ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

৩য় পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#পর্ব_৩

#কলমে_নীলপ্রজাপতি

কেটে গেছে প্রায় ২–৩ দিন। সকালের আকাশ টা পরিষ্কার।

ইস্তাম্বুলের এপ্রিল মাসে বাতাসে হালকা নরম রোদ

জানালা ভেদ করে ভেতরে ঢুকছে। আকাশে মেঘ নেই

বললেই চলে। সবকিছুই শান্ত। তবে এই শান্তি খান

মহলের ভেতরে নেই।

আদ্রিতা বারান্দার পাশে দাঁড়িয়ে। চুলগুলো হালকা

বাতাসে উড়ছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে ঘুরে তাকাল।

আবরাজ তখন ফোনে কিছু দেখছিল।

“শুনুন।”

তার কণ্ঠে দ্বিধা তবুও বলল,

“আমি আমার পড়াশোনাটা চালিয়ে যেতে চাই।”

আবরাজ চোখ না তুলেই বলল,

“খান মহলে বিয়ের পর কেউ পড়াশোনা করে না।”

এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল সবকিছু।

আদ্রিতা ধীরে বলল,

“আমি পড়তে চাই।”

আবরাজ মাথা তাকালো আদ্রিতার দিকে। তার দৃষ্টি ঠান্ডা।

“বোঝো না একটা কথা?”

আদ্রিতা এবার এক পা এগিয়ে এলো।

“আমার বাবা বলেছিল, বিয়ের পর আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারব।”

কথাটা শুনে আবরাজের চোখে হালকা কিছু একটা

ঝলক খেলল। তারপর সে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

একদম সামনে এসে দাঁড়াল আদ্রিতার।

“তোমার বাবা কী বলেছে সেটা আমি দেখতে যাব না।”

তার কণ্ঠ নিচু কিন্তু কড়া। স্পষ্ট করে বলল,

“এখন তুমি এই বাড়ির বউ। আমার বউ। তাই আমি যা বলব সেটাই হবে।”

আদ্রিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। মাথায় কিছু একটা ভেবে নিলো। তারপর নরম গলায় বলল,

“সেদিন তো আপনার ভাই নিজেই বলছিল, বাড়িতে একটা ডাক্তার থাকা ভালো।”

একটু থামল। তার চোখ সরাসরি আব্রাজের দিকে,

“তাহলে আপনি যদি আমাকে পড়তে না দেন তাহলে আমি ডাক্তার হব কীভাবে?”

কথাটা শেষ হতেই ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো।

আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল‌। তার

চোখে এবার রাগ নেই বরং কিছু একটা হিসেব।

সে ধীরে বলল,

“প্রয়াণ যেটা বলে সেটা এই বাড়ির নিয়ম নয়। তুমি কি করবে সেটা সম্পূর্ণ আমি ঠিক করবো।”

আদ্রিতার রাগে হাত মুঠো হয়ে গেল। তবুও নিজেকে সামলে নরম কন্ঠে বলল,

“দেখুন আমি পড়াশোনা করলে আপনারই লাভ।”

সে একটু থেমে যোগ করল,

“আপনি তো মেয়র হতে যাচ্ছেন আর... সবাই যখন

দেখবে আপনি নিজের স্ত্রীকে পড়তে দিচ্ছেন, তখন

আপনার ইমেজ আরও ভালো হবে।”

আবরাজ চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল আদ্রিতার দিকে। আদ্রিতা আরও বলল,

“আমি নিজের থেকেও বেশি কিন্তু আপনার কথা ভেবেই বলছি।”

আবরাজ হেসে ফেলল। সে বুঝলো মেয়েটা চিৎকার না করেই শান্ত থেকে তাকে কনভেন্স করার চেষ্টা করছে।

তার ঠোঁটে ধীরে একটা হাসি ফুটে উঠল।

“তুমি ভীষণ চালাক।”

আদ্রিতা কিছু বলল না।

আব্রাজ ধীরে বলল,

“ঠিক আছে আমি ভেবে দেখবো তুমি পড়াশোনা করবে কিনা।”

একটু থেমে বলল,

“কিন্তু সেটাও হবে আমার শর্তে।”

আবরাজের চোখ গেল‌ হাত ঘড়ির দিকে। তার চোখে কাজের ব্যস্ততা আবার ফিরে এলো। সে বলল,

“এই বিষয় রাতে কথা হবে।”

আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

.......

করিডোর পেরিয়ে এগোতেই আবরাজের মুখের ভাব সম্পূর্ণ বদলে গেলো। সামনেই নির্বাচন। আবরাজ

অনেক সময় ধরে এটার সব প্ল্যান করে রেখেছে।

প্রয়াণ তখন নিজের ঘর থেকে বেরোচ্ছে। আবরাজকে

দেখেই থেমে গেল। তার পরনে ডার্ক চকলেট রঙের শার্ট

সাদা প্যান্টের সাথে অদ্ভুত কনট্রাস্ট। হাতে একাধিক

ব্রেসলেট। চলাফেরায় একটা উগ্র, বেপরোয়া ভাব

স্পষ্ট। চোখে সেই চেনা হিংস্রতার ঝলক।

আবরাজ একবার তাকাল তার দিকে।

“রেডি?”

প্রয়াণ ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে বলল,

“আমি সবসময়ই রেডি, ভাই।”

দু’জনের চোখাচোখি হলো এক সেকেন্ডের জন্য।

তারপর দু’জন একসাথে হাঁটতে হাঁটতে নিচে নামল।

বাইরে কালো রঙের কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে।

সিকিউরিটি, ড্রাইভার সব প্রস্তুত। আবরাজ একবারও

পেছনে তাকাল না। দুপাশ দিয়ে দুজন গাড়িতে উঠলো।

গাড়ি খান মহলের বাইরে বেরিয়ে গেলো।

গাড়ির ভেতরে বসা তিনজন মানুষ। আবরাজ খান, প্রয়াণ খান, মিনহাজ আলি। গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ইস্তানবুলের ব্যস্ত রাস্তায়।

সূর্যের আলো শহরটাকে সোনালী রঙে মুড়ে রেখেছে।

বসফরাসের ওপর সেই আলো ঝিকমিক করছে।

ড্রাইভিং সিটে মিনহাজ। চোখ সোজা সামনে।

স্টিয়ারিংয়ে শক্ত করে ধরা হাত।

সে শুধু ড্রাইভার না সে আবরাজের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মানুষদের একজন।

তার পাশের সিটে বসে আবরাজ। তার দৃষ্টি জানালার

বাইরে। বোঝা যাচ্ছে না কী ভাবছে।

পেছনে বসে আছে প্রয়াণ। সিটে হেলান দিয়ে বসে

আছে। এক হাত জানালার ধারে। চোখে বিরক্তি আর

অস্থিরতা।

গাড়িটা শহরের ব্যস্ত অংশ পেরিয়ে একটা বড় খোলা

জায়গার দিকে ঢুকল। দূর থেকেই শোনা যাচ্ছে

মানুষের গলার আওয়াজ। মাইকের শব্দ, স্লোগান।

একটা বিশাল মাঠ। চারদিকে ব্যানার, পোস্টারে ভরা।

সব জায়গায় ছবিতে একটাই মুখ আবরাজ খান।

গাড়ি থামতেই কিছু লোক ছুটে এলো। সিকিউরিটি

ঘিরে ফেলল চারপাশ।

প্রথমে দরজা খুলে নামল মিনহাজ। চারপাশ একবার

নজর বুলিয়ে সব ঠিক আছে কিনা নিশ্চিত করল।

তারপর নামল আবরাজ।

এক মুহূর্তে চারপাশের গুঞ্জন যেন বদলে গেল।

লোকজনের চোখ একসাথে ঘুরে এল তার দিকে।

পেছন থেকে নামল প্রয়াণ। তার উপস্থিতি আলাদা করে

বোঝা যায়। চোখে সেই আগ্রাসী দৃষ্টি। কেউ সরাসরি

তাকাতে সাহস পায় না।

“আবরাজ! আবরাজ!”

চারদিক থেকে আওয়াজ উঠছে।

আবরাজ একটুও তাড়াহুড়া করল না। ধীরে ধীরে

হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে গেল মঞ্চের দিকে। তার চলার

ভঙ্গিতে এমন একটা নিশ্চয়তা, যেন সে জানে এই

জায়গাটা তারই।

মঞ্চে উঠতেই মাইকের শব্দ আরও জোরে ভেসে এলো।

লোকজন হাততালি দিচ্ছে, কেউ নাম ধরে ডাকছে।

আবরাজ মাইকের সামনে এসে দাঁড়াল। কয়েক

সেকেন্ড চুপ থেকে বলতে শুরু করলো। একটার পর

একটা কথা। পরিকল্পনা, উন্নয়ন, ভবিষ্যতের

প্রতিশ্রুতি।

তার বলার ভঙ্গি এতটাই নিখুঁত যেন প্রতিটা শব্দ

সরাসরি মানুষের মনে গিয়ে লাগছে।‌ মানুষজন

বিশ্বাস করতে শুরু করল।

কারও চোখে আশা, কারও মুখে সম্মতি কিন্তু এই সুন্দর

কথার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য মানুষ।

***********

সন্ধ্যা প্রায় ৭টা। খান মহলের বিশাল হলরুম।

ঝাড়বাতির আলোয় পুরো ঘরটা ঝলমল করছে।

পুরুষরা সবাই বসে আছে একসাথে।

আদ্রিতা দাঁড়িয়ে আছে আফসানা খানের পাশে।

এই কয়েকদিনে সে একটা জিনিস বুঝেছে এই বাড়িতে

যদি কারও মধ্যে সত্যিকারের মমতা থাকে, তাহলে

সেটা এই মানুষটার মধ্যে।

আফসানা তাকে নিজের মেয়ের মতোই কাছে টেনে নিয়েছে।

সামনে সোফায় বসে আছে আবরাজ, প্রয়াণ।

তাদের বিপরীতে শাহবাজ খান আর ফারহান খান।

সবাই কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা করছে। কথার

ভেতরে রাজনীতির চাপা গন্ধ।

ঠিক তখনই হলরুমের দরজা দিয়ে ঢুকল দু’জন।

রাশিদ খান আর আমিনা খান।

তাদের দেখা মাত্রই শাহবাজ খান উঠে দাঁড়াল।

এতদিন পর তার আম্মি আব্বু বাড়ি ফিরেছে।

তার কণ্ঠে সম্মান।

রাশিদ খান ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। চোখে বয়সের

ছাপ কিন্তু তীক্ষ্ণতা স্পষ্ট। আমিনা খান তার পাশেই।

শান্ত, কিন্তু গভীর দৃষ্টি। তারা এসে বসতেই ঘরের

পরিবেশে যেন আরেকটা স্তর যোগ হলো।

আমিনা খানের চোখ ধীরে ঘুরে গিয়ে থামল আদ্রিতার

ওপর। তিনি কিছু বললেন না শুধু গভীরভাবে তাকিয়ে

রইলেন। এমনভাবে যেন এক নজরেই আদ্রিতাকে বুঝে

নিতে চাইছেন।

কিছুক্ষণ পর আমিনা খান আদ্রিতার দিক থেকে চোখ

সরিয়ে তাকালেন প্রয়াণের দিকে।

“রাজন্যা কোথায়?”

কণ্ঠ শান্ত কিন্তু ভেতরে চাপা কড়া ভাব।

প্রয়াণ ভ্রু সামান্য কুঁচকাল।

“রাহি মেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে গেছে।”

এক সেকেন্ড নীরবতা।

আমিনা খানের মুখে স্পষ্ট বিরক্তি ফুটে উঠল।

“এখনও ফেরেনি?”

“না।”

প্রয়াণ ছোট করে উত্তর দিল।

আমিনা খান মাথা নাড়লেন।

“অসভ্য একটা মেয়ে।”

তার কণ্ঠ এবার একটু শক্ত,

“সংসার ফেলে এতদিন বাপের বাড়ি গিয়ে থাকা এর মানে কী?”

হলরুমের পরিবেশ একটু ভারী হয়ে উঠল।

আফসানা খান হালকা হেসে বললেন,

“কিছু করার নেই, আম্মি। রাহি থাকতে পারে না তাই গেছে।”

একটু থেমে বলল,

“এতে আমি ওর কোনো দোষ দেখছি না।”

কথাটা শেষ হতেই আমিনা খানের দৃষ্টি আবার ঘুরে এল আফসানার দিকে। এবার তার চোখে স্পষ্ট অসন্তোষ।

“তুমি সবসময় বউদের পক্ষ নাও কেন?”

তার কণ্ঠ ঠান্ডা ও তীক্ষ্ণ।

“তোমার নিজের ছেলেরা কি তোমার চোখে পড়ে না?”

আফসানা খান এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

“এত বছর তো সবই দেখেই এলাম, আম্মি।

তার কণ্ঠ নরম কিন্তু ভেতরে অদ্ভুত দৃঢ়তা।

“তাই এখন মনে হয় এই বাড়িতে বউদের পাশে দাঁড়ানোই উচিত, তাদের মা হয়ে।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো। কথাগুলো সরাসরি

কারও না কারও দিকে আঘাত করল।

আমিনা খান মুখ কুঁচকে নিলেন। তিনি আর আফসানার দিকে না তাকিয়ে দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিলেন প্রয়াণের দিকে।

“কাল তুই গিয়ে ওদের নিয়ে আসবি।”

কণ্ঠে সরাসরি নির্দেশ।

প্রয়াণ হালকা ভ্রু তুলল। তার ঠোঁটে সেই চেনা বাঁকা হাসি।

“আমি পারব না, দাদি।”

সে সোজা হয়ে বসল,

“রাহি যেমন একা গেছে তেমনই তেজ শেষ হলে,

নিজে থেকেই ফিরে আসবে।”

ঘরের পরিবেশ আবার ভারী হয়ে উঠল।

প্রয়াণ হালকা হাসল। তার চোখে সেই আগ্রাসী ঝলক,

“আমি কাউকে আনতে যাই না। কারও পায়ে ধরে

ফেরানোর অভ্যাস আমার নেই।”

আমিনা খান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।

এই বাড়িতে তার কথাই শেষ কথা। সবাই শোনে, সবাই মানে।

কিন্তু এই প্রয়াণ খান, সে নিজের ছাড়া আর কারও

কথা শুনতে রাজি না।

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

আমিনা খান আর কিছু বললেন না। শুধু মুখটা শক্ত

করে বসে রইলেন।

আদ্রিতা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কিন্তু তার

ভেতরে তখন অন্য কিছু চলছিল। ধীরে ধীরে একটা

বিষয় তার কাছে একদম পরিষ্কার হয়ে গেল। এতোক্ষণ

যাদের বিষয়ে কথা হচ্ছিল। তার মধ্যে রাহি হলো

প্রয়াণ খানের স্ত্রী। আর রাজন্যা হলো তাদের মেয়ে।

এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল। তার চোখ আবার একবার গেল প্রয়াণের দিকে।

এই উগ্র, বেপরোয়া, নিয়ন্ত্রণহীন মানুষটারও একটা

পরিবার আছে।

তারপর আদ্রিতার দৃষ্টি ধীরে ঘুরে এলো আবরাজের

দিকে। আবরাজ খান যার বয়স প্রায় তিরিশ কিন্তু

তাকে বিয়ে দেওয়া হলো মাত্র কয়েকদিন আগে।

আদ্রিতার ভ্রু হালকা কুঁচকে গেল।

অদ্ভুত ছোট ভাইয়ের বিয়ে আগে, তারপর সন্তান।

অথচ বড় ভাই হঠাৎ করে একদিন রাজনৈতিক চুক্তির

মতো বিয়ে করে ফেলল।

এই পরিবারে সবকিছুই যেন উল্টো। স্বাভাবিকতার

কোনো জায়গা নেই।

******

রাতের বেলা ঘরটা নীরব। জানালার বাইরে দূরের

আলো ঝাপসা হয়ে জ্বলছে।

আবরাজ আর আদ্রিতা রয়েছে ঘরে ঠিকই কিন্তু দু’জন

যেন দুই আলাদা জগতে দাঁড়িয়ে।

আদ্রিতা ধীরে বলল,

“আপনি নিজের দেওয়া কথাটা কী ভুলে গেছেন, আবরাজ খান?”

আবরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল তার দিকে।

মনে হলো যেন সত্যিই ভাবছে নাকি ভাবার অভিনয় করছে। তারপর ধীরে বলল,

“হুম… মনে আছে। আমি ভেবে দেখলাম তুমি পড়তে পারো।”

এক সেকেন্ডের জন্য আদ্রিতার চোখে হালকা বিস্ময় ঝলক খেল।

“কোনো সমস্যা নেই।”

আবরাজ আবার বলল,

“তবে যে যে শর্ত আমি বলব সেগুলো মানতে হবে।”

আদ্রিতা সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“কি শর্ত?”

আবরাজ ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে সেই চেনা অন্ধকার ফিরে এসেছে।

“প্রথম শর্ত বাইরে সবার সামনে, তুমি শুধু আবরাজ খানের স্ত্রী হিসেবেই থাকবে।”

সে এক পা এগিয়ে এল,

“দ্বিতীয় শর্ত আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে একটুও হস্তক্ষেপ করবে না।”

তারপর একদম সামনে এসে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি ধীরে আদ্রিতার মাথা থেকে পা পর্যন্ত নামল। সেই দৃষ্টি আদ্রিতার জন্য অস্বস্তিকর। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি।

“তৃতীয় এই ঘরের ভেতরে স্বামী হিসেবে আমার সম্পূর্ণ

অধিকার থাকবে তোমার ওপর।”

কথা শেষ করে সে চুপ করে তাকিয়ে রইল।

আদ্রিতা শান্ত কন্ঠে বলল,

“যদি স্বামী হওয়ার সব অধিকার আপনার থাকে, তাহলে আপনার ব্যক্তিগত জীবনেও হস্তক্ষেপ করার অধিকারটাও আমার থাকবে।”

আদ্রিতার কথা শুনে আবরাজ বাঁকা হেসে এগিয়ে এলো তার দিকে। তার শক্ত হাত হঠাৎই আদ্রিতার কোমর চেপে ধরে টেনে নিল নিজের কাছে। তাদের দূরত্ব এক মুহূর্তে শূন্য।

আদ্রিতার শরীরটা থমকে গেল। কিন্তু চোখ নামাল না

সে। আবরাজ ঝুঁকে এল তার খুব কাছে। তার নিঃশ্বাস

ছুঁয়ে যাচ্ছে আদ্রিতার মুখে।

কণ্ঠটা নিচু তবে ভারী,

“কাল থেকে কলেজে যেতে পারবে। কেউ আটকাবে না তোমায়।”

আদ্রিতা একভাবে তাকিয়ে আছে। আবরাজের আঙুলের চাপ আরও শক্ত হলো তার কোমরে।

সে আরও কাছে টেনে নিল তাকে। তার ঠোঁট আদ্রিতার কানের খুব কাছে,

“কিন্তু এই মুহূর্তে…”

আদ্রিতার বুকের ভেতরটা জোরে ধকধক করছে। তবুও সে নিজেকে সামলে রাখল।

আবরাজ ফিসফিস করে বলল,

“এই রাতে তুমি পুরোপুরি আমার।”

একমুহুর্ত আদ্রিতা শান্ত হয়ে রইল। তারপর নিজের দু হাত দিয়ে আবরাজের বুকে চাপ দিয়ে ঠেলে সরাতে চাইলো। তবে আবরাজের শক্তির সাথে পেরে উঠেলো‌ না। আবরাজ নিজের অন্যহাত দিয়ে আদ্রিতার হাত দুটো পিছনে মুচড়ে ধরল।

আদ্রিতার মুখটা ব্যথায় কুঁচকে গেল।

“লাগছে.. আমার.. ছাড়ুন।”

তার কণ্ঠ এবার চাপা কষ্টের সঙ্গে ক্ষোভ। আব্রাজ

একদম কাছে ঝুঁকে এল। ঠান্ডা গলায় বলল,

“ভালোয় ভালোয় রাজি হলে তোমার কষ্ট অনেক কম হবে।”

একটু থেমে যোগ করল,

“জো'র করা আমার খুব একটা পছন্দ না, আদ্রিতা।”

আদ্রিতার চোখে এবার স্পষ্ট রাগ জ্বলে উঠল।

“আবরাজ খান ছাড়ুন।”

দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ টানটান নীরবতা চলার পর

আবরাজ ধীরে তার হাত ছেড়ে দিলো। অন্যহাতটাও

কোমর থেকে হাত সরিয়ে নিলো। আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে

পিছয়ে গেলো।

আবরাজ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার কন্ঠে সরাসরি হুমকি,

“লিটিল স্পার্ক, আবরাজ খান বিনা স্বার্থে কিছুই করে না।”

সে ধীরে এক পা এগিয়ে এলো।

“তুমি যদি ভেবে থাকো, বিনা কারণে আমি তোমাকে স্বাধীনতা দেব তাহলে তুমি ভুল ভাবছো।”

তার দৃষ্টি স্থির আদ্রিতার চোখে। মাথা সামান্য কাত করল। ধীরে প্রত্যেকটা শব্দ উচ্চারণ করলো।

“তুমি এখন আমার স্ত্রী। আর এই সম্পর্কটা শুধু নামের জন্য না।”

তার ঠোঁটের কোণে ঠান্ডা হাসি ফুটে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,

“দুই-তিন দিন তোমাকে ছুঁ'ইনি তার মানে এই না যে

সারাজীবন এভাবেই চলবে।”

কথা শেষ করেই আবরাজ হাত বাড়িয়ে আদ্রিতার

কব্জি আলতো করে ধরে নিজের দিকে আবারো টেনে

নিলো। সেই স্পর্শের ভেতরে রয়েছে অদৃশ্য এক চা'প।

আদ্রিতা প্রথমে শক্ত হয়ে রইল। তার চোখে রাগ ও

অসহায়তা মিশ্রণ।

ঘরের নীরবতা আরও ঘন হয়ে উঠল। জানালার বাইরে

দূরের আলো কাঁপছে। যেন আজ রাতে সেই আলোও

স্থির থাকতে পারছে না।

সময়টা যেন থেমে গেছে। তারপর ধীরে, খুব ধীরে

আদ্রিতার প্রতিরোধটা নরম হয়ে এল। না মেনে নেওয়া,

না পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। শুধু পরিস্থিতির ভারে চুপ

হয়ে যাওয়া।

আবরাজ তাকে সম্পূর্ণ নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো।

দু’জনের দূরত্ব মিলিয়ে গেল। কোনো কথা নেই শুধু

নিঃশ্বাসের শব্দ।

ঘরের ভেতর দুটো ভিন্ন পৃথিবীর মানুষ ‌একই বাস্তবতায়

আটকে রইল। বাইরে ইস্তাম্বুলের রাত নিঃশব্দে বয়ে

যাচ্ছে।

*******

সকাল প্রায় ৭টা।

খান মহলের জানালার ফাঁক দিয়ে নরম রোদ ঢুকে

পড়েছে ঘরের ভেতরে। বাইরে দূরে শহরটা ধীরে ধীরে

জেগে উঠছে কিন্তু এই ঘরের ভেতরে যেন এক অন্যরকম নিস্তব্ধতা।

আদ্রিতা ধীরে ধীরে চোখ খুলল।

এক মুহূর্তের জন্য সে বুঝতেই পারল না সে কোথায়।

তারপর ধীরে ধীরে গত রাতের সব স্মৃতি একসাথে ফিরে এলো। তার শরীরটা যেন ভারী হয়ে আছে।

হালকা নড়তেই কুঁকড়ে উঠল সে। প্রতিটা অঙ্গে টান,

ব্যথা। মনে হচ্ছে যেন কেউ তাকে ভেতর থেকে চেপে

ধরে রেখেছে। সে ধীরে উঠে বসলো।

চুলগুলো এলোমেলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ।

একটা মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে নিজেকে

সামলানোর চেষ্টা করলো।

“আমি দুর্বল নই।”

নিজেকেই খুব আস্তে বলল সে।

বিছানার অন্যপাশে তাকাল। সেই দিকটা খালি।

আবরাজ নেই। হয়তো বেরিয়ে গেছে। একটা অদ্ভুত

অনুভূতি হলো তার ভেতরে। স্বস্তি না শূন্যতা সে নিজেও

বুঝল না।

ধীরে ধীরে উঠে ওয়াশরুমে গেল। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে

এল কিছুক্ষণ পর। একটা হালকা হলুদ রঙের শাড়ি

পরনে। তবে আজকের আদ্রিতা আর গতকালের সেই বধূ না। চোখে আজ এক অন্যরকম ঝলক।

চুলগুলো ভেজা। টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে

সেখান থেকে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকালো সে।

কয়েক সেকেন্ড পর খুব ধীরে বলল,

“এই খেলাটা আপনি শুরু করেছেন, আবরাজ খান।”

তার চোখ শক্ত হয়ে উঠল,

“তবে শেষটা আমি ঠিক করব।”

ঠিক তখনই ঘরের দরজাটা খুলে গেল। আবরাজ ঢুকল

ভেতরে। তার চেহারায় কোনো পরিবর্তন নেই।

যেন রাতে কিছুই হয়নি। যেন গত রাতটা তার কাছে

কোনো গুরুত্বই রাখে না। পরনে সাদা কুর্তা। চোখে সেই

চেনা ঠান্ডা দৃষ্টি। সে একবার তাকাল আদ্রিতার দিকে

মাথা থেকে পা পর্যন্ত। এক সেকেন্ডের জন্য তার দৃষ্টি

থেমে রইল আদ্রিতার ওপর।

তারপর স্বাভাবিক স্বরে বলল,

“রেডি?”

আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকালো।

“কিসের জন্য?”

আবরাজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল,

“কলেজ।”

একটু থামল। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

“আমি কথা রাখি লিটিল স্পার্ক।”

আদ্রিতা কিছু বলল না। শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল তার

দিকে। তার চোখে কোনো কৃতজ্ঞতা নেই বরং একটা

ঘৃণা আছে।

আবরাজ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো।

“তাড়াতাড়ি, লিটিল স্পার্ক।”

তার কণ্ঠে সেই আগের মতোই অধিকারী সুর।

“আমার আরও কাজ আছে।”

#চলবে

(যারা গল্পটা পড়বেন রেসপন্স করবেন। হ্যাপি রিডিং 🤍)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন