ফন্ট সাইজ:
থিম:
শত ডানার প্রজাপতি

৪৬তম পর্ব

লেখক: উর্মি প্রেমা

শত_ ডানার_ প্রজাপতি

#urme prema (sajiana monir )

পার্ট :৪৬

সাদার তুষারে ডাকা এক পাহাড়ে দাড়িয়ে আছি । সবকিছু সাদা । যেন প্রকৃতির বাহারি রঙের উপর কেউ সাদারঙ ডেলে দিয়েছে । আসমান থেকে তুষার বৃষ্টি ঝোড়ছে । সাদা রঙে প্রকৃতির যেন অদ্ভুত সৌন্দর্যময় রূপ ধারণ করেছে । আমার চোখের ঠিক সামনেই অগ্নি দাড়িয়ে আছে । তার কোলে এক ফুটফুটে বাচ্চা ।বাচ্চাটার চোখ জোড়া খুব গভীর । আলোর মত ঝলমল করছে । অগ্নির পড়নে কালো কাপড় আর চোখে অশ্রুর বিন্দু । আমি মুচকি হেসে অগ্নির দিকে দু'কদন বাড়াতেই ।প্রকৃতি এক ভয়ংকর রূপ ধারন করে । হঠাৎ ই চারদিকে কালো অন্ধকারে ডেকে যায় । শোকের ছায়া নেমে আসে । আমি আপ্রাণ চেষ্টা করছি অগ্নির দিকে যাওয়ার কিন্তু কোনো ভাবে তার কাছে পৌছাতে পারছিনা । পিছন থেকে কেউ যেন আমার হাত ধরে রেখেছে ।আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মা দাড়িয়ে আছে । আমাকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে । আমি ছাড়ানোর হাজার চেষ্টা করছি কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না । আমাকে টেনে ছেঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে । আমি অনেক কান্নাকাটি করছি কিন্তু আমার কোনো কথাই মা কানে নিচ্ছে না । আমাকে একদম পাহাড়ের কিনারায় নিয়ে আসে । নিজের সাথে নিয়ে ঝাপ দেয় । আমি অগ্নি বলে সজোরে চিৎকার করি ।

আমি চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে কান্না করছি ।অগ্নির গলার স্বর কানে আসতেই আমি চোখ খুলে তাকাই । অন্ধকারে হাল্কা ড্রিম লাইটের আলোতে অগ্নির ভয়ার্ত চেহারা দেখা যাচ্ছে আমি হুট করে অগ্নিকে জড়িয়ে ধরে আবার কান্না করে দেই । একসময় হিচকি উঠে যায় । আমি ধীরেধীরে অগ্নির বুকের সাথে মিশে যাচ্ছি । প্রচন্ড ভয় করছে । অগ্নির বুকে ভিতর আশ্রয় নিলে হয়তো এই ভয় নিবারণ হতো । অগ্নি আমার পিঠে হাত বুলিয়ে আমাকে শান্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু কোনো ভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছি না । অগ্নি আমার কাঁধে বেশ কয়েকটা চুমু দিয়ে । চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে ,

- "কি হয়েছে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখেছো ? "

আমি অগ্নিকে জড়িয়ে ধরেই 'হ্যা 'বোধক মাথা নাড়াই । অগ্নি আমাকে ছাড়িয়ে বেডের পাশে বেড বক্র থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে দেয় । আমি এক ডোকে পুরোটা পানি শেষ করি । অগ্নি আমার চোখে জল মুছে দিয়ে । বললো,

- "চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেও । "

আমি অগ্নির দিকে একদৃষ্টি তে তাকিয়ে আছি । অগ্নি আবার বললো ,

- "নেও না "

আমি চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নেই । চোখে খুলে অগ্নির দিকে ভীতু চোখে তাকাতেই অগ্নি আমার কাছে আমার কপালে বেশ কিছু চুমু এঁকে দেয় । আমি বন্ধ চোখে অগ্নির প্রত্যেকটা স্পর্শ অনুভব করি । অগ্নি আমার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে নাকে নাক ঘোষতে ঘোষতে বলে ,

- "কিছু হবে না । আমি তোমার সাথে আছি তো ! তোমার কিছু হতে দিবোনা । সর্বদা তোমার সাথে থাকবো । নিজের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত আমার সবটা দিয়ে তোমার হেফাযত করবো । "

আমি অগ্নির বুকে মাথা রাখি । অগ্নি বালিশে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে । আলতো হাতে আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে । আমি অন্যমনস্ক হয়ে আছি । অগ্নির টিশার্টের কিছুটা অংশ খুব শক্ত করে নিজের মুঠোয় ধরে আছি । যেন মুঠো হাল্কা হলেই আমি অগ্নির থেকে দূরে চলে যাবো ।অগ্নি কিছুক্ষণ পর পর আমার মাথায় নিজের ঠোঁট ছোঁয়াচ্ছে ।

সে রাতে আর ঘুম হয় না । অগ্নিও আমার সাথে সারাটা রাত জাগে । ফজরের আজানে বিছানা ছেড়ে উঠে নামাজ আদায় করেনি ।

বারান্দার রেলিং ধরে দাড়াই । এখনো ভোরের আলো ফুটেনি চারদিকে এখনো আবছা অন্ধকারে মোড়ানো । আমি উদাসীন দৃষ্টিতে বিশাল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।সূর্য কি সুন্দর করে রাতের আঁধার কাটিয়ে নতুন দিনের সূচনা করছে । কিন্তু আমার জীবন ? আমার জীবনে কি নতুন দিনের সূচনা হবে !

নাকি সোনালি দিনের সূচনার আগেই জীবন কালো মেঘে ছেয়ে যাবে ?

সেই ভয়ংকর স্বপ্নের অর্থ কি ছিলো ? কেন দেখেছি অগ্নি আমাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছে !

এতোদিন পর আমার জীবনে সব ঠিক হচ্ছে নতুন করে সব শুরু হচ্ছে । সবেমাত্র সুখের ছোঁয়া লেগেছে । তবে কি এই সুখই জীবনের শেষ সুখ ? এখানেই সমাপ্তি হবে !

ভয় ,অনিশ্চয়তায় বুক ভার হয়ে আছে ।

অগ্নির স্পর্শে আমার ধ্যান ভাঙে । অগ্নি পিছন থেকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিয়েছে । কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ,

- "কি ভাবছো? "

- "রাতের সেই ভয়ংকর স্বপ্নের নিয়ে । এর অর্থ কি ছিলো ! "

- "কি এমন স্বপ্ন , যা আমার পরীজানকে এতোটা বিরক্ত করছে ? "

- "দেখেছি আমরা এক মনোমুগ্ধকর অপরূপ সুন্দর পাহাড়ের উপর আছি । আপনার কোলে একটা নুরের মত ছোট্ট শিশু আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে । "

- "এতে ভয় পাবার কি আছে । এটা তো ভালো স্বপ্ন । "

- "এখানেই শেষ না ! তারপর হঠাৎ চারদিক কালো হয়ে গেলো । আপনার চোখে অশ্রু । মা আমাকে টেনে উনার সাথে নিয়ে পাহাড়ের কিনারায় যাচ্ছে । তারপর ,তার,,,পর

আমাকে নিয়ে হুট করে পাহাড় থেকে ঝাপ দেয় । "

আমার কথা শেষ হতেই অগ্নি আমাকে তার দিকে ফিরায় । তখনো আমার হাত পা ভয়ে কাঁপছে । চোখে জল ভিড় করছে ।

অগ্নি আমার দু গালে আলতো করে হাত রেখে বললো,

- "পরীজান ,শান্ত হও! এটা শুধুমাত্র একটা খারাপ স্বপ্ন । আমরা সারাদিন যা নিয়ে ভাবি তা আমাদের মন আর মস্তিষ্ককে স্টোরি ক্রিয়েট করে । যা বিশ্রামের সময় আমাদের মস্তিষ্ক দেখায়। এটা খারাপ স্বপ্ন যার সাথে আমাদের জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই । এসব নিয়ে চিন্তা করে মন খারাপ করো না । তোমার এখন হাসিখুশি থাকার সময় । সবসময় হাসিখুশি থাকবে কেমন ? "

আমি পলক ঝাপটে হ্যা বোধক ইশারা করি । অগ্নি আমাকে আমার নিজের বুকে জড়িয়ে নেয় । আমি মুচকি হেসে অগ্নির বুকের বাঁ পাশে হাত রাখি । অগ্নি আমার কানের পিছনে চুল গুজে দিয়ে বললো ,

- "ভিতরে চলো । নাস্তা রেডি করে নেও ! "

আমি মাথা তুলে অগ্নির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বলি ,

- "এখনো তো সবাই ঘুমে । এতো সকালে নাস্তা তৈরি করলো কে ? চম্পা ? "

- " কেন মেম আমাকে কি চোখে পরে না ? "

আমি বিষম খেয়ে বলি,

- "আপনি নাস্তা রেডি করেছেন? আপনি ? "

- "ইয়েস! পরীজান । "

- "অগ্নি আপনি কি পাগল ! শুধু শুধু কষ্ট করে এসব করেছেন । এখনো তো নাস্তার টাইম হয়নি আর আমার খুদা লাগেনি । "

- "তুমি ডিস্টার্ব ছিলে ,সারারাত জেগেছো ঘুমাও নি । তাই ভাবলাম আমার পরীজানকে ছোট একটা সার্প্রাইজ দেওয়া যাক । এতে যদি আমার পরীজানের মন সামান্য ভালো হয়! "

- "অগ্নি আপনি সত্যি পাগল "

- "হুম ,আর তা শুধু তোমার জন্য । এখন ভিতরে চলো নাস্তা করে নেও । "

আমি ভিতরে যেতেই হা করে তাকিয়ে থাকি । অগ্নি খুব সুন্দর করে ব্রেকফাস্ট সাজিয়েছে । একটা প্লেটে দুইটা চিকেন সেন্ডুইচ পাশেই টমেটো কেচাপ দিয়ে স্মাইলি ইমোজি ড্র করা । দুইটা জগ একটায় অরেঞ্জ জুস অন্যটায় গ্রেপ । একটা প্লেটে ফ্রুডস কাটা । বয়েল এগ। মাঝে ফুলদানি তে তাজা গোলাপ ফুল । এখনি হয়তো বাগান থেকে ছিড়ে এনেছে । সবকিছু পরিপাটি সুন্দর করে সাজানো ।আমি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছি । এই মানুষ টা এমন কেন ? উনার সবকিছু এতো সুন্দর পরিপাটি । আর উনার ভালোবাসা তো লাজবাব !

অগ্নি আমার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে অপরাধীর ভঙ্গি তে বললো ,

- "সরি,আসলে বেশি কিছু করতে পারিনি ।

তোমার পছন্দ হয়েছে কি ? "

আমি আচমকা অগ্নিকে জড়িয়ে ধরে তার গালে কয়েকটা চুমু খেয়ে নেই । অগ্নি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে । আমি অতি আনন্দের স্বরে বলি ,

- "অগ্নি আমার খুব খুব খুব পছন্দ হয়েছে । আপনি এতো সুন্দর সার্প্রাইজ দিয়ে আমার দিনটা স্পেশাল করে দিয়েছেন । "

- "তো এবার ব্রেকফাস্ট করে নেও । আমরা মর্নিং ওয়াকে যাবো । "

- "মর্নিং ওয়াক ?"

- "হুম এখন থেকে প্রতিদিন দুজন একসাথে মনিং ওয়াকে যাবো । তোমার আর বেবির জন্য খুব উপকারী । "

আমি উত্তরে মুচকি হাসি । অগ্নি আর আমি একসাথে নাস্তা করে মনিং ওয়াকের জন্য রেডি হই । জুতার ফিতা বাঁধতে গিয়ে পরি মুশকিলে । কোনো ভাবেই নিচু হয়ে জুতার ফিতা বাঁধতে পারছিনা । পেটে চাপ পড়ছে । ব্যর্থ হয়ে হাল ছেড়ে দেই । মন খারাপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকি । এমন সময়ই পায়ে কারো স্পর্শ পাই । তাকিয়ে দেখি অগ্নি । আমার পায়ে ধরতেই আমি পা সরিয়ে নিয়ে বলি,

- "কি করছেন ! পায়ে ধরছেন কেন ? স্বামীদের স্ত্রীর পায়ে ধরতে নেই । "

অগ্নি আমার কথা কানে না নিয়ে নিজের মন মত কাজ করে যাচ্ছে । আমার পায়ে জুতা পড়িয়ে ফিতা বেঁধে দেয় । আমার চোখে চোখ রেখে বলে ,

- "স্ত্রী সবরকম সুবিধা অসুবিধার দিকে লক্ষ করা স্বামী দায়িত্ব । আর আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি ।

সারাজীবন তোমার দাস হয়ে থাকতেও রাজী আমার সুন্দরী ।"

কথা শেষ করে আমার দুহাতে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করে আমি খুশিতে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছি । এতো ভালোবাসা পেয়ে নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সৌভাগ্যবতী স্ত্রী মনে হচ্ছে ।অগ্নির এই অন্তহীন ভালোবাসা আমাকে পাগল করে দেয় । কে বলেছে স্বর্গ দূর ? আমার জন্য তো স্বর্গ এই দুনিয়াতেই । আমার অগ্নির মাঝেই আমার স্বর্গ । যদি পৃথিবীর প্রতিটা পুরুষ তার স্ত্রী কে এভাবে ভালোবাসতো ,তাহলে হয়তো প্রতিটা স্ত্রীর জন্য এই দুনিয়াটা স্বর্গ হতো !

চলবে ...❤️

প্লিজ সবাই সবাই মতামত জানাবেন । ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন 😊😊😊।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন