ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

১১তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

দুপুরেই বাড়ি ফিরে এলো প্রয়াণ।

রাহি তখন রান্নাঘরে তাই সে দেখতেই পেল না, প্রয়াণ

ফিরে এসেছে।

সকালের ঝগড়ার পর সে ভেবেছিল আজও হয়তো রাত

করে ফিরবে অথবা ফিরবেই না।

ঘরের ভেতরে তখন অন্য দৃশ্য। রাজন্যা নিজের মতো খেলছিল। বাবাকে দেখেই ছোট্ট পায়ে দৌড়ে গেল।

প্রয়াণ এক ঝটকায় মেয়েকে তুলে নিল কোলে।

রাজন্যা বলল,

“কই চলে গেছিলে পাপা।”

প্রয়াণ মেয়ের দুই গালে চুমু দিয়ে বলল,

“কোথাও যাইনি, মাম্মাম।”

তার গলায় সেই নরম ভাব।

রাজন্যা খিলখিল করে হাসছে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে।

কিছুক্ষণ পর রাহি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল,

“রাজন্যা, কোথায় গেলি তুই....”

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তার চোখ গিয়ে থামল সামনে।

দুপুরের আলোটা ঘরের ভেতর নরম হয়ে ঢুকছে।

প্রয়াণ বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে, রাজন্যা তার

বুকের ওপর শুয়ে। প্রয়াণ এক হাতে ফোন। স্ক্রিনে কিছু

দেখছে বাবা-মেয়ে মিলে।

রাহি থেমে গেল দরজার কাছে। চোখে স্পষ্ট অবাক ভাব। এই দৃশ্যটা সে আশা করেনি।

প্রয়াণ একবার তাকাল। তার চোখে চোখ পড়তেই

তারপর আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। যেন কিছুই হয়নি।

রাহি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা গলায় বলল,

“কি ব্যাপার? তেজ দেখিয়ে চলে গিয়েছিলে আবার বাড়ি ফিরে এলে যে?”

একটু থামল। ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্য,

“কেউ থাকতে দিলো না নাকি বাইরে?”

প্রয়াণ এবার চোখ তুলল। কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল রাহির দিকে। তারপর ধীরে বলল,

“আমার বাড়ি আমি যখন ইচ্ছা ফিরব।”

গলা একদম শান্ত। কিন্তু ভেতরে চাপা কিছু আছে।

রাহি ভ্রু কুঁচকে বলল,

“ফিরতেই পারো…আমি তো কিছু বলিনি।”

প্রয়াণ হালকা হাসল। একটা ক্লান্ত হাসি।

“বলিসনি?”

তার চোখ এবার একটু গভীর।

“সকালে যা বলেছিস ওটাই কী কম ছিল?”

রাহি ঠান্ডা গলায় বলল,

“সেই দোষ তো আমার তাই না? আমি কেন বলব কিছু? তুমি ম'দ খেয়ে বাড়ি ফিরবে সেটা তো খুব ভালো।”

প্রয়াণ কিছু বলল না। সে জানে এখন কথা বাড়ালে

ঝামেলা বাড়বে। তার থেকে চুপ থাকা ভালো।

সে শুধু মেয়ের চুলে হাত বুলিয়ে দিল। চোখ নামিয়ে রাখল।

***********

দুপুর ২টা প্রায়।

কলেজের গ্রাউন্ডে দাঁড়িয়ে আছে আদ্রিতা।

হাতে কয়েকটা ফাইল। তবে দেখলেই বোঝা যায়, ওগুলো মেডিক্যালের বিষয়ে না। তার ভেতরে অন্য কিছু আছে।

কিছুক্ষণ পর একজন ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। পায়ের শব্দ খুব হালকা।

আদ্রিতার চোখ সরাসরি লোকটার দিকে। বলল,

“কতদূর জানতে পারলেন?”

লোকটা হলো দেবজিত রহমান। চৌধুরী বাড়ির বডিগার্ড। চুপচাপ, কম কথা বলে কিন্তু কাজে সব প্রমাণ করে দেয়।

আদ্রিতার জন্য সে শুধু একজন গার্ড না, একজন ভরসার মানুষ।

দেবজিত চারপাশে একবার তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল,

“যতটুকু বুঝলাম ওই ৩০ লাখ টাকার হিসাবটা সোজা না, ম্যাডাম।”

আদ্রিতার ভ্রু কুঁচকে গেল,

“মানে?”

দেবজিত ধীরে বলল,

“ওটা শুধু টাকা না ওটার পেছনে অন্য কিছু আছে।”

আদ্রিতা বলল,

“আমার প্রশ্ন হচ্ছে হঠাৎ করে বাবার এত টাকার দরকার পড়ল কেন?”

দেবজিত উওর দিলো,

“সেটাই আমিও ভাবছি।”

তারপর সামান্য ঝুঁকে বলল,

“তবে একটা জিনিস নিশ্চিত, আবরাজ খান যদি

ইস্তানবুলের মেয়র হয় তাহলে আপনার বাবার

ফাতিহ (Fatih) এলাকার মিউনিসিপাল কাউন্সিল

মেম্বার হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।”

কথাটা শুনে আদ্রিতা স্থির হয়ে গেল। সবকিছু যেন

একসাথে মিলতে শুরু করেছে। এতগুলো টাকা, এই

বিয়ে সবই #রাজনীতির_রক্তচুক্তি।

সে ধীরে বলল,

“ঠিক আছে।”

তার গলা এখন ঠান্ডা কিন্তু ভেতরে চাপা আগুন।

“বাকিটা আমি দেখে নেব।”

তারপর দেবজিতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনার আর আমার সাথে কন্ট্যাক্ট করার দরকার নেই।”

দেবজিত কিছু বলল না। শুধু মাথা নেড়ে ধীরে ধীরে

বেরিয়ে গেলো।

-------

সকাল ৮টার দিকে ঘরের পর্দা সরিয়ে সূর্যের আলো

ঢুকেছে ভেতরে। হালকা আলো এসে পড়েছে বিছানার

ওপর।

আবরাজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শার্টের বোতাম

লাগাচ্ছে। আজও তার দিন শুরু হবে মিটিং,

ক্যাম্পেইন, রাজনীতি দিয়ে।

ঠিক তখন‌ই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল আদ্রিতা।

চোখ দুটো ঠান্ডা। যেন ভেতরে জমে আছে কিছু।

আবরাজ তাকাল। ভ্রু সামান্য কুঁচকাল।

“কি সমস্যা তোমার?”

আদ্রিতা এক পা এগিয়ে এসে বলল,

“মানে আপনার লজ্জা বলে কিছু নেই?”

কথাটা একদম সরাসরি।

আবরাজ থামল। এক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। বলল,

“কি করেছি আমি?”

আদ্রিতার ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল,

“নন্দিনী মেয়েটা কে?”

নামটা শুনেও আবরাজের চোখে কোনো পরিবর্তন নেই।

সে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“কেউ না।”

আদ্রিতা হালকা হেসে ফেলল। একটা তাচ্ছিল্যের হাসি।

“কেউ না?”

একটু এগিয়ে এসে বলল,

“ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা, চ্যাট সবকিছু নাটক.... এসব কি ‘কেউ না’দের সাথেই হয়?”

তার চোখে এবার আগুন।

ঘরের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।

আবরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর ঘুরে গিয়ে ধীরে ধীরে বিছানায় শুয়ে পড়ল।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ক্লান্ত লাগছে, লিটিল স্পার্ক।”

চোখ বন্ধ করে বলল,

“অন্য কারও কথা বাদ দাও।”

কথাগুলো এতটাই নির্লিপ্ত যেন এই আলোচনাটার কোনো গুরুত্বই নেই তার কাছে।

আদ্রিতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

তার চোখে রাগের চেয়ে বরং একটা ঠান্ডা উপলব্ধি।

এই মানুষটার কাছে মানুষ, সম্পর্ক কিছুই গুরুত্বপূর্ণ

না। সবকিছুই তার সুবিধা অনুযায়ী।

সে ধীরে বলল,

“আপনার একটা জিনিস আমি বুঝি না…”

আবরাজ চোখ খুলল না। আদ্রিতা নিজেই বলল,

“আপনি সবকিছু কন্ট্রোল করতে পারেন কিন্তু নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারেন না।”

ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।

আবরাজ কোনো উত্তর দিল না। চোখ বন্ধ করে এক হাত কপালের ওপর রেখে শুয়ে রইল।

আদ্রিতা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার বলল,

“উত্তর দিন, আবরাজ খান।”

তার গলা এবার আরও ঠান্ডা।

“মেয়েটা কোথাকার?”

একটু থেমে বলল,

“কি করে?”

তার চোখ সরাসরি আবরাজের দিকে,

“বয়স কত?”

প্রশ্নগুলো একটার পর একটা ছুঁড়ে দিল সে।

ঘরের ভেতর আবারও নিস্তব্ধতা।

কয়েক সেকেন্ড পর আবরাজ ধীরে চোখ খুলল।

কিছুক্ষণ শুধু তাকিয়ে রইল আদ্রিতার দিকে। তারপর

ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। সেই বিরক্তিকর,

নির্লিপ্ত হাসি।

“জেনে কী করবে?”

আদ্রিতা চোখ না সরিয়েই বলল,

“আমি সিরিয়াস। উওর দিন।”

আবরাজ এবার উঠে বসল। বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল তার দিকে।

তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“নাম নন্দিনী। ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। যতদূর সম্ভব ইকোনোমিক্সে অনার্স।”

একটু থেমে আবরাজ বলল,

“বয়স বাইশ হয়তো।”

আদ্রিতা শুনল। তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই।

“হয়তো?”

তার ঠোঁটে ব্যঙ্গ ফুটল,

“ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেন, চ্যাট করেন কিন্তু বয়সটা ‘হয়তো’?”

একটু থেমে আদ্রিতা যোগ করল,

“নিজের স্ত্রীর বয়সী একটা মেয়েকেও ছাড়লেন না।”

আবরাজ এবার হেসে ফেলল।

“তুমি ঠিক কী প্রমাণ করতে চাইছ?”

আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“কিছু না। কারন আপনার জীবনটাই তো একটা নোংরা নাটক।”

একটু এগিয়ে এলো সে।

“একটা মেয়েকে টাকার বিনিময়ে বিয়ে করলেন আর

আরেকটা মেয়েকে মিথ্যে দিয়ে বেঁধে রাখছেন।”

একটু থেমে বলল,

“তা এরকম ঠিক কতজন আছে আপনার?”

আবরাজ হেসে ফেলল। একটা নির্লজ্জ হাসি।

“নাম্বারটা ঠিক হিসাব করা যায় না গো, লিটিল স্পার্ক।”

কথাটা শেষ হতেই আদ্রিতার চোখে ঘৃণা নেমে এলো।

সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“জা'নোয়া'র একটা।”

আবরাজ ভ্রু তুলল। হাসিটা আরও বাঁকা হলো। বলল,

“তার থেকেও নিচে।”

দুজনের চোখেই চাপা আগুন জ্বলছে।

আদ্রিতা আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। ঘুরে চলে যেতে লাগল।

ঠিক সঙ্গে সঙ্গে আবরাজ উঠে দাঁড়িয়ে আদ্রিতার হাতটা শক্ত করে ধরে টেনে নিল নিজের দিকে।

আদ্রিতা ঘুরে এসে সোজা ধাক্কা খেল আবরাজের

বুকে। মুহূর্তেই দুজনের দূরত্ব শূন্যে এসে দাঁড়ালো।

আদ্রিতা হাত সরাতে চাইলো কিন্তু আবরাজ ছাড়ল না।

আবরাজের গলা নিচু কিন্তু কণ্ঠে চাপা আগুন।

“এভাবে কথা বলে হঠাৎ করে চলে যাওয়ার অভ্যাস বানিও না।”

আদ্রিতা চোখ তুলে তাকাল। চোখে রাগ, অপমান ঝলসে উঠছে।

“হাত ছাড়ুন।”

আবরাজ ছাড়ল না। বরং হঠাৎই তাকে টেনে নিয়ে

বিছানায় বসে পড়ল। আদ্রিতাকেও আটকে রাখল নিজের কাছে।

আদ্রিতা ছটফট করে উঠল,

“কি আশ্চর্য! ছাড়ুন আমায়।”

আবরাজ একটু ঝুঁকে এসে বলল,

“আগে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও?”

একটু থেমে বলল,

“তুমি চ্যাট দেখলে কীভাবে? কীভাবে জানলে আমি নন্দিনীর সাথে কথা বলি?”

আদ্রিতা চোখ নামাল না। আবরাজের আঙুলের চাপ এখনো শক্ত আদ্রিতার হাতের ওপর।

ঘরের ভেতর পুরোপুরি নীরবতা।

আদ্রিতা স্থির গলায় বলল,

“আপনি ভাবেন নিজের সবকিছুই লুকানো যায়?”

একটু থেমে বলল,

“আপনি যতটা চালাক ভাবেন নিজেকে তার থেকেও আশেপাশের মানুষ বেশি বুঝদার।”

আবরাজ ভ্রু কুঁচকাল। চোখে সামান্য সন্দেহের ছায়া।

“সোজা করে বলো।”

আদ্রিতা এবার হালকা ঝুঁকে এল। চোখে চোখ রেখে বলল,

“আপনার ফোন লক থাকলেও নোটিফিকেশন লুকানো থাকে না।”

তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি।

আবরাজ চুপ করে কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে একটা হাসি ফুটল।

“স্মার্ট…”

তবে কণ্ঠে চাপা কিছু রয়েছে। রাগ নাকি অন্য কিছু বোঝা গেল না।

আদ্রিতা হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করল আবারো,

“এবার ছাড়ুন।”

আবরাজ ইচ্ছা করেই হাতে আঙুলের চাপটা বাড়ালো।

আদ্রিতার বিরক্তিটা তার চোখে যেন পৌঁছালো না।

আবরাজ একটু রিল্যাক্স ভঙ্গিতে বলল,

“সবসময় ‘ছাড়ুন ছাড়ুন’ কেন বলো, লিটিল স্পার্ক?”

আদ্রিতা চোখমুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

আবরাজ হালকা হেসে মাথা কাত করল। তার কণ্ঠ একেবারে স্বাভাবিক।

“বাই দ্যা ওয়ে, বিয়ের আগে তোমার প্রেম-ট্রেম কিছু ছিলো নাকি?”

আদ্রিতা ঠান্ডা গলায় বলল,

“সবাইকে নিজের মতো ভাবেন কেন?”

আবরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে উওর দিলো,

“ভাবি না তো তাই জিজ্ঞেস করছি।”

আদ্রিতা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,

“না, ছিল না। পড়াশোনায় ব্যস্ত ছিলাম। সময় পাইনি।”

আদ্রিতা কথাটা বলতেই আবরাজ হঠাৎ হেসে উঠল।

“সিরিয়াসলি?”

সে একটু ঝুঁকে এল। চোখে দুষ্টু ঝিলিক।

“মানে কেউ তোমাকে পছন্দই করেনি?”

আদ্রিতার চোখ রাগে জ্বলে উঠল। বলল,

“মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ।”

আবরাজ থামল না। বলল,

“না মানে এই অ্যাটিটিউড নিয়ে থাকলে কেউ প্রস্তাব

দিতে গেলে দুই কদম এগোনোর আগেই ভয় পেয়ে

পালাতো।”

আদ্রিতা বলল,

“আমি তো আর আপনার মতো না যে সুযোগ পেলেই সেখানে চলে যাবো।”

আবরাজ হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“জানি তো তুমি অন্যরকম।”

আবরাজ এবার ধীরে বলল,

“বিশ্বাস করো লিটিল স্পার্ক…”

তার আঙুলের চাপ এখনো একইরকম।

“তোমাকে কেউ প্রস্তাব দেয়নি, এটা আমি বিশ্বাস করি না।”

একটু থেমে বলল,

“বরং তুমি কাউকে সুযোগ দাওনি এটাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য।

আদ্রিতা বিরক্ত হয়ে আবার বলল,

“হাতটা ছাড়ুন।”

আবরাজ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল.

“উম্ম… হুমম…সারাদিন এভাবেই ধরে রাখব তোমায়।”

আদ্রিতা রাগে তাকিয়ে বলল

“কেন? আমার হাত কেন ধরে থাকবেন? আপনার তো অনেক অন্য কেউ আছে তাদের কাছে যান।”

আবরাজ হেসে উঠল,

“ইউ নো হোয়াট লিটিল স্পার্ক…”

সে এবার আরও কাছে ঝুঁকল। চোখে অদ্ভুত এক ঝিলিক।

“আমার তোমাকে দারুণ লাগে।”

আদ্রিতা চোখ সরু করে তাকাল। চোখে স্পষ্ট সন্দেহ আর বিরক্তি।

আবরাজ একদম কাছে এসে দাঁড়ালো। তার দৃষ্টি নরম না, আবার পুরো কঠিনও না।

“কী কিউট তুমি। তোমার এই চোখ দুটো দারুন।”

একটু থামল। তার ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,

“একদম পান্ডা টাইপ। গোলুমোলু, সফ্ট একদম।”

কথাটা শেষ হতেই আবরাজ ঝুঁকে গিয়ে আদ্রিতার দুই

গালে দ্রুত দুটো চু'মু দিলো। সবকিছু এত দ্রুত হলো যে

আদ্রিতা এক মুহূর্তের জন্য পুরো থেমে গেল।

চোখ বড় হয়ে গেছে। পুরোপুরি হতভম্ব। কথাও ঠিকমতো বের হলো না।

আবরাজ হাতটা একটু দূরে সরে এল। ঠোঁটে সেই

নির্লিপ্ত, সন্তুষ্ট হাসি। সে কিছু বলল না শুধু তাকিয়ে

রইল।

বাইরে জানালা দিয়ে বসফরাসের হাওয়া ঢুকছে ভেতরে। হালকা ঠান্ডা বাতাস দুজনের গায়ে এসে লাগলো।

আদ্রিতা কিছুক্ষণ বরফের ন্যায় একদম স্থির হয়ে রইল। তারপর হঠাৎ যেন ভিতরে আগুন জ্বলে উঠলো।

মুখ লাল হয়ে গেল রাগে।

সে জোরে চিৎকার করে বলল,

“অ'সভ্য একটা লোক!”

ঘরের নীরবতা এক মুহূর্তে ভেঙে গেল।

আবরাজ জোরে, নির্লজ্জভাবে হেসে উঠল।

যেন পুরো ঘটনাটা তার কাছে একটা মজার ব্যাপার।

আদ্রিতা আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না ধাম করে

দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।

পায়ের শব্দ করিডোরে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।

ঘরের ভেতরে আবরাজ এখনো হাসছে। ধীরে ধীরে তার

হাসিটা থামলো। সে ধীরে সোফায় বসে পড়লো। ঠোঁটে

সেই বাঁকা, আত্মবিশ্বাসী হাসি। চোখে অদ্ভুত এক

অন্যরকম ঝিলিক।

তারপর নিচু গলায় বলল,

“লিটিল স্পার্ক তোমায় আমি আর ছাড়ছি না।”

***********************************

প্রিয়ান্তি খান বয়স কুড়ি। সে আইনের ছাত্রী।

সে কখনো ল' পড়তে চায়নি। তার স্বপ্ন ছিল রং,

ক্যানভাস, স্কেচবুক। তবে খান পরিবারের মেয়ে সে। সব

সিদ্ধান্ত তার নিজের হয় না। তাই অবশেষে বাড়ির

সিদ্বান্তে এখন সে ল' পড়ে।

কলেজ শেষ হয়েছে। গেটের বাইরে হালকা ভিড়।

প্রিয়ান্তি তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে বেরোচ্ছে।

হাসি, গল্প, হাহা, হিহি।

একদম নরম, স্বাভাবিক মুহূর্ত।

তার মুখে আজ সেই চেনা কোমল হাসি। যেটা খুব

কমই দেখা যায় খান মহলের ভেতরে।

এক বান্ধবী বলল,

“আজকে ক্যান্টিনে যা হলো সেটা ভেবে এখনো আমার হাসি পাচ্ছে।”

প্রিয়ান্তি হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“তুই তো সবকিছুতেই বেশি করিস।”

ওদের হাসির মাঝেই হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল

কয়েকজন ছেলে। চেহারায় অন্যরকম ভাব।

ওরা ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। রাস্তা একটু ব্লক করে দিল।

সবাই একটু থেমে গেল। হাসিটা মিলিয়ে গেল মুহূর্তেই।

একজন ছেলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,

“ওহহ খান পরিবারের মেয়ে, তাই না?”

আরেকজন হালকা হেসে বলল,

“ল' পড়তে আসছো নাকি বাপভাই দের পাপ ঢাকতে?”

চারপাশে বাতাসটা হালকা ঠান্ডা হয়ে গেল।

প্রিয়ান্তির বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকাল। চোখে

স্পষ্ট অস্বস্তি।

প্রিয়ান্তি একদম চুপ। উত্তর দিয়ে ঝামেলা বাড়ানোর

সাহস তার নেই।

তার হাতটা ব্যাগের স্ট্র্যাপে শক্ত হয়ে গেল। চোখ নীচের

দিকে নামানো। কণ্ঠ আটকে আছে।

ছেলেগুলো আরও এগিয়ে এলো। কন্ঠে হাসাহাসি, কটাক্ষ,

“চুপ কেন?”

“বড় বড় লোকের মেয়ে কথা বলতে ভুলে গেছো দেখছি?”

প্রিয়ান্তির গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সে কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা গলা ভেসে এল।

কন্ঠটা শান্ত, কিন্তু ভেতরে চাপা কড়া সুর।

“কি দরকার এখানে?”

মুহূর্তে সবাই থেমে গেল।

ছেলেগুলো পিছন‌ ঘুরে তাকাল আর সেকেন্ডের মধ্যেই

ওদের মুখের ভাব বদলে গেল।

চুপ। একদম চুপ করে গেলো তারা।

সামনে দাঁড়িয়ে সারফরাজ আহমেদ। তুরস্কের এমপি।

কালো শার্ট, গম্ভীর মুখ। চোখে সেই ঠান্ডা দৃষ্টি।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।

“সমস্যা কী?”

তার গলা খুব একটা জোরে না তবুও আশেপাশের সবাই শুনতে পেল।

ছেলেগুলোর একজন তোতলাতে লাগল,

“না… না স্যার… কিছু না…”

সারফরাজ চোখ সরু করে তাকাল,

“কিছু না হলে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”

আরেকজন তাড়াতাড়ি বলল,

“সরি স্যার… আমরা যাচ্ছি…!!”

কথা শেষ না করেই ওরা এক এক করে সরে গেল।

পুরো জায়গাটা এক মুহূর্তে ফাঁকা হয়ে গেল।

প্রিয়ান্তির বন্ধুরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

কিন্তু প্রিয়ান্তি শুধু একবার তার বন্ধুদের দিকে তাকাল।

চোখে এখনো সেই চাপা অস্বস্তি। ধীরে বলল,

“চল।”

তার গলায় কোনো আবেগ নেই শুধু এই জায়গাটা

থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তাড়া। বন্ধুরা একটু অবাক

হলেও ওর সাথে হাঁটা শুরু করল।

পেছনে সারফরাজ দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি স্থির ভাবে

প্রিয়ান্তির চলে যাওয়া দেখে যাচ্ছে।

কয়েক কদম এগোতেই এক বান্ধবী ফিসফিস করে বলল,

“তুই একবারও থ্যাংক ইউ বললি না?”

আরেকজন বলল,

“লোকটা না থাকলে আজ কী হতো ভেবে দেখেছিস?”

প্রিয়ান্তি হাঁটতেই হাঁটতে বলল,

“না… ভেবে দেখতে চাই না।”

তার গলা শান্ত।

বন্ধুরা তাকাল তার দিকে,

“কেন?”

প্রিয়ান্তি থেমে গেল এবার। তারপর ধীরে বলল,

“কারণ… ওই লোকটা আমাকে এমনি এমনি বাঁচায়নি।”

সবাই অবাক হয়ে বলল,

“মানে?”

প্রিয়ান্তি মাথা নিচু করল। একটু তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটল ঠোঁটে। বলল,

“আমাকে বাঁচানোর কারণ হলো আমার বড় ভাই আবরাজ খান।”

তার গলা একটু ভারী হয়ে এল,

“সে ইলেকশনে দাঁড়িয়েছে।”

বন্ধুরা একে অপরের দিকে তাকাল।

প্রিয়ান্তি আবার বলল,

“এই লোকটার সাথে ভাইয়ের ভালো সম্পর্ক আছে তাই। নাহলে জীবনে কেউ আমাকে বাঁচাতে আসতো না।”

কথাগুলো খুব শান্তভাবে বলল সে। তবে প্রতিটা শব্দের ভেতরে জমে আছে তিক্ত অভিজ্ঞতা।

#চলবে

(অবশেষে আবরাজ - আদ্রিতা কে দিলাম। এদের লিখতেও ভালোলাগে আমার।)

#রাজনীতির_রক্তচুক্তি

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

#পর্ব_১১

(এরপর থেকে এমন ভাবেই দেবো। কভার ফটো টাও একই থাকবে, যাতে বুঝতে সুবিধা হয়)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন