ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

৩৩তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

প্রয়াণ ভ্রু কুঁচকাল। এই মেয়েটা মাঝে মাঝে সীমা ছাড়িয়ে যায়। অন্য কেউ হলে এতক্ষণে অন্তত চুপ হয়ে যেত।

কিন্তু রাহি, সে তো প্রয়াণ কে ভয় পায় না। প্রয়াণকে ভয় না পাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ একটাই। এক সময় এই মানুষটাই তার প্রেমিক ছিল। সেটা অভিনয় ছিল, সত্যি ছিল, নাকি সময় কাটানো ছিল সেই হিসাব আজও পুরোপুরি মেলাতে পারেনি রাহি।

কিন্তু একটা জিনিস সে জানে। প্রয়াণ খান যতই ভয়ংকর হোক, তাকে দেখে রাহীর ভয় লাগে না। রাগ লাগে, অভিমান হয়, কান্না পায় কিন্তু ভয় নয়।

রাহি হাই তুলে বলল,

"ঘুম পাচ্ছে। ঘুমাতে দাও।"

প্রয়াণ কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর নিচু গলায় বলল,

"আমি কথা বলছি।"

রাহি চোখ বন্ধ করেই উত্তর দিল,

"তুমি সবসময় কথা বলো।"

প্রয়াণ শান্ত গলায় বলল,

"রাহি। আমাকে ইগনোর করছিস?"

রাহি এবার চোখ খুলে বিরক্ত মুখে তাকাল।

"রাত কত বাজে জানো?"

প্রয়াণ জবাব দিল,

"না। আর জানার ইচ্ছেও নেই।"

প্রয়াণ দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার সাহস দিন দিন সত্যিই বেড়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ড পর সে হাত বাড়িয়ে রাহির গালটা চেপে ধরল।

"এই!"

রাহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ খুলে ফেলল।

"ব্যথা লাগছে আমার। তুমি একটা অসভ্য লোক।"

প্রয়াণ বলল,

“জানি।”

রাহি এবার সত্যি সত্যি বিরক্ত হয়ে গেল।

"আমাকে ঘুমাতে দাও।"

প্রয়াণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিল।

"ঘুমা।"

রাহি সন্দেহের চোখে তাকাল।

"এত সহজে?"

"হুম।"

রাহি আর কিছু না বলে পাশ ফিরে শুয়ে গেল। দুই মিনিটও লাগল না, ক্লান্তিতে তার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীরে ধীরে নিয়মিত হয়ে এল। সে ঘুমিয়ে পড়েছে।

প্রয়াণ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করল,

"ভয় পাস না বলেই এত বাড়াবাড়ি করিস।"

কথাটা অবশ্য শোনার জন্য রাহি জেগে ছিল না। আর প্রয়াণও দ্বিতীয়বার বলল না।

****************__________________******************

সারফরাজের মেয়ে সৃজা খুব অদ্ভুত একটা শিশু।

একদম চুপচাপ। নিজের মধ্যে থাকা একটা মেয়ে।

বাড়ির সবার সাথে কথা বলে ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি

খোলামেলা না। ছোটবেলা থেকেই যেন শিখে গেছে,

কিছু আশা করা যায় না। কারণ আশা করলে হতাশ হতে হয়।

সারফরাজ তাকে ভালোবাসে, সেটা সৃজা জানে। কিন্তু ভালোবাসা আর সময় দেওয়া এক জিনিস না।

সারফরাজের সবসময় রাজনীতি, মানুষ, দায়িত্ব, সভা, মিটিং এসবে ব্যস্ত থাকে। আর এলিনা আসলেও সৃজার প্রতি সেই টানটা কখনো পুরোপুরি ছিল না। ফলে মেয়েটা বড় হয়েছে বাড়ির মানুষদের হাতেই।

আজ স্কুল থেকে ফিরে সৃজা অনেক যত্ন করে একটা ছবি এঁকেছে। একটা বড়ো বাড়ি। সামনে বাগান। আর তিনজন মানুষ। ছবিটা শেষ করেই সে ভীষণ খুশি হয়ে গেল।

প্রথমেই চিন্তা আসলো বাবাকে দেখাবে। তাই ছোট ছোট পায়ে দৌড়াতে দৌড়াতে চলে এল সারফরাজের রুমের সামনে। তারপর ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে ঢুকে পড়ল।

"বাবা! দেখো আমি... "

কথাটা শেষ হওয়ার আগেই থেমে গেল।

কারণ ঘরে সারফরাজ নেই। শুধু প্রিয়ান্তি আছে।

প্রিয়ান্তি বিছানার উপর বসে ফোন স্ক্রল করছে। দরজা খোলার শব্দে মুখ তুলে তাকাল। সৃজা দরজার কাছে একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। হাতে আঁকার খাতা।

চোখে দ্বিধা। মুখে অস্বস্তি। মনে হলো এখনই হয়তো বলবে,

"সরি।"

তার ধারণা সে হয়তো প্রিয়ান্তিকে বিরক্ত করেছে।

অথবা ভুল সময়ে ঢুকে পড়েছে।

প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে বলল,

"কি হয়েছে?"

সৃজা খাতাটা নিজের পেছনে লুকিয়ে ফেলল।

"কিছু না।”

প্রিয়ান্তি মিষ্টি করে হেসে বলল,

"কিছু না হলে দৌড়ে এলে কেন?"

সৃজা চুপ। প্রিয়ান্তি ভুরু কুঁচকে বলল,

"তোমার হাতে কি?"

সৃজা আরও একটু খাতা লুকিয়ে ফেলল।

"কিছু না।"

এইবার প্রিয়ান্তি ফোনটা রেখে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল।

"সানসাইন, আমি কি এত ভয়ংকর?"

সৃজা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ল।

"না।"

প্রিয়ান্তি বলল,

"তাহলে এমন করছো কেন?"

সৃজা ঠোঁট কামড়াল। তারপর খুব আস্তে বলল,

"আপনি রাগ করবেন না তো?"

প্রিয়ান্তি একদম থেমে গেল। এত ছোট একটা মেয়ে।

প্রথম প্রশ্নই, রাগ করবে না তো? তার বুকটা কেমন করে উঠল। সে নরম গলায় বলল,

"না।"

সৃজা কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল। তারপর ধীরে ধীরে খাতাটা সামনে ধরল।

"আমি ছবি এঁকেছি।"

প্রিয়ান্তির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে আগ্রহ নিয়ে খাতাটা নিল।

সৃজা উদ্বিগ্ন মুখে দাঁড়িয়ে রইল। মনে হচ্ছে পরীক্ষার ফল বের হবে।

প্রিয়ান্তি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সত্যি সত্যি মুগ্ধ হয়ে বলল,

"এটা তুমি এঁকেছো?"

সৃজা আস্তে মাথা নাড়ল।

"খুব সুন্দর হয়েছে!"

সৃজার চোখ বড় হয়ে গেল।

"সত্যি?"

"একদম সত্যি।"

সৃজা যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না।

প্রিয়ান্তি ছবিটার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,

"এই যে বাড়িটা, এটা কোন বাড়ি?"

সৃজা এবার একটু সাহস পেল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,

"এটা আমাদের বাড়ি।"

"আচ্ছা? আর এই তিনজন?"

সৃজা ছবির দিকে আঙুল দেখাল।

"বাবা।"

তারপর আরেকজনকে দেখাল।

"আমি।"

প্রিয়ান্তির চোখ নরম হয়ে গেল।

"আর এইটা?"

সৃজা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

"তুমি।”

প্রিয়ান্তি থমকে গেল। ঘরটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত নীরব হয়ে গেল।

সৃজা ধীর গলায় বলল,

“পাপা বলেছে তুমি আমার মাম্মা।”

প্রিয়ান্তি বলল,

“তাহলে তুমি আমায় মাম্মা বলো না কেন?”

সৃজা বলল,

“তুমি যদি বকো আমায় তাই?”

প্রিয়ান্তি ধীরে বলল,

"আমি তো কাউকে বকি না। আর আমিও কিন্তু ড্রয়িং করতে খুব ভালোবাসি।"

সৃজা ভীষণ ভীতু গলায় বলল,

"আমি, একটা কথা বলব?"

"বলো।"

"আমি কি তোমায়..."

সে আবার থেমে গেল। প্রিয়ান্তি অপেক্ষা করল।

সৃজা এবার সাহস করে বলেই ফেলল,

"আমি কি তোমায় এবার থেকে মাম্মা বলব?"

কথাটা বলেই সে প্রিয়ান্তির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

যেন উত্তরের ওপর খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নির্ভর করছে।

প্রিয়ান্তির চোখের কোণটা অদ্ভুতভাবে ভিজে উঠল।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে সৃজার মাথায় হাত রাখল।

তারপর নরম গলায় বলল,

"অবশ্যই বলবে।"

সৃজা মিষ্টি গলায় বলল,

“মাম্মা।”

প্রিয়ান্তির মুখে অজান্তেই একটা বড় হাসি ফুটে উঠল।

কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হলো তার।

হয়তো কারণ, এই ডাকটার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।

হয়তো কারণ, এতদিন কেউ তাকে এভাবে ডাকেনি।

প্রিয়ান্তি দুহাত দিয়ে সৃজার মুখটা আলতো করে ধরল।

তারপর ঝুঁকে গিয়ে গালে একটা চুমু দিল।

"আমার সানশাইন বেবি।"

সৃজা খিলখিল করে হেসে ফেলল।

প্রিয়ান্তিরও মন ভরে গেল। সে আরেকটা চুমু দিল এক গালে। তারপর আরেকটা অন্য গালে।

"উমমম... আরেকটা।"

"মাম্মা!"

"আরেকটা।"

"মাম্মা!"

সৃজা এবার হেসে লুটোপুটি খাওয়ার অবস্থা। এত আদর সে খুব একটা পায় না। বাড়ির সবাই তাকে ভালোবাসে ঠিকই। কিন্তু এভাবে, এতটা নির্ভেজাল আদর সে পায়ই না। সে দুই হাত দিয়ে প্রিয়ান্তির গলা জড়িয়ে ধরল।

প্রিয়ান্তি হেসে বলল,

"তুমি এত কিউট কেন?"

সৃজা হাসতে হাসতে বলল,

“জানি না।”

প্রিয়ান্তি গালটা আলতো টিপে দিয়ে বলল,

"কারণ তুমি আমার সানশাইন।"

সৃজার মুখটা আনন্দে লাল হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে বলল,

"আর তুমিও অনেক সুন্দর কারণ তুমি আমার মাম্মা।"

কথাটা এমন স্বাভাবিকভাবে বলল যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ সত্যি এটাই। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারফরাজ নিঃশব্দে দৃশ্যটা দেখল। তার মেয়ে সাধারণত মানুষের সঙ্গে এত দ্রুত মিশে না।

কিন্তু এই মুহূর্তে সৃজা এমনভাবে প্রিয়ান্তির গলা জড়িয়ে আছে যেন বহুদিনের চেনা।

প্রিয়ান্তি তখনও মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

"আমার সানশাইন বেবি।”

সারফরাজ ভেতরে ঢুকল। কোর্ট খুলতে খুলতে বলল,

“তা এতো কি কথা হচ্ছে মা-মেয়ের মধ্যে!”

প্রিয়ান্তি বলল,

“আপনি যে সানসাইন কে একটুও টাইম দেন না, এটা নিয়ে মেয়েটার কতো দুঃখ জানেন?”

সারফরাজের হাত এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর ধীরে কোর্টটা চেয়ারের উপর রাখল। কিছু বলল না। কারণ উত্তরটা সে জানে।

সৃজার ছোটবেলা থেকেই এই অভাবটা ছিল। সে কখনো জোর করে কিছু চায়নি। কখনো অভিযোগ করেনি। কখনো রাগ দেখায়নি। শুধু ধীরে ধীরে চুপচাপ হয়ে গেছে। আর সেই নীরবতার পেছনের কারণটা

সারফরাজ খুব ভালো করেই জানে।

রাত আরও গভীর হলো। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে গেল।

সারা সৃজাকে নিতে আসলেও প্রিয়ান্তি একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,

"আজ থেকে সানশাইন এই ঘরেই থাকবে।”

সারা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। সারফরাজও স্পষ্ট অবাক হলো। প্রিয়ান্তি যেন কিছুই হয়নি এমনভাবে সৃজার গায়ে কম্বল টেনে দিল। মেয়েটা অনেকক্ষণ আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মুখটা একদম শান্ত।

সারা শেষ পর্যন্ত হালকা হেসে বলল,

"আচ্ছা ভাবি।"

তারপর চুপচাপ বেরিয়ে গেল।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে সারফরাজ আর প্রিয়ান্তি।

রাতের বাতাস বইছে। দূরে শহরের আলো জ্বলছে।

ভেতরের ঘরে সৃজা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে।

প্রিয়ান্তি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

"ওর বয়স মাত্র পাঁচ বছর।"

সারফরাজ কিছু বলল না। প্রিয়ান্তি এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,

"একটা বাচ্চা মেয়ে। আর আপনি ওর প্রতি এতটা উদাসীন কেন?"

সারফরাজ ধীরে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"আমি উদাসীন নই।"

প্রিয়ান্তি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,

“তাই? তাহলে ও কেন ভাববে আমি ওকে বকব? কেন ও এত ইতস্তত করে যখন কেউ ওর ছবি দেখে? কেন ওর প্রথম প্রশ্ন হয়, রাগ করবে না তো?"

সারফরাজ রেলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেছে।

প্রিয়ান্তি এবার অনেক নরম গলায় বলল,

"আপনি জানেন, ও আপনাকে ভীষণ ভালোবাসে।"

সারফরাজ বলল,

“জানি।”

"আর আপনি?"

সারফরাজ খুব ক্ষীণ একটা হাসি হাসলো।

"সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে?"

প্রিয়ান্তি চুপ করে গেলো। কারণ উত্তরটা সে জানে।

সারফরাজ তার মেয়েকে পৃথিবীর যেকোনো কিছুর

চেয়ে বেশি ভালোবাসে। তবে সমস্যা ভালোবাসায় না। সমস্যা প্রকাশে।

কিছুক্ষণ পর সারফরাজ নিচু গলায় বলল,

"আমি ভালো বাবা নই, বাটারফ্লাই। আমি চেষ্টা করি ভালো বাবা হতে কিন্তু তাও হয়ে উঠতে পারি না।”

প্রিয়ান্তি শান্ত গলায় বলল,

"আসলে আপনি বা আপনার প্রাক্তন স্ত্রী কেউই সন্তান চাননি। তাই হয়তো এত অবহেলা।"

সারফরাজের ভুরু কুঁচকে গেল।

প্রিয়ান্তি থামল না,

"জন্ম দিলেই যেমন মা হওয়া যায় না, তেমনি শুধু রক্তের সম্পর্ক থাকলেই বাবা হওয়া যায় না।"

কথাটা বলেই সে ঘুরে দাঁড়াল। আর কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে চলে গেল।

কথাটা শোনার পর সারফরাজ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বারান্দার বাতাস তখনও বইছে। কিন্তু প্রিয়ান্তির কথাগুলো যেন তার বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে আঘাত করল।

প্রিয়ান্তির শেষ কথাটা বারবার কানে বাজতে লাগল,

"রক্তের সম্পর্ক থাকলেই বাবা হওয়া যায় না।"

অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে প্রতিবাদ করতে পারে নি।

কারণ নিজের কাছে সে জানে, সৃজার প্রথম হাঁটা সে দেখেনি। কথা বলা সে শোনে নি। প্রথম স্কুল ডে মিস করেছে। অনেক জন্মদিনে উপস্থিত ছিল না। অনেক রাতে মেয়েটা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর বাড়ি ফিরেছে। আর ভোর হওয়ার আগেই বেরিয়ে গেছে।

সে সবসময় ভেবেছে, নিরাপত্তা দিচ্ছে, ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছে, দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু আজ প্রথমবার তার মনে হলো, হয়তো সৃজা এসবের চেয়ে অনেক সহজ কিছু চেয়েছিল। শুধু তার বাবাকে।

ঘরের আলো নিভে গেছে। বিছানার উপর তিনজন মানুষ শুয়ে আছে। সৃজা ঘুমের মধ্যেই প্রিয়ান্তির বুকের কাছে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।

শিশুরা অদ্ভুত, যেখানে নিরাপত্তা পায়, সেখানেই বারবার যায়। প্রিয়ান্তির শরীরে একধরনের পরিচিত উষ্ণতা আছে। একটা মমতা। একটা আশ্রয়। যেটাকে হয়তো ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু শিশুরা ঠিকই বুঝে যায়। তাই সৃজা এত শক্ত করে প্রিয়ান্তির জামা আঁকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।

প্রিয়ান্তি ধীরে সৃজার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিচু গলায় বলল,

"বাবা হওয়ার চেষ্টা করো, মিস্টার এমপি।"

কথাটা খুব আস্তে বলা। কিন্তু সারফরাজের বুকের ভেতর যেন ঝড় তুলে দিল। সে ঢোক গিলল। অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। চোখ দুটো জ্বালা করছে। সে জীবনে অনেক কিছু পেয়েছে। ক্ষমতা, সম্মান, প্রভাব।

কিন্তু যাদের জন্য সবচেয়ে বেশি লড়াই করার কথা ছিল, তাদের কাছেই কি সবচেয়ে বেশি হেরে গেছে?

এলিনাকে ধরে রাখতে পারেনি। সৃজার শৈশবের বড় একটা অংশ হারিয়েছে। নিজের সংসারটাকেও বাঁচাতে পারেনি।

ধীরে ধীরে সে একটু সরে এলো। তারপর হাত বাড়িয়ে একসাথে জড়িয়ে নিল প্রিয়ান্তি আর সৃজাকে। প্রিয়ান্তি অবাক হয়ে তাকাল। সারফরাজ কিছু বলল না।

শুধু ঝুঁকে সৃজার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। অনেকক্ষণ একই ভাবে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল,

"আই অ্যাম সরি, সানশাইন।"

গলাটা কেঁপে গেল।

"রিয়েলি... ভেরি সরি।"

ঘুমন্ত সৃজা অবশ্য কিছুই শুনল না। সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু প্রিয়ান্তি খুব স্পষ্টভাবে শুনল।

আর সেই মুহূর্তে সে বুঝতে পারল, সারফরাজ আহমেদ পৃথিবীর সামনে যত শক্তই হোক, এই ছোট্ট মেয়েটার সামনে সে শুধু একজন অপরাধবোধে ভরা বাবা।

****************__________________******************

বিপদ কখন, কীভাবে, কার জীবনে নেমে আসবে, সেটা কেউ বলতে পারে না। ক্ষমতাবান মানুষরা প্রায়ই ভাবে তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। রাজনীতিবিদরা ভাবে তাদের চারপাশের নিরাপত্তা, প্রভাব আর ক্ষমতা সব বিপদকে দূরে রাখবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম।একটা ছোট্ট ভুলের জন্য সবকিছু বদলে যেতে পারে।

চারপাশ অন্ধকার। ঘরের ভেতরে একটা ভারী স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। প্রিয়ান্তি ঘরের এক কোণে বসে আছে। তার হাত দুটো কাঁপছে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন এত দ্রুত চলছে যে মনে হচ্ছে এখনই বেরিয়ে আসবে।

দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। প্রিয়ান্তির নিঃশ্বাস আটকে গেল। দরজাটা খুলে অন্ধকারের ভেতর থেকে কয়েকজন লোক ঢুকল।তাদের পেছনে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো আরেকজন।

প্রিয়ান্তি প্রথমে মুখটা দেখতে পেল না। কিন্তু লোকটা সামনে আসতেই তার ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো ভয়ঙ্করভাবে ঠান্ডা। সেটা হলো কেমাল আরসালান।

লোকটা কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর মাথা কাত করল।

"হুম।"

প্রিয়ান্তির দিকে তাকিয়ে বলল,

"তোমার সাথে ঠিক কী করা যায় বলতো?"

প্রিয়ান্তির গলা কেঁপে উঠল।

"কেন এনেছেন আমায় এখানে?"

কেমাল আরসালান কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,

"তোমার এই সুন্দর রূপটা সম্পূর্ণ দেখার জন্য।"

কথাটা শুনেই প্রিয়ান্তির পুরো শরীর ঘৃণায় কেঁপে উঠল। না, না, এটা হতে পারে না। তার বুকের ভেতর আতঙ্ক জমাট বাঁধতে লাগল। চোখে পানি চলে এলো।

"আমাকে যেতে দিন।"

কণ্ঠস্বরটা ভেঙে গেল।

কেমাল ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। প্রিয়ান্তি আরও সরে গিয়ে দেয়ালের সাথে মিশে গেল।

কেমাল কিছুক্ষণ তার ভীত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বলল,

"দেখলে? ঠিক এটাই দেখতে চেয়েছিলাম।"

প্রিয়ান্তি কিছু বুঝতে পারল না।

কেমাল এবার নিচু গলায় বলল,

"সারফরাজ আহমেদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আসলে কেমন দেখতে, সেটা জানতে চেয়েছিলাম।”

প্রিয়ান্তির চোখ দিয়ে অনবরত জল পড়ছে। ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় তার পুরো শরীর কাঁপছে। কেমাল নিচু হয়ে তার দিকে তাকাল। তার চোখে সেই অস্বস্তিকর ঠান্ডা দৃষ্টি।

"কাঁদলে তোমাকে আরও অসহায় দেখায়।"

প্রিয়ান্তি দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

"জা"নো*য়া"র।"

কেমালের মুখ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল। সে প্রিয়ান্তির চুলটা চেপে ধরল। বলল,

"চুপ। একদম চুপ।”

প্রিয়ান্তির ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো। তাবে তার মাথায় নিজের ভয়ের চেয়েও বড় একটা চিন্তা বজ্রপাতের মতো আঘাত করল। সে তো সৃজাকে নিয়ে বেরিয়েছিল। তার চোখ হঠাৎ বড় হয়ে গেল।

সৃজা কোথায়? সানশাইন? তার সানশাইন কোথায়?

প্রিয়ান্তির মুখ থেকে রঙ উধাও হয়ে গেল। সে কাঁদতে কাঁদতেই বলল,

"সৃজা কোথায়? প্লিজ... প্লিজ ওকে আমার কাছে আনুন... প্লিজ।"

তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। চোখের পানি থামছেই না।

কেমাল হেসে ফেলল। সেই হাসিতে কোনো উষ্ণতা নেই।

শুধু ঠান্ডা নিষ্ঠুরতা।

প্রিয়ান্তি মাথা নেড়ে বলল,

"ওকে ছেড়ে দিন... প্লিজ।"

কেমাল কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল,

"তোমার মেয়ে এখন মৃ/ত্যু/র কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে।"

কথাটা শুনেই প্রিয়ান্তির বুক থেকে একটা চাপা আর্তনাদ বেরিয়ে এলো।

"না!"

সে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে সামনে এগিয়ে এল।

"না... না... প্লিজ। ও তো একটা বাচ্চা...ওর কোনো দোষ নেই... ওকে ছেড়ে দিন।"

তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।

তবে কেমাল নির্বিকার। পাশে দাঁড়ানো একজন লোককে সে ইশারা করল। লোকটা এগিয়ে এসে তার হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট ধরিয়ে দিল।

#চলবে

(একটু তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলাম পর্বটা 🙂 এখন আমি ঘুমাতে যাই। তোমারা পড়ে বড়ো বড়ো মন্তব্য করোওওও। পরেরটা পার্টটা রাত ৮:০০ এ আসবে।)

#পর্ব_৩৩

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন