প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“একদমই না।”
উত্তরটা এত দ্রুত এলো যে সেটা বড়োই সন্দেহজনক শোনাল।
সারফরাজের ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
সে আরও একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তাহলে এত রাগ কেন, হুম?”
প্রিয়ান্তি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“রাগ কেন করবো আমি? আমি কে রাগ করার?”
তারপর নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“আপনি আমাকে টেনে ধরে আছেন কেন? যান না, যান আপনার ওই মেয়েগুলোর কাছেই যান।”
কথাগুলো বললেও তার গলার অভিমানটা লুকানো গেল না।
আর সেটা শুনে সারফরাজের সত্যিই হাসি পেয়ে গেল।
কারণ বাস্তবে সে ঐসব মেয়েদের কাছে যায়ই না।
রাজনৈতিক সৌজন্য ছাড়া তাদের প্রতি তার কোনো আগ্রহ নেই। সে কষ্ট করে হাসিটা চেপে রাখল।
তারপর নিচু হয়ে প্রিয়ান্তির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা… সত্যিই যাব?”
প্রিয়ান্তি সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
“হ্যাঁ যান।”
সারফরাজ এবার আরও কাছে ঝুঁকল।
“নিশ্চিত?”
প্রিয়ান্তি এবার রাগে বলল,
“অবশ্যই!”
সারফরাজ কিছু বলতে যাবে তার আগেই দূর থেকে আবরাজ তাকে ডাকলো। সারফরাজ সেদিকে তাকিয়ে একবার মাথা নাড়ল। তারপর প্রিয়ান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার ভালো না লাগলে ঘরে গিয়ে বিশ্রাম করো। আমি যাচ্ছি ওদিকে।”
কথাটা বলেই ধীরে সরে গেল সে।
প্রিয়ান্তি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়। অদ্ভুত
মানুষ সারফরাজ। যার জন্য প্রিয়ান্তির রাগও হয়
আবার তার চলে যাওয়াটাও খারাপ লাগে।
**********
রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। আরেক দফায় ঈদ জমে উঠেছে খান মহলের রুফটপে।
খোলা আকাশের নীচে বসে রয়েছে আজ রাজনীতির সব শত্রু-মিএ গুলো।
প্রত্যেকেই সামনেই দামি হুইস্কির বোতল রাখা। তারা নানাধরনের আড্ডায় মেতে রয়েছে।
সময় এগোতে এগোতে রাত প্রায় দুটো ছুঁইছুঁই।
সারফরাজ দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো। চলাফেরায় আজ স্বাভাবিকের চেয়ে সামান্য ধীরতা।
আর ঘরে ঢুকতেই স্পষ্ট মদের গন্ধ ভেসে এলো।
প্রিয়ান্তি জেগেই ছিলো। গন্ধে তার বিরক্তিতে মুখ কুঁচকাল।
সারফরাজ ধীরে ধীরে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ল।
প্রিয়ান্তি তাকিয়ে বলল,
“এইসব গিলছিলেন বুঝি?”
সারফরাজের চোখে হালকা ঝাপসা ভাব আছে। তবুও তার ধারণা সে সুস্থ সম্পূর্ণ। কিছুক্ষণ চুপ করে সে তাকিয়ে রইল প্রিয়ান্তির রাগী মুখটার দিকে।
তারপর হঠাৎ দুহাত বাড়িয়ে প্রিয়ান্তির গাল দুটো আলতো চেপে ধরল। একদম শিশুসুলভ ভঙ্গিতে। তার ঠোঁটে ক্লান্ত হাসি ফুটল। সে নিচু স্বরে বলল,
“উম্ম, আমায় একটু ভালোবাসবে, বউ?”
কয়েক সেকেন্ড থেমে আবার বলল,
“কেউ ভালোবাসে না আমায়, কেউ না।”
প্রিয়ান্তি ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কি বলছেন এসব? আপনি নেশার ঘোরে আছেন তাই এইসব দুঃখ বেরিয়ে আসছে, বুঝি?”
কথাটা শুনে সারফরাজ হালকা হেসে ফেলল। এবার সত্যিই বোঝা যাচ্ছে, মানুষটা সম্পূর্ণ মাতাল। তার চোখের নিচে ক্লান্তি জমে রয়েছে। গলার স্বর ভারী।
সে ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না না, সবাই কষ্ট দেয় আমায়। সবাই ছেড়ে চলে যায়।”
প্রিয়ান্তি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, থাকবে না কেউ। এমন মাতাল হয়ে থাকলে কেউ থাকবে?”
সারফরাজ ঝুঁকে এলো সামনে। তারপর নিজের শক্ত দুটো হাত দিয়ে প্রিয়ান্তিকে জড়িয়ে ধরল। নিজের মুখটা ডুবিয়ে দিল তার গলার কাছে।
প্রিয়ান্তি মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। তার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল।
সারফরাজ খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“ও আমায় অনেক কষ্ট দিয়েছিল।”
কথাগুলো বলতে বলতে তার গলা আরও ভারী হয়ে উঠছে।
“আমি কতবার ওকে বলেছিলাম, থেকে যাও, কত কেঁদেছিলাম আমি। তাও চলে গেলো। চলে গেলো..!”
তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তবুও প্রিয়ান্তিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
তার কণ্ঠে এবার অদ্ভুত অসহায়তা।
“তুমি আমায় ছেড়ে যেও না, বউ। প্লিজ... প্লিজ।”
প্রিয়ান্তি হালকা ধাক্কা দিয়ে সারফরাজ কে নিজের থেকে সরিয়ে দিলো।
মদের ঘোর, ক্লান্তি আর চাপা আবেগে সারফরাজের মধ্যে কোনো শক্তি নেই এই মুহূর্তে। সারফরাজ মাথা বালিশে রাখতেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই প্রায় ঘুমিয়ে গেল। তার মুখে এখন আর সেই ঠান্ডা, নিয়ন্ত্রিত
রাজনীতিবিদের মুখোশ নেই। বরং অদ্ভুতভাবে ক্লান্ত লাগছে তাকে।
প্রিয়ান্তি চুপচাপ বসে রইল পাশে। তার মাথার ভেতর বারবার ঘুরছে কিছু কথা,
“ও আমায় অনেক কষ্ট দিয়েছিল।”
“কত কেঁদেছিলাম আমি।”
প্রিয়ান্তির বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি জমল।
“সারফরাজ কি এলিনার কথাই বলছিল?
কিন্তু যদি তাই হয়, তাহলে তাদের মাঝে আসলে কী হয়েছিল?
কেন এমন ভেঙে পড়েছিল সারফরাজ?
একজন মানুষ, যে সবার সামনে সবসময় এত ঠান্ডা, এত শক্ত হয়ে থাকে, সেও কখনো কাঁদেছিল কারোর জন্য?”
প্রিয়ান্তি ধীরে ঘুমন্ত সারফরাজের দিকে তাকালো।
তারপর খুব আস্তে ফিসফিস করে বলল,
“আপনার ভেতরে ঠিক কত গল্প লুকিয়ে আছে?”
************
আদ্রিতা মাঝে মাঝে ভাবে,
তার জীবনটা এমন কেন হলো?
সে তো খুব সাধারণ কিছু চেয়েছিল। একটা সুন্দর সংসার। এমন একজন জীবনসঙ্গী যার বুকে নিঃসন্দেহে মাথা রাখতে পারবে। যে তাকে অধিকার নয়, ভালোবাসার দ্বারা স্পর্শ করবে।
তবে নিয়তি তো তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।
তাই আজ সে বাঁধা পড়ে আছে আবরাজ খানের মতো এক মানুষের সাথে।
একটা মানুষ, যার পৃথিবী রক্ত, ক্ষমতা আর অন্ধকারে ভরা।
আদ্রিতা মাঝে মাঝে সত্যিই বুঝতে পারে না,
“উপরওয়ালা কেন তার জীবনটাকে এমন পথে এনে দাঁড় করাল? কেন তাকে এমন একজনের সাথে জুড়ে দিল?”
আদ্রিতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ঘুরে তাকালো পাশে শুয়ে থাকা আবরাজের দিকে। বলল,
“আমার বাবাকে হঠাৎ ডিস্ট্রিক্ট মেয়র নির্বাচনের ভোটে দাঁড় করালেন কেন?”
আবরাজ জবাব দিলো,
“আমার ইচ্ছা তাই। তোমার সমস্যা কোথায়?”
আদ্রিতা বিরক্ত বলল,
“আবরাজ, আপনি কখনো ক্লান্ত হন না?”
আবরাজ হালকা ভ্রু তুলে বলল,
“না। হই না।”
আদ্রিতা ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
“ক্ষমতাই সব বুঝি আপনার কাছে?”
আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে আদ্রিতাকে টেনে নিজের বুকের কাছে এনে ফেলল। সবকিছু এত দ্রুত হলো যে আদ্রিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।
আবরাজ নিচু হয়ে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“তোমায় আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে, লিটিল স্পার্ক।”
ঘরের নরম আলোয় আদ্রিতার কালো চুলগুলো কাঁধ জুড়ে ছড়িয়ে আছে। অথচ সেই মুহূর্তেও আদ্রিতার চোখে একফোঁটা নরমতা নেই। আদ্রিতা মুখ সঙ্গে সঙ্গে শক্ত হয়ে গেল। সে নিজেকে আবরাজের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিরক্তি আর ঘৃণায় ভরা গলায় বলল,
“কথায় কথায় একদম আমার গায়ে হাত দেবেন না। আপনার ছোঁয়ায় আমার জাস্ট বমি চলে আসে।"
কথাটা শুনে সাধারণ কেউ হলে হয়তো অপমানিত হতো। হয়তো রেগে যেত। কিন্তু আবরাজের গায়ে স্পর্শ করলো না কথাটা।
আবরাজ বলল,
“তবে আজ অবধি বমি তো করতে দেখলাম না।”
কথাটা শুনে আদ্রিতার মাথা আবার গরম হয়ে উঠল।
লোকটা ইচ্ছে করেই সবকিছুর মানে অন্যদিকে নিয়ে যায়। অসভ্য, অসহ্য লোক একটা।
সে আর কোনো উত্তর দিল না। রাগ চেপে গিয়ে AC-টা আরও বাড়িয়ে দিল। তারপর আবার পিঠ ফিরিয়ে শুয়ে পড়ল।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সে আর একটা কথাও বলতে চায় না।
কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে হালকা হাসি নিয়ে বলল
“ঈদের রাত বলে কথা।”
আদ্রিতা চোখ না খুলেই বিরক্ত গলায় বলল,
“তো?”
আবরাজ বালিশে মাথা রেখে ছাদের দিকে তাকাল।
“এত রাগ করে কেউ ঈদের রাত কাটায়?”
আদ্রিতা কোনো উওর দিলো না। বেশ কয়েক মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর আবরাজ হঠাৎই হাত বাড়িয়ে আদ্রিতা কে কাছে টেনে নিলো।
“সমস্যা কী আপনার?”
তার গলায় স্পষ্ট বিরক্তি। কারণ এই জোর করে টেনে নেওয়াটা সে ভীষণ অপছন্দ করে। সে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল।
“ছাড়ুন… ছাড়ুন আমাকে।”
কিন্তু আবরাজ এবার তার দুটো হাত একদম সহজভাবে মাথার ওপর চেপে ধরল। যেন সে জানে, আদ্রিতা তার শক্তির কাছে কিছুই না।
আবরাজ নিচু হয়ে তার মুখের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
“লিটিল স্পার্ক....
তার ঠোঁটে ধীরে ধীরে ভয়ংকর হাসি ফুটল।
“আমি একটা কথা ভাবছি, তোমার ভাইয়ের যদি আজ রাতে কিছু হয়ে যায়, তাহলে কী হবে?”
কথাটা শুনে আদ্রিতার পুরো শরীর কেঁপে উঠল। চোখ বড় হয়ে গেল আতঙ্কে।
“মানে?”
আবরাজ হেসে ফেলল। সেই হাসিটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। সে খুব আস্তে বলল,
“তোমার প্রাণপ্রিয় ভাই, আকাশের যদি প্রাণটাই না থাকে?”
আদ্রিতার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
“কি… কি বলছেন এসব…?”
তার গলায় এবার সত্যিকারের ভয় এসে জমেছে।
আর সেই ভয়টাই যেন উপভোগ করছে আবরাজ। সে নিচু হয়ে আরও কাছে এলো। তার চোখদুটো অন্ধকারে আরও ভয়ংকর লাগছে।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“কি দারুণ লাগছে তোমার এই ভয় পাওয়া মুখটা দেখতে।”
আদ্রিতার চোখে জল জমেছে।
আবরাজ খুব নিচু স্বরে বলল,
“লিটিল স্পার্ক।
তার আঙুল ধীরে আদ্রিতার গাল ছুঁয়ে নামল।
“তোমার ভাই আমার বিরুদ্ধে যাওয়ার চেষ্টা করছে।”
আদ্রিতার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
আবরাজ আরও বলল,
“আমার সাথে থেকে, আমার দল সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে বিরোধী দলেকে। এত সাহস কোথা থেকে হয় ওর?
তুমি ভাবছো আমি ওকে এমনিই ছেড়ে দেব?”
আদ্রিতা কাঁপা গলায় বলল,
“না, আবরাজ আপনি ওকে কিছু করবেন না, প্লিজ।”
কথাটা শুনে আবরাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে হাঁসি ফুটে উঠল মুখে। সেই হাসিটা দেখে আদ্রিতার বুকের ভেতরটা আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
আবরাজ নিচু স্বরে বলল,
“তোমার জন্য এক সমুদ্র সমবেদনা।”
সে মাথা কাত করল সামান্য। বলল,
“কারণ আবরাজ খানের ডিকশনারিতে ‘ক্ষমা’ বলে কোনো শব্দ নেই।”
আদ্রিতার চোখ থেকে এবার জল গড়িয়ে পড়ল।
আবরাজের হাতের চাপ একটু ঢিলা হতেই সে দ্রুত নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। তারপর সামনে ঝুঁকে আবরাজের কলার শক্ত করে ধরে ফেলল। তার নিঃশ্বাস কাঁপছে। চোখে আতঙ্ক স্পষ্ট।
“আপনি এটা করতে পারেন না… না… না পারবেন না।”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে প্রায়।
“আমি যা চান সব দেব। সব আপনার কথা মেনে চলব। আর কখনো বেয়াদবি করব না।”
সে প্রায় কেঁদে ফেলল এবার।
“প্লিজ আবরাজ। আমার ভাইকে কিছু করবেন না।”
আবরাজ হেসে ফেলল। যেন তার কাছে আদ্রিতার ভয় পাওয়াটা ভীষণ বিনোদনের। সে আদ্রিতার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ওহহো, লিটিল স্পার্ক, তুমি ভয় পেয়েছো? গুড ফর ইউ, বেব।
কথাটা বলেই সে পাশে থাকা ফোনটা তুলে নিয়ে একটা ভিডিও চালু করে আদ্রিতার সামনে ধরলো।
স্ত্রিনে ভিডিও টা দেখতেই আদ্রিতার শরীর জমে গেলো। স্ক্রিনে দেখা যাচ্ছে,,,
অন্ধকার একটা জায়গায় কেউ একজন হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার হাত বাঁধা। মুখে র"ক্ত।
আর কয়েক সেকেন্ড পর ক্যামেরা একটু কাছে যেতেই আদ্রিতার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।
“আ… আকাশ?”
তার গলা দিয়ে শব্দই বের হলো না ঠিকমতো।
ভিডিওর ভেতরে আকাশ মাথা তুলতে চেষ্টা করছে।
মুখে আঘাতের দাগ স্পষ্ট। পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পড়া কয়েকজন লোক।
আর ভিডিওর পেছনে কারও গলা ভেসে এলো,
“Boss, what should we do now?”
আদ্রিতা তাড়াহুড়ো করে বলল,
“না… না… না…!”
তার চোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। যেন পারলে ফোনের ভেতর থেকেই ভাইকে বাঁচিয়ে নেবে।
“আমার ভাইকে কিছু করবেন না। প্লিজ.... প্লিজ আবরাজ। আমি আপনার পায়ে পড়ছি.. প্লিজ।
আবরাজের চোখে আজ একধরনের তৃপ্তি ফুটে উঠেছে। সে নিষ্ঠুর ভাবে হেসে বলল,
“ধরো।”
সে নিচে নিজের পায়ের দিকে তাকালো।
“পায়ে ধরো।”
ঘরের বাতাস মুহূর্তে অপমান আর ভয়েতে ভারী হয়ে উঠল। ঘরের নরম আলোয় আজ তেজস্বী এক নারীকে ভীষণ অসহায় লাগছে।
ধীরে ধীরে সে হাত বাড়ালো আবরাজের পায়ের দিকে।
কিন্তু স্পর্শ করার আগেই আবরাজ তার কবজি ধরে ফেলল।
আদ্রিতা থেমে গেল। মুখ তুলে তাকালো তার দিকে। চোখে জমে আছে অপমান, ভয় আর অসহায় কান্না।
আবরাজ খান সেই চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“এত সহজে হেরে যাচ্ছো, লিটিল স্পার্ক?”
তার কণ্ঠে অদ্ভুত আনন্দ। যেন কারও আত্মসম্মান ভাঙা তার কাছে খেলনা।
আদ্রিতা কাঁপা গলায় বলল,
“প্লিজ।”
কথাটা শুনে আবরাজ মাথা কাত করল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,
“আজ রাতের জন্য তোমার ভাইকে বাঁচিয়ে রাখব। তবে কালকের সূর্য তোমার ভাই দেখতে পাবে না।”
কথাটা শুনেই আদ্রিতা জোরে কেঁদে উঠল। সে মাথা নাড়তে লাগল বারবার।
“না… না… প্লিজ।”
তার গলা ভেঙে যাচ্ছে।
“ওকে ছেড়ে দিন। প্লিজ… ও ভুল করেছে… তার জন্য আমি ক্ষমা চাইছি।”
সে প্রায় হাঁপিয়ে উঠছে কান্নায়। তারপর একদম ভাঙা গলায় বলল,
“ওকে ছেড়ে দিন, আবরাজ। আমায় মেরে ফেলুন তার বদলে।”
আবরাজ হেসে ফেলল। বলল,
“তোমার এই অবস্থাটা দেখে আজ ভীষণ শান্তি লাগছে আমার। এই যে আমার ওপর বেয়াদবি করা মেয়েটা, আজ আমার পায়ে পড়ছে। হাহাহাহা।”
আদ্রিতার বুকের ভেতর অপমান আর আতঙ্কে পুড়ছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে তার আত্মসম্মানের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ভাইয়ের জীবন।
আবরাজ অবশেষে সরাসরি বলল,
“তবে একটা কথা কী জানো, তোমার ভাইকে আমি ছেড়ে দিতাম। বিশ্বাস করো ওয়ারনিং দিয়ে ছেড়ে দিতাম। কিন্তু ও যা করেছে, তা ক্ষমার অযোগ্য।”
আদ্রিতার নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আবরাজ এবার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“প্রয়াণকে মারার ব্যাপারে ওর হাত আছে।”
মুহূর্তেই আদ্রিতা স্তব্ধ হয়ে গেল।
“কি…?”
আবরাজ ঠান্ডা হাসল। বলল,
“প্রয়াণের গাড়ির ব্রেক ফেইক করিয়েছিল তোমার ভাই। গাড়িতে GPS ট্র্যাকার পর্যন্ত লাগিয়েছে।”
প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে ঢুকছে আদ্রিতার ভেতরে।
আবরাজ থামল না। সে নিচু স্বরে বলল,
“সেদিন ওদের খাবারে ড্রাগস মিশিয়েছিল তোমার
ভাই। তাই বিরোধী দলের লোকারা এত সহজে লোকেরা
সহজেই প্রয়াণের গায়ে হাত দিতে পেরেছে।”
আদ্রিতা নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে বলল,
“আপনি তো জানেন আবরাজ, কাছের মানুষের কিছু হলে কত কষ্ট হয়।”
কথাটা শুনে আবরাজের চোখে হালকা পরিবর্তন এলেও মুখের ভাব বদলালো না।
আদ্রিতা কাঁদতে কাঁদতেই বলল,
“প্রয়াণ যেমন আপনার ভাই, তেমনই আকাশ আমার ভাই।”
তার গলা আবার কেঁপে উঠল। সে প্রায় হাত জোড় করে বলল,
“আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে আবরাজ। ওকে ছেড়ে দিন না… প্লিজ।”
আবরাজ স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
“আমি আমার ভাইয়ের জন্য পৃথিবী জ্বালিয়ে দিতে পারি। আর সেখানে তোমার ভাই, আমার ভাইকে মারতে চেয়েছে। ওকে কোনো কিছুর বিনিময় আমি ছাড়বো না।
আদ্রিতার চোখ বেয়ে একটানা জল গড়িয়ে পড়ছে।
আজ যেন প্রথমবার সে সত্যিকারের অসহায় বোধ করছে।
ভাগ্য কেন তাকে বারবার এমন জায়গায় এনে দাঁড় করায়, যেখানে সে শুধু সবকিছু হারিয়ে ফেলে?
তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কারণ সে জানে আকাশ তার জন্যই সব করেছিল।
আবরাজ খানের সাথে বিয়ের সময় পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লড়েছিল ছেলেটা।
কতবার ফোন করে জিজ্ঞেসা করে,
“তুই ঠিক আছিস তো?”
দিনের পর দিন দেবজিত কে দিয়ে খবর নিয়েছে,
“তার বোন খেতে পারছে কিনা, ভয় পাচ্ছে কিনা,
কাঁদছে কিনা।”
আর আজ সেই ভাইটাই মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
আর আদ্রিতা এতটাই অসহায়, যে সে তাকে বাঁচাতেও পারছে না। তার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল। মুখে হাত চেপে ধরল সে, যাতে কান্নার শব্দ বের না হয়।
******************
ভোর প্রায় ৫ টা।
ইস্তাম্বুলের শহর তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি।
আকাশ ধূসর রঙে রঞ্জিত।
ইস্তাম্বুলের সেই পুরনো ওয়্যারহাউসের শেষ ঘরের
দরজা খুলে প্রবেশ করলো একে একে।
ঘরের মাঝখানে একটা চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে আকাশ। তার মুখে আঘাতের দাগ। তার ঠোঁট ফেটে গেছে। চোখে ক্লান্তি স্পষ্ট।
ঠিক তখনই ধীরে ধীরে সামনে একটা চেয়ার টেনে বসল আবরাজ খান। তার মুখে অদ্ভুত শান্ত ভাব।
আকাশ ধীরে মাথা তুলে তাকালো। তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
কারণ আবরাজ একা না। তার ডানপাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রয়াণ খান। তার চোখদুটো ভয়ংকর ভাবে ঠান্ডা।
সেই অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে তার ভেতরের আগুন যেন আরও অন্ধকার হয়েছে।
আর অন্যপাশে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারফরাজ আহমেদ। মুখ পুরো এক্সপ্রেশনলেস।
আবরাজ পায়ের ওপর পা তুলে বসে বলল,
“ইস, কি কষ্ট হচ্ছে আমার তোর এই অবস্থা দেখে।”
তার ঠোঁটে হাসি কিন্তু সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র মায়া নেই।
বরং নিষ্ঠুর আনন্দ। সে সামান্য সামনে ঝুঁকে বলল,
“তার থেকে বরং তোকে একেবারে মেরে দিই?”
আকাশ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“মেরে ফেলুন। আপনার তো এটাই স্বভাব, আবরাজ খান।”
প্রয়াণ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড আকাশের দিকে তাকিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
“তোকে একেবারো মেরে দেবো। যাতে বেশি কষ্ট পেতে না হয়।”
আকাশ বুঝতে পারছে এই মানুষগুলো রাগের মাথায় না পুরো হিসেব করে এসেছে।
প্রয়াণ খান আবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখদুটো জ্বলছে।
“আমার গাড়ির ব্রেক ফেইল করেছিলি? আমার মেয়েকে বাবা ছাড়া করতে চেয়েছিলি?”
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“ভুল মানুষকে স্পর্শ করেছিস তুই।”
কথাগুলো শুনে আকাশ হেসে ফেলল।
ফাটা ঠোঁটের কোণ দিয়ে আবার রক্ত বের হলো সামান্য। তবুও সেই হাসিটা থামল না।
সে নিচু গলায় বলল,
“আর আপনারা কী করেছেন?”
তার কণ্ঠ ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠছে।
“দিনের পর দিন মানুষের জীবন নষ্ট করেছেন আপনারা।”
কথাটা শুনে প্রয়াণ চোখ সরু করে তাকালো।
আকাশ সরাসরি আবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার সাথে আমার কোনো শত্রুতা ছিল না।”
ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল।
আকাশ ধীরে বলল,
“আমি আপনাকে মন থেকে সম্মান করতাম।”
আবরাজ চুপচাপ বসে আছে।
আকাশ তিক্ত হেসে বলল,
“কিন্তু যেদিন টাকার বিনিময়ে, চুক্তির বিনিময়ে আপনি আদ্রিকে বিয়ে করলেন, সেদিনই আমি আপনার আসল রূপটা বুঝতে পেরেছি।”
ভোরের আলো ধীরে ধীরে জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকছে। আর সেই আলোয় কয়েক সেকেন্ডের জন্য আবরাজ খানের মুখটা আরও অন্ধকার লাগল।
আকাশ থামল না। তার চোখে ঘৃণা স্পষ্ট হয়ে উঠল এবার।
“আপনারা ক্ষমতাকে ভালোবাসেন। মানুষকে না। আপনি জানেন আদ্রি ছোটবেলা থেকে কেমন জীবন চাইত?”
সে আবার নিজেই বলল,
“একটা সাধারণ সংসার। এমন একটা মানুষ, যে ওকে সম্মান করবে। আর আপনি কী দিয়েছেন ওকে?
একটু থেমে আকাশ বলল,
“অসম্মান, অপমান, একটা খাঁচা।”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
সারফরাজ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার ধীরে চোখ তুলে তাকালো।
আর প্রয়াণের মুখের রাগ আরও শক্ত হয়ে উঠল।
কিন্তু আকাশ শুধু তাকিয়ে রইল আবরাজের দিকে।
তারপর নিচু স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, আমি আপনার ভাইকে মারার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আপনি? আপনি তো জন্ম থেকেই অন্ধকার, আবরাজ খান।
আবরাজ হেসে ফেলল। কথা গুলো তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলল না। ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,
“তুই আর তোর বোন দুজনেই সেইম আগুন।”
ভোরের আলো ধীরে ধীরে তার মুখে পড়ছে।
তবুও মানুষটার ভেতরের অন্ধকারটুকু একফোঁটাও কমছে না।
আবরাজ নিচু স্বরে বলল,
“তবে আবরাজ খানের সামনে কারও আগুন বেশিদিন টেকে না।”
কথাটা শেষ হতেই প্রয়াণ সামনে এগিয়ে এলো। চোখে ভয়ংকর ঠান্ডা রাগ। সে বন্দুকটা হাতে নিলো।
তারপর একটুও দ্বিধা না করে বন্দুকটা ঠেকিয়ে দিল আকাশের বুকের ঠিক ওপর।
প্রয়াণের ঠোঁটে নিষ্ঠুর হাসি ফুটে উঠল। নিচু স্বরে বলল,
“এইভাবে মারতে চেয়েছিলি আমায়। তাই না? এবার তোকে ফিরিয়ে দেবো সেটা।”
আকাশের চোখে কোনো ভয় নেই। সে আবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আদ্রিতা আপনাকে ছাড়বে না। মিলিয়ে নেবেন আমার কথাটা।”
তার শ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।
“আপনি ধ্বংস হয়ে যাবেন, আবরাজ খান।”
আবরাজ ধীরে হাসল। যেন “ধ্বংস” শব্দটা তাকে ভয় না দেখিয়ে বরং আনন্দ দেয়।
ঘরের ভেতরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে গুলির শব্দে পুরো ওয়্যারহাউস কেঁপে উঠলো। একের পর এক গুলি আকাশের শরীর ভেদ করে গেলো। চেয়ারে বাঁধা অবস্থাতেই আকাশের শরীরটা ঝাঁকিয়ে উঠল। দেয়ালে প্রতিধ্বনি হতে লাগল শব্দগুলো। ঘরের বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠল।
ঘরে থাকা তিনজন পুরুষের চোখে না আছে চোখে ভয় না আছে অনুশোচনা। কারণ তাদের কাছে আকাশ শুধু একজন মানুষ না
সে এমন একজন, যে পরিকল্পনা করে প্রয়াণ খানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
আর সেদিন যদি সত্যিই প্রয়াণের কিছু হয়ে যেত,
তাহলে ছোট্ট রাজন্যা সারাজীবন তার বাবার জন্য কাঁদত।
“পাপাই আমার গিফট।”
বলা মেয়েটা হয়তো প্রতিটা জন্মদিনে দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত।
রাহির কী হতো?
প্রয়াণ ছাড়া সে সম্পূর্ণ অসহায়। তার জীবন প্রয়াণ একমাত্র আপন মানুষ।
আর আবরাজ খান তার ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে।
হয়তো অস্বাভাবিকভাবে। হয়তো ভয়ংকরভাবে।
কিন্তু সেই ভালোবাসাটা সত্যি।
তার পৃথিবীতে খুব কম মানুষ আছে যাদের সে “নিজের” ভাবে।
আর প্রয়াণ খান তাদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাই তার কাছে এটা শুধু রাজনীতি না। শুধু প্রতিশোধও না।
এটা ছিল তার নিজের রক্তকে বাঁচানোর হিসেব।
**************
চৌধুরী বাড়ি যেন আজ স্তব্ধ হয়ে আছে। যে বাড়িতে সবসময় মানুষের কণ্ঠ, কাজের শব্দ, রাজনৈতিক আলোচনা লেগে থাকত, আজ সেখানে শুধু কান্নার শব্দ।
ড্রইংরুমের মাঝখানে সাদা কাপড়ে ঢাকা আকাশের নিথর শরীর। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে মানুষ।
কেউ নিচু গলায় কথা বলছে। কেউ শুধু তাকিয়ে আছে।
কিন্তু পুরো বাড়িটার ভেতর যেন একটা প্রশ্নই ঘুরছে,
“কেন?”
অরিন্দম চৌধুরী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার চোখদুটো লাল। মুখ ফ্যাকাশে হয়ে আছে। মনে হচ্ছে এখনও মানুষটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। নিজের ছেলের লাশ তার চোখের সামনে।
তিনি কয়েকবার কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেছেন।
মাথার ভেতর যেন কিছুই কাজ করছে না আর।
“কীভাবে হলো এটা?”
তার গলা কেঁপে উঠল।
“কেন হলো?”
কিন্তু উত্তর দেওয়ার মতো কেউ নেই।
আকাশের মা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। বারবার তার মুখ ছুঁয়ে দেখছেন। যেন এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেছে।
“উঠ বাবা। একবার চোখ খোল। আকাশ।”
তার কান্না শুনে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকের চোখও ভিজে উঠছে।
*****************
আদ্রিতার কাছে আজ পৃথিবীটা সত্যিই থেমে গেছে।
কারণ আবরাজ খান যেন তাকে সবকিছুর শাস্তি একসাথে দিয়েছে। সে তার ভাইকে শেষবারের মতো দেখতেও যেতে পারছে না। চোখ ফুলে গেছে। শ্বাস এলোমেলো। সে মাথা নাড়ছে বারবার।
“আবরাজ প্লিজ আমায় যেতে দিন…একবার…আমি আমার ভাইটাকে দেখবো।”
তার গলা কেঁপে উঠল।
সোফার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা আবরাজ সম্পূর্ণ শান্ত।
যেন এই কান্নাগুলো তার ভেতরে কোনো প্রভাবই ফেলছে
না। আদ্রিতা কাঁদতে কাঁদতেই সামনে এগিয়ে এলো।
তার গলা এতটাই কাঁপছে যে ঠিকমতো শব্দও বের হচ্ছে না।
“আবরাজ প্লিজ, একটু শুনুন না। একবার যেতে দিন।
অনবরত জল গড়িয়ে পড়ছে চোখ দিয়ে।
“আমি কাউকে কিছু বলব না। কোনো ঝামেলা করব না। প্লিজ।”
সেই অবস্থাতেই আবরাজ হাত বাড়িয়ে আদ্রিতার গালটা চেপে ধরল। ঠান্ডা স্বরে বলল,
“আজ বুঝতে পারছো কেমন লাগে?
যখন নিজের মানুষকে বাঁচাতে পারো না, যখন সামনে থেকেও কিছু করতে পারো না।”
আদ্রিতা আর নিতে পারছে না। তার বুকের ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
সে সামনে ঝুঁকে আবরাজের কলার শক্ত করে ধরে বারবার নাড়াতে লাগল তাকে।
“একবার, শুধু একবার আমার ভাইটাকে দেখতে দিন।”
সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না ঠিকমতো। ধীরে ধীরে মাথাটা গিয়ে ঠেকল আবরাজের বুকের কাছে।
কাঁধ কাঁপছে তার। হাতদুটো আবরাজের শার্ট আঁকড়ে ধরা। যেন এই মানুষটা না চাইলে তার পৃথিবীতে আর কিছুই বাকি থাকবে না।
ঘরের ভেতর শুধু আদ্রিতার চাপা কান্নার শব্দ ভেসে বেড়াচ্ছে। আবরাজের চোখ নিচে নামল আদ্রিতার মাথার দিকে। এই মেয়েটা তাকে ঘৃণা করে। অভিশাপ দেয়। তার ছোঁয়াকে অপবিত্র বলে। তবুও আজ সবচেয়ে ভাঙা মুহূর্তে এসে তার বুকেই আশ্রয় চাইছে।
আবরাজ ধীরে হাত তুলল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো হয়তো সে আদ্রিতাকে জড়িয়ে ধরবে।
কিন্তু না। সে শুধু আদ্রিতার চুলের মুঠি আলতো ধরে মাথাটা একটু তুলল। তারপর নিচু স্বরে বলল,
“কাঁদো না, লিটিল স্পার্ক।”
ঠোঁটে ঠান্ডা হাসি ফুটল।
“তোমার কান্না দেখলেও আমার সিদ্ধান্ত বদলাতে ইচ্ছে করে না।”
আদ্রিতা ফুপিয়ে উঠে বলল,
“এতো নিষ্ঠুর কেন আপনি?”
#চলবে
(বড়ো বড়ো মন্তব্য চাইইইই 🥹 ৩০০০+ শব্দের পর্ব)
#রাজনীতির_রক্তচুক্তি
#পর্ব_২৬
#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি