ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

২৭তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

সময়র স্রোত কখনো কারও জন্য থেমে থাকে না।

সে এগিয়ে চলে নিজের নিয়মে। সঙ্গে মানুষকে টেনে নিয়ে যায় সামনে।

পেছনে পড়ে থাকে কিছু অসমাপ্ত চিৎকার। কিছু হারানোর স্মৃতি আর কিছু গভীর ক্ষত।

কিছু ব্যথা সময়ের সাথে সাথে বাইরে থেকে শুকিয়ে যায় ঠিকই। মানুষ হাসতে শেখে আবার। কথা বলতে শেখে। স্বাভাবিক থাকার অভিনয়টাও রপ্ত হয়ে যায় ধীরে ধীরে।

কিন্তু ভেতরের ক্ষত?

সেগুলো কখনো পুরোপুরি সারে না। মনের মনিকোঠায় জমে থাকে নীরবে।

জীবন থেকে কেটে গেছে দুটো মাস। ইস্তাম্বুল আবার আগের মতোই ব্যস্ত উঠেছে। রাস্তা ভরা মানুষ। রাজনীতি চলছে। মিটিং হচ্ছে। ক্ষমতার হিসেব বদলাচ্ছে প্রতিদিন।

আদ্রিতা নিজেও আবার কলেজে যাওয়া শুরু করেছে।

সবকিছু বাইরে থেকে স্বাভাবিক। সে ক্লাসে যায়।

প্রয়োজনমতো কথা বলে।

কিন্তু এই আদ্রিতা আর আগের সেই আদ্রিতা না।

দুজনের মধ্যে যেন আকাশ-পাতাল তফাৎ।

আগের মেয়েটার ভেতরে স্বপ্ন ছিল। রাগ ছিল।

ভালোবাসা পাওয়ার ইচ্ছেও ছিল কোথাও না কোথাও।

আর এখন?

এখন তার ভেতরটা ভীষণ ফাঁকা। মনে হয় হৃদয় নামের

জায়গাটাতে শুধু শূন্যতা পড়ে আছে।

জীবন তাকে একের পর এক রূপ বিষাদ চিনিয়েছে।

চুক্তির বিয়ে। অপমান। ভয়। ভালোবাসাহীন ছোঁয়া।

আর শেষে নিজের ভাইয়ের যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু।

কিছু কিছু রাত এখনও দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায় তার।

মনে হয় আবার ফোনটা বেজে উঠবে।

আকাশ বলবে,

“আদ্রি, ঠিক আছিস তো?”

কিন্তু ফোন আর বাজে না।

আর আজকাল আদ্রিতার মনে হয়, জীবনে তার হারানোর মতো বোধহয় আর কিছুই বাকি নেই।

***************

সকালের আলো খান মহলের সৌন্দর্যকে দ্বিগুণ করে তুলেছে। বড়ো হল রুমে বসে আছে প্রয়াণ খান। তার কোলে রাজন্যা। আজ মেয়েটা ভীষণ খুশি। কারণ তার “পাপা” আজ বাড়িতে আছে।

সামনে বসে রাহি মেয়ের গালে খাবার তুলে দিচ্ছে।

রাহি নিচু গলায় বলল,

“আমি আজ বিকেলে ওই বাড়ি যাব।”

প্রয়াণ ভ্রু কুঁচকালো।

“মানে?”

রাহি শান্ত গলায় বলল,

“আমার বাড়ি। তৃণার বিয়ে সামনে। সব আয়োজন শুরু হয়ে গেছে। আব্বু ফোন করেছিলেন, আমাদের যেতে বলেছে।”

কথাটা শুনে প্রয়াণ চুপ হয়ে গেল। কারণ সত্যিটা হলো বিয়ের পর সে কখনো শ্বশুরবাড়ি যায়নি। একদমই না।

এমনকি রাজন্যার বয়স এখন সাড়ে তিন বছর, তবুও যায়নি। কারণ তাদের বিয়েটাই তো স্বাভাবিক ছিল না পুরোপুরি। তার ওপর প্রয়াণের রাগী, হিংস্র স্বভাব,

রাজনীতি, শত্রুতা সব মিলিয়ে দূরত্বটা থেকেই গেছে।

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে প্রয়াণ ঠান্ডা গলায় বলল,

“তুই গেলে যা।”

তারপর মেয়েকে আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল,

“আমার মেয়েকে রেখে যা।”

রাহি অবাক হয়ে গেলো।

“মানে?”

তার গলায় বিরক্তি স্পষ্ট।

“মেয়েকে রেখে যাব মানে কী?”

তারপর আরও নিচু গলায় বলল,

“আমার মেয়েকে আমি নিয়ে যাব। আর আব্বু তো তোমাকেও যেতে বলেছে। তাহলে তুমি যাবে না কেন?”

প্রয়াণের মুখের অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এসব কথা তার পছন্দ হচ্ছে না। রাজন্যা কিছু না বুঝে কখনো মায়ের দিকে, কখনো বাবার দিকে তাকাচ্ছে।

প্রয়াণের চোয়াল শক্ত। নিচু গলায় বলল,

“সকাল সকাল মাথা গরম করাস না। আমি কোথাও যাব না।”

রাহি ভীষণ বিরক্ত হয় প্রয়াণের এই সব স্বভাবের জন্য। সে ঠান্ডা গলায় বলল,

“ভালো। যেতে হবে না।”

তারপর রাজন্নার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,

“আজ বিকেলে আমি আর মেয়ে চলে যাব।”

প্রয়াণ সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“মানে।"

রাহি একটু জোর গলায় বলল,

“বাংলা ভাষা বোঝো না নাকি? বিকেলে আমি আর মেয়ে চলে যাব তোমাকে যেতে হবে না। আমরা বিয়েবাড়ি কাটিয়ে তারপর ফিরবো।

প্রয়াণের মুডটাই নষ্ট হয়ে গেছে। সে গজগজ করতে করতে উঠে দাঁড়াল।

“পুরো মুডটার বারোটা বাজায় দিলি।”

বলে সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

আর তার পেছন পেছন ছোট ছোট পায়ে দৌড়াতে লাগল রাজন্যা।

“পাপাইইইইই।”

মেয়েটা ছোট ছোট পায়ে বাবার পেছনে যাচ্ছে।

কারণ সে এখনও বুঝতেই পারে না বড়দের অভিমান কত জটিল হয়।

ওদিকে রাহি বসে বসেই বিরক্ত মুখে বিড়বিড় করতে লাগল,

“নাটক। সবসময় শুধু ওর কথাই শুনে চলতে হবে যেন।”

সে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল

“উম্ম… কেন রে? আমার কোনো ইচ্ছা নেই নাকি?”

তার গলায় অভিমান জমে আছে। একদম জেদি স্বরে বলল,

“ও, যাবে না, যাবে না। আমি তো যাবই।”

************

~ আহমেদ ম্যানশন ~

প্রিয়ান্তির জন্য শ্বশুরবাড়িতে মানিয়ে নেওয়া খুব একটা সহজ হয়নি এখনো। এই বাড়ির নিয়ম, পরিবেশ, মানুষ সবকিছুই তার কাছে অচেনা।

সে কখনোই কাজ করতে অভ্যস্ত নয়। বিশেষ করে রান্নার দিকটা। এখানে কাজের লোকের অভাব নেই।

তার ওপর সারফরাজ নিজেও এসব নিয়ে কখনো কিছু বলেনি।

কিন্তু রুকসানা বেগমের ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা।

তার মতে “বাড়ির বউ” মানে সংসারের কাজ জানতে হবে।

সেই কারণেই সেদিন জোর করেই তিনি প্রিয়ান্তিকে রান্নাঘরে নিয়ে গিয়েছিলেন।

“এসব না শিখলে চলবে কীভাবে?”

প্রিয়ান্তি তখন অস্বস্তি নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল।

তাকে সবজি কাটতে দেওয়া হয়েছিল। যেগুলো যে সে একদমই অভ্যস্ত নয়। ফলস্বরূপ তার ছুঁড়ি চালাতে গিয়ে তার হাতটা কেটে যায়। অন্যকারোর কাছে সামান্য হলেও বিষয়টা তার কাছে ভীষণ বড়ো।

রুকসানা বেগম বিরক্ত মুখে বললেন,

“একটা সবজিও কাটতে পারো না। সংসার করবে কি করে?"

এছাড়াও নানারকম কথা শুনিয়েছিল। প্রিয়ান্তি চুপচাপ মুখ বন্ধ করে শুনেছে, একটা কথাও বলেনি।

তবে রাতে সারফরাজ বাড়ি ফেরার পর প্রিয়ান্তি নিজের রাগ ঝেড়েছে তার ওপর।

“আপনার মা আমাকে কী ভাবে? আমি কি কাজের লোক? এই বাড়িতে কাজ করার জন্য এসেছি?”

তার কাটা আঙুলটা সামনে ধরে বলল,

“দেখুন। কতটা কেটে গেছে। কত রক্ত বের হয়েছে।”

সারফরাজ তখন কোট খুলছিল শান্তভাবে। সে একবার আঙুলটার দিকে তাকিয়ে আবার প্রিয়ান্তির দিকে তাকালো। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,

“এতটুকু কেটেছে।”

ব্যস এই কথাটাই প্রিয়ান্তির রাগটা বানানোর জন্য যথেষ্ট। সে রাগে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“এতটুকু মানে? আপনারা সবাই অসভ্য! আমি কি কোনোদিন এসব কাজ করেছি?”

তার চোখে দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।

“আমি কি জানতাম এমন হবে? আপনার মা জোর দিয়ে আমায় করে সবজি কাটাচ্ছিল।”

সারফরাজ ভীষণ ক্লান্ত। তাই সে এখন আর কোনো ঝামেলা চায় না। সে বলল

“আচ্ছা, তাহলে আমার এখন কী করা উচিত?”

কথাটা শুনেই প্রিয়ান্তি চোখ চকচক করে উঠল। সে যেন এই সুযোগটার অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে বলল,

“আপনাকে এলিনার আবার আসা বন্ধ করতে হবে।”

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল তার দিকে। কারণ এই এক মাসে মেয়েটা প্রায় দশ হাজার বার একই কথা বলেছে।

সারফরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“তোমার হাত কাটার সাথে এলিনার এই বাড়িতে আসার কী সম্পর্ক?”

প্রিয়ান্তি মুখ কুঁচকে বলল,

“বাহ্ রে, সম্পর্ক থাকবে না?”

সে একদম সিরিয়াস মুখে বলল,

“আমি তো ওই ডাইনিটার কথা ভাবতে ভাবতেই সবজি কাটার বদলে হাত কেটে ফেলেছি।”

কথাটা শুনে সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির তাকিয়ে রইল। তারপর আর হাসি চেপে রাখতে পারল না।

তবে প্রিয়ান্তি সারফরাজ কে কোনো কথা বলতে দিলো না। সে বলে চলল,

“আর আপনাদের বাড়িতে কাজের লোকের অভাব নেই। তাও আপনার মা আমাকে দিয়ে কাজ করাচ্ছে।”

তার চোখ গোল গোল হয়ে গেছে রাগে।

“এটা কি ঠিক? আপনিই বলুন!”

সারফরাজ এবার শান্ত গলায় বলল,

“না, একদম ঠিক না।”

কথাটা শুনে প্রিয়ান্তির মুখে সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ী ভাব চলে এলো। যেন সে বড় কোনো পুরষ্কার জিতে গেছে।

সারফরাজ ঠোঁটে চাপা হাসি নিয়ে বলল,

“কারণ তোমাকে দিয়ে সবজি কাটানো মানে হলো, ন্যাশনাল রিস্ক।"

প্রিয়ান্তি ক্ষেপে উঠে বালিশ ছুঁড়ে মারল তার দিকে।

“আপনি আমার সাথে মজা করছেন?”

সারফরাজ দাঁড়িয়ে উঠে এক পা দু পা করে এগিয়ে এলো প্রিয়ান্তির দিকে। প্রিয়ান্তি নিজের অজান্তেই পিছিয়ে যেতে লাগলো। একসময় বিছানার ধারে এসে পড়ল। আর ঠিক তখনই ব্যালেন্স হারিয়ে ধপাস করে পড়ে যাচ্ছিল সে কিন্তু তার আগেই সারফরাজ হাত বাড়িয়ে তাকে টেনে নিল।

মুহূর্তেই প্রিয়ান্তি গিয়ে পড়ল তার বুকের ওপর।সারফরাজের শক্ত হাতটা এসে থামল তার কোমরে।

প্রিয়ান্তির নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো।

সে দুহাত দিয়ে সামান্য সরে যাওয়ার চেষ্টা করে নিচু গলায় বলল,

“ছা… ছাড়ুন প্লিজ।”

সারফরাজ ভ্রু তুলল। তার হাত এখনও প্রিয়ান্তির কোমরে। সে খুব শান্ত গলায় বলল,

“আমি তো ধরলামই না। আর না ধরলে ছাড়ব কী করে?”

তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।

প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড বোকার মতো তাকিয়ে রইল তার দিকে।

“মানে?”

সারফরাজ একটু ঝুঁকে এলো। তার গলার নিচু। ভারী স্বরটা আরও কাছে শোনা গেল এবার। সে খুব আস্তে প্রিয়ান্তির কানের কাছে বলল,

“যেদিন ধরব, সেদিন কিন্তু কোনো বারণ শুনব না আমি।”

কথাটা শুনে প্রিয়ান্তির চোখ বড় হয়ে গেল। মুহূর্তেই তার কান গরম হয়ে উঠল লজ্জায়।

**************

আজ জেলা ভিত্তিক মেয়র নির্বাচন ভোট। পুরো ইস্তাম্বুলে সকাল থেকে একটা আলাদা উত্তেজনা ছড়িয়ে রয়েছে। রাস্তার চারপাশ জুড়ে ব্যানার। ইস্তাম্বুলে ভোট মানেই যেন এক ধরনের যুদ্ধ। আর এইবারের যুদ্ধটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ সবাই জানে, এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু জেলার মেয়র ঠিক করবে না। এটা ঠিক করবে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যও।

আর পুরো শহরের নজর এখন এক জায়গাতেই,

ফাতিহ।

কারণ এই জেলায় জিততে পারলে রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই বদলে যাবে।

এখানে National Development Party (NDP)-র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অরিন্দম চৌধুরী।

আর বিপরীতে আছে People’s Reform Union (PRU)-এর শক্তিশালী প্রার্থী।

এই লড়াইটা এখন শুধু ভোটের না,

এটা আবরাজ খান বনাম কেমাল আরসালানের ক্ষমতার লড়াই হয়ে গেছে প্রায়।

আর সেই কারণেই আজ সকাল থেকে অস্বাভাবিকভাবে চিন্তিত হয়ে আছে আবরাজ।

সে সাধারণত আবেগ প্রকাশ করে না। কিন্তু আজ তার চোখে চাপ স্পষ্ট। তার সকাল থেকে ঠিকমতো কিছু খায়ওনি।

আজ আদ্রিতা কলেজ যায়নি। ব্যাপারটা হলো আবরাজ তাকে যেতে দেয় নি। বাইরে কখন ভোটের জন্য ঝামেলা হয়ে যাবে সেই নিয়ে।

আদ্রিতা শান্ত স্বরে বলল,

“আপনি তো জিতবেন, তাহলে বেকার এত চিন্তা করছেন কেন?”

আবরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,

“আর না জিতলে?”

আদ্রিতা এক সেকেন্ডও দেরি করল না। একদম শান্ত মুখে উওর দিল,

“না জিতলে বুঝব, ইস্তাম্বুলের মানুষ সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

আবরাজ চোখ দুটো সরু করে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে আদ্রিতা তাকে নিয়ে মজা করছে। তবে আদ্রিতা আগের মতো এখন অতোটা কথাবার্তা বলে না। এটা আবরাজের খুব একটা ভালো লাগে না। তবে নিজের ইগোর জন্যই আবরাজ আগবাড়িয়ে কথা বলতে যায় না। তবে যেহেতু এখন আদ্রিতা কথা বলা শুরু করছে তাই আবরাজের ইচ্ছা হলো লিটিল স্পার্কের‌ সাথে দু-চারটে কথা‌ বলার।

আবরাজ বলল,

“লিসেন লিটিল স্পার্ক, তুমি কাকে ভোট দিয়েছিলে ইস্তাম্বুলের মেয়র ইলেকশনে?”

আদ্রিতার মুখে সবসময় কার মতো নির্লিপ্ত ভাব। সে শান্ত ও অলস ভঙ্গিতে বলল,

“আমি যাকে ইচ্ছা ভোট দিতে পারি। সেটা সম্পূর্ণ আমার অধিকার। আপনাকে কেন বলবো?”

আবরাজ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,

“তাহলে অবশ্যই আমায় দাওনি।”

আদ্রিতা এবার সোফায় হেলান দিয়ে আবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আপনি এত আত্মবিশ্বাসী কীভাবে?”

আবরাজ সামনে ঝুঁকল একটু। তার চোখে সেই পরিচিত অন্ধকার হাসি।

“কারণ তুমি সুযোগ পেলে আমায় দেশ থেকে নির্বাসিত করে দিতে।”

আদ্রিতা এবার সত্যি হাসল। কিন্তু সেই হাসির ভেতর উষ্ণতা নেই। সে নিচু স্বরে বলল,

“নির্বাসিত অনেক ছোট ব্যাপার। তার চেয়েও খারাপ কিছু ভাবতাম।”

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর আবরাজ বলল,

“অবশেষে লিটিল স্পার্কের চোখে আবার আগুনটা দেখতে পাচ্ছি। এতদিন খুব মিস করছিলাম ব্যাপারটা।”

কথাটা শুনে আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকালো।

“মিস?”

সে অবিশ্বাসের স্বরে বলল,

“আপনি কোনো কিছু মিস করেন?”

আবরাজ এবার সত্যিই হালকা হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“বাহ্ রে, আমিও তো মানুষ। মিস করব না কেন?”

আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তার দিকে।

তারপর ধীরে বলল,

“আপনি ঠিক আছেন তো, আবরাজ খান? ভীষণ অচেনা লাগছে আপনাকে।”

আবরাজ বলল,

“আমারও এতোদিন অচেনা লাগছিল তোমাকে। আগের লিটিল স্পার্ক আমাকে দেখলেই রেগে যেতো, চিৎকার করত কিন্তু এতোদিন তুমি একদম চুপ হয়ে গেছিলে।”

কথাটা শুনে আদ্রিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আবরাজ আবার বলল,

“আদ্রিতা, কখনো ভেবে দেখেছো তোমার ভাই যেটা করেছিল সেটা কি ঠিক ছিল?

সেদিন যদি মিনহাজ ঠিক সময় না পৌঁছাত তাহলে আজ প্রয়াণ আমাদের মধ্যে থাকতো না। আর প্রয়াণের কিছু হয়ে গেলে রাহি, রাজন্যা এদের কি হতো?

আদ্রিতার দিকে তাকিয়ে বলতে রইল,

“তোমার ভাই আমার থেকে‌ প্রতিশোধ নিতে গিয়ে, প্রয়াণকে শেষ করতে চেয়েছিল, সেটা কি ঠিক?

আদ্রিতা চুপচাপ শুনছে। আবরাজ বলল,

“আমি নাহয়, খারাপ। কিন্তু তুমি তো কখনো অন্যায়ের পক্ষে থাকো না। তাহলে তুমি ভেবে দেখো?”

কথাগুলো শুনে আদ্রিতার চোখে ধীরে জল জমে উঠল।

কারণ এই কথাগুলোর ভেতরে একটা নিষ্ঠুর সত্যি আছে। আকাশ ভীষণ বড়ো ভুল করেছে।

আবরাজ সামনে এগিয়ে এসে বলল,

“কেঁদো না লিটিল স্পার্ক, সেদিন তুমি আমার কাছে অনেক অনুরোধ করেছিলে, আমি জানি।”

তার কণ্ঠ এবার অদ্ভুত শান্ত। কয়েক সেকেন্ড থেমে সে আবার বলল,

“তবুও আমি শুনিনি। তোমার কাছে আমায় নিষ্ঠুর লাগতে পারে। কিন্তু ভুল তো তোমার ভাইয়েরই ছিল সেদিন।”

আদ্রিতার কিছু বলার নেই বা থাকলেও বলতে চায় না। কারণ কিছু ব্যথা এত গভীর হয় যে শব্দও সেখানে পৌঁছাতে পারে না। সে ধীরে উঠে চলে যাচ্ছিল।

কিন্তু হঠাৎই আবরাজ তার হাতটা ধরে টেনে নিল আবার।

“লিটিল স্পার্ক।”

সে নিচু গলায় বলল,

“তোমার চোখে কান্নাটা মানায় না, লিটিল স্পার্ক।”

তার আঙুল আলতো ছুঁয়ে গেল আদ্রিতার গাল।

“তুমি তো আগুন।”

কথাটা শুনে আদ্রিতা চোখ তুলে তাকালো। তার চোখের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা আজ খুব স্পষ্ট।

সে কাঁপা গলায় বলল,

“আগুনও একসময় নিভে যায়। শুধু ছাইটা পড়ে থাকে।”

আদ্রিতার চোখের এই শূন্যতা, না চাইতেও আবরাজের ভেতরে সূক্ষ্মভাবে কোথাও আঘাত করলো। অদ্ভুত এক অনুভূতি। যেটাকে ব্যাথা বলা যায় না। কারন বছরের পর বছর ধরে অনুভূতিহীন হয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো নিজের অনুভূতিও ঠিকমতো চিনতে পারে না। তারা শুধু চাপা দিতে জানে। অস্বীকার করতে জানে।

আবরাজও তাই করল। তার চোখে মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না। সে ধীর স্বরে বলল,

“চূপ করো লিটিল স্পার্ক! জীবনে এখনও অনেকটা পথ চলা বাকি।”

*********

আবরাজ ভীষণ বুদ্ধিমান। সে জানে কোন চাল টা কখন দিতে হয়। দুপুরের দিকে ইস্তাম্বুলের রাজনৈতিক দিকটা কিছুটা বদলে যেতে শুরু করল। সকাল থেকে আবরাজ চিন্তিত থাকলেও নিজের দিকে খেলা ঘোরানোর অস্ত্র, সে আগেই ভেবে রেখেছিল।

আর ঠিক ভোটের দিন দুপুরে, সে চালটা চালল।

হঠাৎ করেই সংবাদ মাধ্যম, সোস্যাল মিডিয়া, অনলাইন পোর্টাল সব জায়গায় একসাথে খবর ছড়িয়ে পড়ল।

সেই রে/প কেসটার সরকারি তদন্তের প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার‌ হলো, যে রাজনৈতিক নেতার ছেলে এই কেসটার সাথে জড়িত ছিল, তাকে পুলিশ গ্ৰেফতার করেছে। শুধু সে না, এই কেসের সাথে জড়িত বাকি কয়েকজনকেও একসাথে পুলিশ কার্স্টাডি তে নেওয়া হয়েছে।

আর এই পুরো অভিযানের কৃতিত্ব সরাসরি গেল আবরাজ খানের প্রশাসনের ওপর।

কারণ সংবাদ মাধ্যমে স্পষ্টভাবেই দেখানো হচ্ছে,

“মেয়র আবরাজ খানের নির্দেশেই তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।”

এসব দেখে অন্যদিকে কেমাল আরসালানের মাথায় হাত পড়ে গেল। আবরাজ তলে তলে যে এতদূর চলে গেছে কেমাল একটা বারের জন্যও বুঝতে পারে নি।

কারণ যে রাজনৈতিক নেতার ছেলেকে গ্ৰেফতার করা হয়েছিল সেই নেতা কেমালের ক্লোজ সার্কেলের মধ্যে একজন। সে চিন্তায় পড়ে গেছে এখন কারণ কোনোভাবে তার নামটা যদি বাইরে বেরিয়ে আসে, পুলিশ যদি তাকে গ্ৰেফতার করতে আসে তাহলে কি হবে! তার কপাল জুড়ে ঘাম ঝরে পড়ছে।

অবশেষে ভোট শেষ হয়ে গনণা শুরু হয়েছে। গভীর রাতের পর সকাল হলো। গনণা শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। ফলাফল অনুযায়ী National Development Party-এর জয় শতাংশের হিসেবে অনেকটাই বেশি।

বিশেষ করে ফাতিহতে অরিন্দম চৌধুরী প্রত্যাশার থেকেও বড় ব্যবধানে এগিয়ে গেছে।

যদিও বিরোধী দল People’s Reform Party (PRP)-ও প্রচুর ভোট পেয়েছে।

তাদের প্রভাব যে এখনও ইস্তাম্বুলে শক্তিশালী সেটাও স্পষ্ট হয়ে গেছে এই নির্বাচনে।

তবে শেষ হাসিটা আজ আবরাজ খানের।

কারণ শেষ মুহূর্তের সেই চাল,

ধ/র্ষ/ণ মামলার বিচার আর গ্রেপ্তার, পুরো জনমতটাই ঘুরিয়ে দিয়েছে।

ফলাফল ঘোষণার পরই খান মহলের বাইরে উৎসব শুরু হয়ে গেল।

*****************

ওদিকে প্রয়াণ খানের বর্তমানে রাজনীতি নিয়ে একফোঁটাও মাথাব্যথা নেই।

পুরো ইস্তাম্বুল যখন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে উত্তেজিত, মানুষটা তখন নিজের ঘরে দিব্যি মেয়েকে জড়িয়ে ঘুমাচ্ছে।

কারণ তার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট এখন নির্বাচন না।

সংকট হলো রাহি সত্যিই যদি রাজন্যাকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে যায়?

এটাই এখন তার প্রধান দুশ্চিন্তা।

আর সেই কারণেই মহাশয় খুব বুদ্ধি করে মেয়েকে নিজের কাছে নিয়ে ঘুমিয়েছে।

বিছানার মাঝখানে রাজন্যা গোল হয়ে ঘুমাচ্ছে। প্রয়াণ নিজের একহাত শক্ত করে মেয়ের ওপর রেখেছে। যেন কেউ এসে মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যাবে।

তার মুখভঙ্গি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, সে পুরোপুরি পরিকল্পনা করেই এটা করেছে।

কারণ সে জানে, রাহি যতই রাগ করুক,

ঘুমন্ত মেয়েকে জাগিয়ে সে নিয়ে যেতে পারবে না। কারণ রাজন্যা ভীষণ জেদি। তার কাঁচা ঘুম একবার ভাঙলে, সে কেঁদে অস্থির করে ফেলবে।

আর ঠিক সেটারই সুযোগ নিয়েছে প্রয়াণ খান।

#চলবে

(আজ থেকে শুরু গল্পের প্রতিটা সম্পর্কের নতুন সমীকরণ। তবে হঠাৎ করেই আবরাজ-আদ্রিতার খুব ভালোবাসার দিক দেখাতে পারিনা। ধীরে ধীরে এগোবে সম্পর্ক টা। আর আপনাদের সবার মতামতেই আমি গল্পটার হ্যাপি এন্ডিং দেবো। মন্তব্য করেবেন আজকে কেমন লাগলো 🫶)

#পর্ব_২৭

#লেখনীতে #নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন