#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_76 1st
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
স্তব্ধ ঘরে ঠিক মাঝবরাবর থাকা প্রসস্থ বিছানাটায় মিরা জুলিয়েট কে কোলে নিয়ে বসে আছে। জুলিয়েট ইদানিং মিরার কাছাকাছি থাকতেই সাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তার ইচ্ছে হলেই লাফিয়ে মিরার কোলে চোরে বসে থাকে। বোবা প্রাণিটা এভাবেই তার আদরের দাবি জানায় এখন। মিরা প্রোগ্রাম শেষে একটা কুইক শাওয়ার নিয়েছে- যেভাবে নাচানাচি করেছে শাওয়ার না নিলে আর শান্তিতে ঘুমাতে হতো না তার। জুলিয়েট তার কোলে বসার পর থেকে আহ্লাদে জুলিয়েটের ফোলা পেটে হাত বুলিয়ে আদর করে যাচ্ছে মিরা। জুলিয়েট আজ কোনো এক বিশেষ কারণে কথা বলছে না মিরার সাথে। মিরা তার বাচ্চা মেয়েটাকে এতোটা চুপচাপ দেখে নিজে থেকেই বকবক করা শুরু করলো-
"জুলি..কি হয়েছে তোর? রোমিও কি কিছু করেছে? কিছু তে কষ্ট পেয়েছিস? পেটে ব্যাথা হচ্ছে বুঝি?"
মিরার অনবরত প্রশ্নের প্রকোপে পড়ে জুলিয়েট মুখ উঠিয়ে মিরার দিকে চাইলো। দুচোখের রং ভিন্ন হওয়ায় মিরার বরাবরই বুঝতে সমস্যা হতো জুলিয়েটের তাকানোর মানে। কিন্তু আজ সে স্পষ্ট দেখলো বিড়ালটার ছলছল চোখে একরাশ মায়া। কিন্তু নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করার ক্ষমতা ও তো প্রাণী টার নেই। মিরা বুঝলো জুলিয়েট প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকেই কেমন যেন হয়ে গেছে। মিরা জুলিয়েটকে হাতে তুলে নিয়ে বিড়াল টার মাথায় আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে নিজ থেকে বুঝিয়ে বলল-
"এমন মনমরা হয়ে থাকতে নেই সোনা। বরের উপর এতো রাগ কেন তোর? ছেলেটা তো সাড়া দিন তোর পেছন পেছন ঘুরে। হয়তো এখনো ঘরের বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে। তোকে কতই না ভালোবাসে তবু ওকে সহ্য করতে না পারার কারণ কি?"
জুলিয়েট মিরার কথা কতটুকু বুঝলো কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে মুখটা উল্টো দিকে ঘুরিয়ে নিল। মিরা বুঝে নিল জুলিয়েট এই ব্যপারে কিছু শুনতে চায় না। সে পুনরায় জুলিয়েটের ফোলা পেটের উপর হাত বুলাতে বুলাতে একটু দ্বিধান্বিত জিজ্ঞাসা মূলক সুরে বলল-
"জুলি.. আমার পেটটা তোর পেটের মতো বড় হচ্ছে না কেন? তোর পাপা কি তাহলে ঠিক বলে- আমি কি সত্যিই পর্যাপ্ত খাই না? বেবি টা যেন বড়ই হতে চাইছে না।"
-"হৃদপাখি..রোমিও বাইরে দাঁড়িয়ে কেন?"
কোলে অনুতপ্ত মুখো ভাব ভঙ্গি ধরা রোমিওকে নিয়ে রায়ান ঘরে প্রবেশ করলে মিরা চমকিত হয়ে সেদিকে খেয়াল করলো। রায়ানের প্রশ্নের জবাবে কি বলা উচিত না বোঝায় তার সকল উত্তর গলার মাঝেই দোমে গেল। জুলিয়েট এক মূহুর্ত দেরি না করে মিরার কোল থেকে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে ওই ঘর থেকে প্রস্থান করলো। মিরা অবাক চোখে সেই দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান নিজেও বেশ অবাক- আজ তার কাছেও আদর খেতে এলো না বিড়াল টা। জুলিয়েট কে চলে যেতে দেখে রোমিও ও আর সেখানে থাকার ইচ্ছে পোষণ করলো না। সেও রায়ানের কোল থেকে লাফ দিয়ে নেমে ড্যাং ড্যাং করে জুলিয়েটের পিছন পিছন চলে গেল। উক্ত দৃশ্য অবলোকন করে রায়ান মিরা উভয়ই আশ্চর্য। মিরার মুখে চিন্তার ছাপ দেখে রায়ান কথা ঘুরিয়ে বলল-
"দুটো বাচ্চাই ভালো ম্যানারস শিখেছে। আমাদের একা ছেড়ে দিয়ে কি সুন্দর চলে গেল দেখলে?"
মিরা রায়ানের দিকে তাকালো। সে রায়ানের কথায় একমত প্রকাশ করতে পারলো না-
"মোটেও তেমন কিছু না। রোমিও ওকে কিছু করেছে আমি সিওর। জুলি তো এমন করে না কখনো। ইদানিং এমন করছে। রোমিওর থেকে দূরে দূরে থাকে আর রোমিও ওর পিছন পিছন ঘুরে।"
মিরার কথা শুনে রায়ানের মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সামান্য আওয়াজে বিড়বিড় করলো-
"যেমন মা তেমন মেয়ে। বিড়ালের পরিবর্তন চোখে পড়ছে অথচ নিজেরও যে এক অবস্থা তা চোখে পড়ে না। প্রেগন্যান্ট বউ সামলানো কি এতো সোজা! পুরুষ হলে না বুঝতো- কত ধৈর্য লাগে।"
রায়ান দরজা বন্ধ করে সোজা গিয়ে মিরার পাশে বসে মিরার চোখে চোখ রাখলো। মিরাও চোখ বড় বড় করে সেই ধারা অব্যাহত রেখে বলল-
"এভাবে কি দেখছেন?"
রায়ান কিছু না বলে মিরার গুটিয়ে রাখা পায়ের দিকে খেয়াল করে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
"পা ব্যাথা করছে?"
মিরা একটু থতমত খেয়ে নিজের পা এপাশ ওপাশ করে উল্টে দেখতে দেখতে বলল-
"না তো..পা ব্যাথা করবে কেন? আমার পায়ে কি লেগেছে?"
রায়ান হাফ ছেঁড়ে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সোজা
আলমারি দিকে এগিয়ে গেল। আলমারি থেকে রাতে পড়ার জন্য একটা টি-শার্ট ও ট্রাউজার বের করে গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে ওয়াশ রুমের দিকে চলে গেল। মিরা কৌতুহলে বিছানা থেকে নেমে হাঁটাহাঁটি করে আনমনে বলল-
"কি অদ্ভুত! পায়ে তো ব্যাথা করছে না। তাহলে উনি ওমন বললেন কেন?"
___
১৫ মিনিট পর, ভেজা চুল মুছতে মুছতে রায়ান ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে এলো। অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে কেবল ডীম লাইট টা জ্বালানো। রায়ান বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখলো মিরা সম্পূর্ণ বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে। তথাকথিত ভাবে বললে- বিছানার কোনো এক অংশও অন্য কারো শোয়ার জন্য পর্যাপ্ত নয়। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের ভেজা টাওয়ালটা কাঁধে ঝুলিয়ে দিয়ে মিরার দিকে ঝুঁকে মিরার কপালে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তার গায়ে কাঁথা মুড়ে দিল। এরপর নিজের লেপটপ টা নিয়ে ঘরের অন্য কণার সোফায় বসে পড়লো। বিয়ের ঝামেলায় অফিসের কাজ সামলাতে একটু হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। অবসর সময় বলতে কেবল এই রাত টুকুই যখন সে একটু অফিসিয়াল কাজ নিয়ে মাথা ঘামাতে পারে। সোফায় বসে একের পর এক মেইল আর ডকুমেন্টস চেক করতে শুরু করলে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কাজের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিল রায়ান। মিনিট ত্রিশেক পর একটা ছায়া এসে পড়লো তার লেপটপের উপরিভাগে। রায়ান চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো মিরা স্থির দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। মেয়েটার টলমলে চোখে অপরিপক্ক ঘুমের রেশ লেগে আছে এখন। রায়ান হালকা চমকে উঠে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
"আর ইউ ওকে হার্ট বার্ড? উঠে গেছো কেন?"
অপর পাশ থেকে আহ্লাদী কাঁদো কাঁদো স্বর ভেসে এলো-
"হাবি..আমার ভীষণ পা ব্যাথা করছে। ঘুমাতে পারছি না।"
এই কথায় রায়ানের ইচ্ছে হলো বলতে-" কেন ব্যাথা করবে? পায়ে কি লেগেছে?" এতো নাচানাচি হৈ হুল্লোড় করার পর পা ব্যাথা ধরা বাধা বিষয়। মূলত রায়ান সে জন্যই তখন জিজ্ঞেস করেছিল মিরাকে তার পা ব্যাথা আছে কিনা। তখন অনুভব না হলেও এখন সেটা মিরার অনুভব হচ্ছে। রায়ান কথা না বাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে উঠে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে বলল-
"এই জন্য কাঁদতে হয় বোকা মেয়ে? আমার স্ট্রং বউ না তুমি? এদিকে এসো।"
রায়ান মিরাকে একটু সামলে নিয়ে তাকে সোফার একদিকে হেলান দিয়ে বসিয়ে দিয়ে অন্য দিকে রায়ান নিজের বসে মিরার পা দুটো নিজের কোলে তুলে নিয়ে আলতো হাতে টিপে দিতে দিতে বলল-
"ঘুমানোর চেষ্টা করো পাখি। ব্যাথা সেড়ে যাবে। আমি আছি তো।"
মিরা চোখজোড়া বন্ধ করে নিল। রায়ান এক হাত লেপটপে অন্য হাতে মিরার পা টিপছে। কয়েক মিনিট চেষ্টা করেও মিরা ঘুমাতে ব্যর্থ। মিটিমিটি চোখ দুটো খুলে রায়ানের দিকে আড় চোখে তাকালো। ছেলেটা মনোযোগ সহকারে কাজ করছে দেখে মিরার বিরক্ত অনুভব হলো। নিজের পা দুটো হঠাৎ রায়ানের কোল থেকে নামিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে আবদারের সুরে বলল-
"কোলে নিন।"
রায়ান একটু অবাক হলেও তর্কে গেল না। মিরা দুই দিকে পা দিয়ে রায়ানের মুখোমুখি হয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে বসলো। রায়ান মিরার এলো মেলো চুল গুলো গুছিয়ে কানের পিছনে গুঁজে দিতে দিতে বলল-
"এভাবে বসলে তো কাজ করতে পারবো না পাখি।"
-"তো কাজ করতে হবে না। বাদ দিন। আমি এভাবেই বসবো।"
রায়ান মিরার মাথা তার কাঁধের উপর নুইয়ে দিয়ে আবার কাজে মনোযোগ দিয়ে বলল-
"এভাবে থাকো তাহলে, কেমন? আমি ম্যানেজ করে নিবো।"
মিরার মোটেও পছন্দ হলো না বিষয়টা। তাকে কোলে বসিয়ে রেখে রায়ান কাজ কিভাবে করতে পারে! এই ব্যাপার টা তার হজম হচ্ছে না। মিরা রায়ানের মাথায় পিছনের একগুচ্ছ ভেজা চুলে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে ধীরে আঙুল গুলোকে সঞ্চালন করতে করতে বলল-
"কাজটা কি খুব ইমপোর্টেন্ট?"
-"হুম...!"
-"আমার থেকেও?"
রায়ান এক গাল হেঁসে মিরার পিঠে হাত রেখে মিরার কাঁধে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে দেহটা আরো গুটিয়ে গেল। মিরা নিজের শিরদাঁড়ায় অদ্ভুত শিরশির শিহরণ অনুভব করলো। মিরা মাথা উঠিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রায়ানের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো-
"এই যে মিস্টার, গোটা সন্ধ্যা ওভাবে হা করে তাকিয়ে থেকে কি ভাবছিলেন শুনি।"
রায়ান একটু অবাক হয়ে মিরার চোখের দিকে তাকালো। হঠাৎ কি মনে করে মিরা তাকে এমন প্রশ্ন করলো কে জানে। তবে সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল-
"তুমি একবার বলেছিলেন না- তোমার জন্য যেন একটা কবিতা লিখে ফেলি? একটা কবিতাই লিখছিলাম। তখনি হঠাৎ করে তুমি হাসলে, আর ছন্দ রা সব এলোমেলো হয়ে গেল।"
মিরা ভ্রু উঁচিয়ে নিল। রায়ানের কথা তার বিশ্বাস হলো না হয়তো-
"তাই নাকি? অসমাপ্ত কবিতা টুকুই শোনান তবে।"
রায়ান গলায় খাঁকাড়ি দিল, যেন আবৃত্তি করার পূর্ণ প্রস্তুতি নিল। অতঃপর সুমিষ্ট কণ্ঠে কবি কবি ভাব নিয়ে বলল-
"কবিতার নাম-আমার হৃদপাখি। লিখেছেন - রিভান চৌধুরী রায়ান।" এককথায় মিরা মুচকি হেঁসে উঠলো।
রায়ানের নিজের আবৃত্তি অব্যহত রাখলো-
"কত সুন্দর তুমি- প্রেমে পড়েছি আমি ।
মায়াবী তোমার আঁখি, দিওনা আমায় ফাঁকি।
অপরূপ তোমার এই হাসি, আর আমি...
আমি তোমাকে ভালোবাসি!"
মিরা রায়ানের এমন ছন্দময় কবিতা শুনে মিষ্টি হেঁসে উঠল। রায়ান মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখের দিকে পলকহীন তাকিয়ে থেকে মেয়ে টার গালে আলতো করে চুমু দিয়ে পুনরায় মিরার মাথা নিজের কাঁধে নুইয়ে দিয়ে বলল-
"যা শুনতে চেয়েছ তা শোনা শেষ। এবার লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘুমিয়ে পড়ো।"
মিরা কিছু টা সময় ওভাবে থাকলো কিন্তু একবার ঘুমের বেঘাত ঘটায় এখন আর তার ঘুম আসছে না। নীরবতার ব্যাপ্তি একটু দীর্ঘ হলে মিরা আর চুপ থাকতে পারলো না।
-"হাবিইই..!"
-"শুসস, বেবি। আই এম চেকিং এ্যান ইমপোর্টেন্ট মেইল। কিপ কুয়াইট ফর সাম টাইম। তোমার আওয়াজ আমাকে ডিস্ট্রিক্ট করছে।"
মিরার এই বাধ্যবাধকতা পছন্দ হলো না। তৎক্ষণাৎ চুপ করে গেল। অভিমানী মন এখন কেউ চাইলেও তাকে কথা বলতে দেবে যদি রায়ান না বলে। মিরা নিস্ক্রিয় অবস্থায় রায়ানের কাঁধে মাথা রেখে শুয়ে রইল। চোখের পাতা এখনো খোলা। বেশ কিছু টা সময় মিরাকে চুপচাপ দেখে রায়ানের হঠাৎ মনে হলো তার কথা হয়তো তার আহ্লাদী বউয়ের মনে লেগেছে। সে মিরার কানে কানে নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
"আমার লক্ষ্মী বউ জান..মাথায় কি ঘুরছে তোমার বলো তো?"
মিরা নিজের আহ্লাদী ভাব বাদ দিল। একটু ম্যাচিউর ভঙ্গিতে দ্বিধায় জিজ্ঞেস করলো-
"আচ্ছা, যদি আমি চুপ করে থাকি, তাহলে আপনার ভালো লাগবে?"
রায়ান নিজের ধারণা সঠিক বুঝে গম্ভীর পরিবেশ টা একটু স্বাভাবিক করতে শান্ত গলায় পাল্টা প্রশ্ন করলো-
"ঠিক কখন চুপ থাকার কথা বলছো?"
মিরা প্রশ্নের কারণ না বুঝে-"কখন মানে..!"
রায়ান দুষ্টু ভঙ্গি যে এক গাল বাকা হেঁসে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল-"Sometimes I like it when You are loud.."
-"কিহ্..!" হঠকারিতায় মিরা উল্টো প্রশ্ন করে বসলো। ঠিক পরের মূহুর্তেই রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলে কথাটার মানে মিরার মস্তিষ্কে ধরা পড়লো। সে সজোরে রায়ানের কাঁধে ঘুষি মেরে ছেলেটার চুল ধরে মাথাটা ঘুরিয়ে বলল-
"ইউ আর সাচ আ ব্যাড বয়।"
রায়ান খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে এক হাতে মিরার কোমর এবং অন্য হাতে মিরা হাত ধরে ফেলে একই দুষ্টু ভাব নিয়ে বলল-
"Yes, I am your Bad boy without d and o.."
মিরা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ থেকে মাথায় কিছু অক্ষরের বিয়োজন করে বিয়োগফল বের করলো। সাথে তার ঠোঁটে আবিষ্কৃত হলো একটা সন্তুষ্টির হাসি। দুষ্টু মিষ্টি এই প্রেমান্দোলনে মিরা বরাবর রায়ানের কাছে হাড়ে। এভাবে আরো আধ ঘন্টার বেশি পার হলো। মিরা রায়ানের সাথে অনবরত আলোচনা করে যাচ্ছিল কাল বিয়ের বিষয়ে আর রায়ান নবীদের অফিসিয়াল কাজ আর বউয়ের বকবকানি উভয়ই সামলে নিচ্ছিল। কাজের সমাপ্তি ঘটলে রায়ান লেপটপ টা বন্ধ করে মিরার পিঠে হাত রেখে মেয়েটার গলার ভাঁজে নিজের মুখ গুঁজে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল। সকল ক্লান্তির সমাপ্তি যেন এই খানেই হয় ছেলেটার। রায়ান ওভাবেই কিছু সময় বসে রইল। পুরুষ মন একটু একটু করে বেসামাল হয়ে পড়ছে। রায়ান একটা শুকনো ঢোক গিলে ফিসফিস করে মিরাকে বলল-
"হৃদপাখি, আমার সুগার ফল করছে। আই নিড মাই ফেবারিট সুইট নাও।"
মিরার কোনো সাড়া শব্দ নেই। রায়ান এবার আবদারের সুরে বলল-
"বেইবি প্লিজ..! তুমি বলেছিলে আজ নিজের কথা রাখবে। আর আজ নিজের দাবি আদায় করার অনুমতি ও কিন্তু আমার আছে। তুমি নিজে সেই অনুমতি দিয়েছো।"
মিরার কোনো প্রতি উত্তর না পেয়ে রায়ান নিজের মুখ উঠিয়ে অধৈর্য হয়ে মিরার দিকে তাকালো। চোখ বন্ধ, ক্লান্তি ভরা মুখ টা একদম নিস্তেজ। মিরার ঘুমে আচ্ছন্ন মুখটা রায়ানের চোখের অশান্ত ভাব কমিয়ে দিল। রায়ান স্বল্প আওয়াজ দিলো-
"মিরা..মিরা...হৃদপাখি..!"
মেয়েটার কোনো হেলদোল নেই। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরাকে ওভাবেই কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ধীর পায়ে হেঁটে বিছানায় নিয়ে গিয়ে সাবধানে মিরাকে নিজের বুকে জড়িয়ে শুইয়ে মেয়েটা কপালে আদরের পরশ এঁকে দিয়ে আনমনে বলল-
"My tired headache... Sleep well.."
________
রাত-২টা~
-"হ্যালো কে..?"
-"হ্যালো, জুঁই...কিরে তুই কি ঘুমাচ্ছিস?"
জুঁই সোরায়ার এমন প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে বলল-
"তুই আমাকে রাত দুইটায় ফোন দিয়েছিস আমি ঘুমাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করতে? তোর ঘুমের সময় হয় নি? তোর না কাল বিয়ে গাঁধী।"
সোরায়া নিজের ঘরের এক কোণায় থাকা সুসজ্জিত দোলনায় বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল-
"আরে কাল বিয়ে বলেই তো ঘুম আসছে না। জানিস একটু আগে রিলস স্ক্রল করতে করতে দেখলাম এক মেয়ে এক গ্রুপে পোস্ট করেছে ১৮ বছর বয়সে হাসবেন্ডের ব্যাড টাচের শিকার হয়েছে সে।"
-"তো...!"
-"দোস্ত বিয়ের পর যদি আমায় বরের নজর খারাপ হয়? তখন আমার কি হবে?"
জুঁই বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে সোরায়ার উদ্দেশ্যে দাঁত কটমট করতে করতে বলল-
"আগে নিজের নজর ঠিক কর তুই।"
সোরায়া ফোনের স্ক্রিনে বাঁকা চোখে তাকালো। কিন্তু জুঁইয়ের কথায় সে নিজেও কোনো এক পর্যায়ে এক মত যত যাই হোক-উপন্যাস প্রেমি বলে কথা। সোরায়া সে কথা পিছনে ফেলে জুঁইকে জিজ্ঞেস করলো-
"সকালে গায়ে হলুদ আমার। তুই না এসে পৌঁছালে আমি গায়ে হলুদ মাখবো না। তুই কাল কখন আসবি বলতো।"
-"ট্রেনেই আছি। সকাল সকালই পৌঁছে যাবো চিন্তা করিস না। তোর বিয়ে আর জুঁই আসবে না এটা হতেই পারে না তাছাড়াও মাহির স্যারকে জিজু বলে খেপানোও বাকি।"
সোরায়া জুঁইয়ের কথায় মজা পেয়ে শব্দ করে হাসলো। অপর পাশ থেকে জুঁই কৌতুহলী হয়ে সোরায়া কে জিজ্ঞেস করলো-
"সোরা..কাল যে তোর বিয়ে..কবুল বলার প্রেক্টিস করেছিস? কিভাবে কবুল বলবি।"
-"আরে ধুরু, এসব নেকামি কে করে ভাই। কবুল বলতে বলবে যখন বলে দিবো। প্রেক্টিস করার কি আছে। আচ্ছা শোন খুব ঘুম পাইছে আমি ঘুমাই কেমন? কার সকালে উঠতে হবে আবার। টাটা। তুই তাড়াতাড়ি চলে আসিস।"
জুঁই ঠিক বুঝলো না হঠাৎ সোরায়ার চোখে ঘুম জুড়ে আসার কারণ। তবে তারও খুব ঘুম পাচ্ছিল তাই আর কথা বাড়ালো না-
"আচ্ছা দোস্ত, তুই ঘুমা। কাল দেখা হচ্ছে।"
সোরায়া হঠাৎ পা দোলানো থামিয়ে দিয়ে ফোনটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে লাফ দিয়ে দোলনা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আনমনে বিড়বিড় করলো-
"আল্লাহ, এতো বড় বিষয়টা কিভাবে মিস করে গেলাম। কথায় আছে, প্রেক্টিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। জীবনের প্রথম আর একমাত্র বিয়ে আমার কবুল বলার পারফেক্ট হওয়া চাই। আই সুড প্রেক্টিস।"
সোরায়া দৌড়ে আলমারি থেকে নিজের একটা লাল ওড়না বের করে নিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নার দিকে চোখ রেখে মাথায় ওড়না দিয়েই বলে উঠলো- "কবুল..!"
বলেই একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে ওড়না দ্বারা নিজের মুখটা লজ্জায় ঢেকে নিল দুই হাতে। পুনরায় আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলতে গেল-"আলহামদুলিল্লাহ , ক..! এ্যাঁ, ছেলেদের কণ্ঠ মনে হচ্ছে কেন?"
একটু কাশি দিয়ে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে গলার স্বর একটু নরম করে বলার চেষ্টা করলো এবার-"আলহামদুলিল্লাহ, কবুল..! আরে ধুর, এতো অভিনয় করবো কেন আমি।" নিজের আচরণে মেয়েটা বড্ড অসন্তুষ্ট হলো। সে আনমনে ভাবলো-" আচ্ছা আমি যদি কবুল না বলি তাহলে? শুধু মাথা উপর নিচ করলে হবে না?" পরবর্তীতে আবার নিজেই নিজের যুক্তি খন্ডন করলো- "অবশ্যই না, কেন? আমি কি বোবা নাকি?"
-"আবার ট্রায় করি। স্যারের দিকে লাজুক তাকিয়ে বলবো- আলহামদুলিল্লাহ কবুল। ওকে ওকে ডান। প্রথমে নিচের দেখবো (সে নিচু করলো নজর) পরে উনার দিকে তাকাবো (আয়নার দিকে তাকালো) আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
সঙ্গে সঙ্গে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো-"ছিঃ ছিঃ। এতো ড্যাস্পারেট! না না এতো ড্যাস্পারেট লাগতে দিলে চলবে না। আবার আবার হয়নি এটা।"
সোরায়া এবার ভালো করে মাথায় কাপড় দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মন শান্ত করলো। একবার নিচু মুখটার উঁচু করে আয়নায় তাকালো আবার মাথাটা নিচু করে নিয়ে মৃদু ভাবে সম্মতি সূচক মাথা নেড়ে বলল- আলহামদুলিল্লাহ কবুল।"
বলার পর সাথে সাথে নিজের মুখ দুই হাত দিয়ে ঢেকে নিলো লজ্জায়-"আয় হায়য়য়..কি লজ্জা কি লজ্জা!"
মজার ছলে আরেকবার সে এভাবে বলার চেষ্টা করলো। লজ্জার রেশ একটুও কমলো না। আরেকবার বলতে যাবে তখনি সোরায়ার মাথায় অন্য চিন্তা ভর করলো-
"হায় আল্লাহ, তিন বার কবুল বলে ফেলছিলাম। এই ঘরে কোনো জ্বীন থাকলে তার সাথে আমার বিয়ে হয়ে যাবে না তো? উপন্যাসে তো জ্বীন আরা মানুষের ও বিয়ে হয়। আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি ঘুমাই যাইগা।"
সোরায়া আর এক সেকেন্ডও না দাঁড়িয়ে ওড়না টা ছুড়ে ফেলে বিছানায় লাফ দিয়ে উঠে শুয়ে পড়লো। আর এই এক ঘুমে তার সকাল।
________
সকাল-৭টা~
সকালের নরম আলোটা এখন পুরো উঠান জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। নাতিশীতোষ্ণ বাতাসে কাঁচা হলুদ বাটা আর গাঁদা ফুলের মিষ্টি গন্ধ মিশে এক অদ্ভুত উৎসবের আবেশ তৈরি করেছে। বড় খোলা উঠানটার এক পাশে বাঁশের মাচায় হলুদ আর সবুজ কাপড় ঝোলানো, মাঝখানে গোল করে পাটি বিছানো— সেখানেই একটু পর বসবে দিনের সবচেয়ে আদরের মানুষটা। বাড়ির মেয়ে বউরা যেন আজ সূর্যের আগেই জেগে উঠেছে। খোলা উঠোনে মিরা কাঁচা হলুদ বাটছে, আর রিমি ঠিক তার পাশে বসেই ফুল গেঁথে মালা বানাচ্ছে, গ্রামীণ নিয়মে হলুদ বাটার সময় কোনো প্রকার কথা বলার নিয়ম নেই বলে রিমি মিরাকে জ্বালাতে ইচ্ছে মতো বকবক করছে। মিরা চেয়েও কোনো কিছুর প্রতি উত্তর করতে পারছে না। রিমির ফুলের মালা গাঁথা শেষ হলে সোরায়ার জন্য কাঁচা ফুলের গহনা বানাবে ভেবে রেখেছে। মিরার বোবা অবস্থা দেখে রোকেয়া বেগম উঠান ঝাড়ু দিতে দিতেই হেসে উঠছেন। রামিলা চৌধুরী সবার জন্য নাস্তা তৈরি যে ব্যস্ত। আশে পাশের চুড়ির টুংটাং শব্দ, স্টিলের থালা রাখার ঠকঠক আওয়াজ, আর মাঝেমধ্যে ভেসে আসা গানের দুই লাইন— সব মিলিয়ে সকালটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। ছোট ছোট কাজ নিয়েও কতো ব্যস্ততা মেয়েদের। অথচ বাড়ির ছেলেদের এখনো কোনো হদিস নেই। কেউ হয়তো এখনো কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে, কেউ বিছানায় শুয়েই ফোন স্ক্রল করছে। মিরা অনেকক্ষণ সময় নিয়ে সম্পুর্ন হলুদ বেটে শেষ করে উঠে কোমর টানা দিয়ে বলল-
"ওহ আল্লাহ, চুপচাপ থাকা এতো কষ্টের আজ বুঝলাম। আমি আর কখনো কারো বিয়ের হলুদ বাটবো না। কি অদ্ভুত নিয়ম রে বাবা।"
রোকেয়া বেগম হেঁসে বললেন-"বাড়ির ভেতরে যা তো। সোরা কে ডাক গিয়ে। দেখে মনে হচ্ছে যার বিয়ে তার হুস নেই পাড়াপড়শির ঘুম নেই। কনে এতো দেরি করে ঘুম থেকে উঠে কখনো?"
রিমি মজার ছলে বলল- "যার বর বিয়ের আগে থেকেই বউকে বাচ্চা বাচ্চা ডাকে ওই কনের দেরি করে ঘুম থেকে উঠা মানা যায় খালামণি।"
হঠাৎ করেই মিরার ফোন বেজে উঠলো। মিরা নিচু হয়ে ফোনটা হাতে তুলে নিল।
-"কে ফোন করেছে মিরু?"
-"যার কথা বললি সে।"
-"মাহির ভাই?"
-"হ্যাঁ.. দাঁড়া রিসিভ করে কথা বলি আগে।"
মিরা ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে মশকরা করে বলল-
"আসসালামুয়ালাইকুম জামাই রাজা। কি অবস্থা আপনার?"
অপর পাশ থেকে ব্যস্ত কণ্ঠ শোনা গেল-
"ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাবি, না সরি আপু। ধুর কি ডাকবো কনফিউজড হয়ে যাই।"
-"আরে একটা ডাকলেই হলো। এতো ব্যস্ত হওয়ার কি আছে।"
মাহির একই তাড়াহুড়োতে বলল-"ভাবি প্লিজ আপনার গুনোধর হাসবেন্ড কে বলুন আমার কল ধরতে। আজকে ওর আর রুদ্রর সম্পূর্ণ দিন বর পক্ষের হয়ে থাকার কথা। মারা দুটোকে কখন থেকে কল দিচ্ছি দুটোর একটাও তুলছে না। এইদিকে ঢাকা থেকে সবাই রিসোর্টে এসে উঠেছে। গায়ে হলুদের আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। ওরা কখন আসবে?"
মিরা এক নজর রিমির দিকে তাকালো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহির কে ভরসা দিয়ে বলল-
"আহা, মাহির ভাই, এতো টেনশন নিচ্ছেন কেন? আচ্ছা আপনি রাখুন আমি গিয়ে ডাকছি ওনাকে।"
-"জি আচ্ছা ভাবি।"
মিরা ফোনটা রাখতে যাবে তখনি মাহির আমতা আমতা করে আরো কিছু বলতে চাইলো-"ভাবি ভাবি, ওয়েট।"
মিরা ফোনটা আবার কানে ধরলো-"জি মাহির ভাই, বলুন।"
মাহির গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"আমার বউ টা কি করছে?"
মিরা মাহিরের কথায় না হেঁসে পারলো না। সে মাহিরকে একটু জ্বালাতে তুচ্ছার্থে বলল-
"আপনার বউয়ের তো কোনো হেলদোলই দেখা যাচ্ছে না মাহির ভাই। দুঃখের কথা কি বলবো বলুন তো বোনটা তো আমারই। এখনো ঘুম থেকেই ওঠে নি সে। যাই হোক এখন আপনার হয়ে যাচ্ছে। ওর ঘুমটা আপনি সামলে নিয়েন কেমন? আমি রাখি এবার।"
মিরা মাহির কে আর কিছু বলতে না দিয়ে ঠাস করে কলটা কেটে দিল। এদিকে মাহিরের উচ্ছ্বসিত মুখটা কেমন চুপসে গেলো তার বউ এখনো ঘুমোচ্ছে শুনে।
___
মিরা হাঁসি মুখে ঘরের দিকে যেতে নিলে রিমি কৌতুহলে প্রশ্ন করলো-"কি রে কি বললো মাহির ভাই?"
মিরা পিছন ফিরে-"তোর আর আমার বর কে আজকের জন্য ধার চাইছে। ভাবছি দিয়ে দিবো। একদিনের ব্যাপার। একদিনের জন্য সিঙ্গেলস হয়ে বায়াই দের সাথে মজা নিলে মন্দ হবে না। কি বলিস?"
রিমি বেশ খুশি মনে বলল-"এটা আবার জিজ্ঞেস করা লাগে? দিয়ে দে দিয়ে দে। আজকে আর আমাদের ভর লাগবে না।"
মিরা পা নাচিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেল।
___
-"একটু ঘুমাতে দেখলেই হওয়া। আল্লাহ আমার বউটা এমন কেন? কি এমন চাই আমি? ঘুম থেকে উঠে বউটা কে নিজের সাথে লেপ্টে থাকতে দেখবো এইটুকু চাওয়া কি আমার অন্যায়?"
-"রায়ান...হাবিইই...! উঠুন..!"
নিজে নিজে খিটখিটে মেজাজে বিড়বিড় করছিল রায়ান। আর তখনই তার খিটখিটে মেজাজের উৎস তার কাছে হাজির হলো তার নামের বিলাপ পারতে পারতে। মিরার উপস্থিতি অনুভব হতেই রায়ান গম্ভীর মুখ ধারণ করে নিল। মিরা নাচতে নাচতে ঘরে প্রবেশ করে বিছানার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে একনাগাড়ে বলা শুরু করলো-
"মাহির ভাই কল দিয়েছিল। আপনাকে আর রুদ্র ভাইয়াকে জলদি যেতে বলেছে। বর যাত্রী আপনাদের অপেক্ষায়। মাহির ভাই অনুরোধ করলো আপনাকে যেন আজকের জন্য বর পক্ষকে দিয়ে দেই। সো মিস্টার হাবি..আজকের জন্য আপনি মুক্ত। সাথে আমিও।"
বাকি সব কথার ভীরে রায়ানের মনোযোগ থমকালো "মুক্ত" শব্দটায়। রায়ান ধৈর্য ধরতে নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বাঁকা হাসলো। সে বিছানা থেকে উঠে মিরার সামনে বুকে হাত বেঁধে বলল-
"কি বললে? আরেকবার বলো..।"
মিরা রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে একটু পিছিয়ে গেল। একটু শ্বাস নিয়ে বলল-
"ওওই মাহির ভাই...!"
-"রিপিট দ্যা লাস্ট লাইন বেইবি..! আজকে তুমি কি? মুক্ত.. রাইট? এটাই তো বললে?"
মিরা নিজের কথার ভুল বুঝতে পারলো। রায়ান মিরার দিকে এক পা এগিয়ে গেলে মিরা এক পা পিছিয়ে গেল। মিরার গলায় সব জবাব জড়িয়ে গেল। আমতা আমতা করে তবু নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করলো-
"আআ..আমি তা বলি নি।"
রায়ান শান্ত হেঁসে মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল-
"তুমি যা বলতে চাইছো তাই বলো শুনি।"
মিরা নিজের চোখের পাতা নিচু করে নিয়ে বলল-
"আপনি আজকে বর পক্ষ আমি কনে পক্ষ তাই আর কি মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে।"
রায়ান মিরার থুতনি ধরে মুখটা নিজের দিকে উঁচু করে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলল-
"আমরা যে পক্ষেরই হই না কেন পাখি, ইউ আর মাইন। আন্ডারস্ট্যান্ড?"
মিরা ঢোক গিলে মাথা হ্যা সূচক নেড়ে রায়ানের কোমর জড়িয়ে তার প্রসস্থ বুকের মাথা রেখে বলল-
"সামান্য স্লিপ অফ টাং, এমন করতে হবে তাই? ভয় লাগছে আমার।"
রায়ান মিরার ভীতু মুখটা দেখে মনে মনে নিজেকে বলল-
"ভীতু বউই বেশি কিউট লাগে। এখন থেকে আহ্লাদী পনা কমিয়ে দিতে হবে যা বোঝা যাচ্ছে। নয় তো এই বউ কে সামলানো যাবে না। কি সাহস! বলে কিনা আজ সে মুক্ত..!"
ঠিক পরেই মিরা রায়ানের থেকে দূরে সরে আলমারির সামনে গিয়ে গায়ে হলুদে কি পড়বে তা চিন্তা করতে করতে আলমারি থেকে দুটো হলুদ রংয়ের শাড়ি বের করে রায়ানকে
জিজ্ঞেস করলো-
"কোনটা পড়বো?"
রায়ান দুটো শাড়ির একটার দিকেও তাকালো না। সোজা মিরার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল-
"কাল যেটা কিনে দিয়েছিলাম সেটা পড়ো।"
মিরা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল- "কাল আবার কি কিনে দিয়েছেন?"
রায়ান দুষ্টু হেঁসে বলল- "কিছু না..!"
মিরা রায়ানের ইঙ্গিত বুঝে পায়ে স্লিপার খুলে হাতে নিয়ে রায়ানের দিকে ছুড়ে মারলো রায়ান অন্য দিকে সরে গিয়ে সেটা ডজ করলো। মিরা নিজের হাতে যেকোনো একটা শাড়ি রেখে অন্যটা আলমারি ভেতর থেকে দিয়ে রাগী গলায় বলল-
"আমি শাওয়ার নিতে যাচ্ছি।"
রায়ান মাথায় হাত রেখে মিনমিনে জিজ্ঞেস করলো-
"এটা ইনফরমেশন না ইনভিটেশন বললে ভালো হতো।"
মিরা নিজের আরেক পায়ের স্লিপার খুলে রায়ানের দিকে ছুড়ে মেরে বলল-
"বুঝে নিন এবার ইনফরমেশন না ইনভিটেশন ছিল।"
রায়ান এবারও অন্যদিকে সরে গিয়ে জুতো ডোজ করলো। মিরা রাগে খটমট করে ওয়াশ রুমে ঢুকে গেল। রায়ান ফেলে মাহির কে কল দিল কথা বলতে। সাথে রুদ্র কে ডাকতে গেল।
_______
গায়ে হলুদের আয়োজন প্রায় শেষ। সবাই রেডি হয়ে নিচে নেমে গেছে। রুদ্র আর রায়ান ও রেডি বর পক্ষের সাথে যুক্ত হতে। রিমি মিরা দুজনেই রেডি হয়ে রান্না ঘরে গেলে রামিলা চৌধুরী তাদের খেয়ে নিতে বলেন। মিরার খাওয়া শেষ হলে রোকেয়া বেগম মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বললেন-
"মিরা..তুই একটু সোরাকে গিয়ে খাইয়ে দে তো। এখন না খেলে আবার সেই কখন খাবে তার ঠিক নেই। এরপর আর সময় হবে না। সাজ গোজের ব্যাপার আছে।"
মিরা সোরায়ার জন্য খাবার নিয়ে ড্রয়িং রুমে যেতেই দেখলো সোফায় রায়ান তার লেপটপ নিয়ে বোসের আছে আর সোরায়া তার পাশেই বসে আছে। মিরা সেদিকে এগিয়ে গিয়ে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-
"নাস্তা করেছেন?"
রায়ান লেপটপে নজর রেখে বলল- "না, পড়ে খাব। একটা ফাইল দেখছি।"
মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় বসলো। যেহেতু সোরায়া কে খাইয়ে দিচ্ছেই ভাবলো রায়ানকেও খাইয়ে দেবে। রুটির এক টুকরো নিয়ে রায়ানের মুখের সামনে ধরে বলল-
"পরে খেতে হবে না। এখন ফাইল দেখতে দেখতে খেয়ে নিন।"
রায়ান মুখ সরিয়ে নিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল-"মিরা প্লিজ, বললাম তো পরে খেয়ে নিবো আমি।"
মিরা আর জোর করলো না। খাবারটা রায়ানের পাশে বসে থাকা সোরায়ার দিকে এগিয়ে ধরে বলল-
"বনু তুই খা তো। যার যখন খিদে পাবে খেয়ে কূল পাবে না। আমি শুধু শুধু চিন্তা করছি।"
সোরায়া হা করে খেতে এগোতে যাবে তখনি রায়ান তার খাবার সোরায়ার দিকে যেতে দেখায় ছো মেরে মিরার হাত ধরে খাবার টা নিজের মুখে নিয়ে নিলো। মিরা আর সোরায়াদুজনেই অবাক হয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। রায়ান খাবার চিবোতে চিবোতে মিরাকে বলল-
"খিদে পেয়েছে। পরে সময় হবে না। খাইয়ে দাও।"
সোরায়া অভিমানী গলায় বলল-
"কিন্তু এটা তো আমার জন্য এনেছে আপু। তুমি রান্নাঘরে গিয়ে খাও।"
রায়ান সোরায়ার মাথায় গাট্টা মেরে বলল-
"বন্ধুর বউ বলে কিছু বলছি না। সম্পর্ক আর আগের মতো নেই। বোন প্লাস শালি থেকে এখন আমার ভাবিও হয়ে গেলি। মানে কি এক জ্বালায় আছি। চুপ চাপ রান্নাঘরে গিয়ে খেয়ে আয়। আমার বউএখন আমাকে খাওয়াবে।"
সোরায়া মাথায় হাত ডলতে ডলতে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল-
"যত্তসব নাটক। স্যার আসুক, তোমার নামে বিচার যদি না দিয়েছি। বলবো তুমি আমাকে খেতে দাও নি আমার আপুর হাতে তাও বিয়ের দিনে আবার মেরেছোও।"
রায়ান মুখের খাবার টুকু গিলে বলল-
"আরে যা যা, তোর স্যার ও আমাকে ভয় পায়। আমি ওর প্রিন্সিপাল। গিয়ে পেট ভরে খেয়ে আয় যা।"
সোরায়া চলে গেলে রায়ান মিরার দিকে তাকিয়ে হা করে বলল-
"খিদে পেয়েছে বললাম তো। খাওয়াচ্ছো না কেন?"
মিরা কিছু বলার চেষ্টা ও করলো না। কেমন নিজের চোখ উল্টিয়ে ঘুরিয়ে নিলো। রায়ান দুষ্টু হেঁসে মিরার চোখে চোখ রেখে বলল-
"I can give you a good reason to roll your eyes for me baby.. want me to?"
মিরা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ডানবামে নাড়ে অসম্মতি জানালে রায়ান হা করে বলল-"এখন এমন কিছু না চাইলে চুপচাপ খাওয়াও।"
মিরা বাধ্য বউয়ের মতো দায়িত্ব নিয়ে রায়ান কে খাইয়ে দিলো।
_______
গায়ে হলুদের আগেই জুঁই এসে পৌঁছালো রহমান বাড়ির উঠোনে। সোরায়া তার প্রিয় বান্ধবী কে দেখে দৌড়ে তার কাছে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাকে। বাড়ির সবার সাথে পরিচয় আলাপ শেষ হলে তারা সবাই গায়ে হালুদের অনুষ্ঠান শুরু করার তোরজোর শুরু করলো। রায়ান রুদ্র মিলে রওনা দিল মাহিরদের রিসোর্টের উদ্দেশ্যে। তারা একেবারে বর যাত্রীর সাথে বিয়ের আসরে আসবে।
______
সোরায়া কে রেডি করিয়ে উঠোনের মাঝবরাবর বসানো হলো। সবাই তাকে ঘেরাও করে দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচা ফুলের গহনায় সুসজ্জিত নতুন বউয়ের চেহারার চমক সবার চোখে লাগার মতো। মিরা নিজের চোখের গেল কণা হতে কাজলের একটা ক্ষুদ্র অংশ সোরায়ার কানের পিছনে লাগিয়ে দিয়ে সবার নজর থেকে তার সন্তান সুলভ ছোট্ট বোনটার কল্যাণ কামনা করলো। জুঁই সোরায়া কে দেখে বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে থেকে বলল-
"সোরা রে, তোকে কি সুন্দর লাগছে রে। মাশাআল্লাহ। পুরো একটা হলুদ পরী।"
মিরা হেঁসে বলল-"সময় আসুক, তোমাকেও এমন হলুদ পরী সাজাবো।"
সবাই হেঁসে জুঁইকে খেপানোর বৃথা চেষ্টায় ব্যর্থ। জুঁই হতাশাগ্রস্থ কণ্ঠে বলল-
"আর বলো না আপু, আমার হাতের সবার বিয়ে হয়ে বাচ্চা হয়ে যাচ্ছে। আর আমি এখনো পরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছি।"
সোরায়া জুঁইয়ের কুঁচি টেনে বলল- "সবার সামনে আমার মান সম্মানন খাইছ না প্লিজ। বিয়ের শখ একটু লুকিয়ে রাখ।"
আচ্ছা অনেক হয়েছে এবার শুরু করো তবে। জুঁই সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল- "মেহেদী যে আমি আস্তে পারি নি তাই বলে কি আজকের আনন্দ মিস যাবে? গান কই আমি কি নাচবো না?"
রিমি জুঁইয়ের কথায় তাল দিয়ে বলল- "অবশ্যই, শুধু তুমি কেন সবাই নাচবে।"
অতঃপর হাসি মজার মধ্যেই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হলো। গান বাজলো সজোরে জুঁই সোরায়াকে ঘিরে মিরা আর রিমি কে সহ নাচতে লাগলো-
"দুরু দুরু বুক কাপে কেন আজ ভয়ে লাজে মরি।
জাদুর এই কাঠি ছুঁইয়ে দিল যেন এক পরী..
নিজেরই কাছে নিজে আজই তাই অচেনা যে আমি,
যেন বদলে গেলাম এক পলকে..
এলো যে এলো খুশির লগন ,
এলো যে এলো খুশির লগন
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন,
আসবে সে তাই লাজে রাঙা মন,
মেতেছে আনন্দে আজ প্রাণ যে.."
চলবে,
অনেকদিন পর। পাখিরা আমি দুঃখিত। আমি অসুস্থ থাকার কারণে তেমন এক্টিভ ছিলাম না। ইনশাআল্লাহ এখন থেকে চেষ্টা থাকবে তাড়াতাড়ি গল্প দেওয়ার। তোম দের কমেন্টের অপেক্ষায় থাকবো। বেস্ট পার্ট কোনটা লেগেছে জানি ও।love you pakhis ❤️ 🥰
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_76 (2nd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
-"কিরে মাহির, রায়ান আর রুদ্র কি আদোতেও বর পক্ষের লোক নাকি? ছেলে গুলো এখনো কেন আসছে না?"
সীমা খান ব্যস্ত পরিবেশে মাহির কে প্রশ্ন করলেন। মাহির নিজের ফোন স্ক্রিনে নজর রেখে জবাব দিল-
"আম্মু প্লিজ, এখন আমাকে প্যারা দিও না। ওরা চলে আসবে। আমি বুঝতেছি না ওই বাঁদর দুটোর জন্য আমার থেকে তুমি এতো এক্সাইটেড কেন?"
সীমা খান বিরক্ত হয়ে খটমট করে হেঁটে স্বামী মাহিদ খানের সামনে গিয়ে চিৎকার করে উঠলেন-
"শুনলেন কি বললো আপনার ছেলে? আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে আজ। আর ও আমাকে প্রশ্ন করছে আমি এক্সাইটেড কেন? আমার কি শোক পালন করা উচিত?"
মাহির তৎক্ষণাৎ ফোন স্ক্রিন থেকে মুখ তুলে মা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অধৈর্য কণ্ঠের বলল-
"আরে আমি কখন শোক পালন করতে বললাম? এমনি তেই টেনশনে কলিজা শুকিয়ে যাচ্ছে আমার, খোদা জানে কেন। আব্বু প্লিজ আম্মু কে চিল করতে বলো না। তুমি অন্তত আমাকে বুঝার চেষ্টা করো।"
মাহিদ খান বেচারা বরাবরই পত্নী নিষ্ঠো ভদ্রলোক তবে ছেলের দিকটাও বুঝতে পারছেন। যে ছেলে বিয়ের কথা উঠলেই পালাই পালাই করতো আজ তার বিয়ে তাও আবার প্রেমের বিয়ে- কলিজা শুকিয়ে আসারই বিষয় ছেলেটার জন্য। মাহিদ খান এবারের মতো তার স্ত্রী কেই বুঝিয়ে বললেন-
"ছেলে ভুল কি বলেছে? তুমি নিজের প্রেসার হাই করছো কেন টেনশন করে। রায়ান রুদ্র এই এলো বলে।"
-"চলে এসেছিইইই...!"
রুদ্র মেইন গেট থেকে চিৎকার করে দৌড়ে মাহিরের দিকে এলো। মাহির স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে উঠে দাড়াতেই রুদ্র এক লাফে মাহিরের কোলে চোরে গেল ছেলেটার গলা জড়িয়ে। রায়ান পিছন থেকে স্বাভাবিক হেঁটে এসে রুদ্রর পাঞ্জাবির কলার টেনে তাকে মাহিরের থেকে আলাদা করে বলল-
"বেশি উত্তেজনা ভালো না। সামলে যা। আশেপাশে মানুষ আছে।"
রুদ্র নিজের হঠকারিতা বুঝে নিজের পাঞ্জাবি ঝেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে রায়ানের মুখোমুখি হয়ে অশান্ত গলায় বলল-
"অবশেষে এলি তোরা। আমার যে কি পরিমান নার্ভাস লাগছে সকাল থেকে বলে বোঝাতে পারবো না।"
রায়ান কুটিল হেঁসে সাইড থেকে মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বিশ্বস্ত আশ্বাস দিয়ে বলল-
"আরে বেট্টা, কিসের নার্ভাস? ইউর ভাই ইজ হিয়ার নো নিড টু ফিয়ার।"
মাহির জোরপূর্বক বানোয়াট হেঁসে দ্বিধান্বিত আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-"তাই নাকি?"
-"অফ কোর্স.. চল এবার তোর সাথে এক পাক্ষিক হলুদ দিয়ে হলি খেলবো।"
মাহির তৎক্ষণাৎ রায়ানের দিকে থেকে সটকে গিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে বলল-
"আমার গায়ে হলুদ তোদের ছাড়াও হয়ে যাবে। তোরা ঘরে গিয়ে রেস্ট কর।"
সীমা খান তড়িৎ গতিতে এগিয়ে এসে রায়ান কে আদেশ মূলক কন্ঠে বললেন-
"রায়ান..তোরা ওকে পাঁজাকোলা করে হলুদের স্টেজে নিয়ে আয় তো সবাই বসে আছে হলুদ লাগাবে বলে। বেলা চলে যাচ্ছে তো। বিকালে গায়ে হলুদ হবে নাকি!"
রায়ান শয়তানি হাঁসি দিয়ে ভদ্র ছেলের মতো সহমত প্রকাশ করলো-
"হ্যাঁ হ্যাঁ আন্টি, তুমি গিয়ে এক বালতি হলুদ রেডি করো। গায়ে হলুদ কাকে বলে আজ সবাইকে দেখিয়ে দেব একবারে।"
মাহির কিছু বলা বা করার আগেই রায়ান আর রুদ্র মিলে মাহিরকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে গেল স্টেজের উপর। এরপর বোধহয় এক ঐতিহাসিক হলুদ অনুষ্ঠানের শুরু হলো। সবাই এলোপাথাড়িভাবে নিজেদের হাতের মুঠোয় হলুদ নিয়ে মাহিরের গায়ে মেখে দিতে শুরু করলো। সকলের মাঝে অসহায়ের মতো বসে আছে বেচারা মাহির। ছেলেটাকে রীতিমতো গোসল করানো হয়েছে হলুদ দিয়ে। মন ভরে হলুদ লাগানো শেষ হলে সীমা খান ছেলেকে দেখে তৃপ্তি নিয়ে বললেন-
"ব্যাস, মিশন কমপ্লিট। এবার ছেলে আমার রাতের বেলায় উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো গ্লো করবে।"
মাহির মায়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্ত কণ্ঠে বলল-
"হয়েছে এবার? খুশি? এবার আমাকে ছাড়ো। আর এই অত্যচার নিতে পারছি না আমি।"
-"আচ্ছা আচ্ছা যা। গোসল করে নে গিয়ে।"
তখনি রায়ান মা ছেলের মাঝে এসে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল-
"আরে এখনি কিসের গোসল। আন্টি..! কি বলছো তুমি? আসল জায়গায়ই তো হলুদ লাগানো হলো না। ওটা গ্লো না করলে আমার শালির সাথে নাইনসাফি হয়ে যাবে।"
মাহির অবাক হয়ে রায়ানের দিকে চাইলো। সীমা খান ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন সূচক কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন-
"কোন আসল জায়গা?"
রায়ান মাহিরের দিকে তাকিয়ে কুটিল হেঁসে মাহিরের কোমরের নিচের অংশে লক্ষ্য করে বলল-
"The star of the night...it should glow brighter.."
মাহির রায়ানের দৃষ্টি অনুসরণ করে রায়ানের উদ্দেশ্যে বুঝে বড় বড় নেত্র নিক্ষেপ করলো রায়ানের দিকে। রায়ান মাহিরের দিকে শয়তানি হাসি দিকে এগিয়ে যেতেই মাহির এক চম্পট দিয়ে রিসোর্টের ভিতরে যেতে যেতে বলল-
"রায়ানের বাচ্চা, তোর বারবারির হিসেব আমি শুধে আসলে নেবো দেখিস।"
-"আরে যাস কই, আমার শালির জন্য এতো টুকু তো করতেই পারি। এইদিকে আয় শরীরের সব কিছুই গ্লোয়িং গ্লোয়িং করে দেই।"
মাহির রায়ানের কথায় থামবার ছেলে নয়। সে এক দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেছে। মনে হয় না বর যাত্রীর বের হওয়ার সময়ের আগে আজ সে বের হবে নিজের ঘর থেকে।"
মাহির ঘরের ভিতর ঢুকে ধপ করে বিছানায় বসে হাঁপাতে লাগলো। দৌড়ে পালিয়ে এখন শ্বাস আসছে না বুকে। একটু স্থির হয়ে নিজেকে একনজর আয়নায় দেখলো ছেলেটা। হলুদ রঙা এলিয়েন মনে হলো নিজেকে তার। হঠাৎ করে মাথায় এলো সোরায়াকে এমন হলুদ মাখা অবস্থায় ঠিক কতটাই না মিষ্টি লাগছে হয়তো। অথচ তার দেখার সুযোগ টুকু হচ্ছে না। পুরুষ মন ওমনি মোচর দিয়ে উঠলো। মনে হলো, সুপার ম্যানের মতো উড়ে বউয়ের কাছে চলে যেতে পারলে শান্তি লাগতো। মাহির নিরুপায় হয়ে নিজের ফোনটা হাতে তুলে নিল। মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের শিরা উপশিরা তাকে উষ্কানি দিল একটি বার কাঙ্ক্ষিত মুখটি দেখতে ভিডিও কল করার জন্য। মানব দেহের এই বিপরীত অংঙ্গ দ্বয় যখন একসঙ্গে আগ্রহ যোগায় তখন সেই ডাকে সাড়া না দেওয়া অসম্ভব। মাহির নিজেকে সামলে রাখতে ব্যর্থ হলো। কল ট্রান্সফার হলো সোরায়ার ফোনে। রিসিভ ও হলো তবে সোরায়া নয় হলুদ মাখা অন্য এক পরিচিত মুখ ভেসে উঠলো সামনে। মাহির ছোট ছোট চোখ করে চেনার চেষ্টা করতেই তার মুখ থেকে নামটা বেড়িয়ে এলো-"জু.. জুঁই..!"
জুঁই অপর পাশে হঠাৎ মাহিরের হলুদ মুখ দেখে চমকে চিৎকার দিয়ে উঠলো হাত থেকে যেন ফোনটা পড়েই যাবে। মাহির নিজের পরিচিতি যাহির করলো-
"আমি মাহির। তোমার মাহির স্যার। ভয় পেও না।"
বেচারা আনমনে বেশ বকাঝকা করলো নিজেকে অন্তত মুখটা ধুয়ে কল করা উচিত ছিল। একেই মান সম্মান খাদে ঝুলে আছে- নিজের এক স্টুডেন্টের সামনে আরে স্টুডেন্ট কে বিয়ে করছি। তাও আবার দুজন বেস্ট ফ্রেন্ড। কি ডেয়ারিং কাজ কারবার! জুঁই মাহিরকে চেনার চেষ্টা করে উৎসাহিত হয়ে বলে উঠলো-
"আরে সত্যিই তো মাহির জিজু...হাই! আসসালামুয়ালাইকুম জিজু।"
"জিজু" ডাকটা শুনে মাহিরের কাশি উঠে যাবার উপক্রম। ছেলেটা যেমন অবাক ঠিক তেমনি অন্যরকম একটা ভালো লাগা কাজ করছে তার মনে। আবেগ সামলে একটু ভাব ধরলো মাহির। জুঁই কে মিষ্টি হেঁসে পটানোর চেষ্টায় বলল-
"ওয়ালাইকুম আসসালাম শালিকা। জিজু তার বউয়ের সাথে একটু কথা বলতে চায়। তাকে ফোনটা দাও তো।"
-"০১৭*********...আমার বিকাশ নাম্বার।"
মাহির হতবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-"মানে কিহ্?"
জুঁই হিহি করে দাঁত বের করে হেঁসে বলল-
"আরে জিজু, মানে জিজ্ঞেস করে লজ্জা দেন কেন? এমনি এমনি কি কিছু হয় বলেন তো? কিছু পেতে গেলে তো কিছু দিতে হয়। আচ্ছা বুঝিয়ে বলি- আমার নাম্বারে ১১টা ডিজিট সো আপনি বরং ১১০০০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দিয়েন। আমিও ফোনটা আপনার বউয়ের হাতে দিয়ে দিবো।"
মাহিরের বক্ষ পেশি অতিক্রম করে এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। মনে মনে বিড়বিড় করলো-
"এমন জাল্লাদ শালি দিয়ে কি হবে আমার। ধুরু।"
তবু ঠেলায় পড়ে বেচারা শর্ত মেনে নিয়ে বলল-
"আচ্ছা আপাতত বউটা কে দেখতে দাও। কল টা কেটে পরে নিজের নাম্বার টা সেন্ড করে দিও। পাঠিয়ে দিবো।"
জুঁই কিছু সময় নিয়ে ভেবে সোরায়ার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল-
"ঠিক আছে। বিশ্বাস করে দিচ্ছি। কাজ শেষে যেন ১১ সংখ্যা টা দেখতে পাই এ্যাকাউন্টে।"
জুঁই সোরায়ার হাতে তার ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলল-
"হলুদ পরে তোল। আগে চেহারা দেখিয়ে নে বরকে।"
সোরায়া জুঁইয়ের কথায় অবাক হয়ে ফোনের দিকে তাকাতেই আতকে উঠলো-"ওমা গো..!"
-"আরে আমি..মাহির..! বিয়ের দিন বর কে চিনো না এই কষ্ট কই রাখবো আমি।"
সোরায়া ভালো করে মাহির কে খেয়াল করে উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল-
"সরি, কিন্তু আমার দোষ কোথায়? আমি কি আমার এমন বরকে চিনি? না দেখেছি? এটা কি অবস্থা করেছেন?"
-"তোমার একমাত্র দুলাভাই আর ভাইকে জিজ্ঞেস করো গিয়ে।"
সোরায়া ফিক করে হেঁসে উঠলো মাহিরের কথায়। মাহির গম্ভীর গলায় বলল-
"হাঁসি থামিয়ে এখন একটু ফোনটা রেখে সামনে যাও তো। দেখবো তোমাকে। মাথা কাজ করছে না। ভীষণ অশান্ত লাগছে।"
সোরায়া বাড়তি প্রশ্ন করলো না। এমন টা প্রথম বার নয়। কলেজে যেদিন সোরায়া যেত না অফ টাইমে মাহির এমনই করতো। আর বরাবরের মতো একটা কথাই বললে অভ্যস্ত সে- "তোমাকে দেখবো। ভীষণ অশান্ত লাগছে।" সোরায়া ফোনটা রেখে সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মাহির স্তব্ধ থেকে শুধু তাকিয়ে রইল। পাঁচ মিনিট পার হলে সোরায়া ফোনের দিকে আসতে নিলে মাহির করুন গলায় চেঁচিয়ে বলল-
"এই হয়নি হয়নি, দাঁড়িয়ে থাকো। আমি আরো দেখবো তো।"
সোরায়া কিছু বলার আগেই জুঁই এসে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে নিল খপ করে। আর হেঁয়ালি করে বলল-
"অনেক হয়েছে। সব শান্তি এখন পেয়ে গেলে বিয়ের পর কোন শান্তির তাল্লাশ করবেন জিজু? এখন আমার এগারো সংখ্যা টা পাঠিয়ে দিন ভালোয় ভালোয়। টাটা। আসসালামুয়ালাইকুম।"
-"আরে কেটে দিলি কেন? উনি তো আরো একটু দেখতে চাইলো।"
জুঁই চোখ পাকিয়ে বলল- "বিয়ের পরে ওনার ঘরে গিয়ে ভালো করে নিজেকে দেখাস কেমন? এইদিকে আমার একটা প্রেম হচ্ছে না আর সে বিয়ে করে ফেলছে। এখন আবার আমার সামনে লুতুপুতু প্রেম করতে চায়। শখ কত..! এই শোন, সিঙ্গেল ব্যক্তি দের অভিশাপ অনেক বাজে। সম্মান দিয়ে চলবে তবেই মিঙ্গেল হয়ে সুখে থাকতে পারবি বুঝলি? যা গিয়ে গোসল কর।"
সোরায়া জুঁইয়ের সাথে তর্কে পারবে না বিধায় সে চুপ চাপ তার কথা মেনে নিয়ে গোসল করতে চলে গেল। জুঁই অপেক্ষা করছিল তার এ্যাকাউন্ট আপডেটের। সেটা হলোও তবে, ১১০০০ এর জায়গায় ১১ দেখে তার মাথায় বাজ পড়লো বোধহয়। সে সঙ্গে সঙ্গে মাহিরকে এই নিয়ে প্রশ্ন করায় উল্টো দিক থেকে মাহিরের জবাব এলো-
"এগারো সংখ্যা চেয়েছিলে তাই দিয়েছি। মন ভরে দেখ। বেয়াদব বিচ্ছু শালিকা। পরীক্ষায় ১১মার্ক কমিয়ে দিবো এবার।"
জুঁই মার্ক কম হওয়ার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে জিভ কামড়ে লিখলো-
"সরি স্যার সরি। আর জীবনেও হবে না। মার্ক কম দিয়েন না প্লিজ। আমি তো উত্তরই করেছি ১১ মার্কের।"
অপর পাশ থেকে আর উত্তর এলো না। নিজের কাজে জুঁই নিজেই ফ্যাসে গিয়ে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে গেল কিছু সময়ের জন্য।
______
বিকেল~
-"তোরা কি বর পক্ষকে জব্দ করার প্রস্তুতি নিতে নিতেই দিন পার করে দিবি? তোদের সময় জ্ঞ্যান দেখে তো আমার জ্বর চলে আসছে।"
-"উফফ্, চাচি..তুমি ঘরে যাও তো। এতো শখ করে বরযাত্রীর জন্য শরবত বানাচ্ছি ডিস্টার্ব করো না।"
-"মিরু..একটু চিলি সস দিবো?" রিমির প্রশ্নে মিরা রিমির দিকে তাকিয়ে বলল- "এটা জিজ্ঞেস করতে হয়? ঢেলে দে পুরো।"
রোকেয়া বেগম চিন্তিত গলায় বলে উঠলেন-
"ছেলে গুলো অসুস্থ হয়ে যাবে মিরা। এসব কি শরবত বানাচ্ছিস?"
-"মহব্বতের শরবত চাচি। তাকিয়ে দেখো, কেমন লাল লাল দেখতে হয়েছে।"
-"মিরা আমি তোকে সাবধান করছি। কারো যেন কিছু না হয়। বিয়েটা নইলে ভেস্তে যাবে।"
রোকেয়া বেগমের বকাবকিতে মিরা চাচার কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল-
"চাচা..তুমি তোমার বউকে নিয়ে ঘরে যাও তো। কনে পক্ষের হয়ে বর পক্ষের জন্য এতো দরদ থাকা ভালো না। যেখানে নিজের পরাণের স্বামীর জন্য মায়া কাজ করছে না সেখানে এসব শুনতে ভালো লাগে? চাচি কে ঘরে নিয়ে গিয়ে সুন্দর করে সাজাও। যাও। শাশুড়ি বলে কথা একদম ডানা কাটা পরী লাগা চাই।"
শফিক রহমান খুবই দৃঢ়তার সহিত মাথা উপর নিচ করলেন। পিছন থেকে রামিলা চৌধুরী কথা কেটে বললেন-
"এখন তো চাচিকেই ডানা কাঁটা পরী বানাতে চাইবি শাশুড়ির জন্য কি আর চিন্তা আছে?!"
মিরা সাথে সাথে রামিলা চৌধুরীর দিকে ফিরে উনার গলা জড়িয়ে ধরে বলল-
"আরে মামণি, চাচি কে তো ডানা কাটা পরী বানাতে হবে আর তুমি..(খানিক সময় নিয়ে নিজ শাশুড়ি কে দেখে বলল) তুমি তো অলরেডি একটা ডানাকাটা পরী।"
রায়হান চৌধুরী পাশ কেটে যাওয়ার সময় একমত প্রকাশ করে গেলেন-"আই এগ্রি।"
রামিলা চৌধুরী পুত্র বধু আর স্বামীর থেকে এমন কথা শুনে লজ্জায় মুখ চেপে হাসলেন। মিরা খিলখিলিয়ে হেঁসে শাশুড়ির মজা নিয়ে বলল-
"ওওহো! শশুর কে তো আমার পুরো দিওয়ানা করে রেখেছ।"
শফিক রহমান মিরার মাথায় গাট্টা মেরে শাসন করলেন-"চুপ, হাড়ে বজ্জাত মেয়ে। শশুর শাশুড়ি কে নিয়ে এমন মজা করতে আছে নাকি?"
মিরা মাথায় হাত ডলতে ডলতে আহ্লাদী সুরে বলল-
"চাচা..আমি কিন্তু ছোট নেই। মা হয়ে যাবো কিছু মাস পর। আমাকে বোকবে না এখন।"
-"বোকলে কি করবি?"
-"আমার বরকে বলে দেব।"
-"তোর বরকে বুঝি আমি ভয় পাই?"
মিরা তর্কে জোড় দেখানোর জন্য কোমরে দুই হাত রেখে বলল-"ভয় না পেলে, দ্যাং দ্যাং করে নিতে এলো আর মেয়ে দিয়ে দিলে?"
রামিলা চৌধুরী এবার বাপ মেয়ের মাঝে বলে উঠলেন-
"ভয়ে না, ভয় ছিল না বলেই মেয়ে দিয়েছে। ছেলে আমার এক মাস পর জ্ঞান ফিরতেই দৌড়ে এসেছিল বউ নিতে। সেই ছেলেকে মেয়ে না দিয়ে উপায় আছে? এমন ছেলে লাক্ষে মিলবে একটা?"
মিরা মুচকি হাসলো লজ্জায়। মেয়েটার চোখ দুটো চকচক করে উঠলো রায়ানের কথা উঠতেই। শফিক রহমান মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কৃতজ্ঞতা শিকার করলেন হাজার বার- ভাগ্যিস সেদিন রায়ানের উন্মাদ প্রেমিক সত্তার সামনে হার মেনে ছিলেন তিনি, নয়তো অনাথ মেয়েটার মুখশ্রীতে এই পূর্ণতার লাজুক চাকচিক্যতা কখনো দেখা হতো না। রোকেয়া বেগম রেগে খটমট করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যেতে যেতে বললেন -
"আমার কথার তো কোনো মূল্যই নেই। যা খুশি কর। কিচ্ছু বলবো।"
রোকেয়া বেগম উপরে চলে গেলে শফিক রহমান ও স্ত্রীর পিছু নিলেন। আর মিরা পুনরায় লেগে গেলো তার দুষ্টু পরিকল্পনায়-
"আরে শরবতে লবণ এতো কম দিচ্ছিস কেন? আরো তিন চামচ দে। এক চুমুকে বমি করা চাই।"
রিমি চোখ বাঁকিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল-
"বর গুলো আমাদেরই। বমি করলে পরিষ্কার ও আমাদের করতে হবে। তুই করবি পরিষ্কার?"
মিরা নাক ছিটকে বলল-
"ইয়াক, তোর কথায় তো আমার এমনি বমি পাচ্ছে। থাক থাক, আর দিস না।"
______
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় এখন প্রায় ৭.৩০। অতিথিদের আগমন শুরু হয়ে গেছে। বাড়ির গুরুজনেরা ব্যস্ত তাদের স্বাগতম জানাতে এই দিকে এই কাজের দায়িত্ব ছিল মিরা আর রিমির। মেয়েদের সময় জ্ঞানের পরিধি চিন্তা করে রোকেয়া বেগমের মাথা বিরক্তিতে ফেটে যাচ্ছে। রোকেয়া বেগম রামিলা চৌধুরীকে উদ্দেশ্যে করে উদ্বিগ্ন গলায় বললেন-
"আপা, বাজে কয়টা দেখেছো? ৮টা বেজে যাবে আর কিছুক্ষণ পরেই। মেয়ে গুলোর কোনো বোধবুদ্ধি নেই। এই সন্ধ্যায় কেউ পার্লারে সাজতে যায়?"
-"আহা, ওদের কি দোষ? মেকআপ আর্টিস্ট রা হঠাৎ বললেন আসতে পারবে না তাই তো তিনজন মিলে ছুটলো পার্লারে এখন বিয়ের দিন কি সাজগোজ করবে না? চলে আসবে তুই টেনশন করিস না।"
-"বললেই তো আর টেনশন কমে যায় না। দু ঘণ্টা হয়ে গেছে। ওদের কল করো। দেখো কত দূর।"
রামিলা চৌধুরী রোকেয়া বেগমকে পেনিক করতে দেখে মিরার নম্বরে কল করলেন। মিরা দুই থেকে তিন বার ফোনটা বাজতেই রিসিভ করে কানে ধরলো-
"হ্যাঁ মামণি বলো..!"
-"কিরে মিরা কতদূর? সময় তো বয়ে চলেছে ঠিকই।তোদের হয় নি?"
-"মামণি, আমি আর রিমি রাস্তায় আছি। এসে যাবো টেনশন করো না। একটু সামাল দাও আপাতত।"
-"তুই আর রিমি মানে সোরা কোথায়?"
-"মামণি এই কম সময়ে কি ব্রাইডাল প্যাকেজ হয় বলো? একটু সময় লাগবে বনুর। আমরা এসে যাই পরে ও এসে যাবে সাজা শেষ হলে।"
রামিলা চৌধুরী এই কথায় একটু ভড়কে উঠলেন-
"কিসব কথা এগুলো? কনে কে রেখে তোরা চলে আসছিস মানে? ও একা একা কিভাবে আসবে পরে?"
মিরা রামিলা চৌধুরীর রাগান্বিত হওয়ায় কারণ বুঝে শান্ত ভাবেই বুঝিয়ে বলল-
"মামণি, বনু বাচ্চা না। ওর বিয়ে আজ। পার্লার থেকে এখানে আসতে পারবে না এমনটা হবে না।"
রামিলা চৌধুরী কথা বাড়ানোকে সময় নষ্ট মনে করলেন। আপাতত মিরা আর রিমি চলে এলেও লোক সামাল দেওয়া যাবে। বরযাত্রী চলে আসতে পারে যেকোনো সময়। এখানে এখন তাদেরকে দরকার। তিনি ফোন কেটে রোকেয়া বেগমকে সবটা বুঝিয়ে বললে রোকেয়া বেগম মন শান্ত করে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলেন।
মিনিট খানেক পর মিরা রিমি বাড়িতে পৌঁছেই অতিথিদের সাথে কথা বলতে মশগুল হলো। তখনও সব স্বাভাবিক দেখে মিরা রিমির স্বস্তি অনুভব হলো কিছু টা- তাদের দেরি হয় নি এতো টুকু তেই প্রশান্তি।
________
-"ওয়াহ..! আমার সেই পিচ্চি কালের হাবলা বন্ধুটা আজ কত বড় হয়ে গেছে। আজ নাকি তার বিয়ে! ভাবা যায়! এই আনন্দ আমি কই রাখবো?"
রায়ান মাহিরের মাথায় পাগড়ি পড়িয়ে দিয়ে ছেলেটার দুই গালে হাত রেখে নাটকীয় সুরে এমন আবেগী কথা বলায় মাহির রায়ানের দিকে বিরক্তিকর চাহনিতে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা সূচক কণ্ঠে বলল- "সিরিয়াসলি রায়ান?!"
রায়ান মাহিরের গাল থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে নিজের ব্লেজার টানটান করে গম্ভীর গলায় বলল- "একটু মজা নিচ্ছিলাম। তোর নার্ভাসনেস কম করার জন্যই।"
মাহির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দুই মুঠো করে অস্থির হয়ে বলে উঠলো-
"রায়ান, আমাকে একটা কথা বলতো, তুই ভাবি কে তুলে নিয়ে কিভাবে বিয়ে করে নিলি? আমার তো নর্মাল বিয়েতেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে বিশ্ব যুদ্ধ করতে যাচ্ছি।"
রায়ান হাফ ছেঁড়ে মাহিরের পাশে বসে মাহিরের কাঁধে হাত রেখে বলল- "কিভাবে করেছি কে জানে! ওকে চেয়েছিলাম, আমার ওকে পেতেই হতো। মন তো এতো টুকুতেই আটকে গেছিল। কিভাবে পেতে হবে, পেতে কি করতে হবে, কোথায় যেতে হবে, এসব কিচ্ছু মাথায় আসেনি। শুধু মনে হয়েছে, ওকে আমার চাই।"
মাহির রায়ানের কথায় ছেলেটার চোখের দিকে তাকালো- তার এক মূহুর্তের জন্য মনে হলো তথাকথিত পিরিতি উপচেপড়ার বিষয়টা হয়তো ঠিক এমনই যা সে রায়ানের চোখে দেখছে মিরার জন্য। মাহির মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলো-
"তুই ভাবিকে অনেক ভালোবাসিস তাই না?"
রায়ানের সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি-
"হুম, অনেক। এতোটা ভালোবাসি যে যদি এখন ফোন করে বলে ওর সাথে কনে পক্ষের লোক হয়ে থাকতে সঙ্গে সঙ্গে চলে যাবো তোকে ফেলে।"
মাহির অফেনসিভ সাইড আই দিলো রায়ান কে-"হারামি..!" রায়ানের হাত কাঁধ থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-"যা সর। চলে যা বউয়ের কাছে। লাগবে না আমার তোকে।"
রায়ান আবার মাহিরের গলা জড়িয়ে বলল-
"আরে প্যারা নিস কেন? তোর ভাবি এটা বলবে না রে।"
ঠিক তখনই রুদ্র দ্রুত পায়ে মাহিরের রুমে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলো-"তোমাদের কি এখনো হয় নি? বরযাত্রী রেডি। এবার বর বেরোলেই রওনা দেবে সবাই।"
রায়ান রুদ্রর দিকে তাকিয়ে মাহিরের পিঠ চাপড়ে বলল-
"তুই আমাকে জিজ্ঞেস করছিস আমি কিভাবে বিয়ে করে নিলাম। কিন্তু আসল মহাজন তো সামনে- ওকে জিজ্ঞাসা কর ও কিভাবে বিয়ে করে নিল।"
কথাটা বলেই রায়ান হেঁসে উঠে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। মাহির ও উঠে দাঁড়িয়ে রুদ্রর দিকে এগিয়ে গেল। রুদ্র একটু অবাক রায়ান মাহির কি প্রসঙ্গে কথা বলছে সেই নিয়ে কোনো ধারণাই নেই ছেলেটার। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর কোর্টের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার রুদ্রর শার্টের কলার টা ঠিক করে দিয়ে রায়ান কে বলল-
"এই মহাপুরুষ কে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করতে চাই না বাবা। তোদের দুই ভাইয়ের পা থেকে মাথা সম্পূর্ণ টাই কলিজা।"
রায়ান নিজের চুল সেট করতে করতে-
"আমাদের পুরো শরীর কলিজা তাহলে তোরটা কই।"
মাহির এক সেকেন্ড সময় না নিয়ে বলে দিল-
"তোর শালিকে দিয়ে দিয়েছি। বকবক করে এমন ভাবে মায়ায় ফেলেছে যে চেয়েও নিজের কাছে রাখতে পারি নি।"
রুদ্র মাহিরের হাত নিজের উপর থেকে সরিয়ে দিয়ে বলল-
"নেকামি দেখলে গা জ্বলে। পুরো কলেজ দাওয়াত দিয়ে নিজের স্টুডেন্টকে বিয়ে করছে সে আবার কলিজার কথা বলে।"
আর কিছু সময় দাঁড়ালে ভালো রকম একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতা হয়ে যাবে এই ঘরে বুঝে রায়ান মাহির আর রুদ্র কে তাড়া দিয়ে বলল-
"হয়েছে, চল চল। দেরি হয়ে যাচ্ছে। বিয়ের প্রচুর ঝামেলা এখনো বাকি।"
এরপর আর কি বিশাল তোরজোর করে বের হলো বরযাত্রী। ছেলের বিয়েতে সবচেয়ে আমোদ হয়তো সীমা খানই করছেন। একমাত্র ছেলের বিয়েতে কোনো শখ বাদ রাখেনি তিনি। বরযাত্রীর কেউ যাত্রাপথে নিজেদের নাচ থামালো না। বাড়িতে নতুন সদস্য আসবে এই খুশিতে সকলে ডগোমগো। মাহিরের হৃদস্পন্দন এখন আকাশ ছোঁয়া। প্রিয়শীকে আপন করতে তার দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথ যত ক্ষীণ হচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকুনি গতি যেন চূড়ান্ত সীমা পার করছে।
_______
-"বর এসেছে, বর এসেছে.. বরযাত্রী চলে এসেছে। কে কোথায় আছো? জলদি গেইটে আসো।"
একঝাঁক চার চাকা গাড়ি দেখে জুঁই চিৎকার করে উঠলো। মিরা এই কথা শুনে এক হাতে রিমির হাত ধরে অন্য হাতে নিজের লেহেঙ্গা সামলে ছুটলো গেইটের দিকে-
"তাড়াতাড়ি চল মরা, গেইট ধরা মিস করা যাবে না।"
-"আরে তুই ধীরে দৌড়া। রায়ান ভাইয়া আমাকে বলে গেছে তোকে দেখে রাখতে। পরে বোকবে আমাকে।"
মিরা রিমি কে টানতে টানতে গেইটের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল-
"ভাইয়ার চামচি, একটা মারবো। চুপচাপ চল জলদি।"
আলোকসজ্জায় ঝলমল করা গেট পেরিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে প্রবেশ করলো বরযাত্রীর দল। সামনে বন্ধুদের হইহুল্লোড়, মাঝখানে আত্মীয়দের ব্যস্ততা পূর্ণ তিন চারটা বড় বড় গাড়ি। আর সবার কেন্দ্রে ফুলে আবৃত সুসজ্জিত বরের গাড়ি যেটা রায়ান ড্রাইভ করছে। ছোটরা আতশবাজির আলোয় মেতে উঠেছে, বড়রা ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়নে। আর কনের বান্ধবীরা? তারা তো বরপক্ষকে আটকানোর নতুন নতুন ফন্দি আঁটতেই ব্যস্ত। পুরো পরিবেশটা যেন মুহূর্তেই এক টুকরো উৎসবে পরিণত হলো। মিরা, রিমি আর জুঁই সহ রিমি সোরায়ার আরো কিছু বন্ধু বান্ধবরা বিশাল বড় গেইট ঘিরে দাঁড়ালো। সবার চোখে মুখে বিয়ে বাড়ির চেনা পরিচিত দুষ্টুমি ভরা ছাপ। বরযাত্রীর গাড়ি গুলো সামান্য দূরত্বে থামলো কেবল বরের গাড়ি ড্রাইভ করে রায়ান গেইটের দিকে এগোলো। গাড়ির ভেতর থেকেই সামনে থাকা এক ঝাঁক মানুষের ভীড়ে রায়ানের নজর গিয়ে থামলো মিরার উপর। ছেলেটার চোখ জোড়া যেন আকুল হয়ে ছিল তার হৃদপাখিকে প্রাণ ভরে দেখার জন্য। রায়ান মিরাকে আপাদমস্তক একনজর দেখে শুকনো ঢোক গিললো। গোলা শুকিয়ে এলো তার, অন্তরে ঢাকঢোল বাজতে লাগলো এমন ভাবে যেন বিয়েটা সেই করতে এসেছে। মাহির রায়ানের দিকে দেখলো আবার সামনে মিরার দিকে তাকালো। তার মন চাইলো রায়ানের মাথাটা ধরে স্টেয়ারিং-এ ঠুকে দিতে। কিন্তু নিজের বিরক্ত ভাব সংবরন করে মাহির শান্ত গলায় রায়ানকে বলল-
"ভাই আল্লাহর রস্তে নিজের বউরে এইভাবে চোখ দিয়ে খাওয়া বন্ধ কর।"
রায়ান বোধহয় মাহির কথা শুনতে পেল না। কোনো প্রতি উত্তর নেই, শরীরের নড়াচড়া বন্ধ, চোখ জোড়া এখনো মিরার উপর স্থির। মাহির এবার বাধ্য হয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠলো-"রায়াননন..!"
-"হ্যাঁ, হ্যাঁ, হুয়াট..কে..?" হকচকিয়ে উঠলো রায়ান।
মাহির তার চোখ দুটো ছোট ছোট করে দাঁত বের করে হেঁসে বলল- "আমি..মাহির..তোর বন্ধু..আজ আমার বিয়ে..মনে পড়ছে কিছু?"
রায়ান এমন সময় মাহিরের হেঁয়ালি করে বলা কথা পছন্দ হলো না। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা কিছু সেকেন্ডের জন্য নিচু করে মাহিরের উদ্দেশ্যে করুন গলায় বলল-
"ভাই...মনে হচ্ছে তোর সাথে এখন নিজেও বিয়ে করে নিই আবার।"
মাহির কিছু বলল না। পিছন থেকে রুদ্র কিছু বলছে না দেখে মাহিরের পিছন সিটে তাকালো। সে হতাশ হলো রুদ্র কেও একই অবস্থায় দেখে। মাহির বিরক্ত হয়ে বলে উঠলো-
"ধুর বিয়েই করবো না আমি। বসে থাক তোরা।"
বেশ অনেকক্ষণ যাবত কাউকে গাড়ি থেকে নামতে না দেখে মিরা অধৈর্য হয়ে চিকিৎসা করে বলে উঠলো-
"আরে আরে ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? এখনো তো কি করলামই না। গাড়ি থেকে তো নামুন। একটু আপপায়ন করার সুযোগ টুকু তো দিন।"
রায়ান নিজের মাথা তুলে একটু ঝাঁকিয়ে বলল-
"লেট'স গো বয়েজ। এখন দূর্বলতা দেখানো যাবে না।"
রায়ান গাড়ি থেকে নামলো। রায়ানের দেখা দেখি রুদ্র আর মাহির ও নামলো। মাহির কে মধ্যমণি করে রায়ান ও রুদ্র পাশ থেকে নিজের কোর্ট টানটান করে এগিয়ে গেল গেইটের দিকে। মিরা রিমি রায়ান আর রুদ্র কে এক নজর দেখে একে অপরের কাছে কাছে ঝুঁকে এলো। মিরা রিমি কে অস্থির গলায় বলল-
"বিয়েটা কার রে? আমার বিয়ে বিয়ে পাচ্ছে কেন?"
রিমি হাসতে হাসতে বলল-"বিয়ে বিয়ে তো আমারও পাচ্ছে। কিন্তু এখনকার মতো সামলে যা।"
-"হুম হুম...!" মিরা সম্মতি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের ভেতরকার অদৃশ্য সত্তাকে বুঝিয়ে বলল-
"পাপা কি প্রিন্সেস..মাম্মা কে উষ্কানি দিও না। মাম্মা এখন পাপাকে ওভাবে দেখতে পারবো না। পরে দেখবো ওকে?"
-"আরে রুদ্র, মানুষ কই? কাউকে দেখছি না কেন? এখানে দূর দূর পর্যন্ত কাউকে চোখে পড়ছে না রে। কেউ কি আমাদের লেভেলে নেই?"
রায়ানের হঠাৎ কথায় মিরা ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকালো। রায়ান নিজের উচ্চতার প্রেক্ষিতে নজর ঘুরিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে বলল কথা টা। তবে তা দেখে মিরার বুঝতে একটুও অসুবিধা হলো যে রায়ান ইচ্ছে করে তাদের উচ্চতার মজা উড়াচ্ছে। সাইড থেকে রিমি মুখ টিপে হেঁসে বলে উঠলো-
"আহা রে, এতো সুদর্শন পুরুষরাও চোখে কম দেখে? এটা তো অনফেয়ার।"
সকলে হেঁসে উঠলো। রুদ্র রায়ান কে ডেকে তার নজর নিচু করিয়ে বলল- "আরে ভাইয়া উপরতলায় কি দেখো? মানুষ তো গ্রাউন্ড ফ্লোরে।"
-"ওহো তাই তো , তাই তো..!"
মিরা রায়ানের উদ্দেশ্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো। রায়ানের চোখ মিরার চোখের পড়তেই বাকি সবাই তার জন্য অদৃশ্য হলো। সে মিরার দিকে ঝুঁকে খোঁচাখুঁচি খেলার শুরু করলো-
"আসসালামুয়ালাইকুম, বেয়াইন সাহেবা?"
মিরাও তাল দিলো মুচকি হেঁসে-"ওয়ালাইকু আসসালাম, বেয়াই সাহেব।"
-"বেয়াইন সাহেবা, আমাকে একটা কথা বলুন তো। খোদা যখন উচ্চতা দিচ্ছিলেন তখন আপনি কোথায় গেছিলেন? শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যান।"
রায়ানের হাঁসি মুখে বলা এই খোঁচা মারা কথার প্রতি উত্তর ও হাঁসি মুখেই দিল-
"আর বলবেন না, আসলে আমি তখন কিছু মানুষের জন্য এক্সট্রা ব্রেইন নিতে গেছিলাম। কিছু কিছু মানুষের কাছে শুধু ওই নিচ তলার উচ্চতা টুকুই আছে উপর তলা তো খালি।"
রায়ান নিজের নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো ধৈর্য ধরতে। মিরা থামলো না-
"এ্যান্ড গেছ হুয়াট বেয়াই সাহেব, এক্সট্রা ব্রেইন নিয়েও কোনো লাভ হলো নি।"
রায়ানের ইচ্ছে হলো জোরছে একটা চুমুতে মিরার মুখটা বন্ধ করে দিতে। বেচারা না পারতে, সহ্য করে নিল স্ত্রীর দিকের মিষ্টি অপমান। রিমি একটা বড় ট্রেতে করে কয়েকটা গ্লাস ভর্তি শরবত নিয়ে এলো। মিরা চমকিত ভাব ধরে এক গ্লাস শরবত তুলে নিয়ে রায়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে আদুরে গলায় বলল-
"বেয়াই সাহেব, এতো দূর থেকে এসেছেন। হয়তো ভীষণ পিপাসা পেয়েছে তাই না। এটা নিন। প্রাণ জুড়ানো লবণে পোড়া, চিলি সস এর শরবত।"
মাহির রুদ্র বড় বড় চোখে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান কুটিল নজরে মিরার দিকে তাকালো। মিরা শরবতের গ্লাসের দিকে ইশারা করাতে রায়ান বাঁকা হেঁসে মিরার হাত থেকে শরবতের গ্লাস টা নিল-"থ্যাঙ্কস বেইবি..!"
মিরা একটু লজ্জায় পড়লো বোধহয়। শুধু মিরা নিজ হাতে দিয়েছে বলে রায়ান এক চুমুক খেলো। এক ফোঁটা মুখে পড়তেই রায়ানের মাথা ঘুরে গেল মনে হলো। মিরা মনে মনে একটু অপরাধবোধে ভুগলো। রিমি রুদ্রর দিকে শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিয়েও আবার ফিরতে নিয়ে নিল। রায়ানের মুখ দেখে তার আর সাহস হলো না রুদ্র কে সেটা খেতে দেওয়ার। যতই হোক মায়া তো লাগছে ছেলে গুলোর জন্য। মাঝ থেকে জুঁই রায়ান কে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলো-
"ভাইয়া..আপনার কি মাথা ঘুরে গেছে?"
রায়ান নিজের মুখ মুছে চোখের পলক ফেলে বাস্তবে ফেরার চেষ্টায় মিরার দিকে তাকিয়ে জুঁইয়ের প্রশ্নের উত্তরে বলল-
"হ্যাঁ, একটু। এক মহারানি কে পৃথিবী মনে করে এমন ভাবে তার পিছনে ঘুরেছি যে মাথাটাই ঘুরে গেছে।"
মিরা একটু ইতস্তত বোধ করে রায়ানের হাত থেকে শরবতের গ্লাস কেড়ে নিলো। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে অধৈর্য স্বরে জিজ্ঞাসা করলো-
"আপুরা..দাবি বলুন..!"
মিরা রিমি আর জুঁইয়ের সাথে চোখাচোখি করে বলল-
"১ লাখ..!"
মাহির আর কথা কাটাকাটি করলো না। এমনি তেই জান চলে যাচ্ছে ভেতরে গিয়ে সোরায়াকে এক নজর দেখবে বলে। বউ সাজে কত সুন্দরই না হয়তো লাগছে তাকে। মাহির মেনে নিল দাবি-"ওকে ডান। ১লাখ। তবে আমারও একটা শর্ত আছে।"
-"কি বলুন..!"
-"৫০ হাজার এখন আর বাকি ৫০ বউ দেখার পর দিবো।"
মাহিরের শর্তে মিরা ঘাবড়ে রিমির দিকে তাকালো- সোরায়া তো এখনো এসে পৌঁছায় নি। আর এমন সময় নতুন বউকে পার্লারে যেতে হয়েছে যেখানে মেকাপ আর্টিস্টের বাসায় আসার কথা জানাজানি হলে ৫০ হাজারো হাত থেকে যাবে। মিরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল-"ওকে ডান ডিল।"
মাহির মুচকি হেঁসে রায়হানকে ইশারা করতেই রায়ান পকেট থেকে ৫০ হাজার টাকার বান্ডেল বের করে মিরার দিকে এগিয়ে দিল। মিরা সেটা নিতে গেলে রায়ান সেটা পুনরায় নিজের দিকে নিয়ে মিরার কানের কাছে ঝুঁকে কানে কানে ফিসফিস করে বলল-
"বেয়াইন সাহেবা, ওই শরবতের তিক্ততার মিটমাট আপনার ঠোঁটের মিষ্টতা দিয়ে করবো আমি। বি রেডি ফর দ্যাট।"
মিরার চোখ এক মূহুর্তের জন্যও ছানাবড়া হলো। ভয়ার্ত নজরে রায়ানের দিকে তাকালে রায়ান মিরাকে চোখ টিপে ইশারা করলো। মিরা শুকনো ঢোঁক গিলে চট জলদি রায়ানের হাত থেকে টাকার বান্ডিল টা ছিনিয়ে নিল। এরপর আর কি, জামাই আদর করা হলো। বাচ্চারা গেইট ছাড়লে রোকেয়া বেগম এবং রামিলা চৌধুরী মাহিরকে মিষ্টি মুখ করিয়ে স্বাগতম করেন। কিছু টা সময় পর মাহির স্টেজের উপর একা বসে অপেক্ষা করতে থাকলো সোরায়ার জন্য। বারবার ছেলেটা আশপাশ দেখে যাচ্ছে অধির আগ্রহে। মনের ব্যাকুলতা বেড়েই চলেছে তার। মিরা করিডরে দাঁড়িয়ে টেনশনে পায়চারি করছে এটা একা বকবক করতে করতে। হঠাৎ তার কেউ এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো এক ফাঁকা পরিবেশে।
চলবে...
পাখিরা পর্ব অনেক বড় হয়ে গেছে এটা। বাকিটুকু পোস্টে নিচ্ছে না ছাতার মাথা 😑। পারের টুকু যে বিয়ে অংশ টুকু আছে🤦। আপাতত এইটুকুই পড়ো। কাল ওইটুকু দিয়ে দিবো নে। এখন দুই পর্ব একসাথে দিলে রিচ আসবে না একসাথে দুই পর্বে 🥲। এইটুকু পড়ে কমেন্ট করো কেমন হয়েছে। একটু বেশি রেসপন্স করো। সকালে যদি ১.৫ কে রিয়েক্ট থাকে তাহলে সকালেই দিয়ে দিবো। Love you pakhis ❤️ 🥰
#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ বিয়ে স্প্যাশাল #Soul_bound_obsession
#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান
#Part_76 (3rd)
(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)
(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)
মিরা করিডরে দাঁড়িয়ে টেনশনে পায়চারি করছে একা একা বকবক করতে করতে,
— “ইয়া আল্লাহ! যদি কিছু গণ্ডগোল হয়ে যায়? না না… শান্ত হ মিরা… কিছু হবে না…”
হঠাৎ কেউ এক ঝটকায় তাকে টেনে নিলো এক ফাঁকা পরিবেশে। লেহেঙ্গার ব্যাকলেস ব্লাউসে উন্মুক্ত পিঠ ঢেকে গেল এক প্রশস্ত হাতের তালু দ্বারা, অন্য হাতটা তার কোমরের পাশে শক্ত হয়ে রইলো, যেন সামান্য নড়ার সুযোগটুকুও দেবে না। চোখের পলকে সযত্নে দেয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকলো মিরার। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব মিরা আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে ফেললো। বুকের ভেতর ধকধক শব্দ যেন করিডরের নীরবতাকেও হার মানাচ্ছে। মিরা নিজের দূর্বল কায়া সামলে উঠার আগেই কাউকে নিজের বড্ড কাছে অনুভব করলো। দ্বিধান্বিত মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়ার আগেই—
উষ্ণ এক জোড়া ওষ্ঠ তার কোমল গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া বন্দি করে নিলো নিজের মাঝে। মুহূর্তেই জমে গেল মিরার সম্পূর্ণ শরীর, চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠলো বিস্ময়ে, মাথার ভেতর সবকিছু এলোমেলো লাগছে তার। দু’হাত দিয়ে ছেলেটার প্রশস্ত বুকে ধাক্কা দিতে লাগলো সে। মুক্তি পেতে চাইলো সেই বন্ধন থেকে। কিন্তু অপর পাশের মানুষটা যেন আজ একচুলও দূরে সরে যাওয়ার পক্ষে নেই। বরং আরও ধীর, আরও গভীরভাবে তাকে থামিয়ে দিলো। মিরার ছটফটানি টের পেয়ে ছেলেটা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলো আস্তে করে। নীরব একটা আশ্বাস। যেন বোঝাচ্ছে—
“শান্ত হও… প্লিজ… শুধু এই মুহূর্তটা…”
মিরার এলোমেলো নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো। বুকের ভেতর কাঁপন বাড়তেই হঠাৎ তার নাকে ভেসে এলো এক চেনা ঘ্রাণ, খুব চেনা, ভীষণ কাছের কারো। এক মুহূর্তেই শরীরের সমস্ত টান থমকে গেল তার। চোখের পাতাগুলো কেঁপে উঠলো হালকা করে মনে পড়লো সেই সতর্ক বাণী-
"ওই শরবতের তিক্ততার মিটমাট আপনার ঠোঁটের মিষ্টতা দিয়ে করবো আমি। বি রেডি ফর দ্যাট।"
পুরুষালি এই ভারী নিঃশ্বাস, এত কাছ থেকে বুক কাঁপিয়ে পড়ার ভঙ্গি, এই স্পর্শ… সবটাই মিরার চেনা। এতটাই চেনা যে অন্ধকারেও ভুল হওয়ার উপায় নেই মানুষটাকে চেনার ক্ষেত্রে। মিরার নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে আটকে আসতে লাগলো। অসহায় হয়ে এক হাত রায়ানের কাঁধে রাখলো সে, আর অন্য হাতটা গিয়ে ঠেকলো তার বুকের উপর। হালকা টোকা দিয়ে মৃদু আওয়াজ বের করলো— “উউউমম্…!”
রায়ান কয়েক সেকেন্ড স্থির রইলো মিরার ঠোঁটে, যেন নিজের ভেতরের সমস্ত তীব্রতা সামলানোর শেষ চেষ্টা করছে। তারপর ধীরে ধীরে সরে এসে কপাল ঠেকালো মিরার কপালে। দু’জনের এলোমেলো নিঃশ্বাস একসাথে মিশে যেতে লাগলো নীরব আলো-আধারী পরিবেশে।
রায়ান চোখ বন্ধ রেখেই গভীর, ঘোর লাগানো কাঁপা স্বরে বললো—
“আই মিসড ইউ… হার্টবার্ড…”
কথাগুলোর ভেতরে এমন এক ক্লান্ত আকুলতা, যেন বহুদিনের জমে থাকা অস্থিরতা অবশেষে ছুঁয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছে। মিরা এখনও হাঁপাচ্ছে। বুকটা দ্রুত উঠানামা করছে তার। কাঁপা কাঁপা চোখ তুলে তাকালো রায়ানের দিকে। করিডরের ক্ষীণ আলোয় ছেলেটার রক্তিম চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম গভীর লাগছে। সেই চোখে ক্লান্তি আছে, অভিমান আছে, আর আছে একরাশ না বলা আকুতি। মিরার গলা কেঁপে উঠলো।
— “আই মিসড ইউ টু… কাম ডাউন… একটু শান্ত হন প্লি...!"
বাকিটুকু আর শেষ করতে পারলো না সে। শব্দের গতি রোধ হলো পুনরায়। তবে এবার কোনো আকস্মিকতা ছিল না। ছিল দমিয়ে রাখা অনুভূতির ধীর বিস্ফোরণ।
রায়ানের ঠোঁট আবার ছুঁয়ে গেল মিরার ঠোঁট। মিরা প্রথমে শক্ত হয়ে রইলো। তার আঙুলগুলো অজান্তেই মুঠো পাকিয়ে গেল রায়ানের কোর্ট ও শার্টের কলারে। কিন্তু রায়ানের কাঁপা নিঃশ্বাস বারবার তাকে ছুঁয়ে যেতে থাকলে ধীরে ধীরে তার ভেতরের অস্থিরতাটাও নরম হতে শুরু করলো। মিরার মাথার পাশে দেয়ালে রাখা হাতটা আরও শক্ত হলো রায়ানের আর একটা সময়ে হাতটা মিরার চুলের ভাঁজে জায়গা নিল, অন্য হাত আলতো করে ছুঁয়ে রইলো মিরার গাল।
করিডরের বাইরে মানুষের শব্দ ভেসে আসছে। অথচ এই ছোট্ট অন্ধকার জায়গাটায় সময় যেন থমকে গেছে।
রায়ান ধীরে সরে এসে কপাল ঠেকিয়ে রাখলো আবার। দু’জনেই হাঁপাচ্ছে। মিরার চোখের পলক কাঁপছিল অবিরত। আর রায়ান শুধু তাকিয়ে রইলো তার দিকে— এমনভাবে, যেন বহু অস্থিরতার পর অবশেষে নিজের শান্তিটাকে খুঁজে পেয়েছে।
-"মিয়াও...!" হঠাৎ এমন মিনমিনে আওয়াজে দুজনের ধ্যান ভঙ্গ হলো। দুজন একসাথে ওই আওয়াজের উৎস খুঁজতে নজর ঘুরাতেই মেঝেতে ফ্যালফ্যাল করে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকা রোমিও কে দেখতে পেল। ছোট্ট ছেলেটা পা গুটিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে বড় বড় চোখ করে মনোযোগ দিয়ে তথাকথিত শশুর শাশুড়ি কে চুমু খেতে দেখছে। মিরা রোমিও উপস্থিতিতে অদ্ভুত ভাবে লজ্জিত অনুভব করলো। দাঁতে জিভ কেটে দুই হাতে মুখ লুকিয়ে রায়ানের বুকে ঝুঁকে গেল সে। রায়ান দুই আঙ্গুলে কপাল চেপে মিরার মাথায় হাত রেখে স্বান্তনা দিল। রায়ান রোমিওর দিকে করুন নজরে তাকিয়ে চোখের ইশারায় নিজের অসহায়ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করলো। মনে মনে মিনতি করলো-
"বাপ আমার, চলে যা। দেখছিস তো লজ্জা পাচ্ছে তোর শাশুড়ি। বহু কষ্টে বউটা কে কাছে পেয়েছি। শশুরের এতো বড় ক্ষতি করিস না। ভুলে যাস না তোর বিয়ে আমি দিয়েছি আমার মেয়ের সাথে।"
রোমিও ঘাড় কাত করে মায়াবী চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে সাড়া দিল যেন বলতে চাইছে-"আমি কি করলাম? যা করার তা তো তোমরাই করলে। আমি তো শুধু দেখেই গেলাম।"
মিরা অস্বস্তি তে রায়ানের বুকে মুখ লুকিয়েই মাথা ঝাঁকিয়ে রায়ান বুকে সজোরে আঘাত করে বকলো তাকে- "আপনি একটা অসভ্য, অশ্লীল লোক। নিজের উপর একটুও কন্ট্রোল নেই কেন আপনার? আমার সব মানসম্মান পানিতে গেল।"
রায়ান বিরক্তি ভরা চোখ জোড়া বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেবল মিরার বকা সহ্য করে নিল। রোমিও এখনও তাদেরকে দেখে যাচ্ছে। রায়ান রোমিওর দিকে চোখ পাকিয়ে ইশারায় তাকে চলে যেতে বলল। রোমিও চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেল লেজ গুটিয়ে। রোমিওর প্রস্থানের পর রায়ান মিরার দিকে নিচু নজরে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল-
"এইযে আমার লজ্জাবতী, আপনার মেয়ে জামাই চলে গেছে। এবার মুখ উঠিয়ে নিজের জামাইকে একটু দেখবেন প্লিজ? তার যে জান বেরিয়ে যাচ্ছে আপনাকে প্রাণ ভরে দেখার জন্য।"
মিরা ধীরে নজর উঠিয়ে রায়ানের দিকে তাকালো। দুজনের নজর এক হতেই একসঙ্গে খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠলো। রায়ান মিরার কোমর আঁকড়ে ধরে নিজের কাছে নিয়ে এলো। মিরা রায়ানের মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে থেকে আনমনে অর্ধ বুলিতে বলল- "আপনার ফেইস..!"
-"কি আমার ফেইস..?
মিরা মিষ্টি হেঁসে ফ্লার্টি ভাব নিয়ে বলল-
"কিছু না, it's cute..!" কথাটা বলে মিরা হিহি করে হেঁসে উঠলো।
রায়ান মিরার হাস্যোজ্জ্বল মুখটা দেখে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজেকে সংযত করে দুষ্টু হেঁসে মিরার দিকে ঝুঁকে হাস্কি কণ্ঠে প্রশ্ন রাখলো-"Wanna sit..?!"
মিরা হাঁসি তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে পাল্টা প্রশ্ন করলো-"কিহ্..?!"
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে নিজের কথা পাল্টে বলল-
"কোলে বসার কথা বলছি সোনা, অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছো তো তাই। আমার প্রিন্সেস এর কষ্ট হয় যদি। Wanna sit..?"
মিরা চোখ বাঁকিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বুকে আড়াআড়ি ভাবে হাত বেঁধে হেঁয়ালি করে প্রশ্ন করলো-
"মিস্টার বেয়াই সাহেব, আপনি কি বাই এনি চান্স আমার সাথে ফ্লার্ট করছেন?"
রায়ান এক গাল হেঁসে পুরো ভাব নিয়ে মিরার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল-
"বেয়াইন সাহেবা, আপনি ফ্লার্টিং এর কথা বলছেন.. অথচ আমার চোখের দিকে তাকালেই আপনি পোটে যাবেন।"
মিরা রায়ানের এমন নির্লজ্জের মতো কথা শুনে তার বুকে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে দিল। সে ঠোঁট বাঁকিয়ে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-
"শুনেছি আপনি বিবাহিত, আমার আবার কারো সংসারে আগুন লাগানোর শখ নেই।"
রায়ান জিভের সাহায্যে নিজের ঠোঁট জোড়া ভিজিয়ে সম্মতি প্রকাশ করে বলল-
"হুম, কথাটা ভুল বলেন নি। বউ আমার সেই হট, আগুন লাগলে অস্বাভাবিক কিছু মনে হবে না আমার।"
রায়ানের সাথে কথায় পেরে ওঠা মুশকিল। মিরার কথার ভান্ডার ফুরিয়ে এলো তবুও হারমানলে চলবে না-
"কিছু মানুষ আছে জানেন, তাদের বউ চাই হট কিন্তু সংসারে আগুন লাগলে সমস্যা। আবার কিছু কিছু নমুনা আছে হট বউ পাওয়ার জন্য এ্যাকসিডেন্ট করে হসপিটালে বসে থাকে এক মাসের জন্য।"
রায়ান মিরার তর্কে হেঁসে উঠলো। সে নিজের দুহাত উপর করে নিয়ে বলল- "Ok ok, fine.. I, the Rayan chowdhury accepts his defeat.. happy now? কি হবে বিতর্ক করে সেই তো দিন শেষে তুমি আমার।"
মিরা রায়ান কে হাড় মানতে দেখে তৃপ্তি নিয়ে হাসলো। রায়ানের সিদ্ধান্তের বাহোবা দিয়ে বলল-
"গুড গুড, নারীদের কথার উপর কথা বলা পুরুষরা কখনো সুখে শান্তিতে থাকতে পারে না বুঝেছেন?"
-"হুম, তুমি বুঝাবে আর আমি বুঝবো না তা কি কখনো সম্ভব বলো? আমি সুখী পুরুষ হতে চাই। আর আমার এই প্রিটি হট বউটার সাথে শান্তি তেও থাকতে চাই।"
মিরা রায়ানকে সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরে তার ডান গালে ছোট্ট করে একটা চুমু খেল। আর তখনই হঠাৎ মিরার ফোন বাজলো। মিরা রায়ান কে ছেঁড়ে ফোনের দিকে তাকাতেই রায়ান বিরক্ত হয়ে মিরার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল-
"বালের এই ফোন কি বাজার আর সময় পায় না?"
ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে-"সোরার কল..ও তোমাকে কল করছে কেন? ওর তো এখন স্টেজে মাহিরের সাথে থাকার কথা।"
সোরায়ার নাম শুনতেই মিরার মনে পড়লো সোরায়া এখনো পার্লারে আছে। রায়ানের সাথে সময় কাটাতে গিয়ে ওর কথা তো সে ভুলেই গেছে। কনে বিয়ের আসরে নেই জানাজানি হলে অনেক বড় কেলেংকারি হয়ে যাবে। মিরা একপ্রকার যুদ্ধ করে রায়ানের হাত থেকে নিজের ফোনটা নিয়ে সোরায়ার কল রিসিভ করলো-
"হ্যালো হ্যালো, বনু..! শুনছিস?"
-"আপু..১৫ মিনিট ধরে পার্লারের নিচে দাঁড়িয়ে আছি একটা গাড়িও পাচ্ছি না। ফোনের ডাটা শেষ একটা ওবার ডাকার ও অবস্থা নেই। চার্জও শেষ হয়ে এসেছে। কি করবো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। আমার খুব ভয় করছে। কান্না পাচ্ছে খুব।"
ভয়ার্ত কন্ঠে সোরায়া এক টানা কথা গুলো বলে গেল। মেয়েটার কণ্ঠস্বরে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। মিরা শুকনো ঢোক গিলে আগে সোরায়াকে শান্ত করা জরুরি মনে করলো-
"বনু আমার কথা শোন। চিল কর। কিচ্ছু উল্টোপাল্টা হবে না সব পারফেক্টলি হবে। আমি আসছি।"
মিরা কথা না বাড়িয়ে কলটা কেটে ব্যস্ত গলায় রায়ান কে বলল-
"হাবি..আই নিড টু গো। এই দিকটা সামলে নিন। আমি আসছি। হাইয়েস্ট ১৫-৩০ মিনিট। এইটুকু সময় একটু ম্যানেজ করে নি।"
রায়ান মিরাকে টেনশনে দেখে অবাক হলো। এমন কি সে মেয়েটার একটা কথার মানেও বুঝলো না-
"বেইবি, কি বলছো তুমি? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। কোথায় যাবে তুমি। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে চলো।"
-"প্লিজ প্লিজ প্লিজ, এখন এমন করবেন না। আমার কথা শুনুন। আপনি এখানে থাকুন প্লিজ। এখানে আপনার প্রয়োজন পড়তে পারে আমি আসছি।"
-"আচ্ছা, যাচ্ছো টা কোথায় সেটা তো বলবে।"
-"বনুকে আনতে যাচ্ছি। তাড়াতাড়ি চলে আসবো।"
মিরা হাতে লেহেঙ্গা আঁকড়ে দৌড়ে উপরে নিজের ঘরে গিয়ে নিজের বাইকের চাবি নিয়ে নিচে নামলো। রায়ান ড্রয়িং রুমে এলো। অতিথিদের বিচরণ চারদিকে মাহির বেজার মুখে স্টেজের সোফায় বসে আছে। রায়ানের মাথায় ঢুকছে না মিরা সোরায়াকে কোথা থেকে আনার কথা বলল। এখন তার টেনশনে মাথার সকল চিন্তা ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। মিরা নিচে নামতেই বর পক্ষের কেউ একজন তার পথ আটকে দাঁড়ালো।
-"মিরায়া রাইট..? কনের বোন!"
মিরা চমকিত হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে গেল-
"জি, কোনো প্রয়োজন? ডু ইউ নিড সামথিং?"
-"ইউর নাম্বার.. মে আই হেভ ইট?"
মিরা এক সেকেন্ডের জন্য নিজের চোখ বন্ধ করে মনে মনে সময়কে দোষারোপ করলো-
"হায় আল্লাহ, এইটা কোন আবালের পাল্লায় পড়লাম এখন? আমার পেটে একজনের বাচ্চা , বিবাহিত সুখী মেয়ে মানুষ আমি আর এই লোক আমার নাম্বার চাইছে লাইক হুয়াট দ্যা হেল..আমার বোনটা কতই না ভয় পাচ্ছে এখন। এমন একটা দিনে এসব প্রেশার নেওয়া যায়?"
দূর থেকে রায়ান মিরাকেই দেখছে। মিরার রায়ানের সাথে চোখাচোখি হওয়ার পর মেয়েটার আত্মায় সাহস এলো একটু। মিরা লোকটার দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক ঠোঁট প্রসারিত করে হেঁসে বলল-
"অবশ্যই, কেন না। আপনার ফোন দিন।"
লোকটা হাসি মুখে নিজের ফোনটা এগিয়ে দিল। দূর থেকে রায়ানের রক্ত মাথায় চড়ে যাচ্ছে এসব দেখে। শুধু বিয়ে বাড়িতে সবার সামনে এখন সিনক্রিয়েট করার মন মানসিকতা বা সুযোগ নেই বলেই কিছু উল্টো পাল্টা করছে না ছেলে টা। তার বিশ্বাস মিরা হ্যান্ডেল করে নেবে শান্তভাবে। মিরা লোকটাকে নাম্বার টাইপ করে দিয়ে সামনের দিকে এগোলো। পিছন থেকে লোকটা চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-
"আপনি কখন ফ্রি থাকেন? কখন কল করলে পাবো আপনাকে?"
মিরা আর থামলো না নজর সামনের দিকে রেখেই জোরে বলল-
"কল এনি টাইম।"
মিরার কথায় রায়ানের ভ্রু কুঁচকে এলো। মিরা রায়ানের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় রায়ানের উদ্দেশ্যে বলে গেল-"হ্যান্ডেল দ্যাট স্টুপিড..! মেক সিওর হি নোস হুম আই বিলং টু।"
মিরা প্রস্থান করলো। রায়ান মিরার কথায় গুরুত্ব দিলো। প্রথমে বুঝতে না পারলেও তার খুব একটা সময় লাগলো না বুঝতে কারণ ঠিক পরেই তার ফোন বাজলো, কোনো এক অপরিচিত নাম্বারের কলে। রায়ান সামনে তাকিয়ে দেখলো ওই লোকটা কাউকে কল করছে। মিরা নিজের নাম্বারের বদলে যে তার নাম্বার দিয়েছে সেটা পরিষ্কার হলো তার কাছে। ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে গর্বিত হাঁসি দিয়ে বিড়বিড় করলো-"That's my girl.. such a mine.. wholely mine..."
রায়ান কলটা রিসিভ করলো। অপর পাশ থেকে আগ্রহী কণ্ঠ ভেসে এলো-
"হ্যালো, মিস মিরায়া বলছেন?"
রায়ান মুচকি হেঁসে নিজের চুলের ভাঁজে হাত গলিয়ে ভাব নিয়ে হেঁটে ওই লোকের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গর্বিত কণ্ঠে বলল-
"জি না, মিসেস মিরায়ার অনাগত বাচ্চার বাপ বলছি। হাও ক্যান আই হেল্প ইউ?"
লোকটা অবাক হয়ে একবার রায়ানের দিকে আরেকবার নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলো। রায়ান ভ্রু নাচিয়ে তার কাছে এগোতেই লোকটা ভয়ে দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেল। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা ঝাঁকিয়ে মিরার কথা মনে করে আনমনে বিড়বিড় করলো-
"কি ঝামেলা পাকিয়ে আছে কে জানে। কোথায় গেলে হৃদপাখি। কাম ব্যাক ফাস্ট..!"
______
রাস্তার ধারে ভয়ার্ত ও মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা অল্প বয়সী মেয়ে- পড়নে লাল লেহেঙ্গা, গায়ে ভারী গহনা, দুহাত ভরা মেহেদি। তবে সাজসজ্জার সাথে মেয়েটার মুখশ্রীর মিল নেই- চোখ দুটো ছলছল করছে তার এই বুঝি গড়িয়ে পড়বে অশ্রু কণারা। তবে সদ্য অতি ধৈর্য ধরে করা সাজসজ্জার প্রতি মায়া দেখিয়ে নিজের চোখের জলধারা নিয়ন্ত্রণ করছে সে। ব্যস্ত রাস্তার ভীর কাটিয়ে এক বিকট গর্জন তুলে এক উজ্জ্বল হেড লাইট এগিয়ে এলো সোরায়ার দিকে। তীব্র আলোক রশ্মির তোপে সোরায়া সেদিকে তাকিয়ে নিজের চোখ ঢেকে নিলো। হেডলাইটের আলো কমে গেলে সোরায়া চাতোক পাখির ন্যায় তাকিয়ে আবেগী হয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় চেঁচিয়ে উঠলো-
"আপুউউউউ..!"
সে দৌড়ে গিয়ে মিরাকে জড়িয়ে ধরলো। মিরা স্বস্তির শ্বাস ফেলে সোরায়া কে নিজের বুকে জড়িয়ে নিলো বাইকের উপর থেকেই-"কিচ্ছু হয় নি তো বাবা। ভয় পেতে হয়? বড় হয়েছিস না? আজ বিয়ে তো। অনেক বড় হয়ে গেছিস।"
সোরায়া সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মিরাকে দেখে চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করলো- "আপু.. লেহেঙ্গা তে কে রাইড করে? যদি কিছু..?"
মিরা সোরায়ার দিকে হেলমেট ছুড়ে দিয়ে শাসন করে বলল-
"এটা মাথায় দিয়ে পিছনে বস। কেউ করে না লেহেঙ্গাতে রাইড তোর আপু করে। এই জন্যই সে তোর আপু বুঝেছিস। এখন কথা না বলে তাড়াতাড়ি উঠ পিছনে। মাহির ভাইয়ের মুখ পুরো শুকিয়ে আছে তোকে দেখতে না পেয়ে। তুই বসতে পারবি তো এভাবে?"
সোরায়া আর সময় নষ্ট করলো না। সে নিজের ঘোমটার উপরের কোনো মতো হেলমেট টা পড়ে নিজের লেহেঙ্গা নিজের হাতে সামলে নিয়ে বাইকের পিছনে বসলো। মিরা আবারো বাইক ছোটালো বাড়ির পথে।
_______
রাত~৯টার কাছাকাছি
বিষন্ন মনে মাহির একা স্টেজে বসে সোরায়ার অপেক্ষা করে যাচ্ছে। মাহির দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের দিকে তাকায়। রায়ান গিয়ে মাহিরের পাশে গিয়ে বসে তার কাঁধে হাত রাখতেই মাহির চমকে রায়ানের দিকে তাকালো।
-"কিরে? বিয়ের জন্য এতো উৎসাহ নিয়ে এলি। এখন দেবদাস হয়ে বসে থাকার কারণ কি?"
মাহির রায়ানের হাত নিজের হাতে নিয়ে উৎকণ্ঠায় বলল-
"ভাই আমি আর ধৈর্য রাখতে পারছি না। তুই ভাবিকে একটু বল না আমার বউটাকে তাড়াতাড়ি আমার কাছে আনতে।"
রায়ান চুপ করে গেল। মিরা গেছে বেশ অনেকটা সময় হয়েছে এখনো না ফেরার কারণ সে জানে না। তার নিজেরই টেনশন হচ্ছে যেটা চেয়েও কাউকে বলতে পারছে না। উপর থেকে যার সাথেই দেখা হচ্ছে সেই দুই বোনের খোঁজ করছে। রায়ানের ইচ্ছে করছে নিজের কপাল চাপড়াতে। সে টেনশনে মাথায় হাত দিলে মাহির রায়ানের হাত মাথা থেকে নামিয়ে উদ্বেগ দেখিয়ে বলল-
"দোস্ত প্লিজ, কিছু একটা কর। এক কাজ কর ভাবি কে গিয়ে বল আমি প্রয়োজনে আরো ৫০ হাজার বাড়িয়ে দিচ্ছি তবু আমাকে আমার বউটার চেহারা দেখতে দেওয়া হোক।"
এক দিকে নিজের বউয়ের প্যারা অন্য দিকে বন্ধুর এমন বউ বউ পাগলামি রায়ানের কাছে বিরক্তিকর লাগছে। এই দিকে সকলে একসাথে রিমিকে ঘিড়ে ধরেছে গান করতে। চৌধুরী বাড়ির ছোট বউ গান করে এমন কথা ছাড়িয়ে পড়ায় বর পক্ষ তার গান শুনবে বলে জোর করছে। রিমি সবাইকে কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় নানান তালবাহা করে চলেছে ঠিক তখনই রুদ্র রিমির সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
"যদি আমি শুরু করি। আমাকে সঙ্গ দেবে?"
রিমি অবাক হয়ে রুদ্রর দিকে তাকালো। রুদ্র নিজের হাতে মাইক তুলে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গান ধরলো-
"এলো এলো এলো একি গোধূলি জীবনে..
ডানা ম্যালে একশটা প্রজাপতি মনে..
চাওয়া পাওয়ার ছিল যত এতদিন ধরে..
পেল সবই পূর্ণতা বিবাহ বাসরে..
বেঁধেছি তোমাকে এই সাত পাকে,
চার হাত যেন এক হয়ে থাকে।
কোনেরই তো সাজে অন্তরে আজ এ
আনলে তুমি ভালোবাসা যে.."
মাহির সকলের মাতামাতি দেখে যেন আরো অধৈর্য হলো। সোরায়া কে বউ সাজে দেখার আকুলতা তার বুকে চড়ে বসছে। মাহির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। রায়ান মাহিরের কাঁধে হাতে রেখে তাঁকে শান্ত করতে উপদেশ দিল-
"এতো অধৈর্য হোস না মাহির। আরো একটু ধৈর্য ধর দেখবি তোর সব অপেক্ষা উসুল হয়ে যাবে যখন চড়ুই কে নিজের চোখের সামনে দেখবি।"
হঠাৎ গর্জন করে এক বাইক ঢুকলো। লেহেঙ্গা পড়ে কেউ বাইক চালিয়ে ঢুকছে। সবার নজর সেই দিকে ফিরলো। রায়ান অবাক চোখে মিরাকে দেখছে। মনে মনে বিড়বিড় করছে- "কি সাহস..! এই অবস্থায় লেহেঙ্গা পড়ে বাইক নিয়ে গেছে।"
মিরার চোখে মুখে স্বস্তিরর পাহাড় ভেঙে পড়লো অবশেষে সে পেরেছে সময় মতো পৌঁছাতে। মাহিরের নজর মিরার পিছনে উড়তে থাকা লাল রংয়ের ওড়নার দিকে। মিরার বাইক থামলো। সোরায়া ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়ালো সামনে। মিরা বাইক সাইড করে সরে দাঁড়ালো। রায়ান মাহির কাঁধে হাত রেখে বলল-
"অপেক্ষা উসুল করে নে..!"
রায়ান স্টেজ থেকে নেমে সোজা দৌড়ে মিরার কাছে গেল। সোরায়া চোখ তুলে স্টেজের উপর মাহিরের দিকে তাকালো। মাহির সোরায়াকে বউ সাজে দেখে আনমনে বলল-
"অপেক্ষার উসুল আবার কি? আমার তো পৃথিবীতে আসা উসুল হয়ে গেল।"
রুদ্র রিমির হাতে মাইক ধরিয়ে দিলো সর্ব কাঙ্ক্ষিত গানের লাইন গুলো গাইতে রিমি সোরায়া আর মাহিরের মনের অভিব্যক্তি যেন গানের দ্বারা প্রকাশ করলো-
"সামনে আমার এভাবে আর আগে এসেছ কই?
চাইছিল মন সারা জীবন কাউকে তোমার মতই।
সামনে আমার এভাবে আর আগে এসেছ কই?
চাইছিল মন সারা জীবন কাউকে তোমার মতই..
কোনেরই তো সাজে অন্তরে আজ এ
আনলে তুমি ভালোবাসা যে.."
চলবে,
অবশেষে 😩🤌 কেমন হয়েছে জানি ও পাখিরা। Love you pakhis ❤️ 🥰