#অন্তরমোহ
#পর্বসংখ্যা২
#সুহাসিনি_মিমি
"ভাই, আপনার শালারা আসছে। আসো আসো ছোট মিয়া, বড় মিয়া-এদিকে, এদিকটায় এসে বসো!"
সারাদিন কাজিনদের সঙ্গে গ্রাম ঘুরে ঘুরে পাড় করলেও সন্ধ্যা হতেই এখানে ভর করে মধ্যরাতের নীরবতা। সেই নীরবতা কাটাতেই তৃতীয় দিনের মাথায় কাজিনদের সঙ্গে মিলে গ্রামের বাজারের ক্লাবঘরে এসেছে মিনহাজ। বলা চলে ওকে একপ্রকার জোড় করেই নিয়ে এসেছে ওর সমবয়সী কাজিনরা। গ্রামের ছেলেদের আড্ডার জায়গা—এই ক্লাবঘর। রাত হলেই এখানে কেরাম বোর্ড ঘিরে জমে ওঠে তুমুল সেই আড্ডা। সেই সূত্রেই কাজিনরা জোর করেই মিনহাজকে নিয়ে এসেছে। তবে ক্লাবঘরে ঢুকতেই যে হঠাৎ এমন একটা কথার সম্মুখীন হতে হবে খুনাক্ষরেও ভাবতে পারেনি কেউ-ই। মিনহাজের মনে হলো, এটা বুঝি ভীষণ বাজে কোনো রসিকতা। এরকম রসিকতা মনে ধরল না তার। প্রথমে বিষয়টাকে হাসি-ঠাট্টা ভেবেই উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল মিনহাজ। কিন্তু যখন ছেলেগুলো আবারও একই ধারায় বলে উঠল,
“আরে পারভেজ! তোর ভাইরে নিয়ে এখানে এসে বস। ঐখানে বসছিস কেন ব্যাটা? সম্পর্কটা তো আমাদের আত্মীয়তায় পরবর্তন হতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই। ভীরের শালা হলে আমাদেরও তো আত্মীয়ের মধ্যেই পড়ে, তাই না?”
পারভেজ বোকার মতো মাথা চুলকে বলল,
“ঠিক বুঝলাম না ভাই, কার শালা? কী বলতাসেন?”
“কার আবার? আমাদের ভীরের! তোদের তো ভাই চান কপাল। আমাদের ভীর শেষমেশ একটা মেয়েকে পছন্দ করছে। শহর থেকে যে মেয়েটা আসছে—ওইটা তো তোদের বোন, তাই না? সেই হিসেবে ওর সঙ্গে বিয়ে হলে তো আমাদের ভাবিই হবে। আর তোরা হবি ভীরের শালা!”
চারপাশে হাসির রোল পড়ে গেল একচোট। ক্লাবে উপস্থিত বলতে আপাতত আনভীরের খুব কাছের কয়েকজন ফ্রেন্ড আর ছোট ভাই ব্রাদার। অন্যদিকে মিনহাজ, পারভেজ আর ওদের ছোট দুটো ভাই।এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এই জায়গায় এসে নিজেকে দমাতে পারল না মিনহাজ। কথাটা যখন নিজের আদরের বোনকে ঘিরে উঠল তখনি তেলে বেগুনে ছেৎ করে জ্বলে উঠল সে,
“এইসব কী ধরনের ফাইজলামি? ইয়ার্কি পাইছেন? মুখে যা আসছে তাই বলছেন? আমার বোনকে কী অন্যসব গ্রামের মেয়েদের মতো ভেবেছেন? আমার বোনকে আমি কেন যে-সে ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেব?”
কথাগুলো বলেই মিনহাজ চারপাশে তাকাল।
প্রথমে বুঝতে পারেনি “ভির” বলতে কাকে বোঝানো হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখ গিয়ে আটকাল ক্লাবঘরের একপাশে। সেখানে একটা চেয়ার হেলান দিয়ে বসে আছে কেউ একজন। কেরাম বোর্ডের ওপর দুই পা তুলে, মাথা চেয়ারের পেছনে ঠেকিয়ে, মনের আয়েশে সিগারেট টানছে সে ব্যক্তিমানব। আশেপাশে কি কথা হচ্ছে, কি নিয়ে দ্বন্দ্ববিদন্ড চলছে তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রূক্ষেপটুকু ও নেই পর্যন্ত।
ভাবখানা এমন যেন এই জায়গার মালিক সে-ই। মিনহাজ জানেনা আনভীরের পরিচয় সম্পর্কে। দুদিন তো হলো সে এসেছে। জানবে কি করে? মিনহাজ যতটুকু বুঝল একেই ভীর বলে সম্মোহিত করছে সকলে। কৌতূহলি চোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল ছেলেটাকে। দেখতে—একেবারে গুন্ডা টাইপ, বখাটে, উশৃঙ্গখলই মনে হয়। চলন-বলন, বসার ভঙ্গি—সবকিছুতেই গুন্ডা গুন্ডা একটা ভাইব আসে। এই পর্যায়ে মিনহাজের মাথা গরম হয়ে গেল আরও।ওদিকে আনভীরের বন্ধুবান্ধব তখন তাজ্জববনে। এই ছেলে বলছেটা কি? ভয়ে ভয়ে একবার মাথা কাত করে চাইলো চেয়ারে নির্লিপ্ত গাঁ এলিয়ে বসে থাকা আনভীরের উপর। বিশেষ হেলদুল লক্ষ্য করল না তেমন। এপর্যায়ে ভারী অবাকই হলো একেকজন। রাজন মিনহাজ কে সংশোধন করে জবাব দিলো তখন,
"এইযে ছোট ভাই! মুখ সামলাইয়া কথা বলো। আমাদের ভীরের সম্পর্কে জেনে কথা বলছো তো? নাকি না জেনেই বায়ম মাছের মত লাফাইতাসো?"
"মুখ সামলানানোর দরকার তো আপনাদের। মুখে যা আসছে বলে যাচ্ছেন। আমার কাউকে চিনার দরকার নেই। আমার বোনকে আমি প্রয়োজনে নদীতে কেটে ফেলে দিলেও তো এমন ছেলেদের সঙ্গে বিয়ে দিবোনা!"
এতক্ষনে চেয়ারে হেলান দিয়ে থাকা ব্যক্তিটা খানিকটা নড়েচড়ে উঠল। বন্ধ করে রাখা দূ চোখের পাতা মেলল টানটান করে। হাতে থাকা সিগরেটের শেষ অংশটুকু এক টানে শেষ করে পায়ের নিচে ফেলে মাড়িয়ে দিল সেটার শেষ স্তুপ। সোজা হয়ে বসল সে। চোখদুটো সোজা গিয়ে ঠেকল মিনহাজের ওপর।আগাগোড়া সময় নিয়েই দেখে আকস্মিক টেনে টেনে বলে উঠল,
“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই ‘যেমন-তেমন ছেলে’?”
ঘাবড়ালো না মিনহাজ। আর নাতো পিছু পা হলো। বরংচ উল্টো আরও একধাপ এগিয়ে কণ্ঠে আক্রোশ ঢেলে বলল,
“মানে বুঝতে পারছেন না? আপনাকেই বলছি। এসব কেমন ধরনের ইয়ার্কি? আপনাদের গ্রামে এসেছি দেখে কি মাথা কিনে নিয়েছেন নাকি?যা ইচ্ছা বলেই যাচ্ছে আপনাদের দলবল?ওদের মুখে লাগাম টানতে বলুন। আমার বোনকে ঘিরে একটাও বাজে কথা শুনলে আমি একেকটার খবর করে ছাড়বো বলে দিলাম!"
অধিক বিস্ময়ে চারপাশে থাকা ছেলেগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।পরিস্থিতি যে খারাপের দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে কারও বাকি নেই।আনভীরের মাথা গরম। এমনিতেও জনদরদী হলেও ওকে কটাক্ষ করে কথা বলাতে এখুনি রেগে যাবে নির্ঘাত। শেষে না আবার উল্টাপাল্টা কান্ড ঘটিয়ে ফেলে। ঠিক এই ভয়টাই পাচ্ছে মিনহাজের কাজিনরাও।আনভীর এবার খানিকটা কৌতূহলী দৃষ্টিতে মিনহাজকে দেখল। মাথা কাত করে, ঠোঁটের কোণে সুক্ষ হাসির রেশ টেনে বলল,
“কেন? তোমার বোনকে কি তোমরা আলাদা স্বর্ণ-মুক্তা দিয়ে বানিয়েছ নাকি? যে অন্য সব মেয়েদের থেকে এতটা স্পেশাল সে?”
কথাটা শেষ হতেই পাশে থাকা ছেলেগুলোর মধ্যে চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করল মিনহাজ। উপস্থিত কেউ কেউ তো আবার ঠোঁট টিপে মুচকি হাসছেও।ওদিকে মিনহাজের সঙ্গে থাকা কাজিনরা আতঙ্কে রীতিমতো
ঘাবড়ে আছে। পেছন থেকে মিনহাজের হাত চেপে ধরল তারা।কণ্ঠ নিচু করে বলল,
“চুপ যা ভাই ! কী বলছিস তুই! কার সঙ্গে লাগতে যাচ্ছিস কোনো আইডিয়া আছে?"
মিনহাজ ও আজ যেন পন করেই নেমেছে সে দমবে না। তাইতো ঘাড় উঁচিয়ে, টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে বলল পুনরায়,
“সেটা আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়। এখন আমার বোনকে আমরা হীরা দিয়ে বানাই বা মুক্তা দিয়ে বানাই সেটাও আপনাদের জানার দরকার নেই।”
“পার্সোনাল?আমার শহরে, আমার জায়গাতে দাঁড়িয়ে পার্সোনাল বলতে কিছু থাকেনা ছোটমিয়া। এই আনভীর সিকদারের নজর খুবই খারাপ, যে জায়গায় একবার পড়ে সেটা নিজের দখলে নিয়ে নেয়।"
"আমার বোন কোনো সম্পত্তি নয়।যাকে আপনার নামে দলিল করে দিবো, বা জোড় করে দখলদারিত্ব নিবেন। প্রয়োজনে না থাকলাম আপনাদের শহরে।"
তখনো আগের ন্যায় বসে রইলো আনভীর। বড্ড শীতল স্বাভাবিক কণ্ঠে আওড়াল,
“তোমার কথা বলার স্টাইলটা আমার পছন্দ হচ্ছে না ছোটমিয়া।"
“আমারও না!"
বিন্দুমাত্র দেরি না করে জবাব দিল মিনহাজ।পরপর বলল,
“বিশেষ করে কথাটা যখন আমার বোনকে কেন্দ্র করে ঘুরে তখন!"
আচমকাই শব্দ করে হেসে উঠে আনভীর। গাঁ ছাড়া ভাব নিয়ে পাল্টা জবাবে বলে,
“তোমার বোনকে নিয়ে কথা বলেছি বলে এত রাগ?
যদি সত্যিই কিছু করে বসি, তখন?”
“চেষ্টা করে দেখেন।"
চারপাশে টানটান উত্তেজনা বিরাজমান।মিনহাজের পক্ষের কাজিনরা ঝড়ের পূর্বাভাস টের পেতেই থামাতে চাইলো মিনহাজ কে। ওরা প্রায় টেনে ধরে ক্লাব থেকে বেরিয়ে গেল। যেতে যেতে নত মুখে দুই তিনবার মাফ ও চাইলো আনভীরের কাছে। নতুন এসেছে, এখানে তো আর থাকেনা তাই বুঝতে পারেনি, চিনতে পারেনি বলেই আপাতত বেরিয়ে গেল ওরা।
মিনহাজ ও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলো বাইরে।আনভীরের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তখন দরজার অভিমুখেই তাক করা। কিছুক্ষন ঠোঁট কামড়ে ভেবে আচমকাই গলা উচু করে ডাকল,
"এই মিন্টু! বিয়ে করতে কি কি লাগেরে?"
মিন্টু আনভীরের অতি কাছের সহচর। বন্ধুর এহেন কথায় চমকে অবাক হয়ে তাকাল।মাথা চুলকে বলল,
“বিয়ে করতে তো শুনছি অনেক কিছুই লাগে। কিন্তু আমি কেমনে কমু ভাই? আমি তো নিজেই বিয়া করি নাই!”
“কি বাল জানিস তুই?”
বিরক্ত গলায় বলল আনভীর। পরপর গলা চড়াও করে বলল ফির,
“তুই তো বাল কিছুই জানিস না। আপাতত কী কি লাগে ইমার্জেন্সি—সেটা বল!”
মিন্টু এবার একটু সিরিয়াস হলো।সেকেন্ড খানিক সময় নিলো ভাবতে। তৎপর হয়ে বলল এরপর,
“ভাই কিছু লাগুক আর না লাগুক ইমিডিয়েটলি একটা জিনিস তো লাগবেই। ওটা ছাড়া বিয়া অসম্ভব!"
"ভনিতা ছেড়ে জলদি বল!"
“কাজী। আর মেয়ের জন্য একটা লাল শাড়িও লাগে।"
ফট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আনভীর।হাতের ইশারায় কাছে ডাকল মিন্টু কে। ঠান্ডা,দৃঢ় সরে আদেশ ছুড়ল,
“যা। বিশ মিনিট। বিশ মিনিটের মধ্যে কাজী আর শাড়ি—দুইটাই আমার চোখের সামনে চাই। কয় মিনিট?"
ভারি আশ্চর্য মিন্টু মাথা ঝাকিয়ে সঙ্গে সঙ্গে শুধাল,
"ব বিশ মিনিট!"
বলেই দৌড়ে বেরিয়ে পড়ল মিন্টু। ওদিকে উপস্থিত বাকি সকলও তখন ব্যাপক চমকে আছে। এতক্ষনে বিষয়টা ধরতে সফল হয়েছে সকলে। তাহলে ওর মাথায় এসবকিছু চলছিল। এর জন্যই বুঝি এতক্ষন যাবৎ চুপচাপ ঠান্ডা মাথায় সবকিছু মেনে নিয়েছিল। নাহলে শাহরিয়ার আনভীর সিকদারের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার পরও সম্পূর্ণ সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় বাড়ি ফিরে যাওয়ার রেকর্ড তো বিরল। নেই বললেই চলে।
:
:
“তুই এটা কি করলি মিনহাজ? কতবার ইশারায় থামতে বললাম শুনলি না কেন?"
পারভেজ হাঁপাতে হাঁপাতে বলল মিনহাজ কে উদ্দেশ্য করে। পাশ থেকে সোহানও সায় মিলালো তাতে,
“মাথা নষ্ট হয়ে গেছে ওর।কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলছিল আইডিয়া আছে আদৌ?জানিস ও কে?”
মিনহাজ থামল না। হাঁটার কদম বাড়াল আরও। ঘাড় টানটান করে জবাব দিল,
“যা বলার ছিল, বলেছি। "
“তুই বুঝতেছিস না ব্যাপারটা। ও আনভীর সিকদার! সিকদার বংশের ছেলে! এই এলাকায় ওদের কথাই আইন, ওদের কথাই মানুষের সিদ্ধান্ত!"
“আইন? আইন কারো বাপের কিনা গোলাম না।"
“তুই শহরের ছেলে, তাই বুঝতেছিস না! আমরা এখানে থাকি আমরা জানি। এখানে ওদের হুমুক ছাড়া গাছের পাতাও নড়েনা ভাই। পুলিশ, থানা—সব ওদের হাতেরে মুঠোয় থাকে। এখানে কারো সাহস নাই ওদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর! তোর ওই কথাগুলো ও যদি সিরিয়াসলি নেয় তাহলে সব শেষ, সব!"
পারভেজ আবার বলল,
“তুই জানিস না ও কেমন ঘাওড়া রগচটা স্বভাবের! ওর মুখ তো বুলেটের থেকেও ফাস্ট। যেটা একবার ওই মুখ দিয়ে বের হবে দুনিয়া উল্টেপাল্টে গেলেও সেটা করা থেকে কেউ থামাতে পারবেনা ওকে।"
“আমার বোনকে নিয়ে কেউ বাজে কথা বলবে—আর আমি চুপ থাকব?সেটা আমার দ্বারা সম্ভব না। আমার জায়গায় তোদের বোন কে নিয়ে এমন কথা বললে তোরাও কি চুপ থাকতি? "
"চুপ থাকতাম কে বলল। তৎক্ষণাৎ গিয়া জড়াইয়া ধইরা কোলাকুলি করতাম। এমন বাড়িতে বোনকে বিয়ে দেয়া প্রত্যেকটা বাপ্,ভাইয়ের স্বপ্ন!"
"স্বপ্ন তোদের হতে পারে। তবে আমার ক্ষেত্রে দুঃস্বপ্ন থেকেই জগন্য। আমার বোন এতোটাও সস্তা নয়, যে এরকম একটা মাস্তান, বখাটে, বাত্তামীজ ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিবো। বিয়ে তো বহুত দূর! এই কথা ভাবতেও আমার রীতিমতো জগন্য ফিলিংস হচ্ছে।"
সেদিনের সেই ঘটনাটা ছিল মিনহাজের জীবনের সবচেয়ে চরম, বড় ভুল। আর নিজের করা এই একটা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল তার নিষ্পাপ বোনটাকে। ক্লাবঘর থেকে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বের হয়ে এসেছিল মিনহাজ। মাথার ভেতর তখন আগুন জ্বলছে। চারপাশের কারও কথা কানে ঢুকছে না। পেছন থেকে পারভেজ, সোহান বারবার ডাকছিল, থামতে বলছিল তাকে। বলেছিলো আনভীরের কাছে গিয়ে মাফ চাইতে। কিন্তু মিনহাজ তখন নিজের জেদে সম্পূর্ণ অন্ধ ছিল বৈকি। দ্রুত পায়ে হেঁটে বাড়ির গেট পেরিয়ে বাড়ির উঠানে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ চারদিক থেকে ওদের ঘিরে ফেলল কয়েকজন লোক। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে, প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগই পায়নি মিনহাজ।
“এই কারা রে?"
পারভেজ, সোহান ভয়ে জমে গেছে জায়গাতেই। মিনহাজ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোর আগেই ওর কপাল বরাবর টের পেল ঠান্ডা ধাতব কিছুর স্পর্শ।চোখ তুলে সামনে তাকাতেই অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে এলো আনভীর। এসে দাঁড়াল একদম সামনে। মিনহাজের চোখে চোখ রাখল। বড্ড শান্ত, শীতল সেই দৃষ্টি। অন্যদিকে মিনহাজের চোখে তখন উত্তপ্ত দহনশিখা জ্বলজ্বল করছে। আনভীরের চোখের ইশারায় মিনহাজের কপালে পিস্তল চেপে রাখা ব্যক্তিটার হাত আরও শক্ত হয়ে হলো।ভড়কে গেল মিনহাজ। তখনি শুনতে পেল আনভীরের বরফ শীতল কণ্ঠখানা,
"ওয়েলকাম ছোটমিয়া!"
ততক্ষনে ওদের মামার বাড়ি জুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল আতঙ্কের ঝড়। মামা বাড়ির সবাই ভয়ে জড়ো হয়ে পড়ে রইলো এক জায়গাতেই। কেউ টু শব্দটি অব্দি করলোনা।বারকয়েক মিনহাজের ছোট মামা এসে বুঝাতে চেয়েছিলো আনভীর কে। ভাগ্নির তরফ হতে মাফ ও চেয়েছিলো তবে আনভীর নিজের সিদ্ধান্তে অনড়। সময়ের ব্যবধানে কাজী এলো। ভাইয়ের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনটা নিলামে তুলে দিলো ওর আদরের বোনটা।বোনের কবুল বলার বিনিময়ে সেবারের মতো ছাড়া পেলো মিনহাজ।
"বাবা মিনহাজ! নাস্তা করবি না?"
মায়ের ডাকে দীর্ঘক্ষণের ধ্যান ভাঙে মিনহাজের। কপাল চেপে রাখা আঙ্গুল দুটো সরিয়ে ঘুমহীন লাল লাল চোখ দুটো ঘুরে ঘুরে মাকে অবলোকন করে জানতে চায়,
"আরোহী উঠেনি?"
"ঘুমালো তো সকালেই। কাঁদতে কাঁদতেই পাড় করল পুরোটা রাত।"
"এসব কি হয়ে গেল আম্মু? আমি কিভাবে নিজেকে ক্ষমা করবো বলো? আমার বোনটার জীবনটা এভাবে নষ্ট হয়ে গেল? ভাই হিসাবে আমি নিরর্থক, ব্যর্থ।কেমন ভাই হলাম আমি?আমিতো এমন ভাই হতে চাইনি আম্মু!"
"এখানে তোর দোষ কি বাবা? এটা আমাদের ভাগ্যর দোষ।ভাগ্যে বোধহয় এমনটাই লিখা ছিল। নাহলে কেন আমাদের সঙ্গে এমনটা হবে বল?"
"ভাগ্যর উপর দোষ দিয়ে চুপ করে বসে থাকতে পারিনা আম্মু। আমার বোনের জীবনটা আমি এভাবে বিনাশ হতে দেখতে পারবোনা। ও-কে উঠলে তৈরী থাকতে বলবে। আমরা এক্ষুনি রওনা দিবো। এই বিয়ে আমি মানিনা। আর এমনিতেই ওদের বিয়ের কার্যক্রম সম্পূর্ণ হয়নি, আমার আরোহীর তো এখনো আঠারো হয়নি। আমার চাইলেই ওদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবো এই রিজন দেখিয়ে। শুধু একটাবার এখান থেকে যাওয়ার ব্যবস্থা করো আম্মু। বাকিটা আমি সামলে দিবো কথা দিচ্ছি!"
শালিকপুর গ্রামের মাঝামাঝি অবস্থিত সিকদার বাড়িটি। বিশাল লোহার গেটের দুই পাশে উঁচু প্রাচীর আর উপরে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া। ভেতরে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ এক উঠান, আর বাড়ির সামনে লম্বা লম্বা বারান্দায়।
এই বাড়িরই কর্তা, হাজী দেলোয়ার সিকদার।
একসময় এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন তিনি। বর্তমানে তার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন তার বড় ছেলে আয়নাজ সিকদার। পূর্বপুরুষদের জমিজমা, ব্যবসা, আর রাজনীতির হাত ধরে সিকদার বংশ এই গ্রামের প্রাণ। বড় ছেলে আয়নাজ সিকদার গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান। চতুর, হিসেবি, আর ক্ষমতা ধরে রাখার খেলায় পাকা খেলোয়াড় সে। মেজ ছেলে শামসুদ্দিন সিকদার হয়েছে নামকরা ব্যবসায়ী। শহরে বড় বড় কন্ট্রাক্ট ডিল করা থেকে শুরু করে টাকা আর প্রভাব—দুটোই সমানভাবে সামলায়। ছোট ছেলে মাহবুব সিকদার—রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত। জেলা পর্যায়ে বেশ দাপট আছে তার। এই তিন ভাইয়ের হাত ধরেই আজও সিকদার বংশ টিকে আছে ক্ষমতার চূড়ায়।
আর সেই বংশেরই বড় নাতি শাহরিয়ার আনভীর সিকদার। আয়নাজ সিকদারের বেপরোয়া, অবাধ্য, ছেলে সে। তবে তবুও সে বাড়ির সবার বড্ড আদরের। স্বভাবটা এমন, যদি সে কাউকে খুন করে নদীতে ফেলেও আসে, সেখানে তার পরিবার উল্টো ছেলেকে এসে জিজ্ঞেস করবে মারার সময় হাতে কোথাও চোট পেয়েছে কিনা।
সিকদার বাড়ির বিশাল ড্রয়িংরুমটা আপাতত মানুষ্যর সরগমে ভরপুর। উঁচু ছাদটায় একটা বড়োসড়ো ঝাড়বাতি ঝলমল করছে। দেয়ালে টানানো একটা বড় ফ্যামিলি ছবি। যেখানে একসঙ্গে গাদাগাদি করে একজোট হয়ে দাঁড়িয়ে, বসে,আছে সিকদার পরিবারের উনিশ জন সদস্যসংখ্যা। আপাতত বাড়ির সকলকের কৌতূহলের হেডলাইন হচ্ছে গতকালের ঘটনাকে ঘিরে। গতরাতের ঘটনাটা মহামারীর মতোই মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে অত্র এলাকা জুড়ে।
"আমার নাতি ভুল কি করছে? পছন্দ হইসে ডাইরেক্ট বিয়াই তো করসে। মেয়েরে তুইলা নিয়া জোড়জবরদস্তি করে ছাইড়া তো আর দেয়নাই?"
"আপনি এসব কেমন কথা বলছেন আম্মা?মেয়েটাকে জোড় করে বিয়ে করেছে শের! শুনেছি মেয়েটার ভাইয়ের কপালে বন্ধুক ঠেকিয়ে কবুল বলিয়েছে। এত বড় একটা কান্ড করার পরও আপনারা কিছুই বলছেন না উল্টো ওর পক্ষপাদিত্য করছেন?"
"তোহ? আমি তো সেটাই বলতেসি বউ মা। আমার নাতি বন্ধুক ঠেকাইয়া সোজা বিয়ের মতো পবিত্র একটা কাজ করছে। ওতো আর মেয়েটার সঙ্গে জোড়জবরদস্তি কিছু করেনাই। একরাত জোড় কইরা শুইয়া পরেরদিন ফালাইয়াও দেইনাই।"
"জোড় করে বিয়ে করা কি জোড়জবরদস্তির মধ্যে পড়েনা আম্মা?"
"শোনো বউ মা। এত বছর ধইরা সিকদার বাড়ির ভাত খাইতাসো আর এই বাড়ির পুরুষদের চিনোনা? ওগো জাত কেমন জানোনা? ওর বাপ্ তোমারে কেমনে বিয়া করসে ভুলে গেসো? ওর বাপ্, দাদা, চাচারা সবাই তো নিজের ইচ্ছেয়, নিজের মন মোতাবেগ পছন্দের মেয়েদের নিয়েই সংসার করতাসে। মেয়ে পছন্দ হইসে সোজা তুলে নিয়ে আসছে। বিয়ে করছে, বাচ্চা হইসে। এখনো দিব্যি আরামসে সংসার করতাসে। এতে দোষের কি?"
"আম্মা! মেয়েটা এখনো প্রাপ্তবয়স্কা হয়নি। মাত্র নাকি এস এস সি পরীক্ষা দিসে। বাচ্চা একটা নাবালিকা মেয়ে। দুজনের বয়সের তফাৎটাও তো অন্তত একবার বিবেচনা করে দেখবেন!"
"আমার বিয়া হইসিলো কত তে জানো? মাত্র ১৪ বছরে তোমার শুশুর আমারে বাড়ি থেইকা জোড় কইরা বিয়ে করে আনসে। এর পরের বছরেই তোমার জামাই আমার পেটে আইসে। বয়স কোনো ব্যাপারনা। আর সবথেকে বড় কথা আমার শের এর যেহেতু মেয়েটাকে মনে ধরসে তাইলে ওখানে তোমাগো এত আপত্তি কেন?"
শাশুড়ির কথারে পিঠে আর তর্কে গেলেন না আঞ্জুমান সিকদার। উপরন্তু শাশুড়ি না আবার রেগে যায়। তপ্ত একটা শ্বাস ফেলে নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন পুনরায়। ছেলেটা দিন দিন বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে। কারো কথা শোনে না, নিজের মর্জি মতো সিদ্ধান্ত নেয়। আজ একটা মেয়ের জীবন নিয়ে খেলল, কাল কে জানে আর কী করবে! ডাইনিং টেবিল সাজানো হচ্ছে। সকালের নাস্তা করবে সকলে। প্রথমে বাড়ির বড়োরা খেয়ে উঠে নিজেদের নিত্যদিনের কাজে ডুকবে। এরপর বসবে ছোটরা। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় এই নিয়মটাই প্রচলিত এখানে। আগে ১৯ জন থাকলেও বর্তমানে সদস্য সংখ্যা ছাড়িয়েছে বিশের ঘর। ততক্ষণে লাঠিতে ভর দিয়ে এসে দাঁড়ালেন বাড়ির প্রবীণতম সদস্য হাজি দেলোয়ার সিকদার।
“কি হইতেছে এইখানে?” গম্ভীর গলায় বললেন তিনি।
“তোমার নাতির কীর্তি নিয়াই আলোচনা হইতেছে।”
স্ত্রীর কথায় দেলোয়ার সিকদার ভ্রু তুললেন খুব স্বাভাবিক ভাবেই। উনি এসে দাঁড়াতেই কাজের ছেলেটা হুড়মুড় করে এসে চেয়ার টেনে বসতে দিলো। বৃদ্ধা বসতে বসতেই বললেন,
“হুম! শুনছি।কিন্ত তোমার নাতি তো দেখি আমাদের থেইকা অনেক কদম পিছায়া গেছে।আমাদের মুখে চুন কালী মাখাইসে। ওরে দিয়া অন্তত এটা আসা করিনাই!"
আঞ্জুমানের মুখটা চকচক করে উঠল শুশুরের কথায়। খানিকটা আসার আলো দেখতে পেলেন বোধহয় চোখে। তবে সেই আলোটুকু নিভিয়ে বৃদ্ধা পরপর গর্জন তুলে বললেন,
“আমাগো মাইয়া পছন্দ হইসে, ব্যাস সোজা তুইলা বাড়ি নিয়া আইসি সঙ্গে কইরা। কিন্ত ওই হতচ্ছাড়া তো মাইয়া বাড়িতেই রাইখা একা ঢেঙ ঢেঙ কইরা চইলা আসলো। এহন এইটা যদি বাইরে ছড়ায় মানুষ কী কইবো?সিকদার বাড়ির পোলা বিয়া করছে—আর বউ নিয়া আইতে পারে নাই?থাকবো তখন সিকদার বাড়ির মান সম্মান?"
মিনিট খানেক যাবৎ ফুটে উঠা আসার আলোটুকু নিভে গেল এক নিমিষেই। রান্নাঘরে স্বামীর জন্য পরোটা চেকছিলেন তখন। স্বামী তার হাতের পরোটা ছাড়া মুখে তুলেন না। শুশুরের কথায় হাতে থাকা বেলুনটা থেমে যেতেই পাশ থেকে কাঁধে রাখলেন তার ছোট জা, মিষ্টি। নারীটি নামের মতো দেখতেও মিষ্টি। তাইতো সামসুদ্দিন সিকদার প্রথম দেখাতেই সোজা স্কুল থেকেই তুলে নিয়ে ফিরেছিলেন বাড়ি। বর্তমানে তার দুটো মেয়ে। ছেলে নেই। আনভীর কে নিজের মেয়েদের চাইতেও বেশি ভালোবাসেন তিনি। ছেলের খুব শখ ছিল যে। তবে দ্বিতীয় মেয়েটা হওয়ার সময় দুর্ভাগ্যবশত পুরোপুরি হারান মাতৃত্বের স্বাদ। আর সন্তান নিতে পারবেন না তিনি। এমনটাই জানান ডাক্তার সেদিন।
"নিজেকে শক্ত করো আপা! উনাদের কথা কানে তুলোনা। এসব আর নতুন কি। বাদ দাও!"
"আমার ছেলেটা, আমার ছেলেটাকে কেন মানুষ বানাতে পারলাম না মিষ্টি? কেন?বিশ্বাস কর, আমি কোনোদিন চাইনি এদের মতো আমার আনভীর হউক। কিন্ত আমি তো ভুলেই বসেছিলাম,এদের রক্তই দূষিত। রক্ত তো রক্তের মতোই হবে তাইনা!"
বলেই হাতের উল্টো পিঠে চোখ মুছলেন আঞ্জুমান। বিয়েটা জোড় করে হলেও সে ছিল একটা শিক্ষিত বংশের মেয়ে। তার বাবা ছিলেন একজন নামকরা অ্যাডভোকেট। তবুও মেয়েটাকে রক্ষা করতে পারেন নি এই সিকদার বংশ থেকে। দুজন সন্তানের জননী হলেও ভদ্রমহিলার এখনো নিজের জীবন নিয়ে আফসোস হয় বড্ড। তিনি তো এমন জীবন চান নি। যেখানে খুনাখুনি করে হাত না মুছেই রক্তমাখা হাত নিয়ে রাতের খাবার গিলে একেকজন। কত করে চাইতেন প্রথমে পালিয়ে যেতে। দুয়েকবার নিজের জীবন বাকি রেখে চেষ্টাও করেছিলেন। তবে সফল হয়নি। সফল হলে নিশ্চই এরকম একটা জানোয়ার পেটে ধরতেন না। ছেলেটা তো তার বাপ্, দাদার সবার উপরে ছাড়িয়ে গেছে। আঞ্জুমান কে আশ্বাস দিয়ে গলার সর নরম করে শান্তনা দিলো মিষ্টি,
"চিন্তা কইরেন না আপা। আরেকটু ধৈর্য্য ধরেন। দেখবেন আমাদের শের ঠিক পাল্টাইয়া যাইবো। জীবনে কাউরে ভালোবাসতে শিখলে নিজেরে সুধরাইয়া নিবো। আর আমার তো মনে হয় ওই মাইয়াটাই পারবো আমাগো শের রে পরিবর্তন করতে। শুনসি মাইয়াডা নাকি বেশ সুন্দরী।"
"আমি সেই দোয়াই করিরে মিষ্টি। রাত দিন আল্লাহর কাছে মোনাজাত করি যেন আমার ছেলেটাকে আল্লাহ হেদায়াত দান করে। আগে যা করসে তো করসেই, ভবিষ্যতেই যেন শুধরাইয়া যায়।"
"কই গো! নাস্তা কি পাবো নাকি না খাইয়া চলে যাবো?"
আয়নাজ সিকদারের ডাকে দ্রুত হাতের গতি বাড়ালেন আঞ্জুমান। তাকে সাহায্য করলেন মিষ্টি ও। পরপর কয়েকটা পরোটা ছেকে নিয়ে এসে টেবিলে রাখতেই শুনতে পেলেন স্বামীর কণ্ঠ,
“শুনলাম আমার পোলা নাকি বড়সড় কাণ্ড ঘটাইছে?”
"শুনছেনই যেহেতু, তাহলে তো সত্যিই হবে!"
আয়নাজ এবার গলা উঁচু করে ডাকল,
“লাভলু!”
ঘরের এক কোণ থেকে দৌড়ে এলো লাভলু,
“জি চাচা!”
“আনভীর কোথায়?”
“কোথায় আর। মনে হয় ঘুমাইতেছে।"
"ওরে ডেকে নিয়ে আয়। বল আমি ডাকছি!"
লাভলু ছেলেটা নড়ল, চড়লনা। ঠাই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ঘাড় উল্টে আয়নাজ বললেন ফির,
"কিরে যাচ্ছিস না কেন?"
"ইয়ে মানে চাচা, অন্যজনরে পাঠানো যায়না?ভাইয়ের রাগ তো জানেনই। কাঁচা ঘুম ভাঙলে মারাত্মক রাইগা যায়। এর আগেরবার আমারে টাইসন এর দৌড়ানি খাওয়াইসিলো। মরতে মরতে বাঁচসিলাম সেইবার। তিনটা সিলাই লাগ...
"হইসে চুপ! তোর কাছে ইতিহাস জানতে চাইসি আমি? এখন গিয়া জলদি আনভীর কে ডেকে আন। বল ওর সঙ্গে আমার কথা আছে জরুরি। গতকাল রাতে যা করসে আমি সব ওর কাছ থেকেই সরাসরি শুনতে চাই! বুঝসোস কি বলছি ?"
"জি চাচা!"
ভয়ে ভয়ে বলে উঠে গেল লাভলু সিঁড়ি ধরে।সিকদার বাড়ির ভেতরের দোতলায়, একদম কোণার দিকের বড় রুমটাই আনভীরের। দরজাটা আধখোলা, ভিরিয়ে রাখা। এসি চলছে সর্বনিম্ন তাপমাত্রায়। বিশাল বড়োসড়ো একটা মাস্টার বেডরুম। রুমটায় একবার চোখ বুলালেই বুঝা যায় এই রুমের মালিকের সৌখিনতা, রুচি সম্পর্কে। গ্রাম অঞ্চলে এরকম রুম অনেকটা দৃষ্টিনন্দনই বটে। আনভীর নিজের রুমটা ইস্পেশাল ডিজাইনার দিয়ে ডিজাইন করেছে। তাই রুমের সবকিছুই একদম মানানসই। তবে যত্ন না নেয়ায় সেই সুন্দর্য্যটুকু ঢাকা পড়েছে আড়ালে।
বিছানার চাদর এলোমেলো, মেঝেতে পড়ে আছে দু’একটা টি-শার্ট, এক কোণায় ছুড়ে রাখা জ্যাকেট, টেবিলের ওপর খোলা সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার। দিনের বেলাতেও রুমটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে মাড়িয়ে রেখেছে ঘরের মালিক। বিছানার ওপর—
উল্টে হয়ে শুয়ে আছে আনভীর। পেটানো, শক্তপোক্ত শরীরটা পুরোটাই খালি। বুক আর পিঠের পেশীগুলো স্পষ্টভাবে ফুটে আছে তাতে। নিচে শুধু একটা ট্রাউজার। যেটা ঢিল হয়ে নাভির অনেক নিচে নেমে গেছে। এক হাত মাথার পাশে ছড়িয়ে, অন্য হাতটা বিছানার বাইরে ঝুলে আছে। গভীর ঘুমে ডুবে সেই মানব।
"পুরো বাড়িশুদ্ধ, পুরো শালিকপুর গ্রামে তান্ডব চালিয়ে জলহস্তীটা নাক ডেকে ডেকে ঘুমাচ্ছে এখন!"
মনে মনে বেশ কিছু কটুকথা শুনিয়ে হাফ ছাড়ল দরজায় দাঁড়ানো লাভলু।এগিয়ে আসার সাহসটুকু সঞ্চয় করে উঠতে পারছেনা ঠিকঠাক। মনে পড়ে যায় এর আগের বারের কথা। অবেলায় ডেকে উঠানোয় কি রাগটাই না রেগেছিলো সেবার। ভাবতেই গাঁ কাঁটা দিয়ে উঠে তার। দুপুরের খাবারের জন্যই তো ডাকতে এসেছিলো লাভলু সেদিন। সূর্য টানটান হয়ে মাথার উপর উঠে থাকার পরও এই জলহস্তী অবেলায় ডাকার দোহায় দিয়ে শাস্তিস্বরূপ ওই পাগলা টাইসনের দৌড়ানি খাওইয়েছিল তাকে।
“ভাই!ও ভাই! শুনছেন? চেয়ারম্যান সাহেব ডাকতেছে আপনারে!"
এই নিয়ে তিনবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করে ফেলল লাভলু। বিশেষ কোনো হেলদুল লক্ষ্য করল না তাতে। ভাবলো আরেকটু এগিয়ে এসে বাড়াবে কণ্ঠের জোড়। সেই ভেবেই ডেকে উঠে খানিকটা উঁচু কণ্ঠে,
"ভাই! শুনছেন নি? বড় চাচা ডাকতাসে। ওহ ভাই। ভাইইইইইই!"
এবারের ডাকে কাজে দিলো কিছটা বোধহয়। বিরক্তিতে খানিকটা নড়েচড়ে উঠল আনভীর। আরমোরা ভেঙে এপাশ, ওপাশ হয়ে শুলো। লাভলুর কাছে মনে হচ্ছে আমাজন জঙ্গলে বিলুপ্ত হওয়া কোনো বিশাল আকারের এনাকোন্ডা পানির ভিতর থেকে নড়েচড়ে উঠল বোধহয়। অন্যদিকে এসির সর্বনিম্ন তাপমাত্রায় গায়ে বড় হাতা শার্ট থাকার পরw রীতিমতো থরথর করে কাঁপছে সে। আর এই জলহস্তী কে দেখ! উর্ধ উলঙ্গ হয়ে নাক ডেকে ডেকে ঘুমাচ্ছে। এটা কে কি শুধু শুধুই নাম দিয়েছে সে জলহস্তী? শরীরটা যেমন, তেমনই একটু গরমেই জলহস্তীর মতো খালি নিসপিস করতে থাকে। শ্যাম বর্ণের ওই চেহারাটা ঘেমে টেমে লাল টকটকে হয়ে যায় তখন।বিড়ালের মতো ছোট ছোট ছোট চোখ দুটোতে ভর করে প্রবল বিরক্তি।
"ভাই! বড় চাচা আপনারে ডাকতাসে। বলসে একবারে আপনারে সঙ্গে কইরা নিয়া যাইতে। শুনছেন নি ভাই? ও ভাই? ভাইইইই?"
ঘুমের ঘোরেই কপাল কুঁচকাল আনভীর। সময় নিয়ে আধো আধো চোখ মেলে চাইলো। হাতড়ে নরম কুশল বালিশটা ছুড়ে মারল একদম লাভলুর মুখ বরাবর। অভিজ্ঞতাসম্পূর্ণ লাভলু ওটা সপাটে ক্যাচ করে ধরে ফেলল।গর্ভে বুক টানটান করে বলল,
"রাইগা লাভ নাই। বড় চাচা অপেক্ষা করতাসে, জলদি আহেন!"
"এই লাভলু, আগেরবার টাইসনের কামড়ে তোর কয়টা ইনজেকশন লাগছিলো রে?"
"একবারে গুনে গুনে ছয় ছয়টা ইনজেকশন লাগছিলো।কেন ভাই?"
"না ভাবছি এবার যদি ও তোর পশ্চাৎদেশে কামরায় তাহলে ঠিক কয়টা ইনজেকশন লাগতে পারে। এমনত হতে পারে আ জায়গায় কামড়ে ধরার ফলে বেঁচেই না থাকলি। ব্যাপারটা কেমন হবে তখন বলতো?"
"একদমই ভালা না!আর আমারে ভয় দেখাইয়া লাভ নাই। আমি আসতে চাইনাই। চেয়ারম্যান চাচা জোড় কইরা আমারে পাঠাইসে। আকাম যা করসেন আপনি, হেইডার লাইগাই ডাকতাসে।"
এক লাফে খাট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো আনভীর। নাভির নিচ অব্দি লুটোপুটি খাওয়া ট্রাওজার টা টেনে উঠালো কিঞ্চিৎ। খাট থেকে নিচে পা দিতেই খালি একটা সিগরেটের বাক্সতে পা পড়ল ওর। এক লাথিতে সেটা ছুড়ে মারল সোফার নিচে। ঢুলু ঢুলু পায়ে এগিয়ে গিয়ে কাবার্ড খুলে একটা টি শার্ট জড়িয়ে নিলো গায়ে।
চলবে..