ফন্ট সাইজ:
থিম:
আত্মার অঙ্গীকারে অভিমোহ

৭৯তম পর্ব

লেখক: অরাত্রিকা রহমান

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_79 (1st)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

রায়ান ধীরে ধীরে মিরার দিকে ঝুঁকে এলো। তার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা, ঠোঁটে একগুঁয়ে দাবির ছাপ। মিরা কাঁপা কাঁপা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি যেন বেড়েই চলেছে। মিরা নিজের চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করলো আর দুহাতের মুঠোয় নিজের ওড়না খামচে ধরলো। রায়ানের মুখটা যখন ঠিক মিরার মুখের খুব কাছে, ঠিক তখনই—

"রিভান, আমি এই বক্সে কিছু খাবার দিয়ে দিলাম। খিদে পেলে খেয়ে নিস তোরা।"

রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে দু’জনই যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে সরে দাঁড়াল। মিরা তাড়াহুড়ো করে নিজের চুল আর ওড়নাটা ঠিক করে নিল, মুখ লাল হয়ে গেছে লজ্জায়। আর রায়ান দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করল, বিরক্তিতে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো-"এতো বাজে টাইমিং কিভাবে হয় মানুষের?"

রায়ানের মুখ থেকে অস্পষ্ট কথাটা বেরিয়ে এলো। ভেতর থেকে শফিক রহমান আর রোকেয়া বেগম দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। দুজনে মুচকি হেসে দু’জনের দিকে তাকালেন। তাদের চোখে ছিল এক ধরনের বুঝে ফেলার ইঙ্গিত। রোকেয়া বেগম তাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন-

"কি হলো? এমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস কেন?"

মিরা মাথা নিচু করে ফেলল। তার গাল লাল টুকটুকে, যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে যাওয়া কোনো অপরাধী। শফিক রহমান দৃশ্যটা দেখে মৃদু হাসলেন মনে মনে। রায়ানের মুখের বিরক্তি তার চোখ এড়ালো না।

রায়ান ঠোঁট কামড়ে জোর করে হাসলো-

"তেমন...কিছু না চাচি। তোমাদেরই অপেক্ষা করছিলাম।"

কিন্তু তার চোখের ভাষা যেন বলছিল—"আর পাঁচ মিনিট পরে এলেও হতো!"

রোকেয়া বেগম এগিয়ে এসে মিরার মাথায় হাত রেখে বললেন-

"নিজের খেয়াল রাখবি। সময়মতো খাবি, বিশ্রাম নিবি।"

মিরার চোখ নরম হয়ে এলো। সে ভেজা গলায় বলল- "জ্বি, চাচি।"

শফিক রহমানও স্নেহভরা গলায় বললেন-

"ভালো থাকিস মা। কোনো দরকার পড়লে আমাকে জানাবি কিন্তু। আর রায়ান তো আছেই। ও যেহেতু আছে চিন্তা একটু কমই হবে আমার।"

মিরা রায়ান উভয়ই শফিক রহমানের মুখে রায়ানের প্রশংসা শুনে অবাক হলো। রায়ান ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসলো। মিরা সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো। তার চোখে কৃতজ্ঞতা, মায়া আর বিদায়ের কষ্ট একসাথে মিশে আছে। সবশেষে রায়ান গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়ালো। তবে রায়ানের মুখে এখনো বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। মিরা সেটা দেখে ঠোঁট চেপে হাসলো। গাড়িতে ওঠার আগে ধীরে বলল-

"এতো হ্যান্ডসাম মুখটাকে এমন করে রেখেছেন কেন?"

রায়ান নিচু স্বরে জবাব দিল-

"কারণ আমার খুব দরকারি একটা কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।"

মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। মিরা রায়ানের জবাবে ঠোঁট কামড়ে হালকা হেসে ফেলল। তার চোখে তখন লজ্জার সঙ্গে মিশে ছিল একরাশ কোমলতা। সে ধীরে ধীরে রায়ানের একটু কাছে গিয়ে খুব নিচু স্বরে বলল—

"এত মন খারাপ করবেন না... আপনার পাওনা আমি বাকি রাখবো না।"

রায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো- "মানে?"

মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নরম গলায় বলল—

"এত মানে বোঝাতে পারবো না‌‌। আপনার ক্রেভিংস মেটালেই তো হলো, তাই না?"

রায়ানের বিরক্ত মুখে মুহূর্তেই হাসি ফুটে উঠলো। চোখে সেই আগের দুষ্টু ঝিলিক ফিরে এলো- "ইউ প্রমিস দ্যাট?"

মিরা ছোট্ট করে মাথা নাড়লো। সবকিছু শেষে দু’জন গাড়িতে উঠে বসল। পিছনে দাঁড়িয়ে রোকেয়া বেগম মুচকি হাসছিলেন আর শফিক রহমান মাথা নেড়ে বললেন- "যৌবন জিনিসটাই আলাদা। আহ, পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ে গেলো।"

রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের কথায় অস্বস্তি প্রকাশ করে বললেন- "বুড়ো বয়সে ভীমরতি হয়েছে নাকি আপনার। বাচ্চারা শুনলে কি ভাববে? চুপ করুন।"

মিরা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল, আর রায়ান স্টিয়ারিং আঁকড়ে ভেতরে ভেতরে ঠিক করলো— অসম্পূর্ণ হিসাবটা সে খুব শিগগিরই মিটিয়ে নেবে। গাড়ি চলতে শুরু করলে কিছুটা দূরত্বে গিয়ে রায়ান একবার পাশ ফিরে মিরার দিকে তাকিয়ে বলল—

"সময়ের সাথে সাথে ক্রেভিংসের দৈর্ঘ্য সীমা বাড়লে তোমারই সামলাতে কষ্ট হবে। আমি কিন্তু কারো দেওয়া প্রমিস সহজে ভুলি না।"

মিরা রায়ানের কোলে নিজের দু পা তুলে, জানালার বাইরে তাকিয়ে আপেল কামড়ে খেতে খেতে নির্বিকার চিত্তে উত্তর দিল— "আমিও না।"

মিরা আপেলে বড় করে একটা কামড় দিয়ে সেই আপেলের অংশ টুকু মুখ থেকে বের করে হাত বাড়িয়ে রায়ানের মুখের দিকে এগিয়ে দিল। রায়ান এতে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে মুখ খুলে সেটা মুখে নিয়ে চিবোতে চিবোতে হতাশ হয়ে বলল-

"চাইলাম স্ট্রবেরি, খাওয়াচ্ছে আপেল..! এটা কিছু হলো?"

মিরা রায়ানের কথায় মুচকি হাসলো। রায়ান কে আরেকটু জ্বালাতে মিরা রায়ানের কোল থেকে তার পা নামিয়ে গাড়ির ফ্রন্ট মিরর টা নিজের দিকে সেট করলো। রায়ান ড্রাইভিংয়ের পাশাপাশি অবাক চাহুনিতে মিরার কান্ড কারখানা দেখছে বারংবার। মিরা তার মিনি পার্স থেকে একটা লিপ বাম বের করে সেটা খুব মনোযোগ সহকারে নিজের ঠোঁটে লাগালো। রায়ান আড়চোখে তাকে খেয়াল করছে দেখে মিরা নিজের মুখ রায়ানের দিকে এগিয়ে দিয়ে তার ঠোঁটে গোল করে জিজ্ঞেস করলো-

"দেখুন তো স্ট্রবেরির মতো দেখতে লাগছে কিনা..!"

পাহাড়ি পথের নীরবতা যেন এক মুহূর্তে আরও ঘন হয়ে উঠলো। রায়ান বিস্ময়ে মিরার দিকে তাকিয়ে আছে।

রায়ানের চোখে এখন অদ্ভুত এক অস্থিরতা— যেন সে নিজের সংযমটুকু ধরে রাখতে লড়ছে নিজের সাথে। তবে প্রতিবারের মতো সে পরাজিত তার প্রিয়তমার মায়ার কাছে। রায়ান অস্থির হয়ে ধীরে ধীরে মিরার দিকে ঝুঁকে এসে নিচু গলায় বলল—

"স্ট্রবেরিস শুড বি ইটেন নট জাস্ট সিন, হার্ট বার্ড।"

অতঃপর রায়ান দ্রুত গাড়িটা হঠাৎ রাস্তার ধারে থামিয়ে দিল। ব্রেক কষার শব্দে মিরা সামান্য চমকে তার দিকে তাকালো। তারপরই বুঝলো— রায়ানের চোখের ভেতর কিছু বদল ঘটেছে। একটু আগের সেই স্বাভাবিক, ঠান্ডা দৃষ্টি নেই সেখানে। বরং এক ধরনের অস্থিরতা, চাপা উন্মাদনা— যেন মিরার ওই একটুখানি দুষ্টুমি তার সমস্ত সংযম এলোমেলো করে দিয়েছে। রায়ান কিছুক্ষণ শুধু তার ঠোঁটের দিকেই তাকিয়ে রইল। যেন পৃথিবীর আর কিছুই তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ছে না।

মিরার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি থাকলেও তার চোখে লজ্জার নরম পরত দেখা দিল। রায়ান এক মুহূর্ত থেমে তার দিকে তাকিয়ে রইল, যেন অনুমতি চাইছে চোখের ভাষায়। তারপর খুব আলতো করে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। মিরার লিপবামের হালকা স্ট্রবেরির স্বাদ এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়াল রায়ানের মাঝে। মিরার আঙুল অজান্তেই রায়ানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরলো। তার চোখ বুজে এলো, বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন নিজের ছন্দ ভুলে গেছে। রায়ান একটু সরে এসে কপাল ঠেকালো তার কপালে। নিঃশ্বাস দুটো তখনও এলোমেলো। মিরা উষ্ণ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ফিসফিসিয়ে বলল—

"স্লো ডাউন হাবি.. প্লিজ!"

রায়ানের ঠোঁটে এক টুকরো হাসি ফুটলো। সে মিরার নাকের ডগায় আলতো টোকা দিয়ে বলল—

"শুশ… খাওয়ার সময় এত কথা বলতে নেই, হৃদপাখি। আই ডোন্ট লাইক ইট। লেট মি হ্যাভ মাই মিল।"

________

খান বাড়ি~

অনেকক্ষণ শাড়ি নিয়ে যুদ্ধ করার পর হাঁপিয়ে উঠে ড্রেসিং টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল সোরায়া। একদম নিরুপায় হয়ে। বিরক্তি ও পরিশ্রমে কপালে ছোট ছোট ঘামের বিন্দু জমেছে তার। শশুর বাড়িতে তার প্রথম সকাল, শাড়ি না পড়লে খারাপ দেখায় এমন ধারণা সোরায়া। যার জন্যই এতো কশরত। হঠাৎ ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল এক পরিচিত কণ্ঠ,

— “আর ইউ স্ট্রাগলিং, মাই ডিয়ার বউ জান?”

হঠাৎ মাহিরের কণ্ঠ শুনে চমকে উঠল সোরায়া। অবাক চোখে বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখল, মাহির আরাম করে বসে আছে নিজের হাতের উপর ভর দিয়ে। ছেলেটার চোখে নিজের জন্য একরাশ মুগ্ধতা দেখতে পেল সে, আর ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। সোরায়ার হৃদয় কম্পিত হলো। নিজের অবস্থার কথা মনে পড়তেই সোরায়ার মুখ লাল হয়ে উঠল। শুধু ব্লাউজ আর পেটিকোটে দাঁড়িয়ে আছে সে মাহিরের সামনে। তাড়াহুড়ো করে উল্টোপাল্টা শাড়িটা গায়ে জড়াতে গেল, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সেটাও পা ছুঁয়ে মেঝেতে পড়ে গেল। দৃশ্যটা দেখে মাহির মৃদু হেসে কম্ফোরটারের আড়ালে মুখ লুকিয়ে ফেলল লজ্জায় আর বলে উঠলো-

"সকাল সকাল এমন কিউট এর মধ্যে হট কাজ কারবার দেখলে আমি সিওর পাগল হয়ে যাবে। দয়া করো আমার উপর একটু জান।"

সোরায়া অসহায়ের মতো স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মাহিরের এমন কথার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে? মাহির মুখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে হাতের ইশারায় বলল,

— “কাছে এসো।”

সোরায়া নড়ল না। মেয়েটার মনে অদ্ভুত এক ভয় বাসা বেঁধেছে। হয়তো সেটা ভালোবাসা ও আদরের ভয়। মাহির এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,

— “কাছে আসতে বলেছি আমি।”

সোরায়া ভয়ে হালকা করে না সূচক মাথা নাড়তেই মাহির চোখ সরু করে বলল,

— “তুমি নিজে কাছে এলে যতটুকু অংশ তোমার গায়ে আছে, ততটুকুই থাকবে। কিন্তু যদি আমাকে গিয়ে আনতে হয়... তখন কী হবে, তার দায় আমি নেব না।”

কথাটা শুনে সোরায়ার বুক ধক করে উঠল। তাড়াতাড়ি মেঝেতে পড়ে থাকা শাড়িটা গুছিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে মাহিরের কাছে গিয়ে বসল বাধ্য মেয়ের মতো। তবে একটু দূরত্ব রেখেই বসলো। মাহির সেটা খেয়াল করল। সে একটানে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। সোরায়া ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় তার গায়ে গিয়ে পড়ল।

মুহূর্তের জন্য দু’জনেই চুপ। তারপর মাহির মাথাটা আলতো করে সোরায়ার কাঁধে রেখে শান্ত স্বরে বলল,

— “এত জেদ করে একা একা সব করতে হবে কেন জান? ইউ হ্যাভ আ হাসবেন্ড। রাইট? ইউজ হিম‌।”

সোরায়ার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। লজ্জা, অস্বস্তি আর এক অদ্ভুত অচেনা অনুভূতি মিলেমিশে তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। মাহির সোরায়ার ভেজা চুলে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করলো-

"একা শাওয়ার নিতে সমস্যা হয় নি?"

সোরায়া কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই। তার গলা শুকিয়ে আসছে। শুধু মাথা নাড়লো সে। মাহির সোরায়ার কাঁধে উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল বলল-

"তোমার সমস্যা না হলেও, আমার সমস্যা আছে তোমার একা শাওয়ার নেওয়া তে।"

সোরায়া এবার আর চুপ থাকতে পারলো না। অন্তরের ভয় তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। সোরায়া নিচু কণ্ঠে বলল- "আপনি তো ঘুমাচ্ছিলেন। তাই জাগাই নি।"

মাহির সোরায়ার কথা শুনতে শুনতে মেয়েটার উন্মুক্ত মসৃণ পিঠে নিজের গালের ঘর্ষণ করে আনমনে বলল-

"তাহলে তুমিও আমার সাথে ঘুমাও নি কেন? এসব ক্রিমিনালাইজড কাজ কর্মের শাস্তি ভীষণ অসহ্যকর হবে তোমার জন্য।"

হোরায়রা শুকনো ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বলল-

"এ্যালার্মে ঘুম ভেঙে গেছিল তাই আর ঘুমাতে পারি নি। আর হবে না। সরি।"

মাহির সোরায়াকে ভয় দেখাতে সফল হয়েছে বলে মুচকি হাসলো। অতঃপর এক টানে সোরায়াকে বিছানায় ফেলে দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে মাথা নামিয়ে সোরায়ার বুকের কাছে ঠেস দিয়ে শুয়ে পড়ল, যেন এই মুহূর্তের শান্তিটুকুই তার দরকার। সোরায়া থমকে গেল হঠকারিতায়। তার হৃদস্পন্দন যেন আরও দ্রুত হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ দ্বিধায় থাকার পর ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মাহিরের মাথায় আলতো করে হাত রাখল।

ঘরজুড়ে নেমে এল এক নীরব, কোমল শান্তি। সোরায়ার হৃদস্পন্দনের শব্দ মাহিরছর কানে বাজতেই মাহির এক গাল বাঁকা হেঁসে বলল-

"শান্ত হও। হার্ট ব্লাস্ট করবে তো।"

সোরায়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে জিজ্ঞেসা সূচক ভঙ্গিতে বলল-

"অনেক সকাল হয়ে গেছে। উঠবেন না?"

মাহির শান্ত গলায় বলল-

"উঁহু, আরেকটু সময় এভাবে থাকি।"

সোরায়ার অস্থির কণ্ঠ -"আর কতক্ষন..!"

-"যতক্ষণ না তুমি নিজে আমাকে উঠাবে..!"

মাহিরের উত্তরে সোরায়া অবাক হলো। সজাগ মানুষ কে কিভাবে উঠাবে সে? তখনই মাহির তার সকল প্রশ্নের জবাবে আলতো করে নিজের ওষ্ঠ ছোয়ালো সোরায়ার গোলাপ রাঙা ওষ্ঠে। সোরায়া হতভম্ব। রক্তের প্রবাহ থেমে গেল বোধহয়। মাহির নিজেকে সরিয়ে নিল। সোরায়া পরিস্থিতি বুঝে উঠতে পারছে না। সে এমনি বলে বসলো-

"কলেজের জন্য লেইট হয়ে যাবো আমরা।"

মাহির এবারও আর কোনো জবাব দিল না। পুনরায় মত্ত হলো সোরায়ার মাঝে। সোরায়া অবিশ্বাস্যে কেবল চোখ বন্ধ করে মাহিরের বিচরণ অনুভব করছে। তার শিথিল দেহে আর কোনো ইন্দ্রিয় কাজ করছে না। আরো আধ ঘণ্টা পর তারা দুজন বিছানা ছাড়লো‌। মাহির সোরায়া কে সাহায্য করলো শাড়ি পড়তে ইউটিউব দেখে দেখে। সোরায়া মাহিরের শাড়ি পড়ানো দেখে অবাক। এতো তাড়াতাড়ি শিখে শাড়ি পড়িয়ে দিল অথচ তার মাথায়ও আসে নি এই আইডিয়া তখন, নাহলে তো এতোটা জ্বালাতন তার ওষ্ঠযুগল কে সহ্য করতে হতো না। সোরায়া একটু খোঁচা মেরে মাহির কে বলল-

"এমন ভাবে পড়ালেন যেন খুব অভিজ্ঞ আপনি! শাড়ি বিষয়ক জ্ঞান ভালোই আছে দেখছি।"

মাহির সোরায়ার মুখের দিকে ঝুঁকে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দুষ্টুমি করে বলল-

"শাড়ি বিষয়ক সবচেয়ে ইমপোর্টেন্ট জ্ঞান আছে আমার।"

-"কিসের?"

-"শাড়ি খোলার..দেখাবো?"

সোরায়ায মুখ চুপশে গেলো সঙ্গে সঙ্গে। মাহির শব্দ করে হেঁসে সোরায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-

"অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ে জ্ঞান আছে। ধীরে ধীরে দেখতে পাবে।"

________

দেখতে দেখতে কেটে গেল আরো তিনটে মাস। মিরার ভেতরকার ছোট্ট প্রাণ টা সময়ের সাথে সাথে বড় হচ্ছে তার মাঝে। মিরা আপাতত পড়াশোনা আর বাচ্চা কে নিয়েই ব্যস্ত আর বাড়ির সবাই তাকে নিয়ে। তবে মিরার আচার আচরণে ইদানিং বেশ ভালোই ভিন্নতা ধরা পড়ে। মাঝে মাঝেই একটা ছোট্ট বিড়াল ছানার ন্যায় আদুরে হয়ে যায় আবার মাঝে মাঝেই তার মেজাজ থাকে সাত আসমানের তুঙ্গে। তবে মিরার এই পরিবর্তন গুলো বেশিরভাগ রায়ানেরই সহ্য করতে হয় কারণ মিরার এই ছোট্ট ছোট্ট মুড সুইং গুলো কেবল রায়ানের কাছেই প্রশ্রয় পায়। যেটা মূলত তাকে মানসিক শান্তি দেয়। আর রায়ান ও মিরার মুড সুইং গুলো উপভোগ করে বিধায় মিরা কোনো প্রকার দ্বিধা ছাড়াই রায়ানের কাছে নিজেকে উজাড় করে দিতে পারে। কিছু মজার মূহুর্তের সাক্ষী হওয়া যাক তবে~

কোনো এক বিকেলের কথা, রায়ান তার রিডিং রুমে বসে লেপটপে কাজ করছে। আজকাল রায়ান দুপুরের সময় বাড়ি ফিরে আসে। লাঞ্চ এরপর আর অফিস যায় না সে। প্রেগন্যান্সির এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টা সে মিরার সাথে কাটাতে চায় বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। হঠাৎ করেই রিডিং রুমের দরজা খুলে মিরা সেখানে প্রবেশ করলো। তার একহাত নিজের ফোলা পেটের উপর রেখে অন্য হাত দিয়ে নিজের মাথার একগুচ্ছ চুল মুঠো করে ধরা।

-"উফফ্, মাথাটা যেন ব্যাথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। আমি কি মারা যাচ্ছি?"

রায়ান চমকিত চাহুনিতে দরজার দিকে তাকালো। মিরার কথার তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। রায়ান নিজের চেয়ারে বসে থেকেই তার বা চোখের ভ্রু নাচিয়ে শাসনের সুরে জিজ্ঞেস করলো-

‍"এইসব কি ধরনের অলক্ষুনে কথা বার্তা হৃদপাখি?"

মিরার চোখ অশ্রুর ভীরে চিকচিক করে উঠলো, যেন এখনি গড়িয়ে পড়বে কয়েক ফোঁটা। সে নিজের দু বাহু ছড়িয়ে দিয়ে মৃদু চাপা জেদ দেখিয়ে বলল-

"আহ্, কি প্রচন্ড ব্যাথা..! একটুও নড়তে পারছি না।"

রায়ান মিরার নাটক দেখে মনে মনে ঠোঁট কামড়ে হেঁসে সঙ্গে সঙ্গে উঠে গিয়ে তাকে পাঁজাকোলা করে শুন্যে তুলে নিল। মিরা নিজের বিলাপ থামালো। মিরা এখন যথেষ্ট ভারী..! মিরাকে কোলে নিতেই রায়ানের পেশিবহুল বাহু তার শার্টের গায়ে আঁটসাঁট হয়ে এলো। মিরা রায়ানের গলা জড়িয়ে থাকায় খুব সহজেই কয়েক মূহুর্তের জন্য রায়ানের বাইসেপে হাত রেখে তার কঠোরতা অনুভব করে বিস্ময়তায় বলে উঠলো-

"ইউ আর সো স্ট্রং হাবি..!"

রায়ান ভ্রু উঁচিয়ে নিশ্চিত হতে প্রশ্ন সূচক কণ্ঠে বলল-

"তাই নাকি..?"

মিরা দাঁত বের করে হিহি করে হেঁসে গর্বিত ভঙ্গিতে বলল-

"হুম হুম, টু মাচ স্ট্রং এ্যান্ড হ্যান্ডসাম..!"

রায়ান সামান্য লাজুকতায় নিজের নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। অতঃপর মিরাকে কোলে নিয়েই চেয়ারে গিয়ে বসলো। আলতো করে মেয়েটার গালে হাত রেখে কপালে ঠোঁট ছোঁয়াতেই মিরা রায়ানকে জড়িয়ে ধরে ছেলেটার গলায় মুখ গুঁজে দিল। রায়ানের মূলত মিরার এই দিকটা এখন বেশ ভালো লাগে যখন তার ছোঁয়ায় মিরা খুব সহজেই গোলে যায়‌। ওভাবেই মিনিট দশেক পাড় হতেই মিরা রায়ানের কোল থেকে মেনে যেতে চাইলো। রায়ান মিরাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়ে প্রশ্ন করলো-

"কি হলো পাখি? আন কমফোর্টেবল লাগছে? নামতে চাইছো যে?

মিরার নজর গিয়ে স্থির হলো তার ফুলকো উদরের উপর। রায়ান মিরার দৃষ্টি অনুসরণ করলো। মিরা আবারো রায়ানের কোল থেকে নামার চেষ্টা করতে করতে বলল-

"প্রিন্সেস কাপ কেক খাবে। ফ্রিজে রাখা আছে। ওকে খাইয়ে আসছি আবার।"

রায়ান মুচকি হাসলো। সে মিরার নাকটা আলতো হাতে টেনে দিয়ে বলল-

"বাচ্চা টাকে ভালো কিছু খাওয়ানো যায় না? জন্মের আগে থেকেই ওর খাদ্যাভ্যাস বিগড়ে দিচ্ছো।"

মিরা রায়ানের কথায় কোনো পাত্তা দিল না। মুখে একটু বিরক্তি দেখিয়ে সেখান থেকে চলে গেল। মনে মনে বিড়বিড় করলো- "রায়ান চৌধুরীর বাচ্চা বলে কথা, এমনিতেও ওর বিগড়ানোরই কথা। জেনেটিক্স বলতেও তো কিছু আছে!"

রায়ান নিজের কাজে মন দিলো আবারো। মিনিট পাঁচেক পরে রায়ান মিরাকে ফিরে আসতে না দেখে নিজেই উঠে নিচে নামলো। মিরা যখন তার প্রেগন্যান্সির ক্রেভিংস সামলাতে না পেরে সোফায় বসে কান্না করছে তখন রায়ান মিরাকে দেখে চিন্তিত হয়ে উঠলো। সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি ভেঙে নিচে নেমে মিরার পাশে গিয়ে বসলো। মেয়েটার ভেজা গালে হাত রেখে তার অশ্রু কণা মুছে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করলো-

"হয়েছে কি? আমার হৃদপাখি কাঁদছে কেন?"

সেখানে রুদ্র আর রিমিও উপস্থিত। রুদ্রর মুখের বিরক্তি ভাব, আর রিমি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে লজ্জায়। মিরা গাল ফুলিয়ে ফুপাতে ফুপাতে বলল-

"আপনার ভাই আমার সব পেস্ট্রি আর কাপ কেক খেয়ে নিয়েছে।"

রায়ান হা হয়ে রইল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এইটুকু কারণের জন্য এভাবে কাঁদা সম্ভব তার যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে নিজের মাথা ঝাঁকিয়ে পুনরায় মিরার দিকে মনোযোগ দিল‌। সে মিরার চোখের জল মুছতে মুছতে বলল-

"তাই বলে কাঁদতে হবে? আমি আবার এনে দেব। কাঁদে না বেইবি।"

রুদ্র মিরার ফোলা পেটের উদ্দেশ্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে খোঁচা মেরে বলল-

"আর কত খাবি? খেয়ে খেয়ে ফুটবল হয়ে যাচ্ছিস।"

রুদ্রর কথায় রিমি সঙ্গে সঙ্গে রুদ্রর পায়ে পা মারলো-

"কি সব বলছেন? ও প্রেগন্যান্ট। চুপ করুন। মন খারাপ হবে ওর।"

মিরা সোফার থেকে একটা কুশন উঠিয়ে সজোরে রুদ্রর দিকে ছুঁড়ে মারলো। রায়ান রুদ্রর দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। সে জানে এই ভাই বোনের তর্ক বিতর্কের মাঝেই সে ঠিক পিষবে। রায়ান মিরার মন ভোলানোর তাকে শান্ত করতে দুষ্টুমির ভাব নিয়ে বলল-

"আচ্ছা শান্ত হও এখন। যত রাগ হচ্ছে আমার উপর দেখাও‌। আমাকেই খেয়ে নাও, আমি কিছু মনে করবো না।"

মিরা রায়ানের দিকে তাকালো। সে রাগে সত্যি সত্যি রায়ানের হাতে নিয়ে কামড়ে দিল। রায়ান নিজের চোখ খিচিয়ে বন্ধ করে নিলে মিরা রায়ানের কষ্ট হচ্ছে দিখে রায়ানের হাত মুক্ত করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালো। অতঃপর নিজের পেটে হাত রেখে বিড়বিড় করতে করতে উপরে চলে গেল-

"থাক প্রিন্সেস, মন খারাপ করে না। মাম্মা এখুনি তোমাকে কাপ কেক খাওয়াবো। চলো।"

______

চলবে,

কমেন্ট করে বলো তো কেমন হয়েছে? এই বার আর অত দেরি করি নাই। 🙃 একটু রেস্ট হইছে জানি আসলে ঘুমিয়ে গেছিলাম। তোমাদের কমেন্ট পড়বো আমি সময় করে। Love you pakhis 🥰 ❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_79 (2nd)

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

মিরা রাগ করে উপরে নিজের ঘরে চলে গেলে রায়ানও অবিলম্বে মিরার পিছনে ছুটলো। মিরা ঘরের ভেতর গিয়ে দরজা বন্ধ করতে যাবে রায়ান দরজা আঁটকে দাঁড়ায়।

-"আমি বললাম তো আমি আবার অনেক গুলো কাপ কেক এনে দেব। তবুও এতো রাগ করতে হবে?"

মিরা দরজা বন্ধ করতে নিজের শক্তি প্রয়োগ করে বলল-

"আপনার আনতে হবে না‌ আমি হোম ডেলিভারি নিয়ে নেব। এখন যান এখান থেকে। আমার মাথা ঠিক নেই, বেয়াদবি করে বসবো। পরে নিজেরই খারাপ লাগবে এই ভেবে যে, কেন ওমন ব্যবহার করেছি আপনার সাথে। তাই বলছি চলে যান প্লিজ। আমি সামলে নেব নিজের মুড সুয়িং। আর কামড়ানোর জন্য সরি‌।"

রায়ান হাইপার হয়ে উঠলো-

"হুয়াট দ্যা হেল আর ইউ টকিং এ্যাবাউট? আমি তোমার হাসবেন্ড, তোমার ভিতরে আমার বাচ্চা। তোমার মুড সুয়িং আমি সহ্য করবো না তো কে করবে? মিরা..আমি এখন সত্যিই খুব সিরিয়াস। লেট মি ইন..লিভ দ্যা ডোর!"

মিরা অবশেষে দরজা ছেড়ে দিয়ে বিছানায় গিয়ে বসলো। রায়ান ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে মিরার সামনে গিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। মিরা মুখ উঠিয়ে রায়ানের দিকে দেখার শ্রম টুকু করতে চাইলো না। রায়ান নিচু চাহনিতে মিরাকে পরোখ করছে।

-"আমার দিকে তাকাও হৃদপাখি।"

মিরা অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল-

"মাথা ঘুরছে আমার। উপরে দেখতে পারবো না।"

রায়ান তাকে জোড় করলো বরং নিজে হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসলো। এবার মিরা রায়ানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে রায়ান মিরার চোখে মুখে একটা অজানা চিন্তার রেখা খেয়াল করলো। রায়ান শান্ত গলায় মিরার দু গালে হাত রেখে জিজ্ঞেস করলো-

"আমাকে একটু পরিষ্কার করে বলবে তোমার হয়েছে কি? তোমার মনে কি চলছে তা যদি তুমি মুখ ফুটে না বলো আমার পক্ষে সেটা অনুমান করা কঠিন হবে পাখি। টেল মি হুয়াট'স বদারিং ইউ? হঠাৎ এতো খিটখিটে মেজাজের কারণ কি?"

মিরা রায়ানের শান্ত ভাব দেখে হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলো-

"আমি খিটখিটে? আমার কি হচ্ছে আমি নিজে বুঝতে পারছি না আপনাকে কি বুঝাবো আমাকে বলুন। এখন বেবির ৬ মাস চলছে বেবির কোনো মুভম্যান্ট নেই। এই বিষয়টা কি আপনাকে একবারও ভাবায়? না, ভাবায় না। কিন্তু আমাকে ভাবায়। আমি প্রতিটা মূহুর্তে ভাবি, বাচ্চা টা আমার ভেতরে আছে তবে আমি ওকে অনুভব করতে পারছি না কেন! আপনি কি বোঝেন এটা কতটা ফ্রাস্ট্রেটিং? বুঝবেন কি করে.. প্রেগন্যান্ট তো আমি আপনি না।"

রায়ান মিরার কথা শুনে হতবাক। রায়ান মোটেও আশা করে নি প্রেগন্যান্সির কোনো একটা বিষয়ে মিরা এতটা দুঃশ্চিন্তায় ভুগছে যে আশেপাশের ছোটো ছোটো বিষয় গুলো এখন তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রায়ান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে মিরাকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলো-

"মিরা.. লাস্ট টাইম চ্যাকাপের সময় ডক্টর এই বিষয়টা নিয়ে আমাদের যা বলেছেন তা কি ভুলে গেছো? শি সেড, প্রথম প্রেগন্যান্সির সময় অনেক ক্ষেত্রে মায়েরা বেবির মুভমেন্ট দেরিতে অনুভব করতেই পারে। ইটস টোটালি ফাইন। তাছাড়া ডক্টর নিজে বলেছেন আমাদের বেবি যথেষ্ট হ্যালদি আছে ওর বয়স অনুযায়ী। তুমি প্যানিক কেন করছো?"

মিরা রায়ানের কথায় মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের মুখ নিচু করে নিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-

"কিন্তু আমি তো ওকে ফিল করতে চাই। আপনাকেও ফিল করাতে চাই যে ও কতটা বড় হয়েছে আমার ভেতর‌। কেন নিজের অস্তিত্বের জানান দেয় না ও? ওকি বোঝে না আমি কতো করে চাইছি ওকে অনুভব করতে?"

রায়ানের হৃদস্পন্দন স্থির হলো। মিরা যেই অনুভূতির কথা বলছে, ওই মূহুর্ত গুলোর জন্য সে কতই না কল্পনা করেছে। কিন্তু চেয়েও কখনো মিরার সম্মুখে তা উপস্থাপন করার সাহস হয়নি তার। বরাবরের মতোই তার মনে হয়েছে তার কল্পনার বিষয়বস্তু মিরার মনে কষ্ট দিতে পারে তাই এতোটা সতর্কতা অবলম্বন করেছে সে। তবে শেষ রক্ষা বোধ হয় আর হয় নি। রায়ান মিরার বেবি বাম্পে হাত রেখে দৃষ্টি স্থির করলো সেখানে। মিরা সম্পূর্ণ চুপচাপ কেবল বসে আছে। মিরা গোটা শরীর হঠাৎ ঝাকুনি দিয়ে উঠলো। রায়ান ধীরে মিরার কমল উদরের দিকে ঝুঁকে গিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোয়ালো সেখানে, অতঃপর নিজের কপাল ঠেকিয়ে নরম কণ্ঠে মিরার ভেতরের অদৃশ্য ছোট্ট আত্মার উদ্দেশ্যে বলল-

"প্রিন্সেস..পাপা জানে, ইউ আর কাম্প্লিটলি ফাইন। কিন্তু মাম্মা তো সেটা মানতেই চাইছে না। তুমি একটাবার সাড়া দিয়ে মাম্মা কে বোঝাও তো তুমি ঠিক আছো। তোমার মাম্মা কাউকে বিশ্বাস করছে না, আমাকেও না ডক্টর কেউ না। তুমি সাড়া দিলে ঠিক মানবে। ক্যান ইউ মুভ, মাই গার্ল?"

মিরা বাকা নজরে দেখলো রায়ানের দিকে। চোখের জল এবার গড়িয়ে পড়লো বলে! রায়ানের কথাগুলো শেষ হতেই কয়েক সেকেন্ডের জন্য চারপাশ যেন অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল। দু'জনেরই নিঃশ্বাস আটকে আছে।

হঠাৎ— মিরা তার পেটের ভেতর থেকে একদম স্পষ্ট একটা নড়াচড়া অনুভূতি পেল। তারপরই ছোট্ট একটা মৃদু লাথি। মিরার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। বিস্ফারিত চোখে নিজের পেটের দিকে তাকালো সে। ঠোঁট দুটো ধীরে ধীরে ফাঁক হয়ে গেল বিস্ময়ে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোল না। অবিশ্বাসে কাঁপা হাতে নিজের পেটে রায়ানের হাতের উপর হাত রাখল সে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ভয় তাকে গ্রাস করে রেখেছিল, সেই ভয়ের জায়গায় এখন অবিশ্বাস্য আনন্দ। মিরার ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটে উঠলো, কণ্ঠ স্বর জড়িয়ে এলো তার-

""রা... রায়ান..." মেয়েটার গলা কম্পিত হচ্ছে। "বেবি কিকড..! আপনি কি ওকে ফিল করতে পেরেছেন?!..."

কথাটা বলতেও যেন তার নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না।

ঠিক তখনই আবারও আরেকটা ছোট্ট ধাক্কা অনুভূত হলো তার-"আহহ্.." মুখ থেকে মৃদু আড়তোনাদ বেরিয়ে এলো মিরার। রায়ানের হাত তখনও মিরার বেবি বাম্পের ওপর রাখা। সেই নড়াচড়াটা এবার তার হাতের তালুতেও স্পষ্ট ধরা পড়ল। সে থমকে গেল। চোখের পলকে তার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো। ঠোঁট কাঁপতে লাগল, কিন্তু আনন্দে কোনো শব্দ খুঁজে পেল না যা তার অনুভূতি প্রকাশ করতে সক্ষম। কয়েক সেকেন্ড নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল মিরার উদরের উপর রাখা নিজের হাতের দিকে, যেন নিশ্চিত হতে চাইছে—এটা সত্যিই ঘটেছে। পরের মুহূর্তেই তার মুখ জুড়ে এমন এক হাসি ফুটে উঠল, যা এতদিনের সব অপেক্ষাকে হার মানায়। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রুবিন্দু-

"আলহামদুলিল্লাহ..." ফিসফিস করে বলল সে। তার কণ্ঠে ছিল বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা আর সীমাহীন আনন্দের মিশেল। রায়ান তাড়াতাড়ি মাথা তুলে মিরার দিকে তাকাল। মিরার চোখেও তখন টলমল করছে জল। দু'জনের চোখে চোখ পড়তেই আর কোনো ভাষার প্রয়োজন রইল না। রায়ান মৃদু হেসে আবারও আলতো করে পেটের ওপর হাত বুলিয়ে দিয়ে নিজের ঠোঁটের স্পর্শে স্নেহের পরশ এঁকে দিল।

-"থ্যাংক ইউ, প্রিন্সেস..." তার গলায় আবেগ জমে উঠল। "পাপার কথা শোনার জন্য‌। এভাবেই মাঝে মাঝে মাম্মাকে জানিয়ে দিও তুমি ভালো আছো। তাহলে আমরা কেউ অকারণে ভয় পাবো না। ওকে?"

কথা শেষ হতেই যেন ছোট্ট প্রাণটা আবারও একটুখানি নড়ে উঠল। মিরা এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। চোখ বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল-

"আমি...কি স্বপ্ন দেখছি? ও সত্যিই আমার মাঝে নড়ছে, তাই না?"

রায়ান কোনো উত্তর দিল না। শুধু মিরার কপালে দীর্ঘ, শান্ত একটি চুম্বন এঁকে তাকে নিজের বুকে জড়িয়ে নিল। সেই আলিঙ্গনে ছিল স্বস্তি, কৃতজ্ঞতা আর নতুন জীবনের প্রথম স্পষ্ট সাড়ার অনির্বচনীয় সুখ। মিরা আদুরে গলায় রায়ানের কাছে এবার আবদার রাখলো-

"হাবি...এখন যদি আপনার খুব কাজ না থাকে চলুন না একটু ঘুরতে যাই। আমার বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে।"

এই মূহুর্তে মিরা রায়ানের কাছে তার প্রাণ টুকু চাইলেও হয় তো রায়ান নির্দ্বিধায় দিয়ে দিত, এ আর এমন কি। রায়ান মিরাকে রেডি হতে বলল। আর ঠিক কিছুক্ষণ পরেই তারা বেরিয়ে পড়লো ব্যক্তিগত একটু সময় কাটাতে।

~

দুজনে একটা শপিং মলে ঢুকেছে প্রায় ১৫ মিনিট হয়েছে। মিরা প্রয়োজনীয় টুকটাক কিছু জিনিস কেনাকাটা করেছে নিজের জন্য আর অন্যদিকে রায়ানের এই পুরোটা সময়ই কিডস স্যাকশনের কালেকশন দেখতে দেখতে পার হয়েছে। মিরাকে বেবির জন্য অগ্রিম কেনাকাটা করার জন্য মানাতে পারেনি বলে তার মন সামান্য বেজার‌। তবে মিরার কথা হলো বেবি যখন আসবে তখন কিনলেই হবে আগে থেকে কেনাকাটা করে লাভ কি! রায়ান তবুও সেই দিকেই মনোযোগ দিয়ে রেখেছিল। মিরা একদিকে নিজের জন্য লিপস্টিকের শেড দেখছিল তখনি, রায়ান একটা ছোট্ট বাচ্চার জামা উঠিয়ে মিরার কাছে নিয়ে গেল।

-"হৃদপাখি...দেখ। এটা অনেক প্রিটি না? এটা নেই হ্যাঁ?"

মিরা বাকা চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"রায়ান, আপনার কি হয়েছে বলুন তো? প্রিন্সেস প্রিন্সেস বলছেন দেখে যে সত্যি সত্যি প্রিন্সেসই আসবে তার কি কোনো মানে আছে? যদি ছেলে হয়? এই জামা কে পড়বে?"

-"সেটা নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না। আমি জানি খোদা আমাকে আরেকটা মা দেবেন।"

মিরা তুচ্ছার্থে হেঁসে বুকে আড়াআড়ি করে হাত বাঁধলো-

"আচ্ছা..? এমন কেন মনে হচ্ছে আপনার? যদি ছেলে হয়?"

রায়ান হেয়ালি করে বলল-

"হলে হবে। এমন তো নয় একটা বাচ্চাতেই থেমে যাবো আমরা। কখনো না কখনো মেয়ে তো হবেই।"

মিরা রায়ানের দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকালো। রায়ান বানোয়াট হেঁসে নিজের পক্ষে যুক্তি দেখাতে বলল-

"আরে রেগে যাও কেন পাখি? আমি বলছি তো আমাদের মেয়েই হবে। ট্রাস্ট মি। দেখলে না কেমন প্রিন্সেস বলে ডাকতেই নড়ে উঠলো! আমি সিওর আমাদের ছোট্ট রায়া আসতে চলেছে।"

মিরা রায়ানের কথা শুনে অনাগ্রহ দেখিয়ে আবারো নিজের কাজে মন দিয়ে বলল-

"আপনার যুক্তি শুনে যুক্তি নিজেই ছুটি নিয়ে চলে গেল। এখন চুপচাপ এটা যেখান থেকে উঠিয়ে এনেছেন সেখানে রেখে আসুন। আর আমাকে হ্যাল্প করুন ভালো একটা শেড চুজ করতে।"

রায়ানের মুখ মলিন হয়ে গেল। বেচারা মুখটা ছোট্ট করে জামাটা পুনরায় আগের জায়গায় রেখে এলো। মিরা আনমনে মুচকি হাসলো রায়ানের কর্মকাণ্ড দেখে। রায়ান নিজের মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে মিরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

-"হাবি.. দেখুন তো। কোনটা ভালো মানাবে? কোনটা নেবো?"

রায়ান এক নজর মিরার দিকে তাকিয়ে আনমনে বিড়বিড় করলো-

"যেটা আমার গালে ভালো মানাবে সেটা।"

মিরাকে শুনিয়েই বলতে তো চাইছিল তবে এখন তার মন মেজাজ ঠিক নেই কিন্তু মিরা রায়ানের বিষন্ন মুখে বিড়বিড় করা দেখে ঠিকই বুঝলো রায়ানের মন ভালো করতে এখন ঠিক কি করা প্রয়োজন। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু দুষ্টু বুদ্ধি পাকিয়ে হাতের সব চেয়ে গাঢ় লাল রংয়ের লিপস্টিক টা ঠোঁটে লাগিয়ে নিল। অতঃপর রায়ান কাছে গিয়ে ছেলেটার শার্টের কলার টা শক্ত করে খামচে ধরে টেনে নিজের দিকে নিয়ে রায়ানের গালে ঠোঁট ছোয়াল। রায়ান হকচকিয়ে উঠলো। মিরা রায়ানের গালে তার ঠোঁটের ছাপটা দেখলো‌। মিটিমিটি হাসছে সে। রায়ান মিরার হঠাৎ এমন কাজে সে চমকিত হয়ে নিজের গালে হাত রেখে মিরার দিকে দেখতেই মিরা দাঁত দেখিয়ে হিহি করে হেঁসে বলল-

"এটা একদম পারফেক্ট। আমি এটাই নিবো।"

রায়ান পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে সঙ্গে সঙ্গে মিরাকে উৎসাহিত করলো-

"আরে একটা লিপস্টিক দিয়ে কি হবে? আরো কয়েকটা দেখ। ট্রায় আনাদার ওয়ান..!"

মিরা খুব ভালো করেই বুঝলো রায়ানের উদ্দেশ্যে। মিরা নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইল-

"আমার আর দরকার নেই তো। আপনি নিজে কতো ব্রেন্ডেড লিপস্টিক কিনে আমার ড্রিম রুম সাজিয়েছেন মনে নেই? ওগুলো তো পড়েই আছে। আর লাগবে না।"

রায়ান এবার বিরক্ত হয়ে হঠকারিতায় মুখ ফুটে বলেই ফেলল-

"তোমার না লাগুক আমার লাগবে। আমার আরো চুমু চাই। কিনো আর না কিনো, ট্রায় করতে সমস্যা কই?"

রায়ানের এমন ঠোঁট কাটা কথা শুনতেই মিরার গলা দুটো রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো। মিরা চট জলদি রায়ানের মুখে হাত দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে বলল-

"আল্লাহ..! চুপ করুন। কেউ শুনলে কি মনে করবে?"

রায়ান মিথ্যা হাত তার মুখের উপর থেকে সরিয়ে নিয়ে ভারী কণ্ঠে বলল-

"এখানে আমাদের আশে পাশে কেউই নেই। কে শুনবে?"

-"নির্লজ্জ লোক কোথাকার! কেউ না শুনুক আপনার বাচ্চা তো আপনার এই সব ঠোঁট কাটা কথা বার্তা শুনছে। লজ্জা করুন একটু..!"

রায়ানের মুখশ্রীতে কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল না উল্টো সে কুটিল হেঁসে মিরার কোমর জড়িয়ে নিজের দিকে টেনে নিল মিরাকে আর তার কানে কানে ফিসফিস করে বলল-

"কি আজব! লজ্জা করবো কেন? আমরা নির্লজ্জতার সব সীমা অতিক্রম করেছি বলেই, ও তোমার পেটে।"

মিরা দ্রুত রায়ানের থেকে দূরে সরে এলো লজ্জায়। রায়ান আর বাড়াবাড়ি করলো না। নিজেদের কেনাকাটা শেষে শপিং মলের ভিতর এক কোণায় খুব ভাইরাল আইস্ক্রিম ছিনিয়ে নেওয়ার খেলাটা মিরার নজরে পড়লো। ওমনি তার শখ জাগলো সেও খেলবে। রায়ান তখন ফোনে তার ম্যানেজার এর সাথে গুরুত্বপূর্ণ কিছু একটা নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। মিরা রায়ানর শার্ট টেনে ইশারায় নিজের ইচ্ছা প্রকাশ করলে রায়ান তাতে বাধা দিল না। মিরা হাস্যোজ্জ্বল মুখে গেম টা খেলতে শুরু করলো। মাত্র ৫ মিনিট হয়েছে, মিরা আইস্ক্রিম বিক্রেতার ছলনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ইদানিং তার এমনিতেই ধৈর্য সীমা একটা সুতোর সমান সূক্ষ্ম হয়েগেছে তার মাঝে এই রকম খেলা বলা চলে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে। এক পর্যায়ে মিরা বিরক্ত হয়ে গেল। সে হতাশ চাহুনিতে রায়ানের দিকে তাকালো। রায়ান তখনও নিজের ফোনে ব্যস্ত। মিরা রায়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তার হাত আঁকড়ে ধরে আইসক্রিম বিক্রেতার দিকে ইশারা করলেন রায়ান নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের পকেটে থেকে ওয়ালেট বের করে মিরার হাতে দিয়ে দিল। মিরা অবাক হলো সে রায়ানের দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে রায়ান নিজ থেকে ওয়ালেট থেকে আইসক্রিম বিক্রেতার সামনে কয়েক হাজার টাকা এগিয়ে দিল। এরপর আর কিছুই বলার প্রয়োজন পড়লো না। সেই আইস্ক্রিম বিক্রেতা সম্মানের সাথে মিরার দিকে একটা আইসক্রিম কোণ এগিয়ে দিলেন। মিরা খুশি খুশি সেটা নিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে উড়ন্ত চুমু দিল রায়ান ফোনে কথা বলার মাঝেই তা সসম্মানে গ্রহণ করে নিল। পাশের কিছু মেয়ের রায়ানের এমন ব্যক্তিত্ব বেশ পছন্দ হলো। তারা নিজেদের মাঝেই কথা বলাবলি শুরু করলো-

"এমন একজন আমাদের জীবনে থাকলে কি এমন হয়ে যেত রে দোস্ত?"

-"আজ কেউ নেই বলে টাকার গরম দেখাতে পারি না।"

মিরার কান থেকে এই সাইড কমেন্ট গুলো এড়ালো না। মিরা রায়ানের তোয়াক্কা না করে ওই মেয়েগুলোর দিকে এগিযে গিয়ে তাদের আত্মশক্তি বৃদ্ধি করতে খোঁচা মেরে বলল-

"হাই গার্লস, জীবনে কারো থাকা খুব একটা ন্যাসেসারি না। নিজের যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত। অন্যের বরের দিকে নজর দেওয়া ভালো কাজ নয়।"

মিরার কথা গুলো মেয়েগুলোর গায়ে ফোস্কা ফেলল হয় তো। রায়ান এইটা খেয়াল করে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ম্যানেজার কে ফোন রাখতে বলল-

"ওকে ওকে, ড্রাপ দ্যা কল নাউ। আই উইল কল ইউ লেটার।"

রায়ান মিরার দিকে এগিয়ে গেলে মিরা রায়ানের চিড় চিড়ে মেজাজে রায়ানের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করলো-

"এমন হ্যান্ডসাম বর নিয়ে আর বেরই হওয়া যাবে না দেখছি। বেডা একটু বেশিই জ্যান্টালম্যান।"

মিরা মনের কথা মনে রেখে মুখে অন্য কিছুই বললো-

"এরপর থেকে সাথে আর নিয়েই আসবো না কাউকে। আই নিড নো ওয়ান।"

এই বলে সে তিরিক্ষি মেজাজে সেখান থেকে বেরিয়ে গেল। রায়ান আর দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো ঠিক বুঝেতেই পারলো না কি হলো মিরার। রায়ান হাঁফ ছেড়ে মিরার পিছু যেতে নিলে এক মূহুর্তের জন্য থেমে ওই মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলল-

"শি ইজ রাইট সিস্টার। শি নিডস নো ওয়ান। এ্যান্ড আই অ্যাম দ্যা নো ওয়ান।"

এই বলে পত্নী নিষ্ঠো ভদ্রলোক নিজেও সেই স্থান ত্যাগ করলো।

~

রাতে-১০টা

মিরা এখন আর রেগে নেই। তার যথেষ্ট কারণও আছে সেটা দুজনের কথা শুনেই বুঝতে পারবেন হয়তো।

-"হাবি, আরেক রাউন্ড হয়ে যাক তবে?"

মিরার আবদারে রায়ানের আপত্তিকর উত্তর এলো- "নো..!"

-"প্লিজ হাবি..জাস্ট আরেকটা রাউন্ড..!"

মিরা উৎসুক চাহুনিতে নিজের আবদার বহাল রাখলো।

রায়ান মিরার দিকে প্রশ্ন সূচক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো- "তোমার ক্লান্ত লাগছে না? অলরেডি ৫ রাউন্ড খেলা হয়েগেছে। তার পরও আরেক রাউন্ড চাই..!"

-"হ্যাঁ চাই, আমার আরেকবার চাই।"

মিরা সঙ্গে সঙ্গে প্রতি উত্তর করলো নিজের চাহিদার সপক্ষে। তবে রায়ানও নাছোড়বান্দা। সে গম্ভীরতা বজায় রেখে মিরাকে শাসনের স্বরে বলল-

"একটুও না..! উই আর নট গোয়িং ফর আনাদার রাউন্ড। ঘুমাও এখন।"

মিরা রায়ানের গম্ভীর কণ্ঠ নিজের জন্য ভীষণ অপছন্দ করে। সে ছোট ছোট চোখ করে রায়ানের দিকে তাকিয়ে তাকে শাসানোর চেষ্টায় বলল-

"আপনি আরেক রাউন্ড খেলবেন নাকি আমি মামণির ঘরে চলে যাবো। কোনটা?"

রায়ান হতাশ। তার হাত নিজের কপালে। রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার আবদার মেনে নিল-

"ঠিক আছে চলো। এটা লাস্ট বার।"

মিরা এবার সন্তুষ্ট মনে দাঁত বের করে হেঁসে বলল -

"ওকে ফাইন..!"

কি মনে হচ্ছে? কি খেলছে তারা? তারা মোটেও সেটা খেলছে না যেটা সবাই ভাবছেন। মূলত দুজনে এখন রক প্যাপার সিজার খেলছে বেস্ট ওহ ফাইভ এর নিয়মে। তবে এই গেমের রুলস সব মিরার তৈরি যেমন- সে হারলে সে রায়ানের হাতে চিমটি কাটবে, আবার রায়ান হাড়লেও রায়ানের কপালে টোকা পড়বে। সুতরাং মূলত বিষয়টা হলো খেলার নিয়ম মিরা হাড়তে পরবে না।সেই তখন থেকে রায়ান নিজেকে বাঁচাতে মিরাকে ইচ্ছে করে জিতিয়ে দিচ্ছে। বিষয়টা বাচ্চামি কেও পাড় করে গেছে তবে মিরা নিজের জিৎ উপভোগ করছিল এটাই বড় কথা। অবশেষে শেষ রাউন্ড টাও তাদের খেলা শেষ হলো। কথা অনুযায়ী তারা শুয়ে পড়লো ঘুমাবে বলে। কিছু টা সময় যেতেই মিরা রায়ানের বুক থেকে মুখ তুলে রায়ান কে জিজ্ঞেস করলো-

"হাবি..আমি যদি আর্শোলা হতাম, আপনি কি তবুও আমাকে ভালোবাসতেন?"

রায়ানের চোখ বন্ধ। সে চাইছিল না মিরার এমন আজগুবি কথার প্রশ্রয় দিতে তার উত্তর করে। মিরা রায়ান তখনও ঘুমায় নি বুঝে অসহায় ভাবে নিয়ে বলল-

"আপনি ঘুমিয়ে নেই। তবুও আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন না। আমি কি তাহলে আর ইমপোর্ট..!"

মিরা এর বাড়তি কিছু বলার আগেই রায়ান সুউচ্চ স্বরে বলল- "অফ কোর্স বেইবি.. আমি তবুও তোমাকে ভালো বাসতাম।"

মিরা ঠিক কি উত্তর আশা করছিল বা ঠিক কি উত্তরে সে খুশি হতো তবে রায়ানের এই উত্তর টা সে ঠিক হজম করতে পারলো না। সে মনে মনে চিন্তা করলো রায়ানের মতো সুঠামদেহী সুশ্রী চেহারার পুরুষ একটা আর্শোলার সাথে.. ছিঃ ছিঃ..! মিরা সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের উদ্দেশ্যে আবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো-

"কিহ..?! আর আমি যদি ছেলে হতাম, আপনি কি তবুও আমাকে ভালোবাসতেন?"

রায়ান এবার নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে ধৈর্য ধারণ করলো। মিরার মাথা আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে তার কপালে ছোট্ট চুমু এঁকে দিয়ে বলল-

"আল্লাহর দোঁহায় লাগে ঘুমাই যাও, সোনা বউ আমার। অনেক রাত হইছে। এই ছোট্ট ব্রেইনে এমন নাসা ইনস্টিটিউট এর লেভেলের প্রশ্ন ঘুরলে মাথা হ্যাং করবে। এতো ভাবতে হয় না। ঘুমাও। আই লাভ ইউ দ্যা ওয়ে ইউ আর।"

মিরা ফ্যালফ্যাল করে রায়ানের মুখপানে তাকিয়ে রইল। আর সঙ্গে সঙ্গে রায়ানের কাছ থেকে সরে এসে বলল-

"আপনি অনেক জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন। আমার ভালো লাগছে না। দূরে জান।"

রায়ান থ মেরে গেল। একটু আগে মিরা নিজেই তার গায়ের সাথে গা মিশে শুয়েছে- তার নাকি এভাবে শুলে ঘুম ভালো হয় আর এখন তারই মুখে এই উক্তি শুনে তার নিজের মাথাই হ্যাং করছে। প্রেগন্যান্সির কমপ্লিকেশন শারীরিকের থেকে মানসিক দিক থেকেই বেশি। অন্য সকল দিন হলে রায়ান মিরাকে জোড় করেই নিজের কাছে টানতো। কিন্তু এখন সে নিজেও জানে একটু পর মিরা পুনরায় নিজের থেকেই তার গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়বে। আর হলো ও তাই, মাঝ রাতে মিরা ঘুমের ঘোরে নিজেই রায়ানের দিকে ঘুরে তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে রইল।

~

মাস দুয়েক পর~

কোনো এক পড়ন্ত দুপুর~

ইদানিং রায়ানের কাজের চাপ বেড়েছে। আমেরিকারর মেইন অফিসটা সে বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চাইছে যার জন্য একটা অগোছালো পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে তার কর্মস্থলে। সেখানকার এমপ্লয়ি দের সাথে একটা লম্বা মিটিং শেষে রায়ান নিজের ফোন টা হাত নিতেই দেখলো প্রায় ৮-১০ টার মতো মিসড কলস এসেছে তার ফোনে মিরার নাম্বার থেকে। মূহুর্তে রায়ানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। এতো গুলো কল কোন কারণে ? এমন প্রশ্নের উদয় হতেই রায়ান মিরাকে কল ব্যাক করলো। রিং এক থেকে দুইবার বাজতেই মিরা রিসিভ করলো ফোনটা তবে তার কোনো সাড়াশব্দ নেই অপরপাশ থেকে তাই রায়ান নিজের নীরবতা ভঙ্গ করলো-

"আজ এতো গুলো মিস কল একসাথে..ব্যাপার কি মিসেস? কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কথা ছিল নাকি?"

মিরা রায়ানের প্রশ্নের তোয়াক্কা না করে নিজের বক্তব্য ব্যক্ত করলো-

"হাবি...আপনি আমাকে ভালো বাসেন না..!"

আজ রায়ান মিরার কথায় অবাক হলো না বরং নিজের ধৈর্য ধরে রেখে জিজ্ঞেস করলো-

"এমন কেন বলছো পাখি? কি হয়েছে?"

মিরা রায়ানের এই প্রশ্নেরও উত্তর দিল না। উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করলো-"কতটা ভালোবাসেন আমাকে?"

-"আরে, অনেক ভালোবাসি। তুমি জানো সেটা বেইবি।"

ফোনের অপর দিক থেকে রায়ানের জবাব শুনেও মিরা জোড় পূর্বক নিজের কথায় আটকে রইল-

"উঁহু, বাসেন না।"

রায়ান বুঝলো হয়তো মিরা চাইছে সে মিরার কথার গুরুত্ব দিক। তাই নির্বিকারে সে মিরার কথায় সম্মতি দিল-

"আচ্ছা ঠিক আছে বাসি না। তুমি যা বলবে তাই। পরে বলো আর কি?"

মিরা কিছু সময়ের জন্য চুপ করে গেল। তার বড্ড একা একা লাগছে এতো বড় ফাঁকা বাড়িতে মূলত তাই মেজাজের এই হাল‌। রায়ানের মেনে যাওয়াতে তার বিরক্তি বাড়লো-

"আমার না মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। অনেক বেশি ওভার থিন্কিং হচ্ছে।"

মিরা উত্তেজিত হয়ে রায়ান কে সোজাসাপ্টা স্বীকারোক্তি দিল।

রায়ান বুঝতে পারছে মিরার এমন হঠাৎ মুড সুইং এর সময়টা তার সাথে থাকা উচিত অথচ সে পারছে না। শারীরিক বিভিন্ন হরমোনাল, ও মানসিক চাপে গর্ভবতী মায়েদের এমন অনেক সময় পাড় করতে হয় যা চাইলেও স্বাভাবিক একজন মানুষের পক্ষে বোঝা অসম্ভব। মূলত এসব কারণেই অনেক মায়েরা গর্ভাবস্থায় মানসিক ভাবে ডিপ্রেশড হয়ে পড়ে যা কখনোই কাম্য নয়। রায়ান নিজ দায়িত্ব বুঝে মিরাকে ঠান্ডা করতে শান্ত গলায় বলল-

"ওকে চিল আউট। কিছু খাবে তুমি? আমায় বলো।"

-"না।", মিরা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর করলো। তবে রায়ান বুঝে নিল মিরার চাইছে যেন সে নিজ থেকে কিছু অর্ডার করে তার জন্য। তারই পরিপ্রেক্ষিতে রায়ান একটু বুদ্ধি খাটিয়ে প্রশ্ন করলো-

"চকলেটস অর্ডার করে দেই?"

-"করে দিন..!" এবারও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এলো মিরার দিকে থেকে। রায়ান মুচকি হেঁসে তাকে আস্বস্ত করলো-

"আচ্ছা ঠিক আছে করে দিচ্ছি।"

রায়ান ফোন তুলে অর্ডার করতে নিল। কিন্তু তখনই মিরা কিছু একটা ভেবে রায়ানের উদ্দেশ্যে ভারী কণ্ঠে বলল-

"না থাক, বাদ দিন। আমি খাবো না।"

রায়ানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল কোথাও একটা-

"আরে অদ্ভুত তো, কেন খাবে না?"

মিরা এবার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল-

"চকলেট না আইস্ক্রিম অর্ডার করে দিন।"

রায়ান কেবল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই মেয়ের আবার কখন মুড সুইং হবে তার কোনো সময় সীমা নেই তাই রায়ান একটু সতর্ক থাকলো নিজের সিদ্ধান্তে-

"ঠিক আছে, আমি দুটোই অর্ডার করে দিচ্ছি।"

মিরা খুশি হলো‌। চোখে তার অন্যরকম একটা তৃপ্তির ঝলক-

"ভালো তো আপনি আমাকে বাসেন..!"

রায়ান তুচ্ছ জ্ঞ্যানে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো মিরার কথায়-

"হয়েছে হয়েছে, বুঝেছি। আর বলতে হবে না।"

তবে মিরা পরক্ষনেই নির্বিকার ভাব নিয়ে বলল-

"কিন্তু আপনি আর কেয়ারই করেন না। কি অর্ডার করবেন এটাও জিজ্ঞেস করতে হয়? নিজের থেকে করা যায় না? আপনি আমার পরোয়া করেন না। যাই হোক আই লাভ ইউ।"

এই বলেই সে কল কেটে দিল। রায়ান তার হাতের ফোনটার দিকে মুচকি হেঁসে তাকালো। স্ত্রীর এমন খোঁচাখুঁচি প্রেম নিবেদন বরাবরই তাকে অদ্ভুত রকমের আনন্দ দেয়। রায়ান নিজের ফোন টা টেবিলের উপর রেখে পুনরায় নিজের ল্যাপটপে মনযোগ দিতে দিতে বলল-

"আই লাভ ইউ মোর মাই হার্টবার্ড।"

রাত~১০টা

এক টানা মোট ৭ টা মিটিং এরপর রায়ান ক্লান্ত হয়ে নিজের কেবিনে ফিরলো। পড়িহিত কোর্ট টা একটানে খুলে কাউচের উপর ছুঁড়ে ফেলে গলার কাছ থেকে আটশাট করে বাধা টাইটা সে হাত দিয়ে টেনে কিছুটা হালকা করলো। শার্টের উপরের দুটো বাটন খুলে ঠাস করে বসে পড়লো নিজের চেয়ারে। হাত দ্বারা মাথা টা চেপে ধরলো নিজের- খুব বেশি প্রেশার নেওয়া হয়ে গেছে তা সেও বুঝতে পারছে। তখনি তার চোখে পারলো তার অযত্নে ফেলে রাখা ফোনটা। রায়ান তার টেবিলের রাখা তার আর মিরা একটা কাপল ছবি ফ্রেম বন্দি করে রেখেছিল। সেই দিকে চোখ যেতেই রায়ানের মিরার কথা মনে পড়লে। চোখজোড়া জলজল করে উঠলো তার, ঠোঁট অজান্তেই প্রসারিত হলো। রায়ান হাঁফ ছেড়ে টেবিলে থেকে নিজের ফোনটা তুলে নিল। আর মিরাকে কল লাগালো। মিরা এমন সময় রায়ানের কল দেখে একটু অবাক হলেও হাঁসি মুখে ফোনটা রিসিভ করলো।

-"হ্যালো..!"

রায়ান মিরার কণ্ঠ শুনতেই নিজের চেয়ারে গা ছেঁড়ে দিয়ে স্বাভাবিক গম্ভীর থমথমে গলায় মিরাকে উদ্দেশ্যে করে বলল-

"মুড অফ। এক্সোস্টেড লাগছে খুব। একটু ভালো কিছু বলো।"

মিরা রায়ানের গলায় আওয়াজ শুনে একটু চিন্তিত হলো। সচরাচর রায়ানের কণ্ঠ এমন শোনায় না। মিরা পাল্টা প্রশ্ন করলো না। রায়ানের চাহিদা টুকু পুরণ করা এখন জরুরি মনে হলো তার। মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে লম্বা নিঃশ্বাস নিল। আর উৎসুক ও আহ্লাদী কণ্ঠে বলল-

"হাবিইইই..কি করছেন আপনি? কখন আসবেন আমার কাছে? অনেক মিস করছি তো। আপনার প্রিন্সেস ও খুব মিস করছে আপনাকে। উই মিস ইউ, উই লাভ ইউ। উম্মাহ উম্মাহ..!"

মিরার একটানা এমন আদরে রায়ানের ক্লান্তি সব দূর হলো। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে সে মুচকি হাসলো। মিরা অপর পাশ থেকে দ্বিধান্বিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল -

"ব্যাটার লাগছে এখন?"

রায়ান নিজের ওষ্ঠপুট দাঁতের মাঝে সামান্য কামড়ে ধরে অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে বলল-

"উঁহু, কই? লাগছে না তো। আবার ট্রায় করো।"

মিরা রায়ানের দুষ্টু বুঝে গলায় গাম্ভীর্যতা এনে বলল-

"ডোন্ট বি সো পিকি..! মনে মনে যে আপনার লাড্ডু ফুটছে তা আমি জানি। মাথা শান্ত রেখে কাজ করুন। হতাশ হবেন না। আমি সব সময় আপনার পাশে আছি।"

মিরার কথায় রায়ানের ব্যস্ত মন শান্ত হয়ে এলো। সে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের কোর্টটা হাতে নিতে নিতে বলল-

"বউ বলেছে সে আমাকে মিস করছে। এখন কিভাবে কাজ করবো? বাড়ি ফিরছি..! কিছু লাগলে বলো নিয়ে আসবো ফেরার পথে।"

মিরা শব্দ করে হেঁসে উঠলো‌। অতঃপর শান্ত গলায় বলল-

"আপনার প্রিন্সেস ফুচকা খাবে।"

রায়ানের বুঝতে আর বাকি নেই মিরা কি বোঝাতে চাইলো তাকে। সে তবুও হেয়ালি করে মিরার দুষ্টুমিতে তার সঙ্গে দিল-

"আর প্রিন্সেসের মাম্মা কি খাবে?"

মিরা ঠোঁট কামড়ে হেঁসে রায়ানকে উস্কে দিতে বলল-

"প্রিন্সেসের পাপা আছে কি করতে?"

দুজনেই দুদিক থেকে লাজুক হাসলো। রায়ান অফিসের করিডোর পার করে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-

"ওয়েট ফর মি বেইবি। আই এ্যাম কামিং।"

~

রায়ান অফিস থেকে ফিরতেই মিরা লাফিয়ে রায়ানের গলা জড়িয়ে ধরলো-"আই মিসড ইউ হাবি..!"

রায়ান হাসি মুখে মিরাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল-

"আই মিসড ইউ মোর বেইবি।"

মিরা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞাস করলো- "ফুচকা?"

রায়ান পিছন থেকে তার হাত ঘুরিয়ে এনে মিরার সামনে এনলো। মিরা এক নজর ফুচকার দিকে তাকিয়ে আহ্লাদী সুরে বলল-

"বাইরে গিয়ে খেতে পারলে আরো ভালো হতো।"

রায়ান মিরার কাঁধে হাত রেখে তাঁকে সান্ত্বনা দিল-

"আর মাত্র দেড় দু মাসের ব্যাপার বেইবি। পরে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

প্রকৃতি ভালো জানে সব কি সত্যিই ঠিক হয় কিনা! তবে বাস্তবতা অবশ্যই আশাহত করে। মা হওয়া কি সহজ? মোটেও না। তবে এই যাত্রা সহজ করার ক্ষমতা কেবল গর্ভবতী মায়ের আপন জনদের আছে। মিরা নিজের বাস্তবতা মেনে নিল তবে তখনই সে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-

"এমন তো নয় যে বাড়িতে রোড সাইডের ফিল নেওয়া যাবে না, তাই না?"

রায়ানের ভ্রু কুঁচকে এলো। সে এক কদর মিরার থেকে দূরে গিয়ে বলল- "তুমি যা ভাবছো তা হবে না।"

মিরা শয়তানি হাসি দিয়ে মায়াবী মুখ করে বলল-

"হাবি প্লিজ, আমার জন্য এইটুকু করতে পারবেন না আপনি?"

ব্যাস এখানেই হার হলো রায়ানের। এই কথার উপর কিছু বলার সাহস কি কোনো বর করবে? অতঃপর মিরা রায়ানকে ফুচকা ওয়ালা হিসেবে সাজিয়ে নিল। যে সে ফুচকা ওয়ালা নয়, কোটিপতি হ্যান্ডসাম ফুচকা ওয়ালা। মিরা রায়ানের মাথায় আর কোমরে গামছা বেঁধে দিল, সুন্দর করে টেবিল সাজিয়ে দিল। এরপর শুরু হলো তাদের অভিনয়। রায়ান মিরাকে নিজ হাতে ফুচকা বানিয়ে দিতে লাগলো। মিরা প্রথম ফুচকা টা বড় হা করে মুখে পুরে নিয়ে আমোদ করে চিবোতে চিবোতে নিজের দুচোখ মাঝে মাঝে খুলছে আর বন্ধ করছে যেন স্বাদটা ঠিক তার মনে ধরছে না। মিরা রায়ানের দিকে খেয়াল করে মিটিমিটি হাসলো। রায়ান পলকহীন মিরার মুখশ্রী দেখে যাচ্ছে কতই না ভাব মূর্তি সেই গোলগাল মুখটায়। ছেলেটার প্রেমিক মন বেশ বিনোদন পাচ্ছে‌। মিরা মুখের ফুচকা টা শেষ করে সম্পূর্ণ স্ট্রিট ভাইব নিতে রায়ানের উদ্দেশ্যে বলল-

"মামা, আরো ঝাল দেন। ঝাল হয় নি।"

-"হুয়াট...?! মামা..!"

রায়ান আচম্বিতিতে বড় বড় চোখ করে মিরার দিকে তাকালে মিরা জিভ কেটে নিজের কথার ব্যাখ্যা দিতে তাড়াহুড়ো করে বলল-

"আরে, আপনাকে না তো। আপনার মধ্যকার যেই ফুচকা ওয়ালা জাগ্রত হয়েছে তাকে সম্বোধন করলাম।"

রায়ানের মেজাজ তেতে উঠলো- সব ছেঁড়ে মামা ডাক শুনতে হবে বউয়ের থেকে! রায়ান খেপে গিয়ে বলল-

"ওই ছেমড়ি, কোন অ্যাঙ্গেল থেকে আমাকে মামা লাগে?"

মিরা একটু ভয় পেল বোধহয়। সে সামান্য ঠোঁট ফাকা করে হেঁসে আনমনে রায়ানের কথায় সম্মতি দিল-

"জি, জি, তা তো ঠিকই, তা তো ঠিকই। আপনাকে কোনো অ্যাঙ্গেল থেকেই মামা টাইপ লাগে না।"

-"আচ্ছা ভাইয়া, ভাইয়া আরেকটু ঝাল দেন।"

রায়ান ফুচকার টকের বোল থেকে চামচ তুলে মিরার দিকে তেড়ে আসার ভাব নিয়ে বলল-

"মাথায় মারবো কিন্তু এখন। আমার বাচ্চা পেটে নিয়ে আমার চোখের সামনে সারাদিন টইটই করে আমাকে ভাইয়া ডাকা হচ্ছে এখন?"

মিরা নিজের মুখ ফুলিয়ে নিল। রায়ানের শাসন তার একদম গায়েসয় না। রায়ান মিরার ৮ মাসের ফোলা পেটের দিকে আঙুল তাক করে জিজ্ঞেস করলো-

"এটা কার বেবি?"

মিরা সোজা উত্তর দিয়ে ফেলল-

"আমার.."

রায়ানের ব্রেন সেলস মনে হয় ব্লাস্ট করে যাবে এখন। সে নিজের মাথার চুল খামচে ধরে জিজ্ঞেস করলো-

"তোমার বেবি কি আকাশ থেকে পড়েছে? তোমাকে বেবি টা দিয়েছে কে শুনি?"

মিরা মুখ নিচু করে ঠোঁট কামড়ে বলল-"আপনি..!"

-"তো আমি কি তোমার?"

মিরা এবার কেঁদেই ফেলল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রায়ানের বুকের সঙ্গে লেপ্টে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-

"হাবি...!"

ব্যাস, ওমনি রায়ানের মেজাজ গেল ঠান্ডা হয়ে। সে উপরের ঝাড়বাতির দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল-

"হে আল্লাহ, আমাকে ধৈর্য দাও।"

মিরা অনুতপ্ত হলো নিজের কর্মে। হঠাৎ করেই মিরার পেটে সজোরে একটা লাথি পড়লো। মিরা আর্তনাদ করে উঠলো-"উফফ্!"

রায়ান চিন্তিত হয়ে উঠলো-"কি হলো..!? হসপিটালে যেতে হবে? খারাপ লাগছে হৃদপাখি? আমাকে বলো..।"

মিরা হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে বলল-

"আপনার বাচ্চা আপনার হয়ে মায়ের সাথে ঝগড়া করছে ভেতর থেকে। কি জোরে লাথি মাড়লো‌। উফফ্, এমনি যে সাড়া দিন অলসের মতো চুপ করে শুয়ে থাকে একটা ফোঁটাও নড়ে না আপনার সাথে কথা হলেই ইচ্ছে মতো হাত পা ছোঁড়ে।"

মিরা রায়ানের মন বোলাতে হেঁসে হেঁসে কথা গুলো বললেও রায়ান মিরার চোখে মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ও ব্যাথার অনুভূতি দেখতে পেল। সে ইচ্ছে করলেও এই ব্যাথার ভাগ নিতে পারবে না সে জানে। এই অপারগতাই তার অসহ্য লাগে। কত ভালোই না হতো যদি প্রেগন্যান্সির প্রতিটা প্রতিবন্ধকতা সে মিরার থেকে ভাগাভাগি করে নিতে পারতো! কিন্তু এই মহান ক্ষমতা খোঁজে কেবল মহান মেয়ে জাতি কেই দিয়েছেন। রায়ান মিরার কথায় বিশ্বাস করেছে বোঝাতে হাঁটু গেঁড়ে মিথ্যা পেটে বরাবর বসতে বলল-

"যেহেতু আমার এতো গুরুত্ব, আমি বললে নিশ্চয়ই আমার প্রিন্সেস বুঝবে। আমাকে কথা বলতে দাও।"

মিরা অবাক চোখে রায়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। রায়ান মিরার ফোলা পেটে হাত রেখে আলতো করে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে নরম কণ্ঠে বলল-

"মাম্মা কে এভাবে কষ্ট দিতে নেই প্রিন্সেস। আমাদের কাজ তো মাম্মা কে আগলে রাখা, তাই না? আমারা মাম্মাকে সব সময় সেফ রাখবো‌, কখনো কষ্ট দেব না। বি জ্যান্টাল উইথ হার, ওকে? পাপা নয়তো খুব অভিমান করবে তোমার উপর। তোমার মাম্মা তোমার পাপার খুব মূল্যবান সম্পদ। মাম্মা আর পাপা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।"

চলবে..

পাখিরা গল্পে এর পর একটু ট্রেজিক কিছু ঘটবে🙂। এতো হ্যাপি হ্যাপি ভালো লাগছে না কেন জানি। শয়তানে নাড়া দিতেছে। ভাবছি কেউটে মেরে পেরে ফেললে বেশি বেশি হবে তাই একটু ট্রেজিক একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করবো ডোন্ট প্যানিক। 1.5k react complete করে দিও। পেইজ ডাউন অনেক। Love you pakhis 🥰 ❤️

#আত্মার_অঙ্গীকারে_অভিমোহ #Soul_bound_obsession

#Oratrika_Rahman_অরাত্রিকা_রহমান

#Part_special_1

(কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ)

(প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উন্মুক্ত)

রহমান বাড়ি~

একটা সাদা বড় চারচাকা গাড়ি থামলো রহমান বাড়ির সামনে। গাড়ির উপস্থিতিতে রোকেয়া বেগম এবং শফিক রহমান উভয়ই ছুটে এলেন বাড়ির বাইরে। মিরা সোরায়া আর রিমি একসাথে গাড়ি থেকে নামলো। মিরা আর সোরা দুজনেই চাচা চাচিকে অনেক দিন পর দেখে দৌড়ে গিয়ে তাদের জড়িয়ে ধরলো। রোকেয়া বেগমের চোখে তখনও অশ্রু কণা ছলছল করছে। মিরা রোকেয়া বেগমের চোখে পানি দেখে নিজেও কাঁদো কাঁদো মুখে বলল-

"আরে চাচি, কাঁদছো কেন? কত দিন পর এলাম। আমাকে দেখে বুঝি ভালো লাগছে না?"

রোকেয়া বেগম মিরার গালে হাত রেখে মমতাময় গলায় বললেন-

"তোদের ছাড়া এক একটা দিন যে তোর চাচার আর আমার কত লম্বা কাটে মা, কিভাবে বোঝাবো বল। তোরা এলি মনে হলো আমার মরা বাড়িটা এখন জীবিত হয়ে উঠলো।"

সোরা শফিক রহমান কে জড়িয়ে ধরে আছে। শফিক রহমান বরাবরই সোরার প্রতি একটু বেশি দূর্বল, হয়তো সোরা ছোট বলেই। অথচ কয়েকদিনের মধ্যেই সোরার বিয়ের পাকা কথা হবে চিন্তা করেও তিনি বেশ অবাক। তিনি সোরার মুখের দিকে তাকিয়ে কেবল চিন্তা করেন- সময় সত্যি খুব দ্রুত অতিবাহিত হয়। রুদ্র মিরা, সোরা আর রিমিকে চট্টগ্রাম পৌঁছে দিতে এসেছিল। তাকে আবারও ফিরে যেতে হবে। রোকেয়া বেগম এবং শফিক রহমান আগের কখনো রিমিকে দেখেন নি। রুদ্রর স্ত্রী হিসেবে রুদ্র রিমিকে পরিচয় দিলে রোকেয়া বেগম ভীষণ আদরে রিমিকে আপন করে নেন। রিমিরও সময় লাগলো না সবার সাথে মিশে যেতে। নিজেদের সাথে স্বাভাবিক কুশল বিনিময় করার সময়ই রহমান বাড়ির সামনে একজন রাইডার এসে নিজের বাইক থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন-

"আচ্ছা, শফিক রহমানের বাড়িটা কোন দিকে বলতে পারেন?"

সবাক বিষ্ময়ে শফিক রহমানের দিকে তাকালে শফিক রহমান নিজেই উত্তর করেন-

"জি, বলুন। আমিই শফিক রহমান।"

রাইডার টি বাইক থেকে নেমে নিজের হাতে একটা পার্সেল নিয়ে বললেন-

"আপনার নামে একটা পার্সেল ছিল।"

শফিক রহমান অবাক হয়ে তাকিয়ে বললেন-

"আমার তো কোনো পার্সেল আসার কথা ছিল না‌ আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।"

রাইডার টি দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বলল-

"না না, আমার ভুল হচ্ছে না। পার্সেল টা তো আপনার নামেই। রিভান চৌধুরী রায়ান নামে কেউ একজন পাঠিয়েছেন।"

রায়ানের নামে সবার মুখেই আশ্চর্যতা ধরা পরলো। মিরা এগিয়ে গিয়ে রাইডার টির থেকে পার্সেল টা রিসিভ করে উনাকে বিদায় দিল। বাড়ির ভেতরে গিয়ে মিরা শফিক রহমান কে পার্সেল টা আনবক্স করতে বললে শফিক রহমান পার্সেল টা খুলে দেখলেন ভিতরে একটা বড় ওভার লোডেড চকলেট কেক। বাড়ির জামাই সব ছেড়ে চকলেট কেক পাঠিয়েছে বিষয়টা সবাইকেই অবাক করলো। কেক এর উপর থেকে প্লাস্টিক পেপার টা সরাতেই বড় বড় করে লিখা একটা উক্তি সবার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো-

"আমার বউকে ফেরত দিন।"

মিরা নিজের কপালে হাত রেখে তার চাচা চাচির চেহারা দেখলো। রোকেয়া বেগম মিরাকে জিজ্ঞেস করলেন-

"এসব কি মিরা? তুই কি রায়ানের সাথে ঝগড়া করে এসেছিস?"

মিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যা বলতেই রোকেয়া বেগম গম্ভীর গলায় আবার জিজ্ঞেস করলেন-

"ঝগড়া কেন করেছিস আবার?"

-"কি করবো? আমাকে আসতে দিতে রাজিই হচ্ছিলেন না উনি। তাই ঝগড়া করছি। দুটো দিন বেশি থাকলে কি এমন হবে? না, উনি আমাকে দূরে থাকতেই দেবেন না। বেশ করেছি ঝগড়া করেছি। দেখছো না, নিজে আসেনি আমাকে দিতে, রুদ্র ভাইয়াকে পাঠিয়েছে। এখন আবার কিনা কি পাগলামো করছে।"

শফিক রহমান একটু গম্ভীর মুখে মিরাকে জিজ্ঞেস করলেন-

"মিরা, রায়ান কি সব সময় তোর উপর এমন রাগ দেখায়?"

মিরা চাচার কথায় মুচকি হাসলো। আসলে বাবার মাথায় হয়তো মেয়ের ভালো থাকার চেয়ে বেশি আর কিছুই আসে না। মিরা শফিক রহমানের কাছে গিয়ে ওই কেক টা নিয়ে নিল। আর রান্নাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে বলল-

"আরে ধুর..রাগ না ছাই। ওনার রাগ আমার সামনে ৫ সেকেন্ডও টেকে না। কেক পাঠিয়েছে তাও বেছে - যেটা আমার পছন্দের। কি লিখেছে না লিখেছে ভুলে যাও তো, পাত্তা দিও না। ওনার সারাদিনই বউ লাগে। কেকটা খেয়ে চুপচাপ বসে থাকবো ইফতার এর পর।"

রোকেয়া বেগম শফিক রহমানের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করলেন-

"হায় খোদা, আমার মেয়ের কপাল টাও এমন হলো? বিয়ের পর আমিও শান্তিতে একটু বাপের বাড়ি থাকতে পারি নি। এই সব বেডা মানুষের সমস্যা কি?"

শফিক রহমান রোকেয়া বেগমের অস্পষ্ট কথা গুলো শুনে বললেন -

"বেডা মানুষের কষ্ট যদি বেডি মানুষ বুঝতো তাহলে তো বাপের বাড়ি যেতেই চাইতো না।"

রোকেয়া বেগম মুখ কালো করে নিয়ে বলল-

"তাহলে তোমার মেয়ে কি ভুল কিছু করেছে এমন টা বলতে চাইছো?"

-"না, আমার মেয়ে ভুল কেন করবে? একদম ঠিক করেছে। বাপের বাড়িতে আসতে ইচ্ছে হলে আসবে না কেন? আমার মেয়ের সাহস দেখে আমার গর্ব হয়।"

-"তাহলে আমাকে কখনো যেতে দিতে না কেন আমার বাপের বাড়িতে?"

শফিক রহমান শান্ত গলায় দৃঢ়তা দেখিয়ে বললেন -

"কি আজব, তুমি আমার বউ। বাপের বাড়ি কেন যাবা? বাড়ির বাড়িতে পাঠানোর জন্য বিয়ে করেছিলাম নাকি?"

রোকেয়া বেগম রেগে গেলেন শফিক রহমানের কথায়। তিনিও দেমাক দেখিয়ে বিড়বিড় করতে করতে রান্নাঘরে চলে গেলেন-

"বাদজাত বেডা মানুষ। বউয়ের বেলায় যা ভুল মেয়ের বেলায় তা ঠিক!"

রোকেয়া বেগম রাগ করে চলে গেলেন দেখে শফিক রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুদ্রর সাথে বাইরে চলে এলেন রুদ্র কে বিদায় দিতে। রুদ্রকে কাজের জন্য আবার ঢাকা ফিরে যেতে হবে। শফিক রহমান রুদ্র কে বিদায় দিয়ে বাড়িতে ঢুকলে রিমি দৌড়ে বাড়ির বাইরে এলো। রুদ্র গাড়ির দরজা খুলে গাড়িতে উঠবে তখনই রিমি রুদ্র কে ডেকে উঠলো-

"রুদ্র..!"

রুদ্র পিছন ফিরে রিমির দিকে চাইল। রিমি হাঁপিয়ে উঠেছে দৌড়াতে গিয়ে। রুদ্র রিমিকে সাথে সাথে বুকে জড়িয়ে নিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

"কি হয়েছে সোনা? দৌড়াচ্ছো কেন এভাবে? যদি পড়ে যেতে?"

রিমি রুদ্রর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে উল্টো নিজের প্রশ্ন সামনে রাখলো-

"আপনি চলে যাচ্ছেন? থেকে গেলে হয় না?"

রুদ্র পাল্টা প্রশ্ন করলো-

"কেন? তোমার ভালো লাগছে না খালামণির বাসায়?"

-"তা না, বিয়ের পর আপনাকে ছাড়া কোথাও থাকি নি তো তাই কেমন কেমন লাগছে।"

রুদ্র মিষ্টি হেঁসে রিমির ছোট্ট মুখটা নিজের হাতের আচলায় পুরে নিয়ে বলল-

"আমার পাগলি বউটা আজ হঠাৎ করে খুব আহ্লাদ করছে কেন? না এখন নিজের ঘরে আছি আর না উপায় আছে আমার কিছু করার। রোজা যে রেখেছি..আমার রোজাটা কি হালকা করার ধান্দায় আছো?"

রিমি রুদ্রর এমন ঠোঁট কাটা কথায় লজ্জা পেয়ে রুদ্রর বুকে ধাক্কা দিয়ে বলল-

"চুপ করুন অসভ্য। আমি কি কিছু করতে বলেছি আপনাকে?"

-"কেন? সমস্যা কোথায়? বলো না কিছু করতে।"

রুদ্র রিমির কোমর দুই হাত জড়িয়ে নিজের কাছে টানল। রিমি হকচকিয়ে বাড়ির ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখে রুদ্রর বুকে হালকা ধাক্কা দিয়ে বলল-

"ছাড়ুন ছাড়ুন, কেউ দেখে ফেলবে।"

রুদ্র রিমির গালে চুমু দিয়ে তার গলায় মুখ গুঁজে ভারী কণ্ঠে বলল-

"একটা চুমু খাই?"

রিমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের চোখ জোড়া বন্ধ করে নিয়ে সাথে সাথে আবার খুলে ফেলল। রুদ্র কে একটু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে রুদ্র গালে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল-

"উহু, পরে। এখন রোজা আছেন মনে নেই নাকি। সংযম করুন।"

রুদ্র অধৈর্য হয়ে বলল-"আরে একটু চুমু খেলে কিছু হয় না।"

রুদ্র পুনরায় এগিয়ে গেলে রিমি আবার রুদ্র কে থামি দিয়ে গাড়ির দিকে ইশারা করে বলল-

"ইফতার এর পর আসুন জনাব। তখন কথা হবে।"

রুদ্র উপায় না পেয়ে হার মেনে নিল। রিমির কপালে একটা ছোট্ট চুমু দিয়ে গাড়িতে উঠে গেল। রিমি মুচকি হেঁসে রুদ্র কে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানিয়ে উড়ু উড়ু মনে পা নাচিয়ে বাড়ির ভিতর ঢুকে গেল। এই সম্পূর্ণ দৃশ্য টুকু মিরা উপরের নিজের ঘরের বারান্দা থেকে খুব মন দিয়ে দেখলো‌। তার কাছে এই কাজটা মোটেও লজ্জা জনক লাগলো না। এগুলো চৌধুরী বাড়ির নিত্য দিনের ঘটনা, আসতে যেতে চোখে পরে। উল্টো মিরার হঠাৎ করেই মনটা ভাল হয়ে এলো, বড্ড রায়ানের কথা মনে পড়লো। তৎক্ষণাৎ মাথায় এলো- যদি রুদ্রর এই অবস্থা হয় তাহলে রায়ান ঠিক কতটা পাগল হয়ে আছে এখন তার জন্য!

আসার পর থেকে রায়ান একবারও তাকে কল করলো না, গাড়িতেও কল করলো না। কি করছে এখন লোকটা? মিরা উদাস মুখে ঘরের ভিতরে গিয়ে নিজের পুরোনো খাটে ঠাস করে শুয়ে পড়লো। ফোনটা হাতে নিয়ে নিজের ফোনের ওয়াল পেপারে তার আর রায়ানের ছবিটা দেখে হালকা মুচকি হেঁসে নিজেই সব মান অভিমান ভুলে রায়ানকে কল করলো। খুব উৎসাহিত মনে মিরা রায়ানের নাম্বারে কল ডায়াল করলো। কিন্তু ফোনটা রিসিভ হলো না। মিরার মুখের হাঁসি টা মিলিয়ে গেল। পুনরায় কল করলেও রায়ান আর ফোনটা ধরলো না। মিরা পরে আর কল করলো না। তাঁরও তো একটা আত্মসম্মান আছে তাই না!

__________

গোটা দিন পাড় হয়ে গেছে। মিরা সারাটা দিন যখনি সময় পেয়েছে নজরটা তার ফোনেই ছিল। রায়ান ফোন করতে পারে হয়তো এমন কিছু চিন্তা করে। সবাই মিরাকে উদাসীন দেখে তার কি হয়েছে জিজ্ঞেস করলেও মিরা কিছু খুলে বলেনি। কিন্তু রোকেয়া বেগম মেয়ের মনের অবস্থা একটু হলেও ঠাওর করতে পারছিলেন। কিন্তু মিরা যেহেতু কাউকে কিছু বলতে চাইছিল না তাই তিনিও সেই নিয়ে কথা তুলেন নি।

ইফতারের সময়টা সবাই একসাথে বসে ইফতার করেছে মিরা তখনও মুখ ভার করে ছিল। তেমন কিছু খায় ও নি। এর মাঝে রুদ্র রিমিকে কল করে খোঁজ নিয়েছেন সে ইফতার করেছে কিনা, আবার মাহির ও কল করে বাড়ির সবার সাথে কথা বলেছে- আজ বাদে কালই এনগেজমেন্টট। বাড়ির নতুন জামাই হিসেবেও তো তার একটা কর্তব্য আছে। মিরা আশা করছিল রায়ান ও কল করবে তার সব কাজ শেষ হয়ে গেলে। ইফতারের সময় আবার নিজের থেকেই কল করতে চেয়েছিল মিরা কিন্তু মনের দোটানায় আর করতে পারেনি। রাতের তারাবীহ নামায আদায় করে সবাই ডিনার করলো কিন্তু মিরা কিছু মুখে দিল না। রোকেয়া বেগম খুব করে জোড় করলেন কিন্তু তবুও মিরাকে খেতে বাধ্য করতে পারলেন না। মিরার জেদ ঠিক তার বাবার মতো এর এখন খানিকটা সঙ্গে দোষে রায়ানের থেকে পেয়েছে।

রাত~২টা

বেশ অনেকটা সময় এপাশ ওপাশ করার পর মিরার দু চোখে ঘুম নেমে এসেছে। বিয়ের পর রায়ান কে ছাড়া এই প্রথম ঘুমাচ্ছে সে নয়তো কখনো আলাদা থাকতে চাইলেও রায়ান কোনো না কোনো উপায়ে মিরার সাথেই থাকে। হয় জেদ ধরে নিজের বেহায়ার মতো মিরার কাছে চলে যাবে নয়তো নিজে জেদ দেখিয়ে মিরাকে কোলে করে নিজের কাছে এনে নেবে। কয়েকমাস আগে এই রুমে জেন্ত লাশের মতো জীবন যাপন করে একা একা ঘুমাতে খানিকটা ভয় ও পাচ্ছিল মিরা।

হঠাৎ করে একটা শব্দ ভেসে এলো মিরার কানে। মনে ভয় আর মাথায় এক গাদা চিন্তা নিয়ে ঘুমিয়েছিল বলে ওই অল্প শব্দেও মেয়েটার কাঁচা ঘুম ভেঙে গেল। মিরা হুট করে বিছানায় উঠে বসে নিজের খোলা চুলে খোঁপা বেঁধে বিছানা থেকে নেমে নিজেই প্রশ্ন করলো-

"কে ওখানে?"

তার কণ্ঠ টা খুবই ধীর বোঝা যাচ্ছে ভয়ে আড়ষ্ট সে। শব্দটা আবার হলো- মনে হলো ভারী কিছু খুব অসাবধানতায় জমিন স্পর্শ করলো। শব্দটা বারান্দায় শুনা গেল বলে মিরাও শুকনো ঢোক গলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে।

-"বা..বারান্দায় কেউ আছেন?"

মিরার কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। ভয়ে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে মেয়েটার। মিরা অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে জিজ্ঞাসা করলো-

"আমি জিজ্ঞেস করছি কে আছে ওখানে?"

মিরা কোনো প্রকার সাড়া শব্দ না পেয়ে মনে একটু সাহস যুগিয়ে বারান্দায় এগিয়ে গেল। চারপাশটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। নিজের ভেতরের ভয়টাকে জোর করে চাপা দিয়ে মিরা ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।

সাদা পর্দার আড়ালে একটা লম্বা ছায়া নড়ে উঠতেই মিরার গলা দিয়ে প্রায় চিৎকার বেরিয়ে আসতে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই হঠাৎ একটা কণ্ঠ—

“শিট! বউটা আজকে আমাকে গণপিটুনি খাওয়াবে মনে হয়…”

বলেই মুহূর্তের মধ্যে ছায়াটা সামনে এসে দাঁড়াল। মিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে বারান্দার দেয়ালে চেপে ধরল। আর কোনো শব্দ বেরোতে না দেওয়ার জন্য তার ঠোঁটের উপর নিজের ঠোঁট চেপে দিল। সেকেন্ডের ব্যবধানে এমন ঘটনায় মিরা হতভম্ব। বড় বড় চোখে তাকিয়ে নিজের ঠোঁট জোড়া রায়ানের থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল। তার ঠোঁট থেকে অস্পষ্ট প্রতিবাদের শব্দ বেরোলো—

“উমম্…!”

রায়ান চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলল, কিন্তু মিরা তার দিকে তাকাচ্ছেই না। উল্টো আরও ছটফট করছে। বাধ্য হয়ে রায়ান চুমুটাকে আরও গভীর করল—একটু থামাতে, একটু শান্ত করতে। মিরার শ্বাসপ্রশ্বাস এলোমেলো হয়ে গেল। ধীরে ধীরে তার শরীরের টান কিছুটা ঢিলে পড়তেই রায়ান দু’হাতে তাকে আগলে নিল। রায়ানের ঠোঁট ও অবাধ্য হলো। রায়ান চেয়েও আর মিরা ঠোঁট ছাড়লো না।

কিন্তু পরের মুহূর্তেই, অপরিচিত ভেবে মিরা হঠাৎ হাঁটু তুলে রায়ানের দুই উরুর মাঝ বরাবর সজোরে আঘাত করল।

-“আহ্—!”

ব্যথায় কাতর একটা শব্দ বেরিয়ে এল রায়ানের মুখ থেকে। চুমুটা ভেঙে গেল। রায়ান মিরার ঠোঁট ছেঁড়ে দিতেই মিরা এবার সত্যিই চিৎকার করতে যাচ্ছিল, কিন্তু রায়ান দ্রুত তাকে আটকে দিল। এক হাতে মিরার মুখ চেপে ধরে, আরেক হাতে নিজের ব্যথা সামলাতে সামলাতে কাতর গলায় বলল—

“আল্লাহর দোহাই বউ আমার…চুপ... দূরে থেকেও জান নিয়ে নেয়, কাছে এসেছি, তাতেও জান কবজ করে নিচ্ছে! চুপ কর… মাফ চাই…”

পরিচিত কণ্ঠটা কানে যেতেই মিরা থমকে গেল। বিস্ময়ে চোখ বড় হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও লাগল না রায়ানকে চিনতে তার। নিজের শ্বাসই যেন ঠিকমতো নিতে পারছে না সে। ধীরে ধীরে রায়ানের হাতটা মুখ থেকে সরিয়ে দিয়ে অশান্ত, কাঁপা গলায় বলল—

“আ… আপনি কি পাগল? এই সময়ে বারান্দা দিয়ে আমার ঘরে এসেছেন কেন? তাও আমাকে এভাবে—! না জানিয়ে এমন করলে আমি তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিছু করবই, তাই না?”

রায়ান অগ্নিদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টি দেখে মিরা হালকা জিভ কামড়ে নিল। তারপর মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখে নিয়ে একটু থেমে, কণ্ঠটা নরম করে জিজ্ঞেস করল—

“বেশি লেগেছে…?”

রায়ান এক হাত দিয়ে পেটের নিচের দিকে আলতো করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

“তোমার কাছে আসা মানেই রিস্ক নেওয়া, এটা আমার আগেই বুঝা উচিত ছিল আমার…নতুন তো নয়, এর আগেও দেখেছি একই কাজ করতে।

”

তার গলায় ব্যথার সাথে মিশে হালকা অভিমানও ছিল। মিরা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। হে বুঝতে পারলো রায়ান রেসের রাতের কথা বলছে যখন সে জ্যাক কে আঘাত করেছিল। বেচারি নিজেও বুঝতে পারছে, ভয়ে যা করেছে সেটা ইচ্ছে করে না, কিন্তু আঘাতটা বেশ জোরেই লেগেছে। মিরা ধীরে ধীরে একটু কাছে এগিয়ে এলো। কণ্ঠ আগের মতো কঠিনতা নেই, বরং নরম—

“আমি তো ভেবেছি… কেউ অচেনা… এভাবে আচমকা ধরলে… আমি কী করতাম বলুন?”

রায়ান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তারপর হালকা ঝুঁকে মিরার চোখের সমান হয়ে বলল—

“অচেনা মানুষকে সবাই এমনই ‘স্বাগত’ জানাও নাকি?”

কথার শেষে ঠোঁটের কোণে ব্যথা মিশ্রিত এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। মিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড দুজনেই চুপ।

চেহারায় কষ্টের ছাপ স্পষ্ট, কিন্তু চোখে সেই চেনা দুষ্টু ঝিলিকটা এখনও জ্বলজ্বল করছে। মিরা সারাক্ষণ বাচ্চা বাচ্চা করে রায়ানের মাথা খায় বলে রায়ান মিরাকে পরিস্থিতির গম্ভীরতা বুঝতে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো-

"পাখি আমার বাচ্চা গুলো মনে হয় আজ অক্কা পেল। তোমাকে মা হওয়ার সুখ আমার পক্ষে দেওয়া আর সম্ভব হবে না বোধহয়।"

মিরা বাচ্চার কথা উঠতেই খুব সিরিয়াস হয়ে গেল-

"একদম ফালতু কথা বলবেন না। মা হওয়ার সুখ দিতে পারবেন না মানে কি? বেডা মানুষ তো তাই বেশি বুঝেন একটু।"

মিরা রায়ান কে ঝারি দিয়ে রায়ান কে দ্রুত ঘরের ভেতর নিয়ে গিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল। হঠাৎ মিরা ধীরে হাত বাড়িয়ে রায়ানের হাতটা সরিয়ে দিল, যেখানে সে চেপে ধরে ছিল। খুব সাবধানে, যেন আবার ব্যথা না লাগে—

“দেখতে দিন… বেশি লেগেছে কিনা…”

তার স্পর্শে রায়ান একটু থমকে গেল। আগের দুষ্টুমি বা রাগ—সবকিছু মিলিয়ে যেন মুহূর্তটা নরম হয়ে এল। সে সাথে সাথে মিরার হাত ধরে ফেলে বলল-

"ওই..দেখতে দিব মানে কি? পাগল হয়ে গেছে নাকি? কোথায় হাত দিচ্ছো?"

মিরা রায়ানের কথায় পাত্তা দিল না। ওই ভাবেই তেড়া জবাব দিল-

"আমি দেখবো আমার বাচ্চা দের কি হয়েছে।"

রায়ান আটকানোর পরও মিরা রায়ানের বাঁধা না মেনে নিজের হাত অগ্রসর করলে রায়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার হাত দুটো চেপে ধরে তাকে বিছানায় ফেলে মিরার উপরে উঠে অস্থির গলায় বলল-

"ওই কি সমস্যা হ্যাঁ? উস্কানি দিচ্ছ কেন? আমি আমার বউয়ের বাপের বিছানায় তাকে সারা রাত কাদাতে চাই না। শুধু শুধু আমাকে আমার পিছনে লেগো না মিরা। আমি মোটেও ভালো মানুষ না তুমি ভালো করেই জানো।"

মিরা রায়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে রায়ানের মনে চলতে থাকা অবাধ্য ঝড়ের বেগ বুঝতে পারলো। একটু আমতা আমতা করেই বলল-

"এ..এতো রাতে কেন এসেছেন আপনি? সারাদিন তো আমার কথা মনে পড়ে নি?"

রায়ান আরো মিরার মুখের কাছে ঝুঁকে গিয়ে বলল-

"ভুললে তো মনে পড়বে। সারাটা দিন মাথায় চরকির মতো ঘুরেছ। পা ব্যাথা করে না তোমার? একটা কাজ করে শান্তি পাই নি আমি। বালের শশুর বাড়ি কোনো কাজেরই না। এখান থেকে নিয়ে গেছি কেন তোমাকে? আবার এখানে থাকতে পাঠাতে? আমি তোমাকে ছাড়া কতটা ছন্নছাড়া তুমি জানো না?"

মিরা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

"এমন পাগল হয়ে আছেন কেন? শান্ত হন। হাত ছাড়ুন লাগছে আমার।"

রায়ান এক নাগাড়ে বলে গেল-

"পড়ার জন্য একটা শার্ট পাচ্ছিলাম না, রুমাল হারিয়ে গেছে, ওয়ালেট নিতে ভুলে গেছি, শার্টের উপরের বোতাম লাগাতে ভুলে গেছি, টাই টাও ভালো করে বাঁধা হয়নি আজ। কতটা ইনফার্মাল লেগেছে আমাকে আজ অফিসে তোমার আইডিয়া আছে? সাল থেকে একটা চুমু খাইনি তোমাকে, মনে কোনো প্রফুল্ল তা নেই। আর তুমি পড়ে আছে শান্ত হওয়া নিয়ে।"

মিরার নিজের চোখের সামনে যেন রায়ানের সব ভোগান্তি কল্পনা করতে পারলো। রায়ান মিয়াকে চুপ দেখে মিরার চোয়ালে হাত রেখে নিজের মুখোমুখি করে বলল-

"এতো দূর এসেছি কি বউকে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখবো বলে? Eyes on me, heartbird.."

মিরা আর কিছু না বলে নিচে থেকেই রায়ান কে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল-

"I missed you.."

রায়ান ওমনি মোমের মতো গলে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে মিরার কপালে চুমু দিয়ে বিড়বিড় করলো-

"হাহ্! এই শেষ হয়ে গেল সব রাগ। কিভাবে পারে আমাকে শান্ত করতে এই বাচ্চা মেয়েটা?!"

মিরা মুখ উঁচিয়ে রায়ানের গালে চুমু দিল। রায়ান একটু ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল-

"ওখানে তো আর ব্যাথা দাও নি। যেখানে ব্যাথা দিয়েছ সেখানে দিলে যদি একটু কাজের কাজ কিছু হয় আর কি।"

মিরা প্রথম বুঝতে না পারলেও পরে রায়ানের কথার মানে বুঝতে পেরে জোরে মারলো রায়ানের কাঁধে আর বলল-

"চুপ অসভ্য। বেশ করেছি ব্যাথা দিয়েছি। আমাকে ভীষণ জ্বালায় ওটা।"

রায়ানের তেমন কোনো যায় এলো না। সে ভ্রু নাচিয়ে মিরার গলায় মুখ গুঁজে দিয়ে আদুরে গলায় আবদার করলো-

"Baby.... Can you get on your knees for me today? কথা দিচ্ছি আর কখনো এই আবদার করবো না I swear..!"

মিরা অশান্ত গলায় বলল-

"আপনার আবদার সম্পর্কে আমার ভালোই ধারণা আছে। চুপ করুন। আমি লজ্জায় শেষ হয়ে যাবো।"

রায়ান ও অস্থিরতা নিয়ে বলল- "তাহলে লজ্জা টুকু দাও।"

মিরা রায়ানের স্পর্শে শিহরণে কেঁপে উঠলো। এমন ঠোঁট কাটা কথায় মেয়েটার শ্বাস আঁটকে আসছে। রায়ান মিরার গলা থেকে মুখ তুলে মিরার চোখে মুখে স্নেহের পরশ এঁকে দিয়ে তার ঠোঁট দুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। তারপর সে বরাবরের মতো রায়ানের সাম্রাজ্যের রানী। মাঝ পথে মিরা নিজের চিৎকারে আর সামাল দিতে পারছিল না বলে রায়ানের কাছে আর্জি জানালো-

"রায়ান..প্লিজ একটু গতি সামলান। আহহ্..! কেউ শুনতে পাবে।আমি চিৎকার ধরে রাখতে পারছি না। উফফফ্..!"

রায়ান নিজের মাঝে নেই তখন। সেও আর নিজের উপর সামাল রাখতে পারছে না বলে মিরাকে চূড়ান্ত বাণী দিল-

"Not possible.. bite the pillow"

চলবে..

কোনো মতো লিখলাম। একটু সাড়া দাও পাখিরা। Love you pakhis ❤️ 🥰

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন