#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_75 1st
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরার পা টা তার বুকের উপর থেকে সরিয়ে নিজের কাঁধে রেখে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
"এবার একটু বেশি মানিয়েছে।"
মিরার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা দুষ্টু হাসিটা তৎক্ষণাৎ মিলিয়ে গেল। সেকেন্ডের ব্যবধানে নিজের পা রায়ানের কাঁধ থেকে সরিয়ে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে আমতা আমতা করে বলল-
"দে..দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমি যাই দেখে আসি বনুর রেডি হওয়া হলো কিনা।"
কথাটা বলে যেই মিরা দরজার দিকে পা বাড়াবে ঠিক তখনই রায়ান পিছন থেকে মিরাকে নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে জাপ্টে ধরলো। মিরা নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো যেন এই ভয়টাই পাচ্ছিল। রায়ান আলতো করে মিরার কানের লতি তে একটা ছোট চুমু দিয়ে মিরার ঘাড়ের নিজের নাক ঘষলো আর ফিসফিস করে হাস্কি গলায় বলল-
"অপূর্ব লাগছে...!"
মিরার চোখের চাহনি সামান্য নরম হয়ে এলো মুহূর্তে। এক সেকেন্ডের সূক্ষ্ম সময়ের ব্যবধানে বাক্যের পূর্ণতা নিয়ে একটি শব্দ উচ্চারিত হয়ে তার কানে ভেসে এলো একই কণ্ঠ হতে-
"বরাবরের মতো।"
মিরা তার উদরের উপর আবদ্ধ রায়ানের দুহাতের বাঁধনের উপর হাত রেখে নরম গলায় মিনতি করলো-
"ছেঁড়ে দিন।"
রায়ান সাথে সাথে মিরার কাঁধে মুখ গুঁজে মাথা ঝাঁকিয়ে আওয়াজ করলো-"উঁহু..!"
বোঝাতে চাইলো তার এখন ছাড়তে ইচ্ছে করছে না। মিরা কিছু বলার আগেই রায়ান মিরাকে নিজের মুখোমুখি ঘুরিয়ে নিয়ে মেয়েটার গলার মুখ ডুবিয়ে দিলো। প্রাণ ভরে একটা লম্বা নিঃশ্বাসের দ্বারা মিরার শরীরের সুবাস নিজের মাঝে টেনে নিয়ে গরম প্রশ্বাস ফেললো। মিরা খানিকটা অস্বস্তি তে পড়ে রায়ানের চুলের ভাজে আঙ্গুল গলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে আবারো মিনমিনিয়ে বলল-
"হয়েছে তো..এবার ছেঁড়ে দিন।"
-"উঁহু..!"
রায়ান জেদ ধরে মিরার গলার ভাঁজে মাথা না সূচক নাড়লো। মিরা অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলো। রায়ানের উচ্চতা খুব বেশি হওয়ায় মেয়েটার গলা বাঁকা হয়ে আছে সেই কখন থেকে অথচ রায়ান ছাড়ার নাম গন্ধ ও নিচ্ছে না। মিরা একদম না পারতে আবারো করুন সুরে বলল-
"প্লিজ... ছেঁড়ে দিন না।"
রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবার মেনে নিল মিরার আবদার-"আচ্ছা।"
-"সত্যি সত্যি ছেঁড়ে দেবেন?"
মনের অজান্তেই মিরা মুখ ফসকে প্রশ্ন টা করে বসলো। ছাড়া পাওয়ার আশায় এতো মিনতি করার পর ছেড়ে দেওয়ার কথায় বউয়ের এমন প্রশ্নে রায়ান মুচকি হাসলো। মেয়েটার গলায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে মিষ্টি সুরে আওয়াজ করলো-
"উহু..!"
মিরা যেন ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারলো না কি বলল সে তার ঠিক কি হলো তার সাথে। থতমত খেয়ে রায়ান থেকে দ্রুততার সাথে নিজেকে পৃথক করে নিয়ে ঠোঁট উল্টে দ্বিধায় রায়ানকে উদ্দেশ্যে করে প্রশ্ন করলো-
"আচ্ছা..আপনি আমাকে দেখলেই এমন করেন কেন? কি হয়ে যায় আপনার?"
রায়ান নিজের মাথা চুলকে একটু লাজুক ভাব ধরে রসিকতায় মিরার চার দিক প্রদক্ষিণ করতে করতে গাইলো-
"যৌবনে লাগাইছো আমার..! এই দেহে আগুন 🔥
তোর ছোঁয়ায় আসে আমার অঙ্গেতে ফাগুন..🫠"
মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"এইটা কেমন কথা? এই গান তো আগে শুনিই নি।"
রায়ান মিরার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে তার থুতনি ধরে বলল-
"এই টা তো আমার অন্তরের কথা হৃদপাখি। শুনবা কিভাবে!"
মিরা রায়ানের কথায় আর পাত্তা দিল না। এই লোকের মুখে কোনো কালেই লাগাম ছিল না। মজার বাইরে গিয়ে রায়ান গম্ভীর গলায় মিরাকে প্রশ্ন করলো-
"আজকে সারাদিন কাজে ব্যস্ত থাকায় তোমার খাওয়া দাওয়ার খেয়াল রাখা হয় নি। সারা দিন, কখন কি কি খেয়েছ, আর কি কি খাও নি সবকিছুর লিস্ট বলো তো পাখি।"
মিরা রায়ানের প্রশ্নে থ মেরে গেল। এখন কি জবাব দেবে সে? সারাদিনে এতো আনন্দ খুশির মাঝে তা তার তেমন কিছু খাওয়াই হয় নি বলার মতো। এইটা রায়ান কে বললে আজ আর তার নিচে যেতে হবে না। কিন্তু মিথ্যা বলার মতো ও সাহস নেই।
-"কি হলো? বলো। কি কি খেয়েছ আজ?"
মিরা কথাটা ধামাচাপা দিতে গলার জোর দেখালো-
"কি অদ্ভুত! মনে আছে নাকি কি কি খেয়েছি। কত কিছুই তো খেলাম। গোটা বাড়ি জুড়েই তো খাবার। অনেক কিছু খেয়েছি। এতো মনে নেই।"
রায়ান মিরার গলায় স্বর শুনে চোখ দুটো বাজ পাখির মতো ছোট ছোট করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"গোটা বাড়ি জুড়েই খাবার তাই না? এতো খেয়েছ যে মনেই নেই। ওয়াও। এতো লক্ষ্মী মা পেয়ে তো আমার প্রিন্সেস ধণ্য। সারাদিন সে খাবার পেয়েছে।"
বাচ্চার কথা উঠতেই মিরা কেমন চুপ করে গেল। সত্যিই তো, যেহেতু সে আজ তেমন খায় নি তার মানে বাচ্চা টাও খাবার খায় নি ভালো করে। মিরা আনমনে পেটের উপর হাত রেখে মনে মনে জিজ্ঞেস করলো তার ভেতরের ছোট প্রাণ টাকে-
"মাম্মা..তোমার কি খিদে পেয়েছে?"
অদ্ভুত ভাবেই মিরার কিছু খেতে ইচ্ছে করলো তখন। রায়ান মিরাকে সন্দেহ ভরা নজরে কেবল পর্যবেক্ষণ করছে। মেয়েটা যে খাই নি সেটা তার মুখের ভাব নমুনায় স্পষ্ট। রায়ান ভারী কণ্ঠে মিরাকে আদেশ মূলক গলায় বলল-
"আমার দিকে তাকাও।"
মিরা পিটপিট করে চোখ তুলে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ান হাফ ছেঁড়ে নিজের হাত মুঠো করে সংযম রেখে বিড়বিড় করলো-
"All the time..all the fucking time..এমন ভাবে মায়াবী চোখে তাকাবে- একটু যে বোকবো তারও সুযোগ থাকে না। একটু ভালোবেসে আদর করবো সেটুকুও পারছি না। কি এক জ্বালার মধ্যে আছি।"
রায়ান মিরাকে বাড়তি আর কিছু বলার জন্য সময় নষ্ট করলো না। বিছানার পাশের সাইড টেবিলে থেকে একটা আপেল এনে মিরার মুখের সামনে ধরল। মিরা পলক ফেলে একবার রায়ান কে আর আপেলটাকে দেখলো। রায়ান মেজাজ দেখিয়ে ধমক দিয়ে বলল-
"হা করে তাকিয়ে না থেকে এটা হাতে নাও।"
মিরা হকচকিয়ে উঠে আপেল টা রায়ানের হাত থেকে নিয়ে নিল। এবার আপেল টা নিয়ে চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। রায়ান রাগে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে জোরে চেঁচিয়ে বলল-
"হাতে নিয়ে দাড়িয়ে থাকার জন্য দেই নি ওটা। খাওওও..!"
মিরা রায়ানের চেঁচানো তে ভয়ে কেঁপে উঠলো। এই কেঁদে দেবে দেবে এমন ভাব। চোখের গন্ডি তে অশ্রু কণারা খেলা করছে। মিরা আপেল টায় কামড় দিতে যাবে ঠিক তখনই থেমে গিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলে বসলো-
"এখন আপেল কামড় দিতে গেলে লিপস্টিক টা নষ্ট হয়ে যাবে তো।"
মিরার এমন কথায় রায়ান রাগী নজরে মেয়েটার ঠোঁটের দিকে চাইলো। রায়ানের ইচ্ছে করলো তখনি সেই লিপস্টিকে রাঙা ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে সব সাজ এলোমেলো করে দিতে। মেয়েটার গায়ের শাড়ির প্রত্যেকটা ভাঁজ এখন অসহ্য লাগছে তার। এক কদম এগিয়ে গিয়ে রায়ানের পা থেমে গেল। মিরার ছলছল চোখে চোখ পড়তেই খুব মায়া লাগলো তার। এখন উল্টাপাল্টা কিছু করে বসলে কান্নাকাটিতে কোনো ছাড় হবে না তা বোঝাই যাচ্ছে। এমন না সে আদর করার সময় মিরার কান্না তার উপর খুব প্রভাব ফেলে। কিন্তু এখন বিষয়টা আলাদা। মায়ের কান্না করা বাচ্চার জন্য ঠিক না। মূলত তাই এতো সচেতনতা ছেলেটার মাঝে।
মিরা একটু ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। না জানি এই বেপরোয়া পুরুষ টা কি করে বসে এখন। রায়ান মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাত থেকে আপেল টা নিয়ে নিল। মিরা কিছু টা অবাক চোখে রায়ানের দিকে তাকাতেই রায়ানের কঠোর কণ্ঠ হতে প্রশ্ন এলো-
"চিবোতে পারবে নাকি দাঁতেও লিপস্টিক লাগিয়েছ?"
মিরা মাথা উঁচু করে নিয়ে শান্ত জবাব দিল-"পারবো।"
রায়ান ফলের ঝুড়ির দিকে তাকালো সেখানে কোনো ছুড়ি নেই। ইচ্ছে করেই রাখা হয়নি, যদি কোনো অঘটন ঘটে! তাছাড়া মিরা চট্টগ্রামে আসার পর থেকে রায়ানের ভয়ে বাধ্য হয়েই তার এনে দেওয়া ঝুড়ি ভর্তি ফল খায়। যেহেতু কামড়ে কামড়েই খায়, তাই ছুড়ির প্রয়োজন ও পড়ে না। রায়ান মাথা ঠাণ্ডা করে নিজে আপেলে কামড় দিয়ে কিছু টা অংশ কেটে নিয়ে সেটা মুখ থেকে বের করে মিরার মুখের দিকে ধরে বলল-
"আআআ করো?"
মিরা কোনো প্রকার তর্ক না করে হা করলো। এভাবেই কামড়ে কামড়ে বউকে পুরোটা আপেল খাইয়ে নিয়ে আদেশ মূলক কন্ঠে বলল-
"নিচে গিয়ে চুপ চাপ এক কোণে গিয়ে বসো। আমি খাবার নিয়ে আসছি।"
মিরা ছাড় পেতেই রায়ানের থেকে ছুটে পালাতে চাইলে রায়ান সঙ্গে সঙ্গে মিরার কোমর এক হাতে জড়িয়ে ধরে মিরার কানের কাছে মুখ এনে হুমকির সুরে বলল-
"চলাচলের গতি বাড়লে, হাঁটার মতো অবস্থায় রাখবো না। You are a good mom right? Free advice..Be a good wife as well...ok?"
মিরার বুকে কেঁপে উঠলো রায়ানের কথায়। একটা শুকনো ঢোক গিলে মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে ধীরে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। মিরা যাওয়ার পর রায়ান বুকের বা পাশে হাত রেখে সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় ধপ করে শুয়ে পড়ে এলোপাথাড়ি হাত পা ছুড়ে মনের সব আবেগ চিৎকার করে বহিঃপ্রকাশ ঘটালো-
"Aaaahh..Why is she so pretty...? My heart is beating so hard..!"
মিরাকে উদ্দেশ্যে করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল-
"সময় আমারও আসবে। তখন তুমিও এমন ছটফট করবে আমার মতো দেখি নিও। কিন্তু ছাড়া পাবে না।"
_________
সাজ ঘর~
ভরা ঘরে একটা ফোন শব্দ করে উঠলো হঠাৎ। রিমি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সোরায়ার সাজ সম্পন্ন হতে দেখছে খুব মনোযোগ দিয়ে। আওয়াজ হওয়া ফোনটা তার উপলব্ধি হতেই সে দ্রুত ফোন টা হাতে তুলে নিল। রুদ্রর মেসেজ-
"একটু রুমে আসো। তাড়াতাড়ি দরকার আছে।"
রিমি একটু ভাবলো কি দরকার হতে পারে! একটা মেসেজ করে জিজ্ঞেস করলো-
"কেন? কি দরকার?"
সেকেন্ডের মাঝে রিপ্লাই এলো-
"হঠাৎ করে খুব বুকে ব্যাথা হচ্ছে। একটু আসো না।"
মেসেজ টা পড়তেই রিমির মন উতলা হয়ে উঠলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে সোরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"বনু, তুই রেডি হ কেমন। আমি একটু আসছি।"
সোরায়া চোখ বন্ধ রেখেই জিজ্ঞেস করলো-
"কোথায় যাচ্ছ? প্রথমে আপু চলে গেল এখন তুমিও চলে যাচ্ছো।"
রিমি দরজা চাপিয়ে দিতে দিতে বলল-
"তোরা ভাইয়া মেসেজ করেছে। কি যেন দরকার। আমি আসছি। তুই সাজ।"
রিমি চলে যেতেই সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করলো-
"হাহ্! যত্তসব নাটক..! বউ গুলো চোখের আড়াল হতেই দুই ভাইয়ের দরকারের শেষ নেই।"
একবার চোখ মেলে নিজের ফোনের স্ক্রিন অন করে দেখলো। কাঙ্ক্ষিত কোনো নোটিফিকেশন চোখে পড়লো না বলে হাসি মুখ টা বেজার করে আবার চোখ বন্ধ করে নিল।
___
-"কি হয়েছে আপনার? হঠাৎ বুকে ব্যাথা করছে কেন?"
হন্তদন্ত হয়ে রিমি ঘরে ঢুকে কারো উপস্থিতি উপলব্ধি করতে পারলো না। ফাঁকা ঘরটা পর্যবেক্ষণ করে যখনই রুদ্র কে ডাকতে যাবে তখনি একটা শক্ত বলিষ্ঠ হাত তার কোমর আঁকড়ে ধরল। কিছু বোঝার আগেই তার পিঠ গিয়ে ঠেকলো দরজার অপর পাশে। মিটিমিটি চোখ খুলতেই রুদ্র কে সামনে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মেয়েটা। কিন্তু এভাবে ভয় দেখানোর জন্য রুদ্রর কাঁধে জোরে আঘাত করতে গেলে রুদ্র ইশারায় রিমিকে তার হাতে থাকা ফোন দেখালো। সামান্য বোঝানোর চেষ্টা যে সে এখন কারো সাথে কলে আছে। রিমি স্থির হয়ে গেল। রুদ্র নিজের চোখজোড়া রিমির উপর আবদ্ধ রেখে ফোন কানে ধরে অপর পাশের কারো সাথে কথা বলতে থাকলো। রিমি দরজার সাথেই চেপে দাঁড়িয়ে- অথচ রুদ্র তার কোমরটা ও ছাড়ছে না। রিমির হঠাৎ মনে পড়লো রুদ্রর তাকে এখানে ডাকার কারণ- তার না বুকে ব্যাথ্যা করছে..! রিমির মাথায় আসতেই সে রুদ্রর বুকের উপর হাত রেখে খালি চোখেই কিছু একটা পর্যবেক্ষণ করতে চাইলো। ফোনে কথা বলার সময়, হঠাৎ রিমির স্পর্শে রুদ্র কিছু টা মুচকি হেঁসে রিমির মুখ বরাবর হেলে এলো। রিমি চমকে তার দিকে তাকাতেই রুদ্র অদ্ভুত ঘোর লাগানো চাহুনি যে তার চোখে চোখ রেখে তার বুকের উপর রাখা রিমির হাতটা আঁকড়ে ধরে ঠোঁটের কাছাকাছি এনে একটা নীরব চুমু দিল। কানে এখনো ফোনটা বিদ্যমান। রিমি লজ্জা নিজের হাত টেনে নিতে চাইলে রুদ্র শক্ত করে তার চুড়ি ভর্তি হাতটা ধরে রাখলো। চুড়ি ভেঙ্গে যেতে পারে ঠাওড় করে রুদ্র মেয়েটার হাত ছেড়ে দিলে মেয়েটা কোনো মতো ওই দরজায় চেপে থাকা অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সরে আসতে চাইলে তার কোমরের কাছে রুদ্রর হাতের বাঁধন আরো দৃঢ় হলো। রিমি চেয়েও আর সরে আসতে পারলো না। রুদ্র আলতো হাতে রিমির বুকের দিকের শাড়ির ভাঁজ ঠিক করে দিল। ডান পাশের ব্লাউজের নেক লাইনকা সোজা করলো। রিমি রুদ্রর এমন আদুরে আচরণে মুচকি হেঁসে রুদ্রর হাতের মৃদু জোরে আঘাত করে হাতটা নামিয়ে দিল। রুদ্রও ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ মুচকি হেসে রিমির গলায় মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফোনের অপর পাশের ব্যক্তির উদ্দেশ্যে জোড়ানো গলায় বলল-
"Cut the call for now.. I'll call you later.."
কথাটা বলে সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা ছুড়ে বিছানায় ফেলে দিল সে। এবার ভালো মতো স্বস্তি করে বউয়ের গলার ভাঁজে মুখ গুঁজে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল-
"উফফফ্, শান্তি...!"
রিমি তার সাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে রুদ্রকে কোনো মতো সামলে নেওয়ার চেষ্টায় জিজ্ঞেস করলো-
"বুকের কোথায় ব্যাথা করছে দেখি! হঠাৎ বুকে ব্যাথা হচ্ছে কেন? বেশি কষ্ট হচ্ছে?"
রুদ্র রিমির কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে নিজের মুখ তুলে হঠাৎ করে রিমিকে কোলে তুলে নিল। রিমি কিছু বলার আগেই তাকে বিছানার উপর শুইয়ে দিয়ে রুদ্র রিমির উপর উঠে শুয়ে পড়লো। বিছানার নিচে এখন মেয়েটার দমবন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। রুদ্র কে এমন অস্থির দেখে রিমি আর নিজের সাজ বা শাড়ি নিয়ে পরোয়া করলো না বরং নরম হাতে রুদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো আবার-
"না বললে বুঝবো কি করে, হুম? কি হয়েছে? কিছু জিজ্ঞেস করলাম তো..!"
রুদ্র অবুঝ কণ্ঠে বলল-
"অক্সিজেনের মাত্রা কম হয়ে গেছিল। শ্বাস আসছিলাম না।"
রিমি হকচকিয়ে গিয়ে বাঁকা চোখে রুদ্র্যর দিকে তাকিয়ে দ্বিধায় আওড়ালো-"কিহ্..!"
-"হুম, তাই তো তোমাকে ডাকলাম। একটু অক্সিজেন নিয়ে ছেড়ে দিবো প্রমিস। এখন নড়াচড়া করো না।"
রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলল- সে কি ভেবেছিল আর এই লোকের মাথায় কি! মেয়েটা রুদ্রর কথা মতো চুপ করে
শুয়ে রইলো, ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। বেশি কিছুক্ষণ এভাবে থেকে এক পর্যায়ে রিমি নরম কণ্ঠে বলল-
"আচ্ছা আপনি সত্যি বলছেন তো? কোনো সমস্যা হচ্ছে না আপনার?"
রিমি এখনো তার মিথ্যে বাহানা ধরে আছে দেখে রুদ্র হেঁসে উঠলো। রিমির উপর থেকে উঠে রিমির হাত ধরে তাকের বিছানার থেকে টেনে তুলতে তুলতে বলল-
"বুকে ব্যাথা উঠার মতো করে তো এখনো দেখতেই পারলাম না। আগে উঠো দেখে নিই।"
রিমি রুদ্রর আঁতকা টানে উঠে দাঁড়ালে রুদ্র এক পা পিছু হটে রিমিকে পা থেকে মাথা অব্দি পর্যবেক্ষণ করে দেখতে লাগলো। রিমি একটু অস্বস্তিতে নিজের শাড়ির ভাঁজ হাত দিয়ে ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। রুদ্র নিজের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে উঠলো রিমির দিকে তাকিয়ে থেকে। তারপর মজার এলেই একটু আনমনা ভাব নিয়ে ঠোঁটের উপর আঙ্গুল নাচিয়ে খুব ভাবুক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে বলল-
"উমম্, ঠিকঠাকই লাগছে। কিন্তু বুকে ব্যাথা করবে এমন না। So I think I am safe.."
কথাটা বলেই একটা হতাশা গ্রস্থ হাঁফ ছাড়ল সে। এই দিকে একটু আগেও রুদ্রর বুকে ব্যাথা করা নিয়ে চিন্তিত রিমি মুখ ফুলালো রুদ্রর বুকের ব্যাথা হচ্ছে না বলে। কি অদ্ভুত! বেচারি চেয়েও কিছু বলতে পারছে না আর না পারছে এই নিয়ে রাগ দেখাতে। রিমির ফুলকো লুচির মতো মুখটা অবলোকন হতেই রুদ্র ঠোঁটে ঠোঁট চেপে হাঁসি লুকিয়ে নিল। রিমির এখন বিন্দু মাত্র ও ইচ্ছে হচ্ছে না রুদ্রর মুখ দেখতে। তাই মেঘাচ্ছন্ন মনে গম্ভীর স্বরে বলল-
"যেহেতু আপনার কোনো সমস্যা হচ্ছে না আমারও এখানে আর কোনো দরকার বলে আমার মনে হচ্ছে না। আমি বরং আসি।"
মেয়েটা রাগ দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ দরজার দিকে হাঁটা ধরলো। রুদ্র জিভ কামড়ে দ্রুত পায়ে রিমির পিছনে গিয়ে তার শাড়ির আঁচল আঁকড়ে ধরলো। আঁচলে টান পড়তেই রিমি নিজ অবস্থানে থমকে গেল। রুদ্র এখন তাকে মানানোর চেষ্টা করবে তা আন্দাজ করে সোজা মুখ করেই সেই একই রাগী কণ্ঠে বলে উঠলো -
"এখন যেন আমাকে মানানোর বিন্দু মাত্র চেষ্টা না করা হয়। আমি বিশ্ব সুন্দরী না তা আমি জানি। এতে কোনো মিথ্যে নেই আর আমার কিছু যায় আসে না।"
রুদ্র রিমির কণ্ঠে রাগের থেকেও বেশি অভিমানের সুর খুঁজে পেল। শাড়ির আঁচলটা নিজের হাতে পেচাতে পেচাতে রিমির পিঠের সাথে সেঁটে দাঁড়ালো। রিমি রুদ্রর হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শুনছে। রুদ্র ধীরে রিমির শাড়ির ভাঁজে হাত গলিয়ে মেয়েটার নরম উদরে তা প্রতিস্থাপন করলো। পুরুষালি হাতের শীতল স্পর্শে রিমির মেয়ে দেহ সাথে সাথে ঝাঁকি দিয়ে উঠলো। রিমি শারীরিক প্রতিক্রিয়াতে শাড়ির উপর থেকেই রুদ্রর হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। রুদ্র রিমিকে দূর্বল হয়ে যেতে দেখে অন্য হাতে মেয়েটাকে জড়িয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। দুজনের হৃদস্পন্দন আর শ্বাস প্রশ্বাস পর্বত শৃঙ্গেরও তুঙ্গে। রুদ্র পেছন থেকে রিমির ঘাড়ে ঠোঁট ছুঁইয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে যত্ন মাখা কণ্ঠস্বরে বলল-
"যেই পুরুষের কাছে তার সাদামাটা বউটা বিশ্ব সুন্দরী তার কাছে এমন ভাবে শাড়ি পড়া, সুসজ্জিত বউটা ঠিক কি! সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই।"
রিমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য হতবুদ্ধি হয়ে গেল। রুদ্র রিমির হাত উপেক্ষা করে রিমির উদরের উপর নিজের স্পর্শ আরো দৃঢ় করলে রিমি মৃদু আর্তনাদ করলো-"আউউউ্..!"
রুদ্র ঠিক তখনই রিমির কানে কানে বলল-
"রিমি..আমার চুমু টা প্যান্ডিং আছে। এই পারিশ্রমিকের দাবি আমি ছাড়বো না।"
রিমির সকল ব্যাথা ছুটি নিল। রুদ্রর কথায় চোখ দুটো বড় বড় করে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"মা..মানে?"
রুদ্র বাঁকা হেঁসে বলল-
"নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তাকে তার পারিশ্রমিক বুঝিয়ে দিতে হয়। এই দিকে আমি গোটা দিন পার হয়ে যাওয়ার পর চাইছি। আপনার তো খুশি হয়ে আমাকে সাথে আরো কিছু বকশিশ দেওয়া উচিত।"
রিমি শুকনো ঢোক গিলে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে রুদ্রর দিকে তাকানোর চেষ্টা করলো। রুদ্রর চোখে চোখ মিলতেই সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল লজ্জায়। রুদ্র এক ঝটকায় রিমিকে ঘুরিয়ে নিজের মুখমুখি করে নিল। রিমি হকচকিয়ে রুদ্রর প্রসস্থ বুকের পাঞ্জাবি মুঠোয় নিয়ে নিজের মুখ লুকিয়ে এক নাগাড়ে বললে গেল-
"তখন ওইটা মিরা বলতে বলেছিল। কসম আমি ইচ্ছে করে বলি নি। মিরা জোর করেছিল। সত্যি বলছি।"
রুদ্র রিমি কে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় চুমু খেয়ে বলল-
"মিরাকে এর জন্য একটা চকলেট দিয়ে দিব নি। পাওনা আছে ওর। এতো বড় ডিল পেয়েছি ওর জন্য, কিছু না দিলে খারাপ দেখায়। ভাবি হিসেবে ও তোমার জন্য বেস্ট।"
রিমি তৎক্ষণাৎ রুদ্রর দিকে মুখ উঁচু করে তাকালো। কি ভেবে কথাটা সে বলল আর রুদ্র কি বলছে কিছুর আগা মাথা পেল না। রুদ্র মিষ্টি হাসি ঠোঁটের কোণায় রেখে দুই চোখ বন্ধ করে রিমি দিকে নিজের ঠোঁট জোড়া গোলাকার পাকিয়ে এগিয়ে দিয়ে বলল-
"We are getting late.. do it fast.."
রিমি একটু ছটফট করলো রুদ্রর শক্ত হাতের বাঁধনে। রুদ্রর কপালে বিরক্তির ভাঁজ পড়লো। ছাড়ার বদলে আরো শক্ত করে মেয়েটার কোমর আঁকড়ে ধরে হুমকির স্বরে বলল-
"আর একবার নড়লে, তোমার পড়নের শাড়ি দিয়েই আজ হাত বাঁধবো বলে দিচ্ছি।"
রিমি চমকে গেল। চুমু দেওয়া তো বড় কথা নয়, লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যাবে এইটা বড় ভাবনার বিষয়। তবুও আর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের পায়ের পাতায় ভর দিয়ে উঁচু হয়ে রুদ্রর দু গালে টুপ করে পর পর দুটো চুমু দিয়ে বলল-
"হয়েছে এবার? একটা দেওয়ার কথা ছিল আমি আপনার কথায় বকশিশ সহ দিলাম। এখন ছেঁড়ে দিন।"
রুদ্র বিরক্ত ভাব নিয়ে বলল-
"আমি রেডি ছিলাম না। আবার করো।"
-"কিহ্!"
-"আরে, হুট করে দিলে কি আর ফিল নেওয়া যায় নাকি? আমাকে তো রেডি থাকতে হবে নাকি? আচ্ছা যাও দু'টো দিতে হবে না। একটাই দাও...(ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে) এখানে।"
রিমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইল রাগ রাগ মুখ করে। এখন সে নড়ছেও না চড়ছেও না, ছেঁড়ে দেওয়ার জন্য কোনো আকুতি ও নেই। রুদ্র মুখ গোমড়া করে নিয়ে হঠাৎ রিমিকে ছেঁড়ে দিল। হঠাৎ মুক্তি পেয়ে রিমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট রাগ দেখতে পেল ছেলেটার মুখে। তবে এতক্ষণ ধরে যা চাইছিল তা হওয়ায় খুশি মনে রুদ্রর পাঞ্জাবি টেনে ধরে ছেলেটাকে নিজের কাছে টানলো। উচ্চতার সামঞ্জস্যতা হতেই এক সেকেন্ডের জন্য ছেলেটার ঠোঁট নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালালো। হঠাৎ করে কি হলো রুদ্র কিছু বুঝে উঠার আগেই রিমির অস্তিত্ব অগোচরে চলে গেল। রুদ্র ঘর থেকে পুনরায় চেঁচিয়ে বলল-
"আমি এবারও রেডি ছিলাম না। This is cheating.."
তার কথা শোনার মতো কেউ নেই দেখে মেঝেতে সজোরে পা মেরে বিড়বিড় করতে করতে বলল-
"ধুর ছাই, খেয়াল করলেই তো ধরে রাখতে পারতাম। আর একটু সময় নিয়ে চুমু দিলে কি হতো ওর?"
___
সন্ধ্যা ৭টা~
বাড়িতে ধীরে ধীরে মেহমানদের আগমন শুরু হয়েছে। মেহমান বলতে মিরা আর সোরায়ার ছোটবেলার খেলার সাথীদেরই ডাকা হয়েছে নাচগান করতে। গুরুজন বলতে কিছু আত্মীয় ছাড়া কেউ আজ আসেন নি। তারা কাল সকাল অর্থাৎ বিয়ের দিন সকালের গায়ে হলুদেই আসবেন। মিরা রিমিকে নিয়ে একসাথে সোরায়ার সাজ শেষ হলে তাকে উপর থেকে নিচে নামিয়ে এনেছে। সোরায়াকে মেহেদী স্টেজের মধ্যমণি করে বসিয়ে দিয়ে হাতে হাতে কিছু শুকনো খাবার সাজিয়ে সোরায়ার সামনে রাখছিল।
ঠিক তখনই রোকেয়া বেগম ব্যস্ত কণ্ঠে মিরা আর রিমিকে ডেকে চেঁচিয়ে উঠলেন-
"মিরা..রিমি..কই তোরা? ছেলের বাড়ি থেকে তত্ত্বের ডালা এসে গেছে। মেহমান দের স্বাগতম জানানোর একটা লোক নেই গেইটে। কিরে..? জলদি আয়।"
চাচির ডাকে মিরা রিমি একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে একসঙ্গে সোরায়ার দিকে তাকালো। সোরায়া অবাক চোখে পর পর একবার মিরা অবার রিমির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
"কি..? আমার দিকে কি দেখ?"
মিরা আর রিমি একসাথে সোরায়ার প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন সূচক কণ্ঠেই বলল-
"মাহির ভাই...?"
সোরায়া এক সেকেন্ডের জন্য মাথা দ্রুত না সূচক নাড়িয়ে বলল-
"না না, উনার আসার কথা না তো। উনি তো বলেছিলেন উনার কিছু কাজিন আসবে। ওরাও মেহেদি পড়বে আমাদের সাথে।"
সোরায়ার কথা মিরা রিমি দুজনে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো- "ধুর..!" তারপর একজন আরেকজনের হাত ধরে মুখটা ঝুলিয়ে ড্যাংড্যাং করে হেঁটে মূল দরজার দিকে চলে গেল। সোরায়া ভ্রু কুঁচকে তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনা হয়ে নিজে নিজে বলল-
"আজব তো। উনি না আসলে আমার কি করার আছে! আমি কি একবারও আসতে না করেছি ওনাকে? ভাল্লাগে না।"
_______
সাজানো ডালা হাতে একের পর এক ছেলে পক্ষের লোক প্রবেশ করছে। মিরা আর রিমি মিলে অমায়িক সংবর্ধনায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে বাড়ির ভেতরে। বাড়ির বড় রা অন্যান্য আত্মার সজনদের নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আর রায়ান রুদ্র মেহমানদের খাওয়ার জায়গায় সব কিছুর আয়োজন ঠিক আছে কিনা সেটা দেখছে।
রায়ান মিরার জন্য খাবার নিতে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার ফোন রিং হলো। রায়ান তড়িঘড়ি করে ফোনটা পকেট থেকে বের করে চোখের সামনে আনতেই দেখলো মাহিরের কল। রায়ান ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে উচ্ছসিত কণ্ঠে কথা বলল-
"কিরে নতুন জামাই, খবর কি? দিন কাল কেমন যায়?"
অপর পাশ থেকে মাহিরের উৎকণ্ঠিত গলা ভেসে এলো-
"দোস্ত তুই কই?"
-"আমি তো আমার শশুর বাড়িতেই। কেন?"
-"আসসালামুয়ালাইকুম আপু, কেমন আছেন? আমি মিরা, কনের বড় বোন।"
ফোনের অপর পাশ থেকে মাহিরের কণ্ঠের বদলে পরিচিত এক মেয়ে কণ্ঠ ভেসে আসতেই রায়ান কৌতুহলে মাহিরকে জিজ্ঞেস করলো-
"মাহির...ওই শালা! তুই কই? মিরার না ওটা"
অপর কাস থেকে ফিসফিসানি আওয়াজ এলো-
"আমিও আমার শশুর বাড়িতেই। তাড়াতাড়ি মেইন গেটে আয় ভাই। এবারের মতো বাঁচিয়ে দে।"
-"তোর আসার কথা ছিল আজ? কই চড়ুই পাখি তো কিছু বলল না! কাল বিয়ে তুই আজ এখানে কি করিস?"
-"বাল, তুই তোর সব প্রশ্ন আপাতত রাখ। এখান থেকে আমাকে বাঁচা। তোর আর তোর ভাইয়ের বউ তো আমার কাজিন দের জড়িয়ে ধরে ওয়েল কাম করছে।"
-"তো..!"
-"তো মানে..! আমাকেও যদি করে তখন?"
-"তুই বেডা মানুষ, তোকে কেন করবে?"
-"আরে ভাই, আমি তো মাহির হয়ে আসি নি। মাহিরের কাজিন হয়ে আসছি।"
-"মানে কি ভাই..!?"
-"বোরখা পড়ে আছি রে ভাই। মিরা ভাবি আর রিমির থেকে এবারের মতো বাঁচিয়ে দে।"
রায়ান রেগে চিৎকার করার আগেই ফোনটা কেটে গেল। রায়ান সঙ্গে সঙ্গে দৌড় দিল মেইন গেটের দিকে।
মিরা রিমি সবাইকে জড়িয়ে ধরে স্বাগতম জানাচ্ছে দেখেই মাহির বাধ্য হয়ে রায়ান কে কল করে ডাকলো। নয়তো নিজের বউ টাকে এক নজর দেখেই চলে যেত বেচারা। মিরা পাত্র পক্ষের একজন এখনো ডালা হাতে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। মিরার চোখে কিছু অদ্ভুত ধরা পড়লো। সবাই জমকালো জামা কাপড় পড়ে এসেছে অথচ পেছনের এই একজনই কেবল প্লেইন কালো বোরখা পড়া, তাকে মেয়ে মানুষের তুলনায় একটু বেশিই লম্বা মনে হলো মিরার। নেকাব দিয়ে চোখ মুখ সব ঢাকা। প্রথমে একটু অবাক লাগলেও পরবর্তী তে মিরার মনে হলো পর্দা তো পর্দাই, যারা পর্দা করে তারা তো বিয়ে বাড়িতেও করবে আশ্চর্যের কিছু নেই। আর উচ্চতা তো আল্লাহর দান, লম্বা হওয়া তো অস্বাভাবিক কিছু না। মিরা অতিরিক্ত চিন্তা না করে মুখে মিষ্টি একটা হাসি নিয়েই ভদ্র মহিলার দিকে এগিয়ে গেল। মিরা উচ্ছসিত হয়ে বিনয়ের সাথে হাত বাড়িয়ে দিয়ে সালাম দিল-
"আসসালামুয়ালাইকুম, বেয়ান সাহেবা।"
মাহির শক্ত হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। সালামের উত্তর ও নিচ্ছে না। এই দিকে মিরাও দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছে। কিছু না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা পাও সন্দেহ জনক। মাহির বুদ্ধি করে কেবল নিজের এক হাত বাড়িয়ে দিল হ্যান্ড সেট করতে। মিরা হটকারীতায় আর মাহিরের হাতের দিকে চাইলো না উল্টো সেটা উপেক্ষা করে নিজের থেকে কোলাকুলি করতে উদ্যত হয়ে বলল-
"আরে, কিসের হাত মেলানো? বেয়ানের সাথে কোলাকুলি করতে হয়। কেমন আছেন আপু?"
মাহির নেকাবের আড়ালে ঘাবড়ে চোখ বন্ধ করে নিল।
-"Spot..."
হঠাৎ চিৎকারে মিরা থেমে গেল। রায়ান হন্তদন্ত হয়ে মিরার সামনে এসে মাহিরকে নিজের পিছনে লুকিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলো-
"কি হচ্ছে এখানে?"
মাহিরের বুকের ধুকপুকুনি একটু কমে এলো। স্বস্তি তে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে মনে মনে রায়ানের কৃতজ্ঞতা আদায় করলো-"ভাই আমার, বাঁচিয়ে নে এবারের মতো।"
পিছন থেকে মিরা বিরক্ত মুখে চেঁচিয়ে রায়ান কে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"এমন করলেন কেন?"
রায়ানও মেজাজ দেখিয়ে মিরাকে জিজ্ঞেস করলো-
"যাকে তাকে জড়িয়ে ধরতে যাও কেন?"
মিরার কপালে আশ্চর্যতার ভাঁজ দেখা দিল। রায়ানের এমন প্রতিক্রিয়ার সে কোনো কারণ দেখতে পাচ্ছে না।
-"এভাবে বলছেন কেন? আপুরা কি ভাববে? ওয়েল কাম করছিলাম তো কোলাকুলিতে সমস্যা কই?"
রায়ান চেয়েও মিরাকে বোঝাতে পারবে না যে সামনে কোনো মেয়ে না , ওটা মাহির। রায়ান মিরার মন রাখতে মাহিরের দিকে ঘুরে গিয়ে মাহির সাথে কোলাকুলি করতে উদ্যত হয়ে বলল-
"এভাবে ওয়েল কাম করতে হলে আমি করি। তোমাকে করতে হবে না।"
ছেলে হিসেবে মাহির ও বোরকার আড়ল থেকে রায়ানের কথায় সম্মতি জানিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। মিরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে রায়ান আর অন্য এক মেয়েকে কোলাকুলি করার চেষ্টা দেখে সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের হাত টেনে ধরে পিছনে টালো। আর নিজের পিছনে রায়ান কে লুকিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো-
"আরে, অদ্ভুত তো..! আপনি একটা মহিলাকে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছেন কেন?"
মাহিরের ইচ্ছে করলো নিজের মাথা টা দেয়ালের সাথে বাড়ি দিতে। মিরা সিনক্রিয়েট না করে মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
"থাক আর ওয়েল কামের দরকার নেই। আপনি ভেতরে যান।"
অনুমতি পাওয়ার পর মাহির আর এক সেকেন্ড ও দাঁড়িয়ে না থেকে ভেতরের দিকে পা বাড়ালো। রিমি বাকি সবাই কে নিয়ে অনেক আগেই ভেতরে চলে গেছে। মিরা রায়ানের সাথে এবার তুমুল এক ঝগড়া করার উদ্দেশ্যে পিছন ফিরে দেখল তার পিছনে কেউ নেই। আশে তার চোখ ঘুরিয়ে দেখতেই খেয়াল করলো রায়ান ওই বোরকা পরা নারীকে নিয়ে বাড়ির পিছন দিকে যাচ্ছে। মিরা নিজের চোখ কে যেন বিশ্বাস ই করতে পারলো না। ঠিক তখনই তার নজর গেল ভদ্র মহিলার পায়ের দিকে- মহিলা মানুষের পায়ে পুরুষ মানুষের জুতা! মিরা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সব মাথার উপর দিয়ে গেল কিন্তু আজকালকার যুগে এসে মাহিরের থেকে শেষ মেষ বোরকার আইডিয়া সে আশা করে নি। কোমরে হাত বেঁধে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বিড়বিড় করলো-
"মাহির ভাই.. it's gonna be fun to catch you.."
মিরা রায়ান আর মাহিরের দিকে আর পাত্তা না দিয়ে সোজা বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
চলবে,
পাখিরা এর বাকি অংশ কাল ৮টায় আসবে ইনশাআল্লাহ। তোমাদের মধ্যে যাদের সাথে কথা হয় তারা জানো আমি একটু অসুস্থ। মানসিক স্থিতি ও ঠিক নেই। এখন রেগুলার হওয়ার চেষ্টা থাকবে। কেমন লাগলো জানি ও কেমন। Love you pakhis ❤️ 🥰 missed you..
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ (বিয়ে) #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_75 (2nd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
মিরা বাড়ির ভেতরে এসে সঙ্গে সঙ্গে সোরায়ার কাছে গিয়ে বসলো। সোরায়া মিরাকে পাশে পেতেই একটু উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আপু..কে কে এসেছে?"
মিরা মাহিরের আসার খবর নিজের থেকে সোরায়াকে না দিয়ে উল্টো সোরায়া এই ব্যপারে কিছু জানে কিনা তা যাচাই করার জন্য এমনি স্বাভাবিক ভাবেই বলল-
"আরে..তোর কিছু ভাবি আর ননদ এসেছে। আর কেউ তো এলো না।"
এ কথায় সোরায়ার মুখটা সামান্য মলিন হতে দেখে মিরা বুঝে গেল মাহিরের মেয়ে সেজে এখানে আসা সম্পর্কে সোরায়ার হয়তো কিছু জানা নেই। সে একটু নীরবতা রেখে সোরায়ার দিকে ঝুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আর কারো কি আসার কথা ছিল?"
সোরায়া ঠোঁটে সূক্ষ্ম বানোয়াট হাঁসি রেখে মাথা না সূচক নাড়িয়ে বলল- "উঁহু, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।"
মিরা এবার নিশ্চিত হলো যে সোরায়া আদতে মাহিরের এখানে লুকিয়ে আসার ব্যাপারে কিছু না জানলেও মাহির আসবে এমনটা আশা করছিল। আর এই আশা সত্যি হয়নি বলেই এতো উদাস মন তার। মিরা তার বাচ্চা সুলভ ছোট্ট বোনের গালে হাত রেখে আদুরে গলায় বলল-
"আমার ছোট্ট বনু টা কত বড় হয়ে গেছে। কাল তার বিয়ে। এমন দিনে মন মরা করে রাখতে আছে? মন খুলে আনন্দ কর। তোর যা চাই ঠিক পেয়ে যাবি।"
সোরায়া মিরার কথার মানে ঠিক মতো না বুঝেই মিষ্টি হাসলো। মিরা সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
"যাকে চাইছিস তাকে তো পাবি বনু। কিন্তু নতুন জামাইকে একটু হেনস্থা না করলে কি আর বিয়ে বাড়ি জোমবে বল? Advance sorry.."
মিরা কথাটা মনে মনে চিন্তা করেই হিহি করে হেঁসে উঠলো। কে জানে কি দুষ্টু বুদ্ধি পাকিয়েছে!
_______
এইদিকে বাড়ির পিছন দিকে অন্য রকম সার্কাস বসেছে মনে হচ্ছে। বোরকা পড়া ৬ ফুট লম্বা একটা বলিষ্ঠ ছেলে, হিজাব নেকাবের ঠিক ঠিকানা নেই, মনে হচ্ছে এই খুলে পড়ে যাবে- দৌড়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে আর তার পিছনে আরেকজন একটা পাতা বাহার গাছের টব মাথায় তুলে তাড়া করছে।
-"মাহিরের বাচ্চা.. দাঁড়া বলছি। নয়তো এই টব তোর মাথায় মারবো আমি। ওখানেই দাঁড়া।"
-"পাগল কুত্তায় কাটেছে নাকি আমারে যে দাঁড়াবো? তোকে কোনো বিশ্বাস নেই। কাল আমার বিয়ে এখন কিছুতেই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাবে না।"
রায়ান মাহিরের পিছনে ছুটা বন্ধ করে হাতের টব টা মাটিতে আছাড় মেরে চেঁচিয়ে বলল-
"কাল বিয়ে তো আজ নেকামি করে সং সেজে বউ দেখতে এসেছিস কেন? কাল থেকে তো তোরই হয়ে যেতো।"
মাহিরও ছুটা থামিয়ে হাঁটুর উপর হাত রেখে, ভর দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল-
"তুই বিয়ের আগে বউকে লুকিয়ে দেখতে আসার মজা কি বুঝবি? তুই তো বউ তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করেছিস।"
এটা যেন কাটা গায়ে একদম নুনের ছিটে ছিল। রায়ান পুনরায় মাটি থেকে টব তুলতে গেল-
"শালা তোর বিয়ের জন্য কত কি করছি আমি। নিজের বউ বাচ্চার ও ঠিক মতো খেয়াল রাখতে পারছি না কাজের ব্যস্ততায় আর তুই বেইমান আমাকেই খোঁচা দেস। তোরে আমি..!"
মাহির দ্রুত রায়ানের কাছে এসে রায়ানকে আষ্টেপৃষ্ঠে জাপটে ধরে মিনতির সুরে বলতে লাগলো-
"আচ্ছা সরি সরি! এমন করিস কেন? তুই না আমার ভাই। ভাইয়ের জন্য এই টুকু তো মানুষ করেই তাই না বল?"
রায়ান টব ছেড়ে এখন মাহিরের থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ছটফট করতে করতে বলল-
"মাহির ছাড় আমাকে। তুই আর আমার মানসম্মান খাইছ না ভাই। মাফ কর। আমি এই বাড়ির বড় জামাই। বাড়ি ভর্তি মানুষ, কেউ যদি তোকে এই রূপে আমাকে জড়িয়ে ধরে থাকতে দেখে, আমাকে চরিত্রহীন লম্পট ভাববে। ছাড়..!"
মাহির রায়ানের দূর্বলতার সুযোগ নিতে একটুও ছাড় দিল না। উল্টো আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রায়ানের কাছে একটা শর্ত রেখে বলল-
"ছেঁড়ে দিবো তো, আগে বল সোরায়া আর আমাকে একা দেখা করার একটা সুযোগ করে দিবি?"
রায়ানের ছটফটানি থেমে গেল। ছেলেটার চোখে এখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। রায়ান মাহিরের চোখের দিকে তাকিয়ে খ্যাক করে উঠে বলল-
"আমি তোর এই ফালতু প্লেনের আগে পিছে উপর নিচে কোথাও নেই। নিজে এসেছিস নিজে সুযোগ বুঝে দেখা করে নে যা। আমি তোকে চিনি না।"
মাহির জোর করেই রায়ান কে জাপ্টে ধরে বলল-
"আমি জানি না তুই কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিবি আমাকে। নইলে ছাড়বো না।"
-"মাহির রাগ উঠাবি না, ছাড় এখনি নয়তো এমন জায়গায় মারবো যে বিয়ের শখ মিটে যাবে একদম।"
মাহির সঙ্গে সঙ্গে রায়ান কে ছেড়ে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে বলল-
"আজ আপন বলতে কেউ নাই আমার। মানুষের ফ্রেন্ড রা কত..!"
-"চুপ কর ভাই আমার। বুঝছি তো! আর কিছু বলা লাগবে না।"
রায়ান নিজের পাঞ্জাবি ঝেড়ে। মাহিরের নাটকীয় সংলাপের ধারা অব্যাহত হওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দিল। হঠাৎ রায়ানের ফোনের রিংটোন বাজলো। মুখে বিরক্ত ভাব নিয়ে রায়ান নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করলো-
"সবাই কিছু একসাথে মরা মরে কেন খোদা? অশান্তি..?"
ফোনের স্ক্রিনে জ্বল জ্বল করছে "হৃদপাখি" নামটা। মিরা কল করেছে দেখে রায়ান তাড়াতাড়ি কলটা রিসিভ করলো-
"হৃদপাখি..আর ইউ ওকে বেইব?"
-"হাবি..! একটা হেল্প করবেন?"
-"হ্যাঁ, অবশ্যই সোনা। কি লাগবে তোমার বলো শুধু?
শরীর খারাপ করছে? কিছু খাবে? পেটে ব্যাথা করছে না তো আবার? আচ্ছা ওয়েট আমি আসছি?"
-"আরে না না, আমার কিছু হয় নি ঠিক আছি। আসতে হবে না। বিষয়টা বনুকে নিয়ে। কাজটা করে দিন, তাহলেই হবে।"
-"চড়ুই পাখিকে নিয়ে? কি হয়েছে ওর?"
রায়ানের চিন্তিত গলায় সোরায়ার কথা শুনে মাহির রায়ানের কাছাকাছি এসে তাকে উদ্বিগ্ন হয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
"স্পিকারে দে ফোন।"
রায়ান মাহিরের কথায় প্রথমে রাজি না হলেও মাহির হাত জোড় করে বলায় সে মিরার কলটা স্পিকারে রাখলো।
-"আরে পেনিক করছেন কেন? তেমন কিছু না। আসলে আমি নিচে আছি তো বনু উপরে আমার সিঁড়ি বেয়ে আর উপরে উঠতে ইচ্ছে করছে না। আপনি একটু ওকে নিয়ে আসবেন প্লিজ। ও একা ঘরে বসে আছে।"
সোরায়া তার রুমে একা কথাটা কানে যেতেই মাহির বেশ খুশি হলো যেন কাঙ্ক্ষিত সুযোগ টা পেয়েই গেছে। কিন্তু রায়ান মিরার কথায় আগা মাথা কিছুই খুঁজে পেলো না। বাড়িতে এতো মানুষ থাকতে মিরা তাকেই কেন ফোন করবে!? রায়ান বিষয় টা পরিষ্কার ভাবে বুঝার জন্য মিরাকে অন্য উপদেশ দিয়ে বলল-
"কিন্তু বেইবি, আমি কিভাবে চড়ুইয়ের ঘরে যাই বলো! তুমি বরং রিমিকে পাঠাও।"
রায়ানের পাল্টা কথায় মাহিরের শুধু মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া বাকি ছিল। তার প্রাণের বন্ধু তার বউয়ের সাথে দেখা করার এমন সুবর্ণ সুযোগ টা তার থেকে কেড়ে নিচ্ছে বলে বুকটা যেন তার ফেটে যাচ্ছে। মিরা অপর পাশ থেকে শান্ত তবে বেশ মায়া মায়া মোহ লাগিয়ে বলল- "রিমি মেহমান দের দেখছে।"
-"আম্মু বা খালামণি কে বলো।"
-"মামণি আর চাচি কাজ শেষ করে সবে রেডি হতে গেল। আশে পাশে আর কেউ নেই।"
-"পাত্রক্ষের এতো জন এলো ওদের বাড়ির বউ যেহেতু ওরাই নিয়ে আসুক। তুমি ওদের বলো।"
মিরা এবার বিরক্ত হয়ে গেল। জোরে চেঁচিয়ে উঠলো রায়ানের উপর-
"একটা কাজ দিয়েছি, আদরের বউয়ের জন্য এটুকুও করতে পারবেন না আপনি? আমাকে অন্য কাউকে বলতে হবে? দরকার নেই থাক। আমিই সিঁড়ি বেয়ে ওকে নিয়ে আসছি। এরপর আমার কিছু হলে বুঝে নিয়েন।"
রায়ানের মিরার কথায় সন্দেহ হলো। যেই মেয়ে তার চিন্তার বিন্দু মাত্র পরোয়া করে না, সাড়া দিন সিঁড়ি দিয়ে উঠার নামা করে তার আজ এতো অভিযোগ! চাইছে কি মেয়েটা! যাই হোক বউয়ের কথার মানে উল্টো হলেও তার মূল্য অপরিসীম। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে শান্ত করতে বলল-
"ওকে ওকে চিল, শান্ত হও। আমি যাচ্ছি। তোমার যেতে হবে না। রেস্ট নাও। কিছু খাও। ওকে?"
মিরার রাগী গলা সঙ্গে সঙ্গে শান্ত হয়ে এলো। রায়ানের হাড় মেনে নেওয়াতে খুব খুশি হয়ে রায়ানের কথা মেনে নিল-
"ওকে হাবি...লাভ ইউ।"
-"হুম..লাভ ইউ মোর।"
ফোনটা কাটতেই মাহির রায়ানের উদ্দেশ্যে ঠেস মেরে বলল-"তোর থেকে তো ভাবিই ভালো। অজান্তেই আমার কত বড় হেল্প করলো। মানুষ ঠিকই বলে- ভাবি মায়ের সমান। তুই থাক তোর যাওয়া লাগবে না। আমি যাই আমার বউয়ের কাছে।"
মাহির নিজের নেকাব ঠিক ঠাকই করে পড়ে নিল।
_________
সোরায়ার ঘর~
খোলা দরজা টা আলতো করে চাপিয়ে রাখা। বাইরে থেকে সামান্য ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। বিছানায় সোরায়ার জায়গায় বসে আঙুর খেতে খেতে আলতায় রাঙা নূপুর পরিহিত পা দুলাচ্ছে মিরা। বোরকা পড়া মাহিরের অপেক্ষাই করছিল সে, আর তখনি দরজা খুলে বোরকা পড়া এক বলিষ্ঠ মানবের আবির্ভাব হলো। মিরাকে দেখে আখাম্বা লম্বা মানুষ টা থ মেরে দাঁড়িয়ে গেল, যেন খুব আশ্চর্য হয়েছে মিরাকে দেখে। কালো কাপড়ে ঢাকা মানুষটাকে বেশ অপ্রস্তুত অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মিরা খিলখিল করে হেঁসে ধপ করে বিছানা থেকে নেমে, দুহাত পিছনে বেঁধে হেঁয়ালি করে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলতে লাগলো-
"এ বাবা , কি হলো এটা? এখানে তো সোরায়ার থাকার কথা তাহলে আমি কেন? হিহি..! যাই বলুন, বোরকায় বেশ মানিয়েছে আপনাকে মাহির ভাই। বনু দেখলে পুরো ফিদা হয়ে যেতো। কিন্তু মাহির ভাই..এর পর কখনো মেয়ে বেশ ধারণ করলে জুতাও মেয়েদের পড়বেন, আরো ভালো মানাবে। হিহি।"
সামনে থেকে কোনো প্রতি উত্তর আসছে না দেখে মিরা অধৈর্য হয়ে বলল-
"আর লুকোচুরি ভালো লাগছে না মাহির ভাই। আই এম বোর্ড।"
মাহির তবুও একচুলও নড়ছে না বলে মিরা নিজের থেকেই মাহিরের নেকাব উঠিয়ে দিয়ে বলল-
"ধাপ্পা..!"
-"হাই, মাই টুউ মাচ চালাক চতুর ওয়াইফি..!"
নেকাব সরানোর পর বোরকার আড়ালে মাহিরের বদলে রায়ান কে দেখ মিরা আশ্চর্য হয়ে হলো-
"রায়ান..আ.. আপনি..! আপনি কেন? কিভাবে? মাহির ভাই কোথায়?"
রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরাকে খেপাতে বলল-
"আমি ড্যাম সিওর মাহির আর তুমি মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাই বোন। মানে এতো কাঁচা প্লেন কেউ কিভাবে করে? একজন মেয়ে সেজে ছেলে মানুষের জুতা পড়ে এসেছে, তো আরেকজন বোনকে গ্রাউন্ড ফ্লোরে বসিয়ে রেখে সে উপরে আছে বলে জাল পেতেছে। লাইক সিরিয়াসলি? (মিরায়ার দিকে ঝুঁকে সরল মুখ করে) Do I look that much idiot to you baby?"
মিরা বাচ্চাদের খেলা নষ্ট হয়ে গেলে ঠিক যেমন বিরক্ত মুখভঙ্গী করে ঠিক তেমন মুখ বানিয়ে বিছানায় গিয়ে ধপ করে বসে পড়লো। বউয়ের অভিমান দেখে রায়ান নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ধীর পায়ে মিরার কাছে এগিয়ে গিয়ে ঠিক মিরার পাশে বসে মিরার মাথায় আলতো করে হাত রাখল। মিরা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রায়ানের হাত নিজের মাথা থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজে নিজে তার ভেতরের ছোট আত্মাটাকে বলল-
"প্রিন্সেস তোমার পাপাকে বলে দাও। মাম্মার মুড অফ। মাম্মার সব মজা নষ্ট করে দিয়ে একদম ঠিক করেনি সে।"
রায়ান হাফ ছেঁড়ে মুচকি হাসলো। যত দিন যাচ্ছে তার বুঝদার বউটা কেমন যেন আরো অবুঝ হয়ে যাচ্ছে। যদিও মিরার এই দিকটা কখনোই তার বিরক্তিকর লাগে নি বরং বেশ ভালোই লাগে। রায়ান মিরার মাথায় আবারো হাত রেখে মিরার ধাঁচেরই প্রতি উত্তর করলো-
"প্রিন্সেস, তোমার পাপা যে তোমার মাম্মা কে হাসানোর জন্য বোরকা পড়ে এসেছে তা কি তার চোখে পড়ছে?"
মিরা রায়ানের কথায় তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকালো। বেশ সূক্ষ্ম চোখে পা থেকে মাথা অব্দি রায়ানকে দেখলো। তার হাসি তো পেলো, কিন্তু সে ভুলেও হাসলো না। মুখ গম্ভীর করে বলল-
"বোরকা টা খুলে ফেলুন। বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।"
রায়ান নিজের বুকের বা পাশে হাত চেপে ধরে নাটকীয় সুরে বলল-
"আউচ..! খুলতেও বললা, তাও কি? সব ছেঁড়ে বোরকা..?!"
মিরা রায়ানের এই কথা শুনে আর নিজের হাঁসি ধরে রাখতে পাড়লো না। ফিক করে হেঁসে উঠলো। রায়ানও সাথে হেসে উঠলো। কায়দা করে ছোট্ট মেয়ে দেহটাকে নিজের সাথে লাগিয়ে নিল সে। পরম যত্নে মিরার কপালে , দুগালে, নাকে, থুতনিতে চুমু খেলো। আর সব শেষে তার প্রিয় ঠোঁট জোড়ার উপর বৃদ্ধা আঙ্গুল ছুঁইয়ে কিছু একটা পরখ করে যেই নিজেকে সেখানে বিলিন করতে যাবে তখনি মিরা হাঁসি থামিয়ে আবার গোমড়া মুখ করে রায়ানের থেকে দূরে সরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"তখন মাহির ভাই কে জড়িয়ে ধরতে গেছিলেন কেন? ছেলে হলেও ছিল তো মেয়ে বেশেই।"
-"আমি জানতাম ওটা মাহির। তোমাকে থামাতেই তো ভুলে ওকে ওইভাবে...(মিরা কে খেপানোর চেষ্টা করে) Are you jealous baby ?"
মিরা বাজ পাখির ন্যায় ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
"Jealousy আবার কি..? আমার তো জেন্ত কবর দিতে ইচ্ছা করে।"
রায়ান শব্দ করে হেঁসে উঠলো। মিরার অভিমানী ফোলা গাল গুলো টেনে দিয়ে আদুরে গলায় বলল-
"You look so mine..when you are jealous, my Mrs.."
মিরা লাজুক হেঁসে মাথা নিচু করে নিল। রায়ান ঘাড় কাত করে মিরার লজ্জায় রাঙা মুখ টা দেখার চেষ্টা করলো। বউয়ের লজ্জায় ঢাকা মুখ খানি দেখার সৌভাগ্য তো আর সব সময় হয় না। দিনে একবার দুবার যাও সে সামান্য লজ্জার কারণ হতে পারতো এখন মিরার শারীরিক অবস্থার জন্য সেটুকুও পারছে না। মিরা একটু মুখ তুলে রায়ানের দিকে চাইলো। চোখে চোখ পড়তেই পুনরায় চোখের পাতা নামিয়ে নিল। রায়ান মিরা থুতনিতে হাত রেখে মেয়েটার মুখ উঁচু করে নিজের মুখোমুখি করে শান্ত ঘোর লাগানো চাহুনি যে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-
"আমি নিশ্চিত, আজ আমার চাঁদ কে দেখে ওই আকাশের চাঁদের ও লজ্জা লাগছে।"
মিরা লাজুক হাসলো। কিন্তু নিজের উদ্দেশ্য থেকে আর মনোযোগ ব্যাহত করলো না। হাসি মুখেই জিজ্ঞেস করলো-
"হাবি..আপনি এখানে..তো মাহির ভাই কোথায়?"
রায়ান ও মিরার মতো হেঁসে হেঁসে উত্তর দিল-
"মাহির মাহিরের বউয়ের কাছে। আর আমি আমার বউয়ের কাছে।"
মিরার মুখের হাঁসি উধাও হয়ে গেল। বিছানা থেকে চট করে নেমে গিয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠলো-
"কিহ্? বউয়ের কাছে মানে?"
রায়ানও বিছানা থেকে নেমে গিয়ে মিরার উপর চড়াও হয়ে বলল-
"তুমি কনে পক্ষ, বর পক্ষ কে হেনস্থা করতে চাইতেই পারো। আমিও তো বর পক্ষের, আমাকে তো ডিফেন্ড করতে হবে আমার বন্ধু কে।"
মিরার চোখ দুটো আশ্চর্যে বড় বড় করে নিয়ে প্রশ্ন করলো- "মানে..কি করেছেন আপনি?"
-"চরের উপর বাটপারি।"
___
(ফ্ল্যাশব্যাক)
মিরা ফোন কাটার পর পর রায়ান মাথায় হাত দিয়ে মাহিরের অবস্থা দেখে তার মজা উড়িয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
"বউটাতো আমার তাই আমি জানি- ওর দ্বারা কি কি সম্ভব। হঠাৎ আজ লাভ ইউ বেরোলো ম্যাডামের মুখ থেকে তাও এমন কারণে! সামথিং ইজ ফিসি..!"
রায়ান কিছু একটা ভেবে নিজের ফোন থেকে সোরায়া কে কল করলো। ফোনটা এক থেকে দুবার বাজতেই রিসিভ হলো।
-"হ্যালো রায়ান ভাইয়া..!"
"হ্যাঁ হ্যালো, সোরা..! মিরা কোথায় রে?"
সোরায়ার কণ্ঠ শোনার সাথে সাথে মাহির থমকে গেল। ফিরে আবার রায়ানের কাছে এলো দ্রুত গতিতে। রায়ান হাত উঁচু করে মাহির কে চুপ থাকতে বললো।
-"আপু তো একটু আগেই উপরে গেল।"
-"তুই কোথায় তাহলে?"
-"আমি তো রিমি আপু আর বাকিদের সাথে নিচে স্টেজে বসে আছি।"
সোরায়ার কথা শুনে রায়ান নিচের ঠোঁট কামড়ে হেঁসে মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির ও হতবাক। রায়ান সোরায়াকে আর কিছু না বলে সম্পূর্ণ বানোয়াট কাহিনী শুনালো-
"চড়ুই মিরার একটু হেল্প লাগবে তোর। ছাদে যা তো।"
-"আপু ছাদে? এই সময় ছাদে কেন? কি হয়েছে? কি হেল্প লাগবে?"
-"আরে, তোকে দরকার আমাকে তো বললো না কিছু। যা না...!"
-"আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি।"
রায়ান ফোন কেটে দিল। মাহিরের মাথায় সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। কে কোথায়! কার কি হেল্প! সব মাথায় জোট পাকিয়ে গেছে। রায়ান মাহির কে ঠিক করে বুঝিয়ে বলল-
"শোন, মিরা সাম হাও তোকে চিনতে পেরে গেছে। এই ভাবে ধরা খেলে মানসম্মান সব যাবে। যা বলছি তা কর।"
মাহির সম্মতি দিলে রায়ান মাহির কে প্লেনটা বুঝিয়ে বলল-
"তুই এখন মাহির হয়ে ছাদে যাবি। সোরা ছাদে যাবে এখন ওখানে মিরা আছে এই ভেবে। বুঝলি?"
মাহির একদিকের হিসেব বুঝলো কিন্তু কৌতুহলে প্রশ্ন করলো-
"তাহলে ভাবির কাছে কে যাবে?"
রায়ান মাহিরের মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
"আমার বউয়ের কাছে আমি যাবো। তুই তোর বউয়ের কাছে যা। আর এই বোরকা খোল। আমি তোর বেশ নিয়েই যাবো। তোকে চিনলো কিভাবে এটাও তো জানতে হবে।"
অতঃপর যা হওয়ার তা তো হলোই।
_______
মিরা রায়ানের মুখে সম্পূর্ণ কাহিনী শুনে আগুপিছু কিছু না ভেবেই দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল ঘর থেকে বের হতে। রায়ানও তাড়াতাড়ি দৌড়ে গিয়ে মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে শূন্যে তুলে নিল মেয়েটাকে। মিরা রায়ানের থেকে ছাড়া পেতে ছটফট করতে করতে বলল-
"ছাড়ুন আমাকে। এখন গেলে ওদের হাতে নাতে ধরতে পারবো।"
-"আচ্ছা, সমস্যা কোথায়? একটু কথা বলুক না। এমনিতেও কাল তো বিয়ে হয়েই যাবে।"
-"আরে আমি কি ওদের শত্রু নাকি? সোরা নিজেও মাহির ভাইয়ের সাথে দেখা করতে চাইছিল। আমি তো শুধু একটু মজা নিতে চাইছি।"
রায়ান মিরাকে বিছানায় নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে বলতে নিল-"হৃদপাখি..আমার কথা বোঝার চেষ্টা..!"
-"আপনি যদি এখন আমার সাথে হাত মেলান তাহলে আপনাকে আপনার পছন্দের সুইট রিওয়ার্ড দিবো।"
রায়ান ভ্রু কুঁচকে মিরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আমার পছন্দের সুইট?"
মিরা দাঁত বের করে হেঁসে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরে ছেলেটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল। সম্ভবত মিষ্টির পরিচিতি 🌚..!
রায়ানের গলা শুকিয়ে এলো। শুকনো ঢোক গিলে নিল যেন হঠাৎ বেশ তৃষ্ণার্ত লাগছে তার। সে দ্বিধায় প্রশ্ন করলো-
"সত্যি দিবা তো? চিটিং করলেও ছাড় দিবো না বলে দিচ্ছি আগেই।"
-"ওকে ডিল। আমি চিটিং করলেও আপনার স্বাধীনতা রইল নিজের প্রাপ্য জিনিস আদায় করার। এবার বলুন..Are you in?"
-"Of course.. I am so in for it...I am so into you as well.."
মিরা মুখ টিপে হাসলো। তার রায়ান কে কাবু করতে কয়েক সেকেন্ডের বেশি লাগবে না এটা তার নিজের উপরে বন্ধ বিশ্বাস ছিল। মিরা বিছানা থেকে নেমে রায়ানের হাত টেনে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে রায়ান এক জায়গায় ই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। মিরা অনেক বার টানলো কিন্তু তাতে ছয় ফুট উচ্চতার অধিকারী পুরুষটার কোনো হেলদোল দেখা গেল না। মিরা অধৈর্য হয়ে রায়ান সামনে এসে মাথা উঁচু করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"কি হলো আবার? দাঁড়িয়ে গেলেন কেন?"
রায়ান আইফেল টাওয়ারের মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে সোজা তাকিয়ে বলল-
"এনার্জি নেই, চার্জ শেষ।"
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, সে জানে রায়ান কি ডিমান্ড করছে। এখন কথা না রাখলেও চলবে না বেচারির।
-"নিচু হন একটু। এভাবে সোজা দাড়িয়ে থাকলে নাগাল পাবো কিভাবে?"
রায়ান হাঁফ ছেড়ে নিজের পড়নে থাকা বোরকা খুলে ফেলে পাঞ্জাবি টানটান করে ঠিক ঠাকই করে মিরার উচ্চতা অনুযায়ী ঝুঁকতে ঝুঁকতে মিরাকে খেপানোর উদ্দেশ্যে বলল-
"বেটে বউ বিয়ে করার যে কি জ্বালা..!"
-"তাই নাকি?"
মিরা ভ্রু উঁচু করে রায়ানের কথায় প্রতিক্রিয়া দেখলে রায়ান ও নিজের কথায় সম্মতি দেয় মাথা নেড়ে। মিরাও রায়ান কে খেপানোর উদ্দেশ্যে তার পাঞ্জাবির কলার সোজা করতে করতে বলল-
"তাহলে কি আমার নিজের লেভেল অনুযায়ী কাউকে খুঁজে নেওয়া উচিত?"
বেশ এই কথায় রায়ানের গায়ে বেশ ফোস্কা পড়লো। সেকেন্ডের ব্যবধানে মিরাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে গম্ভীর গলায় হুমকির সুরে বলল-
"খুন করে ফেলবো একদম।"
মিরা ভয় মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করলো-
"হায় খোদা, কেন বলতে গেলাম এটা।"
রায়ানের চিন্তা চেতনার পরিধির ব্যাপ্তি ঘটলো না বরং চোখ জোড়ার সাথে হৃদস্পন্দন, মস্তিষ্ক একসাথে ষড়যন্ত্র করে স্থির হলো মিরার কমল লাল টুকটুকে ওষ্ঠযুগলে। মিরা রায়ানের দৃষ্টি অনুসরণ করে নিজের ঠোঁটের পথ ঠাওড় করে একটু আঁতকে উঠে কিছু বলতে চাইলো-
"রা.. উমম্..!
ব্যাস! উক্তির বহিঃপ্রকাশ এতো টুকু তেই থামলো। কাঁপা কাঁপা আঙুলে মেয়েটা রায়ানের পাঞ্জাবির কিছু অংশ আঁকড়ে ধরলো। এতো করে কি ছেলেটাকে আরো উস্কে দিল তা সে নিজেও জানে না। রায়ান মিরার ওষ্ঠের উপর চাপ বৃদ্ধি করলে মিরা রায়ানের পাঞ্জাবি ছেঁড়ে একহাতে রায়ানের ঘাড়ের কাছে একগুচ্ছ চুল মুঠো করে ধরলো। এই উন্মাদ পুরুষের তৃষ্ণা নিবারণের শেষ মূহূর্ত অতিবাহিত হওয়া ছাড়া আজ নিজের মুক্তির কোনো আশা মিরার চোখে ধরা পড়লো না।
______
একই সময়ে-ছাদে~
-"আপু...আপু..কি হয়েছে তোমার? ঠিক আছো.,?"
উজ্জ্বল নক্ষত্র, আর সাথে কিছু কৃত্রিম রঙিন লাইটে গোটা ছাদ আলোয় জ্বলজ্বল করছে। সম্পূর্ণ ফাঁকা ছাদের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সোরায়া- গায়ে হালকা সবুজ ও কমলা রংয়ের লেহেঙ্গা, আর হালকা কিছু গহনা। কার্ল করা চুল গুলো অতিরিক্ত হওয়ায় অবাধ্য রূপ নিয়েছে। সোরায়া ছাদে এসেছে বড় জোড় ২-৩ মিনিট। মিরাকে ছাদের কোনো কোণাতেই দেখতে না পেয়ে সে হতাশ। মনে মনে ভাবলো, হয়তো মিরা তার আসার আগেই নিচে নেমে গেছে নিজের ঘরে। সোরায়া আর দাঁড়ানোর প্রয়োজন বোধ করলো না। লেহেঙ্গার দুই দিক নিজের হাতের মুঠোয় তুলে পিছন ফিরলো ছাদ থেকে প্রস্থান করতে।
হঠাৎ ছাদের লোহার দরজাটা বিকট আওয়াজ করলো- কেউ দরজা খুলছে। সোরায়া মিটিমিটি চাইলো দরজার দিকে। টোটাল ফোর্মাল ড্রেসআপে একজন ব্যক্তি। ছাদে প্রবেশ করে দরজাটা চাপানোর সময় তার প্রসস্থ পিঠ সোরায়ার নজরে পড়লো দূর থেকে। এসময় ছাদে কে আসতে পারে না বুঝে সোরায়া শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
"কে ওখানে..? এসময় ছাদে কি?"
অচেনা মানুষটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল-
"একজন অধৈর্য বর। নিজের হবু বউ কে একনজর দেখতে এসেছি। ছাদ ব্যতীত তাকে এখন একা পাওয়া মুশকিল ছিল।"
সোরায়া মাহিরের দিকে কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল। কি হচ্ছে! চোখের সামনে যাকে দেখছে সে কি সত্যিই এসেছে তার কাছে? নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না তার। মাহির বিমোহিত চাহুনিতে সোরায়ার মুখোশ্রীর দিকে তাকিয়ে আনমনে বলল-
"মাশাআল্লাহ..কি অদ্ভুত মারাত্মক..!"
সোরায়া সাথে সাথে নিজের মাথা নিচু করে নিলো দ্বিধা ও লজ্জায়। উভয়ের হৃদস্পন্দনের গতির তীব্রতা আকাশ চুম্বি। সোরায়া মাথা নিচু করেই নরম স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-
"এই সময় কেন এলেন? কেউ দেখে ফেললে হাসাহাসি করবে।"
মাহির মুচকি হেঁসে দৃঢ়তা সহিত বলল-
"না আসার জন্য হাজার কারণ ছিল কিন্তু আসার জন্য ছিল শুধু একটা কারণ- তুমি..! পৃথিবীর ৮ম আশ্চর্য সৌন্দর্য দেখতে এই একটা কারণই যথেষ্ট ছিল।"
সোরায়া মাথা তুলে মাহিরের দিকে তাকালো। মেয়েটার দুচোখ ছলছল করছে। হয়তো অতিরিক্ত আনন্দে। মাহির নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে তার দু বাহু উন্মুক্ত করে সোরায়া কে নিজের দিকে ডাকলে সোরায়া মনের ডাকে ছুট্টে মাহিরের কাছে গিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। দুজনেই একে অপরের সংস্পর্শে এসে শান্তি শৃঙ্গের চূড়ায় নিজেদের অনুভব করলো। সোরায়ার মাথায় হাত রেখে মাহির দুচোখ বন্ধ করে একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলল-
"মনে হচ্ছে, যেন জানে জান ফিরলো এতোক্ষণে।"
সোরায়া মাহির বুকে মুখ লুকিয়ে লাজুক হেঁসে বলল-
"শুধু শুধু আজ এলেন কেন? আপু, রিমি আপু, ভাইয়ারা আপনাকে দেখলেই মজা উড়াবে।"
মাহির সোরায়া কে আরো শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে সে কথা তুচ্ছার্থে উড়িয়ে দিয়ে বলল-
"Now that you are in my arms.. It's all gonna be worth it.."
একটা দীর্ঘ আলিঙ্গনে তাদের মূল্যবান কিছু সময় ব্যয় হলে মাহির সোরায়াকে নিজের থেকে আলগা করে মেয়েটার কপালে একটা ছোট্ট স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে বলল-
"আল্লাহ, আমার জান বাচ্চার যেন কারো নজর না লাগে। মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ..!"
সোরায়া বাচ্চাদের মতো ফ্যাল ফ্যাল করে মাহিরের দিকে তাকিয়ে কেবল হাসছে। তার এটা ভেবেই খুশি লাগছে যে মাহির তার সাথে দেখা করতে এসেছে, যা সে চাইছিল। মাহির সোরায়ার হাস্যোজ্জ্বল মায়া ভরা মুখটার দিকে তাকিয়ে সোরায়ার গালে টেনে সাবধান করে বলল-
"এভাবে তাকিয়ে মায়া লাগানোর চেষ্টা করে লাভ নেই। আমি এর চেয়ে বেশি আদর করবো না এখন। বাড়ন আছে।"
সোরায়ার গাল দুটো মাহিরের কথায় লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। মাথা নিচু করে নিয়ে মনে মনে চিন্তা করলো- সে তো কিছু করার চেষ্টা করছিল না তাহলে মাহির তাকে এটা কেন বলল!? নির্ঘাত তার নিজেরই ইচ্ছে করছে আদর করতে কিন্তু এখন তার সুযোগ নেই বলে সোরায়ার উপর দিয়ে বিষয়টা কাটিয়ে যাচ্ছে। সোরায়াও উল্টো ভাব দেখিয়ে বলল-
"আমি মোটেও মায়া লাগানোর চেষ্টা করছিলাম না। আর আমার আদরের ও দরকার নেই। হুহহ্!"
মাহির বাঁকা হেঁসে সোরায়ার দিকে ঝুকে মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল-
"মায়ায় তো সেই কবে থেকে পড়ে আছি। আর বাকি রইল আদর..সেটার হিসেব কাল থেকে শুরু হবে। তুমি নিজ দায়িত্বে বুঝিয়ে দিও, আমি নিজ অধিকারে বুঝে নিব।"
সোরায়া চট করে চোখ দুটো বড় বড় করে মাহিরের দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা শব্দে জিজ্ঞেস করলো-"এ্যাঁ...মা..মানে?"
মাহির সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বলল-
"আজকের জন্য এতো টুকু ইনফরমেশন এনাফ। এখন এই ছোট্ট মাথায় এর বেশি প্রেশার নিলে বেডিতেও এফেক্ট পড়বে। I just can't afford that..You know?"
সোরায়া শুধু শুনেই গেল বলার মতো কিছুও মুখে আসছে না। যাকগে সে এখন খুব খুশি নিজের মনের স্বান্তনায়। দুজন ছাদের দোলনায় বসে দুলতে লাগলো। বেশ আপন মনে একজন আরেকজনকে নিজেদের বাড়ির মজার কাহিনী গুলো সাজানো গোছানো ভাষায় বলল কি কি হয়েছে। সোরায়া বেশ আগ্রহ নিয়ে সকালে তার আর রুদ্রর ঘটনাও বলল- তা শুনে মাহিরের হাসি থামার নামই নিচ্ছে না। এভাবে করে কখন সময় পার হলো দুজনের কেউই টের পেল না। হঠাৎ মাহির নিজের থেকে উদ্যোগ নিয়ে সোরায়াকে জিজ্ঞেস করলো-
"জান..একটা প্রশ্ন সব সময়ই আমার মাথায় ঘুরপাক খায়। কখনো জিজ্ঞেস করা হয় নি তোমাকে আজ করি?"
সোরায়া মাহিরের বাহু জড়িয়ে বসে ছিল তখন। মুখ টা উঁচু করে মাহিরের দিকে তাকিয়ে সম্মতি দিল-"হুম..!"
-"কলেজের প্রথম দিনে ক্লাস রুমে টিচার ও স্টুডেন্ট হিসেবে প্রথম দেখে হওয়া থেকে আজকে একে অপরকে বিয়ে করার বিষয়টা তোমার স্বপ্নের মতো লাগে না?"
সোরায়া মাহিরের কথায় হালকা হাসলো। তার পর দোলনায় লেহেঙ্গা সামলে পা তুলে মাহিরের দিকে করে বসে মাহির কে উৎসাহিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
"আপনাকে কে বলেছে আমি আমার ক্লাস টিচার এর প্রেমে পড়েছিলাম?"
মাহির অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"তো আমি কে?..আমি তো তোমার ক্লাস টিচারই ছিলাম। তুমি আমার প্রেমে পড়নি তো কার..!"
মাহিরের কথা সম্পূর্ণ হতে না দিয়েই সোরায়া আগে আগে বলল-
"ওয়েট ওয়েট, আমি আমার ক্লাস টিচার এর প্রেমে পড়িনি। আমি যার প্রেমে পড়েছিলাম, ভাগ্যক্রমে সে আমার ক্লাস টিচার হয়ে গেছিল। আর দুটো মানুষই আপনি ছিলেন।"
মাহির মাথায় সব হিসেব কেমন গুলিয়ে গেল। সোরায়ার কথায় আগা গোড়া কিছু খুঁজে পেল না। সোরায়া মাহিরের চোখে মুখে আশ্চর্য ভাব দেখে নিজের থেকে পরিষ্কার করে বিষয়টা তাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো-
"আচ্ছা, আমি বুঝিয়ে বলছি। কলেজে আপনার জয়েনিং ডেটে আপনি রাস্তায় এক বৃদ্ধ দম্পতি কে সাহায্য করেছিলেন কিছু বখাটে লোকদের থেকে বাঁচিয়ে, মনে আছে?"
মাহির নিজের স্মৃতির উপর জোর দিয়ে সেদিনের কথা মনে করার চেষ্টা করলো। কিন্তু অনেক আগের ঘটনা ছিল বলে ঠিক তেমন কিছুই মনে পড়লো না। তবে সোরায়া যা বলছে এমন কিছু সে একবার করেছিল তা খেয়াল আছে। সেটা যে কলেজের জয়েনিং ডেটের ঘটনা তা ঠিক খেয়াল নেই। মাহির সোরায়ার কথায় হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে সম্মতি দিলে সোরায়া খিলখিলিয়ে হেঁসে বলল-
"সেদিন রিক্সায় বসে আপনাকে মারামারি করতে দেখে তো আমি পুরোই ফিদা হয়ে গেছিলাম। রাস্তায় অচেনা একজন মানুষের উপর ক্রাশ খেয়ে তার সাথে আর দেখা হবে না মেনে নিয়ে বেজার মুখে কলেজে এসে ক্লাস রুমে বসতেই সেই মানুষটা আমার টিচার হয়ে আমার সামনে এলো। আর আজ.,সে আমার বর। (ভাব নিয়ে আকাশ পানে চেয়ে ভাবুক মুখ করে বলল) উমম্..ঠিকই বলেছেন, স্বপ্নের থেকে কম কিছু না।"
মাহিরের চোখে সোরায়ার বলা প্রতিটা শব্দ খুব জোরে প্রতিধ্বনিত হলো। চোখের সামনে কয়েক মিনিটে সম্পূর্ণ ঘটনা কল্পনা করলো। সত্যিই তো, স্বপ্নের থেকে কম কি?! মাহির সোরায়ার দিকে তাকিয়ে তার অতীতের রূঢ় ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত হয়ে বলল-
"সোরা..জান I am so sorry...আমি কল্পনাও করতে পারবো না। এতো মন থেকে কাউকে চাওয়ার পর তার অমানবিক আচরণ তোমাকে ঠিক কতটা কষ্ট দিয়েছে।"
সোরায়া মাহিরের কাতর কণ্ঠ শুনে হেসে বলল-"Thank you for that..."
-"Thank you for what?"
-"বাহ রে, যদি আমাকে না বোকতেন আমি কি দূরে যেতাম? দূরে না গেলে কি আপনি আমার প্রয়োজনীয়তা বুঝতেন? প্রয়োজনীয়তা না বুঝলে কি কখনো আমাকে নিজের করে চাইতেন? নিজের করে না চাইলে কি আমরা আজ এখানে বসে থাকতাম? আর না কাল আমাদের বিয়ে হতো? কিচ্ছু হতো না। So thank you.."
মাহির হা হয়ে কেবল শুনে গেল মেয়ে টার কথা। এই ছোট্ট বয়সে তার কথার ধরন যত সাবলীল মানে তত গভীর অথচ একফোঁটা উপলব্ধি নেই। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোরায়া কে আবার জিজ্ঞেস করলো-
"আরেকটা প্রশ্ন ছিল.. করবো?"
-"হুম...!"
-"তুমি কি ছোট থেকেই এতো সুন্দর? না আমার প্রেমে পড়ার পরে হয়েছো?"
সোরায়া খিলখিলিয়ে হেঁসে দুই হাতে মুখ লুকিয়ে নিয়ে লজ্জায় বলল- "যাহ্..! আমার লজ্জা করে না বুঝি?"
মাহির সোরায়া কে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে যাবে ঠিক তখনই তাদের দরজা খোলার শব্দ হলো।
-"হাবি.. মেহেদী আর্টিস্ট যে একজন ছেলে তা তো বলেন নি আগে। আর ছাদেই যেহেতু মেহেদী পড়া হবে এতো কষ্ট করে স্টেজ কেন সাজালাম বলুন তো?"
মিরার গলার আওয়াজে মাহির আর সোরায়া হকচকিয়ে দোলনা থেকে নামলো। সোরায়া মাহিরের পিছনে বৃথা লুকানোর চেষ্টা করলো। মিরা আর মিরার ঠিক পিছন পিছন রায়ান বন্য স্বামীর মতো মাহির আর সোরায়ার দিকে এগিয়ে আসছে। মাহির চোখের ইশারায় রায়ানের দিকে চাইলো-
"এইসব কি ভাই..?"
রায়ান ইশারায় অদৃশ্য হাত জোড় করে যেন মিনতির সুরে মাহির কে বলল-
"Sorry রে ভাই, happy wife happy life.."
মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে যাবে তার আগে রায়ান নিজের থেকে মিরার পক্ষ থেকে নাটকীয় কণ্ঠে বলল-
"আরে জামাই রাজা যে..আপনি এখানে?"
মিরা বুকে আড়াআড়ি হাত বেঁধে রায়ানের কথায় তাল দিয়ে বলল-
"মৌমাছি তো মৌচাকের আশেপাশেই থাকে। এ আবার নতুন কি..!"
সোরায়া মাহফিলের পিছন থেকে উঁকি দিয়ে মিরার দিকে দেখলো। মিরাও সোরায়া কে দেখলো। সোরায়া খবর লুকিয়ে গেলে মিরা ভাব নিয়ে বলল-
"কি ভেবেছিলেন শুনি? আমার চোখ ফাঁকি দেওয়া এতো সোজা হবে?"
সোরায়া নিজের ভয়কে সাইডে রেখে মাহিরের পিছন থেকে বেরিয়ে এসে বলল-
"আমাদের কি ৫ মিনিটের প্রাইভেসি দেওয়া যায় না? কেমন ভাই বোন তোমরা?"
মিরা সোরায়া কে ধমক দিয়ে বলল-
"সোরা, বেশি কথা না বলে নিচে চল। মেহেদী আর্টিস্টরা এসে বসে আছে। তোর শশুরবাড়ি থেকে কাজিনরাও ভাবিরা এসেছে আর নতুন বউয়ের খবর নেই।"
রায়ান মাহিরের উদ্দেশ্যে বলল-
"জামাই বাবাজি..আপনিও আসুন। দেখা করার সময় শেষ। বাকি টা নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেরে নিয়েন কেমন? আপনারই আমানত। আপনার বাড়িতেই যাবে।"
রায়ানের কথা মাহির পোরায়ার দিকে তাকানোর সাথে সাথে সোরায়া লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। মিরা মাহির আর সোরায়ার দিকে এগিয়ে গিয়ে খেপানোর উদ্দেশ্যে বলল-
"এক রাতের ব্যাপার মাত্র। এইটুকু সবুরও হচ্ছে না আপনাদের?"
মিরার পিছন দিয়ে রায়ান ও এগিয়ে এসে ভাব নিয়ে বলল-
"সেটাই তো আমাকে দেখ.. কিছু শেখ আমার থেকে। দশটা বছর অপেক্ষা করেছি..!"
মিরা চটে গিয়ে পিছন ঘুরে বলল- " কিসের অপেক্ষায়? ডিভোর্সের? এসব শিখবে?"
রায়ান উল্টো ধমক দিয়ে বলল-"ওই.. ফালতু কথা তুলো কেন? ওইটা আমি ছিলাম না।"
-"তো কে ছিল?"
-"আরে আমি একটু হ্যান্ডসাম তো তাই এক পরী আমাকে সিঙ্গেল পেয়ে খপ করে ধরে ফেলেছিল। ওইটার প্ররোচনায় একটা ভুল হয়ে গেছে। আমি আসলে নির্দোষ।"
মিরা রায়ানের সহজ স্বীকারোক্তিতে না চাইতেও হেঁসে দিল। সাথে সোরায়াও মুখ টিপে হাসলো। মাহির মিরার কাছে মিনতি করে বলল-
"মিরা ভাবি, আপু, আমি সরি। আসলে আমি সোরা কে খুব মিস করছিলাম। আর থাকতেও পারি নি। একটু ম্যানেজ করে নিন এখন সবাইকে। প্লিজ প্লিজ।"
-"আপু, প্লিজ, চাচি চাচা, আর মামণি বাবাকে কোনো মতো বুঝিয়ে দাও।"
মিরা মাহিরের ব্যাপারে সবকিছু সবাইকে জানিয়েই ওদের ছাদে থেকে নিচে নিয়ে এসে যা মাহির আর সোরায়া জানে না। মিরা একটু ভাব নিয়ে বলল-
"আচ্ছা হয়েছে। চল এবার। দেরি হয়ে যাচ্ছে। কখন মেহেদী পড়বো কখন নাচগান হবে! তাড়াতাড়ি নিচে চল।"
এরপর আর কি ! তারা সবাই নিচে নামলো।
_______
রহমান বাড়ির ড্রয়িং রুম এখন পরিপূর্ণ হয়ে ভরে উঠেছে। চারপাশে গোলাপ আর রজনীগন্ধার মালা ঝুলছে, সাদা ও হলুদের আলোয় পুরো পরিবেশটা আরও উষ্ণ আর উৎসবমুখর লাগছে। মাঝখানে বড় করে সাজানো মেহেদীর আসর—নরম কুশন, রঙিন চাদর আর ফুল দিয়ে ঘেরা। সেখানে বসে আছে মিরা, রিমি আর সোরায়া; তিনজনের মুখেই আলাদা আলাদা উচ্ছ্বাসের আভা। মেহেদী আর্টিস্টরা একমনে নিজেদের শৈল্পিক কাজে ব্যস্ত। মিরা মাঝে মাঝে হাত উঁচু করে নকশা দেখছে, রিমি নিজেরটার পাশা পাশি বাকিদের পাও দেখছে। একজন আরেক জনের টা দেখে পরখ করছেন কার্টা বেশি সুন্দর হচ্ছে। আর দেখে মুগ্ধ হয়ে হাসছে, এদিকে সোরায়ার দুহাতে দুই মেহেদী আর্টিস্ট বসেছে, কনে বলে কথা। সবাই প্লেন করে তাদের হাতে তাদের স্বামীরর নাম লিখালো। মিযা আর রিমি একটু প্লেন করেই মেহেদীর ডিজাইনের ভেতর লুকিয়ে রায়ান আর রুদ্রর নাম লিখালো। সোরায়ার তো সে সুযোগ নেই। মাহির বলেছে দুই হাতে বড় করে যেন তার নাম লিখা থাকে, সবাইকে বোঝাতে হবে না. সে কার বউ!
চারদিকে মেয়েদের হাসি-ঠাট্টা থামছেই না। কেউ মেহেদি শুকোতে শুকোতে ফুচকা খাচ্ছে, কেউ ঝালমুড়ি হাতে গল্পে মশগুল, কেউ আবার জুসের গ্লাস সামলে এক হাতে নকশা বাঁচিয়ে বসে আছে। ছোট ছোট বাচ্চারাও এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে এসে বড়দের হাতে মেহেদী দেখছে বিস্ময়ে। এক পাশে স্পিকারে বাজছে প্রাণখোলা গানের তালে তালে কয়েকজন নেচে উঠেছে। তালি, উল্লাস আর হাসির শব্দে পুরো বাড়িটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রিমিকে টেনে নাচের দলে নেওয়া হয়েছে, সোরায়া হাতভর্তি মেহেদী নিয়েই কোমর দুলিয়ে উঠেছে, আর মিরা বসে বসেই হেসে তাদের দেখছে। সামান্য একটু বিরতি তে সবাই মেহেদী দেওয়ায় মনোযোগ নিবেশ করলে হঠাৎ গান বাজলো-
"Mehedi Laga ke rakhna..
Doli saja ke rakhna..."
সবাই বিস্ময় যে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলো মাহির ফোর্মাল ড্রেস চেঞ্জ করে পাঞ্জাবি আর গলায় ওড়না পেঁচিয়ে স্টেজের উপর। সোরায়া হা হয়ে মাহফিলের দিকে তাকিয়ে আছে। তবে গান অব্যাহত থাকলো-
"Mehedi Laga ke rakhna..
Doli saja ke rakhna...
Lene tujhe o gori
Aayenge there sajna"
এর পর তার সাথে রায়ান আর রুদ্র ও একই ভাবে এন্ট্রি নিলো স্টেজে। মিরা আর রিমির চোখ ও ছানা বড়া। রায়ান রুদ্র মাহির স্টেজে জিতে যাওয়া ভাব নিচ্ছিল দেখে মিরা বসে থেকেই গানের লাইনে লিপসিং করলো-
"Sehra saja ke rakhna..
Chehara chupa ke rakhna.."
এবার সাথে রিমিও যোগ দিল-
"Sehra saja ke rakhna..
Chehara chupa ke rakhna..
Yeh Dil ki bat apne,
Dil mein daba ke rakhna.."
রুদ্র রিমির হাত ধরে রিমিকে তুলে টেনে এনে স্টেজে তুলে তার উদ্দেশ্যে গাইলো-
"Udh udhke Teri zulfeun..
Karti hain Kya isharee..
Dil thake khade hain..
Ashiq sabhi kanware..
তখন রিমি-
"Chup jaaye sari kudiyan..
Gharme mein sharam me mare..
Gaon mein AA gaye hain..
Pagal shehar ke sare.."
রুদ্র- "Nazrein jhuka ke rakhna..
Daman bachake rakhna..
"Nazrein jhuka ke rakhna..
Daman bachake rakhna..
Lene tujhe o gori
Aayenge there sajna"
এবার রায়ান মিরার কাছে গিয়ে বসে থাকে হেয়ালি করে কাঁধে ধাক্কা দিয়ে গাইলো-
"Main ek Jawan ladka..
TU ek haseen ladka..
Yeh Dil machal gaya to..
Mera kusoor Kya hai.."
তখন মিরা উল্টো জবাবে গাইলো-
"Rakhna tha Dil pe kabu..
Yeh husn to hai Jadu..
Jadu..yeh chal geya to..
Mera kusoor Kya hai.."
মাহির সোরায়ার সামনে গিয়ে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে-
"Rasta hamara takan..
Darwaja khula rakhna..
Rasta hamara takan..
Darwaja khula rakhna..
Lene tujhe o gori
Aayenge there sajna"
তখন সোরায়া-
"Kuch or abna khehna..
Kuch orna ab Karna..
"Kuch or abna khehna..
Kuch orna ab Karna..
Yeh dil ki bat apne..
Dik Mai daba ke rakhna ..
চলবে..
এই পর্যন্তই পরে টুকু পরে দিবো নি। আজকের জন্য ২k কমপ্লিট করে দিও কেমন। আর কমেন্ট করে নিজেদের মতামত জানিও। Love you pakhis ❤️ 🥰
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_75 (3rd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
এই যে নাচ গানের শুরু হলো আর থামলো না। যে যার যার মন মতো গানে মন খুলে নাচছে। তবে মিরা, রিমি সোরায়া ঠায় বসে আছে নিজেদের হাত পেতে। তিনজন একটু পর পর ভারী চাহুনিতে একে অপরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে যাচ্ছে। মন যেন টিকছেই না আর। ইচ্ছে করছে ছুট্টে স্টেজে উঠে গানের তালে তাল মেলাতে। কিন্তু কথায় আছে না- বিউটি ইজ পেইন..! কথাটা তারা এখন হারে হারে টের পাচ্ছে। হাতের মেহেদী লাগানো এখনো মাঝে পথে। মেহেদী আর্টিস্টরাও ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণ পর পর ব্রেক নিচ্ছেন। তাদের জন্য হালকা নাস্তার আয়োজন করা হয়েছিল এর মাঝে। এখন একনাগাড়ে বসে থাকায় মিরার বেশ খিদে পেয়ে গেছে। মেয়েটা এমনিতেই অন্তঃসত্ত্বা, তার উপর সকাল থেকে কিছু না কিছু করেই যাচ্ছে অথচ খাওয়ার মধ্যে তার আট আনার কদরও নেই। মিরা করুন মুখে রিমির দিকে তাকালো, সেই বেচারির মুখ ও মলিন হয়ে আছে। আনন্দের মাঝে খিদে অনুভব না হলেও পেট যে খালি তা মুখ প্রমাণ দিচ্ছে। রিমির চোখ মিরার চোখে পড়তেই রিমি খেয়াল করলো মিরা বেশ মনমরা হয়ে গেছে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে। মিরার শরীরের অবস্থা চিন্তা করে রিমি একটু সিরিয়াস হয়ে মিরাকে জিজ্ঞেস করলো-
"মিরু..জান, কি হয়েছে তোর? হঠাৎ চুপ করে গিলি যে! শরীর খারাপ করছে?"
রিমির কথায় মিরার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
"আমার না কেমন খিদে খিদে পাচ্ছে রে..! এইটা এখন আমার ওনাকে বললে খুব রাগ ঝাড়বে আমার উপর। আগেই বলেছিল খেয়ে নিতে, কিন্তু আমার খেয়াল ছিল না। এখন খুব খিদে পাচ্ছে।"
-"আরে কি যে বলিস তুই..! রায়ান ভাইয়া তোর খাওয়া নিয়ে যে পরিমাণ আগ্রহ দেখায়..নাসা বিজ্ঞানীরা মহাকাশ নিয়েও এত আগ্রহ দেখায় না মনে হয়।"
মিরা রিমির কথায় মনে মনে এক মত প্রকাশ করলো। সত্যিই, শুরু থেকে এখন অব্দি রায়ান কখনো মিরার খাদ্যাভ্যাসে অনিয়ম দেখতে পারে না। হয়তো রায়ানের লাভ ল্যাঙ্গুয়েজই এটা- "বউ ঠিক মতো খাচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা।" রিমি মিরাকে খাবার আনানোর জন্য বলল-
"মিরু, তুই ভাইয়াকে ডেকে বল একটু কিছু খাওয়ার জন্য আনতে।"
-"তোদের খিদে পায় নি? বনু কে জিজ্ঞেস করতো কিছু খাবে কিনা? সেই কখন খেয়েছে মেয়েটা।"
রিমি সোরায়াকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো-
"সোরা..তোর কি খিদে পেয়েছে? কিছু খাবি..?"
সোরায়া মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝালে রিমি মিরাকে স্পষ্ট করে বলল-
"হ্যাঁ, খাবে বলছে। আমারও বেশ খিদে পেয়েছে।"
মিরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে পড়লো। তিন জনের দুই হাতেই মেহেদী তাহলে খাবে টা কিভাবে! ঠিক তখনই ভীরের ঘনঘটা সরিয়ে রায়ান একহাতে প্লেট ভর্তি করে বিরিয়ানী আর অন্য হাতে একটা বড় পানির বোতল এনে ঠিক মিরার পাশে তার গা ঘেঁষে বসলো। মিরা অবাক হয়ে একবার রায়ানের হাতের দিকে আবার রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান হাতের বোতল টা নিচে রাখতে রাখতে সব মেহেদী আর্টিস্টকে উদ্দেশ্যে করে বিনয়ী কণ্ঠে বলল-
"আপু, আপনারা অনেকক্ষণ ধরে কাজ করছেন। গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিন এবার। আপনার গুনধর ক্লায়েন্ট সারাদিন খাওয়ার অনিয়ম করেছে আজ। অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে একটু খেয়ে নিক আগে, পরে না হয় কন্টিনিউড করবেন।"
রায়ানের কথায় মিরা সরু সরু চোখে তাকিয়েই রইল। মেহেদী আর্টিস্টরা উঠে নিজেরা খাওয়ার জায়গায় চলে গেলেন। রিমি সোরায়া মিরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। রিমি মজা করে বলল-
"হ্যাঁ ভাইয়া , ভালো করে খাওয়ান তো। ওর নাকি ভীষণ খিদে পেয়েছে। তাই না মিরু?"
মিরা রিমির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। রিমি মুখে হাত দিয়ে হাঁসি আড়াল করার চেষ্টা করলো। রায়ান মিরার দিকে দেখলো একনজর। বান্ধবী খেপাচ্ছে এখন যদি সেও তাল দেয় তাহলে মিরার মন খারাপ হবে ভেবে মিরাকে ডিফেন্ড করে বলল-
"আমার বউয়ের পিছনে লাগা বন্ধ করো। খিদে কি ওর একার লেগেছে নাকি? আমার বাচ্চা টার ও তো খিদে পায়।"
সোরায়া শালির আচরণ ধরে রেখে রায়ান কে খোঁচা মেরে বলল-
"হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝেছি, তুমি তোমার বউ বাচ্চা কেই খাওয়াও। খিদে তো আমাদের ও পেয়েছে কই আমাদের নিয়ে তো কেউ ভাবে না।"
-"জান তোমার খিদে পেয়েছে তুমি আমাকে আগে বলতে পারতে না?"
সোরায়া মাহিরের কণ্ঠ পেতেই দরজার দিকে তাকালো। মাহির ও হাতে খাবার নিয়ে ঢুকলো। পিছন পিছন রুদ্র ও প্রবেশ করলো। সোরায়া রিমি পুরো অবাক। রায়ান সোরায়ার কথার মজা বানিয়ে বলল-
"তোদের খিদে পেলে সেটা দেখার জন্য তোদের বর রা আছে। আমার দেখে কাজ নেই।"
রায়ান কথাটা বলে খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে কিছু টা খাবার পাকিয়ে মিরার মুখের সামনে ধরে বলল-
"হা করো..!"
মিরা আবেগী হয়ে বাধ্য মেয়ের মতো হা করলো। রায়ান তার মুখে খাবার টা পুরে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আমার পাখিটার সত্যিই কি খুব খিদে পেয়েছিল?"
মিরা চিবোতে চিবোতে মাথা উপর নিচ নেড়ে হ্যাঁ বলল। সাথে নিজেও কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আমার খিদে পেয়েছে সেটা আপনি কি করে জানলেন? খাবার নিয়ে এলেন যে।"
রায়ান আবার মিরার মুখে খাবার তুলে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল-
"তোমার খিদে পেয়েছে তাই খাবার এনেছি এমন কিছু না। তোমার এখন খিদে না থাকলেও খাওয়াতাম আর তোমাকে খেতেও হতো।"
মিরা শুধু চিবিয়েই গেল এরপর। আর একটা বারতি কথা বলল না। রায়ান মিরাকে চুপচাপ খেতে দেখে মিরার উদরের দিকে তাকিয়ে অদৃশ্য ছোট্ট আত্মাকে বলল-
"প্রিন্সেস, খুব কষ্ট হয়েছে আজ তাই না? খিদে পেয়েছিল খুব..? পাপা কয়েকদিন ধরে ঠিক মতো তোমার প্যাম্পার করতে পারছি না। আর আজকে তো.."
সম্পূর্ণ কথাটা শেষ না করে মিরার মুখের দিকে চাইলো। বোকা বোকা চাহুনিতে মেয়েটা তার দিকেই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে, যেন বোঝার চেষ্টা করছে রায়ানের কথাগুলো। ঠোঁটের কোণে খাবার দানা লেগে আছে দেখে রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে তা পরিষ্কার করে দিয়ে নিজের কথা শেষ করলো-
"থাক প্রিন্সেস, মাম্মার উপর অভিমান কোরো না কেমন? তোমার মাম্মাও তো ছোট্ট এখনো। পাপা এরপর থেকে আরো খেয়াল রাখবো। ঠিক আছে? অনেক ইয়াম্মি ইয়াম্মি ট্রিট দিবো। Now, eat and grow bigger and healthier.."
এরপর সে পুরোপুরি মিরাকে খাওয়ানো তে মনোযোগ দিল।
এইদিকে রুদ্র আর মাহির ও একই কাজে লেগেছে। শুধু কী খাওয়া! খাওয়ার পাশাপাশি উড়ন্ত চুলের গুচ্ছ সামলাচ্ছে, মেহেদীর নকশার প্রশংসা করছে, অনবরত গল্প করে যাচ্ছে যেন তারা বিরক্ত না হয়। সোরায়ার অবস্থা তো এমন যেন ঘুমিয়েই যাবে। অনেকক্ষণ বসে ছিল বলে মাহির তার পিঠের দিকে একটা কুশন দিয়ে গা হেলিয়ে বসতে দেওয়ায় এখন শুধু খাবার মুখে নিয়ে চোখ বন্ধ করেই চিবিয়ে যাচ্ছে। মুখের টুকু শেষ হলে মাহির টেনে তুলে আবার মুখে খাবার দিচ্ছে। রিমির ও এক অবস্থা রুদ্র রিমির দিকে নিজের কাঁধ এগিয়ে দিয়ে তাঁকে ইশারায় মাথা ঠেকিয়ে রাখতে বলল। রিমিও মাথা ঠেকিয়ে রাখলো। মিরা তো রায়ানের বাহু জড়িয়ে ধরে সেই বলিষ্ঠ, শক্ত পোক্ত বাহুতেই মাথা ঠেকিয়ে খেয়ে যাচ্ছে শুধু। রায়ান, রুদ্র, মাহির একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তিন জনে একসাথে তাদের নিজ নিজ অর্ধাঙ্গিনীর দিকে তাকিয়ে একসাথে আওড়ালো-"কি একটা অবস্থা?!"
রায়ান এদের এমন ঝিমিয়ে পড়তে দেখে জোড়ে চেঁচিয়ে ডিজেকে বলল-
"ভাই এটা তো একটা বিয়ে বাড়ি নাকি? সবাই তো ঝিমিয়ে পড়েছে আপনাদের চট্টগ্রামের বিয়ে বাড়ি কি এমন হয় নাকি?"
নিজের হোম টাউন নিয়ে খোটা শুনে মিরা আর সোরায়া সঙ্গে সঙ্গে মাথা চাড়া নিয়ে উঠে বাঁকা চোখে রায়ানের দিকে চাইলো। রায়ান নিজেকে তাদের দৃষ্টির কেন্দ্র বিন্দু হিসেবে আবিষ্কার করতেই নিজের মুখে তালা দিল। রায়ানের কথায় ডিজে সিলেক্ট করে রাখা গান গুলো বাজানো শুরু করলো। গানের টিউন বাজতেই মিরা চিৎকার করে উঠলো -
"রিমি, বনু আমাদের সিলেক্ট করা সং..!"
রিমি আর সোরার হুস ফিরলে। তারা কান খাড়া করে বড় বড় চোখ করে মিরার দিকে তাকালো। উচ্চ স্বরে গানের প্রথম লাইন বাজলো-
"AAA re Pritam piyare..
Bandook mein na toh goli mere.."
মেয়ে গুলো একসথে চিৎকার দিয়ে উঠে এক দৌড়ে স্টেজে উঠে গেল। রায়ান রুদ্র আর মাহির হা হয়ে আছে এদের কান্ড দেখে। বেচারা হাতে খাবার প্লেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আর তাদের বউরা স্টেজে উঠে গেছে নাচতে।
-"AAA re Pritam piyare..
Bandook mein na toh goli mere..
AAA re Pritam piyare..
Sab aag toh meri choli mein re..
Jara hukka utha, Jara chillam Jalaaa...
Hayyyy..
Pallu ke niche chupake rakkha hey..
Dikhadu to hanggama hooo.."
বউদের এমন গানে তাল মিলিয়ে নাচতে দেখে ছেলে গুলো হতভম্ব। মেয়েগুলো তো মনের আনন্দে কেবল নেচেই যাচ্ছে। রায়ান মিরার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে তার বউ এতো ভালো বাইক চালানোর পাশাপাশি এতো ভালো নাচতেও পারে তা তো সে জানতো না। চোখের পলক এক মূহুর্তের জন্যও পড়ছে না তার। রায়ান মুগ্ধ দৃষ্টিতে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-
"আমার বউটা এত ভালো নাচে..! কই এর আগে তো আমাকে একবারও নেচে দেখালো না।"
রুদ্র রায়ানের কথার পৃষ্ঠে বলল-
"আরে মিরা কই তেমন ভালো নাচ করছে? রিমির বডি মুভম্যান্ট পুরো এ্যাকুরেট।"
রায়ান বাঁকা চোখে রুদ্রর দিকে তাকালো। রুদ্রর কথায় আবার মাহির প্রতিবাদ করে বলল-
"বডি মুভম্যান্ট হলেই কি নাচ হলো? এ্যাক্সপ্রেশন ম্যাটার করে। এটায় সোরা বেস্ট। ওর নাচ দেখেই তো আমি ফিদা হয়ে গেছিলাম।"
এবার রায়ান রুদ্র একসাথে বাঁকা চোখে মাহিরের দিকে চাইলো। মাহির মোহিত চাহুনিতে সোরায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। যেন নবীনবরণের দিনটা চোখের সামনে ভাসছে। রায়ান তাদের সবার কথার খন্ডন করে বলল-
"আরে তোরা কিসের সাথে কি মিলাচ্ছিস? আমার বউ পুরো তিন মাসের প্রেগন্যান্ট। তার পরও ওর এনার্জি দেখ শুধু। ওর সাথে রিমি আর সোরায়ার তুলনা চলে? আমার হৃদপাখির চোখে মুখে প্রেগন্যান্সির গ্লো দিখছিস? পুরো চোখে বিঁধছে।"
মাহির রুদ্র এবার রায়ানের দিকে বাঁকা চোখে তাকালো। রায়ান ও এক মনে মিরাকে দেখতে ব্যস্ত। মাহির সোজা হয়ে সোরায়ার দিকে তাকিয়ে বলল-
"আর সোরায়ার চোখে মুখে নিউ ব্রাইড গ্লো কি তোর চোখে পড়ে না? আমার তো চোখই ঝলসে যাচ্ছে ওকে দেখে।"
রুদ্র রায়ান আর মাহিরের কথায় বেশ বিরক্ত হলো কারণ তার বলার মতো তো কোনো জায়গা নেই। বেচারা মনে মনে ঠিক করলো তার বউয়ের প্রকৃতিগত একটা গ্লো এর ব্যবস্থা করতেই হবে তার। কিন্তু এই মুহূর্তে আর তার কিছু বলার নেই তাই শান্ত গলায় শুধু বলল-
"হয়েছে হয়েছে, যে যার যার বউকে দেখ তাহলেই হয়।"
রায়ান স্টেজের দিকে এগিয়ে গিয়ে মিরার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিজের কাছে ডাকলো। মিরা উচ্ছসিত হাঁসি মুখে রায়ানের দিকে গিয়ে ঝুঁকে গেল। রায়ান মিরার মুখে খাবার দিয়ে সাবধান করে বলল-
"হৃদপাখি, একটু ধীরে নড়াচড়া করো সোনা। তোমাকে দেখে তো আমার ভয় করছে। বেশি লাফালাফি করা যাবে না এখন।"
মিরা লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নেড়ে আবার রিমি আর সোরায়ার কাছে চলে গেল নাচতে। এভাবে করে রুদ্র আর মাহির ও ফাঁকে ফাঁকে রিমি আর সোরায়া কে খাইয়ে দিতে লাগলো। সময় পার হতে হতে বউদের খাওয়ানো শেষে তারা নিজেরাও খাবার নিয়ে এসে বউদের নাচ দেখতে দেখতে খেয়ে নিল। এর মাঝে তিন জনের তর্ক ও অব্যাহত ছিল-কার বউ বেশি ভালো নাচ করছে এই নিয়ে। খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে মিরা রিমি সোরায়া স্টেজ থেকে নেমে দলবদ্ধ হয়ে ছেলে তিনজনের সামনে গিয়ে একসাথে বলল-
"খালি দেখলে হবে? খরচা আছে।"
রায়ান রুদ্র তাদের কথা বুঝে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করে মাহির কে মাঝে ফেলে দুজন দু দিকে সরে গিয়ে একসাথে বলল-
"যার বিয়ে তার খরচা।"
মাহির পর পর রায়ান রুদ্র দিকে এক নজর তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-
"দুই ভাই মিলে আমাকে সাইড লাইনে করে দিলি তো! এবার দেখ।"
মাহির পকেট থেকে দুটো ৫০০ টাকার নোটের বান্ডিল বের করে একটা মিরার হাতে আর একটা রিমির হাতে দিয়ে ইচ্ছে করে রায়ান আর রুদ্র কে খোঁচা মেরে মিরা আর রিমা কে উদ্দেশ্য করে বলল-
"তা তো অবশ্যই। যার বিয়ে খরচ তো তারই হওয়ার কথা। আমি তো আর অন্য দের মতো তুলে নিয়ে গিয়ে বা হঠাৎ বিয়ে করে ঘরে বউ আনি নি। আমার তো আর শালিদের ঠাকানোর সুযোগ নেই। শালিদের ডিমান্ড অনুযায়ী তারা যা চাইবে তাই পাবে।"
মিরা আর রিমি মাহিরের কথায় মুখ টিপে হেঁসে মাহির কে উৎসাহ দিলো-"ওয়াওওও..what a big heart personality...!"
সোরায়ার মুখে গর্বিত ভাব সাথে ঠোঁটের কোণে একটা হাঁসি লেগেই আছে। মাহিরের কথায় নিজের বউদের সম্মতি প্রকাশ করতে দেখে রায়ান আর রুদ্রর গায়ে ফোস্কা পড়লো। দুজন ভাব দেখিয়ে সোফা থেকে উঠে পাঞ্জাবি টা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়ালো। মাহির আড় চোখে দুজনকে দেখলো একনজর। প্রথমে রায়ান নিজের পকেট থেকে দুটো ১০০০ টাকার নোটের বান্ডিল বের করে একটা রিমির আর একটা সোরায়ার হাতে দিল। আর পরে রুদ্র তার নিজ হাতে মিরার হাতে আর সোরায়ার হাতে ৫০০টাকার নোটের বান্ডিল দিল। রায়ান রুদ্রর কাছে স্পষ্ট বোঝা গেল মাহিরের খোঁচা ঠিক কতটা জোরে লেগেছে তাদের গায়ে। মাহির মনে মনে সফলতার হাসি হাসলো। মিরা রিমি আর সোরায়া একজন আরেকজনের হাতের টাকার বান্ডিলের দিকে তাকিয়ে কুটিল হাসলো। নিজেদের বরের এমন ছোটখাটো খোঁচাখুঁচি তে তাদের লাভই হলো। মিরা দুষ্টু হেঁসে মাহির কে উৎসাহিত করে বলল-
"মাহির ভাই, বলি কি, আপনারা আরেকটু খোঁচাখুঁচি করে আরো কয়েকটা বান্ডিল বের করুন পকেট থেকে।"
রিমি সোরায়া মিরার কথায় সম্মতি দিয়ে মাথা একনাগাড়ে হ্যাঁ সূচক নাড়ালো। ছেলে গুলো কয়েকবার পলক ফেলে তাদের বউদের অবস্থা দেখলো। এখন আর কেউ কিছু বলছে না দেখে মিরা আর কথা না বাড়িয়ে হিহি করে হেঁসে রিমি আর সোরায়াকে উদ্দেশ্যে করে বলল-
"আচ্ছা, থাক। এনারা লেগে থাকুক। আয় আয় আমরা মজা করি গিয়ে। মেহেদী ও শুকিয়ে গেছে। এইগুলো তুলে আবার বাকি টুকু লাগিয়ে নিবো।"
মিরার কথা মতো রিমি আর সোরায়া নিজেদের টাকার বান্ডিল গুলো দিয়ে ভাব নিয়ে মুখে হাওয়া করতে করতে স্টেজে ফিরে গেল। ছেলে গুলো পুরো বোকা বনে গেল যেন। রায়ান মাহিরের মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
"তোর জন্য হলো এসব।"
মাহির উল্টো রায়ানের কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বলল-
"তোরে কি আমি বলছি ভাব মারিয়ে টাকা দিতে? বেশ হয়েছে, তোরই বেশি টাকা গেছে।"
কথাটা বলেই ঠাট্টা করে মাহির আর রুদ্র হেঁসে উঠলো। রায়ানের কথা গেছে বলে আফসোস না হলেও সবার কাছে বোকা হয়ে গেল সেটা সহ্য হচ্ছে না। তার থেকেও বেশি হয়তো গায়ে লেগেছে মিরাও সবার সাথে মিশে তাকে ধোঁকা দিল তাই। ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসতে যাবে তখনি মিরা হুট করে এসে ছেলেটার হাত ধরে টেনে দাঁড়া করিয়ে বলল-
"হাবি, চলুন না। আমার সাথে নাচবেন।"
রায়ান হকচকিয়ে গিয়ে মিরার থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল-
"পাগল নাকি? আমি নাচতে টাচতে পারি না। ছাড়ো হৃদপাখি। এই নিয়ে জোর করে লাভ নেই।"
-"পারতে হবে না আপনার। আমার সাথে শুধু কোমর দোলাবেন। চলুন না।"
রায়ান কিছু একটা ভেবে মিরাকে এক টানে নিজের দিকে টেনে নিল। মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে বলল-
"কোমরে বেশি জোর হয়েছে তাই না? তখন থেকে দেখে যাচ্ছি শুধু। আজ ঘরে চলো একবার, রাতে দেখবো ভালো করে। এখন পাগল কোরো না আমাকে।"
মিরা ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে রায়ানের দিকে পিট পিট করে তাকিয়ে বলল-
"সরি..আর নাচতে বলবো না। ছেঁড়ে দিন।"
রায়ান নিজেকে সামলে নিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে মিরাকে মুক্ত করে দিল। মিরা ছাড়া পেতেই রায়ানের থেকে দূরে চলে গেল। রায়ান মিরা চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে গাইলো-
"তুমি দেখায়াও দেখলা না..
তুমি শুনিয়াও শুনলা না..
তুমি জ্বালা ইয়া গেল মনের আগুন..
নিভাইয়া গেলা না..!"
মিরা পিছন ফিরে রায়ানের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হেঁসে উঠলো। রায়ান মিরার হাঁসি মুখ দেখে বুকের বা পাশে হাত রেখে ঠাস করে সোফায় বসে পড়ে বলল-
"হায়য়য়..!
তারপর দৌড়ে মিরার পিছন পিছন গিয়ে মিরার পাশে কাটিয়ে স্টেজে উঠে যেতে যেতে মিরার উদ্দেশ্যে বলল-
"Watch your hubby My Mrs..!"
এরপর যা হলো মিরা সম্পূর্ণ অবাক। গান বাজলো সাথে রায়ান ও নেচে উঠলো-
"চিকন চাকন মান্জা দোলে গানের তালে তালে..
হায় হায়, গানের তালে তালে।
হাঁসি দিলে টোল পড়ে তোমার দুটি গালে,
চুপি চুপি থাকো তুমি কাছে আসো না,
আসলে তুমি আমায় ভালোবাসো না।
তুমি জ্বালাইয়া গেলা মনের আগুন,
নিভাইয়া গেলা না।"
মিরা মুখে হাত দিয়ে হা হয়ে শুধু দেখছে তার বরকে। এমন হাড় কষ্টা মানুষ তার জন্য নাচছে! ভাবা যায়? মিরার কিছু ছোট বেলার বান্ধবীরাও সেখানে উপস্থিত ছিল। রায়ান মিরার বর জানতে পেরে একজন মিরার পাশাপাশি এসে মিরার কাঁধে হেঁয়ালি করে ধাক্কা মেরে বলল-
"মিরু রে, এটা তোর বর?"
মিরা মিটিমিটি হেসে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো রায়ানের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেই।
-"তাই নাকি? কই আজ অব্দি তো অনলাইনে একসাথে ছবি দিয়ে কোনো পোস্ট করলি না।"
মিরা তার ফ্রেন্ডের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল-
"খালি নজর লাগবে বলে কিছু পোস্ট করি না। (আবার রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল) নাইলে আমার বেডায় যেই মাল..!"
মাঝ পথে কথা থামিয়ে দিয়ে মিরা চুপ করে কথা গিলে নিলো। একটুর জন্য তার ভেতর কার রায়া জেগে উঠেছিল যেন। মিরা কথা বলা থামিয়ে দৌড়ে স্টেজে উঠে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো- "এই...গান থামাও.."
রায়ান এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল। মিরা ডিজের উদ্দেশ্যে বলল-
"কাউন্টার হিসেবে আমি যা গাইবে সেই গান বাজবে।"
রায়ান নিজের দুহাত উঁচু করে নিয়ে সেরেন্ডার করার ভাব ধরলে মিরা বুকে হাত ভাব নিয়ে হাত বেঁধে গাইলো-
"দুইয়ে দুইয়ে চার হয় আর তিনে তিনে ছয়..
ভালো বাসাতে একটু দিওয়ানা হয়ে হয়..!"
রায়ান সম্মতি দিল-"জি জি অবশ্যই মিসেস.. আমি তো আপনার দিওয়ানাই হয়ে আছি সেই কবে থেকে।"
এরপর গান বাজলে মিরা রায়ানের হাত টেনে নিজের কাছে নিয়ে এসে একসাথে নাচতে শুরু করলো-
"দুইয়ে দুইয়ে চার হয় আর তিনে তিনে ছয়..
ভালো বাসাতে একটু দিওয়ানা হয়ে হয়..!
তোমায় দেখে সবই হলো এলো মেলো..
সবই দিয়েছি বাসো না ভালো।
ঘুরছি আমি কোন প্রেমেরই ঘুর্ণিরপাকে,
ইশারাতে শীষ দিয়ে কে ডাকে আমাকে..
ঘুরছি আমি কোন প্রেমেরই ঘুর্ণিরপাকে..
ইশারাতে শীষ দিয়ে কে ডাকে আমাকে.."
অব্যহত রইল তাদের নাচ। এরপর রিমি রুদ্র মাহির সোরায়াও তাদের সাথে যুক্ত হলো। গান বদলালো নাচের দলও বদলিয়ে ছেলেপক্ষ ও মেয়েপক্ষের সৃষ্টি হলো। এমন উৎসব মুখর পরিবেশ দেখে বাড়ির বড়রাও সেখানে এসে হাজির।
ছেলেরা একসাথে-"chunari chunari, chunari chunari.."
মিরা রায়ানের বিপরীতে-
"Meri chunri Lal rang ke sharmaye ghabraye..
Wo Jo dale isqu najariya aur Lal ho jaye.."
আর রায়ান মিরার প্রতি উত্তরে-
"Teri chunri lipat lipat ke Pagal mujhe banaye..
Pahle SE hi tadap Raha tha AUR mujhe tarpaye..!"
মাহির সোরায়ার বিপরীতে-
"Jane tamanna Karna aise setamm..
সোরায়া তার প্রতি উত্তরে-
Kuch na mein Bolu tujhe Meri kasam..
রিমি রুদ্রর বিপরীতে-
"Aai jawani sar pe mere..
রুদ্র তার উত্তরে-
""Tere pe kiya karu jawani be rehem.."
এই রইল অব্যহত ধারা।
মিরা-"aja na chule Meri chunri Sanam.."
রিমি-"Kuch na mein Bolu tujhe Meri kasam.."
সোরায়া-"ayie jawani sar oe mere..."
তিন জন একসাথে-"Tere pe kiya karu jawani be rehem.."
________
রাত-১.৩০~
অনুষ্ঠানের শেষে সবাই নিজেদের হাতে মেহেদি পড়ে নিয়েছিল আর এখন যে যার যার ঘরে। জামা কাপড় ছেড়ে ক্লান্ত শরীর যেন আর চলছে না কারোর। রিমি রুদ্র নিজেদের ঘরে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। মৃদু আলোয় আলোকিত ঘরে বিছানায় শুয়ে রুদ্র রিমির হাত নিয়ে আধো আলোয় নিজের নাম টা পলকহীন ভাবে দেখে যাচ্ছে। রিমি ঘুমন্ত চোখে বাধ্য হয়ে তাকিয়ে আছে রুদ্রর জন্য। রুদ্র আলতো করে রিমির হাতে ঠোঁট ছোয়ালো ঠিক তার নামটার উপর। রিমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
"নিজের নামটা আর কতবার পড়বেন?"
-"সারা জীবন পড়বো। তোমার কি?"
রিমি বিরক্ত কণ্ঠে বলল- "আমারই সব কিছু। এই যে এতটা সময় হাত টা নিজের চোখের সামনে ধরে রেখেছেন for your kind information, এই হাতটা আমার।"
-"এটা আমার বউয়ের হাত।"
-"আপনার বউটা কে শুনি?"
রুদ্র দাঁত বের করে হেঁসে বলল- "এই যে তুমি।"
রিমি নিজের চোখের উপর হাত দিয়ে রুদ্রর হাত থেকে নিজের হাত টা ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-
"রুদ্র প্লিজ, আমাকে হাসানোর চেষ্টা করবেন না তো। হাসলে এখন মাথা ধরে যাবে। ঘুম পেয়েছে আমার।"
রুদ্র বিছানায় ধপ করে উঠে বসলো হঠাৎ। রিমি চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে মাথা তুলে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"কি হলো আবার? উঠলেন যে! ঘুমাবেন না? কাল অনেক কাজ আছে রুদ্র। আমাদের ঘুমানো উচিত।"
গম্ভীর গলায় রুদ্র রিমিকে আদেশ মূলক সুরে বলল-
"উঠে বসো।"
রিমি রুদ্রর এমন গলা শুনে চিন্তিত হয়ে হকচকিয়ে উঠে বসে জিজ্ঞেস করলো-
"কি হয়েছে? কোনো সমস্যা? কিছু চাই আপনার?"
রুদ্র রিমির দুই হাত নিজের হাতে নিয়ে খুব সিরিয়াসলি বলল -
"আমার একটা আলুভর্তা চাই ডালভাত।"
রিমি রুদ্রর কথা ঠিক বুঝে উঠতে পারলো না। রুদ্র মাঝে মাঝেই তাকে আদর করে ডালভাত ডাকে কিন্তু এখন আলু ভর্তা কোথা থেকে এলো সে বুঝতে পারছে না। রিমি দ্বিধায় প্রশ্ন করলো-
"আলুভর্তা চাই মানে? এখন এটা কেন চাই?"
রুদ্র কোনো রকম কপটতা ব্যতীত রিমির দিকে আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গিয়ে বলল-
"তুমি বলেছিলে ডালভাত প্রত্যেক টা মানুষের বেসিক নিড। আমার জীবনে আমার বেসিক নিড, আমার ডাল ভাত আছে। কিন্তু মানুষ মাত্রই লোভী। তাদের তো প্রয়োজনীয়তার সীমা নেই। তাই এখন আমার জীবনে বেসিক নিড ও বেড়েছে। আমি আমাদের আলুভর্তা কে চাই রিমি। দেবে না আমায়?"
রিমি এবার রুদ্রর কথা বুঝলো। আজ প্রথমবার রুদ্র তাদের মাঝে তৃতীয় একটা প্রাণের উপস্থিতি চাইছে। রিমি নিশ্চিত হতে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"তো, এই হঠাৎ নিড বেড়ে যাওয়ার কারণ টা কি শুনি?"
রুদ্র সোজা সাপ্টা উত্তর দিল-
"ভাইয়া বলছিল আজ মিরার চোখে মুখে নাকি প্রেগন্যান্সির গ্লো দেখা যাচ্ছিল। মাহির ভাই বলেছিল সোরার চোখে মুখেও নাকি নিউ ব্রাইড এর গ্লো দেখা যাচ্ছিল।"
-"হুম, কথা তো ঠিকই। তো?"
-"তো মানে? আমিও তোমাকে গ্লো করতে দেখতে চাই। I am so fascinated to see you glowing for our pregnancy.. that's it.."
রিমি রুদ্রর কথায় পারছে না এখন গড়াগড়ি করে হাসতে। যে ছেলের চিন্তা ভাবনা এখনো এতো সরল তার বাচ্চা হলে কি হবে কে জানে। রিমি নিজের হাসি কন্ট্রোল করে রুদ্র কে শান্ত করতে বলল-
"আচ্ছা ঠিক আছে। সেটা পরে দেখা যাবে। আপাতত চলুন ঘুমিয়ে পড়ি। কাল অনেক ব্যস্ত দিন কাটবে।"
-"পরে দেখা যাবে মানে? এইটা যথেষ্ট লং প্রসেস। We need to hurry.."
রিমি অন্য দিকে ফিরে মুখ টিপে হেসে শোয়ার জন্য বালিশ ঠিক ঠাকই করতে করতে বলল-
"আজ ঘুমিয়ে একটু রেস্ট নিবো আমি। যেহেতু লং প্রসেস আমার একটু এনার্জি গেইন করা দরকার তাই না? We will hurry it up later..ok?"
-"later when?"
রিমি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে এক নজর দেখলো। ছেলেটা সত্যিই খুব আশাবাদী এখন। রিমি মনে মনে বিড়বিড় করলো-"এই অধৈর্য মানুষ টাকে কিভাবে সামাল দিই এখন?"
-"বিয়ের ঝামেলাটা শেষ হলে মেইবি!"
-"you mean কাল থেকে?"
রিমি অস্বস্তিতে পড়ে গেল এখন। তার মাথায় ঘুরছে রুদ্র কি একটুও বুঝতে পারছে না যে তার লজ্জা করছে এমন কথায়। রিমি আর কিছু না বলে চুপচাপ রুদ্রর হাত ধরে টেনে ছেলেটাকে শুইয়ে রুদ্রর হাত নিজের কোমরে জড়িয়ে তার পাশে শুয়ে পড়ে বলল-
"আমার লজ্জা করছে। এই নিয়ে আর কিছু বলবেন না প্লিজ। আপনি যা ভালো মনে করবেন আমি তাতে রাজি। Good night.."
রুদ্র সত্যিই বুঝতে পারছিলনা হয়তো কিন্তু রিমির সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তির পর এই নিয়ে আর কথা তুললো না। রিমির এলো মেলো চুল গুলো সরিয়ে মেয়েটার কানের কাছে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে আবেশে নিজেকে সেই চুলের মাঝে ডুবিয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গেল। রিমিও চোখ দুটো বন্ধ করে মন শান্ত করার চেষ্টায় ঘুমিয়ে পড়লো।
___ মিরা-রায়ানের ঘর
চলবে,
পাখিরা, কেমন আছো? কেমন হয়েছে জানি ও। তোমাদের কমেন্ট এখন তেমন দেখতেই পাই না। নিজের অভিব্যক্তি জানি ও। এটাই আমার অনুপ্রেরণা। Love you pakhis ❤️ 🥰