#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি
প্রয়াণ যেন রাষ্ট্রের সবচেয়ে জটিল সংকটে পড়েছে।
"না তো!"
রাজন্যা ফোঁপাতে লাগলো,
"বকচো।"
প্রয়াণ বলল,
"আমি বকিনি আমার প্রিন্সেস কে।"
রাজন্যা একই কথা বলল,
"বকচো।"
প্রয়াণ সঙ্গে সঙ্গে তাকে কোলে তুলে নিল।
"প্রিন্সেস, আমি বকি নাই।"
রাজন্যা কাঁদো কাঁদো মুখে বলল,
“তুমি বকেচো। পচা পাপা তুমি।”
প্রয়াণের মুখে সঙ্গে সঙ্গে অসহায় ভাব চলে এলো। সে এক হাতে মেয়েটাকে শক্ত করে ধরে অন্য হাত দিয়ে ছোট্ট চোখ দুটোর পানি মুছে দিল।
"আচ্ছা, পাপা সরি বলছে।"
রাজন্যা নাক টানল।
"সত্যি?"
"হুম। অনেক বড় সরি।"
"কত বড়?"
প্রয়াণ কয়েক সেকেন্ড ভেবে বলল,
"অনেক অনেক অনেক বড়।"
রাজন্যা সন্দেহের চোখে তাকাল। প্রয়াণ এবার কপালে একটা চুমু খেয়ে নরম গলায় বলল,
"কেঁদো না মা আমার। পাপার খুব কষ্ট হয় তুমি কাঁদলে।"
রাজন্যা একটু ভেবে বলল,
"আর বকবে না প্রমিচ?"
প্রয়াণ মাথা নাড়ল।
"প্রমিস।"
সঙ্গে সঙ্গে রাজন্যার কান্না অর্ধেক উধাও হয়ে গেল।
সে বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
"আইসকিম খাই।"
প্রয়াণ চোখ বন্ধ করল। এই মেয়েটার দুঃখের স্থায়িত্ব সর্বোচ্চ দুই মিনিট। একটু আগে তার পৃথিবী ভেঙে পড়েছিল। আর এখন আইসক্রিম চাই। সে হেসে ফেলল।
"তোমার কান্না গেল কই?"
রাজন্যা গম্ভীর মুখে বলল,
"চলে গেচে।"
প্রয়াণ বলল,
"কোথায়?"
রাজন্যা হেসে বলল,
"জানি না।"
একটা বড়ো কমিউনিটি হল ভাড়া করা হয়েছে। সেখানে সবাই এসে গেছে প্রায়। রাজন্যাকে কোলে নিয়েই ভেতরে ঢুকতেই প্রয়াণ চোখ গিয়ে থামল দরজার দিকে। সেখানে রাহি দাঁড়িয়ে আছে। লাল রঙের শাড়ি পরেছে আজ। চুলগুলো খোলা। এক পাশে গুঁজে দেওয়া সাদা ক্রিস্যান্থিমাম ফুল। চোখে গাঢ় কাজল। ঠোঁটে লিকগ্লস দেওয়া।কোনো ভারী সাজ না। তবুও আজ যেনো তাকে বেশি সুন্দর লাগছে।
প্রয়াণের মনে হলো, এত বছরেও সে বোধহয় রাহীকে এভাবে কখনো দেখেনি।
রাজন্যা বাবার কাঁধে মাথা রেখে কিছু একটা বলছে। তবে প্রয়াণ শুনছেও না। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে রাহীর ওপর।
প্রয়াণের মাথার ভেতর অন্য একটা চিন্তা ঢুকে গেল। ঘরের বাইরে লোকজনের ভিড়। আত্মীয়স্বজন। কাজিন। বন্ধুবান্ধব। আর সবাই রাহীকে দেখছে। প্রয়াণের ভ্রু অজান্তেই কুঁচকে গেল। কারণ রাহিকে কেউ দেখলে তার একটু সহ্য হয় না।
সে মনে মনে স্বীকার করল,
“হ্যাঁ। আজ রাহিকে সত্যিই অসাধারণ লাগছে।”
তবে এই কথাটা মুখে বলার কোনো ইচ্ছা তার নেই। একদমই নেই।
রাহি ভেবেছিল অন্তত আজ একটা স্বাভাবিক কথা শুনবে। কিন্তু তার ধারণা কে সম্পূর্ণ ভুল পরিনত করে প্রয়াণ দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
"কাকে দেখানোর জন্য সেজেছিস?"
রাহি অবাক স্বরে বলল,
“মানে?”
প্রয়াণ কোনো উত্তর দিল না। বরং কোলে থাকা রাজন্যাকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
"যাও প্রিন্সেস, সবার সাথে খেলো।"
রাজন্যা খুশি হয়ে দৌড়ে অন্য বাচ্চাদের কাছে চলে গেল।
তারপর প্রয়াণ আবার রাহির দিকে ফিরল। রাহি কিছু বোঝার আগেই তার হাতটা ধরে টানতে টানতে একটু ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গেল। এত দ্রুত সব হলো যে রাহি প্রতিবাদ করার সুযোগই পেল না। রাহিকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড় করিয়ে নিজেকে সামনে দাঁড়াল।
প্রয়াণ মুখটা অস্বাভাবিক গম্ভীর।
রাহি ভুরু কুঁচকে তাকাল।
"তোমার সমস্যা কি প্রয়াণ?"
প্রয়াণ নিচু গলায় বলল,
"তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই অবিবাহিত। এত সাজগোজের কি দরকার ছিল? তোর ঠোঁট এত চকচক করছে কেন?"
রাহির ভুরু আরও কুঁচকে গেল।
"প্রয়াণ, আমরা বিয়ে বাড়িতে এসেছি। এখানে সিনক্রিয়েট করবে না একদম।"
প্রয়াণ সঙ্গে সঙ্গে কথাটা কেটে দিল। তার গলাটা নিচু, কিন্তু বিপজ্জনক রকম ঠান্ডা।
"আমি সিনক্রিয়েট করছি? আর তুই যে এইভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছিস সেটা কি?"
রাহি হতবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
"আমি আবার কি করেছি?"
প্রয়াণ শুকনো হেসে বলল,
"আমি যদি এখানে না আসতাম, তাহলে জানতেই পারতাম না আমার বউ কতটা উড়তে শিখেছে।"
রাহির মুখের রং বদলে গেল।
"উড়তে শিখেছি মানে?"
প্রয়াণ এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
"যেদিকেই তাকাই, কেউ না কেউ তোর সাথে কথা বলছে। কেউ প্রশংসা করছে। কেউ হাসছে। আর তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিস।"
কিছুক্ষণ নীরবতা চলল দুজনের মধ্যে। রাহির ভীষণ খারাপ লাগছে। আজকের দিনে, এমন আনন্দের মাঝে, প্রয়াণের মুখে এমন কথা শুনতে হবে ভাবেনি। সে ধীরে মুখটা নিচু করে ফেলল।
প্রয়াণ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হাত বাড়িয়ে রাহির থুতনিটা তুলে ধরল। নিচু গলায় বলল,
"মুখ নিচু করছিস কেন?"
রাহি উত্তর দিল না। প্রয়াণ আরও ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল,
"আমার ব্যক্তিগত চাঁদের দিকে আমি অন্য কারও নজর সহ্য করি না।"
রাহির বুকটা ধক করে উঠল। প্রয়াণ তার চোখের দিকে তাকিয়েই বলল,
"যা আমার, তা আমারই।"
কথাটা বলেই নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে রাহির ঠোঁটের উপর থাকা লিপগ্লসটা সম্পূর্ণ ভাবে মুছে দিল। রাহি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
প্রয়াণ নির্বিকার গলায় বলল,
"এত চকচক করার দরকার ছিল না।"
তারপর ধীরে সরে দাঁড়াল। মুখে সেই চেনা কঠিন ভাব।
যেন কিছুই হয়নি। সে বলল,
"বাইরে সবাই অপেক্ষা করছে। চল।"
আর কোনো কথা না বলে ঘুরে নিজেই আগেই চলে গেল।
রাহি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আসছে। তার চোখে ধীরে ধীরে জল জমল।আজও সে মানুষটাকে বুঝতে পারল না। এক মুহূর্তে এমন কথা বলে, যা শুনলে মনে হয় পৃথিবীতে তার চেয়ে বেশি অধিকার কেউ দেখায় না। পরের মুহূর্তেই এমনভাবে চলে যায়, যেন কিছুই ঘটেনি।
************
আদ্রিতা সহজে থামার মেয়ে না। সত্যিটা যখন এতোটা সামনে তখন কিছুতেই সে থামবে না। সামনে থাকা আবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি অনেক ভেবেছি, আবরাজ খান। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না।"
আবরাজ কোনো উত্তর দিল না। আদ্রিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
"আপনি একটা অচেনা, অজানা মেয়েকে বাঁচানোর জন্য এতদূর গেলেন কেন? আপনি তো আমাকে চিনতেন না। আমার সঙ্গে আপনার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাহলে কেন?"
আবরাজ ধীরে চোখ তুলে বলল,
"আবার একই প্রশ্ন।"
আদ্রিতা জেদি গলায় বলল,
"হ্যাঁ। আর আমার উওর চাই।”
তারপর আবরাজ ধীরে ধীরে বলল,
"সব কিছুর কারণ থাকে না।"
আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
"মিথ্যে।"
আবরাজের ভ্রু সামান্য কুঁচকাল।
আদ্রিতা বলল,
"আপনার মতো মানুষ কোনো কারণ ছাড়া কিছু করে না।"
আবরাজ জানালার দিকে তাকাল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বলল,
"তুমি কি চাও আমি বলি, প্রথম দেখাতেই তোমাকে ভালো লেগেছিল?"
আদ্রিতা থমকে গেল। আবরাজের গলায় কোনো আবেগ নেই।
"নাকি চাও বলি, তোমাকে দেখে হঠাৎ করুণা হয়েছিল?"
আদ্রিতা বিরক্ত মুখ করে বলল,
"না, সত্যিটা বলুন।"
আবরাজ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে এক পা এগিয়ে এলো। পরের মুহূর্তেই আদ্রিতা বুঝে ওঠার আগেই তাকে ঘুরিয়ে নিজের সামনে দাঁড় করাল। সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল।
আবরাজ নিচু গলায় বলল,
"সত্যিটা হলো, আদ্রিতা চৌধুরী এখন আবরাজ খানের স্ত্রী।"
আদ্রিতার ভ্রু কুঁচকে গেল। আবরাজ নির্বিকার স্বরে যোগ করল,
"আর কিছুদিন পর আমার সন্তানের মা হবে।"
কথাটা শুনেই আদ্রিতার মুখ লাল হয়ে উঠল।
"অসভ্য!"
আবরাজের মুখে কোনো পরিবর্তন এলো না।
আদ্রিতা হাত ঝটকা দিয়ে সরাতে চেষ্টা করতে করতে বলল,
"আমি আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি করছি না।"
আবরাজ শান্ত স্বরে বলল,
"আমিও করি না।"
কথাটা বলেই সে আলতো করে নিজের বুড়ো আঙুলটা আদ্রিতার গালের উপর বুলিয়ে দিল।
আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত সরিয়ে দিল।
"দূরে থাকুন।"
আবরাজ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিচু গলায় বলল,
"কত দূরে থাকব, লিটিল স্পার্ক?"
আদ্রিতা ভুরু কুঁচকে তাকাল।
আবরাজ ফিসফিস করে বলল,
"এতদিন তো দূরেই ছিলাম।"
আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আপনি ইচ্ছে করে এসব করছেন।"
আবরাজের চোখে ক্ষীণ হাসি ফুটল। মনে মনে সে স্বীকার করল, হ্যাঁ, করছে। কিন্তু বাইরে থেকে আগের মতোই নির্বিকার রইল।
"উমম... না। একদম না, লিটিল স্পার্ক।"
আদ্রিতা বিরক্তিতে চোখ উল্টে ফেলল।
"আমি ঘুমাব। সরুন।"
আবরাজ নড়ল না। বরং আরও শান্ত হয়ে বলল,
"ঘুমন্ত বাঘকে জাগিয়ে এখন শিকার কেড়ে নিলে তো শুনব না আমি।"
***************
ইস্তাম্বুলের রাস্তাঘাটে, ক্যাফেতে, ব্যবসায়ীদের আড্ডায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে একটা নাম এখন প্রায়ই শোনা যায়। সেটা হলো আবরাজ খান। কেউ তাকে পছন্দ করে। কেউ ভয় পায়। কেউ ঘৃণা করে। কিন্তু উপেক্ষা করার সাহস কারও নেই।
কারণ কেমাল আরসালানের শেষ কয়েক বছরের প্রশাসনের পর শহরের আর্থিক অবস্থা প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। একের পর এক দুর্নীতি, অস্বচ্ছ প্রকল্প, অস্বাভাবিক বাজেট ব্যয় আর রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ সব মিলিয়ে ইস্তাম্বুল মিউনিসিপ্যালিটির অবস্থাই নড়বড়ে হয়ে গিয়েছিল।
সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও একাধিকবার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। অডিট রিপোর্টগুলো সুখকর ছিল না।
অনেক ফাইল নিখোঁজ। অনেক হিসাবের কোনো ব্যাখ্যা নেই। অনেক প্রকল্পে খরচ দেখানো হয়েছে বাস্তব ব্যয়ের কয়েকগুণ।
সেই অবস্থায় মেয়রের চেয়ারে বসেছিল আবরাজ খান।
আর প্রথম দিন থেকেই সে বুঝিয়ে দিয়েছে, সে জনপ্রিয় হতে আসেনি। সে হিসাব চাইতে এসেছে।
মেয়র হওয়ার পর প্রথম চার মাসে সে শত শত পুরোনো প্রকল্পের ফাইল পুনরায় খোলার নির্দেশ দেয়। বহু কর্মকর্তার বদলি হয়। কয়েকটি বড় নির্মাণ প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
নতুন নির্দেশ আসে, প্রতিটি ব্যয়ের ডিজিটাল রেকর্ড বাধ্যতামূলক। প্রতিটি টেন্ডার পুনর্মূল্যায়ন হবে।
এবং সবচেয়ে ভয়ের বিষয়, পুরোনো প্রশাসনের ফাইলও খোলা হবে।
সিটি হলের অনেক কর্মকর্তা তখন বুঝেছিল, নতুন মেয়র প্রতিশোধ নিচ্ছে না। সে আরও ভয়ংকর কিছু করছে।
মাত্র পাঁচ মাসে ইস্তাম্বুলের অনেক কিছু বদলে গেছে। বহু বছর ধরে গর্তে ভরা পড়ে থাকা রাস্তা নতুন করে সংস্কার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোতে নতুন কাজ শুরু হয়েছে। বহু পার্ক পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
গণপরিবহনের বেশ কিছু রুট আধুনিকায়ন করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে নতুন নিরাপত্তা ক্যামেরা বসানো হয়েছে।
তবে এর মানে এই নয় যে কেমাল আরসালানের প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। একদমই না। কারণ PRU -দলের কিছুজন এখনো জেলা মেয়র হিসেবে ক্ষমতায় রয়েছে। আর বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা তার রাজনৈতিক নেটওয়ার্কও অক্ষত। অনেক ব্যবসায়ী এখনও তার অনুগত। অনেক কর্মকর্তা এখনও তার লোক। তাই ইস্তাম্বুলের রাজনীতিতে এখন অদ্ভুত এক নীরব যুদ্ধ চলছে। একদিকে আবরাজ খান। অন্যদিকে কেমাল আরসালান।
*************
এবার আসা যাক কেমাল আরসালানের পরিচয়ে।
কেমাল আরসালান। বয়স মাত্র চল্লিশ। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এটাই সত্যি।
কারণ আরসালান পরিবার ইস্তাম্বুলের রাজনীতিতে নতুন কেউ নয়। প্রায় আঠারো বছর ধরে তারা শহরের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
এই সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়েছিলেন কেমালের বাবা।একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, যিনি নিজের প্রচেষ্টায় People Reform Unit (PRU) গঠন করেছিলেন।
প্রথমদিকে দলটি সাধারণ মানুষের অধিকার, প্রশাসনিক সংস্কার এবং নগর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। আর সত্যি বলতে, সেই সময় মানুষ তাদের বিশ্বাসও করেছিল। ফলে ধীরে ধীরে পুরো ইস্তাম্বুলের প্রশাসনিক কাঠামোর উপর প্রভাব।
কেমালের বাবা বহু বছর মেয়রের পদে ছিলেন। তারপর উত্তরাধিকারীর মতো করেই রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসে কেমাল আরসালান।
ছোটবেলা থেকেই ক্ষমতার করিডোরে বড় হওয়া ছেলে।মন্ত্রী, ব্যবসায়ী, কূটনীতিক এসব মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় তৈরি হয়েছিল কৈশোরেই। তাই রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর খুব বেশি সময় লাগেনি।
পাঁচ বছর আগে কেমাল ইস্তাম্বুলের মেয়র হয়। আর তখন অনেকেই বলেছিল,
"আরসালান যুগের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলো।"
তবে কেমাল তার বাবার মতো ছিল না। তার বাবা ছিলেন ধৈর্যশীল খেলোয়াড়। কেমাল ছিল আক্রমণাত্মক। ক্ষমতা ধরে রাখতে সে অনেক দূর পর্যন্ত যেতে পারত।
আর পাঁচ বছর ধরে সে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল। যতক্ষণ না আবরাজ খান তার সামনে এসে দাঁড়ায়।
আর এলিনা রেহমান সে হলো কেমালের কাজিন ভাইয়ের মেয়ে। সেই কারণেই ছোটবেলা থেকেই এলিনা আরসালান পরিবারের ভেতরের মানুষ ছিল।
ক্ষমতার অন্দরমহল, গোপন বৈঠক, রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সবকিছুর মাঝেই তার বেড়ে ওঠা।
আর এক সময় সেই পরিবারের নির্দেশেই এলিনা সারফরাজ আহমেদের জীবনে প্রবেশ করেছিল। প্রথমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হলেও পরে বাস্তবতা জটিল হয়ে যায়।
রাজনীতির খেলায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো,
একবার দাবার বোর্ডে উঠে গেলে কেউ আর মানুষ থাকে না। সবাই ঘুঁটি হয়ে যায়। আর এলিনা রেহমানও তার ব্যতিক্রম ছিল না
আরসালান বাড়িটা বসফরাসের একদম শেষ প্রান্তে।
বিশাল প্রাসাদসদৃশ স্থাপনা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় কোনো অভিজাত ব্যবসায়ীর বাড়ি। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায় এটা যেন রাজনীতির আরেক অন্দরমহল।
রাত নেমেছে ইস্তাম্বুলে। বসফরাসের কালো জলে দূরের আলোগুলো প্রতিফলিত হচ্ছে। বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি বড় কক্ষে বসে আছে কেমাল আরসালান। সামনে কাঁচের টেবিল। হাতে অর্ধেক ভর্তি ম/দ্য পানিয়ের গ্লাস। চারপাশে আরও চারজন লোক বসে আছে।
ঘরের পরিবেশ অস্বাভাবিক রকমের ভারী। টেবিলের উপর খোলা ল্যাপটপ। স্ক্রিনে ভেসে আছে একটি ছবি।সেটা হলো প্রিয়ান্তি খান।
কেমাল ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
"আগামী আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে আমি প্রিয়ান্তিকে নিজের সামনে দেখতে চাই।"
ঘরের ভেতর নীরবতা নেমে এলো।
কেমাল গ্লাসটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখল।
"কীভাবে করবি, সেটা তোদের দায়িত্ব।"
চারজনের মধ্যে একজন অবশেষে মুখ খুলল।
"স্যার, ব্যাপারটা এত সহজ না।"
কেমাল ভ্রু তুলল। লোকটা গলা পরিষ্কার করে বলল,
"সে শুধু খান পরিবারের মেয়ে না। এখন সারফরাজ আহমেদের স্ত্রীও।"
আরেকজন ধীরে মাথা নাড়ল।
"গত কয়েক মাসে সারফরাজের আশেপাশের নিরাপত্তা কয়েকগুণ বেড়েছে। তার উপর খান পরিবারের লোকজনও... "
কেমাল হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল। তার চোখে বিরক্তি ফুটে উঠেছে।
"তাহলে তোদের টাকা দিই কেন?"
কেউ উত্তর দিল না। কেমাল চেয়ারে হেলান দিল।
তার কণ্ঠস্বর আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।
"আমি সমস্যা শুনতে বসিনি। সমাধান শুনতে বসেছি।"
ঘরের এক কোণে বসে থাকা লোকটা ধীরে বলল,
"স্যার, তাড়াহুড়ো করলে উল্টো ফল হতে পারে।"
কেমালের চোখ তার দিকে ঘুরে গেল।
"তুমি কি আমাকে ধৈর্য ধরতে বলছো?"
চারজনের মধ্যে একজন বলল,
“না না স্যার, কাজ হয়ে যাবে।”
************
খান মহলে ফিরতে ফিরতে রাত অনেক হয়ে গেছে। প্রয়াণের জেদের ফলেই আজই ফিরে আসা।
রাহির বাবা-মা অনেকবার বলেছিল,
"আরেকদিন থাকো।"
কিন্তু প্রয়াণ এক কথার মানুষ। সে শুধু বলেছিল,
"কাল আমার কাজ আছে।"
তাই কেউ আর তর্ক করেনি।
খান মহলে ঢুকেই প্রয়াণ প্রথমে রাজন্যাকে নিয়ে নিজের ঘরে গেল। মেয়েটা তখন আধো ঘুমে। চোখও ঠিকমতো খুলতে পারছে না। প্রয়াণ তাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কম্বল টেনে দিল গলা পর্যন্ত।
এসি অন করে দিলো।
রাজন্যা ঘুমের মধ্যেই বাবার হাত আঁকড়ে ধরল।
প্রয়াণ নিচু হয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
"ঘুমাও প্রিন্সেস।"
মেয়েটা কিছু অস্পষ্ট শব্দ বলেই আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। বিয়ে বাড়িতে সারাদিন দৌড়াদৌড়ি করে তার শক্তি শেষ।
রাহিও ভীষণ ক্লান্ত। সারাদিনের অনুষ্ঠান, আত্মীয়স্বজন, বিয়ের ঝামেলা সব মিলিয়ে শরীর আর চলতে চাইছে না। সে শাড়ি বদলে বিছানার একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার চোখ প্রায় বন্ধ হয়ে এলো।
এদিকে প্রয়াণ পোশাক বদলে ফিরে এল। প্রয়াণ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে এসে বিছানায় বসল। রাহির দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। আজকের বিকেলের ঘটনাটা এখনও তার মাথায় ঘুরছে। তার বিরক্তি এখনও পুরোপুরি যায়নি।সে ধীরে ধীরে রাহীর একদম কাছে শুয়ে পড়ল।
এতটাই কাছে যে রাহির চুলের হালকা গন্ধ আবারও ভেসে এলো। রাহী একটু নড়ে উঠল। অচেতনভাবেই আরও একটু সরে এসে প্রয়াণের বাহু ছুঁয়ে রইল।
প্রয়াণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল। তারপর নিচু গলায় বিড়বিড় করল,
"সারাদিন আমাকে রাগিয়ে রাখবি।"
রাহি আধো ঘুমের মধ্যেই উত্তর দিল,
"সমস্যা তোমার, আমার না।"
প্রয়াণের চোখ সরু হয়ে গেল। এক ঝটকায় সে রাহিকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল।
"সাহস বেড়েছে তাই না?"
তার গলাটা নিচু।
"খুব বেড়ে গেছে। আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করিস না।"
রাহি একটুও ভয় পেল না। বলল,
"ভয় পাই না আমি তোমায়।"
#চলবে
#পর্ব_৩২
#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি
(শুনুন কালকের পর্বে একটা এমন দিক থাকবে যেটা অর্ধেক পড়লে আপনারা চাইবেন পরের দিকটা পড়তে। তো আমি তাই ভেবেছি, কাল দুপুর ৩:৩০ এ পর্ব ৩৩ দেবো আর রাত ৮ টায় আরো একটা পর্ব অর্থাৎ পর্ব ৩৪ দেবো। আপনারা কমেন্টে বলুন আপনারা কি কার দুটো পর্ব চান? আপনাদের কমেন্টের ওপর ভিত্তি করেই দেবো।)