#নয়নিকা -২৮
#তিশা
ক্যাটাগরি- রাজনৈতিক
জনরা- রোমান্টিক ,থ্রিলার
নির্বাণ মুহূর্তের জন্য কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললো।নিজেকে খুব অসহায় মনে হলো তার কাদতে চেয়েও কাদতে পারছে না সে। অনাগত সন্তানের কথা তো সে এভাবে জানতে চায়নি।নয়নিকাকে আরো শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরে বললো,
- কিছু হবে না তোমার বউ। আমি কিছু হতে দেবো না তোমার।
সীফাত চিল্লিয়ে বললো ,
- ভাই ভাবীকে তোলো দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।
নির্বাণ বোধহয় এবার একটু সাহস পেলো দ্রু নয়নিকাকে কোলে তুলে নিয়ে যেতে যেতে পিছন ফিরে রক্তচক্ষু নিয়ে নিশাদ আর ইশানকে বললো,
- এই দুটোকে কোথায় রাখতে হবে কিভাবে রাখতে হবে জানিস তো?এদের শাস্তি আমি নিজ হাতে দেবো।
নিশাদ মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো নির্বাণ আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে নয়নিকাকে নিয়ে গাড়িতে বসলো।নয়নিকাকে নিয়ে নির্বাণ ব্যাক সীটে বসে আছে। নয়নিকা নির্বাণের শার্টের কলার খামচে ধরে রেখেছে আর এক হাত পেটে ধরে কাদছে নির্বাণের চোখের কোণেও আজ যেনো অশ্রু জমা হলো সেটা উপেক্ষা করে নয়নিকার চুলের মাঝে চুম্বন একে কপালে অধর ডুবিয়ে বলল,
- আর একটু বউ এইতো চলে এসেছি।
নির্বাণ অনুভব করলো নয়নিকা ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ছে নির্বাণের মত মানুষের বোধহয় ভয় লাগলো এবার উত্তেজিত হয়ে নয়নিকার চিবুকে হাত বুলিয়ে কাপা কাপা কণ্ঠে বললো,
- বউ এই বউ চোখ খুলে রাখো একদম ঘুমাবে না। এই সীফাত এত আস্তে চালাচ্ছিস কেন লাথি মে/রে গাড়ি থেকে ফেলে দেব তোকে দ্রুত চল।
সীফাত এক প্রকার উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে অলরেডি দুই তিনটা সিগন্যাল ব্রেক করে ফেলেছে।সীফাত বুঝলো ভাইয়ের মানসিক অবস্থা একটু আশ্বস্ত করার স্বরে বললো,
- এইতো ভাই আর দুই তিন মিনিট লাগবে।
***********************
অপারেশন থিয়েটারের সামনে চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে আছে সে। নিজেকেই সবচেয়ে বেশী দোষী মনে হচ্ছে তার। এভাবে নয়নিকাকে নিয়ে রিস্ক নেয়া উচিত হয়নি তার।অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে ডাক্তারের হাত দুটো ধরে নির্বাণ অসহায়ের মত বলেছিলো ,
- প্লিজ আমার সন্তানটাকেও বাঁচিয়ে দিন ডাক্তার নাহলে আমার বউকেও হয়তো আমি বাঁচিয়ে রাখতে পারবো না আর।
অবাক হয়ে সীফাত দেখেছিলো ভাইয়ের সেই করুণ আকুতি।মনে মনে ভাবলো এটা কোন পাথর হৃদয়ের প্রভাবশালী মন্ত্রী নয় একজন অসহায় বাবার আর্তনাদ। অপারেশন শুরু হওয়ার পর থেকে নির্বাণ আর একটা কথাও বলেনি। এমনিতেই নয়নিকা মানসিকভাবে স্ট্যাবল নয় ডিপ্রেশনে ভোগে তার মধ্যে দ্বিতীয়বার সন্তান হারালে যে নয়নিকাকে হারিয়ে ফেলার একটা তীব্র সম্ভাবনা আছে সেটা খুব প্রখরভাবে অনুভব করছে নির্বাণ।হঠাৎ নিজের শক্তপোক্ত হাতের মধ্যে মেয়েলি একটা হাতের অস্তিত্ব পেয়ে পাশে তাকিয়ে দেখলো নবনী অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে নির্বাণ বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখলো। নবনীর ভাইয়ের ফিরে আসাতে চেয়েও খুশি হতে পারছে না মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলো 'আমার ভাইয়ের জীবনের সুখ কেড়ে নিও না আল্লাহ।'
দীর্ঘ তিনঘণ্টার অপারেশন শেষে ডাক্তার যখন বেরিয়ে এলো নির্বাণ হুড়মুড় করে উঠে তার সামনে দাঁড়ালো কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না।ডাক্তারই প্রথমে জানালো,
- দুজনকেই এই যাত্রায় বাচানো গেছে স্যার কিন্তু ভ্রুণের পজিশন খানিকটা সরে যাওয়ায় ডেলিভারির সময় সি সেকশন করতে হবে নরমাল ডেলিভারি সম্ভব হবে না আর বাকি দিনগুলোতে সম্পূর্ণ রেস্টে থাকতে হবে। আপাতত প্রচুর র/ক্ত ক্ষরণের জন্য ম্যাডামকে ব্লাড দেয়া হচ্ছে সকালের মধ্যে জ্ঞান ফিরে আসবে আশা করা যায়। একটু পরে কেবিনে দেয়া হবে উনাকে তখন দেখতে পারবেন।
নির্বাণ একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে চেয়ারে নিজের শরীর ছেড়ে দিলো।সেই মুহূর্তে হন্তদন্ত হয়ে ইশান আর নিশাদ প্রবেশ করলো হাসপাতালে।নির্বাণকে চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে দেখে একটু ভয়ই পেলো।নিশাদ কোনমতে বলল,
- ভাবী?
সীফাত চোখ দিয়ে আশ্বস্ত করে জানালো সব ঠিক আছে।দুজনে ধপ করে চেয়ারে বসে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো।
*********************
প্রভাতের স্নিগ্ধ আলোকরশ্মি সফেদ পর্দা ভেদ করে একটু একটু করে উকি দিচ্ছে সেই সাথে হালকা পাখির কলতানও শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে তন্দ্রা কেটে যাচ্ছে নয়নিকার ,পেটে হালকা ব্যথা অনুভূত হচ্ছে ডান হাতটা কোন কিছুর সাথে আটকে আছে মনে হলো বাম হাত পেটের উপর রাখতে গেলে হাতে অস্বাভাবিক ব্যথা অনুভব করলো মুখ দিয়ে হালকা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।
নির্বাণ সারারাত নয়নিকার পাশে বসে ছিল ভোরের দিকে হালকা তন্দ্রাভাব এসেছিলো ,নয়নিকার আর্তনাদ কানে যেতেই ধড়ফড় করে মাথা তুললো সে। নয়নিকা নির্বাণকে দেখে প্রথমে একটু অবাক হলো তারপর ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি সচল হলো মুহুর্তেই উত্তেজিত হলো সে উঠে বসতে চাইলো নির্বাণ দ্রুত ওকে আটকে দিলো তারপর বলল,
- আস্তে বউ ব্যথা পাবে তো।কোথায় কষ্ট হচ্ছে? ডাক্তারকে ডাক দিবো।
নয়নিকা আর্তনাদ করে কান্না করতে করতে বললো,
- আমার বাচ্চা!
নয়নিকাকে আর বলতে না দিয়ে নির্বাণ ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিতে দিতে বললো,
- বাবু একদম ঠিক আছে কিচ্ছু হয়নি ।
নয়নিকা একটু শান্ত হলো তারপর অসহায় কণ্ঠে বললো,
- সত্যি বলছেন তো?
নয়নিকাকে বুকে জড়িয়ে মাথায় ছোট ছোট চুমু দিতে দিতে বললো,
- একদম সত্যি এখন শুধু তোমাকে সাবধানে থাকতে হবে আর বেশি বেশি খেতে হবে বুঝেছো?
নয়নিকার এবার মনে হলো নির্বাণ এতদিন কোথায় ছিল আর কেনই বা নিজেকে মৃ/ত বানিয়ে রেখেছিলো সবার কাছে।
- আপনি এতদিন কোথায় ছিলেন?
- তুমি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরো সব বলবো।
এর মধ্যে নিশাদ ইশান আর সীফাত প্রবেশ করলো।নয়নিকা ওদের দেখে বললো,
- আপনারা জানতেন উনি বেঁচে আছে তারপরও আমাকে বলেন নি কেন?
ইশান নয়নিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,
- বিশ্বাস করো ভাবী আমি গতকালই জেনেছি নিশাদ ভাইয়াই বোধহয় জানতো শুধু।
নির্বাণ নির্বিকার ভাবে বললো,
- তোকে জানায়নি কারণ তুই ভাবীভক্ত হনুমান ভাবীর দুঃখ সহ্য করতে না পেরে ঠিকই বলে দিতি।
সীফাত ফোড়ন কাটলো ,
- আমি কি দোষ করেছি আমাকে বললে না কেন,
- তোর ক্ষেত্রেও একই জিনিস প্রযোজ্য তবে ইশান ভাবীভক্ত আর তুই বউভক্ত বউয়ের কান্না সহ্য করতে না পেরে ঠিকই উগড়ে দিতি।
নয়নিকা অবাক হয়ে শুনছিলো তারপর ছলছল চোখে নির্বাণকে বললো,
- আপনি জানতেন আমি কষ্ট পাবো তারপরও এমনটা করতে পারলেন?
নির্বাণ ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললো ,
- বললাম তো বাড়ি চলো সব বলবো।
- অসভ্য পুরুষ মানুষ কথা বলবেন না আমার সাথে আর।
নির্বাণ একটা স্নিগ্ধ হাসি দিয়ে নয়নিকাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
- আচ্ছা কথা বলবো না একটু বুকে এসে আমাকে শান্তি দাও কতদিন ধরে আমার বুকটা অশান্ত তুমি জানো বউ!
**********************
নয়নিকাকে আজ হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে।বেডরুমে নিয়ে নয়নিকাকে বিছানায় বসিয়ে নির্বাণ উঠতে নিলে নয়নিকা ওর হাত ধরে থামিয়ে দেয় নির্বাণ পুনরায় বসতেই নয়নিকা বললো,
- ওইদিন আমাকে ফেলে চলে গেলেন কেনো আর এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিলেন?
- বলতেই হবে
- অবশ্যই।
নির্বাণ বলতে শুরু করলো। সেদিন,
ভোরবেলা মুঠোফোনের কর্কশ আওয়াজে নির্বাণের ঘুম ছুটে যায় ফোন হাতে নিয়ে আননোন নাম্বার দেখে ভ্রু কুচকে আসে তার নয়নিকাকে ভালো করে কমফোর্টারে জড়িয়ে পুল এরিয়ায় এসে ফোন রিসিভ করে সে।
- হানিমুন কেমন কাটছে মন্ত্রী মশাইয়ের?
- অনিকেত?
- অবাক হলি নাকি?তোর জেলখানা আমাকে আটকে রাখতে পারেনি এখন আসল কথায় আসি ভালো ছেলের মত বাইরে বেরিয়ে আয় নায় তোর আদরের বউ সহ পুরো হোটেলটাই উড়িয়ে দেবো।
নির্বাণ কিছুক্ষণ চুপ রইলো ও বুঝলো অনিকেত ফাকা আওয়াজ দিচ্ছে না ও এখন আঘাতপ্রাপ্ত সাপের ন্যায় হয়ে আছে তাই যেকোনো কিছুই ওর দ্বারা সম্ভব সুতরাং অতিরিক্ত বাক্যব্যয় না করে আসছি বলে ফোন কেটে দিলো।রুমে ঢুকে পোশাক পরিধান করে কিছুক্ষণ নয়নিকার দিকে অপলক চাইলো তারপর নয়নিকার কপালে অধর ছুয়ে দিলো।
- আমি খুব শীঘ্রই ফিরে আসবো তোমার কাছে বউ কয়টা দিন একটু কষ্ট করে একা থেকো।
তারপর নয়নিকাকে ছেড়ে সোজা হেটে বেরিয়ে গেলো হোটেলের বাইরে।কোন বাক্য ব্যয় না করে গাড়িতে উঠে গেলো সে। আশ্চর্যজনক ভাবে রাস্তায় কেউ কোন কথা বলেনি অনিকেত শুধু নির্বাণের ফোনটা নিয়ে অফ করে দিলো।সারারাস্তা অনিকেত ছিলো রুদ্রমূর্তির ন্যায় আর নির্বাণ ছিল নির্লিপ্ত।
রাঙামাটির এক দুর্গম এলাকার পরিত্যক্ত এক বাড়িতে মুখোমুখি বসে আছে অনিকেত আর নির্বাণ।
- সেদিন আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা উচিত ছিল তাহলে তোর পরিবারের সাথে তোকেও শেষ করে দিতে পারতাম।
নির্বাণ শরীরটা চেয়ারে পুরোটা ছেড়ে দিয়ে হেয়ালী করে বললো,
- অতীত ভেবে আর আফসোস করে কি হবে?
সাথে সাথে পকেট থেকে রিভলবার বের করে অনিকেত নির্বাণের কপালে ঠেকিয়ে বললো,
- অতীতের সেই ভুল আজ সংশোধন করতেই তোকে এখানে নিয়ে এসেছি।
- তাহলে শেষ কর।
বাকা হেসে বললো নির্বাণ। অনিকেত ট্রিগার চাপতে যাবে তখনই তার মাথায় ধাতব কিছুর উপস্থিতি বুঝতে পেরে থমকে গেলো। পিছনে তাকিয়ে দেখে তার মাথায় ব/ন্দু/ক ঠেকিয়ে দাড়িয়ে আছে রবার্ট।নির্বাণ একটা আফসোসের শব্দ করে বললো,
- ইস এবারো তোর প্লান ফ্লপ হয়ে গেলো না।তুই কি ভেবেছিস বউয়ের সাথে হানিমুনে এসেছি বলে তোর জেল পালানোর খবর পাবো না।আর একটা কথা শুনে রাখ তুই জেল থেকে পালাসনি আমিই তোকে জেল থেকে বের করেছি।
অনিকেত বিস্মিত নজরে চাইলো নির্বাণের দিকে নির্বাণ একটা ক্রুর হাসি দিয়ে বললো,
- আমার পরিবারের খু/নী এত সহজ শাস্তি পাবে সেটা আমার সহ্য হচ্ছিলো না তাই আগে সবার কাছে তোকে দোষী প্রমাণ করেছি তারপর তোকে জেল থেকে বের করেছি। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামী জেল থেকে পালিয়ে এক্সিডেন্ট করে ম/রে গেলে কারো খুব বেশি মাথাব্যথা হবে না।
নির্বাণের কথায় চমকে গেলো অনিকেত। ওর সেই চমকানো মুখ দেখে নির্বাণ তাচ্ছিল্যের সাথে বললো ,
- চল ম/রার আগে জানিয়ে দিই তোর পতন কিভাবে হলো।
............................চলমান..............................
বিঃদ্রঃ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।