ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৩৮তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_38 (1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

হতাশায় শ্বাস ফেলে রায়ান বলল-

"নিজের বউরেই পরকীয়ার প্রস্তাব দিলাম তাতেই আমি 420 হয়ে গেছি। আর কি শুনা বাকি আছে। ভাব তো এমন নিলো মনে হয় বিবাহিত হয়ে বরকে খুব মনে রাখছে! হাফ নাম মনে রেখে 'আমি বিবাহিত, আমি বিবাহিত ' ভোজন শুনায় তাও আবার নিজের বরকেই। কি কপাল আমার।"

রায়ান কয়েকবার ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মনে মনে ভাবলো এবার ফোন দিয়ে নিজের আসল পরিচয়টা দিয়েই দেবে।

-"হাহ্! বউয়ের সাথে সত্য কথা বলে কাজ হবে না বুঝতে আর বাকি নেই তার চেয়ে বরং আমি রায়ান বলে দিই। অন্তত কথা তো বলবে।"

মিরায়া নিজের ফোনটা বিরক্তি নিয়ে বিছানার একপাশে ছুড়ে মারলো। মাথায় এখনো ঘুরছে বিয়ে নিয়ে মজা কে করবে তার সাথে। এরই মাঝে মিরায়ার ফোন আবার বেজে উঠল সেই একই নাম্বার থেকে কল এসেছে। মিরায়া সাথে সাথে ফোনটা কেটে দিল। রায়ান আবার কল করল মিরায়া আবার ফোনটা কেটে দিল।

এইদিকে রায়ান মিরায়ার বারবার কল কেটে দেওয়ার কারণে বেজায় চটছে। রায়ান ফোনটা নিজের সামনে নিয়ে-

"আরে বাবা কল না তুললে কিভাবে বলবো আমি কে? হৃদপাখি কল টা তো তুলবি।"

রায়ান আবার কল দেয় মিরায়া এইবারও একই কাজ করে। রায়ানও হাল ছাড়ার পাত্র না, মিরায়ার বার বার কল কেটে দেওয়ার পরও সে টাকা কল করতে থাকে। এইভাবে কল করা আর কল কাটার কার্যক্রম চললো প্রায় ১৫মিনিট। ১৫ মিনিটে কম করে হলেও ৩০-৪০ বার কল করেছে রায়ান।

মিরায়া বিছানার উপর বসে আছে ফোনটা একটু পর পর বাজছে আর সে কেটে দিচ্ছে। এক পর্যায়ে মিরায়া বিরক্তি যে বলে উঠলো-

"ধুর ছাই, কে এটা? সমস্যা কি? তখন থেকে কল করে বিরক্ত করেই যাচ্ছে তো করেই যাচ্ছে। কি অদ্ভুত একটা নাম্বার। এর আগে এমন দেখিও নি।"

মিরায়া এবার ফোনটা একবার হাতে নিয়ে নাম্বার টা মুখস্থ করলো এই ভেবে- "আচ্ছা যদি চেট-জিপিটি কে জিজ্ঞেস করি এটা কি নাম্বার তাহলেও তো হয়।" যেই ভাবা সেই কাজ, নাম্বার টা চেট-জিপিটি কে দিতেই সে সমস্ত ডিটেইলস বলে দিল। তবে সব কিছুর মাঝে যেই তথ্যটা মিরায়ার সন্দেহ দূর করলো সেটা হলো-"এটি একটি আমেরিকান নাম্বার।" মিরায়ার বুঝতে আর বাকি নেই আমেরিকা থেকে আর কে কল করতে পারে। কিন্তু বিয়ের বিষয়টা রায়ান জানে বলে এমন ভাবে মজা করা মিরায়ার পছন্দ হয়নি। মিরায়া নিজের নিজে বলে উঠলো-

"কথা বলার হলে ঠিক মতো কথা বলেই হয়। এমন উল্টো পাল্টা কথা কেন বলতে হবে? উনাকে আমার অতীত সম্পর্কে সব বলে মহা ভুল করিছি আমি।"

মিরায়ার ফোন আবার বাজলো রায়ান কল করছে। মিরায়ার হালকা বাঁকা হেঁসে বলল-

"খুব শখ না মজা করার। মজা কত প্রকার ও কি কি এবার টের পাবেন।"

এইদিকে রায়ান ফোনটা কানে ধরে বলছে-"হৃদপাখি প্লিজ পিক আপ দ্যা কল ওয়ানস। বলার সুযোগ দে একবার আমি রায়ান।"

মিরায়া ফোনটা ধরলো এবার রায়ান মিরায়াকে কল রিসিভ করতে দেখে একটু হেঁসে সোজা হলো সে কিছু বলার আগেই অপর পাশ থেকে মিরায়ার কন্ঠ ভেসে এলো একজন কল সেন্টারের কর্মীর ন্যায় নিজের মতো করে-

"আপনি যার নাম্বারে কল করেছেন সে এই মুহূর্তে চরম বিরক্ত। আর কখনো কল দেওয়ার চেষ্টা করবেন না, ধন্যবাদ।

The person's number you have dialed is extremely

disturbed now. Don't call ever, thank you."

রায়ানের মিরায়ার বলা কথা বুঝার প্রসেসিং শেষ হওয়ার আগেই মিরায়া কল কেটে দিয়ে রায়ানের নাম্বারটা ব্লক করে দিল। রায়ান থ মেরে রইল কয় সেকেন্ড পরবর্তী মুহূর্তে সে হালকা হাসলো বুঝতে পেরে যে তার বউও এখন মজা নিচ্ছে তার সাথে। রায়ান আবার কল করল কিন্তু এবার মিরায়া নয় সত্যি সত্যি কল সেন্টারের কর্মীর কন্ঠ শোনা গেল-

"আপনি যে নাম্বারে কল করেছেন তাই এই মুহূর্তে ব্যস্ত আছে কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করুন ধন্যবাদ।

the number you have dialled is busy now please call after sometime thank you."

রায়ান এবার বুঝলো না কল ঢুকার আগেই ব্যস্ত কেন দেখাচ্ছে। সে কয়েকবার চেষ্টা করলো একই কথা ভেসে আসছে ফোন থেকে। রায়ান মিরায়ার তার নাম্বার ব্লক করার বিষয়টা এবার বুঝতে পারলো। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে এক প্রকার। ফোনটা হাতে নিয়ে আকাশ পানে তুললো আছাডড় দিতে কিন্তু কি মনে করে যেন থেমে গেল। নিজের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধির খিচুড়ি পাকিয়ে ফোনটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল-

"আমি এর আগেও একবার বলেছিলাম হৃদপাখি আই ডোন্ট লাইক রিজেকশন। শুধু শুধু আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়ে ভালো করলে না বেইবি। পারলে এখনি দেশে গিয়ে নিজের পাগলামি দেখাতাম। নেহাতই আমার হাত পা বাঁধা তাই। কিন্তু ব্যপার না এবার দূর থেকেই নিজের বরের পাগলামি উপভোগ করাবো তোমাকে।"

রায়ান নিজের কুটিল চিন্তা অনুসরণ পূর্বক সাথে সাথে নিজের ম্যানেজার কে কল করে। ম্যানেজার রায়ানের কল দেখে একবার ফোন বাজতেই কল রিসিভ করে-

"হ্যালো স্যার, গুড মর্নিং।"

রায়ান ম্যানেজার এর কথার কোনো তোয়াক্কা না করে গম্ভীর আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-

"ইনফোর্ম এভরি ওয়ান টুডে ইজ দ্যায়ার অফ ডে। নো ওয়ার্ক‌। আই এম গিভিং ইউ আ নাম্বার এ্যান্ড আ মেসেজ। মেক সিওর দ্যা হোল অফিস কলস ইন টু দিস নাম্বার ওয়ান বাই ওয়ান এ্যান্ড পাস দ্যাট মেসেজ। আই রিপিট এভরি ওয়ান আ্যান্ড এভরি এক্সিস্ট্যান্ট নাম্বার। ডু ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড?"

ম্যানেজার রায়ানের কথার আগা মাথা না বুঝে শুধু গাম্ভীর্যতা খেয়াল করে কথার গুরুত্ব টের পেয়ে এক সেকেন্ড এ উত্তর থ

দেয়-"ইয়েস... ইয়েস স্যার।"

রায়ান ভালো করেই জানতো এইটা অনেক বেশি বেশি কিন্তু কিছু করার নেই। তবে অফিসে এইটা নিয়ে পরে গুঞ্জনের সৃষ্টি হতে পারে তাই ম্যানেজার কে সাবধান করতে বলল-

"ওয়ান মোর থিং, বি কেয়ারফুল এ্যাবাউট দিস ওয়ার্ক। ইট'স মাই ওয়াইফ'স নাম্বার সো...!"

রায়ানের সম্পূর্ণ কথা বলে শেষ করার আগেই ম্যানেজার বুঝতে পারলেন রায়ান কি বলতে চাইছে তাই নিজের থেকেই রায়ানকে আশ্বস্ত করলেন-

"ডোন্ট ওয়ারি স্যার আই উইল হ্যান্ডেল ইট জেন্টলি। এভরি ওয়ান উইল বি রেসপেক্টফুল টু ওয়ার্ডস ম্যাম। দ্যা নাম্বার উইল বি সিকিউর।"

রায়ান ম্যানেজার এর কথা শুনে বলল-"ওকে গ্রেট। গেট ব্যাক টু ওয়ার্ক নাও।"

ম্যানেজার-"সিওর স্যার। থ্যাংক ইউ।"

রায়ান কল টা কেটে দিয়ে মিরায়ার নাম্বারটা আর সাথে একটা মেসেজ লিখে দিলো মিরায়া কল ধরার পর তাকে বলার জন্য। মেসেজ টা ছিল-

-"ম্যাম, প্লিজ আন-ব্লক দ্যাট নাম্বার। মি. রায়ান ওয়ান্টস টু টোক টু ইউ।"

রায়ানের অর্ডার পাওয়ার সাথে সাথে ম্যানেজার অফিসে এনাউন্সমেন্ট করে দেন। আর সবার বোসের কথা অনুযায়ী হাতের সব কাজ ফেলে রেখে রায়ানের দেওয়া আদেশ মতো কাজ করতে লেগে যায়।

বাংলাদেশে রাত ১টা। মিরায়া শুয়েছে কিছুক্ষণ আগে এই মাত্র তার চোখটা একটু লাগছিল এমন সময় তার ফোন বেজে উঠলো। ফোনের বিরক্তিকর আওয়াজ বন্ধ করতে মিরায়া ঘুম ঘুম চোখে বিছানার হাতিয়ে ফোনটা খুঁজতে থাকে। ফোনটা হাতে পেতেই কল রিসিভ করে কানে দেওয়ার পর অপর পাশ থেকে রোবটের মত করে কেউ যেন কথা বলল-

-"ম্যাম, প্লিজ আন-ব্লক দ্যাট নাম্বার। মি. রায়ান ওয়ান্টস টু টোক টু ইউ।"

ঘুম ঘুম চোখে মিটমিট করে তাকালো। ফোনের অপর পাশ থেকে মেয়েটা কি বলল একটানে কিছু ঠাওর করতে না পেরে জিজ্ঞেস করলো-"হুয়াট? হুয়াট ডিড ইউ সে?"

মেয়েটা আবার-"ম্যাম, প্লিজ আন-ব্লক দ্যাট নাম্বার। মি. রায়ান ওয়ান্টস টু টোক টু ইউ।"

মিরায়া এবার কথাটা বুঝতে পারলো। রায়ানের নাম্বার ব্লক করার ফল এটা বুঝতে পেরে জোরে চেঁচিয়ে বলল-

"আই উইল নোট।" এই বলে ফোন কাটলো। ফোন বিছানায় রাখতে যাবে তখন আবার কল এলো। আবার অন্য নাম্বার। মিরায়া ধরলো- "হ্যালো।"

-"ম্যাম, প্লিজ আন-ব্লক দ্যাট নাম্বার। মি. রায়ান ওয়ান্টস টু টোক টু ইউ।" একই লাইন একই সুরে।

মিরায়াও আবার একই ভাবে-"আই উইল নোট ডু দ্যাট।"

ফোন কাটলো। ফোন আবার বাজলো। মিরায়া ভালোই বুঝতে পারছে রায়ানের কথায় হচ্ছে সব। কাঁচা ঘুম ভাঙ্গার জন্য এমনিতেই খারাপ লাগছে তার উপর এসব শুরু হয়েছে। মিরায়া এবার ফোনটা ধরলো-

""ম্যাম, প্লিজ আন-ব্লক দ্যাট নাম্বার। ..."

আবার একই লাইন ভেসে আসার আগেই চেঁচিয়ে উঠলো-

"সাট আপ! টেল ইউর বোস আমি উইল নোট আন-ব্লক হিম।"

ফোনটা আবার কাটলো এই ভেবে হয়তো আর এমন কল আসবে না। কিন্তু কিসের কি, অফিসের কারো সাহস নেই রায়ানের আদেশ অমান্য করার, তার পরিপ্রেক্ষিতেই যা কাজ সেই কাজে সবাই অব্যাহত থাকলো। পর পর কল আসছে আর বেজে বেজে কেটে যাচ্ছে মিরায়া আর ফোন তোলে নি।

তবে বারবার ফোন বাজার কারণে ঘুমের ১২টা অনেক আগেই বেজে গেছে। মিরায়া ভীষণ বিরক্ত হয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে উল্টো করে রেখে শুয়ে পরলো। কিন্তু ঘুম আসছে না। এভাবে কাটলো প্রায় ৩ঘন্টা ভোর হয়ে গেছে। সূর্য আকাশে হালকা উঁকি দিচ্ছে। মিরায়া বিছানা থেকে উঠে বসে ফোনটা তুললো। এখনো ফোনটা বাজছে অনবরত, এক পর্যায়ে কল কেটে গেলে ফোনের স্ক্রিনে " you missed 2000+ calls" ভেসে উঠলো। মিরায়া হতবাক।

-"উনি কি পাগল নাকি এত কল কে করে তাও শুধু নাম্বার আন-ব্লক করার জন্য?" মিরায়ার মুখ থেকে আপনা আপনি কথাটা বের হয়ে এলো। সাথে সাথে ফোনটা আবারও বাজলো। মিরায়া হাঁফ ছেড়ে ভাবলো এবার ফোনটা ধরে বলবে যে আন-ব্লক করছে সে, আর কল না দিতে।

মিরায়া এবার কল রিসিভ করার পর কিছু বলার আগেই অপরপাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত কন্ঠ। গম্ভীর শান্ত অথচ হুমকির মতো করে রায়ান বলল-

"এই ফোনটা কাটার পর যদি সাথে সাথে নাম্বারটা আন-ব্লক না হয়, তোমার ছোট্ট শরীরটার কি হাল করবো দেশে ফিরে তার ঠিক থাকবে না হার্ট-বার্ড। নিজের কপালে শুধু শুধু দুঃখ টেনে এনো না বেইব। নিজেকে কন্ট্রোল করে রেখেছি বলে মনে কোরো না আমি কন্ট্রোল করতে চাই। আমার অবাধ্য হলে আমাদের অসম্পূর্ণ রাখা কাজটা আমি দেশে ফেরার পর খুব বাজেভাবে সম্পূর্ণ হবে।"

মিরায়ার শরীর কেঁপে উঠলো হঠাৎ সাথে লোমগুলোও দাঁড়িয়ে গেলো সাথে তার দেখা স্বপ্ন আর সেই পড়ন্ত দুপুরের কথা মাথায় এলো। সে কিছু বলতে যাবে তার আগেই কল টা কেটে দিল রায়ান। মিরায়া বুঝতে পারলো রায়ানের সাথে জেদ ধরে টেকা আর সম্ভব না। আরো ফোনে যা বললো তার একটাও যদি সত্যি হয় তাহলে তো... মিরায়া নিজের মনে এসব ভেবে মাথা নাসূচক নেড়ে সাথে সাথে রায়ানের নাম্বার টা আন-ব্লক করে দিল। রায়ানও তার পরপরই নিজের নাম্বার দিয়ে কল করে দেখার জন্য তার শাসানোতে কাজ হয়েছে কি না।

এবার কল করতেই কল ঢুকলো। রায়ানের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি খেলে গেল। নিজের মনে মনে ঠোঁট কামড়ে হেসে ভাবলো-" বাচ্চা বউটা শুধু শুধু জেদ করে। আমাকে পাগলামো করতে বাধ্য না করে শুরুতে আন-ব্লক করে দিলেই তো আর রাত জাগাতাম না।"

মিরায়া এবার রায়ানের কলটা ধরল ভালো মতোই বুঝেছে এখন কল না ধরলে আরো খারাপ কিছু হবে। কলটা ধরার পর রায়ান হালকা গলায় বলল-

"গুড গার্ল। নাউ স্লিপ, ওকে?"

মিরায়া আমতা আমতা করে বলল-

"ক্যা..ক্যাম্পাসে যেতে হবে সকাল হয়ে গেছে এখানে।"

রায়ান আবার চেঁচিয়ে বলল-

"নিজের দোষে ঘুম নষ্ট করেছ কিন্তু আমি মানবো না। আজ যেতে হবে না বাড়িতে থেকে রেস্ট করো। আমি আম্মুকে বলে দিবো। যেন খাবার তোমার ঘরে দেয়।"

মিরায়া প্রতিবাদ করবে তার সাহস পেল না বুক কাঁপছে তার। শুধু বলল-"আ.. আচ্ছা।" মনে মনে ভাবছে হ্যাঁ বলে দেই দেশে তো নেই আমি ক্যাম্পাসে গেলেই কি আর বুঝতে পারবেন নাকি।

রায়ান মিরায়াকে আবার বলল-

"খবরদার! ভেবো না দেশে নেই তাই আমাকে লুকিয়ে কিছু করলে যানতে পারবো না। আজকে বাড়ির বাইরে পা রাখলে আমি দেশে ফিরে এমন অবস্থা করবো ১মাস নিজের পায়ে হাঁটতে পারবে না।"

মিরায়া আবার আঁতকে উঠে বিড়বিড় করলো-"অসভ্য, অশ্লীল লোক, ডাবল মিনিং কথা বলে সব সময়।"

রায়ান-"কি হলো? চুপ কেন মাথায় গেছে কি বললাম?"

মিরায়া বাধ্য হয়ে বলল-"হুম, গেছে।"

রায়ান এবার গভীর গলায় বলল-"ঠিক আছে ঘুমাও এখন। আমার মিটিং আছে। পরে কল দিবো। একবার বাজতেই যেন রিসিভ হয়, ওকে? বাই।"

মিরায়া হালকা চিন্তিত কন্ঠে-"ওয়েট একটু.. শুনুন।"

রায়ান মুচকি হেঁসে দুষ্টু ভঙ্গিতে বলল-"বলো জানপাখি, কি ?"

মিরায়া এমন ডাকে লজ্জা পেয়ে একটু অস্বস্তিতে জিজ্ঞেস করলো-"আপ..আপনি ঠিক আছেন তো? কবে ফিরবেন?"

রায়ান এবার একটু প্রসারিত হেঁসে মিরায়াকে বিরক্ত করতে বলল-"কেন বেইব? ডু ইউ মিস মি সো মাচ?"

মিরায়া হালকা কেশে উঠলো রায়ানও হাসলো। মিরায়া আবার আমতা আমতা করলো-"আমি কেন মিস করতে যাব আপনাকে? মামনি জিজ্ঞেস করতে বলেছিল। আপনি যাওয়ার পর থেকে একবারও খবর দেননি নিজের তাই সবাই চিন্তা করছিল।"

রায়ান এবার আর তর্ক না করে মিরায়ার কথায় সায় দিয়ে বলল-"ওকে ওকে গোট ইট। আম্মু কে আমি কল করে নিচ্ছি। তুমি ঘুমাও। রাতের ঘুম পুরো না হলে শরীর খারাপ করবে তোমার।"

মিরায়া সম্মতি দিল-"আচ্ছা ঠিক আছে।"

রায়ান-"ওকে বেইব। আমার মিটিং এ্যাটেন্ড করতে হবে এখন। বাই। পরে কল করছি তোমায়। সুইট ড্রিমস। মিস মি মোর।"

রায়ান কলটা রাখতেই মিরায়া বিছানার উপর ধপ করে পড়ে গেল। তার চোখ ভরা ঘুম। এবার হয় তো রায়ান ঠিক আছে জানতে পেরে শান্তিতে একটু ঘুম হবে। কিছু সময়ের মধ্যেই মিরায়া ঘুমিয়ে পড়লো।

অন্যদিকে রায়ান রামিলা চৌধুরীকে কল করে কথা বলে নেয়। আজ তার বড়ো একটা প্রজেক্ট এর জন্য মিটিং এ বসেছে। মিটিং টা খুব গুরুত্বপূর্ণ এই প্রজেক্টের ডিল এর মূল্য - ১৭০০ কোটি টাকা। মেইন কনফারেন্স ডিলার দের সাথে ৩ তারিখে আর আজ কেবল ২৭ তারিখ। রায়ান কনফারেন্স রুমে মিটিং শুরু করলো।

____________

সকাল ৮টা~

চৌধুরী বাড়ির সবাই খেতে নেমেছে মিরায়া ছাড়া। রুদ্র ও রায়হান চৌধুরী একটু আগেই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছেন অফিসের জন্য। সোরায়া টেবিলে মিরায়াকে দেখতে না পেয়ে রামিলা চৌধুরীকে প্রশ্ন করল-

"মামণি আপু কি আজকে তাড়াতাড়ি চলে গেছে ক্যাম্পাসে?"

রামিলা চৌধুরীর সাথে রায়ানের কথা হয়েছে। রায়ান তখনি বলেছিল মিরায়া যেন আজকে ক্যাম্পাসে না যায় আর ভালো করে রেস্ট নেয় সেটার খেয়াল রাখতে। রামিলা চৌধুরী উত্তরে বললেন -

"না রে মা, তোর আপু নিজের ঘরেই আজ যাবে না ক্যাম্পাসে।"

সোরায়া চিন্তিত কন্ঠে-"কেন ? কি হয়েছে আপুর? শরীর খারাপ?"

রামিকা চৌধুরী সোরায়া কে আশ্বস্ত করে বললেন-

"না, ওর ঘুম হয়নি কালকে কোনো কারণে তাই ঘুমাচ্ছে। তুই বেশি চিন্তা না করে চুপচাপ খেয়ে কলেজে যায়।"

সোরায়া আর কথা না বাড়িয়ে রামিলা চৌধুরী কথামতো চুপচাপ নিচে নাস্তা খেয়ে কলেজে জন্য বের হয়ে যায়।

_____________

সোরায়ার কলেজ~

সকালে কলেজের পরিবেশ খুবই সুন্দর ছিল। কলেজের গেটের সামনেই জুঁই দাঁড়িয়ে আছে সোরায়ার জন্য। কাল কলেজ শেষে কি হয়েছে এই ভেবে রাতে ঘুম হয়নি তার। মাহির সোরায়াকে কি বলতে ডেকেছিল কাল- এই ভাবছিল সম্পূর্ণ সময়।

এমন সময় কলেজের গেটের সামনে জুঁইকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোরায়া দৌড়ে এসে জুঁইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল-

"ওই কি রে, তুই গেটের সামনে দাঁড়িয়ে কি করিস? ভিতরে যাসনি কেন?"

জুঁই সোরায়াকে প্রাণবন্ত দেখে একটু অবাক হয়ে ভাবলো-

"আমি এই জায়গায় ওর চিন্তায় রাতে ঘুমায় নি আর ও এমন লাফাতে লাফাতে হেঁসে হেঁসে কথা বলছে? কাল কি তবে তেমন সিরিয়াস কিছু হয় নি? শুধু শুধু প্যারা নিচ্ছিলাম?"

সোরায়া জুইকে হালকা ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞেস করল-

"ওই জুঁই? কিছু বলিস না কেন? চল কলেজের ভিতরে যাই, আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে এখানে?"

হঠাৎ জুঁই নিজের ধ্যানে ফিরে এসে বলল-

"হ্যাঁ? হ্যাঁ চল যাই। তুই ঠিক আছিস তো?"

কলেজে ঢুকতে ঢুকতে জুঁই সোরায়াকে প্রশ্ন করলো।

সোরায়া হেঁসে বলল -"হ্যাঁ ঠিক আছি আমার কি হবে আবার। সব ঠিক আছে। তুই বেশি ভাবছিস। ক্লাসে চল।"

দুজনেই নিজেদের ক্লাসের দিকে যেতে থাকে এমন সময় অফিস রুম থেকে মাহির ও বের হয়। মাহির সোরায়ার একদম মুখোমুখি অবস্থায় থাকার পরও সোরায়া এক পলকের জন্যও

তার দিকে তাকিয়ে দেখলো না, অনায়েসেই মাহফিলের সাইড কাটিয়ে চলে এলো। এইদিকে এই দৃশ্য জুঁই দেখে সম্পূর্ণ অবাক-"যে মেয়ে কলেজে স্যারকে খুঁজে খুঁজে দেখতো এখন সামনে থাকার পরও একবার তাকালো না!"

সোরায়া এখন সামনের দিকে তাকিয়ে হেঁসে হাঁটছে। মাহির বিষয়টা খেয়াল করল। কালকের পর থেকে বাড়ি ফেরার পর হাজার বার চিন্তা করেছে-" মেয়েটা ছোট আমি কি অতিরিক্ত বকে ফেলেছি? মন খারাপ করে যদি কান্নাকাটি করে কাল থেকে কলেজে না আসে!" কিন্তু কিসের কি সোরায়া দিব্যি হাসিমুখে কলেজে এসেছে যেন কিছু হয়নি কাল। এদিকে সোরায়ার তাকানোতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ায় আজকের সোরায়ার এভাবে দেখেও না দেখার ভাব করে চলে যাওয়া তার ভালো লাগলো না কিন্তু তা মেনতে মন চাইছে না।

সকালের দুই ক্লাস শেষে ইংলিশ ক্লাসের সময় হতেই মাহির ক্লাসে প্রবেশ করে। ক্লাসের সবাই দাঁড়ায় সোরায়াও। ক্লাস যথারীতি চলছে। কিন্তু আজ মাহিরের ক্লাসে পাড়ানোতে মন বসছে না। সে আড় চোখে একবার সোরায়ার দিকে দেখতেই খেয়াল করলো সোরায়া কেবল বই আর খাতার দিকে সামনের দিকে নজর দিচ্ছে না। মাহির আবার মাথা ঝাঁকিয়ে পড়ানো চালিয়ে গেল কিন্তু এক পর্যায়ে এমনটা আর তার সহ্য হচ্ছিল না বলে সবার উদ্দেশ্যে বলল-

"ক্লাস এ্যাটেনশন দেও, সামনে বোর্ডের দিকে তাকাও‌।"

ক্লাসের কয়েকজনের সাথে বলে উঠলো-"বোর্ডই তো দেখছি।"

মাহির এবার হালকা গলা খাঁকারি করে বলল- "সবাই মনোযোগ দেও কয়েকজন না।"

সোরায়া তাও সামনে তাকালো না একবারও। মাহির কোনো মতো ক্লাস টা শেষ করলো। ঘন্টা বাজার পর মাহির সবার উদ্দেশ্যে বরাবরের মতো প্রশ্ন করলো-

"এনি কোশ্চেন?"

প্রতিবার সোরায়া হাত তুললেও এইবার কেউই হাত তুলল না। মাহির সোরায়ার দিকে তাকালো। জুঁই পাশে বসে সব খেয়াল করছে কিন্তু ক্লাসের সময় চলছে তাই চুপ ছিল। সোরায়া আপন মনে বই পড়ে যাচ্ছে যেন আশে পাশে কিছু নেই। মাহির এবার ক্লাস থেকে বিদায় নিতেই জুঁই সোরায়ার থেকে বই কেড়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলো-

"ওই তুই যে বললি কিছু হয় নি তাহলে এসব কি হচ্ছে?"

সোরায়া কিছু বুঝতে না পারার মতো করে জিজ্ঞেস করল-

"কিসব হচ্ছে?"

জুঁই সোজা বলল-"ইইহহ্! নেকামি করোস নাকি। সকাল থেকে দেখছি সব কিছু উল্টো হচ্ছে।"

সোরায়া নিজের বইটা জুঁইয়ের হাত থেকে নিয়ে জিজ্ঞাস করল আবার-"কি উল্টো হয়ে দেখলি তুই আবার?"

জুঁই এবার বলতে থাকলো টানা-"সব সময় ক্লাসে তুই চায়ের দিকে তাকিয়ে থাকিস। আজ সম্পূর্ণ ক্লাস জুড়ে একবারও তুই দেখলি না অথচ তার কোন সময় তোর দিকে তাকায় না আজ পুরোটা ক্লাসে বেশিরভাগ টাইমে তোর দিকে তাকিয়ে ছিল। স্যার জিজ্ঞেস করলে সব সময় তুই প্রশ্ন করিস কিছু না কিছু। আজ একবার ও করলে না। স্যারের চাওনি দেখে বোঝাই যাচ্ছিল স্যার তোর থেকে প্রশ্ন শুনতে চাইছিলেন। এসব উল্টো জিনিস কেন হচ্ছে বলতো?

সোরায়াও যে খেয়াল করেনি বিষয়গুলো তা নয়। ইচ্ছা করেই যে এমন করছে তা যে কেউ বুঝবে। সোরায়া মাহিরের এমন অবস্থা আর নিজের পরিবর্তনে খুশি ছিল। সোরায়া জুঁইয়ের কথায় পাত্তা না দেওয়ার ভাব নিয়ে বলল-

"আমি কিভাবে বলব কেন হচ্ছে। আমি আর দেখছি না আমার ইচ্ছা।"

সোরায়া মনে মনে -"দেখছি না কেন বলল, আমি ভালোবাসি উনাকে চাইলেই এড়িয়ে চলা যায় কিন্তু ভুলে থাকা অসম্ভব। আমি শুধু চাই উনি নিজের মতো থাকুক যেন আমার জন্য তার কোনো সম্মানহানি না হয়।"

মাহির অফিস রুমে গিয়ে নিজের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে নিজেকে প্রশ্ন করতে লাগলো-

"উফ্! মাহির হয়েছে কি তোর ক্লাস করানোতে এতো অনিহা কেন দেখাচ্ছিস। এটা তোর কাজ, বি অ্যাটেন্টিভ।"

মাথার চুল একটু শক্ত করে টানতে থাকলো। মাথা ব্যাথা উঠে গেছে তার। মাহিরের চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে সোরায়ার হাঁসি মাখা চেহারাটা ভেসে উঠতেই মাহির চট জলদি চোখ খুলে ফেলল।

-"অসভ্য মেয়ে কালকের পরও কিভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসে বুঝলাম না। আমাকে এড়িয়ে চলছে। ওয়াও। একদিনে এতো পরিবর্তন।" নিজে নিজে আওড়ালো।

___________

ঢাবি ক্যাম্পাস~

রিমি সকাল থেকে এসে ক্যাম্পাসে মিরায়াকে না দেখতে পেয়ে মিরায়াকে কল করেছে কয়েক বার কিন্তু একবারও মিরায়া কল ধরে নি। ধরবেই বা কিভাবে সে তো বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। রিমি একটু চিন্তিত হয়ে উঠলো- "সব তো ঠিক ঠাক ছিল হঠাৎ ক্যাম্পাসে এলো না মিরা ফোন তুলছে না কিছু কি হয়েছে।"

রিমির মাথায় মিরায়ার ব্যাপারে কোনো জটিলতা থাকলে তার অবসান রুদ্রর কাছের হয়। রিমি ভাবলো-"রুদ্রকে জিজ্ঞেস করলে নিশ্চয়ই জানা ভেবে মিরার কি হয়েছে।"

রিমি নিজের ফোনটা একবার হাতে নিয়ে থেমে গেল-"না না, সব সময় এমন যখন তখন কল করা খারাপ দেখায়। মিরাযর থেকেই জেনে নিবো যা জানার।" এই বলে ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে দিল। তারপর ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে সন্ধ্যার জন্য ক্যাফের দিকে রওনা দিল।

___________

চৌধুরী বাড়ি~

বিকেল ৪টার কাছাকাছি সময়। মিরায়া ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই রামিলা চৌধুরীকে সোফায় বসে থাকতে দেখে নিজেও সোফায় গিয়ে বসলো। ভাবলো রায়ানের সাথে কথা হয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করবে। রামিলা চৌধুরী নিজে উল্টো মিরায়াকে প্রশ্ন করলেন-

"মিরা, রায়ানের সাথে ঘুম থেকে ওঠার পর কথা হয়েছে তোর?

মিরায়া অবাক হলো তবে সাথে সাথে উত্তর দিল-"না তো মামনি। কেন তোমার সাথে কি এখনো কথা হয়নি উনার? আমাকে যে বলল তোমাকে কল করবেন।"

রামিলা চৌধুরী- "আমাকে তো করেছে আগে। তখন বলেছিল তুই ঘুম থেকে উঠলে জানাতে। তাই তোকে জিজ্ঞেস করলাম তোর সাথে এর মধ্যে কথা হয়েছে কিনা।"

রায়ানের রামিলা চৌধুরীকে এইভাবে মিরায়ার সাথে কথা বলতে চাও আর বিষয়টা বলা মিরায়ার আজব লাগলো।

-"নিজে এক নির্লজ্জের হাড্ডি এখন অন্যের মানসম্মান নিয়ে টানছে। মামণি কে বলার কি ছিল।"

রামিলা চৌধুরী মিরায়াকে ধাক্কা দিয়ে বললেন-

"মিরা এক কাজ কর, তুই বরং একবার কল করে নে রায়ানকে। আর হ্যাঁ কথা হলে ভালোভাবে জিজ্ঞেস করিস ঠিক মতো খাচ্ছে কি না, কাজ বেশি কিনা?"

মিরায়া চোখ একটু বাঁকা করে তাকালো রামিলা চৌধুরীর দিকে-

"মামণি তোমার এগুলো জানার থাকলে তুমিই তো জিজ্ঞেস করতে পারো । আর তা না হলেও আমি কল করলে তোমাকে ফোন দিয়ে যাব নিজে জিজ্ঞেস করে নিও। আমি পারবো না।"

রামিলা চৌধুরী মনে মনে একটু হাসলেন বুঝতে আর বাকি নেই যে মিরায়া লজ্জা পাচ্ছে। রামিলা চৌধুরী বললেন-

"না তুই ই জিজ্ঞেস করে আমাকে বলবি। আমি ওর সাথে তখন কথা বলার সময় রাগ করেছি এখন কথা বলা যাবে না ওর সাথে।"

মিরায়া মনে মনে বিড়বিড় করল-

"মা ছেলের মন কষাকষিতে আমাকে পিষে ফেল তোমরা। ধুর ভাল্লাগে না। এখন আবার ওই অশ্লীল টাকে কল করতে হবে।"

রামিলা চৌধুরী মিরায়ার মুখের আবরণ দেখে আরো হাসছেন মনে মনে। আসলে রায়ান এমন কিছুই তাকে বলে নি। তিনি ইচ্ছা করে মিরায়াকে দিয়ে রায়হানকে কল করানোর জন্য এমনটা বলছেন বানিয়ে। ছেলের আর বউমার মাঝে একটু টান তৈরির চেষ্টা এই আর কি। মিরায়া বিয়ের ব্যাপারটা জানলে কেমনভাবে রিয়েক্ট করবে তার ঠিক নৈই অন্তত একটা পিছুটান তৈরি হলেও হয়তো সংসারটা টিকে যাবে বলে তিনি ধারণা করছেন।

মিরায়া আর রামিলা চৌধুরীর কথোপকথনের মাঝেই হঠাৎ সোরায়া বাড়িতে ঢুকলো। মিরায়া আর রামিলা চৌধুরী দুইজনেই তাকিয়ে পা থেকে মাথা অব্দি নোংরা কালো ড্রেনের পানিতে ভেজা সোরায়াকে দেখছে। দুইজনের চোখই কপালে উঠার উপক্রম।

মিরায়া সোফা থেকে উঠে দৌড়ে সোরায়ার কাছে গিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এ কি অবস্থা তোর? কিভাবে হয়েছে? কোত্থেকে এলি?"

রামিলা চৌধুরী ও পিছন পিছন কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন-

"পড়ে গিয়েছিলি নাকি কোথাও?"

মিরায়া আর রামিলা চৌধুরী একাধারে প্রশ্ন করতে থাকায় সোরায়া সামান্য ঘাবড়ে যায়। মিরায়া আবার জিজ্ঞেস করল-

"কিরে কিছু বলছিস না কেন? এসব কিভাবে হলো? আর আজকেও এত লেট করে কেন বাড়ি ফিরলি?"

সোরায়া একটু দম নিয়ে বলল-

"একটা একটা করে প্রশ্ন করো একসাথে সব কিছুর উত্তর কিভাবে দিবো।"

মিরায়া সোরায়ার কথা শুনে নিজেও একটু নিঃশ্বাস নিল। তার পরক্ষণেই জিজ্ঞেস করল-

"ঠিক আছে এবার বল কি হয়েছে।"

সোরায়া একটু সিনেমাটিক বর্ণণা দিতে - "আরে‌ আপু আর বলো না...!"

মিরায়া-"চুপ! নেকামি কম। সোজা উত্তর দে।"

সোরায়া চুপ হয়ে মিরায়ার কথা মতো সোজাসুজি এক লাইনে উত্তর দিল-

"কলেজ থেকে ফিরার সময় রাস্তার পাশে একটা মা কুকুর ড্রেনের সামনে বসে ড্রেনের দিকে তাকিয়ে কাঁদছিল। আমি সামনে গিয়ে দেখলাম তার ৫ টা বাচ্চা কুকুর ড্রেনের পড়ে গেছে। একটুর জন্য ভেতরে পড়ে যায়নি ৫টা একসাথে দলা পাকিয়ে ছিল পরে আমি ড্রেনের ভিতরে গিয়ে তুলে দিয়েছি ৫টাকে।"

কথা গুলো বলেই মাথাটা নিচু করে ফেলল। সোরায়ার কথায় মিরায়া একবার রামিলা চৌধুরীর দিকে তাকাতেই উনি মুচকি হাসলেন। মিরায়া সোরায়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-

"ঠিক কাজ করে মাথা নামিয়ে রেখেছিস কেন? এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে? মাথা উঁচু কর।"

সোরায়া মিরায়ার কথায় মাথা উঁচু করে ফিক করে হেঁসে দিল সাথে মিরায়া আর রামিলা চৌধুরীও। এবার মিরায়া আদেশের সুরে বলল-

"যা এবার গোসল করতে। কি অবস্থা করেছে ইউনিফর্ম টার। জলদি যা।"

সোরায়া তাড়াহুড়ো করে লম্বা লম্বা পা ফেলে যেতে যেতে বলল-"যাচ্ছি যাচ্ছি।"

চলবে...

পাখিরা ওয়েট ইজ ওভার। কি আর বলবো থাক বললাম মুখ বা মুড কোনো টাই নাই। পরের পার্ট পরে দিচ্ছি। এইটা পড়ে শেষ করে নেক্সট পার্ট এ যাবা। কমেন্ট এ নিজের মূল্যবান মতামত জানিয়ে দিও। কমেন্ট দেখে একটু আশা পাই। কালকের জন্য সরি আমার ভুল ছিলো কষ্ট ও আমার হইছে। রেসপন্স ভালো পেলে লিখতে আরো ভালো লাগে।🥰 Love you ❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_38 (2nd)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

খান বাড়ি~

মাহির গাড়ি পার্ক করে বাড়িতে ঘুকতেই দেখলো বাড়িতে এক গাদা মেহমান। সীমা খান মাহির কে দেখেই হেঁসে মাহিরের সামনে এসে বললেন। সোজা উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানার উপরে রাখা শার্ট পড়ে দ্রুত নিচে নেমে আসবি। মাহির কিছু বুঝলো না। মাহির অবাক হয়ে প্রশ্ন করে-

"মানে? কেন? এরা কারা?"

সীমা অতিথিদের দিকে তাকিয়ে ভান করে একটু হেসে বললেন-"তোকে দেখতে এসেছে উনাদের একমাত্র মেয়ের জন্য। যা রেডি হয়ে আয়।"

মাহির রেগে গিয়ে বলল-

"কিহ্! আমাকে দেখতে? আম্মু আমি একটা ছেলে । আমাকে কেন দেখতে আসবে আমি না যাবো মেয়ে দেখতে।"

সীমা খান চোখ পাকিয়ে-"তুই যাবি না মেয়ে দেখতে বেঁচে থাকতে তা আমি জানি। তাই উনাদের ডেকেছি ছেলে দেখতে।"

মাহির শ্বাস নিয়ে বলল-

"আমি উপরে যাচ্ছি নিচে নেমে যেন এনাদের না দেখতে পাই বলে দিলাম। নাহলে বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।"

সীমা খান বললেন-"উনারা আমার অতিথি আমি উনাদের যেতে বলতে পারবো না।"

মাহির একটু বিরক্ত হয়ে গিয়ে-"ঠিক আছে তোমার বলতে হবে না। আমি বলছি।"

মাহির ড্রয়িং রুমের সোফার কাছে গিয়ে সকল অতিথিদের সামনে দাঁড়িয়ে ভদ্রতার সুরে বলল-

"এখানে কোনো ছেলে নিজেকে দেখাবে না। আপনারা এবার আসতে পারেন। ধন্যবাদ।"

সবাই মাহির কথা শুনে একটু ইতস্তুত বোধ করল তারপরই একে অন্যের রং দিকে তাকিয়ে একে একে সবাই বের হয়ে গেল গুনগুন করে কথা বলতে বলতে। সীমা খান মাহির এর কাছে এসে তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বললেন-

"তুই চাস কি আমাকে একটু বলবি? নিজের কোন মেয়ে পছন্দ না, আমার কথা শুনে কোন মেয়েকে দেখতে যাবি না, আমি মেয়ের পরিবারদের ডেকে আনলে তাতেও সমস্যা। কি করবো টা কি বল আমাকে।"

মাহির এবার খুব বিরক্ত হলো তার এই প্রতিদিনের বিয়ে বিয়ে কাহিনী আর ভালো লাগছে না-

"উফ্! আম্মু সবকিছু এটা লিমিট থাকে। আমি যাকে তাকে বিয়ে করব না।"

সীমা খান -"তোর কি মনে হয় তোর জন্য আমি যাকে তাকে রাস্তার থেকে তুলে নিয়ে আসব।"

মাহির-"যাকে তাকে বলতে আমি রাস্তার মেয়ে বুঝাই নি আম্মু। রাস্তার অনেক মেয়েরা ভালো হয়। কিন্তু কাউকে না জেনে না শুনে এমনি শুধু শুধু বিয়ে করে ফেলা যায় নাকি।"

সীমা খান-"বেশ, তোকে আমি এক বছর সময় দিচ্ছি। নিজের পছন্দমত একটা মেয়েকে যত খুশি জেনে শুনে বিয়ে করবি। আর তা না হলে আমি এই বাড়িতে আর থাকবো না।"

মাহির কি বলবে কিন্তু না বুঝে বলে দিল-

"ঠিক আছে। এক বছর তো? এক বছরে কাউকে না কাউকে পেয়েই যাবো। এবার শান্ত হও। আর এই এক বছর আমাকে বিয়ে নিয়ে প্যারা দিবা না।"

মায়ের জেদ সামলে কিছুক্ষণ হলো মাহির নিজের ঘরে একা শান্ত এক পরিবেশে খাটের উপর শুয়ে আছে চোখ বন্ধ করে অজান্তেই কয়েক ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই সে মুচকি হাসলো। তারপরেই চোখটা খুলে মুখে হালকা হাসি রেখে বলল-

"মেয়েটা আসলেই অন্য রকম। এমন ভাবে কিভাবে পারলো সাদা ধবধবে ইউনিফর্ম টা নষ্ট করতে? তাও আবার একটা মেয়ে হয়ে রাস্তার মাঝে‌। ওর জায়গায় অন্য কেউ হলে নিজের বাহ্যিক সৌন্দর্য রাস্তায় নষ্ট করতে চাইতো বলে আমার মনে হয় না।"

তারপর ই আবার চোখ বন্ধ করে নিলো একই ঘটনা চোখের সামনে পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখার জন্য‌।

ফ্ল্যাশব্যাক~

মাহির গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কয়েকজন মানুষকে একটা ম্যানহোলের সামনে জড়ো হতে দেখে গাড়ি থামিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। মনে মনে ভাবছিল-

"কি হচ্ছে ওখানে!!

ঠিক ওই সময় একজন বৃদ্ধ লোক তার গাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে মাহির বৃদ্ধলোকটিকে কৌতুহলি হয়ে প্রশ্ন করল-

"এই যে আংকেল, সামনে তো ভিড় কেন? কিছু কি হয়েছে?"

বৃদ্ধ লোকটা একটু তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল-

"আরে মিয়া আর কইয়েন না। একটা কুত্তা কানতাছে ওর ৫টা ছাউ ওইটার মদ্দে পাইরা গেছে। সবাই দেখতাছে এহন ময়লার মদ্দে আর কে নামবো কন।"

লোকটি নিজের মত কথা বলে চলে গেল। এইদিকে মাহির অন্যের উপকার করার রোগ আছে ছোট থেকে। রায়ানের সাথে তার বন্ধুত্বও সেভাবেই। রায়ান তাকে একবার একটা বড় বিপদ থেকে বাঁচানোর পর ধন্যবাদ স্বরূপ ওকে বলেছিল ভবিষ্যতে অন্যের সাহায্য করতে।

মাহির নিজের গাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় দেখলো সোরায়া রাস্তা পার করে ভীরের দিকে যাচ্ছে খানিকটা অবাক হয় সে।

গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে দৌড়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর দেখল। এইটুকু সময়ের মধ্যে সোরায়া কিছু না ভেবেই কলেজ ইউনিফর্মে ম্যানহোলের সিড়ি বেয়ে ভিতরে চলে গেছে। এই দিকে সবাই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। কেউ কেউ মেয়েটার সাহসের প্রশংসা করছে। এই দিকে মাহিরের চিন্তা হচ্ছিল ছোট বাচ্চা মেয়ে কিছু হলে কি হবে।

কিছুক্ষণ পর সম্পূর্ণ কালো নোংরা পানিতে ভিজে জামা কাপড় সব নষ্ট করে বের হয়ে এলো সোরায়া একটা কুকুরের বাচ্চা হাতে তুলে। এভাবে পর পর ৫ টাকে তুলে আনার পর সবাই সোরায়ার থেকে একটু দূরে সড়ে গেল নোংরা লেগে থাকায় ওর গায়ে। মাহির ভীরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে সোরায়ার সামনে দাঁড়ায়। এবার সোরায়া নিজেই মাহিরের থেকে একটু সড়ে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করল-

"স্যার,আপনি এখানে?"

মাহির একবার দেখলো সোরায়াকে, তার মায়াবি চেহারাতে একটু লজ্জা হয়তো এমন অবস্থায় এভাবে মাহিরের সামনাসামনি হতে হচ্ছে তাই। মাহির চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল-

"গাড়িতে গিয়ে বসো যাও।"

সোরায়া মাহিরের আদেশ শুনেও না লুনার মতো ভাব করলো। নিজের ব্যাগটা তুলে কিছু টাকা বের করে দৌড়ে পাশের দোকান থেকে কিছু বিস্কিট ও পাউরুটি কিনে আবার কুকুর গুলোর সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে মা কুকুরের সামনে ওইগুলো ছিঁড়ে তাদের খেতে দেয়। একবারও মাহির এর দিকে দেখছে না সে। কিন্তু মাহিরের দুই চোখের মণিতে কেবল সোরায়া অঙ্গভঙ্গি গুলো দেখা যাচ্ছে। কুকুরগুলোকে খাবার দেওয়া শেষে সোরায়া নিজের ব্যাগ কাধে নিয়ে মাহিরের সামনে দাঁড়িয়ে বলল-

"আমার বাড়ি এখান থেকে কাছে স্যার আমি যেতে পারবো। থ্যাংক ইউ।"

কথাটা বলেই নিজের মতো বাড়ির পথে হাঁটতে শুরু করে দিল। মাহির তাকে কিছু বলবে এই পরিস্থিতি ছিল না তাই সে চুপ করে সোরায়াকে চলে যেতে দেখলো। আর ভাবলো-

"একদিনে এতো পরিবর্তন সম্ভব?" তারপর আর কি যথারীতি বাড়ি ফিরে এলো আর বাড়িতে এমন পরিস্থিতির শিকার।

বর্তমান~

মাহির নিজের চিন্তায় হারিয়ে গিয়ে ঘুমিয়ে গেছে কখন তা নিজেও জানে না। মাথার মধ্যে একটাই ছবি-সোরায়া। যেই মেয়েকে নিয়ে ভাবলে বিরক্তি ছাড়া কিছুই অনুভব হতো না আজ তা মুগ্ধতায় পরিণত হতে শুরু করেছে।

_________

চৌধুরী বাড়ি~

মিরায়া নিজের ফোনটা নিয়ে পাইচারি করছে। রামিলা চৌধুরীর বলা কথাগুলো তার মাথায় ঘুরছে একবার ভাবছে কল দেবে আবার ভাবছে না দেবে না। মিরায়া আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে জোরে বলল-

"মিরা এত কেন ভাবছিস তুই। ওই অশ্লীল লোকটাকে কল করার প্রয়োজন নেই তোর। জাহান্নামের চৌরাস্তায় যাক‌।"

সাথে সাথেই আবার বিড়বিড় করল যেন আয়নায় নিজেকে উত্তর দিচ্ছে-

"কিন্তু মামণি যে বলল উনি আমাকে কল দিতে বলেছেন। যদি কল না দেই তারপর যদি দেশে ফিরে সকালে যা বলেছে তা করে!"

মিরায়ার শরীরে আবার কাটা দিলো রায়ানের কথা মনে করে। মিরায়া ফোনটা হাতে নিয়ে রায়ানের নাম্বার টা সামনে এনে ভেবে যাচ্ছে কি করবে কিন্তু কিছুই উত্তর পাচ্ছে না মন থেকে। এমন সময় হঠাৎ রামিলা চৌধুরী মিরায়াকে জোরে চেঁচিয়ে ডাকলেন-

"মিরা মা? একটু নিচে আয় তো এক্ষুনি।"

রামিলা চৌধুরীর গলার আওয়াজ একটু উঁচু হওয়ায় হঠাৎ শুনাতে মিরায়া চমকে কেঁপে উঠল এবং সাথে হাতটাও কেঁপে উঠার ফলে ভুলে রায়ানের নাম্বার এ কল চলে গেল। মিরায়া প্রথমে খেয়াল করে নি সে উত্তর করলো রামিলা চৌধুরীকে -

"আসছি মামণি।"

তারপর নিজের ফোনের দিকে তাকাতেই দেখলো রায়ানের নাম্বারে কল গিয়ে সেটা রিং করছে। মিরায়ার বুক ধক করে উঠলো সে কাঁপা কাঁপা হাতে তাড়াহুড়ো করে কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা বিছানার উপর ছুড়ে ফেলে দৌড়ে নিচে চলে গেল যেন এবার রায়ান কল ব্যাক করাতে তাকে ধরতে না হয়।

___

রায়ান কনফারেন্স রুমে, সাথে তার ফোন টা সাইলেন্ট করে টেবিলের উপর উল্টে রাখা বরাবরের মতোই। কাজের সময় কোনো প্রকার বিরক্তি তার পছন্দ নয়। মিরায়ার কল টের পাইনি সে স্বাভাবিকভাবেই।

আরো দীর্ঘ ১ঘন্টা পর মিটিং শেষ হলো। টানা এমন একটার পর একটা কনফারেন্সে অ্যাটেনডেন্ট করার কারণে রায়ানের মাথা বেশ ব্যথা করছে। সে নিজের কেবিনে এসির পাওয়ার টা বাড়িয়ে নিজের কাউচ টার উপর ধপ করে বসে একটু পিঠ ঠেকিয়ে নিল। মাথায় একহাত দিয়ে চুল গুলা টেনে ধরে চোখ বন্ধ করতেই তার মনে মিরায়ার খেয়াল এলো। হঠাৎ চোখ খুলে ফোনে বাংলাদেশের সময় দেখলো-৫টা বাজে।

রায়ান ভাবলো মিরায়ার ঘুম থেকে উড়ে পড়ার কথা অনেক আগেই এখন কল করলে মিরায়াকে করে পাবে। রায়ান নিজের ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো মিরায়ার নাম-"হৃদপাখি" ফোনের স্ক্রিনে ভেসে আছে। রায়ান এক লাফে উঠে বসলো-

"হৃদপাখি! আমার হৃদপাখি আমাকে কল করেছে? আমার তেড়া বউ এতো ভালো কবে হলো? যাক গে কল করেছে তাই আলহামদুলিল্লাহ।"

রায়ান মিরায়ার নাম্বারটায় কল ব্যাক করে।

___

মিরায়া নিচে এখনো তার ঘরে খাটের উপর সরে থাকা ফোনটা বাজছে। তবে কল ধরার জন্য কেউ নেই কাছে। এমন সময় সোরায়া গোসল শেষে নিচে খেতে নামতে সিঁড়ির দিকে এগোতেই ফোন বাজার শব্দ তার কানে যায়। সোরায়া চোখ ঘুরিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো শব্দটা কোথায় হচ্ছে।

রায়ান আবার কল করলো মিরায়া ধরছে না তাই। এবার সোরায়া স্পষ্ট শুনতে পেল মিরায়ার ঘর থেকে আওয়াজ টা আসছে। সোরায়া ঘরে ঢুকে মিরায়াকে আশেপাশে না দেখতে পেয়ে বিছানা থেকে ফোনটা তুলে। রায়ানের নাম সেভ করাছিল তাই সোরায়ার চিন্তে সমস্যা হলো না। সে কলটা রিসিভ করে, মিরায়া এখন ব্যস্ত, ঘরে নেই এটা বলার জন্য। কিন্তু তার আগেই রায়ান অপর দিক থেকে মিষ্টি সুরে বলল-

"হাই হার্টবার্ড! আমাকে কল দিয়েছিলে দেখলাম। খুব মিস করছো বুঝি? আসো একটু আদর করে দেই।"

সোরায়া রায়ানের কথা শুনে মুচকি হাসলো তারপর হালকা গলায় বলল-"ভাইয়া, আমি সোরায়া।"

রায়ান হকচকিয়ে মিরায়ার জায়গায় সোরায়া কথাগুলো শুনেছে বলে কাশতে কাশতে বলল-"আসতাগফিরুল্লা।"

সোরায়া এবার শব্দ করে হেসে বলল-"ভাইয়া, চিল! আমি উল্টোপাল্টা কিছু ভাবিনি। শান্ত হও।"

রায়ান স্বাভাবিক হয়ে প্রশ্ন করল-"চড়ুই পাখি, আমার হৃদপাখি কই? ফোন তুই করলি কেন?"

সোরায়া-"ভাইয়া, আপু নিচে হয়তো ফোনটা ভুলে ফেলে গেছে। আমি নিচেই যাচ্ছিলাম, শব্দ শুনে ঘরে ঢুকে দেখি কল বাজছে তাই তুললাম। আমি বুঝিনি তুমি আর আপু কলে..."

সোরায়া নিজের কথাটা সম্পূর্ণ শেষ করলো না।

রায়ান সোরায়া আধ বলা কথা বুঝতে পারলো। সে সোরায়াকে সাবধান করতে বলল-"তোর আপু করলে তো হতোই রে, এখন পর্যন্ত সব একা আমিই করে যাচ্ছি। পারলে তোর বোনটাকে বোঝা। তোর আপু আমি এইসব বলেছি শুনলে দেশে বসেই না আমার জান নিয়ে নেয়।"

সোরায়া রায়ানের কথায় হাসতে থাকলো। রায়ান এবার একটু পাঠানোর সুরে সোরায়াকে অনুরোধ করে বলল-

"চড়ুই! তোর আপু টাকে তোর ভাইয়ার অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে রে। আমি ভিডিও কল দেই একটু তোর আপুর কাছে নিয়ে যাবি শুধু ফোনটা রিসিভ করে। পারবে ভাইয়ার জন্য এতো টুকু করতে? আসার সময় অনেক চকলেট এনবো তোর জন্য বনু। এইটুকু হেল্প করে দে, প্লিজ।"

সোরায়া এবার সিরিয়াস মুডে বলল-"তুমি কি ভেবেছ আমাকে চকলেট ঘুষ দিয়ে কিনে নিবা? আর আমি তোমার জন্য কাজ করবো!"

রায়ান আশা ছেড়ে দিয়ে আমতা আমতা করলো-"না ইয়ে.. মানে ঐ আরকি...তুই রাগ করিস না বনু।"

সোরায়া এবার ঠিক করে হেসে মজার ভঙ্গিতে বলল-

"মনে করার কিছু নেই তো, তোমার ভাবনা একদম সঠিক। আমাকে চকলেট ঘুষ দিয়ে কেনা যায়। হিহিহি।"

রায়ান এবার হাসলো তারপর বলল-"তাহলে দাঁড়া আমি কল করছি এক্ষুনি।"

অডিও কলটা কাটার পর রায়ান মিরায়ার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা একসেপ্ট করে তার আইডি থেকে ভিডিও কল করল। সোরায়া কলটা প্রথমে ধরে রায়ানের সাথে কুশল বিনিময় করে ফোনটা নিয়ে নিচে গেল। মিরায়া তখন সোফার উপর সাথে কেউ নেই, রামিলা চৌধুরী নিজের ঘরে আছেন হয় তো।সোরায়া সিঁড়ি দিয়ে নেমে মিরায়াকে জিজ্ঞেস করল-"আপু কি করো?"

মিরায়া এক নজর সোরায়ার দিকে তাকালো তারপর আবার টিভির দিকে মন দিয়ে বলল-"এই তো টিভি দেখছি। তুই খেতে বস, খাবার বারা আছে।"

সোরায়ার হাতে ফোনটা রায়ান ভিডিও কলে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার হৃদপাখিকে একটু দেখবে বলে। সোরায়া এবার কিভাবে ফোনটা মিরায়াকে দেবে না বুঝতে পেরে শুধু হালকা উত্তেজনা নিয়ে মিরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা ওর সামনে নিয়ে বলল -

"আপু সারপ্রাইজ! দেখ কে কল করেছে! আমাদের মিস্টার আমেরিকা।"

মিরায়া হালকা চমকে তার মুখে সামনে ধরে রাখা ফোনটার দিকে তাকালো। সাথে সাথে মিরায়া সোরায়ার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কল কেটে দিল। হঠাৎ রায়ানকে এক পলক দেখে ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বলল-

"তুই আমার ফোন কেন ধরেছিস সোরা? এক্ষুনি খেতে যা। তাড়াতাড়ি যা বলছি।"

সোরায়া মিরায়ার ঝাড়ি খেয়ে খেয়ে গেল কিন্তু মনের যথেষ্ট আনন্দ। এবার মিরায়া নিজের ফোনটা নিয়ে দৌড়ে ঘরে গেল। এইদিকে রায়ানের মনটা ভেঙ্গে গেছে। একদিন পর সে তার প্রিয় মানুষটাকে একবার দেখার বাসনা করেছে সেটাতেই বাঁধা। রায়ান হাঁফ ছেড়ে আবার একবার কল করল। মিরায়া হঠাৎ ফোন বেজে উঠায় চমকালো সোরায়া সাইলেন্ট ছাড়িয়েছে সেটা খেয়াল করে নি। মিরায়ার নিজের ও রায়ানকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছিল কিন্তু বলা সম্ভব নয় তাই এমন কিঐনিজের মনকে বলে বিচলিত করে নি। মিরায়া মনের বিরুদ্ধে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না তাই রায়ানের কলটা সে রিসিভ করে নিজের মুখে সামনে এনে ধরল। রায়ান মিরায়া এখন দেখতে পাচ্ছে একে অপরকে কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।

রায়ানের অবস্থা আরো কাহিল। বেচারা একদিন পর শখের বউটাকে দেখে আর কন্ট্রোল করতে পারছে না নিজেকে। তার মনে হচ্ছিল দৌড়ে গিয়ে সেই ফোন স্ক্রিনের মায়াবি মুখটা নিজের দুহাতের আচলায় পুরে পৃথিবীর সব আদর উজার করে দিয়ে। রায়ান নিজের হাতের মুঠো শক্ত করলো, চোখ দুই সেকেন্ডের জন্য বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যেন নিজেকে খুব সামলাতে চাইছে ও অবাধ্য চাওয়া থেকে।

এইদিকে আবার মিরায়া লজ্জায় একবার একবার ছোট ছোট ভাঙা সময়ে একপলক একপলক রায়ানের দিকে তাকাচ্ছিল কিন্তু বেশি সময়ের স্থায়ীত্ব হয়নি সেই সময়সীমা। কিন্তু একনজরে দেখেও যে কেউ বলে দিতে পারবে রায়ানের চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট। মিরায়া একটু ব্যথিত মনে আওড়ালো-

"উনি কি ওখানে গিয়ে কাজের চাপে খাওয়া। ছেড়ে দিয়েছেন! এমন কেন দেখাচ্ছে?"

মিরায়া এবার একটু দীর্ঘ সময় ধরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রায়ানের মিরায়ারও যে তাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল বা তাকে মিস করছে তা বুঝতে সক্ষম।

রায়ান এবার নীরবতা ভেঙে নিজেই প্রথমে প্রশ্ন করলো-

"ঘুম পুরো হয়েছে হৃদপাখি? খারাপ লাগছে না তো?"

মিরায়া শুধু ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে বলল-"হুম হয়েছে। হঠাৎ ভিডিও কল কেন?"

রায়ান এবার মিরায়ার দিকে নিজের নজর আরো তীব্র করে বলল-"দেখতে ইচ্ছে করছিল তাই দিয়েছি। একদিন না দেখার পর কেমন দেখতে লাগছো তাই দেখার জন্য।"

মিরায়া এবার মজার সুরে নিজের গালে ঢং করে হাত রেখে পাল্টা প্রশ্ন করলো-"তো বলুন দেখি কেমন লাগছে আমাকে?"

রায়ান ফোনটা কাছে এনে মিরায়াকে আরো ভালো করে দেখে বলল-"সত্যি বলবো।"

মিরায়া মাথা নাড়ায়-"হুম হুম!"

রায়ান ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল-"একদম মরণঘাতী লাগছো। আমার মরণ!"

মিরায়ার শরীর রায়ানের কথায় হালকা কাপলো। সে মাথা নিচু করে ফেলতেই তাকে লজ্জা পেতে দেখে রায়ান আরো প্রসারিত হাসলো। রায়ান এবার একটু গম্ভীর ভাব নিয়ে মিরায়াকে বলল-

"আমি বলেছিলাম কল একবার বাজতেই ধরতে। এতবার কল কেন দিতে হলো?"

মিরায়া বিরক্ত মাথা গলায়-"নিচে ছিলাম আর ফোন সাথে ছিল না। এমনিতেও কালকের রাতে এতো কল এসেছে ফোনে শান্তিতে ফোনটাও চালাতে পারছি না হ্যাং করছে বারবার। সব আপনার জন্য, ফোনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।"

রায়ান হেঁসে বলল-"ওই ফোন চালাতে হবে না। তোমার জন্য একটা কমলা সুন্দরী নিয়ে আসবো, হ্যাপি নাও?"

মিরায়া কথা না বুঝতে পেরে-"কমলা সুন্দরী! এটা আবার কে? আমি কি করবো ওইটা দিয়ে?"

মিরায়ার দুনিয়া দাঁড়ির সম্পর্কে ধারণা দেখে রায়ান ব্যাখ্যা দিল-"নতুন আই-ফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স কমলা রংয়ের তাই ওইটাকে কমলা সুন্দরী বলে। সেটা তোমার জন্য নিয়ে আসবো তাই বললাম। এবার বুঝেছ?"

মিরায়া ততক্ষনাৎ বলল-"আমার ওইসব কমলা সুন্দরী তুন্দরী লাগবে না, কমলা রংটা ফোনে আমার একদম পছন্দ হয়নি। এটাতেই চলবে আমার।"

রায়ান হেসে বলল-"ব্লাক এডিসন আছে আমেরিকায় ওটা নিয়ে আসবো তাহলে। এবার এটা বলো যদি এটাও না লাগে তো কি লাগবে তোমার? আমাকে দেই? নিবা বেইবি?"

মিরায়া সাথে সাথে না উত্তর বুঝাতে বলল-"ফোনটাই নিয়ে আসেন তাহলে।"

রায়ান আবার ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠলো। এবার একই গভীর কন্ঠে বলল-"হৃদপাখি চলো বিয়ে করে নেই। তোমার বর একটা বেক্কল, ট্রাস্ট মি আই উইল বি বেটার।"

রায়ান মন থেকে কথাটা বললেও মিরায়ার কাছে কথাটা মজা মনে হলো। সে একটু চিন্তা করার ভাব নিয়ে হিন্দিতে ঢং করে বলল-"ঘারওয়ালে নেহি মানেঙ্গে।"

রায়ান এবার সোজা বসে আরো সিরিয়াস মুডে হিন্দিতেই জবাব দিল বলল-"ঘারওয়ালে ভি মানেঙ্গে অর ঘারওয়ালি ভি, মাই লিটল হার্টবার্ড।"

মিরায়া তো মজা ভাবছিল কিন্তু রায়ান গম্ভীর থাকায় সে আর কথা বাড়ালো না শুধু বললো-"দুনিয়া অনেক বড়ো, আরো অনেক মেয়ে আছে টেনশন নিয়েন না।"

রায়ান গম্ভীর ভাবেই-"তোমার দুনিয়া বড়ো হলেও আমারটা ৫ফুট ২ ইঞ্চি। এই পরিধির বাইরে আমার যাওয়ার ক্ষমতা নেই আর না আমার যাওয়ার ইচ্ছা আছে।"

মিরায়া চুপ হয়ে রইল। এভাবে চোখে চোখ রেখে একটা মানুষ কিভাবে এমন কথা বলে কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়া। মিরায়া মানসিক ভাবে বেশ বিরক্ত রায়ানের কথা তার উপস্থিতি এমন অযথা পাগলামিতে। মিরায়া সোজাসাপ্টা একটু উঁচু গলায় ঝাড়লো -

"আপনার সমস্যা কি হ্যাঁ? আপনি কি চান কি চান না বুঝা মুশকিল। কেন এমন করেন?"

রায়ান মিরায়ার রাগের দু পয়সা পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো গাইতে থাকলো তার উত্তর হিসেবে -

"চাইনা মেয়ে তুমি অন্য কারো হও..

পাবে না কেউ তোমাকে, তুমি করো নও..

তুমি তো! আমারই জানো না! ওহহহ..

এই হৃদয়ে তোমারি ওহ হো হো হো..

তোমাকে ছাড়া আমি, বুঝিনা কোন কিছু যে

আর পৃথিবী জেনে যাক, তুমি শুধু আমার।"

মিরায়া অবাক হয়ে বিছানায় বসে রইল। যা হচ্ছে তার জীবনে সেটা যেমন অদ্ভুত তেমন জ্বালাময় আবার ঠিক তেমনি শান্তির। মিরায়া রায়ানকে চুপ করাতে বলল-

"চুপ করবেন আপনি? গান গাওয়ার ইচ্ছে হলে গায়ক হয়ে যান।"

রায়ান-"তোমার পার্সোনাল রাইডার হয়েছে নিজ ইচ্ছায়। তোমার ইচ্ছাতে তোমার পার্সোনাল গায়ক হতেও আমার সমস্যা নেই।"

মিরায়া কাকে কি বলছে আর সেই কথার কি মানে বের করে মানুষটা উত্তর করছে সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। মিরায়া প্রচন্ড বিরক্ত হলো রায়ানের কথায় তাই চেঁচিয়ে বলল-

"আমার খুদা পেয়েছে খেতে গেলাম বাই। মামণি কে কল করে নিজের খবর দিয়েন।"

কথা শেষ করে মিরায়া কলটা কাটতে যাবে ওই সময় রায়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল-

"আরে আরে থামো থামো। তুমি কল কেন দিয়েছিলে তাই তো শুনা হলো না।"

মিরায়া চোখ বাঁকা করে তাকিয়ে-"কেন দিয়েছি মানে? আপনিই তো মামণি কে নাকি বলেছেন ঘুম থেকে উঠার পর আপনাকে কল করতে। মামণি বলল তাই তো করলাম।"

রায়ান হালকা ভাবুক হলো। তারপর বুঝতে পারলো রামিলা চৌধুরী তাদের কথা বলার সুযোগ করে দিতে ইচ্ছা করে হয়তো এমনটা করেছেন। রায়ান মুচকি হেঁসে বলল-"ওহ হ্যাঁ, আমিই বলেছিলাম। মিটিং এর কারণে খেয়াল ছিল না। আচ্ছা তুমি খেতে যাও আম্মুর সাথে আমি কথা বলে নিব।"

মিরায়া-"আচ্ছা।"

রায়ান ডাকলো মৃদু সুরে-"হৃদপাখি?"

মিরায়া-"হুম।"

রায়ান আবার-"মাই হার্ট বার্ড?"

মিরায়া হালকা লজ্জায় -"হুমমমম।"

রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। মিরায়ার মুখ নিচু করা দেখে বললো-"লুক এট মি,বেইবি।"

মিরায়ার বুক ঠোঁট কাঁপছে। সে বাধ্য মেয়ের মতো মুখ তুলে তাকালো রায়ানের দিকে। সাথে রায়ান তার হাত বুকের বা পাশে ধরে থেকে আর্তনাদ করলো-"উফফফ্!"

মিরায়া বিচলিত হয়ে -"কি.. কি হলো আপনার রায়ান ভাইয়া।"

রায়ান এই ভাইয়া ডাক শুনে বুক থেকে হাত নামিয়ে একদম স্বাভাবিক হয়ে বলল-"ওই বদজাত ছেমড়ি তোর কোন ধরনের ভাই আমি হ্যাঁ? কোন ভাই তার বোনের সাথে এমন আচরণ করে? ফিডার খাস নাকি? দুধের বাচ্চা? সব সময় ভাইয়া ডেকে মুডের ১২টা বাজায়।"

মিরায়া রায়ানের বিরক্তি দেখে মজা পেয়ে বলল-"ভাইয়া! রাগ করতে হয় না, এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।"

রায়ান এক মেজাজ নিয়ে-"আমার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর একমাত্র তুই আর তোর এই ভাইয়া ডাক। তফাৎ শুধু এতো টুকু প্রথম ক্ষতিকর জিনিস টা আমি নিজ সৎ ইচ্ছায় খেতে চাই। আর দ্বিতীয় টা শুনতেই মনে চায় না।"

মিরায়া রায়ানের কথায় আর টিকতে পারছে না । বরাবরের মতো রায়ানের দেশে নিজের মনে মনে কয়েকটা গালি বকলো-"অসভ্য, অশ্লীল, বেশরম লোক।"

তারপর আর কথা আগালো না শুধু বলল-"আমার খেতে হবে খুব খিদে পেয়েছে, রাখছি এবার।"

রায়ান-"আচ্ছা ঠিক আছে। পরে না হয় কন্টিনিউ করবো।"

মিরায়া কল কাটার আগে রায়ানের কান্তি ভরা তবুও মৃদু হাসি খেলা চেহারাটা কিছু সময় দেখে বলল-"শুনুন, কাজ ইম্পরট্যান্ট তবে নিজের থেকে বেশি নয়। ওখানে আপন কেউ নেই যে সব খেয়াল করবে, ঠিক মতো খাবেন, ঘুমাবেন। নিজের যত্ন নিয়েন। মামণি আপনাকে নিয়ে অনেক চিন্তা করে।"

রায়ান মিরায়ার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল-"শুধু মামণি তুমি করো না?"

মিরায়া একটু আমতা আমতা করে বলল-"আমি...আমি কেন করবো? মামণিই বলতে বলেছিল এসব তাই বললাম। বাই।"

রায়ান কে আর কিছু বলতে দিলো না মিরায়া। তার আগেই কল কেটে ফোনটা বুকে চেপে ধরলো আর একটু হলেই যেন লাফ দিয়ে বাইরে চলে আসবে হৃৎপিন্ড।

রায়ান মুচকি হাসলো আর মনে মনে এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে কাউচে হেলান দিয়ে ভাবলো-"হৃদপাখি, আর একটা বার ধরা দে আমার কাছে, কসম খোদার নিজের মনের আকাশে বন্দি করে খুব যত্নে রাখবো তোকে। শুধু একবার নিজের মুখে বল তুই আমার হবি, বাকি দুনিয়ার সব খুশি তোর বর তোর পায়ের নিচে এনে ফেলবে। জাস্ট ওয়ানস।"

দুইজন দুই দিকে এটি জ্বালায় জ্বলছে। কিন্তু বলা নিষিদ্ধ প্রায়।

_________

সন্ধ্যার সময়~

রিমি ক্যাফের স্টেজে বসে গিটার কর্ড ঠিক করছে। সেই মুহূর্তে রুদ্র প্রবেশ করলো ক্যাফেতে তবে এবার কোনো ক্লাইন্ট সাথে নেই। রিমি হঠাৎ চোখ তুলতেই রুদ্র কে দেখলো। সে আর রুদ্র পরপর দুইজনের দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে হাত নাড়লো। রুদ্র ক্যাফের ভিতরে একটা চেয়ারে বসলো। আর গোটা সন্ধ্যা রিমির দিকে তাকিয়ে তার মুগ্ধ গলার গান শুনে কাটালো।

রাতের সময় পারফরমেন্সের শেষে রিমি ক্যাফের থেকে বের হতেই রুদ্র কে দেখলো গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে। রিমি হেঁটে রুদ্রর দিকে এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলো-

"আজ এখানে কি মনে করে?"

রুদ্র হেঁসে-"আসলে‌ এখানকার কফি আর..!"

রিমি-"কফি আর কি?"

রুদ্র মাথা চুলকে -"কফি আর লাইভ পারফর্মার দুটোই বেশ ভালো আসক্ত হয়ে গেছি হয়তো। এই দেখুন না অফিস শেষে বেশ মাথা ব্যাথা ছিল কিন্তু এখন আর নেই।"

রিমি সামান্য লজ্জা পেয়ে দাড়িয়ে রইল। রুদ্র রিমির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল-"তাহলে এখন যাওয়া যাক?"

রিমি অবাক হয়ে- "কোথায়?"

রুদ্র স্বাভাবিক গলায়-"আপনার বাড়ি। ফিরবেন তো নাকি।"

রিমি-"ফিরবো তো ঠিকই তাই বলে প্রতিদিন আপনার আমাকে পৌঁছে দিতে হবে?"

রুদ্র এবারও রিমির থেকে ব্যাগটা নিয়ে গাড়িতে রেখে বলল-

"হ্যাঁ হবে। আপনি আমার বোন প্লাস ভাবির বেস্ট ফ্রেন্ড ওই হিসেবে আমার বেয়াইন হন। এতো টুকু করাই যায় তাই না?"

রিমির মাথায় হঠাৎ এলো আজকে মিরায়া ক্যাম্পাসে যায় নি। একসাথে গেলছ মিরায়ার খবর টুকু অন্তত জানতে পারবে রুদ্রর থেকে তাই গাড়িতে উঠলো। পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের মতো কথা বলতে থাকলো তার মাঝেই একবার রিমি সুযোগ বুঝে মিরায়ার খবরও নিয়ে নিয়েছে।

___

পাখিরা পর্বটা অনেক বড় তাই একটা পর্বে আসেনি। পরের পর্বটা দেওয়া আছে আমি কমেন্ট বক্সে লিংক দিয়ে দিব তোমার সেখান থেকে ঢুকে পড়ে নিও। কমেন্ট করে জানিও তোমাদের কেমন লাগলো।

Love you pakhis ❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ

#Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_38 (3rd) বোনাস

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

এভাবেই তিন দিন কাটলো। মিরায়া রায়ানের দিনে দুইজনের সময় মিলে কথা বলে কখনো অডিও কলে কখন ভিডিও কলে। শুরুতে মিরায়া একটু ইতস্তুত ও বিরক্ত বোধ করলেও সময়ের সাথে সাথে বিষয়টা তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। এখন সে নিজেই মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কল করে রায়ানের খবর নেয়। সারাদিনে একবার কথা না বললে তারও ফাঁকা ফাঁকা লাগে। রায়ান ও মিরায়ার পরিবর্তনে বেশ খুশি। বাড়ির বড় গুরুজনরাও ছেলে আর বউমার মাঝে ভাব বিনিময়ের স্বাভাবিকতা দেখে সুন্তষ্ট।

সোরায়া এই তিনদিন মাহির কে একইভাবে এড়িয়ে চলেছে। একবারও তাকায়নি কথা বলে নি। বরং উল্টো হচ্ছে সব এখন মাহির ক্লাসে শুধু ওকে পড়া ধরে, ওর হোমওয়ার্ক চেক করে। বিষয়টা সোরায়া জুঁই এবং ক্লাসের সকলেই খেয়াল করেছে। সবাই এখন সোরায়াকে খেপায় মাহিরের তার প্রতি ব্যবহার দেখে। নিজের পরিবর্তন যে মাহির নিজে খেয়াল করেনি তা নয় কিন্তু যা হচ্ছে তার অজান্তেই। চেয়েও নিজেকে আটকাতে পারছে না। মনে একগুঁয়ে জেদ ধরে যেন সোরায়া সোরায়ার করছে। রিভার্স সাইকোলজি ধারণাটা মাহিরের ক্ষেত্রে বেশ লক্ষণীয়।

অন্যদিকে, রিমির গান আর সেই ক্যাফে রুদ্রর শান্তির নীড়ে পরিণত হয়েছে যেন। অফিস শেষে সেখানে যাওয়া রিমির সাথে দেখা হওয়া তার গলার গান উপভোগ করা আর দিন শেষে তাকে সুরক্ষিত তার বাড়ি পৌঁছে দেওয়া তার রুটিনে পরিনত হয়েছে। রিমিও এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা হলেই এক অধীর আগ্রহে সে রুদ্রর উপস্থিতি কামনা করে। কাজ শেষে রুদ্র তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করে থাকে।

এই তিন দিনে, তিন জোড়া পাখির, তিনটি আলাদা জগতের সৃষ্টি হয়েছে।

___________

অক্টোবর ১ তারিখ~

চৌধুরী বাড়িতে মিরায়ার ঘরে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধের কারণ তুচ্ছ হলেও প্রতিদ্বন্দ্বি দুজন বেশ কোট্টর। সোরায়ার নবীনবরণ আজ, জুঁইয়ের কথা মতো তাকে শাড়ি পড়তে হবে। এইদিকে না সে নিজে শাড়ি পড়তে পারে আর না মিরায়া। সোরায়া ভোর সকালে উঠেই একটা গোল্ডেন আর বেগুনি রংয়ের শাড়ি নিয়ে মিরায়ার ঘরে হাজির তাকে শাড়ি পড়িয়ে দেওয়ার আবদার নিয়ে। এইদিকে দুইজনের হাত একসাথে মাথায়। ইউটিউব থেকে ভিডিও দেখেও পারছে না দুইজন মিলে। মিরায়া যেভাবে পড়াচ্ছে তা সোরায়ার ভালো লাগছে না আবার সোরায়া যেভাবে বলছে মিরায়া ওইভাবে পড়াতে পারছে না।

ওদের চেঁচামেচি তে পুরো বাড়ি মাথায় উঠার উপক্রম। তখনি রায়ানের কল এলো মিরায়ার ফোনে। এই মাত্র অফিস থেকে বাড়ি ফিরেছে সে। রাতে মিরায়ার সাথে কথা না বলে সে ঘুমাতে পারে না তাই বাংলাদেশের সময়ে ভোর হলেও সে মিরায়াকে কল করে এইদিকে মিরায়াও অপেক্ষায় থাকে রায়ানের কলের।

রায়ানের কল দেখে সোরায়াকে মিরায়া ধমক দেয় হালকা-

"বনু চুপ থাক একটু আমি পড়িয়ে দিচ্ছি আগে কলটা রিসিভ করে কথা বলে নেই।"

সোরায়া রেগে মুখ ফুলিয়ে বিছানায় বসে পড়ে বলল-"এখন পিরিতি করবে দুইজনে মিলে। এই দিকে আমি ব্লাউজ, পেটিকোট এ বসে আছি তার খেয়াল নেই , ধুর বাল। জুঁই টারে গিয়ে আগে একটা ঘুসি মারবো। ওইটার জন্যই এই শাড়ি নিয়ে ঝামেলা।"

মিরায়া কল রিসিভ করতেই রায়ান কথা বলল-"হাই! মাই হার্ট-বার্ড। কি করো বেইবি?"

রায়ান মিরায়াকে এসব নামে ডেকেই কথা বলে তাই আর মিরায়া এগুলো পাত্তা দেয় না।

মিরায়া হাঁফ ছেড়ে বলল-"শাড়ি নিয়ে যুদ্ধ করছি।"

রায়ান হকচকিয়ে সোজা হয়ে গম্ভীর মুখে প্রশ্ন করে-

"শাড়ি? শাড়ি কেন? শাড়ি পড়ে কই যাবি তুই?"

মিরায়া কপাল কুঁচকে বলল-"আমি না বনু। সোরা পড়বে আজ নবীন বরণের জন্য। আমি তো শাড়ি পড়িনা। এখন অব্দি কখনো পড়ি নি।"

রায়ান নিঃশ্বাস ফেলে এবার শান্ত গলায় বলল-"গুড, বেইবি। এই জন্যই তো তোমায় এত...! যাক গে একবারে বলতে চড়ুই পাখি পড়বে তাহলেই হতো। আমার আত্মা বের হয়ে যাচ্ছিলো আর একটুর জন্য।"

মিরায়া বিরক্তিতে বলল-"নাটক কম করেন পিও। আত্মা চলে যাওয়ার কি আছে। সামান্য শাড়িই তো। আর বড় কথা আমি শাড়ি পড়তে পারি না আর না পড়াতে পারি। বনুকেও পড়াতে পারছি না।"

রায়ান-"আম্মুকে ডাকো। আম্মু পড়িয়ে দেবে। তোমার মাথায় প্রেশার নিও না ওই টুকু মাথা পড়ে নষ্ট হয়ে গেলে কি করবো।"

মিরায়া রায়ানের টিটকারী ঠিকই বুঝলো সাথে উত্তর ও তেমন দিলো-"ওমা কেন আপনার মাথা আছে কি করতে আমাকে নিজের মাথাটা গিফট করে দিয়েন।"

রায়ান মুচকি হেসে বলল -"ওকে ওকে। বাদ দেও এবার একটু প্রেম করি আসো।"

মিরায়া রেগে-"ওই মিয়া মজা করেন আপনার সাথে কি আমি প্রেম করি?"

সোরায়া চরম বিরক্ত হয়ে বিছানা থেকে উঠে মিরায়ার ফোঁটা টেনে নিয়ে রায়ানকে বলল-"ভাইয়া, যত পিরিতি আছে দেশে ফিরে দেখিও কেমন। আমি আপুকে ম্যানেজ করে দিবো নি এখন রাখো।"

মিরায়া সোরায়ার থেকে ফোনটা টেনে নিয়ে বলল-

"কোনো ম্যানেজ টেনেজ হবো না আমি। আপনি ফোন রাখুন।"

রায়ান বুঝতে পারলো আজকে আর তার বউকে সে পাচ্ছে না। শালিটা এইভাবে ব্যস্ত করে রেখেছে তার বউকে। রায়ান কেবল সোরায়ার চিন্তায় মিরায়াকে সাবধান করলো-

"আচ্ছা রাখছি। কিন্তু শুনো, ভালো করে শাড়ি পড়াবে। আর সাবধানে থাকতে বলবে। দিন কাল ভালো না আর মেয়ে মানুষ শাড়িতে আরো ভয়ংকর ব্যাপার সেপার। ওকে বুঝিয়ে বলে দিও।"

মিরায়া একবার সোরায়ার দিকে তাকালো রায়ানের কথা যথার্থ তা সে জানে তাই সম্মতি জানিয়ে বলল-"আচ্ছা বুঝিয়ে বলব।"

রায়ান হতাশায় শ্বাস ফেলে -"ওকে দেন ভাই বেইবি। সময় পেলে কল কোরো কেমন।"

মিরায়া "হুম" বলে উত্তর দিয়ে কলটা কেটে আবার শাড়ি পড়ানোর মিশনে লেগে পড়লো।

দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর শাড়ি পড়ানো শেষ হলে মিরায়া সোরায়াকে পা থেকে মাথা অব্দি একবার দেখে নিল সব ঠিক আছে কিনা। সোরায়া একবার ঘুরে মিরায়াকে দেখালো সাথে সাথে মিরায়ার চোখ গেল সোরায়ার ব্লাউজের পিছন দিকে এতোক্ষণ খেয়াল করেনি শাড়ি পড়ানোর চক্করে। মিরায়া সোরায়াকে ঘুরিয়ে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এইটা কি?" (ব্লাউজ এর পিছন দিকের গলা একটু বড়ো)

সোরায়া ভাব নিয়ে ঘুরে মিরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল কারিনা কাপুরের পু ক্যারেক্টার এর মতো করে-

"ইটস ব্যাক লেস।"

মিরায়া সাথে সাথে মাথায় গাট্টা মেরে বলল-

"ব্যাকলেস তোর ব্যাগে ঢুকা ছেমড়ি। এসব পড়ে আমি তোকে বাইরে যেতে দিব না। নবীন বরণে যাওয়া লাগবে না ঘরে থাক।"

সোরায়া আবার মুখ ফুলিয়ে বলল-

"আমি কি করবো আমার আর কোন ব্লাউজ নেই এইটা ছাড়া। আমার সোনা আপু প্লিজ প্লিজ প্লিজ প্লিজ এমন করো না আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখবো। প্রমিস। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে আমি যাই। টাটা।"

মিরায়া-"সোরা! বনু! শোন। আচ্ছা সাবধানে যা। খেয়াল রাখিস।"

সোরায়া দরজা দিয়ে বের হতে হতে-"ওকে আপু। খেয়াল রাখবো। টাটা।"

মিরায়া আর কি করবে , ছোট বোনটা বড় হয়ে গেছে চাইলেও কি আর সামলানো যায় বড় হয়ে গেলে। মিরায়া আর বেশি চিন্তা না করে শুধু মনে মনে বলল-"আল্লাহ আমার বোনটা ছোট, ওকে সামলে নিও।"

____________

সোরায়ার কলেজ~

কলেজে নবীন বরণের আনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। জুঁই সোরায়ার জন্য অপেক্ষা করছে কলেজে কিন্তু সোরায়া এখনো আসে নি। মাহির স্টেজের উপর, যেহেতু তার ক্লাস নতুন একাদশ শ্রেণি তাই আজকে আনুষ্ঠানের পরিচালনার দায়িত্ব তারই। স্টেজের উপর দাঁড়িয়ে সে আনমনে সোরায়ার কথাই ভাবছিল।

-"এখনো মেয়েটা এলো না কেন? আজকে কি আসবে না?"

কলেজ হেড এসে মাহির কে বলল-

"স্যার আনুষ্ঠান শুরু করুন এবার। সময় যাচ্ছে।"

মাহির মাথা নেড়ে মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে মাইকে কয়েকবার টোকা দিয়ে মাইক চলছে কিনা তা দেখে নিল। তারপর সবাইকে আমন্ত্রণ জানালো কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে। এরই মাঝে হঠাৎ অডিটোরিয়াম এর দরজাটা খুলে সোরায়া প্রবেশ করলো। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত সকল ছাত্র-ছাত্রী টিচার্স আর স্টেজে দাঁড়িয়ে থাকা মাহির সকলে একসাথে সোরায়ার দিকে তাকালো।

আজ প্রথমবার সে সোরায়াকে শাড়িতে দেখছে—হালকা লিপস্টিক, কাজল কালো চোখ, বেগুনি রঙের সিল্ক, পাড়ে সোনালি কাজ। চুলগুলো খোলা, বাতাসে আলতো দোল খাচ্ছে, কপালে ছোট্ট একটা টিপ, আর ঠোঁটে খুবই হালকা হাসি—যেন নিঃশব্দে বুকে ঝড় তুলছে। মাহিরের চোখ আটকে গেল ঠিক ওখানেই। সে যেন বুঝতেই পারছিল না, তাকাবে কি না—কিন্তু চোখের দৃষ্টি ফিরছে না কিছুতেই।

সোরায়া ধীরে পায়ে এগিয়ে জুঁই য়ের পাশে এসে দাঁড়াল।

জুঁই-"দোস্ত তোর দেরি হচ্ছিল দেখে এতো রেগে ছিলাম। কিন্তু এখন তোকে দেখে রাগ চলে গেছে। কি অপূর্ব লাগছে তোকে।"

সোরায়া মিষ্টি হেসে বলল-"যাহ্! কি যে বলিস। মোর শরম করে।(ঢং করে বলল)

জুঁই আর সে দুইজনেই হাসলো।

যখন পাশে জুঁইয়ের সঙ্গে সোরায়া কথা বলছে, তখন তার ঠোঁটের নরম বাঁক, চোখের কোণে আলতো হাসি—সবই মাহিরের চোখে ধরা পড়ছে স্পষ্টভাবে। তার মনে হলো, এই মেয়েটা যেন আজ পুরো আলোর ছায়ায় মিশে গেছে—মায়াবী, শান্ত, অথচ নিজের উপস্থিতিতেই সবার দৃষ্টি কেড়ে নিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য মাহিরের বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত কম্পন ছড়িয়ে পড়ল। সে বুঝল—এই মুগ্ধতা স্রেফ সাজগোজের জন্য নয়, কিছু গভীর, কিছু অচেনা অনুভূতির জন্ম হচ্ছে ভিতরে ভিতরে। বুকে চিনচিন মৃদু ব্যাথার অনুভূতি।

মাহির মাইক অন রাখা অবস্থায় আওড়ালো নিজের অজান্তেই-"মারাত্মক।"

সবাই হেসে উঠলো। সোরায়া জুঁই বাকি সবাই মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির লজ্জায় মাটি খুঁড়ে নিচে চলে যাবে এমন অবস্থা। অডিটোরিয়াম রুমের সবাই একসাথে প্রশ্ন করলো-

"কি মারাত্মক স্যার?"

মাহির লজ্জায় হেঁসে কথা কাটানোর জন্য বলল-

"তোমাদের উপস্থিতি.. মারাত্মক।"

সবাই আবার হেসে উঠলো। আর সোরায়া? সে হয়তো বুঝতেই পারছে না, তার প্রতিটি হাসির ছায়া, প্রতিটি চুলের হাওয়ায় দোল—একজনকে নিঃশব্দে কেমনভাবে বদলে দিচ্ছে। চাওয়া-না-চাওয়ার মাঝেই, ওই মুহূর্তটুকুতে মাহিরের কাছে সোরায়া যেন এক অনাবিল কবিতা হয়ে উঠল।

পুরো অনুষ্ঠান তখন নিজের গতিতে এগিয়ে চলেছে—হাসি, তালি, সঙ্গীত, আর নবীনদের চঞ্চল উচ্ছ্বাসে ভরা এক বিকেল। কিন্তু মাহির যেন সব শব্দের ভেতর থেকেও আলাদা একটা নীরবতায় বন্দি। মঞ্চে গান চলছে, বক্তারা কথা বলছে, সিনিয়ররা মজা করছে—তবু তার চোখ খুঁজে ফিরছে একটাই মুখ, সোরায়া।

সে নিজের অজান্তেই বারবার তাকিয়ে যাচ্ছে—কখনও সোরায়ার চুলে আলো পড়ছে, কখনও তার হাসির কোণে লাজুক একটা ঝিলিক। বুকের ভেতর কোথাও এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা উঠছে, কিন্তু সে নিজেও জানে না এর মানে কী। মাথায় হাজারো ভাবনা, অথচ হৃদয়ে একটা অচেনা ঝড়।

প্রায় আধঘণ্টা পর অনুষ্ঠানটা শেষের পথে। উপস্থাপক মাইকে ঘোষণা দিলেন,

> “যে কোনো নবীন শিক্ষার্থী চাইলে এখন পারফর্ম করতে পারে—গান, নাচ বা কবিতা—যা ইচ্ছা!”

এমন সময়ে সোরায়ার পাশের সিট থেকে হঠাৎ জুঁই মজার ছলে সোরায়ার হাত তুলে ধরল,

—“এই যে, সোরায়া নাচবে!”

পুরো হলঘরে হাসির রোল পড়ল। সোরায়া মুহূর্তে থমকে গেল, চোখ বড় বড় করে বলল,

—“তুই পাগল নাকি জুঁই! এখানে এতজন মানুষ! আমার হাত তুললি কেন! আমি না করবো কিভাবে এখন।”

জুই ঠোঁটে দুষ্টু হাসি নিয়ে বলল,

—“তোকেই তো কেউ না করতে বলেনি! এখন গিয়ে স্টেজে পারফর্ম কর ! তোকে অনেক সুন্দর লাগছে যে তাই বলছি কর না তুই অনেক ভালো নাচিস”

এরপর একসাথে হলঘরে আওয়াজ উঠল—

“সোরা! সোরা! সোরা!”

তালির শব্দে যেন ছাদের ভেতর ধ্বনি প্রতিধ্বনি তুলল।

মাহির দাঁড়িয়ে আছে একটু দূরে, ভিড়ের মাঝখানে, কিন্তু চোখ শুধু সোরায়ার দিকেই। তার দুই হাত বুকের সামনে ক্রস করে বাঁধা, মুখে গম্ভীর শান্ত ভাব—তবুও চোখের গভীরে একটা অচেনা আলো জ্বলছে।

সোরায়া এক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থাকে। ঠোঁটে শুকনো হাসি, বুক ধকধক করছে। অবশেষে গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে যায় স্টেজে।

কিছু সময়ের মাঝেই গান বাজতে শুরু করে—

> “মায়াবনো বিহারিণী হরিণী…

গহন স্বপনও সঞ্চারিনী…

কেন তার ধরিবারে করি পণ অকারণ..

মায়াবনো বিহারিনী..!"

গান শুরু হতেই সোরায়া যেন নিজের জগত বদলে ফেলল। তার নাচে এমন একটা স্বাভাবিক সৌন্দর্য, যেন বাতাসও থমকে গেছে। চোখে হালকা চাওনি, ঠোঁটে নরম হাসি, গানের তালে কোমরের দোল, হাতের মুভমেন্টে যেন অনাবিল লাবণ্য।

মাহির পলকহীন চোখে দেখছে—

প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি ঘূর্ণন যেন কোনো নিঃশব্দ মন্ত্র উচ্চারণ করছে। আলোয় ভেজা মঞ্চে তার নাচে এক অপার্থিব মায়া তৈরি হয়েছে।

তালির শব্দে হল কেঁপে উঠছে, কিন্তু মাহিরের মনে যেন শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। তার ভেতর কেবল একটাই অনুভূতি বাজছে—

“এই মেয়েটাকে এভাবে আগে কখনও দেখিনি…

এ যেন এক জাদু। মাহির কি ভাবছিস এগুলো তোর ছাত্রী ও।”

গান শেষ হলে সোরায়া হালকা নিঃশ্বাস ফেলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। পুরো হল তালি দিয়ে ভরে যায়। আর মাহিরের বুকের ভিতর সেই অজানা ঝড়—এবার যেন আরও জোরে বইতে থাকে।

নাচ শেষ হওয়ার পর পুরো হলঘর যেন এক উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে, কেউ কেউ শিস দিচ্ছে, আবার কেউ ভিডিও করছে। সোরায়া লজ্জায় মুখ নিচু করে মঞ্চ থেকে নেমে এলো—চুলের গোড়ায় ঘাম, গাল লাল হয়ে আছে, কিন্তু চোখে ঝিলিক এখনো টলটল করছে।

তারপর অনুষ্ঠান শেষের ঘোষণা এলো। হলঘরের একপাশে টেবিল সাজানো, সবার হাতে প্যাকেট করে নাস্তা বিলানো হচ্ছে—সিঙ্গারা, রোল, আর জুসের বোতল। হাসি-আড্ডায় ভরে উঠল চারদিক।

এই ফাঁকে দেখা গেল, সোরায়াকে ঘিরে একটা ছোট ভিড় জমে গেছে। কয়েকজন ছেলে এগিয়ে গিয়ে কথা বলছে—হাসছে, জোক করছে, কেউ কেউ ফোন বের করেছে। কারও মুখে শোনা যাচ্ছে,

— “একটু নাম্বারটা দাও না প্লিজ, দরকারে যোগাযোগ করব।”

— “তোমার আইডিটার নাম কী? ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাবো।”

— “তুমি তো দারুন নাচো! তোমার ভিডিওটা আপলোড করতে পারি?”

সোরায়া প্রথমে হেসে হেসে এড়িয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু মুহূর্তে ভিড়টা বড় হয়ে গেল। সে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল, চোখে পড়ল — চারপাশে অনেকেই তাকিয়ে আছে, হাসছে, কেউ ছবি তুলছে। চোখেমুখে এখন স্পষ্ট লজ্জা আর অস্বস্তির ছাপ। সে মৃদু গলায় বলল,

— “না না, দরকার নেই… আমি নাম্বার দিই না কাউকে…”

এই পুরো ঘটনাটা দূর থেকে খেয়াল করছিল মাহির।

হাতে নাস্তার প্যাকেট, কিন্তু চোখ আটকে আছে সোরায়ার দিকে। সে পাশ ফিরে জুঁইকে ডেকে জিজ্ঞেস করল,

— “ওখানে কি হচ্ছে?”

জুই অবাক চোখে তাকিয়ে বলল,

— “স্যার আসলে। সবাই ওর নাম্বার চাইছে। বেচারী একদম কিছু বুঝে উঠতে পারছে না, শুধু চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।”

মাহিরের বুকের ভেতর কিছু একটা জ্বলে উঠল—একটা তীব্র, দহনময় অনুভূতি। রাগ? হ্যাঁ, কিন্তু শুধু রাগ নয়, আরও গভীর কিছু—একটা অদ্ভুত জেলাসি, অধিকারবোধ, আর ভিতরে জমে থাকা অস্থিরতা। অকারণেই জেগে উঠছে। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে কঠিন হয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল—একটা ছেলেও আছে ভিড়ের মাঝে, অন্যদের থেকে একটু বেশি এগিয়ে।

চোখে একরকম বিকৃত দৃষ্টি—সেই দৃষ্টি কোনো শ্রদ্ধা নয়, একদমই নয়। তার চাওয়ায় ছিল একধরনের অসভ্য লালসা।

ছেলেটা হঠাৎ আড়চোখে তাকিয়ে, ভিড়ের ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা সোরায়ার পিঠের দিকে এগিয়ে এলো,তারপর “ভুলে” বলে ইচ্ছে করেই শরীর ঠেসে দিয়ে হালকা ধাক্কা দিল।

সোরায়া হতভম্ব হয়ে পেছনে ঘুরল—

— “এই! আপনি…”

ছেলেটা ঠোঁট বেকে বলল,

— “ওপস, ভুলে লেগে গেছে। সরি।”

ঠিক তখনই মাহিরের বুকের ভেতর যেন একটা আগুন জ্বলে উঠল। তার চোখে সেই মুহূর্তে আলো ঝলসে উঠল—

যেন কেউ তার মনের গভীর কোনো শিরা ছিঁড়ে দিয়েছে।

তার মুখের পেশিগুলো টান টান হয়ে গেল, নিঃশ্বাস ভারী।

রাগের তাপে তার চোখে এখন অন্ধকার জমে উঠেছে—

যেন আগ্নেয়গিরির ভিতরে লাভা ফুঁসে উঠছে, আর মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে ফেটে পড়বে। সে একদম হন্তদন্ত হয়ে ভিড়ের ভেতর ঢুকে গেল। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল—তার মুখের সেই রাগের তীব্রতা, যেন এক মুহূর্তেই পুরো পরিবেশ নিস্তব্ধ করে দিল।

ছেলেটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, মাহির তার গলা চেপে ধরে পেছনের দিকে টেনে নিল। এক ঝটকায় তার মুখের এক পাশে সজোরে থাপ্পর দিল—"ঠাস!"

শব্দটা যেন চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলল। ছেলেটা মাটিতে পড়ে গেল, মুখে শক আর লজ্জা।

সবাই স্তব্ধ। আর মাহির নিচু হয়ে তার চোখে চোখ রেখে ঠান্ডা, গম্ভীর গলায় বলল—

“ওপস… এটা একদম ভুলে লাগেনি। আর এটা নট সরি।”

তার কণ্ঠে এমন একটা দৃঢ়তা ছিল, যেন শব্দগুলো মাটি কাঁপিয়ে দিল।এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের বাতাসও থেমে গেল—কেউ হাসছে না, কেউ তালি দিচ্ছে না, সবাই নিঃশব্দ।

সোরায়া এক পা এগিয়ে এল, মুখে আতঙ্ক আর বিস্ময় একসাথে। তার চোখে পড়ল মাহিরের মুখ—চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি আগুনের মতো, তবুও ভিতরে কোথাও একটা নরম কম্পন লুকানো। সে বুঝল না হঠাৎ কি হলো।

জুই পেছন থেকে ফিসফিসিয়ে বলল,

— “স্যারের মুখটা দেখেছিস? উনা চোখে রাগ না, অন্য কিছু জ্বলছে।”

মাহির একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল, ছেলেটার দিকে আর তাকাল না। ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সোরায়ার দিকে তাকাল,

চোখে কেবল একটাই কথা—

"কেন? কেন? কেন এতো অস্বাভাবিক সুন্দর হতে হবে তোমাকে?"

মাহির নিজের রাগ গিলে নিল সোরায়া দিকে তাকিয়ে শ্বাস নিয়ে। সোরায়ার শাড়ির আঁচল পিছন দিক থেকে ঘুরিয়ে এনে তার পিঠটা ঢেকে কাঁধ ঢেকে সামনে এনে ওর হাতে দিল আঁচলটা।

সোরায়া কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না।

শুধু এক অচেনা কৃতজ্ঞতা আর কাঁপা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল—

যে দৃষ্টি বোঝাতে চায় হাজারো অব্যক্ত অনুভূতি।

আর সেই মুহূর্তে,মাহিরের ভিতরের ঝড়টা থেমে গেল না—

বরং আরও গভীর হয়ে বুকের ভেতর গেঁথে রইল এক নতুন অস্থিরতা…যার নাম হয়তো ভালো লাগা।

চলবে..

পাখিরা আমি দুঃখিত তাই এত বড় একটা পর্ব দিচ্ছি তোমাদের দুই অংশে। আপ্পি কে ভুল বুঝলো না আমার সমস্যা ছিল এই কয়দিন এখন রিগুলার হয়ে যাবো ইনশাল্লাহ।

কমেন্টে জানাও কেমন লাগলো। আশা করি ভালো লাগবে অনেক কষ্ট করে লিখেছি। 😅 Love you pakhis ❤️ 🥰 🤗

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন