শত_ ডানার_ প্রজাপতি
#urme prema (sajiana monir )
পার্ট :৪৫
হোটেলের পুল সাইডে টেবিলে বসে আছি । অগ্নি রিসেপশনিস্ট এর সাথে কথা বলছে ।ভাইয়াও অগ্নির সাথে । কিছুক্ষণ পর ঢাকার উদ্দেশ্য রওনা হবো । তানিন পুলের সামনে খেলছে । ভাবী আমার সাথে বসে আছে । ভাবী আমার গালে হাত রেখে বলে,
- "আজ তোমার চেহারায় এক অন্যরকম খুশি দেখতে পারছি। চেহারার সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে । এতোটা দিন এই রুপ এই হাসি কোথায় ছিলো শুনি ? "
- "ভাবী এই হাসির কারণ যে অগ্নি । আমার রুপ সুখ খুশি সবকিছু যে অগ্নিকে ঘিরে । ভাবী তুমি ঠিক বলেছিলে আমার অগ্নির কথা শুনার দরকার ছিলো !
যদি তখন অগ্নিকে একটা সুযোগ দিতাম তাহলে কোনো ভুল বোঝাবুঝি হতো না । না আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব আসতো !
ভালোবাসার প্রথম ধাপ বিশ্বাস ! যা আমি কিছু সময়ের জন্য ভুলে গিয়েছিলাম । কিন্তু এখন বুঝতে পারছি আমার ভুল। কোনো দিন অগ্নির আর আমার মাঝে ভুল বুঝাবুঝি হতে দিবো না । "
ভাবী আমার গাল টেনে দিয়ে বললো,
- "বুঝলে ননদী অগ্নি তোমাকে অনেক চায় ।তোমাকে খুব ভালোবাসে । এতোটা হয়তো কেউ কাউকে ভালোবাসে না । প্রথম যখন অগ্নি তোমার ভাইয়াকে ফোন করে তোমার সাথে কথা বলতে চায় । তোমার ভাইয়া মুখের উপর সাফ মানা করে দেয় । আমাদের ও ভুল ধারনা ছিলো অগ্নির সম্পর্কে কিন্তু পরে অগ্নির পাগলামো তে রাজী হয়েছি দুজন ।যা পাগলামো করেছে আল্লাহ্ !
পারছিলো না তোমাকে উড়ে এসে নিয়ে যেতে । "
- "কিন্তু ভাবী অগ্নি কি করে জানলো আমি এখানে সিলেটে আছি ! "
- "তোমার মনে আছে সেদিন তোমার ভাই যখন মিটিং করছিলো ? "
- "হ্যা ভাবী "
- "সেখানে অগ্নির কম্পানির লোক ছিলো । অগ্নির সাথে আমাদের নতুন প্রজেক্ট শুরু করছে । আর অগ্নির ইমপ্লই ছিলো যে অগ্নিকে তোমার এখানে থাকার খবর দেয় । অগ্নি সেই রাতেই আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। তোমার জিদ সম্পর্কে আমাদের ধারনা আছে । যদি তুমি এসব শুনে এখান থেকে চলে যাও তাই আমি আর তোমার ভাইয়া ডিসাইড করি তোমাকে আর অগ্নিকে সামনা সামনি দেখা করাই তাহলে হয়তো সব ঠিক হবে ।তাই জোর করে তোমাকে বৈশাখী মেলায় তোমাকে দিয়ে যাই ! "
- "ও তাই তো বলি ,সেদিন লোকটাকে এমন চেনাচেনা লাগছে কেন !
অগ্নির অফিসে দেখেছি মনে করতে পারিনি । "
- "যাই বলো হুর ,অগ্নি কিন্তু তোমাকে খুব ভালোবাসে একদম পাগলের মত !
দোয়া করি তোমাদের সংসার সুখের হোক । আমরা যেন বছর বছর গুড নিউজ পাই "
আমি লজ্জায় মাথা নামিয়ে হেসে বলি,
- "ওহহ! ভাবী তুমিও না শুধু লজ্জা দেও । "
- " আহারে ! আমার লজ্জাবতী লাজুকলতা । "
অগ্নি আসতেই ভাইয়া আর ভাবী কে বিদায় জানাই । আসার সময় তানিন খুব কান্না করেছে । ভাবীও অনেক আবেগী হয়ে পড়েছিলেন । এতো দিন একসাথে থেকে ছেড়ে আসতে কষ্ট হচ্ছিলো । কিন্তু অগ্নির বুকের গভীরতা সব কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে ।
__________________________
মানুষ পৃথিবীর যেকোনো স্থানেই থাকুক না কেন ! নিজের বাড়ির মত শান্তির স্থান কোথাও নেই । আজ এতোদিন পর নিজের বাড়ি ফিরে খুব শান্তি লাগছে বড় এক শ্বাস ছেড়ে বিছানায় হেলান দিয়ে চোখ বুঝে থাকলাম । ফিরার সাথে সাথেই হিয়া আপু ,মামা ,মামীর কাছে অনেক জবাব দিতে হয়েছে । সবাই প্রথমে খুব রেগে ছিলেন । কিন্তু পরবর্তীতে সবাই ক্ষমা করে দিয়েছে । এ কয়েক দিনে রুমের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে । কিছুকিছু ফার্নিচার নতুন আনা হয়েছে । আমি চোখ খুলে তাকাই । আশেপাশে সবকিছুতে চোখ বুলিয়ে দেখছি । পুরো রুম জুড়ে আমার ছবি । নিশ্চয় অগ্নি এসব করেছে । এতোটা ভালো কেউ কি করে কাউকে বাসতে পারে ?
কিছুক্ষণের মাঝে অগ্নি রুমে আসে । সোজা ফ্রেশ হতে চলে যায় । খানিক পর অগ্নি হাতে তয়াল নিয়ে বেরিয়ে আসে ।
অগ্নিকে দেখে আমি বিছানা থেকে উঠে পরিপাটি হয়ে বসি ।অগ্নি দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারছিনা । কেমন জানো লজ্জা লজ্জা লাগছে। হয়তো এতোদিনের দূরত্বের কারণে এই লজ্জার সৃষ্টি । আড়চোখে অগ্নির দিকে তাকিয়ে দেখি অগ্নি আমার দিকে এগিয়ে আসছে ।অগ্নি আমার সামনা সামনি বসে আমার দিকে উনার নিখুঁত চাহনি নিক্ষেপ করছে আমি ঢোক গিলে আবার বাঁকা চোখে অগ্নির দিকে তাকাই । অগ্নি একপাশ হেসে আমার গালে হাত ছুঁয়িয়ে বলে ,
- " এতো লজ্জা ? লজ্জায় লাল হওয়ায় তোমাকে যে আরো সুন্দর লাগছে তা কি জানো !
আমি যে কন্টোললেস হয়ে যাচ্ছি তুমি বুঝতে পারছো কি ? "
অগ্নির কথায় লজ্জায় মাথা নিচু করে এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছি । এই লোক লজ্জা দেওয়ার কোনো সুযোগ হাত ছাড়া করে না। বদ লোক !
অগ্নি আমার কাছে এসে আমার ঘাড়ের একপাশ থেকে চুল সরিয়ে সেখানে নিজের থুতনি ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে আমার গাঁয়ের সুবাশ নিজের ভেতরে টেনে নিচ্ছে । আমি কাঁপাকাঁপা হাত পা নিয়ে চোখ বুঝে নিজের কাঁপুনি শান্ত করার চেষ্টা করছি । হ্ঠাৎ অগ্নি মাতাল স্বরে কানে আসে ,
- "এতোটা দিন তোমার গাঁয়ের এই মিষ্টি সুবাস খুব মিস করেছি । তোমার ছবি দেখে এতোটা দিন কাটিয়েছি । তোমার সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করতো
। শক্ত জড়িয়ে ধরে নিজের সাথে মিশিয়ে রাখতে ইচ্ছে করতো ।কিন্তু তুমি আমার কাছে ছিলেননা । আর কোনো দিন আমাকে ছেড়ে যাবেনা । তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারবোনা । এই হুরহীন অগ্নি মরে যাবে ! "
আমি দুহাতে অগ্নিকে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরি । অগ্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে কম্পিত আওয়াজে বলি,
- "এই হুর ও যে অগ্নিহীন প্রানহীন । ওয়াদা করছি কোনো দিন আপনার থেকে দূরে যাবো না । আপনার পরীজান তার অরন্যের মাঝে সারাজীবন বিলিন থাকবে ।ভালোবাসি ,খুব বেশি ভালোবাসি ! "
অগ্নি ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে কপালে গভির করে ঠোঁট ছোঁয়ায় ।
সন্ধ্যায় বাড়িতে নিশিত উৎস ভাইয়া ,শেফা ,তানভীর ভাইয়া আসে । আজ রাতটা তারা এখানেই থাকবে ।মানা মামী কিছুক্ষণ পূর্বেই বেরিয়েছে ।আজ সবাইকে এক সাথে দেখে খুব শান্তি লাগছে । এতোদিন যেন নিজেকে কোনো জেলখানায় বন্ধী করে রেখেছিলাম । আজ মন খুলে হাসতে পারছি । কাছের মানুষ গুলোর কেয়ার ভালোবাসা সবকিছু থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছিলাম ।
রাতের দিকে ছাদে আড্ডা বসেছে । অগ্নি আবির ভাইয়া উৎস ভাইয়া একপাশে অন্যপাশে আমি নিশিত হিয়া আপু । নিশিত কথার মাঝে মজার ছলে বলে,
- "ও মাই গড ভাবী ! তুমি হুট করে কিভাবে গায়েব হয়ে গেলে । আর ফিরার পর এতো বড় সারপ্রাইজ পাবো কল্পনাও করতে পারিনি । "
- "কেন খুশি হওনি ফুফি হবে ! "
- " অফকোর্স ভাবী ! খুশি মানে ? আমি তো মহা খুশি ।
বাড়িতে নতুন সদস্য আসছে । হিয়া ভাবী আমাদের রাজপুত্র দিয়েছে । তুমি একটা রাজকন্যা দিবে !"
বলেই বাবুর কপালে চুমু দেয় ।নিশিতের কথায় হেসে উত্তর দেই ,
- " বাহ্ ! কি ডিমান্ড ,কিন্তু আমার যে একটা রাজপুত্রই চাই একদম তার বাবার মত । "
হিয়া আপু বড় বড় চোখ করে হেসে বললেন ,
- "না বোন বাবার মত হওয়ার দোয়া করিস না । বাবার যা রাগ জিদ যদি ছেলেও এমন হয় তাহলে তুই তো শেষ হুর । ফিনিশ ! "
আমি হিয়া আপুর কথায় অবাক হয়ে বলি,
- "ও মা আপু তুমি দেখি আজ তোমার দেবরের সাইড না নিয়ে উল্টো দেবরের বদনাম করছো । তোমার শরীর- টরীর ঠিক আছে তো ? "
শেফা বলে উঠে ,
- "করবে না তো কি করবে ! অগ্নি ভাইয়া যা করেছে এই দুমাস মাই গড আমি এমন বউ পাগল কোনো দিন দেখিনি । সারাদিন পর যখন তোকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতো সব ভাঙচুর করতো । কতবার হসপিটালে ভর্তি হয়েছে । সত্যি অগ্নি ভাইয়া তকে পাগলের মত ভালোবাসে । তুই যা করেছিস একদম ঠিক করিসনি "
- " তুই তো সব জানিস সুপ্তি যা করেছে সবকিছুর পর আমার ঠিক থাকতে পারিনি । আর বোকামির বসে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি । কিন্তু আমার শিক্ষা হয়ে গেছে আর কোনো দিন এমন কিছু করবো না । "
নিশিত পরিস্থিতি এমন থমথমে হতে দেখে আওয়াজ করে বলে উঠে ,
- "ভাবী এসব ছাড়ো । এটা বলো তুমি এমন বোকামি কি করে করতে পারো ? তোমার প্রেগন্যান্সির তিন মাস চলা কালিন সময় তুমি প্রেগন্যান্সি চেকআপ করিয়েছো ! সিরিয়াসলি ? তুমি এই যুগের মেয়ে তো নাকি টাইম মেশিন দিয়ে আদিম যুগ থেকে এসেছো ? এখনকার মেয়েরা ছয় সাপ্তাহ চলা কালেই বুঝতে পারে তাড়া প্রেগন্যান্ট কিনা । চেকআপ করায় । ফুপি মারা যাওয়ার পর তোমার লক্ষন দেখে আঁচ করতে পেরেছিলাম তুমি প্রেগন্যান্ট । তোমাকে চেকআপ করাতে বলেছিলাম । কিন্তু তুমি কি করলে ? খামখেয়ালি ! "
ঠোঁট উল্টিয়ে বললাম,
- "ইয়ার ,এভাবে লজ্জা দিও না । আমি সত্যি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । আর ঐ কয়েক মাসের এতো তোড়জোড়ে মাঝে বিষয়টা মাথা থেকে একদম চলে গিয়েছিলো । "
- " এখন তুমি আর বেবি ঠিক আছো তো ? "
আমি নিশিতের কথায় শুকনো ঢোক গিলে উত্তর দেই ,
- "হুম ,একদম ! ঠিক আছি । "
এমন সময়ই অগ্নি আওয়াজ কানে ভেসে আসে । পিছনে তাকিয়ে দেখি প্লেট ভরা ফ্রুট নিয়ে একগাল হেসে দাড়িয়ে আছে । ইসস! কি সুন্দর হাসি । আমার ঠোঁট একাই প্রসারিত হয়ে যায় । অগ্নি ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বললেন ,
- "গার্ল'স কি নিয়ে কথা হচ্ছিলো ? "
নিশিত অগ্নির কথায় হেসে জবাব দেয়,
- " তোমার বউয়ের বোকামি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো "
অগ্নি আমার দিকে চোখ রেখে বলে,
- " আমার বাচ্চা বউ একটু আকটু বোকামি করে তা আমি জানি । কিন্তু এখন আবার কি বোকামি করেছে ! "
- "এখন না আগেকারই ,তোমা,,,,
নিশিত কিছু বলতে নিলে আমি মুখ চেপে ধরি।নিশ্চিত আগের কথা বলবে।ভাই বোন সব লাগামহীন । শুধু আমায় লজ্জায় ফেলার সুযোগ খুঁজে । ইয়া আল্লাহ্ ! তুমি এদের সুবুদ্ধি দান করো ।
অগ্নি আমার লজ্জা মাখা মুখ দেখে হেসে আমার পাশে এসে বসে । আমার সামনে ফ্রুটসের প্লেট রেখে বললো,
- "বিকেলে নাস্তাটা কমপ্লিট করোনি । যা খেয়েছিলে সব বমি করে ফেলেছো । সব গুলো শেষ চাই । "
কাঁদো কাঁদো চেহারা করে বললাম,
- "আয়ায়ায়া! কেমন অত্যাচার ? "
অগ্নি আমার কপালে চুমু দিয়ে বললেন ,
- "তোমার হেলথের জন্য খেতে হবে । সবটা যেন শেষ হয় । "
আমি মুখ ফুলিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখি হিয়া আপু ,নিশিত ,শেফা নিচের দিকে তাকিয়ে হাসছে । আমি লজ্জায় শেষ । এই লোকটা আমাকে লজ্জায়ই মারবে । এমন কেন উনি ? একদম বেপরোয়া !
উনার ভালোবাসার কোনো তুলনা হয় না! অগ্নির ভালোবাসা সীমাহীন অফুরন্ত বেপরোয়া ।
চলবে ...❤️
প্লিজ সবাই সবার মতামত জানাবেন । ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊।