#নয়নিকা -১৩
#তিশা
ক্যাটাগরি- রাজনৈতিক
জনরা- রোমান্টিক, থ্রিলার
বিধ্বস্ত অফিস কেবিনে বসে আছে অনিকেত। এই মুহূর্তে যে কেউ দেখলেই বলে দিবে কিছু পূর্বে এই কক্ষে ধ্বংস যজ্ঞ চালানো হইছে।অন্য প্রতিদিনের মতই আজকের দিনটাও স্বাভাবিক ভাবেই শুরু হয়েছিলো অনিকেতের। অফিসে আসার কিছু পরে ফোন আসে বাংলাদেশে তার এক কারখানায় গত রাতে আগুন লেগেছে শুধু আগুন লেগেছে সেটা নয় পুরো ভস্মীভূতে পরিণত হয়েছে সম্পূর্ণ ইমারত। অবাক করা বিষয় হচ্ছে এত বড় একটা অগ্নিকাণ্ড ঘটে গেলো অথচ সারারাত নাকি কেউ বুঝতেই পারেনি। অনিকেত যখন দুশ্চিন্তার পাহাড় নিয়ে ভাবনায় মত্ত সেই সময়ে কেবিনে প্রবেশ করে নিশাদ।
- মাথা ঠাণ্ডা করো অনিকেত এখন রাগ করে সিদ্ধান্ত নিলে সেটা কখনোই তোমার জন্য মঙ্গলকর হবে না।
- আমি আগামীকাল বাংলাদেশ যাচ্ছি।
ছোট্ট জবাব অনিকেতের, ওর মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলো নিশাদ তারপর জানালো,
- বেশ তো চলো আমিও যাবো কতদিন নিজের দেশের জল হাওয়া শরীরে লাগে না।
বলে আয়েশ করে বসলো সোফায়। অনিকেত নিশাদের দিকে তাকিয়ে ললাটের চিন্তার ভাজ ফেলে বলল,
- তোমার কি মনে হয় এটা কার কাজ হতে পারে।
নিশাদ গর্দান বাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে বলল,
- তুমি যাকে ভাবছো সে ছাড়া আবার কে!
************
গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় ব্যস্ত ছিল নির্বাণ ,সীফাত আর ইশান এমন সময় নবনী ট্রে তে করে চা নিয়ে এলো সাথে রকমারি ভাজাপোড়া। পিছনে গুটিগুটি পদক্ষেপে নয়নিকা এলো। নবনী টেবিলের উপরে ট্রে রেখে নয়নিকাকে সিঙ্গেল সোফায় বসিয়ে দিলো আর নিজে ফ্লোরে নির্বাণের পায়ের পাশে বসে পড়লো। সবার দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিতেই নির্বাণ ভ্রু কুচকে বলল,
- আমার কফি কই? জানিস না আমি চা খাই না।
নবনী নিজের চায়ের কাপ হাতে নিতে নিতে দুষ্টু হেসে বলল,
- হয়তো আজ থেকে খাবে। কারণ চা নয়নিকা বানিয়েছে ওকে রান্নাঘরে নিয়ে বললাম কি বানাতে চাও ওমা সে দেখি নিজে নিজেই চায়ের ডিব্বা নিয়ে নিজের মত চা বানানো শুরু করে দিছে যদিও চিনির বদলে লবণ দিতে যাচ্ছিলো।
নবনীর কথা শেষ হওয়ার আগেই দেখা গেলো নির্বাণ চায়ের কাপ হাতে তুলে নিয়ে চুমুক দেয়া শুরু করেছে।নবনী ঠোঁট চেপে হাসি সংবরণ করলো। সীফাত মনে হলো পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য দেখছে। ইশান চুপিচুপি সীফাতের কানের কাছে মুখ দিয়ে বলল,
- আজ থেকে আমি তোর মত চাকরি করবো।
সীফাত ভ্রু কুচকে একটু বিরক্ত ভাবে বলল,
- তুই না মেয়ে মানুষের পারফিউম বেচিস তুই আবার কি চাকরি করবি।
- আমিও তোর মত চামচা হবো?
- মানেহ?
- আমি মিনিস্টারের হোম মিনিস্টারের চামচা হবো।
ইশানের কথাটা যে সীফাতের খুব একটা বোধগম্য হলো না সেটা তার চেহারায় স্পষ্ট। তাই ইশান একটা বোকাসোকা হাসি দিয়ে বলল,
- মিনিস্টার মানে ভাই আর তার হোম মিনিস্টার মানে আমাদের ভবিষ্যৎ ভাবী নয়নিকা যতদূর বুঝতেছি অদূর ভবিষ্যতে হোম মিনিস্টারের হাতেই সকল ক্ষমতা হস্তান্তর হবে তাই আমি যদি ভাবীর চামচা থুক্কু পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট হই তাহলে তোর থেকে আমার পাওয়ার বেশি থাকবে।
ফিসফিস করে বললেও ওদের কথা নির্বাণ শুনতে পাচ্ছিলো ইশানের কথা শুনে নির্বাণের ঠোঁটে খেলে গেলো সুক্ষ্ম এক হাসি যেটা কারো নজরে এলো না। অপরদিকে সীফাত ইশানের কথা শুনে বিরক্তিকর এক্সপ্রেশন দেখালেও মনে মনে উদাস হয়ে ভাবলো ইশান খুব ভুল কিছু মনে হয় বলেনি নাহলে চা অপছন্দ করা নির্বাণ শাহরিয়ার চা খাই ভবিষ্যতে যে আরো কি কি হবে!
ইশান সীফাতকে খুচিয়ে এবার মনোযোগ নয়নিকার দিকে নিয়ে বলে,
- মাশাল্লাহ ভাবী চা কিন্তু আপনি খুব সুন্দর বানান।
কিন্তু যাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বলল সে তখন টেবিলের উপরে থাকা নির্বাণের সানগ্লাস পর্যবেক্ষণ করতে ব্যস্ত।
*****************
নয়নিকার ঘরের দরজায় দাড়িয়ে যখন নয়নিকাকে দেখতে পেলো না নির্বাণ তখন ভিতরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকিয়ে খুজতেই বুঝতে পারলো নয়নিকা ব্যালকনিতে।ব্যালকনির দরজায় দাঁড়াতেই নির্বাণ অনুভব করলো ওর হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি দ্রুতই স্পন্দিত হচ্ছে। ব্যালকনির বেতের সোফায় বসে থাকা ওই ভয়ংকর সুন্দরী রমনীই যে তার হেতু সেটা ভালোই উপলব্ধি করতে পারলো নির্বাণ।সকালের সোনালি আলোয় বসে থাকা নয়নিকাকে হঠাৎ করেই অপার্থিব মনে হলো তার কাছে।অনুভূতিহীন নিষ্পলক নেত্র তখন অসীম আকাশের শূণ্যতায় ডুবে আছে নির্বাণের মনে হলো এই বিষাদিনীর সৌন্দর্য ভিঞ্চির মোনালিসাকেও ম্লান করে দিচ্ছে।হঠাৎ নয়নিকা দৃষ্টি ঘুরিয়ে নির্বাণের দিকে তাকাতেই নির্বাণের ঘোর কেটে গেলো। হাসিমুখে নয়নিকার কাছে এসে বলল,
- চুল মুছোনি কেন ভিজে যাচ্ছো তো।
কথাটা বলে নির্বাণ একটা টাওয়াল এনে নয়নিকার চুল মুছিয়ে দিতে লাগলো।
- কেন বাঁচিয়েছেন আমাকে আর এতো কেয়ারই বা কেন করছেন?
চুল মুছতে থাকা ব্যস্ত হাত হঠাৎ থেমে গেলো মুহূর্তেই ঘুরে নয়নিকার সামনে এসে বসে পড়লো ,নির্নিমেষ চেয়ে রইলো ওই গভীর চোখে। একে অপরের চোখে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো যেন দুজনের চোখে ভীড় করেছে সহস্র প্রশ্নমালা।
**************
মধ্যরাত, তালুকদার নিবাসের সামনে এসে দাড়িয়েছে মেরুন কালারের এক গাড়ি দরজা খুলে বেরিয়ে এলো চকচকে কালো সু পরিহিত একজোড়া পা। গাড়ি থেকে নেমে গটগট করে সোজা ঢুকে গেলো বাড়ির ভিতরে।
বসার ঘরে কারো অপেক্ষায় পায়চারি করছেন সাফায়ত তালুকদার পায়ের শব্দ শুনে পিছন ফিরে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে দেখে খুশির ঝলক দেখা দিলো সাফায়ত তালুকদারের মুখে।এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো মানবটিকে তারপর উৎফুল্লতার সহিত বলল,
- অনিকেত তুমি এসে গেছো আমার আর কোন চিন্তা নেই আমি জানি তুমিই একমাত্র সব সমস্যার সমাধান করতে পারবে।
অনিকেত একটা বাকা হাসি দিয়ে বলল,
- সমস্যা সমাধান নয় সমস্যা উপড়ে ফেলতে বিশ্বাসী আমি মামা।
**************
মুখোমুখি বসে আছে নয়নিকা আর নির্বাণ।নয়নিকার চেহারায় কোন অনুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে কি না বোঝা যাচ্ছে না আর নির্বাণ এক ভ্রু উচিয়ে নয়নিকার দিকে তাকিয়ে আছে চেহারায় তার শ/য়/তা/নি হাসি ফুটে আছে।নয়নিকা নির্বিকার ভাবে বলল,
- আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না তো?
- উহু তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে ভাল্লাগবে না তাই বাঁচিয়েছি।
নির্বাণের খাপছাড়া উত্তরে নয়নিকা একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
- নবনী ,ইশান এরা আপনার লোক আপনিই ওদেরকে আমার পিছনে গুপ্তচর করে পাঠিয়েছেন?
- ওরা আমার ভাই বোন আর গুপ্তচর করে পাঠায়নি তোমার খেয়াল রাখতে পাঠিয়েছি।
- কেন?
- উদ্দেশ্য তো ছিল কোন একজনকে দেয়া কথা রাখার কিন্তু পরবর্তীতে সেটা ছাড়াও আর একটা কারণ যোগ হয়।
- কি সেটা?
- ওই যে তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে ভাল্লাগবে না আমার।
- হেয়ালি করছেন?
- নির্বাণ শাহরিয়ার হেয়ালী করে না নিজের মানুষের ব্যাপারে তো আরো নই?
নয়নিকা সোফায় হেলান দিয়ে উদাস ভাবে বলল,
- আমি থাকবো না আপনার কাছে।
নির্বাণ হেসে একটু এগিয়ে এসে নয়নিকার চুল ধরে হালকা টান দিয়ে নিজের দিকে টেনে চোখে চোখ রেখে বলল,
- তুমি জানো তুমি এখন কোথায় আছো?
- অস্ট্রেলিয়া?
নির্বাণ বাকা হেসে জানায়,
- বেলজিয়ামে।
নয়নিকা বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে গেলো নির্বাণ ওর চুলগুলো কানের পিছনে গুজে দিয়ে নয়নিকার কোমল হাতদুটো নিজের মুঠোবন্দী করে নরম সুরে বলল,
- শোনো সুন্দরী আমার তোমাকে চাই এখন এটাকে যদি অবসেশন বলো তাহলে তাই যদি ভালোবাসা বলো তাহলে তাই মোদ্দা কথা আমার তোমাকে চাই।এখন তুমি আমাকে চাও বা না চাও তুমি আমার কাছেই থাকবে। আমাকে ভালোবাসতে আপন ভাবতে সময় লাগবে তোমার?লাগুক।এক বছর ,দুই বছর নাহলে দশ বছর যতদিন সময় দরকার নাও কিন্তু তুমি আমার কাছে আমার সামনে থাকবে ব্যস! আর যদি মনে করো চলে যাবে তাহলে ভুলে যেও না আমি প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তাল জলরাশির মধ্যে থেকে তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছি।
একটু থেমে নির্বাণ নয়নিকার চিবুক স্পর্শ করে পুনরায় বলল,
- মাথায় প্রেসার নিও না নিজের মতো থাকো কেউ তোমাকে কোন কিছুতে ফোর্স করবে না। আর আমার মনে হয় না তুমি অনিকেতের কাছে ফিরে যেতে চাও সুতরাং সব ভাবনা চিন্তা বাদ দাও সুস্থ হও আর আমাকে চিন্তামুক্ত করো।
নয়নিকা এতক্ষণ অবাক হয়ে নির্বাণের কথা শুনছিলো অনিকেতের নাম শুনে তার চেহারার রঙ উড়ে গেলো ঝাড়া মেরে নির্বাণের হাত ছাড়িয়ে উঠে দাড়ালো তারপর পাগলের মত ছটফট করতে করতে বলতে লাগলো ,
- অনিকেত আমাকে খুজে ফেলবে আমাকে আবার নিয়ে যাবে আমি যাব না কিছুতেই যাব না আমার বাচ্চাকে মে/রে ফেলেছে ,আমি বাচাতে পারিনি আমার সন্তানকে ,আমিও যাব আমার সন্তানের কাছে।
নির্বাণ বুঝলো অনিকেতের নাম শুনে আবার প্যানিক এট্যাক করেছে দ্রুত নয়নিকাকে নিজের বাহুডোড়ে আবদ্ধ করে বলতে লাগলো,
- অনিকেত আসবে না নিতে আমি আসতে দেবো না ,শুধু অনিকেত কেন পৃথিবীর খারাপ কোন কিছুই তোমার কাছে আসতে পারবে না আর।
নয়নিকা তবুও প্রলাপ করছে আর কাঁদছে নির্বাণ ওকে নিয়ে সোফায় বসে পড়লো। উরুর উপরে নয়নিকাকে বসিয়ে এক হাত পিঠের পিছন দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে আর এক হাত দিয়ে চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
- দেখো অনিকেত তো অস্ট্রেলিয়া আর তুমি তো বেলজিয়ামে তাহলে ও কিভাবে আসবে বলো? অনিকেত তো জানে তুমি সমুদ্রে হারিয়ে গেছো তাই না?
নয়নিকা হয়তো একটু বুঝলো তাই শান্ত হয়ে মাথাটা নির্বাণের বুকে এলিয়ে দিয়ে একা একা বিড়বিড় করতে করতে চেতনা হারালো।
নয়নিকা জ্ঞান হারিয়েছে বুঝে ফোস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো একটা ,নিজের উপরেই রাগ হচ্ছে তার এখন কেনো যে অনিকেতের কথা বলতে গেলো!
.......................চলমান....................
বিঃদ্রঃ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।