#নয়নিকা -১৯
#তিশা
ক্যাটাগরি- রাজনৈতিক
জনরা- রোমান্টিক, থ্রিলার
সারারাত নয়নিকা আর নির্বাণের চিন্তায় ঘুমাতে পারেনি অনিকেত ভোরের দিকে একটু চোখ লেগে এসেছিলো কিন্তু সকাল হতেই কাজের লোকের হাকডাকে ঘুম ভেঙে গেলো তার। সাফায়েত তালুকদার নাকি তাকে জরুরি তলব করেছেন নিচে।
- কি হয়েছে মামা?
সাফায়েত তালুকদার কিছু না বলে তাকে টিভির দিকে ইশারা করলেন। সোফায় বসে টিভিতে নজর দিতেই যেন বজ্রাঘাত হলো তার মাথায়।
' বিশিষ্ট শিল্পপতি ওরফে সাবেক মন্ত্রী সাফায়েত তালুকদারের ভাগ্নে অনিকেত মির্জার পর্দা ফাস।'
নিউজে দেখানো হচ্ছে অস্ট্রেলিয়ায় অনিকেতের অবৈধ ব্যসসার পুরো বিবরণ সেই সাথে বাংলাদেশ থেকে বেআইনী অস্ত্র পাচার সহ অনিকেতের যত রকমের অবৈধ ব্যবসা আছে সবকিছু উপযুক্ত প্রমাণসহ তুলে ধরা।এবং সেই সাথে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স এর অভিযোগ আছে তার উপরে বিভিন্ন সময়ে নয়নিকার উপর হওয়া অ/ত্যা/চা/র এর ভিডিও আছে তবে নয়নিকার মুখটা বোঝা যাচ্ছে না।অনিকেত বুঝতে পারছে না এগুলো মিডিয়ার কাছে গেলো কিভাবে। এই তথ্যগুলো তো খুবই গোপনীয় ভাবে সংরক্ষণ করা তার থেকে বড় প্রশ্ন নয়নিকাকে মা/র/ধ/র করার ভিডিও কিভাবে আসলো এগুলো তো ঘরের ভিতরের ঘটনা!
*******************
নির্বাণ আজ কড়া আদেশ জারি করেছে বাড়িতে কেউ অনিকেতের ব্যাপারে কথা বলবে না এবং নয়নিকা যেনো কোনভাবে নিউজ না দেখতে পারে তার সকল ব্যবস্থা করে রেখেছে।ইশান আর নবনীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে সারাদিন নয়ানিকাকে ব্যস্ত রাখতে।
তালুকদার নিবাসের সামনে সাংবাদিকদের ভীড় জমা হয়েছে। সাফায়েত তালুকদার অনিকেতকে ভিতরেই থাকতে বলেছেন। সাফায়েত তালুকদার বের হতেই সাংবাদিকেরা তাকে একের পর এক প্রশ্নবাণ ছুড়ছেন। তালুকদার কোনভাবে সাংবাদিকদের শান্ত করে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
**********************
- আমার ইউরোপ ফিরে যাওয়ায় ভালো আপাতত।
নিশাদের কথার বিপরীতে অনিকেতকে নিশ্চুপ দেখা গেলো। আপাতত তার হাতে যে কিছু নেই সেটা স্পষ্ট। নিশাদ পুনরায় বলল,
- তোমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল নির্বাণকে হালকাভাবে নেয়া। যাই হোক আমি কালকের ফ্লাইটে চলে যাচ্ছি এখানে থেকে অযথা সময় নষ্ট করার কোন কারণ দেখছি না।
নিশাদ চলে যেতেই অনিকেত সোফায় শরীর হেলিয়ে দিয়ে চিন্তায় ডুবে গেলো। আপাতত অস্ট্রেলিয়ায় সে ফিরতে পারবে না অস্ট্রেলিয়ান সরকার তার সমস্ত ব্যবসা ব্যান করে দিয়েছে সেই সাথে তার অস্ট্রেলিয়ায় প্রবেশও নিষিদ্ধ জারি হয়েছে তার জন্য।
********************
নয়নিকা খুবই বিরক্ত গত দুদিন বাসায় বিদ্যুৎ নেই জেনারেটর চলছে ফোনে নেট কাজ করছে না ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগছে ওর কাছে।নির্বাণ তখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ফাইল পত্র ঘাটাঘাটি করছিলো।
- আপনি আসলেই মন্ত্রী?
নয়নিকার হঠাৎ প্রশ্নে নির্বাণ নয়নিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
- কোন সন্দেহ আছে?
- হ্যা।
- গুড।
এবার নয়নিকার মেজাজ খারাপ হলো দুম করে সোফায় বসে বলল,
- একজন মন্ত্রীর বাড়ি গত দুদিন কারেন্ট নেই ইন্টারনেট নেই এইটা কোন কথা?
- আগামীকাল চলে আসবে সব।
- হুহ মন্ত্রীর এই অবস্থা হলে না জানি জনগণের কি হাল।
বলেই দুপদাপ করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলো। নির্বাণ নয়নিকার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে। নবনী পাশে এসে বসতেই নির্বাণ জিজ্ঞেস করলো ,
- তারাক মেহতা দেখতে পারছে না বলে মেজাজ খারাপ?
- শুধু কি তাই খাওয়ার সময় গোপাল ভাড়ও দেখতে পারছে না গতকাল রাতে ইশান ভাইয়া না পেরে বাইরে যেয়ে গোপাল ভাড় ডাউনলোড করে এনে দিছে কয়েকটা। সে নাকি এরপর থেকে ব্যাক আপ হিসেবে গোপাল ভাড় আর তারাক মেহতা ডাউনলোড করে রাখবে।
নির্বাণ হেসে দিয়ে বলে ,
- এই চরিত্র কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলো কে জানে?
- বয়সের তুলনায় একটু বেশি মেন্টাল প্রেসার আর ফিজিক্যাল এবিউজের শিকার হয়েছিলো তো এজন্য বোধহয় সব সরলতা ,চঞ্চলতা ঢাকা পড়ে গেছিলো।
*********************
গুলশানের এক নামীদামী রেস্টুরেন্টে মুখোমুখি বসে আছে নির্বাণ আর অনিকেত।নীরাবতা ভেঙ্গে অনিকেত আগে প্রশ্ন করলো,
- নয়নিকাকে কোথায় পেয়েছিস তুই?
- তুই যেখানে ছেড়েছিলি?
- হেয়ালী করবি না নয়নিকা আমার স্ত্রী।
নির্বাণ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
- পুরো দুনিয়া জানে এখন নয়নিকা তোর কেমন স্ত্রী ছিলো।
অনিকেত রেগে চিল্লিয়ে উঠলো ,
- তুই আমার স্ত্রীকে তোর কাছে রাখতে পারিস না।
- আমি অনেক কিছুই পারি তার নমুনা ইতোমধ্যে তুই দেখে ফেলেছিস। আর এই মুহূর্তে তুই কিছুই করতে পারবি না।
বলে নির্বাণ উঠে চলে যেতে নিলে অনিকেত বলে ওঠে,
- আমি লিগ্যাল একশন নেবো।
নির্বাণ একটা বাকা হেসে অনিকেতের চোখে চোখ রেখে বলে,
- প্লিজ।
বলেই নির্বাণ চলে যায় অনিকেত সর্বশক্তি দিয়ে টেবিলে একটা ঘুষি মেরে চিৎকার করে ওঠে।
*****************
ইশান আজ নয়নিকা আর নবনীকে ট্রিট দিতে নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ ফিরে আসার খুশিতে।নির্বাণ আর সীফাত জানিয়েছে তারাও আসছে।ওরা যখন গল্পে মশগুল তখন হঠাৎ ,
- নয়নিকা?
চিরপরিচিত কণ্ঠ শুনে থমকে গেলো নয়নিকা ভয়ে অসাড় হলো চিত্ত।বহু কষ্টে পিছন ফিরে নিজের জন্মদাতা পিতাকে দেখলো সে।ঠিক সেই সময়ে নির্বাণ ঢুকলো রেস্টুরেন্টে আশরাফকে নয়নিকার মুখোমুখি দেখে ভ্রু কুচকে এলো তার।
- নয়নিকা মা আমার!
বলে আশরাফ দু কদম এগিয়ে গেলে সাথে সাথে নয়নিকা পিছিয়ে গেলো। নির্বাণ এগিয়ে এসে নয়নিকার পাশে দাড়িয়ে বলল ,
- আরে আশরাফ সাহেব যে কি অবস্থা আপনার?
আশরাফ একটু বিরক্ত হয়ে বলল,
- দেখুন আমি আমার মেয়েকে নিয়ে যেতে এসেছি আপনি মাঝখানে আসবেন না।
আশরাফের মুখে এমন কথা শুনে নীল হয়ে গেলো নয়নিকার মুখশ্রী।এগিয়ে এসে নির্বাণের পাশে দাড়িয়ে ওর শার্টের কোনা ধরে টান দিলো সে।নির্বাণ তাকালো নয়নিকার পানে।ছলছল চোখে নয়নিকা কাতরভাবে জিজ্ঞেস করলো ,
- আপনি আমায় পাঠিয়ে দেবেন বাবার সাথে?
নির্বাণ নরম স্বরে বিপরীতে জানতে চাইলো,
- তুমি যেতে চাও?
নয়নিকা কয়েকবার মাথা দুপাশে নাড়িয়ে জানালো সে যেতে চাই না। নির্বাণ মনে মনে খুশি হলো কিন্তু সেটা মুখে প্রকাশ করলো না বরং কণ্ঠে দৃঢ়তা এনে বলল,
- তুমি যেহেতু চাও না সুতরাং তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না।
নির্বাণ এবার আশরাফের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল,
- শুনলেন তো নয়নিকা যেতে চাই না এখন আপনি আসতে পারেন।
আশরাফ খেকিয়ে উঠলো,
- যেতে চাইনা মানে ওর স্বামী আছে তাকে ছেড়ে অন্য মানুষের বাড়ি কেন থাকবে।
নির্বাণ আশরাফের সামনাসামনি এসে দাড়ালো তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,
- কেমন বাপ তুই? টিভিতে দেখিস নি অনিকেত তোর মেয়ের উপর কিরকম অত্যাচার করেছে তারপরও তার কথাতে কুত্তার মতো লেজ নাড়াতে নাড়াতে চলে আসছিস ভালোয় ভালোয় বলছি চলে যা নাহলে তোর শরীরের একটা টুকরোও অনিকেত খুঁজে পাবে না।
এপর্যায়ে আশরাফ দমে গেলো তারপরও যাওয়ার আগে নয়নিকাকে চোখ রাঙাতে ভুললো না।
হঠাৎ নবনীর চিৎকারে নির্বাণ পিছন ফিরে দেখলো নয়নিকা অজ্ঞান হয়ে গেছে দ্রুত নির্বাণ ওকে কোলে তুলে নিয়ে প্রস্থান করে।
জ্ঞান ফেরার পর থেকে নয়নিকা চুপ হয়ে আছে একটা কথাও বলেনি। নির্বাণ এসে ওর পাশে বসলো।
- দেখো নয়নিকা এরকম চুপ হয়ে থাকলে তুমি আবার অসুস্থ হয়ে যাবে।
এবার নয়নিকা মুখ খুলল ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলল,
- বাবা অনিকেতকে বলে দেবে তারপর আমাকে জোর করে হলেও নিয়ে যাবে এখান থেকে।
নির্বাণ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
- আমি তো তোমাকে বলেছি তুমি যেতে না চাইলে কেউ তোমাকে জোর করবে না একটু ভরসা রাখো আমার উপরে।এখান ঘুমাও ভালো লাগবে।
নয়নিকা কিছু না বলে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো।নির্বাণ ভাবলো এইসব কিছুর এবার শেষ করে ছাড়বে অনেক হয়েছে।
***************
অনিকেত অগ্নি চোখে তাকিয়ে আছে আশরাফের দিকে। আশরাফ মাথাটা নিচু করে বলল,
- ওই ব্যাটা নির্বাণ খুবই ধুরন্ধর ঠিক বুঝে ফেলছে তুমি পাঠাইছো আমারে।
- আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা নাহলে জিন্দা মাটিতে পুতে রেখে দেবো।
আশরাফ আর কিছু বলল না। মনে মনে ভাবলো এখান থেকে চলে যাওয়ায় ভালো।
অনিকেত চিন্তা করলো অনেক হয়েছে এবার একটা ব্যবস্থা করতেই হবে।নয়নিকাকে কিছুতেই আমি নির্বাণের অধীনে থাকতে দেবো না দরকার হলে মে/রে ফেলবো কিন্তু আমি থাকতে অন্য কারোর কাছে ওকে থাকতে দেবো না।
*************
টিভিতে ইউটিউব ওপেন করে নয়নিকা দেখছিলো হঠাৎ একটা নিউজ ডকুমেন্টারিতে নজর পড়লো ওর। নিউজটা দেখার পরে নয়নিকা কি অভিব্যক্তি প্রকাশ করবে বুঝে পেলো না সেই সময় ইশান এসে পাশে বসে খেয়াল করলো নয়নিকা নিসাড় হয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে আছে ইশান ভ্রু কুচকে টিভির দিকে তাকিয়ে দেখলো অনিকেতের ঘটনা নিয়ে একটা নিউজ পোর্টাল ডকুমেন্টারি বানিয়েছে সেটাই চলছে। ইশান রিমোট নিয়ে টিভি অফ করে দিলো নয়নিকার এবার হুশ হলো ইশানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বলল,
- এগুলো?
ইশান একটা হাসি দিয়ে বলল,
- আরে ভাবীইই তুমি ছোট মানুষ তারাক মেহতা দেখবা গোপাল ভাড় দেখবা তা না এসব কি গুরু গম্ভীর নিউজ দেখো।
- কিন্তু ভাইয়া অনিকেত?
ইশান দুই ভ্রু নাচিয়ে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল,
- বলেছিলাম না ভাই সব সামলে নেবে।
নয়নিকা কিছু বলল না নিজের ঘরে যেয়ে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শরীরটা ছেড়ে দিলো। তারপর চোখ বন্ধ করে অনিকেতের সাথে বিয়ের পরের জীবনটা ভাবতে লাগলো। অনিকেতের ডোমিনেটিং চরিত্র সেই লাল হওয়া চোখ, বেল্ট খুলে ওর দিকে এগিয়ে আসা তারপর অফিসকক্ষে ইশিতার সাথে সেই অবৈধ যৌনতায় লিপ্ত হওয়া সব কিছু যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে উঠলো চিত্তপটে ফট করে চোখ মেলে উঠে বসলো সে সারা শরীর ঘেমে গেছে পাশে রাখা বেড সাইড টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাস তুলে এক চুমুকে পুরোটা সাবাড় করলো তারপর মাথাটা হেডবোর্ডে এলিয়ে পুনরায় চোখ বন্ধ করলো এবার সে অনুভব করলো অদ্ভুত এক শান্তি অনুভূত হচ্ছে তার।
..........................চলমান........................
বিঃদ্রঃ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।