ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

১২তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

∆পড়া শেষ নীচের নোটটা অবশ্যই পড়বেন।

ইস্তাম্বুলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি গত কয়েক বছরে

অনেক বদলে গিয়েছিল। যে বিরোধী দলটা একসময়

সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল

সময় গড়ানোর সাথে সাথে সেই দলের ভেতর দুর্নীতি,

ক্ষমতার অপব্যবহার আর স্বজনপ্রীতি ভয়ঙ্করভাবে

বেড়ে যায়।

মানুষ ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়ে। তাদের মনে হতে

শুরু করে শুধু প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর কিছু বদলাবে না।

ঠিক তখনই National Development Party (NDP) নতুনভাবে সামনে আসে।

মানুষ শুধু NDP-কে ভালোবেসে ভোট দেয়নি বরং

আগের পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে একটা পরিবর্তনের

আশায় ভোট দিয়েছে।

আর রাজনৈতিক মহলে সবাই খুব ভালো করেই জানত

যদি সারফরাজ আহমেদের সমর্থন NDP-এর পাশে

যায়, তাহলে নির্বাচনের ফল কোন দিকে যাবে সেটা

আন্দাজ করা কঠিন হবে না।

আগের এই দলটা প্রায় বিশ বছর ধরে ইস্তানবুলের

রাজনীতিতে রাজত্ব চালিয়ে এসেছে।

দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে তাদের নেটওয়ার্ক

এখনো বিশাল।

প্রশাসনের অনেক জায়গাতেই তাদের লোক রয়ে গেছে।

তবে সময় বদলাচ্ছিল।

টিভি চ্যানেল, সংবাদপত্র, সোস্যাল মিডিয়া সব জায়গাতেই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল NDP-কে নিয়ে।

অন্যদিকে সেই আগের বিরোধী দল চুপ ছিল না।

ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছিল বার বার আবরাজের দিকে,

“NDP শুধু বড় বড় কথা বলে, ক্ষমতায় এলে এরা শেষ করে দেবে ইস্তাম্বুলকে।”

কিন্তু যতই বিরোধিতা বাড়ছিল ততই আবরাজ খানের জনপ্রিয়তা ইস্তাম্বুল জুড়ে আরও ছড়িয়ে পড়ছিল।

সারফরাজও কম কিছু করেনি।

মিটিং, জনসভা, ইন্টারভিউ প্রায় সব জায়গাতেই

কোনো না কোনোভাবে সে NDP-এর নাম উল্লেখ

করেছে।

সরাসরি সমর্থন খুব কম দিলেও ইস্তাম্বুলের

রাজনৈতিক মানুষগুলো বুঝে গিয়েছিল,

সারফরাজ আহমেদ কার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।

ইস্তাম্বুল হলো আবরাজ খানের বহুদিনের স্বপ্ন।

শুধু রাজনীতি না ক্ষমতা, ইনফ্লুয়েন্স সবকিছুর কেন্দ্র

হিসেবে সে এই শহরটাকেই চায়।

তাই ইলেকশন নিয়ে কোনো ধরনের ভুল-ত্রুটি রাখার

ইচ্ছা তার ছিল না।

দিন-রাত মিটিং, প্ল্যানিং, নিজ দায়িত্বে সব পর্যবেক্ষণ করা নিজেকে পুরোপুরি ঢেলে দিয়েছিল সে।

কারণ আবরাজ খুব ভালো করেই জানত একবার

ইস্তাম্বুল তার হাতে চলে এলে আর কেউ সহজে তাকে

থামাতে পারবে না।

১২ দিন পর ____________

অবশেষে চলে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন। ভোট শেষ

হয়েছে কয়েকদিন আগেই। আর আজ ফলাফল

ঘোষণার দিন।

ইস্তাম্বুল শহরটা যেন আজ অন্যরকম। সকালের

আকাশ পরিষ্কার উজ্জ্বল। হালকা নীলের ওপর সূর্যের

সোনালি আলো পড়েছে। তবে শহরের ভেতরে শান্তি নেই আছে উত্তেজনা।

রাস্তর দুপাশে বড় বড় স্ক্রিনে, নিউজ চ্যানেলগুলো

লাইভ রেজাল্ট দেখাচ্ছে।

কাউন্টিং শুরু হওয়ার পর থেকেই একের পর এক রেজাল্ট আসতে থাকে।

আর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে যায়,,,,,,,,

National Development Party (NDP) ভয়ঙ্করভাবে

এগিয়ে আছে।

শুধু এগিয়েই না প্রায় সব জায়গাতেই জয় পাচ্ছে তারা।

রাজনৈতিক মহল দ্রুত বুঝে যায় একটা বিষয়

যারা বাইরে থেকে নিরপেক্ষ বা অন্য দলের সমর্থক

সেজে ছিল তাদের বড় একটা অংশ ভিতরে ভিতরে

NDP-এর পক্ষেই ছিল।

মানুষ আসলে পরিবর্তন চাইছিল। আর সেই

পরিবর্তনের ঢেউ এবার পুরো ইস্তানবুল জুড়েই স্পষ্ট

হয়ে উঠল।

মাইক বেজে চলেছে,

“পরিবর্তনের সময় এসেছে!”

“পরিবর্তন নাকি প্রত্যাবর্তন!”

“উন্নয়নের পথে এগিয়ে যান!”

মানুষজন দল বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কেউ উল্লাস

করছে, কেউ চুপচাপ দেখছে। কারোর চোখে হিসেব,

কারোর চোখে ভবিষ্যতের চিন্তা। পোস্টারগুলো বাতাসে

দুলছে।

সময় যত এগোচ্ছে ফলাফল ততই পরিষ্কার হচ্ছে।

একটার পর একটা এলাকায়, একটার পর একটা

জোনে National Development Party (NDP) দল

জিতে যাচ্ছে।

বিকেল ৪টার দিকে চারদিকে শুধু একটাই নাম

আবরাজ খান। পুরো শহর যেন নতুন কিছুর অপেক্ষায়।

২–৩ দিন কেটে গেলো।

এই কয়েকদিনে ফলাফল অফিসিয়ালি নিশ্চিত হলো,

সব কাগজপত্র ক্লিয়ার হলো।

অবশেষে ইস্তানবুলে নতুন মেয়র হলো আবরাজ খান।

মুহূর্তেই শহরের একদিক থেকে আরেকদিকে ছড়িয়ে

পড়ল শব্দ, হর্ন, চিৎকার, উল্লাস, আতশবাজির

আওয়াজ।

কেউ খুশিতে চিৎকার করছে,

“আবরাজ! আবরাজ!”

কেউ আবার দূর থেকে তাকিয়ে রয়েছে।

কেউ চুপচাপ ভাবছে,

“এই পরিবর্তন সত্যিই শহরে পরিবর্তন আনবে তো?”

খান মহলে আজ যেন উৎসবের ঘর। বাড়িটা সাজানো।

গেটের সামনে লোকজনের ভিড় জমে রয়েছে। মহলের

ভেতরে সবাই ব্যস্ত।

মহলে‌ ফোনের রিং যেন থামছেই না।

আবরাজ একটার পর একটা কল রিসিভ করছে।

কখনো হাসছে, কখনো গম্ভীর গলায় কথা বলছে,

“ধন্যবাদ।”

“হ্যাঁ, আমরা কাজ শুরু করবো খুব শিগগিরই।”

“ইস্তাম্বুল আমাদের এবার।”

তার চোখে সেই আত্মবিশ্বাস, যেন সে অনেক আগে

থেকেই জানত এই জয় তারই হবে।

পাশে মিনহাজ সবকিছু ম্যানেজ করছে।

প্রয়াণ খান নিজেও ব্যস্ত আজ।

লোকজনের সাথে কথা, ফোন, নির্দেশ দেওয়া সবকিছু

যেনো একদম পুরো দমে চলছে।

তার ভেতরের আগ্রাসী এনার্জিটা আজ কাজে লাগছে

পুরোপুরি।

সন্ধ্যা ৬টা__________________

খান মহলের সামনে একটা কালো গাড়ি এসে থামল।

দরজা খুলে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসলো সারফরাজ

আহমেদ।

চারপাশে থাকা লোকজন মুহূর্তেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল।

খান মহলের ভেতর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল আবরাজ।

দুজনের চোখাচোখি হলো। তারপর সরফরাজ

এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরল আবরাজকে।

এই আলিঙ্গনে শুধু সম্পর্ক নেই, আছে ক্ষমতা, হিসেব,

জোট।

আবরাজ হালকা হেসে বলল,

“শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল।”

সারফরাজ ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বলল,

“আমি আগেই বলেছিলাম।”

দুজন ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকতে লাগল। চারপাশে

ক্যামেরা, লোকজন, কোলাহল।

ঠিক তখনই আরেকটা গাড়ি ঢুকল গেট দিয়ে।

সেখান থেকে নামলেন অরিন্দম চৌধুরী। আদ্রিতার

বাবা।

তার হাঁটার ভঙ্গিতে আত্মবিশ্বাস। তবে চোখে আলাদা

হিসেব।

অরিন্দম এগিয়ে এসে আবরাজের কাঁধে হাত রাখলো।

তাদের সম্পর্কটা কাগজে-কলমে শ্বশুর-জামাই হলেও

বাস্তবে দুজনেই রাজনীতিবিদ।

ব্যক্তিগত সম্পর্কের থেকে রাজনৈতিক সমীকরণটাই

তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অরিন্দম এগিয়ে এসে বলল,

“কনগ্র্যাচুলেশনস, মেয়র সাহেব।”

আবরাজ হেসে হাত মিলিয়ে বলল,

“ধন্যবাদ।”

দ্বিতীয় তলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিতা।

উপর থেকে সব দেখছে। সারফরাজ, আবরাজ, তার

নিজের বাবা সবাই একসাথে।

তার ভ্রু কুঁচকে গেল। চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।

মনে মনে বলল,

“কি সুন্দর মিল। সবাই একে অপরের সাথে হাত মিলাচ্ছে আর নিজেদের সুবিধা বুঝে সম্পর্ক বানাচ্ছে।”

তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।

“আসলে এরা কেউ কারোর না।”

বাইরেও তখন পুরো উৎসব। ইস্তাম্বুল জুড়ে আজ যেন

একটাই নাম আবরাজ খান।

তার দলের লোকজন একের পর এক এসে পৌঁছাচ্ছে খান মহলে। কেউ ফুলের বাকেট নিয়ে, কেউ মিষ্টি, কেউ অভিনন্দন জানাতে।

খান মহলের ভেতর এখন মানুষের ভিড় সম্পূর্ন।

সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

পরিবারের সবাই উপস্থিত।

শাহবাজ খান গম্ভীর মুখে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে চোখে ছেলের জন্য একরাশ গর্বের ঝিলিক।

ফারহান খান লোকজনের সাথে কথা বলছেন।

শর্মিষ্ঠা অতিথিদের সামলাচ্ছে। সবকিছু যেন এক

নিখুঁত ছবির মতো সাজানো।

সবকিছুর মাঝেই সারফরাজের চোখ সবদিকেই ঘুরছিলো। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে উঠে গেল উপরের দিকে। দ্বিতীয় তলার রেলিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে

প্রিয়ান্তি খান। তার পাশে আছে আদ্রিতা।

দুজনেই নিচের দৃশ্য দেখছে কিন্তু দুজনের চোখে দুই রকম ভাব।

সারফরাজের চোখ থেমে রইল প্রিয়ান্তির ওপর।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকার পর তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।

সেই হাসিতে স্বাভাবিকতা নেই আছে নতুন চালের প্ল্যান।

মনে মনে কিছু একটা ভাবল সে। একটা বড়ো খেলার

হিসাব। যেখানে মানুষ মানুষ না শুধু দাবার ঘুঁটি।

কিছুক্ষণ পর ভেতরের ভিড়টা যেন আরও বেড়ে গেলো।

মিউজিক হালকা বাজছে। লোকজন কথা বলছে, হাসছে।

ঠিক তখনই একজন স্টাফ এসে ধীরে বলল,

“স্যার, মিডিয়া এসেছে বাইরে।”

আবরাজ একবার সারফরাজের দিকে তাকাল।

দুজনের চোখে এক মুহূর্তেই বোঝাপড়া হয়ে গেলো।

তারপর আবরাজ বলল,

“চলুন।”

দুজন একসাথে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থেমে গেল

আদ্রিতা।

সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অরিন্দম চৌধুরী।

এক মুহূর্তে আদ্রিতার রাগ, কান্না, অভিমান, অসহায়তা

সব একসাথে যেন গলা চেপে ধরল।

সে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে এগিয়ে

গেল। ঠোঁটে হালকা হাসি কিন্তু চোখে সেই হাসির ছিটেফোঁটাও নেই।

“খুব খুশি আপনি আশা করি?”

অরিন্দম কিছু বলার আগেই সে আবার বলল,

“আবরাজ খান জিতে গেছে আপনিও আবার রাজনীতিতে একটা পাকাপোক্ত জায়গা পাবেন।”

কথাগুলো শান্ত কিন্তু প্রতিটা শব্দ যেন কাঁটার মতো।

অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এসব এখন বলার সময় না।”

আদ্রিতা হেসে ফেলল,

“ঠিক… এসব তো এখন বলার সময় না।”

তার চোখ সরাসরি বাবার চোখে। একটু থেমে বলল,

“৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে আবরাজ খানের মতো একটা প'শুর কাছে নিজের মেয়েকে বি'ক্রি করে দিয়েছেন। সেখানে এইসব কথা বলার প্রশ্নই ওঠে না।”

শব্দগুলো ধীরে ধীরে বেরোল কিন্তু আঘাতটা গভীর।

“কারণ আপনার জায়গাটা সেদিন পাকা হয়ে গেছে।”

অরিন্দম থমকে গেল। তার চোখে স্পষ্ট বিস্ময় কারণ কথাটা তো গোপন থাকার কথা ছিল।

সে এক পা এগিয়ে এলো। হালকা কড়া গলায় বলল,

“আবরাজ এসব বলেছে তোমায়?”

একটু থেমে বলল,

“তুমি যেমনটা ভাবছো বিষয়টা তেমন না। আমি যা করেছি তোমার ভালোর জন্যই করেছি।”

কথাটা শুনে আদ্রিতার ভেতরটা যেন ভেঙে পড়ল।

তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। নিজেকে থামাতে

পারল না।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা তার বাবা।

যার হাত ধরে সে হাঁটতে শিখেছে। যাকে ছাড়া এক পা

চলত না ছোটবেলায়। আজ সেই মানুষটাই তার

জীবনটা শেষ করে দিয়েছে। তার গলা কেঁপে উঠল। বলল,

“ভালো?”

একটা ভাঙা হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটে।

“ঠিক কোনটা ভালো? টাকাটা নেওয়া?”

চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।

“নাকি আমাকে বিক্রি করে দেওয়াটা?”

অরিন্দম এবার একটু বিরক্ত। সে একটু অস্থির গলায় বলল

“তুমি বুঝতে চাইছো না, আদ্রিতা।”

তার গলা এবার শক্ত।

“এই দুনিয়ায় সবকিছু আবেগ দিয়ে চলে না। ক্ষমতা লাগে, অবস্থান লাগে নিরাপত্তা লাগে!”

সে সামনে এগিয়ে এসে বলল,

“তোমাকে আমি এমন একটা জায়গায় বসিয়েছি,

যেখানে কেউ তোমাকে ছুঁতেও পারবে না।”

আদ্রিতা কিছু বলার আগেই পিছন থেকে পায়ের শব্দ ভেসে এলো। করিডোরের নীরবতা যেন একটু কেঁপে উঠল। ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল আবরাজ খান।

তার পাশে সারফরাজ আহমেদ।

দুজনেই থেমে গেল দৃশ্যটা দেখে।

কারণ বাবা আর মেয়ে মাঝখানে জমে থাকা উত্তেজনা স্পষ্ট।

আবরাজ একবার পুরো পরিস্থিতিটা চোখ বুলিয়ে নিল।

তারপর স্বাভাবিক গলায় বলল,

“এইভাবে করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছো কেন?”

তার দৃষ্টি অরিন্দমের দিকে গেলো। তারপর আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোমার বাবা এসেছেন ওনাকে ভিতরে নিয়ে যাও।”

আদ্রিতা ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল তার দিকে।

রাগে, অপমানে, কান্নায় চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে।

তার গলা ঠান্ডা কিন্তু শব্দে বিষ ঝরে পড়ছে।

“একদম ন্যাকামি করবেন না আমার সাথে।”

করিডোরে মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

সারফরাজের ভ্রু সামান্য উঠল। সে আগ্রহ নিয়ে

তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।

কারণ সে জানে, আবরাজ খানের সাথে কেউ এভাবে

কথা বলে না।

অরিন্দম নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেল।

আবরাজের সাথে মেয়ের এই আচরণ সে কল্পনাও করেনি। আরেকদিকেও চিন্তা আছে মেয়ের এই আচরণের জন্য আবরাজ না তার কাউন্সিলর সিটটা

বাতিল করে।

তবে আবরাজের তার মুখে এখনো সেই হালকা হাসি।

আদ্রিতা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না।

সে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। পায়ের শব্দ তীক্ষ্ণ। রাগে ভরা।

তার চলে যাওয়ার পর সারফরাজ ধীরে আবরাজের দিকে তাকাল। ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলল,

“ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, মেয়ের সাহেব।”

কয়েক মুহূর্ত পুরো করিডোর নিস্তব্ধ হয়ে রইলো।

তারপর অরিন্দম চৌধুরী ধীরে বললেন,

“তুমি টাকার কথাটা আদ্রিতাকে বলেছো?”

আবরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চোখে বিরক্তির

ছায়া। তবে এখন আর বাইরের সেই ভদ্র, সাজানো মুখ

নেই। এখানে শুধু বাস্তব। সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“না বলে কি করতাম?”

তার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি,

“আপনার মেয়ে তো আর সাধারণ মেয়ে না সে যেন ঝাল মরিচ।”

সারফরাজ পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ শুনছে।

তার চোখে অন্যরকম আগ্রহ। যেন এই সম্পর্কের

ভেতরের ফাটলগুলো সে মাপছে।

অরিন্দম এবার গলা শক্ত করে বলল,

“তুমি কথা দিয়েছিলে আবরাজ এই ব্যাপারটা গোপন থাকবে।”

আবরাজ এক পা এগিয়ে এসে সাথে সাথে জবাব দিল,

“আপনিও তো বলেছিলেন, আপনার মেয়েকে বিয়ে

করলে আমি শান্তিতে থাকবো।”

তার চোখে সেই ঠান্ডা আগুন। গলায় চাপা রাগ স্পষ্ট।

“কিন্তু বিশ্বাস করুন বিয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত

আপনার মেয়ে আমাকে আমার পরিবারকে এক ফোঁটা

শান্তিও দেয়নি।”

কথাগুলো ভারী হয়ে ঝুলে রইল বাতাসে।

অরিন্দম চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর ধীরে বললেন,

“কিন্তু তার জন্য আমার কী দোষ, আবরাজ?”

একটু থামলেন। গলায় হালকা কড়া ভাব।

“তুমি মেয়ের সামনে আমায় খারাপ করলে কেন?”

আবরাজ হালকা হাসল। তবে সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই।

“দোষটা আপনারই।”

তার গলা ঠান্ডা।

“আপনার আমাকে আগে বলা উচিত ছিল যে আপনার মেয়ের নেচারটা ঠিক কেমন।”

সারফরাজ পাশে দাঁড়িয়ে চোখে সেই আগ্রহ নিয়ে দুজনকে দেখছে।

অরিন্দম এবার একটু নরম হলেন। তিনি জানেন

এখানে বেশি চাপ দিলে উল্টো ফল হতে পারে।

ধীরে বললেন,

“শুনলাম… তুমি নাকি আদ্রিতাকে কলেজে যেতে দিচ্ছ?”

আবরাজ এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে।

তারপর মাথা হালকা কাত করল।

“না দিলে আপনার মেয়ে বাড়ির কাউকে শান্তিতে থাকতে দিত না।”

ঠোঁটে আবার সেই হালকা হাসি,

“তাই যেতে দিচ্ছি।”

কথাটা খুব সহজভাবে বলল সে।

অরিন্দম চুপ করে রইলো। তিনি বুঝতে পারছেন এই

খেলাটা তার ভাবনার চেয়েও বড়।

সারফরাজ ধীরে সামনে এগিয়ে এল। দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হালকা গলায় বলল,

“এখানে রাজনীতি শুধু বাইরে না ভেতরেও চলছে দেখছি।”

অরিন্দম শান্ত গলায় বললেন,

“আবরাজ… আদ্রিতাকে ডাক্তারি কলেজে যেতে দেওয়াটা কি ঠিক হচ্ছে?”

তার চোখে হিসেবি দৃষ্টি,

“আমি নিজেই চাইনি ও আর পড়াশোনা করুক।”

তারপর ধীরে, ঠান্ডা স্বরে যোগ করলেন,

“আমি ভেবেছিলাম তোমার সাথে বিয়ে হলে আদ্রিতা তোমার ওপর কোনো কথা বলতে পারবে না। ওর

পড়াশোনাটাও বন্ধ হয়ে যাবে।”

আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎই হেসে ফেলল। মাথা নেড়ে বলল,

“আহা কি সুন্দর স্বপ্ন দেখছিলেন আপনি।”

চোখ সরু করে বলল,

“আপনার মেয়ে এক নম্বরের অবাধ্য। না বড়দের কথা শোনে, না আমার।”

অরিন্দমের ভ্রু কুঁচকে গেল। তার মুখে অসন্তোষ ভাব।

কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন স্বীকারোক্তি। কারণ সে

জানে, তার মেয়ে এমনই।

ছোটবেলা থেকেই সে প্রতিবাদী। নিজের মতো। নিজের

পায়ে দাঁড়াতে চাওয়া মেয়ে।

অরিন্দম ভেবেছিল খান মহলের মতো জায়গায় এসে

এই আগুনটা কমে যাবে। কিন্তু সেটা হয়নি।

অরিন্দম ধীরে বললেন,

“আবরাজ…আদ্রিতার কলেজ যাওয়া কি কোনোভাবে আটকানো যায় না?”

আবরাজ এবার একটু গম্ভীর হলো। চোখে সেই ঠান্ডা হিসেব‌।

“আপনার মেয়েকে যদি আমি বলি সোজা যেতে, সে উল্টো দিকেই যাবে।”

সরাসরি অরিন্দমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আর সবথেকে বড় কথা সে কাউকে ভয় পায় না।”

একটু চাপা গলায় বলল,

“বরং সুযোগ পেলে চার-পাঁচটা থা'প্প'ড় আমাকেই দিয়ে দেবে।”

এক সেকেন্ড নীরবতার পরেই সারফরাজ হেসে উঠল।

“হা হা…!”

তার হাসি প্রতিধ্বনি করিডোরে উঠল।

“হুম, মেয়েটা কিন্তু ইন্টারেস্টিং।”

চোখে সেই কৌতূহল যেন সে নতুন কোনো খেলনা খুঁজে পেয়েছে।

অরিন্দম চৌধুরী ধীরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেন।

মনে ভেসে উঠলো ছোট্ট আদ্রিতার মুখ।

যে ছোটবেলা থেকেই একগুঁয়ে, জেদি কিন্তু নিজের মতো সৎ।

চৌধুরী বাড়িতেও সে এমনই ছিল। কাউকে ভয় পেত না,

ভুল দেখলে চুপ থাকত না।

তিনি ভেবেছিলেন খান মহলের মতো একটা বড়,

ক্ষমতাশালী পরিবারে গিয়ে এই আগুনটা ধীরে ধীরে

নিভে যাবে। কিন্তু আজ বুঝলেন তার ধারণা সম্পূর্ণ

ভুল ছিল।

আবরাজের গলায় সেই ঠান্ডা তাচ্ছিল্য। সে আবার বলল,

“আপনি বরং নিজের মেয়েকে বোঝান সংসার করতে হয় কীভাবে।”

একটু থেমে বলল,

“রান্না-বান্না, কাজকর্ম এইসবও শিখতে বলুন।”

তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি।

“কিছুই তো পারে না। শুধু পারে সবার মুখের ওপর কথা বলতে।”

কথাগুলো শুনে অরিন্দমের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

এই প্রথম তার ভেতরে একটু অস্বস্তি হল।

সারফরাজ হাত তুলে হালকা ভঙ্গিতে বলল,

“যাই হোক… এসব বাদ দিন।”

তার গলা এবার পুরো বদলে গেছে। ব্যক্তিগত কথাবার্তা থেকে সরাসরি কাজের দিকে।

“সামনের দিকটা আমাদের পাকাপোক্ত করতে হবে।”

আবরাজ মাথা নেড়ে বলল,

“হুম।”

তার চোখে আবার সেই রাজনৈতিক হিসেব ফিরে এসেছে।

অরিন্দম চৌধুরী একটু এগিয়ে এসে বললেন,

“আমার এলাকা… মানে ফাতিহ।”

একটু থেমে যোগ করলেন,

“ওখানকার কাউন্সিলরের জায়গায় আমি থাকবো।”

তার গলায় স্পষ্ট ইচ্ছা। সেটা শুধু অনুরোধ না একটা

দাবি।

আবরাজ এক সেকেন্ডও দেরি করল না।

চোখে ঠান্ডা আত্মবিশ্বাস। সরাসরি বলল,

“চিন্তা করবেন না। সেটাই হবে।”

সারফরাজ ধীরে হাসল। চোখে সেই গভীর, হিসেবি ঝিলিক। বলল,

“এছাড়াও আপনার জন্য আমার একটা বিশেষ প্রস্তাব আছে, মেয়র সাহেব।”

আবরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকাল,

“কি?”

অরিন্দমও একটু এগিয়ে এলেন শুনতে আগ্রহ স্পষ্ট।

সারফরাজ ধীরে ধীরে কথা বলল,

“ইস্তাম্বুলের যে জায়গাগুলো এখনো আপনার হাতে আসেনি সেগুলোও আপনার হয়ে যাবে।”

আবরাজ তাকিয়ে রইল তার দিকে। চোখে হঠাৎ এক ঝলক। নতুন ক্ষমতার লোভ।

অরিন্দমও অবাক হয়ে তাকালেন। বুঝলেন, এটা ছোট কোনো অফার না।

সারফরাজ আবার হালকা হেসে বলল,

“শুধু একটা ছোট শর্ত।”

তার চোখ এবার দুজনের ওপর ঘুরল। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,

“আমাদের এই সম্পর্কটা রাজনীতি থেকে ফ্যামিলিতে নিয়ে যেতে হবে।”

করিডোরে মুহূর্তে নিস্তব্ধ নেমে এলো।

কথাটার মানে বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না কারোর।

আবরাজ চোখ সরু করে তাকালো।

অরিন্দমের মুখ শক্ত হয়ে গেল। তার মাথায় প্রথমেই ভেসে উঠল,

“কাকে দাবার ঘুঁটি বানাতে চাইছে?”

#চলবে

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#পর্ব_১২

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

((রাজনীতি সম্পর্কে আমার বিশেষ কোনো গভীর ধারণা নেই। তাই ছোট্ট করে বাস্তবতার ছোঁয়া রেখে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছি মাত্র। ভুল-ত্রুটি হলে অবশ্যই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। 🌑🤍

আর হ্যাঁ, মাঝখানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ আমি বড়ো করে লিখবো। বিশেষ করে আবরাজের মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণের মুহূর্তটা পুরোপুরি নিজের মতো করে সাজাতে চাই।

এবার আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন ______

এই পর্বের পর কি আবরাজের রাজনৈতিক দিকটা আরও বিস্তারিতভাবে দেখাবো?

নাকি সারফরাজের দিকটা এবং খান-আহমেদ পরিবারের পারিবারিক পরিস্থিতিটা বেশি ফুটিয়ে তুলবো?

কারণ যদি পরের পর্বে রাজনৈতিক দিকটা না আসে, তাহলে সেটা সম্ভবত পর্ব ১৬-এর আগে আর দেখা যাবে না। 🌚

তাই অবশ্যই নিজেদের মতামত জানাবেন।))

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন