ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

৩৬তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

সারফরাজ ভেতরে ঢুকল। প্রয়ান শেষ বারের মতো সৃজার মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে গেল। সারফরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমার একটু কাজ আছে। তুমি থাকো আমি এলাম।”

প্রয়াণ বেরিয়ে গেল।

সারফরাজ ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে বসল। ছোট্ট মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। সারফরাজ কাঁপা হাতে সৃজার কপালে হাত রাখলো।

কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে।

এই ছোট্ট মেয়েটা জন্মের পর থেকে কতবার তার বাবাকে খুঁজেছে? কতবার অপেক্ষা করেছে? কতবার নিজের আঁকা ছবি নিয়ে দৌড়ে এসেছে?

আর সে সবসময় ব্যস্ত ছিল। দেশের জন্য, মানুষের জন্য, রাজনীতির জন্য।

সারফরাজ ধীরে সৃজার ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে নিল। ফিসফিস করে বলল,

"সানশাইন..."

ঘুমন্ত মেয়েটা সামান্য নড়ে উঠল।

সারফরাজের চোখ জ্বালা করছে। গলাটা ভারী হয়ে এলো।

"আমার সানশাইন, একবার তুমি আর তোমার মাম্মা সুস্থ হয়ে ওঠো। তারপর পাপা সব ঠিক করে দেবে।"

কথাটা বলেই থেমে গেল। কারণ সে জানে, অতীত ঠিক করা যায় না।

তবু সে আবার বলল,

"পাপা তোমাকে অনেক সময় দেবে। অনেক গল্প করবে। তোমার সব ছবি দেখবে। "তুমি যা বলতে চাও, সব শুনবে।"

তার কণ্ঠ ভেঙে এলো।

"আমি জানি আমি খুব ভালো বাবা হতে পারিনি, সানশাইন। কিন্তু এবার চেষ্টা করব। সত্যি চেষ্টা করব।"

সৃজা ঘুমের মধ্যেই বাবার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে ফেলল। হয়তো অবচেতন মনেও সে চিনতে পারে, এটাই তার বাবা।

সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে বলল,

"তোমাকে আর কখনো একা মনে করতে দেব না। প্রমিস, সানশাইন।"

কেবিনের নরম আলোয় ছোট্ট মেয়েটা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে রইল। আর বহু বছরের মধ্যে প্রথমবার, সারফরাজ আহমেদ শুধু একজন এমপি না। শুধু একজন রাজনীতিবিদ না। সে শুধু একজন বাবা হয়ে তার মেয়ের পাশে বসে রইল।

*************______________________*************

ইস্তাম্বুলের সেই পুরোনো গুদামঘরটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধ। ঘরের মাঝখানে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে এমির। কয়েকদিন আগেও তার মুখে দম্ভের শেষ ছিল না। অথচ তার মুখে ক্লান্তি, চোখে আতঙ্ক।

সামনে চেয়ারে পা তুলে বসেছিল প্রয়াণ। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থাকার পর সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।

তার পদধ্বনি শুনে এমিরের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। প্রয়াণ এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কোনো কথা বলল না।

তারপর প্রয়াণ ধীরে ধীরে বাঁকা হেসে নিজের পা -টা চেপে ধরল এমিরের বুকে।

এমির দাঁত চেপে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

প্রয়াণ বলল,

“দিন গোনা শুরু কর এমির কারণ সারফরাজ তোকে এমন মৃ/ত্যু দেবে যা দেখে স্বয়ং মৃত্যুও ভয়ে পাবে।”

**********

এলিনা খবর পেয়ে প্রায় দৌড়ে হাসপাতালে এসে পৌঁছালো। তার চোখ-মুখে এলোমেলো ভাব। সে সোজা কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াতেই সারফরাজ পথ আটকে দিল। তার মুখ অস্বাভাবিক ঠান্ডা।

"আমার মেয়ের সাথে আমি কোনো বাইরের লোককে দেখা করতে দেব না।"

এলিনা যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। সে বলল,

"আমি ওর মা, সারফরাজ।"

সারফরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

"মা?"

সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

"না। তুমি মা নামের কলঙ্ক।"

এলিনা থমকে গেল।

সারফরাজ এক পা এগিয়ে এসে বলল,

"তুমি প্রিয়ান্তির উপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আমার মেয়েটাকে এই অবস্থায় নিয়ে এসেছ। পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা ও। সে তোমার কী ক্ষতি করেছিল?"

এলিনার চোখ ভিজে উঠল।

"আমি সত্যি কিছু জানতাম না।"

"চুপ।"

সারফরাজের কণ্ঠ হঠাৎ কঠোর হয়ে উঠল।

"একদম চুপ।"

করিডোরে উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল।

"তোমার পরিবারের লোক আমার মেয়ের সাথে কী করেছে, আর তুমি জানো না?‌ এই কথাটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলছ?

এলিনা কাঁপা গলায় বলল,

"বিশ্বাস করো আমায়... আমি জানতাম না... আমি জানলে কখনো এমন হতে দিতাম না।"

তার গলাটা বারবার আটকে যাচ্ছিল।

কিন্তু সারফরাজের মুখের অভিব্যক্তি বদলাল না।

বরং সে হঠাৎ হেসে ফেলল। সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না। ছিল তীব্র বিদ্রুপ।

"তাই?"

সে ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

"যে নিজের স্বার্থের জন্য আমাকে সবার সামনে চরিত্রহীন প্রমাণ করতে পারে, যে বছরের পর বছর মিথ্যাকে সত্যি বানিয়ে বেঁচে থাকতে পারে, সে আর যাই হোক, কাউকে রক্ষা করতে পারে না, এলিনা।"

এলিনা নির্বাক হয়ে গেল।

সারফরাজ এবার তার চোখে চোখ রেখে বলল,

"সৃজা শুধু আমার আর আমার স্ত্রী প্রিয়ান্তির সন্তান। তুমি সৃজার কেউ নও।"

কথাটা শুনে এলিনার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

সারফরাজ থামল না।

কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে সারফরাজ বলল,

"এখন চলে যাও, এলিনা। আজ আমার মেয়ের শান্তি দরকার। আর তোমার উপস্থিতি সেই শান্তি নষ্ট করবে।"

এলিনা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আর সারফরাজ একবারও পিছনে না তাকিয়ে সৃজার কেবিনের দিকে হেঁটে চলে গেল।

এলিনা করিডোরের মাঝখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।সে সৃজাকে জন্ম দিয়েছিল। নয় মাস গর্ভে রেখেছিল। শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। মা হতে হলে সন্তানের পাশে থাকতে হয়। আর সেই পরীক্ষায় সে বহু বছর আগেই হেরে গেছে।

*************______________________*************

কেটে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ। বাইরের পৃথিবীটা স্বাভাবিক হলেও প্রিয়ান্তি স্বাভাবিক হতে পারেনি। তার পক্ষে সেটা এত সহজও না।

এখন খান মহলেই রয়েছে প্রিয়ান্তি। সে থাকায় সৃজাও এখানেই রয়েছে। রাজন্যার সাথে বেশ ভাব হয়েছে তার।

অনেক কিছু সৃজা পুরোপুরি ভুলে যায়নি। কিন্তু শিশুমন তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

বিকেলের আলো ধীরে ধীরে খান মহলের বারান্দায় এসে পড়েছে। প্রিয়ান্তি চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পর সরফরাজ ভেতরে ঢুকল।

সারাদিনের কাজ সেরে ফিরেছে। একজন এমপি হিসেবে তার দায়িত্ব আছে, মিটিং আছে, মানুষের সমস্যা আছে। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে সে যতবার বাড়ি ফিরেছে, তার প্রথম খোঁজ ছিল একটাই, প্রিয়ান্তি।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়াল।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“বাটারফ্লাই!"

প্রিয়ান্তি মাথা তুলে তাকালো। সারফরাজ বলল,

“শরীর ঠিক আছে তো? ওষুধ খেয়েছ?"

প্রিয়ান্তি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল,

"হ্যাঁ।"

আবার নীরবতা ছেয়ে গেল। সারফরাজ দাঁড়িয়ে রইল।

প্রিয়ান্তিও আর কিছু বলল না। এই নীরবতাটা শুধু নীরবতা নয়। এটার ভেতরে জমে আছে ভয়, কষ্ট এক পাহাড় সম অভিমান। হয়তো এমন এক প্রশ্ন, যার উত্তর কারও কাছে নেই।

প্রিয়ান্তির ভেতরের এক অংশ বারবার ফিসফিস করে বলে,

"যদি সে একটু আগে আসত, যদি আর কয়েক মিনিট আগে পৌঁছাত, তাহলে কি সবকিছু অন্যরকম হতো?"

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। কিন্তু প্রশ্নগুলো থেকেই যায়।

সারফরাজ ধীরে ধীরে পাশে বসে পড়ল। সে অনুভব করতে পারছে প্রিয়ান্তির দূরত্বটা।

সারফরাজ ধীরে ধীরে তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখতে গিয়েছিল। কিন্তু প্রিয়ান্তি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঝটকা দিয়ে হাত সরিয়ে নিল। তার শ্বাসটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সে নিচু গলায় বলল,

"আমার ভালো লাগে না।"

সরফরাজ থেমে গেল। প্রিয়ান্তির চোখে জল জমছে।

"আপনার স্পর্শও ভালো লাগে না এখন। কেন এক কথা বোঝেন না?"

কথাগুলো বলেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল।

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

সারফরাজের হাতটা মাঝ আকাশেই কয়েক মুহূর্ত স্থির রইল। তারপর ধীরে ধীরে সে হাত নামিয়ে নিল। তার মুখে কষ্টের ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু সে রাগ করল না।

কারণ সে বুঝতে পারছে, এটা তার বিরুদ্ধে নয়। এটা সেই ভয়ংকর স্মৃতির বিরুদ্ধে, যা এখনও প্রিয়ান্তিকে তাড়া করে বেড়ায়।

প্রিয়ান্তি কাঁপা গলায় বলল,

"আমি চেষ্টা করি, সত্যি চেষ্টা করি স্বাভাবিক হতে কিন্তু কেউ কাছে এলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।"

তার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

"মনে হয় আবার কিছু একটা হবে।"

সারফরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। সে বলল,

“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি আর তোমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করব না। যতদিন না তুমি নিজে চাও।"

প্রিয়ান্তির চোখ কেঁপে উঠল। সরফরাজ জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,

"তোমার সময় লাগলে সময় নাও। এক মাস লাগুক, এক বছর লাগুক, আমি অপেক্ষা করব।

*************____________________***************

আবরাজ আর আদ্রিতার সম্পর্কটা ঠিক কী, সেটা বোঝা সত্যিই কঠিন। এক মুহূর্তে মনে হয় তারা একে অপরের বিপরীত মেরু। পরের মুহূর্তে মনে হয়, অদৃশ্য কোনো সুতোয় বাঁধা।

সন্ধ্যা নেমেছে ইস্তাম্বুলের আকাশে। নিজের রুমের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে আবরাজ। এক হাতে ফোন। চোয়াল শক্ত তার।

“আমি কোনো অজুহাত শুনতে চাই না, কেমাল আরসালানকে খুঁজে বের করো।”

ওপাশে কেউ কিছু বলল। আবরাজ ঠান্ডা গলায় বলল,

“কেমাল আরসালান দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলেও আমার কিছু যায় আসে না। আমি তাকে জীবিত চাই।”

কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল সে।

ঘরজুড়ে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা বিরাজ করল। ঠিক তখনই দরজার পাশে একটা উপস্থিতি টের পেল আবরাজ। মাথা ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখল, আদ্রিতা দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির নিচে জমে আছে অনেক কথা।

আবরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কিছু বলবে?”

আদ্রিতা ধীরে ধীরে ভেতরে এলো। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

“যখন নিজের কাছের কারও ওপর এমন অন্যায় হয়, তখন এত কষ্ট হয়, তাই না?”

আবরাজের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

আদ্রিতা তার চোখের দিকে তাকিয়েই বলল,

“তাহলে ভাবুন, যেসব বাবা-মা বছরের পর বছর বিচার পায় না, যাদের মেয়েরা অন্যায়ের শিকার হয়, কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না তাদের কেমন লাগে?”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আবরাজ কোনো উত্তর দিল না।

আদ্রিতা আবার বলল,

“ক্ষমতা থাকলে নিজের মানুষের জন্য সবাই লড়তে পারে। কিন্তু যাদের কেউ নেই? যাদের জন্য কোনো আবরাজ খান দাঁড়ায় না? ভাবুন তাদের কতটা কষ্ট হয়।”

আবরাজের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা ঝলক দেখা গেল। রাগ, অস্বস্তি নাকি অন্য কিছু?

সে ধীরে বলল,

“তুমি কী বলতে চাইছো?”

আদ্রিতা হাসল না। বলল,

“আমি শুধু বলছি, অন্যায়ের যন্ত্রণা সবার জন্য একই। আজ যখন কষ্টটা আপনার দরজায় এসেছে, তখন আপনি সেটা অনুভব করতে পারছেন।”

আবরাজ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখ স্থির হয়ে গেল আদ্রিতার ওপর।

“তুমি মনে করো আমি কিছু করিনি?”

আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে উওর দিলো,

“আমি মনে করি আপনারা রাজনীতিবিদরা বেশিরভাগ সময় নিজের সুবিধাটাই আগে দেখেন।”

ঘরের বাতাস একটু ভারী হয়ে উঠল।

তবুও সে থামল না।

“সাধারণ মানুষ আপনাদের কাছে ভোটের সময় গুরুত্বপূর্ণ। তারপর ধীরে ধীরে তারা শুধু সংখ্যায় পরিণত হয়।”

আবরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

আদ্রিতা শান্ত গলায় বলল,

“আপনি এই শহরের মেয়র। আপনার হাতে ক্ষমতা আছে। তবুও এই শহরে এখনও অনেক মেয়ে আছে, যারা বিচার পায়নি। অনেক পরিবার আছে, যারা বছরের পর বছর থানার দরজা ঘুরছে। অনেক অপরাধী আছে, যারা প্রভাব আর টাকার জোরে বেঁচে যাচ্ছে।”

আবরাজ চুপচাপ শুনছে। আদ্রিতা এবার আরও কাছে এগিয়ে এলো। বলল,

“আজ আপনার বোনের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে বলে, আপনি কেমাল আরসালানকে খুঁজছেন। আজ আপনি তাকে শাস্তি দিতে চান। কিন্তু যেসব মেয়ের ভাই আবরাজ খান নয়, যাদের বাবার হাতে ক্ষমতা নেই? তাদের জন্য কে লড়বে?”

আবরাজের চোখ সরু করে বলল,

“তুমি আমাকে উপদেশ দিচ্ছ?”

আদ্রিতা মাথা নেড়ে বলল,

“না। আমি শুধু একটাই কথা বলছি।”

সে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে ইস্তাম্বুলের আলো জ্বলছে।

“কেমাল আরসালানকে খুঁজে পাওয়া হয়তো কঠিন না। একজন মানুষকে শাস্তি দেওয়া কঠিন না।”

তারপর আবার আবরাজের দিকে তাকাল।

“কঠিন হলো এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করা। যেখানে আরেকটা কেমাল আরসালান জন্ম নিলেও সে ভাবতে না পারে যে পার পেয়ে যাবে।”

ঘরে নীরবতা নেমে এলো।

আদ্রিতা ধীরে বলল,

“একজন অপরাধীকে ধ্বংস করলে একটা ঘটনা শেষ হয় না। কিন্তু এমন আইন, এমন ব্যবস্থা তৈরি করুন, যেখানে হাজারটা ঘটনা শুরু হওয়ার আগেই থেমে যেতে পারে।”

আবরাজ কিছু বলল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।

আদ্রিতা শেষবার বলল,

“ক্ষমতা আসলেই বড় জিনিস, আবরাজ খান। প্রশ্ন হলো, সেটা শুধু প্রতিশোধের জন্য ব্যবহার করা হবে, নাকি এমন পরিবর্তনের জন্য, যাতে অন্য কেউ একই যন্ত্রণা না পায়।”

*************____________________***************

রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। খান মহলের বেশিরভাগ আলো নিভে গেছে। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা।

ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রাহি। হালকা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ছে। দৃষ্টি দূরের অন্ধকারে। কিন্তু তার মনটা যেন আরও অনেক দূরে।

ঠিক তখনই, পেছন থেকে দরজা খোলার শব্দ হলো।

রাহি ঘুরে তাকাল না। পদশব্দ শুনেই বুঝে গেছে কে এসেছে।

প্রয়াণ ধীরে বারান্দায় বেরিয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে বলল,

“এত রাতে বারান্দায় কেন?”

রাহি চোখ সরাল না। শান্ত গলায় বলল,

“ঘুম আসছিল না।”

প্রয়াণ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠান্ডা স্বরে বলল,

“এই বাড়িতে অনেক চোখ আছে।”

রাহি এবার ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল।

প্রয়াণের মুখ শক্ত। চোয়াল টানটান। সে আবার বলল,

“ঘরে ঢোক।”

রাহি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“তুমি কি আমার জন্য চিন্তা করছ?”

প্রয়াণের ভ্রু কুঁচকে গেল। বলল,

“অপ্রয়োজনীয় কথা বলিস না।”

রাহির ঠোঁটে ক্ষীণ একটা ক্লান্ত হাসি ফুটে উঠল। বলল,

“তাহলে কেন এত চিন্তা হচ্ছে আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি বলে?”

প্রয়াণ বিরক্ত হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি চিন্তা করছি না। কথা বাড়াস না রাহি।”

রাহি কিছুক্ষণ সরু চোখে তাকিয়ে রইল তার দিকে‌। প্রয়াণের মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা। আর কোনো কথা না বলে সে ঘরের ভেতরে চলে গেল। ঘরে ঢুকে আলমারি থেকে আরামদায়ক একটা হাঁটু সমান ঘরোয়া পোশাক বের করে পড়ে নিল। তারপর ধীরে রাজন্যার পাশে শুয়ে পড়ল। ছোট্ট মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই মায়ের দিকে একটু সরে এলো। রাহি আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

কিছুক্ষণ পর প্রয়াণও ঘরে ফিরল। হাত-মুখ ধুয়ে এসে বিছানার অন্য পাশে বসল। ঘরটা মৃদু আলোয় ভরে আছে। রাজন্যা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। আর রাহি তার পাশেই শুয়ে।

প্রয়াণ অজান্তেই কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। পোষাক টা দেখে তার ভ্রু কুঁচকে গেল। মনে হলো ইচ্ছে করেই রাহি এমন পোষাক পড়েছে।

সে রাহির পাশে শুয়ে পড়লো। একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,

"এই ড্রেসটা কেন পরেছিস?"

রাহি চোখ না খুলেই উত্তর দিল,

"এমনি। কমফোর্টেবল লাগে, তাই।"

প্রয়াণের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল। বলল,

"কমফোর্টেবল? তোর আলমারিতে কি আর কোনো কাপড় ছিল না?"

রাহি এবার মুখ ঘুরিয়ে তার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি।

"ছিল তো। কিন্তু এটা পরতে ইচ্ছে করেছে।"

প্রয়াণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে খুব ভালো করেই জানে, এই "ইচ্ছে করেছে" কথাটার পেছনে কিছু একটা আছে। বলল,

"রাহি, তুই ইচ্ছে করে আমাকে জ্বালাস, তাই না?"

রাহি মুখ গম্ভীর করে বলল,

"আমি? কখন? আমি তো ভীষণ নিরীহ মেয়ে।"

প্রয়াণ চোখ ঘুরিয়ে বলল,

"হ্যাঁ, খুব নিরীহ।"

রাহি এবার হাসিটা আর চেপে রাখতে পারল না। খিলখিল করে হেসে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে রাজন্যা একটু নড়ে উঠল। দুজনেই আবার সঙ্গে সঙ্গে চুপ করে গেল। কয়েক সেকেন্ড মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকল। রাজন্যা আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতেই রাহি ধীরে ধীরে কম্বলটা টেনে দিল।

প্রয়াণ নিচু গলায় বলল,

“দেখলি? মেয়েটাকে জাগিয়ে দিবি।"

রাহি ফিসফিস করে বলল,

"আমি জাগাইনি। তুমি জ্বালাচ্ছিলে আমায় তাই এমন হলো।"

প্রয়াণ বলল,

“দোষ আবার আমার?"

রাহি মাথা নেড়ে বলল,

“অবশ্যই। সব দোষ তোমার।"

প্রয়াণ অসহায় ভঙ্গিতে বলল,

“বউকে খুশি রাখতে গেলে তো, সকাল থেকে রাত অবধি যতোই ঝগড়া হোক, সব দোষ নিজেকে স্বীকার করতে হবে।”

#চলবে

(প্রয়াণ খান মনে হয় সংসার জীবনে প্রবেশ করছে 🙆। সারফরাজ প্রিয়ান্তির দৃশ্য আপাতত এতো অবধি রইল। পরের পর্বে থাকবে একটা বেশ বড়ো সারপ্রাইজ 😗 সারফরাজের একটা অন্যরকম দিক। এবং বাকি চরিত্র গুলো।)

#পর্ব_৩৬

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন