#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ
#Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_37 (1st)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
ঠিক তখনই—
মিরায়ার চোখ ফেটে ওঠে বিছানার উপরে হঠাৎ উঠে বসে। সে নিজেকে বুঝতে পারে না, এটা কি স্বপ্ন ছিল। সব স্পর্শ, সব কুয়াশা, সব উত্তেজনা—মাত্র মনের কল্পনা। হাত মুখে ধরে, রেখে হাজার বার শান্ত হতে চাইছে। হৃদয় দ্রুত ধাক্কা খাচ্ছে। মিরায়া সাথে সাথে অস্থিরতায় ফোন হাতে নেয়। হাত অনবরত কাঁপছে তার। ফোনটা খুলতেই দেখলো সকাল ৫টা বাজে। (শনিবার ভোর)
মিরায়া বিছানা থেকে নেমে ধরফরিয়ে বারান্দায় যায়। আর ঠিক সেই সময়ই আকাশ চিড়ে একটা প্লেনের যাওয়ার শব্দ পেয়ে সে আকাশের সেই প্লেনের দিকে তাকায়। তারপর হঠাৎ এক শূন্যতা তার ভিতরে জেঁকে বসে, তার মাথায় এলো রায়ান বলেছিল ভোরে ফ্লাইট কিন্তু সময় জানা ছিল না। মাত্র যেই প্লেনটা আকাশে ছিল এইটা যদি ভোরের ফ্লাইট হয় তবে রায়ান কি এখন আর বাড়িতে নেই? চলে গেছে তাকে একবার না দেখেই। মিরায়ার মন মানলো না। সে কিছু না ভেবে দৌড়ে যায় রায়ানের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় দরজাটা খোলাই ছিল। ঘরে সত্যিই রায়ানের কোনো অস্তিত্ব অনুভব না হওয়ার জন্য সে পা টিপে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে।
ঘরটা একদম পরিপাটিভাবে সাজানো, কেউ একটু আগেও এই ঘরে ছিল দেখে বলা মুশকিল। মিরায়া আশ্বস্ত করল নিজেকে, যে রায়ান চলে গেছে। মিরায়া খালি ঘরটা চোখ ঘুরিয়ে একবার দেখে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রস্থান করার জন্য পা বাড়াতেই তার চোখ রায়ানের টেবিলের উপর যায়। টেবিলের উপর একটা কাগজ বোঝা যাচ্ছে না আসলে কি হতে পারে তবে এটা স্পষ্ট যে রায়ান চোখে পরার মতো করেই রেখে গেছে হয়তো নিজ ইচ্ছায় কারো উদ্দেশ্যে। মিরায়া ধীরে পদক্ষেপে টেবিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে কাগজটা হাতে নেয়। উপরে কিছু লিখা ছিল না তবে। ভিতরে কিছু লিখা আছে তা বোঝা যাচ্ছে। মিরায়া বুঝতে পারছিল না তার কি করা উচিত চিঠিটা কি খুলে দেখবে একবার? নাকি রেখে দেবে। কার জন্য এটা সেটা বোঝারও তো উপায় নেই না খুলে দেখলে।
মানুষ জাতির জন্য একটি তিতা সত্য কথা হচ্ছে- নৈতিক শিক্ষা আর কৌতুহলের মাঝে জিৎ সব সময় কৌতূহলের হয়।
মিরায়াও তো মানুষ তার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম কিছু হয়নি, জানার কৌতূহলেই মিরায়া চিঠিটা হাতে নিয়ে খুলে পড়তে শুরু করে। চিঠিটার প্রথম লিখাপড়া পড়েই মিরায়ার চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেল। লিখাপড়া কিছু টা এমন ছিল-
" হেই মাই লিটল হার্ট-বাড, আমি জানতাম তুমি আসবে আমার ঘরে। তবে একটা ওয়ারনিং আগে দেওয়া হয়নি, এখন দিচ্ছি এসেছ নিজের ইচ্ছেতে আমার ঘরে, তবে নিজের ইচ্ছেতে যেতে পারবে না। আমার ঘরে এই মুহূর্তে অবস্থান করা সবকিছু একান্ত আমার।"
কথাটা মিরায়ার মুখে একটা তৃপ্তির হাসি এনে দিল। মিরায়া চিঠিটার পরবর্তী অংশ পড়লো-
"আমি খুব যত্নবান মানুষ, আমার জিনিসের উপর অবহেলা আমার পছন্দ না। তাই সাবধান, আমার অবর্তমানে নিজের অবহেলা করোনা বেইবি। কারণ এর শাস্তি তোমার জন্য খারাপ হলেও আমার জন্য এনজয়এবল হবে। কাজ শেষে দ্রুত ফিরে আসবো। বাই ।"
চিঠির বাকি অংশে যত্ন ছিল না হুমকি তা বোঝা দ্বায়। তবে মিরায়া নিজেই চিঠিটা পড়ে হাসছে। যেন তার মনটা অদ্ভুত শান্তি পেল। হঠাৎ মিরায়া পাশের ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পায়- এতো মন খোলা হাসি একটা চিঠি পড়ে। মিরায়া সাথে সাথে হাসি থামিয়ে চিঠিটা ভাঁজ করে হাতে নিয়ে রায়ানের ঘর থেকে বের হয়ে নিজের ঘরে চলে যায়।
_____________
শনিবার~
সবাই স্বাভাবিক ভাবে দিন পার করলো। বাড়িটা একটু মনমরা তবে শান্ত কোনো কোলাহল নেই, রায়ানের অনুপস্থিতি সবারই অনুভব হচ্ছিলো। রামিলা চৌধুরীর মন খারাপ ছিল সকাল থেকেই তবে কিছু মুখ ফুটে বলেননি। রিমিও সকালের নাস্তা শেষ করে নিজের বাড়িতে ফিরে গেছে। রুদ্র তাকে নিজে গাড়ি করে দেয়ে আসেছে। সৌভাগ্য বসোতো তার ভাই বাড়িতে ছিল না ওই সময়, যদিও ওই বাড়িতে সে টাকার প্রয়োজন ছাড়া পা রাখে না। রুদ্র আর রায়হান চৌধুরী নিজেদের কাজে ব্যস্ত সোরায়া নিজের মতো আছে আর অন্য দিকে মিরায়া একদম চুপচাপ নিজের ঘরেই বসেছিল সারা দিন।
মিরায়ার ঘর~
মিরায়া নিজের বারান্দায় বসেছিল এক মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে। মুখে যেমন মন খারাপের ছাপ তেমন চিন্তার। মিরায়া শ্বাস ফেলে নিজে নিজে কথা বলতে থাকলো-
"গুনধর ব্যক্তি চিঠি লিখে গেছে কিন্তু এখনকার যুগের ফোন ব্যবহার করে একটা কল দিয়ে পৌঁছেছে কিনা জানাবে সেটা পারছে না। যত্তসব!"
-"আচ্ছা উনি আমাকে তো চিঠি দিয়ে গেছেন এখন কি আমার কল করা উচিত! একবার কল করে জিজ্ঞেস করবো- লেন্ড করেছেন কিনা?"
মিরায়া নিজেই আবার নিজের অতিরিক্ত চিন্তায় বিরক্ত হয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
"ইস্! না, আমি কেন কল করতে যাবো। লেন্ড করলে করবে নাহলে উড়তে থাকুক আমার কি।"
এই বলে নিজের জেদ ধরে রেখে ঘরের ভিতরে চলে গিয়ে পড়তে বসলো। এতো পড়া জমে গেছে দেখেই এক চিন্তায় পড়তে পড়তে দিন পার করলো।
______________
আমেরিকা~ (শনিবার- সময় এর তারতম্যের জন্য)
নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করতেই ট্যাক্সিওয়ে জুড়ে আলো-আঁধারির ঝলকানি। রাতের শহর যেন আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রায়ান লম্বা ট্রেঞ্চ কোট পরে, হাতে ব্ল্যাক লেদার ব্রিফকেস নিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। কাস্টমস আর চেকআউট শেষ করেই সে সোজা বেরিয়ে এলো। ড্রাইভার আগেই অপেক্ষা করছিল কোম্পানির লোগো লাগানো ব্ল্যাক সেডান নিয়ে।
ড্রাইভার সম্মান ভরে দরজা খুলে বলল— “স্যার, অফিস ডাইরেক্টলি?”
রায়ান হালকা মাথা নাড়ল— “ইয়েস। স্ট্রেইট টু দ্য মেইন ব্রাঞ্চ।”
গাড়ি এয়ারপোর্ট ছাড়তেই রাতের নিউইয়র্কের স্কাইলাইন চোখে পড়ল। উঁচু বিল্ডিংগুলো আলোকিত, প্রতিটি রাস্তা আলো আর কোলাহলে ভরা। রায়ান বাইরের দিকে তাকিয়ে কিছুটা শান্ত মুখে শ্বাস ফেলল—অনেকদিন পর আবার এই শহর, নিজের কোম্পানি।
গাড়ি এসে থামল কোম্পানির বিশাল হেডকোয়ার্টারের সামনে। আধুনিক গ্লাস বিল্ডিংটা আলোয় ঝলমল করছে। গেটের সামনে থেকেই সিকিউরিটি গার্ডরা রায়ানকে দেখতে পেয়ে স্যালুট দিল।
লবির ভেতর ঢুকতেই কর্মচারীদের চোখে আলোর ঝলকানি—
“ও মাই গড, মিস্টার রায়ান ইজ হিয়ার!”
“স্যার, ওয়েলকাম ব্যাক আফটার সো লং!”
সবাই যেন একসাথে খুশিতে মুখর হয়ে উঠল। অনেকদিন পর তাদের মালিক, লিডার, অনুপ্রেরণা ফিরে এসেছে। রিসেপশনের মেয়েটা সম্মান ভরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাল—
“গুড ইভনিং, মিস্টার রায়ান। উই আর সো গ্ল্যাড টু সি ইউ এগেইন।”
রায়ান ঠাণ্ডা ভদ্র হেসে বলল—“গুড টু সি ইউ অল টু। লেটস ক্যাচ আপ সুন।”
লম্বা করিডোর পেরিয়ে সে পৌঁছাল কনফারেন্স রুমে। কাঁচের দরজার ওপাশে টেবিল ঘিরে আগে থেকেই বসে আছে কোম্পানির বড় বড় এক্সিকিউটিভ, ডিরেক্টর আর ম্যানেজমেন্ট হেডরা। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল রায়ানকে দেখে।
প্রবেশ করতেই ভেতরটা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“ওয়েলকাম ব্যাক, মিস্টার রায়ান!”
“ইটস অ্যান অনার টু হ্যাভ ইউ হিয়ার এগেইন, স্যার।”
রায়ান ভেতরে ঢুকে একে একে সবার সাথে হ্যান্ডশেক করতে লাগল। বিজনেস মাইন্ড রায়ানের বরাবরই ভালো-
“গুড টু সি ইউ, মিস্টার স্মিথ।”
“হাউ আর ইউ, মিস্টার জনসন?”
“লং টাইম, মিস ক্লেয়ার। নাইস টু সি ইউ এগেইন।”
সবাই উষ্ণ হাসিতে জবাব দিল। পুরো রুম ভরে উঠল প্রফেশনাল অথচ আনন্দঘন এক পরিবেশে। সবাই বসে পড়তেই রায়ান টেবিলের হেডচেয়ারে বসল। এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর গম্ভীর মুখে নথিপত্র সাজিয়ে বললেন—
“মিস্টার রায়ান, উই’ভ বিন ওয়েটিং ফর ইউ। দ্য ইমার্জেন্সি সিচুয়েশন ইজ কোয়াইট ক্রিটিকাল। উইদাউট ইয়োর ডিসিশন, উই কুডন’ট মুভ ফরওয়ার্ড।”
রায়ান হালকা মাথা নেড়ে উত্তর দিল—
“অলরাইট। লেটস নট ওয়েস্ট এনি মোর টাইম। টেল মি একজ্যাক্টলি হোয়াট হ্যাপেন্ড। আই ওয়ান্ট এভরি ডিটেইল অন দ্য টেবিল।”
ম্যানেজার দ্রুত ল্যাপটপ খুলে প্রেজেন্টেশন চালু করল। প্রজেক্টরের আলো জ্বলে উঠল কনফারেন্স রুমে।
“স্যার, লাস্ট কোয়ার্টার’স সাডেন মার্কেট ড্রপ, দ্য লিগ্যাল কমপ্লিকেশনস ইন দ্য ইউরোপিয়ান ব্রাঞ্চ, অ্যান্ড দ্য মার্জার প্রোপোজাল ফ্রম আওয়ার রাইভাল কোম্পানি—এভরিথিং কেম টুগেদার অ্যাট দ্য সেইম টাইম। উই নিডেড ইউ টু মেক দ্য ফাইনাল কল।”
রায়ান ভ্রু কুঁচকে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তারপর গভীর গলায় বলল—
“অলরাইট, লিসেন আপ এভরিওয়ান। ফ্রম নাও অন, আই’ল্ল টেক ফুল চার্জ অফ দিস ম্যাটার। বাট আই নিড ইয়োর কমপ্লিট কোঅপারেশন। অ্যাম আই ক্লিয়ার? আই সেভ টু গো টু দুবাই পর সামথিং রিলেটেড টু দিস।”
সবাই একসাথে দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল—
“ইয়েস, মিস্টার রায়ান! উই নো হেভিং ইউ ইজ আ সল্যুশন ইটস সেল্ফ।"
রায়ান লেন্ড করেই সোজা নিজের অফিসে যাওয়ায় অন্যকিছুর কথা তার মাথায় ছিল না। সবাই এতো দিন পর তার উপস্থিতি পেয়ে বেশ খুশি। তারপর সবাই কম্পানির গ্রোথ এর জন্য আরো কিছু প্লেন সাজায়। দীর্ঘ ৩-৪ ঘন্টা টানা মিটিং এর পর সবাই রায়ানের সকল প্রেক্ষাপটে সহমত প্রকাশ করে মিটিং টার সমাপ্তি হয়।
______________
বাংলাদেশ ~
রাতের বেলা সবাই খেতে বসেছে। রায়হান চৌধুরী খেতে খেতে রামিলা চৌধুরীকে প্রশ্ন করলেন-"রামিলা, রায়ান পৌঁছানোর পর কি তোমাকে কল করেছে?"
রামিলা চৌধুরী খুবই বিরক্ত ছিলেন রায়ানের একবারও কল না করায়। তিনি রায়হান চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললেন-
"না, তোমার ছেলে আমাকে ফোন করবে কেন? আমার কি কোনো চিন্তা আছে নাকি যে তোমার ছেলে ঠিক মতো পৌঁছেছে, না পৌঁছায়নি।"
রামিলা চৌধুরীর কথায় স্পষ্ট বিরক্তি ও কষ্টের ছাপ। মিরায়া খাওয়া থামিয়ে দিল। তার মাথায়ও একই কথা ঘুরছে রায়ান ঠিক মতো পৌঁছেছে কিনা। রায়হান চৌধুরী আবার বললেন -
"আচ্ছা বাদ দেও। হয়তো কাজে ব্যস্ত। এখন খাওয়ায় মনোযোগ দেও সবাই।"
রামিলা চৌধুরী আবার একই শুয়ে বললেন-
"সেই বরং ভালো। এখনকার বাচ্চারা না মা বাবার চিন্তা বোঝে না মন। ব্যস্ততা এতো বেশি যে একটা কল করে নিজের অবস্থাও জানানো যায় না।"
তারপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। বললে হয়তো কথা আরো বাড়তো সাথে মনে থাকা কষ্টও। রাতটা সবারই অন্য রকম শুন্যতায় কাটলো। কেউই নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করলো না।
____________
আমেরিকা~ (শনিবার- সময় এর তারতম্যের জন্য)
কনফারেন্স রুমের দরজা আস্তে করে খুলে বাইরে বেরিয়ে এল রায়ান। মিটিং টা শেষ হয়েছে, কিন্তু মাথার ভেতর এখনও গুঞ্জন করছে নানা হিসাব, নানা চিন্তা। সে নিজের কেবিনে গিয়ে বসতেই টেবিলের উপর রাখা সাজানো ফাইলগুলো একে একে চেক করতে লাগল। গম্ভীর মুখে চোখ বোলাচ্ছে লিগ্যাল ডকুমেন্ট, মার্জার প্রোপোজাল, রিপোর্টের লাইনগুলো—সব কিছুই যেন একসাথে চেপে বসেছে মাথায়।
আমেরিকার রাত শেষ। কোম্পানির বিল্ডিং থেকে বের হওয়ার সময়টা তখন ভোররাতের মতো। আমেরিকার আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ঢুকতে শুরু করেছে। ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাপটা গায়ে এসে লাগতেই রায়ান এক নিঃশ্বাস নিয়ে বেরিয়ে এল নিজের জন্য পাঠানো কালো সেডানে। ড্রাইভার বিনয়ের সাথে দরজা খুলে দিল, কিন্তু রায়ান শুধু মাথা নেড়ে বলল—
“Home. Straight home.”
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি এসে থামল শহরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা রায়ানের সেই বিশাল লাক্সারিয়াস ভিলার সামনে।
গ্লাস আর মার্বেলের দোতলা বাড়ি, চারদিকে আলো জ্বলছে—কিন্তু ভেতরে নীরবতা। বহুদিন পর আমেরিকায় ফিরে নিজের বাড়িটাকে দেখে রায়ানের ভেতরে হঠাৎ এক ধরনের হতাশা ছেয়ে গেল।
বাংলাদেশে তো সে এতদিন একসাথে ছিল মা-বাবা, ভাই-বোন আর নিজের বউটার সাথে। আলোর ঝলমলে এই বাড়িটা এখন অদ্ভুত ফাঁকা আর ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে তার কাছে।
সিঁড়ি দিয়ে নিজের ঘরে যায় রায়ান। ভেতরে ঢুকেই ব্লেজারটা সোফার উপর ছুঁড়ে রাখল। হাতের ফোনটা বের করে ভাবল—“একবার বাড়িতে কল করি? এত ব্যস্ততার মাঝে সিমটাও চেঞ্জ করা হয়নি আর কল ও করা হয়নি। মা নিশ্চয়ই রেগে আছে চিন্তায়।”
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই মনে পড়ল—এখানে এখন ভোর, মানে ওদিকে বাংলাদেশে গভীর রাত। এমন সময় ফোন দেওয়া ঠিক হবে না। কাল কল করে নেবে।
রায়ানের মনে কেবল ঘুরছে মিরায়ার মুখটা আসার আগে একবার দেখে আসারও সুযোগ হয়নি। প্রাণটা হাশফাশ করছে। রায়ান মনে মনে চিন্তা করছে-
“এখন ও কি করছে? ঘুমোচ্ছে তো? আমার জন্য একটু হলেও কি ওর খারাপ লেগেছে আজকের সারাটা দিন? আমাকে ভেবেছে?” মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আচমকা মনে পড়ে গেল সেই চিঠিটার কথা— যেটা সে যাওয়ার আগে লিখে রেখে এসেছে। রায়ানের মাথায় এবার সেই চিন্তা ভর করলো-
“ও কি আদৌ পড়েছে চিঠিটা? ও কি আমার ঘরে গিয়েছিল? যদি পড়ে থাকে, তাহলে একবারও কেন খবর নিল না এখন পর্যন্ত…!”
মনের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা আর অভিমান জমে উঠল। তবে আবার নিজেকে বুঝালো-
"ও খবর নেবেই বা কিভাবে বাংলাদেশের নাম্বার তো এখন আর কাজ করবে না এখানে আর এখানকার নাম্বার টা তো দেওয়া হয়নি ওকে।"
সারাটা রাত বাংলাদেশে না ঘুমিয়ে কাটিয়ে আবার এখানে সারাদিনের পরিশ্রম—শরীর যেন আর টানতে পারছে না।
মাথার ব্যথাটা বাড়তে বাড়তে চোখ ভারী করে তুলেছে রায়ানের।
রায়ান ফোন রেখে। ক্লোজেট থেকে তাড়াহুড়ো করে একটা সাধারণ টি-শার্ট আর ট্রাউজার বের করল। শাওয়ার নিয়ে আসার পর পেটের ক্ষুধাটা মনে হলো জেগেছে মাত্র, এখন কিছু অর্ডার করে আনাবে সেই ধৈর্য আর কুলালো না।
শেষমেষ একটা ডিম নিয়ে সেদ্ধ করল। সেদ্ধ ডিমটাও খেতে যেন অদ্ভুত কষ্ট লাগছিল—একলা টেবিল, একলা রাত। কিছু ভালো লাগছিল না তার।
খাওয়া শেষ করেই ক্লান্ত শরীর নিয়ে শোবার ঘরে গেল।
বড়সড় কিং-সাইজের বেড, সাদা চাদর, ঝকঝকে রুম—কিন্তু আজ সবকিছুই শূন্য। বালিশে মাথা রাখতেই শরীর আর মাথা দুটোই হেরে গেল ক্লান্তির কাছে। শেষবারের মতো মনে ভেসে উঠল মিরার হাসি, তার চোখ, তার ঠোঁট—আর সেই চিঠি-“ও কি সত্যিই পড়েছে…?” রায়ান চোখ খুলে একবার নিজের পাশের খালি বালিশের উপর মিরায়ার মুখটা কল্পনা করতেই মুখে খেলে গেল এক মিষ্টি হাসি আর সাথে সাথেই চোখ বন্ধ করার মাঝে সবকিছু ঘুমের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। শুধু ঘড়ির টিকটিক শব্দে ভরে রইল পুরো ভিলা।
____________
রবিবার সকাল~
সকালটা চৌধুরী বাড়িতে ছিল একেবারেই স্বাভাবিক, নিরিবিলি অথচ নিয়মের ছন্দে ভরা। ভোরের হালকা রোদ উঠতেই বাড়ির চারপাশে এক শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আঙিনার গাছগুলোতে পাখির কিচিরমিচির, বাতাসে একধরনের সতেজ গন্ধ। ডাইনিং টেবিলে সবার একসাথে সকালের নাস্তা শেষ হলো। আলাপচারিতায় ভরা টেবিল ধীরে ধীরে শান্ত হলো—যেন নতুন সপ্তাহ শুরু হওয়ার আগে সবার ব্যস্ততার আভাস।
রুদ্র আর রায়হান চৌধুরী—গম্ভীর মুখে, হাতে ফাইল নিয়ে স্যুট পরা অবস্থায় বাড়ি থেকে বেরোলেন। গাড়ি অপেক্ষা করছিল গেটের সামনে। ড্রাইভার দরজা খুলে দিল, আর তিনি উঠে বসলেন। গাড়ি ছুটলো—চৌধুরী গ্রুপ অফ কোম্পানির হেড অফিসের দিকে।
এইদিকে সোরায়া—ব্যাগ কাঁধে নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কলেজের নোটে ভরা ব্যাগ, আর মুখে একরাশ উদ্যম। বেরোনোর সময় রামিলা চৌধুরীকে হালকা হাসি দিয়ে বলল, “মামণি, আমি যাচ্ছি।” তারপর বাইরে বেরিয়ে কলেজের জন্য রিকশায় ঠিক করে চড়ে বসলো।
অন্যদিকে মিরায়া—চুপচাপ, কিন্তু প্রাণবন্ত চেহারায় ক্যাম্পাসের জন্য রওনা দিল। হাতে ব্যাগ, পরনে হালকা রঙের কুর্তি। গেট পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল, তার দৃষ্টি যেন অজান্তেই কিছুটা দূরে কোথাও হারিয়ে আছে। মন টানছে না তবে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। নিজের এই অবস্থার কারণও তার অজানা।
সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চৌধুরী বাড়িতে একরকম নিস্তব্ধতা নেমে এল। ডাইনিং টেবিল গুছিয়ে রাখা হলো। প্রচণ্ড কোলাহলপূর্ণ সকালের পর হঠাৎ নীরবতা যেন বাড়িটাকে ঘিরে ধরল। যেন দিনের ব্যস্ততার শুরুটা বাইরে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
_____________
সোরায়ার কলেজ~
সকালের প্রথম ক্লাস—অর্থনীতি। ক্লাসরুম ভরা, বোর্ডে প্রফেসর স্যার মার্কার চালাচ্ছেন একের পর এক ডায়াগ্রাম আঁকতে আঁকতে। মাঝের বেঞ্চে বসে সোরায়া—দুই চোখে হালকা ঘুমঘুম ভাব, মাথা দুলছে, খাতায় কলম ছুঁয়ে রেখেছে বটে কিন্তু কোনো নোটই নামছে না। তার এমনিতেই অর্থনীতি বিষয়টা কঠিন লাগে। পাশেই জুঁই বসে আছে, একই অবস্থায়। তবে সোরায়ার ওই আধা ঘুমন্ত চেহারা দেখে জুঁইর আরও মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে—"উফ্ সোরা! একে তো ক্লাসটাই বিরক্তিকর, তার উপর তুই ঘুমে গুট্টি মেরে আছিস, এইসব সহ্যই করা যায়?”
ঘন্টা বাজতেই প্রফেসর স্যার ফাইল গুছিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
ক্লাসরুমের ভেতর হালকা একটা মুক্তির হাওয়া বইলো। প্রফেসরের চলে যাওয়ার সাথে সাথে সবাই যার যার মত কথা বলা আরম্ভ করল ক্লাসটা সাথে সাথেই কোলাহল পূর্ণ হয়ে উঠল। জুঁইও সঙ্গে সঙ্গেই সোরায়ার দিকে ঘুরে বলল—
“ওই ছেমরি! ক্লাসে এমন ঘুমে পড়ে যাচ্ছিলি কেন? রাতে ঘুমাসনি নাকি?”
সোরায়া বেঞ্চে মাথা রেখে বসেছিল, প্রশ্ন শুনে অলস ভঙ্গিতে মাথা অল্প তুলল। চোখ আধো বোজা, কণ্ঠেও আলস্য—
“দেখ জুঁই, সকালের ক্লাস দেহ পায় কিন্তু মন পায় না।”
জুঁই থ হয়ে গেল। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সোরায়ার দিকে, যেন মনে মনে হিসাব করছে—এই মেয়ের মাথা ঠিক আছে তো? তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
“ক্লাসে মন না বসা এক কথা, কিন্তু তুই তো একেবারে ঘুমে টলছিলি। রাতে কি ঘুমাসনি?”
সোরায়া এবার একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল। ঠোঁট নাড়ল ধীরে ধীরে, নিজের মনে বিড়বিড় করল—
সোরায়া (নিজের মনে): “আর ঘুম... যে বই কিনেছি, ঘুম হারাম হয়ে গেছে আমার। যেমন চিন্তা দিচ্ছে, তেমন আকর্ষণ।”
জুঁই ভ্রু কুঁচকে আবার বলল—“কিরে? কিছু জিজ্ঞেস করছি তো উত্তর দে।”
তখন সোরায়া মাথা তুলে হাসির ছোঁয়া মিশিয়ে উত্তর দিল—
"এত দাম দিয়ে একটা বই কিনলাম, ওইদিন টাকা উসুল করার মতো বইটা পড়ে শেষ না করলে কি চলে! এজন্য রাত জেগে পড়েছি।”
জুঁই দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল, তারপর সোরায়ার মাথায় হালকা চাপড় দিয়ে বলল— “তুই আর তোর বই পড়া—দুটোই অদ্ভুত।”
সোরায়া হেসে দিলো—একেবারে দুষ্টুমি ভরা মুখে।
আর জুঁইর বিরক্তি আর অবিশ্বাস মিশ্রিত অভিব্যক্তি দেখে।
অর্থনীতির সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ক্লাস শেষে যখন সোরায়া আর জুঁই এখনও হাই তোলার ফাঁকে ঝগড়া চালাচ্ছিল, তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল মাহির। মুহূর্তেই যেন শ্রেণিকক্ষে পিনড্রপ সাইলেন্স! ঘুমন্ত ছাত্রছাত্রীদের চোখে হঠাৎই আলো জ্বলে উঠল।
সোরায়ার শরীরেও একেবারে এনার্জি শট! সে চোখ তুলে মাহির দিকে তাকাতেই হালকা একটা চকচকে হাসি দিল।
কিন্তু পরম মুহূর্তেই বুকশপের সেই ঘটনা মাথায় চলে আসতেই, তার হাসি একেবারে হ্যাং হয়ে গেল লোডশেডিং-এর মতো! মাথা নিচু করে এমন ভান করল, যেন বেঞ্চের কাঠের ভেতর ঢুকে যাবে।
জুঁই ফিসফিস করে:
“কিরে? হাসছিলি, হঠাৎ মাথা নিচু করলি কেন?”
সোরায়া একেবারে সাইলেন্ট মোড অন করে বসল। কিছুই বলল না জুঁইকে। এসব বলল খেপাতে আর কিছু বাকি রাখবে না জুঁই তার সেটা ভালো করেই জানা।
মাহির স্যার কণ্ঠ খাঁকারি দিয়ে বললেন—
“স্টুডেন্টস, আগামী ১ তারিখ আমাদের নবীনবরণ অনুষ্ঠান হবে। তোমরা সবাই নোটিস বোর্ড টা একটু চেটে করে নিও।”
পুরো ক্লাস খুশিতে একসাথে হাততালি!
“ইয়া-ইয়া-ইয়া!” সোরায়া আর জুঁইর চোখও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
তারপর মাহির সিরিয়াস মুখে জিজ্ঞেস করল—
“ওকে সাইলেন্ট নাও। সবাই ক্লাসে মন দেও এবার। কে কে হোমওয়ার্ক করেছে?”
কেউ কেউ কাতর গলায় বলল—“জি স্যার…”
অন্যরা চুপ।
মাহির ভ্রু উঁচু করে বলল— “ঠিক আছে। এবার কে কে হোমওয়ার্ক করো নি, দাঁড়াও।”
একসাথে একগাদা স্টুডেন্ট দাঁড়িয়ে গেল।
তাদের মাঝে লজ্জায় মাথা নিচু করে দাঁড়ালো জুঁই আর সোরায়া। মাহির চোখ একেবারে সরাসরি গিয়ে থামল সোরায়ার উপর। বুকশপের ঘটনা তার মাথায় তখনও ঘুরছে।
মনে মনে ভাবল—“এই মেয়েটা? উগ্র অভদ্র! এবার দেখি কি বলে।”
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সোরায়ার বেঞ্চের সামনে দাঁড়াল।
গম্ভীর কণ্ঠে বলল—
“হোমওয়ার্ক না করার কারণ কী?”
সোরায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
মাহির আবার বলল—
“শুনছো না জিজ্ঞেস করছি কিছু? কারণ কী?”
সাহস করে সোরায়া মাথা তুলে বলল—
“বিশ্বাস করুন স্যার, আমি হোমওয়ার্ক করেছি… কিন্তু—”
মাহিয সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করল—
“কিন্তু কী?”
সোরায়া-“ খাতা ভুলে বাসায় রেখে চলে আসছি।”
মাহির ভ্রু কুঁচকে হেসে উঠল আর হেসেই বলল-
“তোমরা নিউ জেনারেশন অন্তত অজুহাত হিসেবে কিছু নতুন বানাও। এগুলো তো আমাদের সময়কার অজুহাত—‘খাতা বাসায় রেখে এসেছি’। আর কত বছর চালাবে এটা?”
ক্লাসে সবাই হেসে গড়াগড়ি। জুঁই তো একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে সোরায়ার দিকে তাকিয়ে হাসি চাপতে চাপতে কেঁদে ফেলছে।
শেষে মাহির হাত উঁচু করে বলল—
“আজকের জন্য মাফ করা হলো। তবে এরপর থেকে সবাই হোমওয়ার্ক কমপ্লিট করেই আসবে।”
তারপর আবার ঠান্ডা মাথায় লেকচারে ফিরে গেলেন। দীর্ঘ ১ঘন্টা ক্লাসের পর ঘন্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বেরিয়ে গেলেন। সোরায়া এক দমে বসে পড়ল। তার মুখ গরম, বুকশপের ঘটনা মনে পড়তেই আবার মাথা নিচু।
একটু ভেতরে ভেতরে মজা পেলেও, সে হাসিটা বের করতে পারল না।
জুঁই চাপা গলায়: “তুই তো আজকের পুরো অজুহাত কুইন!”
সোরায়া কানের কাছে হাত দিয়ে শুধু বলল—
“চুপ কর, না হলে কিল খাবি।”
ক্লাস আবার নতুন প্রফেসরের সাথে শুরু হলো।
______________
ঢাবি ক্যাম্পাস~
দুপুরের দিকে ক্লাস শেষ করে মিরায়া আর রিমি দুই বান্ধবী পাশাপাশি হাঁটছে ক্যাম্পাসের বিশাল সবুজ মাঠ ঘেঁষে। হাওয়ায় হালকা ধুলোর গন্ধ, পাখির ডাক, চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ছোট ছোট গ্রুপ জমে গল্প করছে। মিরায়া আর রিমির হাতে গরম গরম এগ রোল, কাগজে মোড়ানো, ধোঁয়া উঠছে। দুজনেই খেতে খেতে হালকা হেসে পাশাপাশি হাঁটছে সবুজ গাছের উপর পা ফেলে তবে মিরায়ার মুখটা একদমই মনমরা আর গম্ভীর।
রিমি এক কামড় দিয়ে রোল চিবুতে চিবুতে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে খেয়াল করছিল—“সকাল থেকে মেয়েটার মুখে হাসি নেই। কিছু না কিছু তো গোলমাল লেগেছে।”
মিরায়ির চোখে স্পষ্ট ক্লান্তি। মাথার ভেতরে শুধু ঘুরছে—
“একদিন হয়ে গেল রায়ান নেই… কেমন আছে, কি করছে? কল তো দিল না একবারও। অথচ চিঠিতে কত আবেগ লিখলো… যত্ন রেখো, অবহেলা করো না, না হলে শাস্তি আছে…ধুর ধুর সব বেফালতু”
মিরায়া বিরক্তির সাথে নিজের মনেই বলল—
“ফালতু! সবই আবেগ। দেশের বাইরে গিয়ে একটুও মনে নেই বোধহয়। এখন আমি বোকা হয়ে শুধু ভাবছি।”
চোখের কোণে বিরক্তি জমলেও ভিতরে একটা হালকা কষ্ট রয়ে গেল।
রিমি হঠাৎ মিরায়ার কাঁধে হালকা কাঁধ লাগিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলল—
“কিরে? কোথায় হারিয়ে আছিস? সকাল থেকে চুপচাপ, শুধু খাচ্ছিস। কিছু বলবি? নাকি দিবাস্বপ্নে ডুবে আছিস?”
মিরায়া স্বপ্ন শব্দটা শুনলেই কেঁপে উঠলো। কেমন যেন ভয় কাজ করে স্বপ্নের কথা ভাবলেই। দীর্ঘ ১৮ বছরের জীবনে জানতে অজান্তে এমন কোনো স্বপ্ন দেখেনি সে যেটা ওই রাতে দেখেছে। মিরায়া রাগ ঝেড়ে ফেলে ছোট্ট উত্তর দিল— “কিছু হয়নি।” কণ্ঠে বিরক্তি স্পষ্ট।
রিমি চোখ সরু করে মিরায়ার দিকে তাকাল।
“হুঁ, বুঝেছি! এটা তোর নরম গলায় ‘কিছু হয়নি’। মানে ভেতরে পুরো আগুন জ্বলছে। ঠিক না?”
মিরার মুখে কোনো জবাব নেই দেখে রিমি ইচ্ছে করেই বলল—“তুই কি রায়ান ভাইয়াকে নিয়ে ভাবছিস? চলে গেছে তো, তাই খুব মিস করছিস, না? কথায় আছে না দাঁত থাকতে মানুষ দাঁতের মর্ম বোঝে না।”
মিরায়া চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রাগান্বিত সুরে বলল—
“যাতা! বাজে কথা বলিস না তো। উনার কথা আমি কেন ভাববো? আর শোন আমি আমার দাঁতের বেশ যত্ন করি এই আফসোস আমার হবে না ভবিষ্যতে।”
রিমি মুচকি হেসে ফিসফিস করল—
“হুম… এইরকম বিরক্তি মানেই আসলেই ভাবছিস।"
রিমি আবার বলল—
“আচ্ছা, উনার খবর কি? কবে ফিরবেন?”
মিরায়া একটু জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বলল—
“আমি জানি না। যাওয়ার পর থেকে উনি একবারও কল করেননি বাড়িতে।”
এই কথা শুনে রিমি যেন আরও স্পষ্ট বুঝল—মেয়েটা সত্যিই মন খারাপ করেছে। তখনই রিমি হালকা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“হয়তো সময় পায়নি। নাহলে কে জানে… বিদেশে নতুন কাউকে পেয়ে গেছে নাকি? যাওয়ার আগে তো কাউকে কিছু বলেও গেল না…”
মিরায়া এক ঝটকায় প্রতিবাদ করে উঠল—
“ধুর! একদম বাজে কথা বলিস না তো। রায়ান ভাইয়া মোটেও এমন না।”
মিরায়ার কণ্ঠে অতিমাত্রার প্রতিবাদ শুনে রিমি হো হো করে হেসে ফেলল। রিমি একদম নিশ্চিত হয়ে গেল মিরায়া ধীরে ধীরে রায়ানের প্রতি দুর্বল হয়ে গেছে তাই রায়ানের জন্য করা সামান্য কটুক্তি ও তার সহ্য হচ্ছে না আবার নিজেও দুর্বলতা স্বীকার করার মেয়ে নয়।
রিমি মিরায়া কে খেপাতে কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে খেপানোর ভঙ্গিতে বলল—
“তাহলে বল, কেমন বান্ধবী? সব খুলে বল আমিও শুনি সে কেমন।”
মিরায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল—
“তুই যদি আর একটা কথা বলিস উনাকে নিয়ে, দেখিস আমি তোর কি করি।”
রিমি দুই হাত উঁচু করে মজার ছলে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল—
“না না বাবা! থাক, আমি আমার বোনের মতো বান্ধবীর সাথে অন্য কারো জন্য ঝগড়া করতে চাই না।”
মিরায়া বিরক্তির মাঝেই হেসে দিল। রিমি এবার একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে মজার সুরে বলল—
“তবে এটুকু সত্যি, আমার মিরা জানের সামথিং-সামথিং হচ্ছে।”
মিরায়া চোখ বড় বড় করে রিমির দিকে তাকিয়ে রাগ দেখাল—“নাথিং ইজ হ্যাপেনিং! একদম বেশি বুঝবি না।”
রিমি মুচকি হেসে মাথা দোলাল—
“যা-ই বলিস, চোখ কিন্তু সব বলে দিচ্ছে।”
দুজনেই হেসে একসাথে এগ রোল শেষ করল। সবুজ মাঠে হাঁটার সেই মুহূর্তটা যেন আবার হালকা আর নির্ভার হয়ে উঠল। মিরায়ার রিমির খেপানো মজার লেগেছে বলা বাহুল্য। সে নিজেও এক মুহূর্তের জন্য রায়ানের প্রতি নিজের দুর্বলতা অনুভব করতে পারলো কিন্তু প্রশ্রয় দিল না। মনের ভাব মনেই দাফন করে রাখলো।
চলবে...
পাখিরা পর্ব টা অনেক বড়ো অনেক কিছু কভার করতে হবে ধামাকা বলে কথা। তাই ৩৭ দুটো অংশে আসবে। আর আমার অনুরোধ থাকবে এই পর্ব গুলো মিস দিও না তাহলে গল্পের মজাই পাবা না। 🤧 মিরায়া রায়ানের ফোনের কথোপকথন কালকের অংশে থাকবে। একটা কথাই বলবো শুধু পর্বের অংশ যেমন তেমন কিন্তু কথাগুলো মনের মতন হবে। 🙈আজকের পর্ব টা কেমন লাগলো বইলো। Love you pakhis ❤️ 🥰
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ
#Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_37 (2nd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
সোরায়ার কলেজ~
সকালবেলার টানা তিন ক্লাস শেষে টিফিনের ঘন্টা বাজতেই পুরো কলেজ যেন হইচইয়ে ফেটে পড়ল। কিন্তু এই ভিড়ের বাইরে একেবারে শান্ত, ফাঁকা একটা ক্লাসরুমে ঢুকে বসেছে সোরায়া আর জুঁই। সোরায়ার হাতে একটা স্যান্ডউইচ—ক্যান্টিন থেকে কিনে এনেছে। অন্যদিকে জুঁই ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করে টেবিলের উপর রাখল। ঢাকনা খোলার সাথে সাথেই ঘরে ভেসে এল বিরিয়ানির মন মাতানো গন্ধ।
জুঁই মুখে খাবার চিবুতে চিবুতে গম্ভীর ভঙ্গি করে বলল—
“নবীন বরণে তুই শাড়ি পরবি তো সোরা?”
সোরায়া থ হয়ে গেল। স্যান্ডউইচ হাতে নিয়ে একটু দ্বিধা নিয়ে বলল—“জানি না রে… দেখা যাক কি পরা যায়।”
জুঁই চামচটা আঙুলে ঘুরিয়ে একেবারে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল— “না না, কোনো দেখা যাক না। তুই শাড়িই পরবি। এইটাই ফাইনাল।”
সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—
“আচ্ছা বাবা, তুই যা বলবি তাই। তবে শাড়ি পরতে আমার মোটেই ভালো লাগে না। মোটা মোটা লাগে, পেট বের হয়ে থাকে এটা আরো বিরক্তি কর লাগে। আমি সামলাতে ও পারি না।”
জুঁই খিলখিলিয়ে হেসে ফেলল—"আরে! তুই আবার কই মোটা?!”
সোরায়া স্যান্ডউইচ নামিয়ে টেবিলের উপর কনুই ভর দিয়ে বলল—“এত ডায়েট করব ভাবি, তাও করা হয় না। প্রতিদিন ওই আনহেলদি খাবার খেয়ে আমার প্রাণ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ঘাসপাতা, স্যালাড, জুস—আরে এগুলো মানুষ খায় নাকি? মনে হয় গরুর খাদ্যাভ্যাস হয়ে গেছে।”
এবার জুঁই খিলখিলিয়ে হেসে টিফিন বক্সটা সোরায়ার দিকে ঠেলে দিল,
“এই নে, বিরিয়ানি খাঁ, আম্মু বানিয়েছে তবে একটু আন-হেলদি।”
সোরায়া বক্সটার দিকে তাকিয়ে কপালে হাত দিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল—
“এইসব আনহেলদি খাবারগুলো ঠিক সুন্দর ছেলেদের মতো। দেখতে সুন্দর, খেতে মজা… কিন্তু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।”
জুঁই হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে হাত দিয়ে পেট চেপে ধরল—
“হাহাহা! সোরা, তোর মুখ থেকে এরকম ডায়লগ বের হয় কিভাবে বল তো? খাবার আর ছেলেদের তুলনা? ওয়াও!”
সোরায়াও হেসে ফেলল, তবে একটু কৃত্রিম ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল—
“যা খুশি বল। আমি সত্যি বলেছি।”
হঠাৎ একই ক্লাসের পিছনের দরজাটা কড়মড় শব্দ করে খুলতেই ভেতরে ঢুকলো দ্বাদশ শ্রেণীর পাঁচজন মেয়ে। ক্লাসরুমটা তখন প্রায় খালি, সামনের বেঞ্চে বসে আছে শুধু সোরায়া আর জুঁই। কোলাহল থেকে দূরে এই নিস্তব্ধ ঘরটায় ওরা আরামে বসেছিল, কিন্তু সিনিয়রদের প্রবেশেই পরিবেশটা বদলে গেল। মেয়েগুলো নিজেদের মধ্যে হেসে-খেলে ঢুকল, যেন অনেক বড় কোনো সিক্রেট নিয়ে কথা বলছে। পেছনের বেঞ্চে বসেই প্রথমজন ফিসফিস করে বলল—
প্রথম মেয়ে ঠোঁটে বাঁকা হাসি, চোখ টিপে বলল,
– "আরে বাবা, আজকের ইংলিশ ক্লাসে দেখেছিস মাহির স্যার কেমন লতার দিকে তাকাচ্ছিল?"
দ্বিতীয় মেয়ে লতার কাঁধে খোঁচা দিয়ে, ঠোঁটে দুষ্টু হাসি,
– "দেখেছি, দেখেছি! সব সময় তোকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। খেয়াল করেছিস? যেকোনো প্রশ্ন করলে তোকেই জিজ্ঞেস করে।"
তার কথায় বাকিরা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সেই হাসির মধ্যে মিশে থাকে একধরনের টিপ্পনী, কটাক্ষ, আর মজার ছলে ঠাট্টা করার আনন্দ।
লতা চোখ বড় করে, বিরক্তির ভান করে বলল,
– "আহ্, কি যে বলিস না তোরা! এসব বাজে কথা। কিছুই না।"
কিন্তু মুখে অস্বীকার করলেও ওর ঠোঁটের কোণে হালকা লাজুক হাসি লুকিয়ে যায়নি। গালে লালচে আভা ফুটে ওঠে।
সে কথা সবাই টের পেয়েই আরও জোরে হেসে ওঠে।
তৃতীয় মেয়ে হাততালি দিয়ে বলল,
– "হাহাহা, এই লুকোচুরি আর কদিন লুকোনো যাবে? এবার পুরো কলেজই জেনে যাবে।"
ওদের হাসির শব্দে চারপাশ কাঁপতে লাগল।
সামনের বেঞ্চে বসা সোরায়া এসব কথা শুনে ভেতরে ভেতরে ফুঁসছিল। ওর চোখে মনে হচ্ছিল আগুন জ্বলছে। স্যারের প্রতি এমন খোঁচা, গুজব, কটাক্ষ—সব ওর কাছে অসহনীয় লাগছিল। হঠাৎ ও জোরে হাত দিয়ে বেঞ্চে চাপড় মেরে উঠে দাঁড়াল। শব্দটা পুরো ক্লাসে প্রতিধ্বনিত হলো। পেছনের মেয়েগুলো প্রথমে চমকে তাকাল, তারপর চোখ সরু করে ওর দিকে মনোযোগ দিল।
সোরায়া উচ্চস্বরে, জুঁইকে শুনিয়ে কিন্তু আসলে ওদের উদ্দেশ্য করে,
– "দোস্ত একটা সত্যি কথা কি জানিস? পাগলের সুখ আসলেই মনে মনে। যা ভেবে ভালো লাগে, তাই ভেবে খুশি থাকে।" ওর গলায় কড়া সুর, চোখে বিরক্তির ঝলক।
সিনিয়রদের মধ্যে একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে এগিয়ে এলো।
চতুর্থ মেয়ে ভ্রু কুঁচকে, আঙুল তুলে বলল,
–" এই যে মেয়ে, তুমি! এইমাত্র যা বললে, সেটা কি আমাদের উদ্দেশ্য করে বলেছো?
জুঁই আতঙ্কিত মুখ, সোরায়াকে চুপ করাতে ফিসফিস করে,
– "দোস্ত, ঝামেলা করিস না… বাদ দে, চল।"
কিন্তু সোরায়ার চোখে তখন দৃঢ়তা। সে সরাসরি তাকাল ওদের চোখে। সোরায়া কঠিন গলায় বলল,
– "হ্যাঁ, তোমাদেরই বলেছি। স্যারকে নিয়ে বাজে গুজব ছড়ানো বন্ধ কর। নিজের শিক্ষকের প্রতি এতটুকু সম্মান নেই তোমাদের? স্যারের একটা প্রস্টিজ আছে কলেজে।"
তার দৃঢ় কথায় সিনিয়রদের মুখে প্রথমে অবাক ভাব,তারপরই কুটিল হাসি ফুটে উঠলো।
লতা সামনে এসে, চোখ টিপে সোরায় উদ্দেশ্যে বলল-
– "ওরে বাবা! এ তো দেখি , স্যারের চামচি! তুমি তো সেই, যে স্যারের গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলি সেদিন। হুম? এখন এত বড় বড় কথা শোনাচ্ছো?"
সোরায়া ঠান্ডা গলায়, কিন্তু চোখে বিদ্যুৎ ঝেড়ে বলল,
– "সেটা ছিল দুর্ঘটনা। আর তোমাদের এই গুজব পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত বানোয়াট। দুটো ব্যাপার একেবারেই আলাদা। এতে স্যার এর সম্মানহানি হবে।"
লতা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে, ঠোঁট বাঁকিয়ে উত্তর করল,
– "সম্মান মাই ফুট! মাত্র দুই দিনের মেয়েও এসে স্যারের গায়ে পড়ে, আর এখন সম্মান শেখাচ্ছে! ওই ফালতু টিচারের মতো লোকের দরকার নেই একেবারেই এই কলেজে। একটু ভালো দেখতে বলে সবাই এই কয়দিনে পাগল হয়ে গেছে নতুন স্যারের উপর।"
এবার সোরায়ার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। ওর চোখ লাল হয়ে উঠল। মাহিরের চরিত্র নিয়ে কথা বলাটা একদম তার পছন্দ হয়নি। সোরায়া তীক্ষ্ণ গলায় প্রতিবাদ করে বলল-
– "গায়ে পড়া ছিল দুর্ঘটনা। কিন্তু শুকরিয়া, আমি লতিকার মতো স্যারের সাথে নিজেকে জড়িয়ে গুজব ছড়াচ্ছি না, মিস লতা।"
এই কথায় চারপাশে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। বাকিদের মুখে অবাক ভাব। তারপর আবার ফিসফিস করে হাসি—
কিন্তু এবার সেই হাসিতে কুটিলতা আর রাগ মিশে ছিল।
লতা চোখ সরু করে, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে থাকে সোরায়ার কথায়। সে এগিয়ে এলো সোরায়ার একদম সামনে। ওর চোখে যেন বিষ মাখানো আগুন, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের রেখা। জুঁই ভয় পেয়ে সাথে সাথে দাঁড়াল, সোরায়ার হাত ধরে টানতে লাগল।
জুঁই আকুতি ভরা গলায়: – প্লিজ আপু, ভুল বুঝছেন। আসলে ও ওইভাবে বলতে চায়নি। চল সোরায়া, চলো…"
কিন্তু সোরায়া হাত ছাড়িয়ে দিল। তার মুখে একগুঁয়ে জেদ, চোখে দৃঢ়তা। সোরায়া দাঁতে দাঁত চেপে, সোজাসুজি তাকিয়ে বলল– "ও ভুল বলছে। আমি তোমাদের সব মিন করেই বলেছি। লজ্জা নেই তোমাদের? নিজের স্যারকে নিয়ে নোংরা গুজব ছড়াচ্ছো!"
এমন সময় ক্লাসরুমের দরজার সামনে একটা ছায়া দেখা যায়। মাহির স্যার, যে একটু আগে টিফিন শেষ করে হাত ধুতে যাচ্ছিল, আওয়াজে দাঁড়িয়ে পড়েন ক্লাসরুম টার সামনে। ভিতরের দৃশ্যটা দেখে কপাল কুঁচকে যায় মাহিরের। ভেতরে একাদশ শ্রেণির ছাত্রী আর দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীরা মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আর তার চোখে পড়ে সামনের দিকে দাঁড়ানো সোরায়া। মাহির মনে মনে, রাগ চেপে আওড়ালো-
– "এই মেয়ে এখানে কী করছে? আর বড় ক্লাসের মেয়েগুলো এভাবে ঘিরে আছে কেন ওকে?"
কিন্তু ভেতরের মেয়েরা এখনো খেয়াল করেনি মাহির দাঁড়িয়ে আছে।
লতা তাচ্ছিল্যের সুরে, সোরায়াকে উস্কে দিতে অপ্রয়োজনীয় কথা জিজ্ঞেস করে,
– "এত ছোট তুমি স্যার স্যার করছ! স্যারের সাথে আসলেই কোনো ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে নাকি তোমার?"
সোরায়া অজান্তেই ফাঁদে পা দিয়ে তাদেরকে বুঝাতে এবং নিজের জমিন শক্ত করতে বলল,
– "হ্যাঁ আছে! উনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে আছেন। মাঝে মাঝে কথাও হয়। তোমাদের মতো তো না, যাদের সাথে স্যারের কোনো সম্পর্কই নেই, জানেও না!"
এই কথা শুনেই দরজার পাশে দাঁড়ানো মাহিরের চোখ লাল হয়ে যায়। তার ভেতরে ভীষণ রাগ জমে ওঠে।
মাহির মনে মনে, গম্ভীর ক্ষোভে ফেটে যাচ্ছে,
– "এ কীসব আজেবাজে কথা বলছে! আমি তো ওকে ভালো করে চিনিই না। আর এখন যদি সবাই ভাবে আমি স্টুডেন্টদের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়াই, তাহলে আমার সম্মান একেবারে ধুলোয় মিশে যাবে।"
তার মুঠো শক্ত হয়ে ওঠে, দৃষ্টিতে ঝলসে ওঠে ক্ষোভ। হঠাৎই দরজাটা জোরে ঠেলে ভেতরে ঢুকল মাহির। দরজা ঠেলতেই “ঠাস!” শব্দে সবাই একসাথে চমকে উঠল। দ্বাদশ শ্রেণীর সিনিয়ররা একসাথে আঁতকে উঠল। হাসি-ঠাট্টা যেন মুহূর্তেই গলার ভেতর আটকে গেল। পরিবেশে চাপা নীরবতা নেমে এলো। সোরায়া প্রথমেই তাকাল মাহিরের দিকে। তার চোখদুটো যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল, চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরা। একেকটা দৃষ্টি যেন ছুরির মতো বিদ্ধ করছিল ভেতরের সবাইকে। মাহিরের সেই চোখে এমন এক আগুন ছিল—যা দেখে কারও দাঁড়ানোর সাহস থাকবার কথা নয়।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—সবাই ভয়ে সরে গেলেও, সোরায়া নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি চললেও, মুখে তার ভয়ের কোনো ছাপ ফুটল না।
মাহির গম্ভীর, প্রচণ্ড রাগে সবার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়লো-
– "এখানে কি হচ্ছে?"
এক মুহূর্তের জন্যও কারও গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল না।
বাকি সিনিয়রদের চেহারায় ভয়ের ছাপ স্পষ্ট, চোখ বড় বড়, ঠোঁট শুকনো।
শুধু লতা সামলে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল—
লতা গলায় কাঁপন, চোখ নিচু করে:– "স্যার… কিছু না… তেমন কিছু হয়নি এখানে। শুধু… এই মেয়েটা আপনার ব্যাপারে…।"
কথা শেষ হওয়ার আগেই টিফিন টাইম শেষের ঘণ্টা বেজে উঠল। “ট্রিন ট্রিন ট্রিন” শব্দ যেন সবাইকে আরও চেপে ধরল।
লতা দ্রুত বিষয়টা গিলতে চাইলো। তাড়াহুড়ো করে বলল—
– "স্যার, ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। আমরা যাই, আমাদের ক্লাস আছে।" এই বলে সে দ্রুত দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। বাকি চারজনও তাকে অনুসরণ করে প্রায় দৌড়ের মতো গতিতে নিজেদের ক্লাসে চলে গেল।
এখন পুরো ফাঁকা ক্লাসে দাঁড়িয়ে আছে কেবল সোরায়া আর জুঁই। মাহির সোজা তাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার চোখ এখনও রাগে জ্বলছে।
মাহির কঠোর গলায়, সোরায়ার দিকে তাকিয়ে:–
"আজকের কলেজ শেষে মাঠে গিয়ে দাঁড়াবে। কথা আছে আমার তোমার সাথে।"
তারপর ঠান্ডা চোখে ঘুরে তাকাল জুঁইর দিকে। মাহির আদেশমূলক গলায় বলল:– "আর তোমাকে বলছি—তুমি আসবে না ওর সাথে।"
এই কথাটা এতটা দৃঢ়তা নিয়ে বলা হলো, যে জুঁইর শরীর শিউরে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই মাহির দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল, তার পায়ের শব্দ করিডোর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো ।ঘরটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু সোরায়ার বুকের ভেতর তখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, চোখ নিচু।
তার মনে এক অদ্ভুত ভয় ঢুকে গেল—
“এভাবে একা ডেকে উনি আমাকে কি বলবেন? আমি কি কোনো বড় ভুল করে ফেললাম? উনি কি ভাবছেন আমার সম্পর্কে? উনার চোখে এত রাগ কেন ছিল…”
সোরায়ার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। বুকের ভেতর প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমা হতে লাগল, কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
_____________
ঢাবি ক্যাম্পাস~
সকালের ক্লাসগুলো শেষ, ক্যাম্পাসের পুরো পরিবেশ শান্ত। রিমি আর মিরায়া ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের মূল গেটের দিকে হাঁটছে। দুজনের মধ্যকার দূরত্ব কম, বাতাসে হালকা গন্ধ, গাছের ছায়া পথের পাশে দীর্ঘ হয়ে গেছে।
রিমি হালকা হাসি দিয়ে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল—“মিরা, তুই তো এখন সরাসরি বাড়ি যাবি তাই না?”
মিরায়া ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। চোখে হালকা অবসাদ, কিন্তু ঠিকঠাক উত্তরে বলল—“হ্যাঁ, বাড়ি ফিরব রে। আজকে আর কোনো কাজ নেই আমার।”
রিমি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, হালকা হাসি ফোটাচ্ছে মুখে—
“আসলে, তোর বাড়ির দিকেই আমার একটা কাজ আছে। একসাথে যাই চল, পরে যেখানে নামার কথা, সেখানে নেমে যাব আমি।”
মিরায়া কিছুটা অবাক হয়ে প্রশ্ন করল—“তোর আমার বাড়ির দিকে কাজ! কী কাজ? আগে তো বললি না।”
রিমি হালকা ইতস্তত বোধ করে, কিন্তু চোখে মজা ফোটাতে বলল—“বললে কিছু মনে করবি না তো?…”
মিরায়া ভড়কে গিয়ে অভিমানী চোঁখে তাকিয়ে বলল— “এমন কি কথা বলবি, যাতে আমি কিছু মনে করতে পারি? তাড়াতাড়ি বল।”
রিমি হেসে বলল, চোখে একটু কৌতুক—“আসলে, আমি একটা ক্যাফেতে লাইভ গান পারফর্ম করি। আজকে সিডিউল আছে।”
মিরায়া চমকে চোখ বড় করে জিজ্ঞেস করল— “কি! তুই গান গাইতে পারিস? লাইভ পারফরমেন্সও করিস? কী বাজিয়ে পারফর্ম করিস রে? আমি তো শুনেছি লাইভ পারফরমেন্সে কোন না কোন ইন্সট্রুমেন্ট প্লে করতে জানতে হয়।” (অতিরিক্ত উৎসাহিত হয়ে)।
রিমি হাসিমুখে উত্তর দিল—“গিটার দিয়ে। গান বাজাই আমি।”
মিরায়া অবাক হয়ে আরেকবার বলল—“এত বড় কথা আজকে আমাকে বললি? আগে কেন বললি না? আমি আর কথা বলবো না তোর সাথে।”
রিমি হালকা কৌতুক ভরে উত্তর দিল—“আরে রে, আগে বলার সুযোগ হয়নি। এই বিষয়ে তো তেমন কথাই হয়নি। তাই তোকে জানাইনি। আজ তো জানলি চল, দেরি হয়ে যাবে আর দাঁড়ালে। রাগ করে না জান।”
মিরায়ার চোখে আগ্রহ, রিমির মুখে লুকানো আনন্দ।
দুজনেই হেসে ফেলল। ক্যাম্পাসের শান্ত পথ পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দুজনের কথোপকথন যেন আরও মধুর হয়ে উঠল।
রিকশা ঠিক করলো তারা। একে একে উঠে রিকশায় বসল।
কিছু সময় পর~
পরবর্তী সময়ে রিক্সা চলতে থাকার এক পর্যায়ে একটা মোড়ে রিমি রিক্সা থামাতে বলে। মিরায়া একটু অবাক হয়ে বলল- "কিরে এখানে থামাতে বললি যে? এখানেই নেমে যাবি?"
রিমিও সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে বলল- "হ্যাঁ রে, ওই যে সামনে একটা ক্যাফেটারিয়া দেখছিস ওইটা তেই কাজ করি (আঙ্গুল তাক করে)।"
মিরায়া রিমির দেখানো দিকে চোখ দেয় ওই ক্যাফেটারিয়ায়। তারপর দুইজন দুইজনকে বিদায় জানিয়ে আলাদা হয় নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। রিমি নিজের কাজের পথে আর মিরায়া বাড়ির পথে।
___________
চৌধুরী বাড়ি~
মিরায়া বাড়িতে ঢুকতেই রামিলা চৌধুরীকে ড্রয়িং রুমে দেখতে পায়। সে দ্রুত তার কাছে গিয়ে সোফায় পাশের জায়গায় বসে পড়ে। রামিলা চৌধুরী বই পড়ছিলেন। মিরায়াকে দেখে হাতের বইটা টি-টেবিলের উপরের রেখে মিরায়াকে এক হাতে জড়িয়ে ধরেন। রামিলা চৌধুরী ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে মাথায় চুমু দিয়ে বললেন-
"এইতো এখন বাড়িটা বাড়ি বলে মনে হচ্ছে।"
মিরায়া একটু দূরে সড়ে গিয়ে বলল- "মানে? এতক্ষন বুঝি বাড়ি বাড়ি ছিল না?"
রামিলা চৌধুরী হালকা হেঁসে বললেন-"বাড়িতে মানুষ না থাকলে বাড়ি কি বাড়ি মনে হয় বল? সকালে তোরা যে যার যার মতো বের হয়ে যাস। বাড়িতে আমি একা থাকি। বাড়ি ফাঁকা থাকলে মন কি আর মানে বল?"
মিরায়া রামিলা চৌধুরীর কথা শুনে একটু চুপ হয়ে গেল। কিন্তু পর মুহূর্তেই আবার বলে উঠলো-
"কেন মামনি? সব সময় তো এমনি হয়। তুমি তো এটাই বাড়িতে থাকতে, হঠাৎ আজ এমন বলছো কেন?"
রামিলা চৌধুরীর চোখের কোণ খানিকটা ভিজে গেল। তিনি আবেগ সামলাতে না পেরে মিরায়াকে মনে থাকা কথাটা বলেই দিলেন-
"আমার কিছুই ভালো লাগছে না রে মা। আমার ছেলেটা এত বছর পর দেশে ফিরলো। বাড়িটা যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছিল তোদের সবার উপস্থিতি তে। কিন্তু রায়ানও কাজের জন্য চলে গেল, এখনো কোনো খবর নেই কবে ফিরবে কে জানে। ঠিক মতো পৌঁছেছে কি না তারও খোঁজ নেই।"
মিরায়া রামিলা চৌধুরীর চিন্তার কারণটা বুঝতে পারছে। তার নিজেরও বেশ চিন্তা হচ্ছে কিন্তু মুখে প্রকাশ করতেও নারাজ আবার মেনে নিতেও। মিরায়া এবার রায়ানের কথা ওঠাতে সুযোগ পেয়েছে একটু নিজের মনের প্রশ্ন গুলো করার। মিরায়া একটু শান্ত ও স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলল-
"আচ্ছা মামণি, এতোই যখন চিন্তা হচ্ছে একটা কল কেন করছো না? তার খবর টা তো শুনতে পারতে ফোন করলে।"
রামিলা চৌধুরী এবার হালকা হেসে উত্তরে বললেন-
"আরে বোকা মেয়ে আমেরিকায় কি বাংলাদেশের নাম্বার চলবে নাকি যে ফোন করে খোঁজ নিবো?"
মিরায়ার ধ্যান ফিরল সাথে সাথে-"ওহ্ তাই তো।" এই নাম্বারে তো আর কথা বলা সম্ভব নয় এটা বুঝতে পেরে মিরায়া পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"তাহলে মামণি উনার আমেরিকান নাম্বার এ কল করো। তাহলেও তো হয়।" (সামান্য উত্তেজিত গলায় যেন উপায় খুঁজতে ব্যস্ত)।
রামিলা চৌধুরী হতাশা নিয়ে বললেন-
"নাম্বার তো নেই। রায়ানের সাথে সবসময় ভিডিও কলে কথা হতো। ব্যস্ততার মাঝে সপ্তাহে বা মাসে একবার করে কল করতো তাই আর তাকে দেখে কথা বলার সুযোগে নাম্বার এর প্রয়োজন পড়েনি।"
মিরায়াও এক মুহূর্তের জন্য আশা ছেড়ে দিয়ে আবার উত্তেজিত গলায় বলল -
"তাহলে মামণি অনলাইনেই কল দেও।"
রামিলা চৌধুরী হাঁফ ছেড়ে বললেন-
"সকাল থেকে অনেক বার চেষ্টা করেছি ঢুকছেই না। তাই তো আরো চিন্তা হচ্ছে। অনলাইনে এখনো আসেনি কানেক্ট হচ্ছে না।"
মিরায়াও এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। মিরায়া কৌতুহলি হয়ে রামিলা চৌধুরীকে অনুরোধ করল-
"মামণি আইডি টা আমাকে একটু দেবে? আমি দেখি একবার চেষ্টা করে।"
রামিলা চৌধুরী একটু অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন-
"তোর কাছে ওর আইডি নেই?"
মিরায়ার রায়ানের সাথে যা কথা হতো না মুখোমুখি আর না হয় ফোনেই, তাই আর কখনো প্রয়োজন পড়েনি অনলাইন প্লাটফর্ম এ অ্যাড হওয়ার। মিরায়া চুপসে যাওয়া মুখ ডানে বামে নাড়িয়ে বলল- "নাহ্ মামণি, নেই।"
রামিলা চৌধুরী অবাক হয়ে বলে উঠেন-
"এত দিনে এইটাও নিস নি? কি করেছিস তাহলে এত সময় বাইরে একসাথে টইটই করে?"
মিরায়া রামিলা চৌধুরীর কাছে এমন কিছু শুনবে আশা করেনি। সে সামান্য লজ্জায় পড়ে যায়। আর মনে মনে রায়ানের উপর সেসব দিনের রাগ ঝাড়তে ঝাড়তে বলতে থাকে-
"সেসব তোমার ছেলে কে জিজ্ঞেস করো কি করেছে
আমার সাথে। ঘুরানো, খাওয়ানো, উতলাই পড়া যত্ন আর নির্লজ্জের মতো কি সব কথা বলে আমাকে লজ্জায় ফেলা- এই করেছে তোমার ছেলে। অন্য কিছুর সময় কোথায় পেলাম!"
রামিলা চৌধুরীকে মিরায়া একটু অন্য ভঙ্গিতে বুঝাতে বলে-
"মামণি আসলে রায়ান ভাইয়ার সাথে তেমন সহজভাবে এখনো কথা হয়নি তাই আইডি টাও নেওয়া হয় নি। প্রয়োজন হবে কখনো তাও মাথায় আসেনি। তুমি এখন দাও না তাহলেই তো হয়।"
রামিলা চৌধুরী ছেলের বউয়ের তার স্বামীর প্রতি এই অদ্ভুত অদৃশ্য টানটা বুঝে পেরে একটু মুচকি হেঁসে নিজের ফোন থেকে রায়ানের আইডিটা বের করে মিরায়াকে দেন। মিরায়াও কৌতুহলি মনে রায়ানের আইডি লিংক টা নিয়ে প্রথমবারের মতো আইডিতে প্রবেশ করতেই দেখতে পায় সম্পূর্ণ আইডি খালি। কিছুই নেই রায়ানের সম্পর্কে, এমনকি বাড়তি একটা ছবিও নেই। শুধু প্রোফাইলের ছবি আর কভার ছবি আছে। কভার ছবিটা আমেরিকায় তোলা বোঝা যাচ্ছে ব্যাকগ্রাউন্ড দেখেই। রায়ান বাইক রাইডিং এর ড্রেসআপ এ নিজের বাইকের উপর বসে আছে ছবিতে। মিরায়া না চাইতেও কয়েকবার জুম করে দেখলো রায়ানের ছবি টা। পাশে রামিলা চৌধুরী বিষয়টা খেয়াল করে মজার ছলে মিরায়ার কাছে ঝুঁকে প্রশ্ন করলেন-
"আমার ছেলেটা হেন্ডসাম আছে, তাই না রে?"
মিরায়া রায়ানের ছবির দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হালকা মিষ্টি হেঁসে আনমনে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল-
"হুম, অনেক বেশি হেন্ডসাম। একটু বেশিই।"
নিজের কথা বলে ফেলেই চোখ বড় বড় করে নিলো কি বলল এই মাত্র তা যেন মাথার ধরছে না। রামিলা চৌধুরী এইদিকে মুচকি হেঁসে যাচ্ছেন। মিরায়া আমতা আমতা করে বলল-
"আ...আমি ওইভাবে বলি না। উনি হেন্ডসাম তবে এতোও না। আমি ভুলে...।"
মিরায়াকে আর কথা বলতে না দিয়ে রামিলা চৌধুরী বলে উঠলেন - "হয়েছে হয়েছে, এই ভাবে বলেছিস, না ওই ভাবে তা জেনে আমার কাজ নেই। ঘরে যা, ফ্রেশ হয়ে নে গিয়ে।"
মিরায়া সোফা থেকে না উঠে উল্টো প্রশ্ন করল-
"মামণি তোমার ছেলের আইডিতে কিছু নাই কেন? এতো সোজাসাপ্টা সব। আমি তো ভেবেছিলাম এতো বড় মাপের ব্যক্তিত্ব আইডি বেশ ইন্টারেস্টিং হবে।"
রামিলা চৌধুরী ছেলের প্রশংশায় ছেলের বউকে একটু নরম করতে বললেন -
"আমার ছেলে এমনি সরল সোজা। বেশ লাজুক প্রকৃতির। খুব কারো সাথে কথাই বলতো না প্রথম দেখাতে তো আরো না। অনেক ইনোসেন্ট। সবাই বলতো রামিলা তোর ছেলে হয়েছে একখান মাশাআল্লাহ।"
মিরায়া হাসার ভান করে মাথা নাড়িয়ে আগের সবকিছু ভাবতে লাগলো। সে রামিলা চৌধুরীর বলা কথার সাথে রায়ানের কোনো মিলই পেল না মনে মনে ভাবছে আর বলে যাচ্ছে-
"কিহ্!..সরল? ইনোসেন্ট? এমন ঠোঁটকাটা নির্লজ্জ লোক নাকি ইনোসেন্ট। প্রথম দেখাতে কথাই না বলা ব্যক্তি, আমার সাথে প্রথম দিন দেখা হওয়ার পর থেকে ননস্টপ ফ্লার্ট করে যাচ্ছিল। আর কি? লাজুক! হাহ্! রাতের বেলায় চুম্মা চাটি ভরা মুভি দেখা মানুষ নাকি লাজুক। মামণি গো, তোমার ছেলেকে তুমি একটুও চিনো না। সবার সামনে যেমন সবার আড়ালে আমার সাথে ঠিক উল্টো। আরে না না আড়ালে কি এই লোক সবার সামনেও আমার সাথে তাই করে। হঠাৎ রাস্তায় কোমর ধরে টানবে একবার, বাইকে হাত জোর করে বুকে নিয়ে রাখবে একবার আবার রেস্টুরেন্ট পুরোটা বুক করে বলে সে হোটেল বুক করেনি সেখানে খাট নেই। কি পরিমান অসভ্য অশ্লীল একটা লোক। ধুর ছাই। সব আবার মনে পড়ে গেলো।"
রামিলা চৌধুরী মিরায়ার মুখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললেন-
"কি রে কোথায় হারিয়ে গেলি?"
মিরায়া হঠাৎ চমকে উঠে। সে বলল- "মামণি আমার কেমন যেন লাগছে ঘরে যাই। ফ্রেশ হয়ে নেই গিয়ে।"
এই বলে দ্রুত সিড়ি দিয়ে উঠতে লাগলো। রামিলা চৌধুরী পিছন থেকে বললেন- "রায়ানের খবর পেলে জানাবি কিন্তু চেষ্টা করিস যোগাযোগ করার।"
মিরায়া উঠতে উঠতে বলল-"আচ্ছা মামণি।"
তারপর নিজের ঘরে গিয়ে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলে ফ্রেশ হতে না গিয়ে সোজা বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ল ফোন নিয়ে। রায়ানের আইডিতে যদিও ঘাটার মতো কিছু নেই তবু মিরায়া বার বার রায়ানের আইডিতে গিয়ে প্রোফাইল পিকচার আর কভার পিকচার টা জুম করে দেখছিল। রায়ানের বাইকের উপর ছবিটা দেখে মিরায়া মুচকি হেঁসে একটু তাচ্ছিল করে বলে উঠলো-
"ইস্! ছেলে মানুষ হয়েও এতো সুন্দর হওয়ার দেমাক দেখাচ্ছেন বুঝি কোনো প্রকার যোগাযোগ না করে, মিস্টার অশ্লীল?"
হালকা হেঁসে মিরায়া রায়ানের ফ্রেন্ড লিস্ট টা দেখলো রুদ্র, রামিলা চৌধুরী আর মাহির ছাড়া আর কেউ নেই। সেটাই স্বাভাবিক এতো সময় কোথায়? এত কম বয়সে একজন সফল ব্যবসায়ী হওয়ার পিছনে অনেক কঠোর পরিশ্রম আছে সময় নষ্ট করার সময় রায়ানের কাছে কখনোই ছিল না। রাইয়ানের ফ্রেন্ডলিস্টে বাড়ির মানুষ ছাড়া অন্য কাউকে না দেখে মিরায়া অবাক হলেও বেশ খুশি হয়। রিমির কথা শোনার পর সে ভাবছিল- "সত্যিই তো, কত মেয়েই হয়তো তাকে পছন্দ করে আমেরিকায়। আর এই দিকে আমি বাংলাদেশের সাধারণ বাঙালি মেয়ে।" তবে এখন রায়ানের আইডিতে কোনো মেয়ের অস্তিত্ব না দেখে মিরায়া খুশি মনে রায়ানকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট স্যান্ড করে নিজের জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশ রুমে চলে গেল।
চলবে...
পাখিরা পর্বটা অনেক বড়। তাই একসাথে সম্পূর্ণটা কপি করতে পারিনি। দুইটা পর্বে ভাগ করে পোস্ট করব কমেন্ট বক্সে নেক্সট অংশটুকু লিঙ্ক দেওয়া থাকবে। আর ওই অংশের নিচের লেখা অনুযায়ী তোমরা নিজেদের কাজ করতে পারো।
Love you😘
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ
#Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_37 (3rd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
মিরায়া ফ্রেশ হয়ে ঘরে এসেই ফোনটা হাতে নিয়ে চেক করলো কিন্তু রায়ানের দিক থেকে এখনো তার পাঠানো রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করি হয়নি। মিরায়া একটু মুখ ফোলিয়ে বড়বড় করল-"নেকামি করে চিঠি লিখে গিয়ে মনে হয় উদ্ধার করে ফেলেছে । এখন যোগাযোগ টুকু করার প্রয়োজন বোধ করছে না। ধুর ধুর আমারই দোষ, বেশি আশা করছি।"
মিরায়া ভেজা চুল মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গেলে তার মাথায় নিজেকে দেখে অদ্ভুত প্রশ্নরা জেঁকে বসে-
"কিন্তু তুই কেন আশা করছিস মিরা? তোর এমন কিছু আশা করার ক্ষমতা নেই। তুই অন্য কারো। কেন দুর্বল হচ্ছিস তুই এতো।"
মিরায়া ততক্ষনাৎ নিজের থেকে চোখ সড়িয়ে বুকে হাত চেপে ধরে একটু গভীর নিশ্বাস নিয়ে-"কি হচ্ছে এসব আমার। আমি কেন এমন হয়ে গেছি? মন কোনো বাঁধা কেন মানছে না?"
মিরায়া শান্ত হতে মাথাটা হালকা উঁচু করে শ্বাস নিতে থাকে। হঠাৎ তার চোখ দেয়াল ঘড়ির দিকে যেতেই সে খেয়াল করল বিকেল ৪টা বাজছে। তখনি মাথায় এক ভাবনা এলো-বিকেল হলো সোরায়ার বাড়ি ফিরার কথা মিরায়ার আগেই কিন্তু বাড়িতে ফিরে তো একবারও দেখা হয়নি। আর যদি পরেও বাড়িতে আসে এখনো পর্যন্ত একবারও মিরায়াকে জ্বালাতন করতে তার ঘরে আসে নি কেন? এমন তো কখনো হয় না। মিরায়া পরিপাটি হয়ে সোজা সোরায়ার ঘরে গেলো। কিন্তু সেখানে সোরায়াকে না পেয়ে সোজা নিচে গিয়ে রামিলা চৌধুরীকে প্রশ্ন করল-
"মামণি বনু কে দেখছি না কেন? ও তো ওর ঘরেও নেই।"
রামিলা চৌধুরী একটু ভাবুক মনে বললেন -"সোরাকে তো বাড়ি ফিরতে আমি দেখি নি দুপুর থেকে তো নিতেই ছিলাম এখনো ফেরে নি হয় তো।"
মিরায়া একটু ভয়ে পেয়ে যায়। সোরায়া কখনো দেরি করে বাড়ি ফেরে না, কিন্তু আজ এখন পর্যন্ত বাড়িতে আসেনি। মিরায়া নিজের ফোনে সোরায়ার নাম্বারটা বের করে ডায়াল করতে যাবে এমন সময় বাড়ির মূল দরজা দিয়ে সোরায়া অলস ও আনমনা ভঙ্গিতে প্রবেশ করে। ব্যাগটা কোনো রকম অসহায়ের মতো কাঁধে ঝুলছে। মিরায়ার ভয় কাটে সোরায়াকে দেখে কিন্তু বড়ো বোনের দায়িত্ব রক্ষার্থে এমন কাজের জন্য তার সোরায়া কে শাসন করা প্রয়োজন তাই একটু রাগ ভাব করে সোরায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলল-
"ওই কিরে.. সাহস কি বেশি হয়ে গেছে নাকি? এটা বাড়ি ফেরার কোন সময় হলো? তোর কলেজ ছুটি হওয়ার কথা বারোটায়, ( নিজের ফোনের স্ক্রিনটা অন করে সময় দেখিয়ে বলল-) আর এখন বাদে চারটারও বেশি। কোথায় ছিলি হ্যাঁ? বাড়ির সবাই চিন্তা করবে মাথায় ছিল না?"
হঠাৎ সোরায়া মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করে। রামিলা চৌধুরী রান্নাঘর থেকে সোরায়ার কান্না দেখে দৌড়ে আসেন। মিরায়া হতভম্ব হয়ে ভাবছিল হয়তো সে বলেছে বলে এভাবে কান্না করছে সোরায়া। মিরায়ার বড্ড আদরের সোরায়া কখনো ঝগড়া, হিংসা কিছুই দুজনের মাঝে ছিল না। মা বাবার অনুপস্থিতিতে বড় বোন হিসেবে মিরায়া সোরায়াকে অনেক আদরের বড় করেছে, কখনো বকে নি প্রয়োজন ছাড়া।
সোরায়া এই দিকে অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। মিরায়া মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। সে সোরায়ার গায়ে হালকা কাঁপুনি টের পাচ্ছে—সোরায়া দু’হাত দিয়ে শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। যেন প্রাণপণে ধরে রাখছে, ছেড়ে দিলে সবকিছু ভেঙে যাবে।
মিরায়া সোরায়াকে সামাল দিতে কাঁপা গলায় বলল-
"ওই পাগল কান্না করিস কেন? আচ্ছা আপু আর বকবো না। কানে ধরছি সরি।( কানে ধরে)। সত্যি আর কিছু বলবো না এরপর থেকে সময় মতো আসিস কেমন। কাঁদে না লক্ষ্মী মেয়ে।"
শব্দ করে কান্না করছে সোরায়া মুখে আর কোনো শব্দ নেই তার —কখনও চাপা হাহাকার, কখনও ছোট ছোট হাহাকার ভরা শব্দ, কখনও কেবল শ্বাসকষ্টের মত কেঁপে ওঠা শুধু কান্নার আওয়াজ। রামিলা চৌধুরী আর মিরায়া দুইজনেই ঘাবড়ে গেছে কি হলো হঠাৎ। রামিলা চৌধুরী সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বলল-
"আচ্ছা হয়েছে আর কাঁদতে হবে না আমি বকে দেবে মিরা কে। চুপ চুপ আর কাঁদে না।"
মিরায়া আরো খারাপ অনুভব করতে শুরু করলো সত্যি কি সোরায়া তার বকার জন্য কাঁদছে! মিরায়া আবার সোরায়ার উদ্দেশ্যে বললো-
"সোনা বনু আমার, কাঁদে না আপু অনেক সরি আর বলবো না তো প্রমিস। চুপ কর এবার কান্না থামা প্লিজ। সোজা হো আমাকে বল তোর কি খারাপ লেগেছে। আমি আর তোকে বকবো না বনু। এমন ভাবে কাঁদে না, আপু কষ্ট পাচ্ছি।"
মিরায়ার চোখেও পানি জলজল করতে লাগলো। নিজের আদরের বোনটা এভাবে কাঁদছে তার মোটেও ভালো লাগছে না। সে এক নাগাড়ে সোরায়ার কাছে ক্ষমা চাইছে। রামিলা চৌধুরী অবাক হয়ে দেখছেন দুই বোনের মাঝে কি বলে সামাল দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না।
সোরায়ার হাতদুটো কাঁপছে, শক্ত করে মিরায়ার শরীর জড়িয়ে আছে। যেন একটা শিশু নিজের শান্তির জন্য আঁকড়ে ধরছে মায়ের আঁচল। মিরায়ার চোখে বিস্ময়, বুকের ভেতর ভারি হয়ে যাচ্ছে। সে নিজের হাত সোরায়ার চুলের উপর রেখে আস্তে আস্তে চাপড়াচ্ছে, কিন্তু বুঝতে পারছে—শুধু বকা দেওয়ার জন্য এভাবে কাঁদার মেয়ে সোরায়া নয়। মিরায়ার মনে অদৃশ্য ভয় ঢুকে পরল। সে সোরায়াকে প্রশ্ন করে-
"বনু সত্যি বল আমাকে কেউ কিছু বলেছে তোকে? কিছু করেছে কেউ? তাই কান্না করছিস? একবার বল কে কি বলেছে বাকিটা আমি দেখে নেব। তুই কান্না থামা প্লিজ।"
সোরায়া মিরায়াকে জড়িয়ে ধরে শান্তি পাচ্ছিল। হঠাৎ সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি মুছে ভাঙা গলায় বলল-
"কি.. কিছু হয় নি আপু। আমি ঠিক আছি।" এই বলে আবার কেঁদে দিল।
মিরায়া আবার সোরায়া কে বুকে জড়িয়ে বলল-"না বনু, কিছু ঠিক নেই। তুই আমাকে বল কি হয়েছে। আমি বকেছি বলে কাঁদছিস?"
সোরায়া মাথা নাড়ায় নাসূচক। মিরায়া আবার একই প্রশ্ন করতে যাবে তখনি রামিলা চৌধুরী মিরায়াকে ইশারা দেন-"এখন আর কিছু বলিস না শান্ত হতে দে ওকে।"
মিরায়া বুঝতে পারলো। সে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। আলতো করে সোরায়ার মাথা তুলে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল-"যা হওয়ার হয়েছে আর ভাবতে হবে না। কাঁদবি না একদম। আমার পুতুলের মতো ছোট্ট পাখিটার চোখ গুলো কতো সুন্দর এগুলোতে পানি মানায় না। ঘরে যাবি চল। ফ্রেশ হয়ে নিবি আয়।"
সোরায়াও একটু শান্ত হয় মিরায়ার কথায়। কান্না থামায় তবে এখন একটু একটু হেঁচকি উঠছে। মিরায়া সোরায়াকে ঘরে নিয়ে যায়। রামিলা চৌধুরী হাঁফ ছেড়ে ভাবলেন-
"এখন কার দিনের বাচ্চারা কখন কি ভেবে কি করবে বলা মুশকিল। কে জানে মেয়েটা এভাবে কাদলো কেন।"
সোরায়াকে রুমে নিয়ে গিয়ে ওকে ফ্রেশ হওয়ার পর মিরায়া ওর রেস্ট নেওয়ার জন্য নিজে কোলে মাথা রেখে ওকে শোয়ায়। সোরায়া একদম চুপ করে শুয়ে আছে। মিরায়া এবার আসলে কি হয়েছে জানতে সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো-
"বনু? এবার অন্তত বল কি হয়েছে। ক্লাসে স্যার বকেছে?"
"স্যার বকেছে" কথাটায় সোরায়ার শরীরে হঠাৎ কাঁপুনি দিলো সে আবার ছুটির পরের কথা গুলো সম্পূর্ণ দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো।
ফ্ল্যাশব্যাক~
তখন ১২.৩০ বাজে দিনের। সোরায়া মাহিরের কথা মতো কলেজ শেষে কলেজ মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রায় ৩০ মিনিট কভার হয়ে গেছে ছুটি হয়েছে স্কুল কিন্তু মাহিরের এখনো আসার নাম নেই। হোরায়রা পা দিয়ে মাঠের ঘাস নাড়িয়ে খেলছে। হঠাৎ মাহিরের গলা ভেসে এলো-
"দাঁড়িয়ে আছো অনেক্ষণ হয়েছে তাই না?"
সোরায়া হালকা মুচকি হেঁসে বলল-"সমস্যা নেই স্যার। আপনি কেন দাঁড়াতে বলেছেন তা বলতে পারেন।"
মাহির গম্ভীরভাবে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে বলল-
"তোমার সমস্যা কি আগে সেটা বলো। কলেজে আমার আসার পর থেকে তোমার উগ্রতা দেখে যাচ্ছি এসবের মানে কি?
সোরায়া কপাল কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো-"সরি? কি বললেন? উগ্রতা মানে?"
মাহির আবার তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল-
"এখন মানে বুঝতে পারছো না। সমস্যা নেই আমি বুঝাচ্ছি। শিক্ষক দের কাজই এইটা। আমাকে প্রথম দিন থেকে ক্লাসে আবল-তাবল প্রশ্ন করে জ্বালাতন করা, ক্লাস চলাকালীন সম্পূর্ণটার সময় তাকিয়ে থাকা, ফেসবুক আইডি খুঁজে বার বার রিকোয়েস্ট সেন্ড করা, আবার ফেইসবুকের টা যথেষ্ট ছিল না তোমার জন্য ওতো রাতের বেলা নিজের টিচারকে কেউ মেসেজ দেয়?, যাক বাচ্চা মেয়ে মনে করে সব সয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু আজকে নিজের লিমিট ক্রস করে ফেলেছো তুমি, কলেজে তুমি আমার পরিচিত তোমার আমার ব্যক্তিগত কোনো কানেকশন আছে এসব ছড়াতে নিজের বড় ক্লাসের মেয়েদের সাথে তর্কে জড়িয়ছো। নিজের আর কোন উগ্রতা এখনো তোমার বোঝা বাকি আমাকে বলো।"
এই কথাগুলো শুনে সোরায়ার ভেতরটা এক ঝটকায় ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতর যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে বারবার আঘাত করছে। আসলে সবকিছুই সে করেছে একটাই কারণে—মাহিরকে ভালোবেসে। অন্ধ ভালোবাসা তাকে এভাবে পাগলামি করিয়েছে। কিন্তু গুজব ছড়ানোর বিষয়টা? সম্পূর্ণ ভুল বোঝাবুঝি! তবুও সে ঠোঁট নাড়াতে পারল না। গলার স্বর আটকে গেল।
মাহির রাগে চোখ রক্তিম করে ঝাঁঝালো কণ্ঠে আবার বলল—
—“কি হলো? চুপ করে আছো কেন? নিজের এসব বেহায়াপনার কোনো ব্যাখ্যা নেই? নাকি নতুন মিথ্যা বানাচ্ছো বলার জন্য? জানো সোরায়া, তোমার মতো মেয়েদের জন্যই শিক্ষকদের সম্মান মাটিতে মিশে যায়।”
সোরায়ার বুকটা কেঁপে উঠল। চোখে পানি টলমল করছে, কিন্তু সে নিজেকে শক্ত থাকলো। একটা ফোঁটাও পড়তে দিল না। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে সব কথা সহ্য করছে।
মাহির ওর চোখের ভেতর জমে থাকা অশ্রু দেখেও বিন্দুমাত্র নরম হলো না। উল্টো আরও ধারালো স্বরে বলল—
—“এখন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেন? নাকি সত্যিই এতটাই নির্লজ্জ যে নিজের অসভ্যতার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাচ্ছো না?
প্রতিটি শব্দ যেন সোরায়ার বুকের ভেতর বিস্ফোরণ ঘটালো। তার মন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বাইরে থেকে সে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। শরীর কাঁপছে, বুক ফেটে যাচ্ছে, তবুও কোনো আওয়াজ নেই। প্রিয় মানুষটা কষ্ট দিয়ে কথা বললে এতো যন্ত্রণা হয় তা সোরায়ার জানা ছিল না।
মাহির শেষবার তাচ্ছিল্যের চোখে তাকিয়ে, কোনো দরদ না দেখিয়ে মাঠ থেকে চলে গেল। তার পদক্ষেপের শব্দ মিলিয়ে গেল দূরে, কিন্তু সোরায়ার কানে সেটা বজ্রপাতের মতো গর্জে বাজতে থাকল। সোরায়া একাই দাঁড়িয়ে রইল—চোখে অশ্রু ঝিকমিক করছে, বুকের ভেতর হাহাকার চলছে, তবুও বাহ্যিকভাবে সে যেন পাথর হয়ে গেছে। চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আছে, আর সেই নীরবতায় কেবল তার ভেতরের কান্না তীব্র শব্দে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
বর্তমান~
মিরায়া সোরায়ার থেকে কোন প্রকার উত্তর না পেয়ে চুপ রইলো। বুঝতে পারছে এখন কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। শুধু চিন্তার জায়গা থেকে জিজ্ঞেস করল-
"কলেজ তো অনেক আগে ছুটি দেয়েছিল বনু। কোথাও গিয়েছিলি বুঝি?"
সোরায়া মিরায়ার কোলে মাথা রেখে বলল-"হুঁ, হাঁটতে হাঁটতে একটু লেকে গেছিলাম।"
মিরায়া এবার চিন্তা মুক্ত হলো সোরায়ার গলা শুনে আর কিছু জিজ্ঞেস করলো না। কিন্তু পুরো মুহূর্তে সোরায়া নিজেই প্রশ্ন করলো-
"আচ্ছা আপু, আমি কি অসভ্য, বেহায়া আর নির্লজ্জ?"
মিরায়ার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল এমন প্রশ্ন শুনে। সে সোরায়ার মাথায় হাত রেখে বলল-"কি? কেহ বলেছে তোকে এসব? আমার বনু অনেক ভালো। সবার চেয়ে বেস্ট। সবদিক থেকে ভদ্র আর সভ্য। তুই বল শুধু কে বলেছে তোকে এসব, মেরে তক্তা বানিয়ে আসবো তাকে।"
সোরায়া মন খারাপের মাঝেও ফিক করে হেঁসে দিল মিরায়ার মাহির কে মেরে তক্তা বানানোর কথায়। সোরায়াকে হাসতে দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মিরায়াও হালকা হাসলো। সোরায়া আবার মিরায়াকে প্রশ্ন করল-
"আপু ভালোবাসা কি কষ্ট দেয়?"
মিরায়া অবাক হয় সোরায়ার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে তবে প্রশ্নের উত্তরে বলল-"হয়তো।"
সোরায়া-"হয়তো মানে?"
মিরায়া-"জীবনের 'হয়তো' গুলো যদি শূন্য থেকে পূর্ণ হতো তাহলে জীবন অনেক সুন্দর হতো। তাই 'হয়তো' এর মানে থাকে না। ঠিক যেমন ভালোবাসার কারণ থাকে না।"
সোরায়া আবার প্রশ্ন করল-"আপু যদি শখের জিনিস কষ্টের কারণ হয় তাহলে কি করা উচিত?"
মিরায়া এক কথায় উত্তর দেয়-" শখের জিনিস পেতে কষ্ট করতে হয় আর কষ্ট করাও উচিত সেটা পেতে। কিন্তু শখের জিনিসটাই যদি কষ্টের কারণ হয় তবে..।"
সোরায়া -"তবে..?"
মিরায়া বাঁকা হেসে উত্তর দেয়-" তবে। শখকে ডিলিট মেরে, ইনস্টাগ্রামে রিলস দেখবি, বুঝেছিস?"
সোরায়া অবার হেঁসে ফেললো মিরায়ার কথায়। মিরায়া হেঁসে সোরায়ার দুই গাল টেনে বলল-"এইতো আমার বোনটাকে হাসলে কত সুন্দর লাগে। বেশি বেশি হাসবি। এখন উঠে টেবিলে গিয়ে পড়তে বস। অনেক ফাঁকি দিয়েছিস।"
সোরায়া মিরায়ার কোল থেকে মাথা তুলে উঠে বসলো। মিরায়াকে একটা চুমু দিয়ে হাত ধরে টেনে ঘরথেকে বের করতে করতে বলল-
"ঠিক আছে পড়তে বসছি। এবার তুমি যাও এত ভালো আইডিয়া দেওয়ার জন্য থ্যাঙ্ক ইউ।"
মিরায়া হঠাৎ দাঁড়িয়ে পরল-"কিসের আইডিয়া?"
সোরায়া মিরায়াকে ঘর থেকে বের করে দিয়ে দরজা লাগানোর আগে দরজার ফাঁকা দিয়চ মাথা একটু বের করে বলল- "শখ ডিলিট করার।"
তারপর গেট লাগিয়ে দিল। মিরায়া দাঁড়িয়ে রইল আর মনে মনে বলল-"এই মেয়েটার মাথায় কি চলে কিভাবে যে বুঝবো। ধুর যাকগে ওর মন ভালো হয়ে গেছে এতেই আলহামদুলিল্লাহ।"
মিরায়া পরে আবার নিচে গিয়ে রামিলা চৌধুরীকে সোরায়া ঠিক আছে সেটা বলে নিজের ঘরে চলে যায়।
এইদিকে মিরায়াকে বের করে দিয়ে সোরায়া নিজের ফোনটা হাতে নিয়েই ফেসবুকে ঢুকে প্রথমে মাহিরের আইডি বের করে তাকে আনফ্রেন্ড করে। তারপর ইনস্টাগ্রামে আনফলো করে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে মেরে হাসি মুখে টেবিলে চলে যায় পড়াশোনা করতে।
____________
সন্ধ্যার~৭টা
রিমি নিজের কাজের জায়গায় পৌঁছে নিজের কস্টিউম চেঞ্জ করে নিয়ে গিটারের সব কর্ড গুলো চেক করে নিয়েছে। তার পারফরমেন্সের আর দেরি নেই। বিকেলের প্রাক্টিস টাইম ওভার এবার সন্ধ্যায় লাইভ পারফরমেন্স শুরু হবে। রিমি নিজের গিটার নিয়ে একদম তৈরি আজকের সন্ধ্যার জন্য।
সময় হওয়ার সাথে সাথে রিমি লাইভ স্টেজে উঠলো। সবাইকে আমন্ত্রণ জানিয়ে। মাইক আর গিটার টা ঠিক করে নিজের চেয়ারে বসে সন্ধ্যা বেলার একটা সুন্দর সূচনা করলো তার গলার গান দিয়ে। এমন সময়ই হঠাৎ রুদ্র সেই ক্যাফেতে প্রবেশ করল।
অফিসের মিটিং শেষে ক্লাইন্ট কে এক কাপ কফির ইনভিটেশন দিতেই ক্লায়েন্ট রাজি হওয়ায় বাড়ির কাছের ক্যাফেতেই ক্লাইন্ট কে নিয়ে এসেছে কফি খাওয়াতে। শনিবার রিমিকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর রুদ্রর আর তার সাথে কথা হয়নি। এভাবে হঠাৎ করে কাকতালীয়ভাবে দেখা হবে সেটা আর কার জানা ছিল। রুদ্র ক্যাফেতে ঢুকার পরই স্টেজে মধ্যমণি হয়ে বসে গিটার বাজিয়ে গান করতে থাকা রিমির দিকে তার নজর পড়ে। রিমি তার মিষ্টি কন্ঠে গান গাইছে-
"আজ না হয় কথা থাক,
লুকনো অনুতাপে ঢাকি, চেরাকাটা আগুন।
আজ শুধুই বলে যাক,
চোখের পাতা খুলে রাখি, নিদার নিঝুম...
মন বলে তোমাকে একবার আগলে ছুঁয়ে যাই,
মন গলানো সন্ধ্যে বারবার, থাকছি ছুঁয়ে তাই...
যেন তোমারি কাছে জমে অভিমান আছে,
যেন তোমারি কাছে... জমে অভিমান আছে...!
রুদ্র তাকিয়েই আছে রিমির দিকে ঠিক তখনই রিমিরও চোখ রুদ্রর চোখে পড়ে। দুইজনই একে অপরকে একদিন পর হঠাৎ দেখে বিস্মিত। রুদ্রর সাথে আসা লোকটা রুদ্রকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল-
"মিস্টার রুদ্র, লেট'স সিট।" (বসার জন্য চেহারার দিকে হাত বাড়িয়ে)
রুদ্র বাস্তবে ফিরে হকচকিয়ে বলল-"হুঁ? হ্যাঁ হ্যাঁ, প্লিজ সিট।"
রুদ্র নিজের দিকের চেয়ারটা টেনে বসলো। রিমি নিজের পারফরমেন্সের দিকে মন ফিরালো। রুদ্র রিমিকে দেখছে পালকবিহীন। রিমি বুঝতে পেরেও সেদিকে মন দিল না। সন্ধ্যার সময়টা এই সুন্দর মুহূর্তে কেটে গেলে রুদ্রর ক্লায়েন্ট নিজের হাতের ঘড়ির দিকে তাকিয়ে রুদ্রকে বলে উঠলো-
"সো থ্যাংক ইউ সো মাচ মিস্টার রুদ্র। ইট ওয়াজ গ্রেট টু মিট ইউ। সি ইউ সুন।"
রুদ্র আর লোকটা দাঁড়িয়ে হেন্ড সেক করার পর লোকটি বিদায় নিল। কিন্তু রুদ্র ক্যাফে থেকে বের না হয়ে ক্যাফের ভিতরেই বসে রিমির গান উপভোগ করতে লাগলো। বাড়ি ফেরার ইচ্ছে হয়নি তার। রিমি নিজের মত গান গেয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ সময় পর, লাইভ পারফর্মেন্স এর সময় সীমা শেষ হতেই রিমি ব্যাক স্টেজে চলে গেল। রুদ্র এবার ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এলো নিজের গাড়ির দিকে। কিছুক্ষণ সময় পর রিমি নিজের কস্টিউম চেঞ্জ করে তার পরিহিত পোশাক পড়ে বের হয় বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার জন্য। তখনই হঠাৎ গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকা রুদ্রর চোখের সাথে চোখাচোখি হয়ে তার। রিমি হালকা হাসি দিয়ে রুদ্রর সামনে এসে দাঁড়ায় - সে ভালোই বুঝতে পারছিল রুদ্র এবার তাকে এই কাজের বিষয়ে প্রশ্ন করবে তাই রুদ্র কিছু বলার আগেই আগ বাড়িয়ে বলতে শুরু করল-
"ওয়েট ওয়েট আপনি কিছু বলার আগে আমিই বলছি। আই এম সরি এই ব্যাপারে আগে না জানানোর জন্য। আসলে এটা তেমন কিছু না শুধু পার্ট টাইম জব। আর..!"
রিমিকে তার সম্পূর্ণ কথা শেষ করতে না দিয়েই রৌদ্রতাকে থামিয়ে দিয়ে তার সামনে কয়েকবার হাততালি দিয়ে বলে-
"গ্রেট পারফরমেন্স।"
রিমি অবাক চোখে দ্রুত দিকে তাকিয়ে হালকা হাসলো। রুদ্র তাই করল। পরবর্তীতে রোদের মুখে বলল-
"আমার কিছু বলার ছিল না এই ব্যাপারে আপনাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করা ছাড়া। তবুও যখন আগবাড়িয়ে সরি বললেন- সরি গ্রহণ করলাম। নিজের প্রতিভা কাজে লাগানো খারাপ কিছু না আর ছোট কাজ বড় কাজ বলতে কিছু নেই কাজ কাজই।"
রিমি আবারো একটু মুচকি হাসলো। তার ধারণার বাইরে ছিল পুরুষ মানুষের এমন রুপ। নিজের বাবা ভাই আর কিছু নোংরা মন মানসিকতার মানুষের জন্য পুরো পুরুষ জাতিকে খারাপ ভাবা মেয়েটা শুধু একটা ছেলের জন্য এখন একটু একটু পুরুষ জাতিকে ভালো ভাবা শুরু করেছে। রিমিকে রুদ্র প্রশ্ন করলো-
"এবার কি? বাড়ি যাবেন তো ?"
রিমি মাথা নাড়ালো-"হুম, আজকের জন্য আমার ছুটি। এবার সোজা বাড়ি যাবো।
রুদ্র গাড়ির সামনের দরজাটা খুলে দিয়ে বলল-"বসুন, আমি ড্রপ করে দেই।"
রিমি ভদ্রতার খাতিরে বলল-"এখন এই কষ্টটুকু করতে হবে না। আপনার বাড়ি খুব সামনে বাড়ি চলে যান। আমি একা যেতে পারবো।"
রুদ্র রিমির হাতের ব্যাগটা সাবধানে নিল নিজের হাতে যেন রিমির হাতে স্পর্শ না হয়। তার পর সেটা গাড়ির ভিতরে রেখে বলল-
"আপনি একা যেতে পারবেন না তার জন্য ড্রপ করতে চাইনি। আপনি একা পারবেন সেটাতে আমার কোন সন্দেহ নেই। আমি বলেছি আমার নিজের শান্তির জন্য। আমি আপনাকে পৌঁছে দিতে চাই। এবার উঠুন।"
রিমি অবাক হয়ে কথা গুলো শুনলো। এতো ভদ্রলোকও এই সমাজে আছে? তার বিশ্বাস হয় না। সত্যি বলতে সমাজে অন্য সবকিছুর ভেরিয়েশনে সংকট দেখা দিতে পারে কিন্তু মানুষের ভেরিয়েশনে কখনো না। রিমি আর কিছু না বলে চুপচাপ বাড়িতে উঠে বসলো। রুদ্র ও ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ির স্টার্ট দিল রিমির বাড়ি উদ্দেশ্যে।
____________
আমেরিকা~
বেলা ১২টা। রায়ান ভোরে বাড়ি ফিরে ঘুমিয়েছিল আর এইমাত্র ঘুম থেকে উঠলো। কাজের চাপ এত বেশি ছিল যে শোয়ার আগে ফোনটা সুইচ অফ করে ঘুমিয়ে ছিল। দেন এখনো বিছানার উপরে শুয়ে আছে। ঘুম ঘুম আধ খোলা চোখ, হাত দিয়ে বিছানার বিভিন্ন জায়গা হাত দিয়ে বেড়াচ্ছে নিজের ফোনটা পেতে। অতঃপর বালিশের পাশে কোনটা পেয়েই অন করলো। ফোন অন করার সাথে সাথে একগাদা নোটিফিকেশনের ঝড় উঠলো ফোনের স্ক্রিনে। রায়ান হালকা বিরক্ত হয়ে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল-
"ধুর শালা! ফোনটা অন করার সাথে সাথে যেন দামামা বাজিয়ে জানান দিচ্ছে হাজারো কাজ আছে তোর রায়ান। জীবনে কি কুক্ষণে যে টাকা টাকা করে এতো কাম বাড়াইছিস নিজের।"
রায়ান ফোনের সব নোটিফিকেশন ক্লিয়ার করতে থাকে। সব অফিসিয়াল কাজের নোটিফিকেশন। রায়ান মুখ বেজার করে বলে উঠলো-
"অসহ্য! এত কাজের নোটিফিকেশন না এসে আমার পিচ্চি বউটার থেকে একটা নোটিফিকেশনও তো আসতে পারে!"
সব নোটিফিকেশন ক্লিয়ার করার সময় হঠাৎই রায়ান আবছা চোখে একটা নোটিফিকেশন দেখলো-
"A friend request from Meherin Rahman Miraya."
রায়ানের চোখ থেকে হঠাৎ সব ঘুম চলে গেল। তৎক্ষণাৎ রায়ান লাফ দিয়ে শোয়া অবস্থা থেকে বসে পড়লো। হালকা চোখ কচলে আবার ফোনের স্ক্রিনে ভালো করে দেখলো যা দেখছে তা সত্যি কিনা। সত্যিই তার বউ তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে! রায়ানের ওই মুহূর্তে খুশিতে নাচতে ইচ্ছে করছিল। সে বুকে হাত দিয়ে বিছানায় ঠাস করে পড়ে গিয়ে খুশিতে হেসে হাত পা ছুড়তে লাগলো বাতাসে। আর নিজে নিজেকে বললো-
"তোর বউ তোকে মিস করছে রে রায়ান। এই খুশি তুই কই রাখবি। আল্লাহ শুকরিয়া অনেক অনেক শুকরিয়া।"
-"মাথা মোটা! বউটা চিন্তা করছে আর তুই ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলি এটা কোনো কাজ করলি তুই?" এই বলে নিজের মাথায় একটা চাটি মারলো।
রায়ান মিরায়ার ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট একসেপ্ট করতে যাবে তার আগেই তার মাথায় তার বউকে হালকা জ্বালানোর জন্য দুষ্টু বুদ্ধি মাথায় এলো। রায়ান নিজের আমেরিকান নাম্বার দিয়ে মিরায়াকে একবার কল করবে ভাবলো । যাই ভাবা সেই কাজ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে মিরায়া নিজের ঘরে চুল আঁচলে বেশি গাথছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। মুখটা বেজার রায়ানকে পাঠানো ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট এখনো একসেপ্ট হয়নি, সম্পূর্ণ সময়টাতে কতবার যে চেক করেছে তা বলা মুশকিল। মিরায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাগের সুরেই বলল-
"সমস্যা নেই। যত ভাব নেওয়ার নিন। বাংলাদেশে ফিরুন একবার তারপর বুঝাবো ভাব কাকে বলে কত প্রকার ও কি কি।"
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো মিরায়ার। মিরায়া চুলের আগাতে ঝুঁটি বেঁধে ফোনটা বিছানা থেকে তুলে সামনে নিতেই দেখলো একটা অদ্ভুত নাম্বার। এমন কোনো নাম্বার তার জানা নেই অফিসিয়াল লেন লাইন এর নাম্বার এর মতো মনে হলো তার। মিরায়া রেস বা চট্টগ্রাম এর রাইডিং কমিউনিটির মেইন অফিস থেকে ফোন আসতে পারে ভেবে কল রিসিভ করে বলল-
"হ্যালো, কে বলছেন?
রায়ান দুইদিন পর মিরায়ার আওয়াজ শুনে বিছানায় শান্তিতে গা এলিয়ে দিয়ে আবেশে তার আসল পরিচয় বলল-
"তোমার বি লাভ'ড হাজবেন্ড।"
মিরায়া অবাক হয়ে বললো-"মানে!"
রায়ান মিরায়ার বয়সে ছোট হওয়ার মজা নিতে হেঁয়ালি করে বলল-
"বাচ্চা মানুষ এতো মানে জানতে হবে না।"
মিরায়া এবার রেগে গেল। সেও একই হেঁয়ালির সুরে বলল-
"হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, এমনিতেও আমার বুড়ো মানুষে ইন্টারেস্ট নেই।"
এই বলে ফোনটা কেটে দেয় মিরায়া। রায়ান ধপ করে বিছানায় সোজা হয়ে বসে একাই বলল-
"কিহ্! ওই ছেমড়ি বুড়ো তে ইন্টারেস্ট নেই মানে? আমি কি বুড়ো নাকি।"
মিরায়ার মাথায় চিন্তা ঘুরছে কে হতে পারে। এমন মজা কে করবে তার সাথে। কিন্তু পরিচিত কেউ করছে সেটা নিশ্চিত কারণ মিরায়াকে কেউ প্রেমের প্রস্তাব দিলে বা মেসেজ দিলে মিরায়া সোজাসুজি বলতো-"আমি বিবাহিত।" কথা সত্য হলেও এটার জন্য সবাই তার মজা উড়াতো। মিরায়া মনে মনে ভাবলো কেউ ইচ্ছে করে তার সাথে মজা করছে। মিরায়াও কম যায় না, বয়স কমের মজা উড়ানোর শোধ বয়স বেশি হওয়ার জন্য নিলো। মিরায়ার এমন উত্তর দিতে পেরে বেশ খুশি।
হঠাৎ ফোনটা আবার বাজলো একই নাম্বার থেকে কল এসেছে। মিরায়া এবার একটু মজার কুটিল হাসি নিয়ে ফোনটা রিসিভ করলো। অপর পাশ থেকে রায়ান বলল-
"হেই, মিস! দুঃখিত মজা করার জন্য। আপনার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই আমার এই কল ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট টা কি একসেপ্ট করা যাবে?"
মিরায়া নিজের এক ডাইলগ রিপিট করল হালকা মিটিমিটি হেঁসে -
"জ্বি না। করা যাবে না, আমি বিবাহিত।"
রায়ান মিরায়ার বিবাহিত হওয়ার কথাটা ওকে বলতে শুনে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল-
"কোনো সমস্যা নেই, আমিও বিবাহিত।"
মিরায়ার হাসি এবার উড়ে গেলে। মিরায়া বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে একবার তাকিয়ে বিড়বিড় করলো-
"এই হারামজাদা আবার কোন মেয়ের বর? পর নারীর সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়।"
রায়ান মিরায়ার বিড়বিড় করা কথা শুনতে পেয়ে হা হয়ে রইল। রায়ান মনে মনে- "শালার জীবনে এক বিয়া করে এখনো বউয়ের সাথে কিছুই করতে পারলাম না এর আগেই গালি শুনা লাগলো আমার। বালের জীবন!"
মিরায়া এবার সিরিয়াসলি বলল- "আরে কে মজা করছেন এতো রাতে ফোন দিয়ে? এসব মজা আমার একদম পছন্দ না শালা-420। ফোন রাখেন।"
বউয়ের মুখে এসব শুনে রায়ান সাথে সাথে ফোন রেখে দেয়। হতাশায় শ্বাস ফেলে রায়ান বলল-
"নিজের বউরেই পরকীয়ার প্রস্তাব দিলাম তাতেই আমি 420 হয়ে গেছি। আর কি শুনা বাকি আছে। ভাব তো এমন নিলো মনে হয় বিবাহিত হয়ে বরকে খুব মনে রাখছে! হাফ নাম মনে রেখে 'আমি বিবাহিত, আমি বিবাহিত ' ভোজন শুনায় তাও আবার নিজের বরকেই। কি কপাল আমার।"
চলবে...
উফ্! পাখিরা কি যে বলবো এতো কিছু একসাথে কাভার করতে গিয়ে দুই দিনে মাথা আউলাই গেছে আমার। এবার কষ্ট সার্থক হবে যদি তোমাদের রেসপন্স পাই। কমেন্ট এ জানাও কেমন লাগলো ম্যারাথন রাইড।
Love you 😘 ❤️