ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তরমোহ

৩য় পর্ব

লেখক: সুহাসিনি মিমি

#অন্তরমোহ

#পর্বসংখ্যা৩

#সুহাসিনি_মিমি

“আনভীর ভাইয়া তো কাল রাতে একেবারে বাজিমাত করে দিয়েছে!”

"কি করেছে?"

"হায় আল্লাহ তুই কিছু জানিস না?ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের ফিমেইল ভার্সন বলি কি, আনভীর ভাই কাল রাইতে বিয়ে করে ফেলসে। তাও আবার যেই সেই নরমাল বিয়ে না। মেয়ের ভাইকে থ্রেট দিয়ে, মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে একদম সিনেমার হিরোদের মতো করে বিয়ে করেছে আমাদের ভীর ভাই!"

"কিহ!"

"জিহ! এমনিতেও আমাদের আনভীর ভাই হিরো থেকে কম কিছুনা। এই গ্রাম থেকে শুরু করে পাশবর্তী গ্রামের সব মেয়েরাই তো ফিদা ভাইয়ের উপরে।তবে শুনসি মেয়েটাও নাকি বেশ সুন্দরী। শহরের থেকে আসছে বেরাতে!"

দ্বিতীয়জন চোখ বড় বড় করে বলল,

“আমাদের সাহারা আপুর থেকেও?”

প্রথমজন মাথা নেড়ে জানাল,

“তুই কি পাশের গ্রামের সাহারা আপুর কথা বলছিস? হ্যা! শোনলাম তো উনার থেকেও নাকি বেশি সুন্দর। আর বয়সও খুব অল্প।ইশ! বেচারির এখন কী হবে,সেটাই ভাবছি! ভাইয়ার পেছনে কত বছর ধরে ঘুরঘুর করছে।বেচারির না আবার হার্ট ফেইল হয়ে হসপিটালে ভর্তি হতে হয়।"

“আমার তো উনার জন্য খারাপ লাগতেছে। এতদিন ধরে আশা করে ছিল।আর বিষয়টা কিন্ত শুধু সাহারা আপু পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না। ভীর ভাইয়ের বিয়ের খবর জানাজানি হলে পুরো এলাকায় শোকদিবস পালন করবে মেয়েরা।আমাদের কলেজে, ভার্সিটিতে কত মেয়ে ভাইয়ার পাগল জানিস!কলেজে কত মেয়ে আমাকে কত কিছু গিফট দিয়েছিলো।চকলেট, কার্ড, এমনকি একবার তো এক আপু পারফিউমও দিছিল!”

“কিসের জন্য?”

“শুধু এই জন্য আমি নাকি ‘আনভীর ভাইয়ার ছোট বোন’!”

“তাইলে তো এখন শেষ!বউ এসে গেছে শুনলে এইসব গিফট-টিফট সব বন্ধ!”

“এইটাই তো সমস্যা! এতদিন ফ্রি ফ্রি জিনিসপত্র পাইতাম এখন আর সেই চান্স নাই মনে হয়!”

"কিসের ফুশুর ফাশুর করছিস তোরা। উঠে বোস!"

হলরুমে অপেক্ষামান সকলেই ভারী পায়ের শব্দ আর শক্ত গলার সর ধরে সিঁড়ির দিকে তাকালো। চোখে পড়ল এলোমেলো পদক্ষেপে এগিয়ে আসা আনভীরকে। আনভীর সরাসরি হেঁটে এগিয়ে এসে দাদির পাশে বসা ছোট বোনের মাথায় চাপট দিয়ে বলল,

“কিরে, সরে বোস! যা!"

মেয়েটা তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াল।বসল অন্যপাশে গিয়ে।

আনভীর নির্বিকার ভঙ্গিতে সেই জায়গায় বসে পড়ল।

তারপর গলা উঁচু করে বলল,

“আম্মু! নাস্তা দাও।”

"টেবিল ওদিকে। তুই এদিকে আইয়া বইসোস কেন? সর এনতে। তোর লগে কোনো কথা নাই আমার!"

"সুইটহার্ট! এমনিতেই তোমার রূপের গরমে ভস্ম হয়ে যাওয়ার অবস্থা, তারউপর এত তেজ নিয়ে থাকলে দুনিয়া পুড়ে ছাই হয়ে যাবেতো।সাথে পুড়ে যাবে তোমার এই আশিক প্রেমিক সিকদার!"

"হইসে! উপরে উপরে আলগা পীড়িত দেখাইয়া তলে তলে যে আমার সতীন বানাইয়া রাইখা আসছো আরেকজন রে। সেই খবর আমরা পাইয়া ফেলসি। নাটক কইরোনা আর হু!"

"ওরেঃ বাবা! এইজন্যই এত জেলাস? হিংসুটে বুড়ি!"

"তোমাকে দিয়ে অন্তত এসব আসা করিনাই আনভীর!"

ডাইনিং টেবিলে বসে সবেই এক টুকরো পরোটা মুখে পুড়েছিল আয়নাজ সিকদার। ছেলের অভিমুখে চেয়ে গমগমে সরে কথাটা ব্যক্ত করে পুনরায় খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন তিনি। পরপর উচু কণ্ঠে ডাকলেন নিজ স্ত্রীকে,

"কিগো! "চা" টা দিবেনা নাকি আজ?"

আনভীর ঘাড় উল্টে বাবার দিকে সন্দেহজনক দৃষ্টি নিঃক্ষেপ করল। আয়নাজ সিকদার আবারও বললেন,

"তুমি সিকদার বাড়ির বড় ছেলে, এই আয়নাজ সিকদারের ছেলে তুমি। কিভাবে পারলে এত নিচ একটা কান্ড করতে। তোমায় দিয়ে অন্তত এমনটা আশা করিনাই। এই বংশের রুলস জানোনা তুমি?আমার মান সম্মান এভাবে না ডুবালেও পারতে!"

রান্নাঘর থেকে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ভ্রু কুঁচকে স্বামীর পানে চেয়ে আছেন আঞ্জুমান। স্বামীর এহেন কথায় মাথা ঘুরার মতো অবস্থা তার। চায়ের কাপ টা দূ হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রাখতেই শুনতে পেলেন শাশুড়ির মলিন কণ্ঠখানা,

"কি মান সম্মান ডুবাইসে আমায় নাতি তোগো?"

"মান সম্মানের আর রাখসে কি আম্মা? তোর মেয়ে পছন্দ হইসে ভালো কথা, বিয়ে করসস সেটাও মানলাম। কিন্ত বউ রাইখা কেন একা একাই বাড়ি চলে আসবি? তোর বউ এখনো ওই বাড়িতে পড়ে থাকবে কেন? এখন বিয়ে করসস তুই, তোর বউ কি আমরা নিয়ে আসবো? মানুষ শুনলে হাসবে না? বলবে না সিকদার বাড়ির ছেলে বিয়ে করে বউ সঙ্গে না নিয়েই চলে আসছে।আমার বংশে আজ পর্যন্ত এমন হইসে কারো?"

"আমি তোমার মতো নই আব্বু! আনভীর সিকদার, ইজ ওয়ান এন্ড অলনি।সে কারো রুলসে চলেনা। নিজে রুলস তৈরী করে!"

চায়ের কাঁপটা ধুপ করে শব্দ করেই টেবিলের উপর রাখলেন আঞ্জুমান। আয়নাজ সিকদার আহত ভঙ্গিতে উৎকন্ঠীয় স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তৎপর হয়ে বললেন,

"আহ, আঞ্জু! আস্তে রাখো। টেবিলটা ব্যথা পাবেতো!"

আঞ্জুমানের মন চাচ্ছে গরম ধোয়া উঠা কাপটা টেবিলে না বরং স্বামী নামের এই অদ্ভুত মানবটার মাথায় ঢালতে পারলে বেশি সন্তুষ্ট হতেন। তিনি সেখানে দাঁড়ানোর মতো ভুল আর করলেননা। উল্টো ঘুরে দ্রিমদ্রাম পা ফেলে সোজা ছুটে গেলেন রান্নাঘরে। যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে গেলেন,

"বাপে আমার জীবনটা তেজপাতা বানিয়েছে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে। আর ছেলে না জানি কোন মেয়ের কপাল পুড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে।হায় আল্লাহ! মেয়েটাকে তুমি রক্ষা করো!"

আয়নাজ সিকদার পরোটাটুকু শেষ করে পানির গ্লাসটা টেনটেনে একদমই পুরোটা খালি করলেন এরপর। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে ভাবলেশহীন গলায় জানালেন ছেলেকে,

"দেখো, তোমার দাদিকে তোমার দাদার পছন্দ হইসে, বিয়ে করে তুলে আনসে। তোমার আম্মা কে আমার পছন্দ হইসে সোজা কবুল বলে তুলে নিয়ে আসছি সঙ্গে করে। তোমার চাচারাও একই নৌকার মাজি। কিন্ত তুমি কি করলে? বিয়ে করে বউ না নিয়ে চলে আসলে? তাহলে তোমার বউটা এখনো আনবে কে বাবা? তোমার বউ তুমিই গিয়ে নিয়ে আসবে। আমরা কিন্ত এসব তুচ্ছ বিষয়ে জড়াতে পারবোনা। বিয়ে করেছো কেন যদি বউ সঙ্গে করেই না নিয়ে আসো?"

"বিয়ে করার ক্রেভিংস হচ্ছিলো, তাই বিয়ে করেছি। বাসর করার ক্রেভিংস হলে বউও নিয়ে আসবো!"

ছেলের বড্ড সহজ সরল গলায় কথাগুলো শ্রবণ হতেই খুক খুক করে কেশে উঠলেন আয়নাজ। অর্ধেক চা শেষ করলেও পুরোটা আর শেষ করার মতো ইচ্ছাশক্তি পোষণ করলেন না তেমন। এখানে তার মা জননীও বসে আছে। এই বদযাত ছেলে যেই হারে ঠোঁটকাটা কখন না কি বলে ফেলে গেরান্টি নেই। তাই বাকি চা টুকু শেষ না করেই সেখান থেকে উঠে গটাগট পা ফেলে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বলে গেলেন একচোট,j

"ব্যাটা হারামজাদা একটা। মুখের লাগামটুকুও নেই। বাপকেও ছাড়িয়ে গেছে বদযাতটা!"

.

আরোহীর রুমের সাথে লাগওয়া ছোট্ট বারান্দাটায় চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ও। সকালের মৃদু রোদ এসে পড়েছে ওর নিস্প্রান, জীর্ণশীর্ন ছোট্ট কায়ায়। দু’হাত বারান্দার রেলিংয়ে শক্ত করে চেপে রেখে অদূরে ফাঁকা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। চোখদুটো লালচে, ফোলা ফোলা। কান্নার দাগ এখনো শুকোয়নি পুরোপুরি। চোখের নিচটা কেমন কালশেটে হয়ে আছে। সকাল থেকে গাঁ হিম ধরা শীতল বাতাস বইছে আজ। সেই এলোমেলো বাতাসে পরনে বেনারসি শাড়িটার আঁচলটা ঢোল খাচ্ছে হাওয়ায়।

পেছন থেকে এগিয়ে এসে মেয়ের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ালেন মাইমুনা। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে। একটা দীর্ঘশাস ফেলে কাঁপা হাতখানা আলতো করে রাখলেন মেয়ের কাঁধে। নিম্ন সরে ডেকে উঠলেন মেয়েকে,

“তুই, তুই আমাকে মাফ করে দিস মা।আমার জন্য তোর জীবনটা এভাবে শেষ হয়ে গেল। আমি পারলাম না মা হয়েও মেয়ের জীবনটা বাঁচাতে। পারলাম না আমি। ছেলের জীবনের জন্য আমি আমি স্বার্থপর হয়ে গেলাম রে মা। একবারও ভাবলাম না তোর কথা? আমি মা হিসাবে ব্যর্থ। আমায় তুই ক্ষমা করে দে। আমি যে নিরুপায় ছিলাম তখন। "

গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া পানিটুকু হাতের উল্টোপিঠে মুছে ব্যক্ত করলেন মাইমুনা।আরোহীর বুকটা হাহাকারে কেঁপে কেঁপে উঠল। শেষবারের মতো দূ ফোটা অশ্রু বিসর্জন দিয়ে উল্টো ঘুরে মাকে শান্তনা দিলো,

“এইসব কী বলছো আম্মু?এখানে তোমার কি দোষ?"

“আছে মা। সব দোষ আমার। আমি ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে মেয়ের জীবন বলি দিয়েছি, স্বার্থপর হয়ে!"

“না,। ভাই তো আমারও। আর ভাইয়ার জন্য আমি আমার জীবন দিতেও দুইবার ভাবতাম না, আম্মু!প্লিজ নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করো।আমার খারাপ লাগছে শুনতে এসব!"

মাইমুনা বেগম নিঃশব্দে কেঁদে উঠলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,

“আল্লাহ তোর ভাগ্যটায় এমন কিছু লিখে রাখসে জানলে কখনোই তোকে নিয়ে এই অভিশপ্ত গ্রামে আসতাম না আমি।আমারই ভুল হয়েছে।তুই তো আসতেও চাসনি। জোড় করেই তো আনলাম তোকে। আর দেখ কি থেকে কি হয়ে গেল? "

"ভাগ্যর উপর কারো হাত নেই আম্মু।তুমি নিজেকে দোষারোপ করা বন্ধ করো।ভাইয়া কোথায়?"

মাইমুনা বেগম নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

“এইজন্যই ডাকতে এসেছি তোকে। ছেলেটা সারারাত দূ চোখের পাতা এক করল না। নাস্তা সাধলাম খেলোও না। কতবার বলছি—শুনতেছে না। তোর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।তুই না খাওয়া অব্দি খাবেনা তোর ভাই।"

" আম্মু, তোমরা কি আমায় ওই খারাপ লোকটার কাছে ফেলে রেখে চলে যাবে?"

আচানক ধুম করে প্রশ্নটা করে বসল আরোহী। থমকে গিয়ে এপাশ ওপাশ করলেন মাইমুনা। কি উত্তর দিবেন খুঁজলেন সময় নিয়ে। এরপর মেয়ের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে বললেন,

"তোকে এখানে একা রেখে যাবে ভাবছিস তোর ভাই?"

"যদি ওই সন্ত্রাসটা বাধ্য করে?"

"ওসব ভাবতে হবে না তোকে। তোর মামা আসছে সিলেট থেকে। ভাই আসলে একটা না একটা বন্দোবস্ত করবেই। আর আমরা তো আছিই। চিন্তা করিস না মা। এখন আয়তো। আগে এটা খুলে নাস্তা করে নে।"

"আচ্ছা খাবার রেডি করো। আমি আসছি!"

.

.

মাথার ওপর লম্বা ঘোমটা টেনে খাটের মাঝখানে চুপচাপ বসে আছে আরোহী। জাম রঙা জামদানির আঁচলটা মাথা থেকে নেমে প্রায় পুরোটা মুখ ঢেকে রেখেছে ওর। তাকালে শুধু নিচের দিকে কোচলাতে থাকা দুধ ফর্সা হাত দুটোই দেখা যাচ্ছে। ঘরের চারপাশ ঘিরে বসে আছে বেশ কয়েকজন মহিলা, আর দু'তিনজন মেয়ে। একজন আরোহীর বয়সী হলেও বাকি দুজন আরোহীর চেয়েও বড়। অহনা, সিমি আর সুহানা। সুহানা আর সিমি দুইবোন। আনভীরের মেজো চাচার মেয়ে। অহনা আনভীরের ছোট বোন। সিমি প্রায় আরোহীর সমবয়সী'ই হবে। এবার এস এস সি দিয়েছে। ভদ্রমহিলারা চুপচাপ থাকলেও রুমজুরে এই তিনজনের মধ্যে চলতে থাকা ফুশুর ফাশুরে অতিষ্ট আরোহী। আসা থেকে মুখ তুলে কাউকে দেখা হয়নি আরোহীর।

এইতো সকালের ভাইয়ের সঙ্গে নাস্তার টেবিলে বসতে না বসতেই ওর মামী দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে জানায় সিকদার বাড়ি থেকে মানুষ আসছে ওকে দেখতে। কথাটা শুনতেই বুঁকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল আরোহীর তখন। খাবারের হাত থেমে গিয়েছিল। চোখ তুলে আহত, অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল ভাইয়ের দিকে। মিনহাজও অপরাধীর চোখে তাকিয়েছিল বোনের দিকেই। বলতে পারেনি কিছু মুখ ফুটে। শুধু আস্তে ইশারা করেছিল,শান্ত থাক।বাকিটা আমি দেখছি।আরোহী তখন জোর করে এক লোকমা খাবার মুখে তুলেছিল শুধু। গলা দিয়ে না নামলেও, তবুও খেয়েছিল মেয়েটা।

তারপর খুব দ্রুত সবকিছু ঘটে যায়। হুট্ করেই কোথা থেকে মামি এসে একটা শাড়ি গায়ে জড়িয়ে দেয়। চুল গুছিয়ে দেয়। লম্বা এজটা ঘোমটা টেনে দেয় মাথার ওপর। বারবার সতর্ক স্বরে বলে দেয় ও-কে,

“দেখো মা, কারো সামনে কিছু বলবেনা মুখ তুলে। চোখ তুলে তাকাইয়ো না। যা জিগাইবো, শান্তভাবে উত্তর দিবা। কোনো রকম অপ্রিত্তিকর কিছু করবা না। রুমে ঢুকেই আগে সালাম দিবা,বুঝছো?”

ননীর পুতুলের মতো আরোহী শুধু মাথা নেড়েছিল উপর নিচ। মামীর কথামতোই এসে মাথা নিচু রেখেই দু’হাত একসাথে করে সালাম জানিয়েছিল প্রথমে। এরপর থেকেই তো মিনিট ত্রিশেক যাবৎ এসে বসে রয়েছে। রয়েছে তো রয়েছেই। নড়ছে চড়ছে না আর।

ঘরের ভেতর এসে বসেছেন চারজন। আরোহী না দেখলেও বুঝেছে,এরা সবাই ওই খারাপ লোকটার মা, বোন'ই হবে। আঞ্জুমান এসেছেন। সাথে এসেছে তার জা মিষ্টি ও দুই মেয়ে। ভদ্রমহিলা দুজন নির্দিষ্ট দুরুত্তে বসলেও আরোহীকে ঘিরে বসেছে মেয়ে দুটো।আরোহী অসস্তিতে হাঁসফাঁস করছে ভীষণ।আনজুমান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটাকে। ঘুমটার আড়ালে চেহারাটা না বুঝা গেলেও দুধে আলতা বর্ণের মেয়েলি হাত দুটো দেখে অনুধাবন করতে পারলেন, মেয়েটার সুন্দর্য্যটুকু। তার ওই ঊশ্রীখঙ্খল ছেলে সরাসরি বিয়ের মতো কান্ড ঘটিয়ে ফেলেছে। এমন তেমন সুন্দরীতো হবেনা নিশ্চই। অবশেষে মিষ্টি ঘুমটা'টা সরালেন আরোহীর। আর তাতেই কীয়তক্ষণের জন্য থমকাললেন উপস্থিত সকলে।লোকমুখে শুনেছিলেন মেয়েটা নাকি দেখতে ভীষণ সুন্দর। কিন্তু,বাস্তবে এতোটাও মুনোমুগ্ধকর সুন্দরী হবে কল্পনা করেননি কেউ।

ঠিক যেন দুই বিঘা জমির বাগানে করা হাজারো গোলাপের মাঝে একদম অক্ষত, কোমল একটা ফুল! যাকে জোর করে ছিঁড়ে আনা হয়েছে একটু আগেই। আনজুমানের বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল যেন। এইজন্যই কি, এই অদ্ভুত, নিষ্পাপ সৌন্দর্যের কারণেই কি তার ছেলেটা এতটা উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল?চেয়েও চোখ সরাতে পারলেন না তিনি। অথচ মেয়েটার ভবিষ্যতের কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।ইস… এত সুন্দর একটা মেয়ে! অথচ এই বয়সেই কী নির্মমভাবে ঝরে গেল জীবনটা।অজান্তেই দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার।পাশে বসা মিষ্টিও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ইশারায় বুঝিয়ে দিলেন—বউ তাদের খুবই পছন্দ হয়েছে। ছেলের সঙ্গে মানাবেও দারুণ।তবে বড়রা চুপ থাকলেও বেশিক্ষণ চুপ থাকতে পারল না মেয়েগুলো।দু’জনই কৌতূহলী চোখে ঝুঁকে পড়ল আরোহীর দিকে। ঘোমটার ফাঁক গলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল নিজেদের নতুন ভাবিকে।

হঠাৎ করেই একজন উচ্ছ্বসিত গলায় বলে উঠল,

“ইশ! তোমাকে দেখতে তো একদম পাকিস্তানের হানিয়া আমীর-এর মতো লাগে ভাবি! তুমি তো মাশাল্লাহ অনেক সুন্দরী!"

আরোহী মাথা নিচু করেই বসে রইল। হাত দুটো আরও শক্ত করে চেপে ধরল। মেয়েটা থামল না।গলা উঁচিয়ে আরও বলল,

“আমরা আগেই জানতাম—আমাদের ভীর ভাই যেই সেই মেয়েকে তো আর পছন্দ করবে না!”

পাশে বসা আরেকজন হালকা করে তাকে কনুই দিয়ে গুতো দিল।

“এহ! কী বলিস এসব?আমাদের ভাবি পাকিস্তানি না, তুর্কি মেয়েদের মতো দেখতে!”

একটু ভেবে বলল,

“ওই যে এক তুর্কি নায়িকা আছে না? নামটা এখন মনে নাই। অনেক ফর্সা, একদম দুধের মতো। ঠিক ওরকমই দেখতে তুমি!”

তারপর আরও উৎসাহ নিয়ে বলল,

“ভাবি, তুমি এত ফর্সা কেন?”

মেয়েদুটো থামছেই না।নিজেদের মধ্যে বলাবলি শুরু করল,

“জানো,আমাদের ভীর ভাইও কিন্তু কম না! ওইযে বর্তমানে AI দিয়ে বানানো শর্ট ড্রামার রোমান্টিক গ্যাংস্টার, মাফিয়া টাইপ নায়ক গুলো আছেনা ওদের মতো দেখতে লাগে আমাদের ভীর ভাইয়াকে!”

“হু একদম সেইম স্টাইল! শুধু গায়ের রঙটা একটু শ্যামলা,এই যা! ভাইয়া কিন্ত আমাদের আগে খুব ফর্সাই ছিল। সারাদিন রোদ্রে রোদ্রে ঘুরে বেড়ায় তো তাই এখনো রংটা একটু চাপা হয়ে গেছে। কিন্ত আমাদের ভাইয়ার চোখগুলো কিন্তু মাশাআল্লাহ!উফ! সবাই তো অবসেসড ওগুলার ওপর!ইস্পেশাললি আমাদের গ্রামের মেয়েরা! কি বলবো ওদের কথা! বলা শুরু করলে পুরো দিন শেষ হয়ে যাবে!"

দু’জন হেসে ফেলল একসাথে। ওদের সেই ফিসফাস, হাসি, উচ্ছ্বাস সবকিছুই খুব স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে আরোহী।তবুও মেয়েটা প্রতিক্রিয়াহীন।নেই কোনো

আনন্দ, আগ্রহ আর না কৌতূহল। শুধু ঘোমটার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠল আবার। ঠোঁট কামড়ে সহ্য করে চুপচাপ বসে রইল তবুও। বলল না একটি বাক্যও। এইসব কথার সঙ্গে তার জীবনের যে কোনো মিল'ই খুঁজে পায়না।

ওর কাছে,এটা কোনো রূপকথা না।বরং তিক্ত একটা বাস্তব দুঃস্বপ্ন।

“তোমার সাথে কিন্তু ভাইয়াকে সেই মানাবে ভাবি।—তুমি ভাইয়াকে একটু ফর্সা হওয়ার টিপস দিলেই,দুজনে একদম খাপে খাপ হয়ে যাবে!”

দ্বিতীয়জন পাশ থেকে সঙ্গে সঙ্গে কনুই দিয়ে গুতো মারল।

“আরে গাধা টিপস-টাপস দেওয়ার দরকার কী?

ভাবির শরীরের ঘষা খেলেই দেখবি—আমাদের ভীর ভাই আগের মতো ফর্সা হয়ে যাবে!আমাদের ভাই কি জন্মগত শ্যামলা নাকি?"

দুজনের ফিসফাঁসে মহাবিরক্ত উপস্থিত বড়োরা।

কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হলেন আনজুমান। কড়া গলায় সাশালেন তিনি,

“এই! এত কথা কিসের?চুপচাপ বসে থাক। আর একটা কথাও যেন শুনতে না পাই!"

মেয়েদুটো চমকে উঠল। চুপ করে গেল সাথে সাথে।

আনজুমান এবার নিজের ব্যাগটা পাশে টেনে নিলেন।

চেইন খুলে ভেতর থেকে একটা বক্স বের করলেন। সাবধানে খুললেন সেটা। ভেতর থেকে বের হলো—

দুইটা সোনার বালা,আর একটা মোটা স্বর্ণের চেইন।

জিনিসগুলো নিয়ে ঝুকে গিয়ে এগিয়ে বসলেন আরোহীর সামনে। ভদ্রমহিলাকে এগোতে দেখে মাথা আরও নিচু হয়ে গেল আরোহীর। আনজুমান বিনা শব্দে ওর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিয়ে যত্নসহকারে আলতো করে বালা দুটো পরালেন দুই হাতে। ফর্সা হাতে সোনালি বালাগুলো চকচক করে উঠল কেমন।

মনে হলো,এই সোনার ঔজ্জ্বল্যও যেন হার মানছে সেই হাতের কোমলতার কাছে। অতঃপর গলায় চেইনটাও পরালেন। গলায় সোনালি চেইনটা ঝলমল করে উঠল।আনজুমান স্থির হয়ে মুগ্ধতায় তাকিয়ে পরখ করলেন মেয়েটাকে এবার।সেই দেখাতে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম নিলো। একদিকে যেমন মায়া হলো অপরদিকে খানিকটা অপরাধবোধ ও সৃষ্টি হলো।

***

রাত ঠিক কাঠকাঠ বারোটা। দিনের শেষ কোলাহলটুকুও বহু আগেই গিলে ফেলেছে শালিকপুর বাজারের ঘন নিস্তব্ধতা। সারি সারি টিনের দোকানপাট অন্ধকারে ডুবে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। দূরে কোথাও মাঝেমধ্যে কুকুরের ক্ষীণ ডাকে কীয়তক্ষণের জন্য নীরবতার বুক কেঁপে উঠলেও তারপরই আবার সবকিছু থেমে যাচ্ছে আগের মতোই।

সেথায় মাত্র ক্লাবঘরটাই জ্বলছে রোশনাই। হলদেটে ম্লান আলোয় ভরে আছে ঘরটা।ঘরের ঠিক মাঝ বরাবর রাখা কাঠের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আনভীর। তার স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ত ভঙ্গি আজও বিন্দুমাত্র বদলায়নি। এক পা তুলে সামনে রাখা টেবিলের ওপর রেখেছে।ডান হাতে ধরা জ্বলন্ত আধখাওয়া সিগারেটর অর্ধেকাংশ।চোখ দুটো বন্ধ করে সেথায় সুখটান দিচ্ছে আরামসে। উপস্থিত বলতে শুধুমাত্র আনভীরের কাছের বন্ধুগণ'ই।তবে আশ্চর্যজনকভাবে কারও মুখে কোনো কথা নেই। নেই স্বাভাবিক হাসিঠাট্টার চিহ্নওটুকুও। বরং প্রত্যেকের চেহারায় একটা টানটান চাপা উদ্বেগ ফুটে আছে।

সকলেই বারবার অস্থির চোখে দরজার দিকে তাকাচ্ছে। অন্যদিকে অবিশ্বাস্য রকম শান্ত হয়ে বসে আছে আনভীর।আর বন্ধুর এই শান্ত ভাবটাই ঠিকঠাক হজম করতে পারছেনা ওর বন্ধুরা। কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে, আনভীর যত শান্ত থাকে, ভেতরে ততটাই ভয়ংকর কিছু জমতে থাকে ওর।

অমনি এক ধাক্কায় খুলল ক্লাবঘরের দরজাটা।দু’জন লোক মিলে একটি ছেলেকে ধরে রানতে টানতে নিয়ে এলো ভিতরে। ছেলেটার অবস্থা করুণ। ছেলেটার মুখটা শুকনো, এইটুকুন হয়ে আছে।লাভলু সামনে এগিয়ে এসে আনভীরের কানের পাশে ঝুঁকল তখন। আস্তে করে বলল,

“ভাই, এইটাই ওই পোলা।”

একটানে চোখ খুলল আনভীর। সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। অতঃপর দৃষ্টি স্থির করল আগত ছেলেটার ওপর।

“নাম?"

মানবের বরফশীতল গলায় ঢোক গিলল ছেলেটা।

“সা… সাব্বির…”

“শোনলাম আমার বাপের নামে আজকাল গলা উঁচিয়ে কথা বলে বেড়াচ্ছিস!"

তরাক করে এলানো শরীরটা টানটান করে বসল মানব। প্রশ্নটাও করল খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই। অথচ তাতেও কেমন কেঁপে উঠল ছেলেটা। জড়োসড়ো দাঁড়িয়ে নিচু সরে উত্তর করল,

“ন না...নাতো ভাই।"

"মিথ্যা! আই ফাকিং হেইট ল্যায়র্স!সহ্য হয়না সালা ওদের জানিস তো? মাথা হট হয়ে যায়!"

গর্জে উঠল মানব। ছেলেটা তড়িঘড়ি মাথা নাড়িয়ে নতি স্বীকার করে জানাল,

"আ আমি ভুল কইরা ফেলছি ভাই। আমি ওইভাবে কইতে চাই নাই। বিস্বাস করেন আমার ঐরকম ইনটেনশন আসিলোনা!"

“তো কীভাবে বলতে চাইছিলি?”

চোখ সরু করে উল্টো প্রশ্ন করল আনভীর এবার।

সাব্বির ছেলেটা কেঁপে আসা গলায় বলল,

“ভাই, মানুষজন যা কয়,ওইটাই কইছিলাম। ভুল হইছে ভাই। মাফ কইরা দেন। আমি আর জীবনেও আপনার বাপের নাম মুখে আনবো না। খোদার কসম ভাই!”

“কি বলে মানুষজন?”

সাব্বির ছেলেটার হাতের তালু ঘামছে। কপাল বেয়েও তরতর করে জড়ছে ঘাম। গলা শুকিয়ে মরুভুমি। তবুও আনভীরের দৃষ্টি এড়িয়ে যাওয়ার সাহস হলো না।

“অপেক্ষা! অপেক্ষা জিনিসটা বড্ড বিরক্তিকর জানিস তো। ছোট থেকে সবকিছু আয়ত্ত করতে পারলেও এটা পারিনি করতে।আমায় অপেক্ষা করাস তুই?"

বড্ড স্বাভাবিক গলায় কথাগুলো বলল আনভীর। অথচ ওই শান্ত কণ্ঠের নিচে চাপা পরে থাকা হিংস্রতা স্পষ্টই টের পেল উপস্থিত সকলে।

“ক-কইতাসি ভাই! কয় চেয়ারম্যান সাব… মানে… আপনার বাপ উনি নাকি নিজের মতো করে সব চালায়। উনার নিজ মর্জিমতো সবকিছু ঘটে এখানে। আর উনি নাকি নিজের লোক ছাড়া কাউরে মানুষই মনে করে না।”

রাজন পাশ থেকে অস্বস্তিতে নড়েচড়ে উঠল।সাব্বির ছেলেটা অনর্গল বলেই যাচ্ছে,

“আরও কয়, উনার পোলাপানও নাকি একই রকম। জোর কইরা যা খুশি তাই করে। জোড় কইরা এক মেয়ের ভাইরে আটকাইয়া মধ্যে রাইতে বিয়াও করসে।"

“আরও কিছু?”

সাব্বির কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করল একবার। তারপর খুব আস্তে বলল,

“ এই বংশের লোকজন,ক্ষমতার লোভে মানুষরে মানুষ মনে করে না। ক্ষমতার বড়াই দেখিয়ে নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপাইয়া দেয় নিঃসঙ্কোচে। টাকা আর দাপট দেখিয়ে গরিবদের হক মেরে খায়!"

শেষের বাক্যদয়ে ফট করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায় আনভীর। এগিয়ে গিয়ে একদম কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল সাব্বিরের।

“আমার বাপ,এই গ্রামের জন্য কী করছে তা জানিস?

এই যে উন্নত মানের পাকা রাস্তা দিয়া হাঁটাচলা করোস,এই রাস্তাগুলা, এই বাজার, এখানে তৈরী হওয়া স্কুল থেকে কলেজ, হাসপাতাল এই সবকিছু কার টাকায় হয়েছে?”

কথাটা শেষ করেই সজোরে এক চর বসায় মানব। সেই চড়ের আঘাতের তীব্রতায় দুলে উঠল সাব্বির। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে ছিটকে বেরিয়ে এলো লৌহ।

“মানুষ যা কয়, সেইটাই মুখে আনবি?"

সাব্বির কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“ভাই ভুল হইছে। আমি আর কইব না।আল্লাহর কসম!"

আনভীর এক ঝটকায় কলার চেপে ধরল ছেলেটার। টেনে একেবারে নিজের সামনে এনে দাঁড় করাল।বলল হিসহিস করে,

“শুন,ভালো করে শুনে রাখ।আমার নামে কথা বললে, আমার বালও আসে যায়না। তবে কথাটা যদি হয় আমার পরিবার আর আমার বাবাকে নিয়ে তখন,পাতালের তলে লুকিয়ে থাকলেও ওখান থেকে বের করে এনে ওর হৃদপিন্ড কুরবানীর গরুর মতো টুকরো টুকরো করতে দ্বিধাবোধ করিনা আমি।"

ঠিক এরপরের মুহূর্তেই পাশের চেয়ারটা তুলে নিয়ে সজোরে আঘাত করল সাব্বিরের গায়ে।ধাম করে একটা শব্দ হলো শুধু। ক্ষনিকেই মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল সাব্বির।ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে চিৎকার করে উঠল,

“ভাই! মাফ কইরা দেন! মাফ কইরা দেন ভাই! আর জীবনেও এমন ভুল করুম না!”

তবুও মায়া হলোনা নির্দয় পুরুষটার।উল্টো আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সজোরে লাথি বসাল সাব্বিরের পেটে।

“আমার পরিবাররে মুখে নিবি?নেক্সট টাইম আমার পরিবারের নাম মুখে নিয়া তো দূর,আমাদের বাড়ির দারোওয়ান কে দেখলেও যেন তর বুক কাপে সেই ব্যবস্থা করছি আমি বাইনচোদ!"

গর্জে উঠছে আনভীর। থামছেই না। পরিস্থিতি অনুকূল ভেবে রাজন এগিয়ে এসে থামাতে চাইলো আনভীর কে। সাব্বির হাত তুলে বাঁচার চেষ্টা করছে। কাঁদছে, কাকুতি মিনতি করছে,

“ভাই আমি আর কইব না। আর না। ভা ভাই..

প্যান্ট এর পিছনে গুঁজে রাখা রিভালবারটা টেনে বের করে সাব্বিরের বুক বরাবর নিশানা করতেই রাজন এক ঝটকায় আনভীরের হাত টেনে সরালো। পাশাপাশি চোখের ইশারায় লাভলুকে বুঝিয়ে দিল সাব্বিরকে এখনই এখান থেকে সরিয়ে নিতে।

লাভলু আর বাকি দু’জন তাড়াতাড়ি সাব্বিরকে টেনে তুলে বাইরে নিয়ে গেল। ছেলেটা তখনও কাঁদছে, কাঁপছে। আনভীর দাঁড়িয়ে আছে স্থির হয়ে। বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। রাগ চেপে রাখতে গিয়ে ফোঁসফোঁস শব্দ বেরোচ্ছে শুধু।

"তুই ইদানিং একটু বেশিই ওভার রিয়েক্ট করে ফেলছিস না? ছেলেটা তো প্রথম থেকেই মাফ চাইছে, ভুল স্বীকার করছে।"

আনভীর আবার চেয়ারে গিয়ে বসল। অন্য একটা চেয়ার টেনে নিল। সিগারেট ধরাল। ধোঁয়া ছাড়ল সেটার। হাতে ধরা সিগারেটটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, তবুও অন্যমনস্কভাবে টান দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক।

“ভুল?বাইনচোদ মিথ্যা বলে গেছে প্রথম থেকেই। সত্যটা বলে মাফ চাইলে হয়তো ক্ষমা করার কথা ভাবতাম। তবে সালা নিজের জান বাঁচাতে গিয়ে একের পর এক মিথ্যা বলে গেছে।

"তুই কিভাবে জানলি ও মিথ্যা বলছিলো?"

রাজনের ভ্রু কুচকানো প্রশ্নে আনভীর বাঁকা হেসে বলল,

“শাহরিয়ার আনভীর সিকদার, কাঁচা প্লেয়ার না।প্রমান ছাড়া আমি মাঠে নামিনা। আরও অনেক নোংরা নোংরা কথা বলছে আমার বাপরে নিয়ে। কিন্তু সাহস পায় নাই মুখে আনতে। আর তুই তো জানিস এই দুনিয়ায় আমি দুটো জিনিস'ই হেইট করি, মিথ্যা আর বিস্বাসঘাতকতা! এই দুইটা হলো আমার দুশমন।মাথা হেং হয়ে যায় বাল মিথ্যা শুনলে!"

চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনল শুধু রাজন। মানুষ বলে, যে জিনিসটা কেউ সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে,অপছন্দ করে, নিয়তি একসময় তাকে ঠিক সেই জিনিসটার সামনেই দাঁড় করিয়ে দেয়। আল্লাহ জানে এর ভবিষ্যতে ঠিক কি লিখা আছে। ভেবেই একটা দীর্ঘশাস ছাড়ল রাজন।

চলবে....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন