#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি
[ ⚠️ Content Warning: এই পর্বে নির্মম প্রতিশোধ ও গ্রাফিক সহিংসতার বর্ণনা রয়েছে। তাই সংবেদনশীল পাঠকদের নিজস্ব বিবেচনায় পড়ার অনুরোধ রইল। ]
গুদামঘরের ভেতরটা অস্বাভাবিক ভাবে নীরব। এমির এতোদিন ধরে একটা নর্দমার কী"টের মতো এখানেই পড়ে ছিলো। আজ তার সামনে বসে আছে সারফরাজ আহমেদ।
সারফরাজ নীচু গলায় বলল,
“তোকে আমি ওয়ার্নিং দিয়েছিলাম আর সেই অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তুই আমার সানসাইনের শরীরে হাত দিলি। সঙ্গে আমার ব্লাটারফ্লাই কে ধ/র্ষ/ণ করলি।”
এমিরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। কোনো কথা বেরোচ্ছে না। সারফরাজ একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তোকে আমি একেবারে মা*র'ব না এমির। তোকে ধীরে ধীরে মা*র*বো।
এমিরের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার চোখে এখন আর আগের সেই উদ্ধত ভাব নেই। শুধু আতঙ্ক।
কাঁপা গলায় সে বলল,
"আমার ভুল হয়ে গেছে... প্লিজ... আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আর কখনও।"
"চুপ।"
সারফরাজের একটা শব্দেই সে থেমে গেল।
গুদামঘরের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"ভুল? তুই এটাকে ভুল বলছিস?"
তার গলা অস্বাভাবিক শান্ত। কিন্তু সেই শান্তির নিচে জমে আছে আগ্নেয়গিরির মতো ক্রোধ।
"আমার পাঁচ বছরের বাচ্চাটার কী দোষ ছিল, এমির?"
এমির মাথা নিচু করে ফেলল। সারফরাজ এগিয়ে এল।
"ও তোকে চিনত না। তোর কোনো ক্ষতিও করেনি। তবুও তুই ওর জীবনে এমন একটা ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিস, যেটার সঙ্গে ওকে চিরদিন লড়তে হবে।"
এমিরের ঠোঁট কাঁপছে।
"আমি... আমি.... "
সারফরাজ থামিয়ে দিল।
"আজ তোর ব্যাখ্যা শোনার জন্য আমি এখানে আসিনি। তোকে নিজের হাতে শেষ করতে এসেছি।”
সে গভীর শ্বাস নিল। প্রিয়ান্তির কান্নাভেজা মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। সৃজার আতঙ্কিত চোখও।তার মুঠো শক্ত হয়ে গেল।
টেবিলের পাশে রাখা আছে বেশ কিছু জিনিস। একটা বড়ো চেইনসো (Chainsaw) [ গাছ কাটার মতো বড় কাটার ]। এছাড়াও রয়েছে কিউটিকল নিপার। একটা মোটা দড়ি আর চকচকে ধারালো ছু"রি।
সারফরাজ হঠাৎই এমিরের হাত দুটো ধরল। বলল,
“তুই তোর এই হাত দিয়ে আমার বাটারফ্লাই আর সানসাইন কে স্পর্শ করেছিস, তাই তো!”
সে দড়িটা তুলে নিয়ে শক্ত করে এমিরের হাতটা বেঁধে দিলো। এমির মাথা নাড়ছে বারবার।
সারফরাজ ওর জামাটা টে"নে ছিঁ*ড়ে খুলে দিলো। তারপর হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ধারালো ছু*রি/টা তুলে নিলো। বলল,
“আজ আমি শিকারী আর তুই আমার বিশেষ শিকার।”
সারফরাজের চোখ দুটোয় আজ ভয়ংকর অন্ধকার জমে আছে। নিজের মধ্যে সে নেই আজ। এক প্রতিশোধের খেলায় আজ সে উন্মাদ হয়ে উঠেছে।
এমিরের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। এমির কাঁপা গলায় বলল,
"আমাকে পুলিশের হাতে তুলে দিন।"
সারফরাজ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর তিক্ত হেসে বলল,
“তোর আইন তোর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে।”
সারফরাজ এমির কে দেয়ালে ঠেসে দিয়ে দাঁড় করালো। তারপর ধীরে ধীরে ছুরির ধারটা এমিরের পিঠের ওপর টেনে একের পর এক দাগ কেটে যেতে লাগল। প্রতিটি দাগ যেন শুধু শরীরে নয়, তার মনে ভয় আর অসহায়তার ছাপও গভীর করে দিচ্ছিল। ঘরের নীরবতার মধ্যে এমিরের কষ্টভরা শ্বাসের শব্দই শুধু শোনা যাচ্ছিল, আর সারফরাজের মুখে ছিল অস্বাভাবিক শান্ত এক অভিব্যক্তি।
এমিরের পিঠ থেকে র/ক্তে*র ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে। সারফরাজ কোনো গভীর আঘাও দিচ্ছে না তাকে। বরং একটার পর একটা দাগ কেটে চলেছে। অবশেষে দশ মিনিট পর সারফরাজ থেমে গেল। এমির কে ছেড়ে দিলো।
এমিরের শরীরটা ধপ করে সেখানেই বসে পড়লো। সারফরাজ আবার টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে রাখা কিউটিকল নিপারটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলো।
এমির প্রথমে খেয়াল করিনি। তবে সামনে তাকাতেই দেখলো সারফরাজ তার দিকে এগিয়ে এসেছে। হাতে সেই কাঙ্খিত বস্তুটা।
এমির বলল,
“আমায় একেবারে মে"*রে ফেলুন প্লিজ।”
সারফরাজ অস্বাভাবিক শান্ত। সে ঝুঁকে বসল। তারপর এমিরের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। কিউটিকল নিপারটা দিয়ে একটা একটা করে প্রত্যেকটা আঙ্গুলের চামড়া কা/ট*তে লাগল। এমির যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তার চিৎকার পুরো ঘরটার মধ্যে প্রতিধ্বনি তুলল।
তবে সারফরাজ মন দিয়ে এমিরের প্রত্যেকটা আঙ্গুলের চামড়া অর্ধেক করে কেটে দিতে লাগল। তার হাতে লেগে রয়েছে এমির নামক জা"নো*য়া"র টার র*ক্ত। এমিরের চিৎকার যেন তার কানে এসেও পৌঁছাচ্ছে না।
একটা সময় ধীরে ধীরে চারপাশটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। এমিরের শ্বাস টা খুব ধীরে ধীরে চলছে। সারফরাজ একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, যেন ভাবছে এরপর কি করবে।
সারফরাজ বলল,
“খুব মজা লাগছে তো এখন তাই না? কী, আরো মজা চাস তো তুই! তাই না? আজ সব মজা একেবারে দেবো তোকে।”
সারফরাজ বিকৃত হেসে এবার হাতে নিল চেইনসো। এমির ভয়ে গুটিয়ে গেলো। সারফরাজ মাথা কাত করে বলল,
“প্রথমে তোর হাতটা পিস পিস করে কা/ট/বো! এই হাত দিয়েই তো তুই আমার বাটারফ্লাইয়ের শরীরে স্পর্শ করেছিলিস।”
সারফরাজ এমনি এমনি বলে নি। সত্যি সে এগিয়ে আসলো মেশিনটা চালু করে কোনো বার্তা ছাড়াই চালিয়ে দিলো এমিরের হাতের মধ্যে। মুহূর্তেই তার হাতের একটা অংশ শরীর থেকে আলাদা হয়ে গেল। এমির থমকে রইল। শ্বাসপ্রশ্বাস পড়ছে কি না, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এটা করেও সারফরাজ থামল না। সে এমিরের ওই হাতটাকে দু-টুকরো করে ফেলল। এমিরের শরীরের সব র/ক্ত বেরিয়ে আসছে। সারফরাজের জামা সম্পূর্ণ র/ক্তা*ক্ত। সারফরাজ আবার তাকালো তার দিয়ে বলল,
“এই হাত দিয়ে তুই আমার বাটারফ্লাইয়ের চুল স্পর্শ করেছিলিস তাই না?"
কথাটা বলেই সেই হাতটাও এক কো"পে আলাদা করলো দেহ থেকে।
কী অদ্ভুত এক দৃশ্য। এমন সারফরাজ কে কি আসলেও কেউ চেনে? তার জামায় র/ক্তের দাগ লেগে আছে, কিন্তু সে যেন সেগুলো দেখছেই না। আজ তার ভেতরের মানুষটা কোথাও হারিয়ে গেছে। একজন বাবা, একজন স্বামী, একজন নেতা সব পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে আজ প্রতিশোধ নামক এক অভিশাপ। তার চোখে আজ কোনো দ্বিধা নেই। কোনো করুণা নেই। কোনো ক্ষমাও নেই।
বাইরে ইস্তাম্বুলের রাত যত গভীর হচ্ছে, গুদামঘরের ভেতরের নীরবতাও তত ভারী হয়ে উঠছে। এমিরের প্রাণপাখি টা যেন আর থাকতে চাইছে না। তবে সারফরাজ এতো সহজে তার মৃ*ত্যু দিচ্ছে না।
এমির একধারে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে। সারফরাজ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোনো আবেগ নেই। চোখ দুটো অস্বাভাবিক স্থির। যেন সে শুধু এমিরকে দেখছে না, তার সামনে ভেসে উঠছে অন্য কিছু স্মৃতি। সৃজার আতঙ্কিত মুখ। প্রিয়ান্তির অসহায় আর্তনাদ।
ঠিক তখনই, ভারী দরজাটা ধীরে খুলে গেল। বাইরে থেকে ঠান্ডা বাতাসের একটা ঝাপটা ভেতরে ঢুকে পড়ল।
দরজার দিকে তাকাতেই দেখা গেল জায়েদ ভেতরে প্রবেশ করছে। তার দু'হাতে দুটো নেকড়ের মোটা বেল্ট ধরা। প্রাণী দুটো আকারে বেশ বড়। ধূসর-কালো লোমে ঢাকা শরীর। তীক্ষ্ণ চোখদুটো চারপাশ পর্যবেক্ষণ করছে। তারা অস্থির নয়, বরং অস্বাভাবিকভাবে শান্ত।
জায়েদ বলল,
“আপনি যেমন বলেছিলেন, তেমনই এনেছি।”
সারফরাজ নেকড়ের দুটোর দিকে গভীর চোখে তাকালো। তারপর এগিয়ে এসে শক্ত করে তাদের বেল্টটা নিজের হাতে জড়িয়ে নিলো।
সামনে এগিয়ে এনে এমিরের কে*টে দেওয়া দুটো হাত তাদের ক্ষুধা নিবারণের জন্য দিয়ে দিল। নেকড়ে দুটো সেটা পেয়ে হিংস্র হয়ে উঠল। এমির মনে মনে মৃত্যু কে স্মরণ করেছে।
সারফরাজ আবার মেশিনটা চালু করলো। বলল,
“এবার তোর একটা, একটা অংশ পিস পিস করে কাটবো।”
সত্যি সে সেটাই করলো। চেইনসো দিয়ে প্রথমে তার পা দুটো আলাদা করলো। এরপর ধীরে ধীরে একটা একটা অংশ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলল। সারফরাজের মুখে সেই র*ক্ত এসে পড়ছে। সারা ঘরে এক র*ক্তের নদী তৈরি হয়েছে।
জায়েদ অনেক বছর পর সারফরাজের এই নৃশংস রূপটা দেখল। কেউ বিশ্বাস করতে পারবে না, যে এই মানুষটাই সেই শান্ত সারফরাজ আহমেদ। অবশেষে নেকড়ে দুটো কে সেই খন্ডাংশ দেহের সামনে উপস্থিত করলো।
নেকড়ে দুটোর চোখ ক্ষুধার্ত হয়ে উঠেছে। তারা ভালো করে চারিদিক টা শুঁকে নিলো। তারপরই ঝাঁপিয়ে পড়ল এমিরের শরীরের খন্ডাংশের ওপর। তাদের ধারালো এবং লম্বা ক্যানাইন (Canine) দাঁতগুলো মাংসের ভেতরে গেঁথে গেলো। তারা শরীরের বড়ো টুকরো গুলোর বিভিন্ন অংশ কা"ম"ড়ে ধরে বিপরীত দিকে প্রচণ্ড শক্তিতে টান দিতে শুরু করল। চামড়া ও মাংস ছিঁড়ে যাওয়ার এক ভয়ংকর শব্দে নীরবতায় ফাটল ধরল।
একটা নেকড়ে সবচেয়ে নরম অংশগুলো টেনে বের করল। সে চিবানোর কোনো চেষ্টা না করেই মাংসের পি"ণ্ড"গুলো সরাসরি গিলে ফেলছে। অন্য নেকড়েটা মৃ"ত"দে"হের শক্ত হাড় নিজের শক্তিশালী চোয়ালের নিচে চেপে ধরল। মটমট শব্দে হা"ড়"টি ভেঙে গেল এবং সে ভেতরের পুষ্টিকর মজ্জা চাটতে শুরু করে। কাঁচা মাংস আর চামড়া ছেঁড়ার একটা চটচটে, বীভৎস শব্দ ('রপ-রপ') হতে লাগল।
নেকড়ে দুটোর পুরো মুখ, নাক আর ধূসর পশম র*ক্তে ভিজে লাল হয়ে গেছে। সে গোগ্রাসে মাংস গিলছে। ক্ষিদের চোটে চিবানোর সময় তার মুখ থেকে লালা আর র"ক্ত মিশে মাটিতে টপটপ করে পড়ছে। তৃপ্তি আর ক্রূরতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ তাদের চোখে।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর, তারা নিজেদের মুখ মাটিতে ঘষে পরিষ্কার করে নিল। বিড়ালের মতো নিজের থাবা এবং পশম জিব দিয়ে চেটে পরিষ্কার করল। এরপর তৃপ্তির এক মৃদু গর্জন দিল।
সারফরাজ পুরো সময়টা তৃপ্তি সহকারে সেই দৃশ্যটা নিজের মস্তিষ্ক বন্দি করে নিলো। তার র"*ক্ত"মা*খা মুখে ফুটে ওঠা হাসিটাও ভীষণ রকমের ভয়ংকর লাগছে।
জায়েদ কে ইরাশা করলো নেকড়ে দুটো কে নিয়ে চলে যেতে। জায়েদ সেটাই করলো।
ঘরটা আবার নীরব হয়ে এলো। সারফরাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“এরপর কেমাল আরসালানের পালা।”
************________________________************
রাত তখন প্রায় আড়াইটে। খান মহলের করিডরগুলো নিস্তব্ধ। চারপাশে এমন নীরবতা, যেন পুরো বাড়িটাই গভীর ঘুমে ডুবে আছে।
সারফরাজ ধীরে ধীরে প্রিয়ন্তীর ঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। ঘরের মৃদু আলোয় দেখা গেল প্রিয়ন্তী আর সৃজা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। কিছুক্ষণ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না।
এক মুহূর্ত পর সে নিঃশব্দে ওয়াশরুমে চলে গেল। অনেকক্ষণ ধরে মুখে পানি দিল, হাত ধুল, তারপর পরিষ্কার জামা-ট্রাউজার পরে বেরিয়ে এল।
ঘরে ফিরে আবার একবার তাকাল দু'জনের দিকে। সৃজা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। প্রিয়ন্তীর মুখে ক্লান্তির এক শান্ত ছাপ।
সারফরাজ ধীরে ধীরে বিছানার পাশে বসে পড়ল। কয়েক সেকেন্ড নীরবে তাকিয়ে থেকে আলতো করে প্রিয়ন্তীর কপালে একটি চুমু দিল। স্পর্শটা এতটাই কোমল ছিল যে কেউ দেখলে বিশ্বাসই করত না, এই মানুষটাই কিছুক্ষণ আগে নৃশংস ভাবে কাউকে খুন করেছে।
প্রিয়ন্তী ঘুমের মধ্যেই সামান্য নড়ে উঠল অবচেতনভাবেই তার হাতটা সারফরাজের হাতের ওপর এসে থামল।
সারফরাজ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে পাশে শুয়ে পড়ল। মনে মনে বলল,
“আমায় বাটারফ্লাই আর সানসাইনের ওপর আর কোনো কালো ছায়া আসতে পারবে না।”
************________________________************
সকাল।
ইস্তানবুলের আকাশ আজ একদম পরিষ্কার। বসফরাসের জলরাশির ওপর সকালের সোনালি আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। এপ্রিলের নরম বাতাস জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছে। কোথাও কোথাও সীগাল উড়ছে, তাদের ডাক মিশে যাচ্ছে শহরের ধীরে জেগে ওঠা কোলাহলে।
খান মহলের বাগানেও সকাল নেমে এসেছে। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে। কিন্তু এই শান্ত সকালের ছোঁয়া সবাইকে ছুঁতে পারল না।
আজ থেকে আদ্রিতার ডাক্তারির চতুর্থ বর্ষের ক্লাস শুরু হওয়ায় ৪টার দিকে সে কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে।
ঘরের মধ্যে আবরাজ সম্পূর্ণ তৈরি। আজ ফাতিহ পরির্দশনের জন্য তাকে যেতে হবে। পরণে সাদা পাঞ্জাবি সঙ্গে পাজামা। ড্রয়ার খুলে নিজের হাতঘড়িটা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল একটা ছোট্ট ওষুধের স্ট্রিপে। সে ভ্রু কুঁচকে সেটাকে হাতে তুলে নিল।
এক-দুবার উল্টে পাল্টে দেখল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। এটা গর্ভনিরোধক ওষুধ।
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
আবরাজের মুখের ভাব মুহূর্তে বদলে গেল। সে স্থির চোখে স্ট্রিপটার দিকে তাকিয়ে রইল।
আদ্রিতা মেডিকেলের ছাত্রী। সে জানে কী খায়, কেন খায়, কীভাবে খায়। এই ব্যাপারে ভুল বোঝাবুঝির কোনো সুযোগ নেই।
সেটাই যেন আবরাজের বিরক্তি আরও বাড়িয়ে দিল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরছে। কিন্তু রাগ দেখানো আর রাগ ব্যবহার করা, দুটো আলাদা জিনিস। আবরাজ খান সেটা ভালো করেই জানে। সে গভীর একটা শ্বাস নিল।
তারপর ধীরে স্ট্রিপটা ড্রয়ারে ফিরিয়ে রাখল।
কয়েক মুহূর্ত আগে যে ঝড়টা মাথার ভেতর উঠেছিল,
সেটাকে নিজের ভেতরেই জোর করেই চেপে রাখল।
আলমারি খুলে নিজের কালো সানগ্লাসটা বের করল।ঘড়িটা হাতে পরল। কুর্তার হাতা ঠিক করল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখল।
বাইরে থেকে তাকে দেখে কেউ বুঝবে না, কয়েক মিনিট আগেও তার মেজাজ কতটা খারাপ ছিল।
মুখে আবার সেই পরিচিত নির্লিপ্ত ভাব ফিরে এসেছে।
দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে এক মুহূর্ত থামল। তার চোখে আবার সেই ঠান্ডা হিসেবি দৃষ্টি ফুটে উঠল।
সে নিচু স্বরে নিজেই বলল,
“লিটিল স্পার্ক, তুমি আমাকে যতটা সহজ ভাবছো, আমি ততটা সহজ না।”
তারপর দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
ইস্তানবুলের ঐতিহাসিক অংশগুলোর মধ্যে ফাতিহ অন্যতম। সরু পাথরের রাস্তা, শত বছরের পুরোনো ভবন, ছোট ছোট দোকান, মসজিদের মিনার আর দূরে বসফরাসের বাতাস সব মিলিয়ে জায়গাটার আলাদা একটা চরিত্র আছে।
আজকের পুরো দিনটাই সেখানে কাটিয়েছে আবরাজ খান। তার সঙ্গে ছিল প্রয়াণ খান, মিনহাজ আলি এবং ফাতিহ জেলার বর্তমান মেয়র অরিন্দম চৌধুরী।
কালো রঙের গাড়ির বহর একের পর এক জায়গা ঘুরে দেখছে। কোথাও রাস্তার অবস্থা খারাপ। কোথাও পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্রায় অচল। আবার কিছু এলাকায় ঐতিহাসিক ভবনগুলো ভেঙে পড়ার অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
একটা পুরোনো চত্বরে এসে থামলো তারা। আবরাজ চারপাশে তাকিয়ে দেখলো একবার। সামনের ভবনের দেয়ালে ফাটল। রঙ উঠে গেছে। পর্যটক আসে ঠিকই, কিন্তু জায়গাটার যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না।
আবরাজ ধীরে বলল,
“এখানে সম্পূর্ণ রেনোভেশন লাগবে।”
মিনহাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“জি, ভাই।”
আরিন্দাম মাথা নেড়ে বললেন,
“ফান্ডের ব্যবস্থা হলে কাজ শুরু করা যাবে।”
আবরাজ সানগ্লাসের আড়াল থেকে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ফান্ড আমি বের করব। কিন্তু কাজ অর্ধেক হলে চলবে না।”
তার কণ্ঠ শান্ত।
“ফাতিহের প্রতিটা জায়গা এমন হতে হবে যেন মানুষ দেখেই বুঝতে পারে, শহরটা জীবন্ত রয়েছে।”
প্রয়াণ পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বিরক্ত মুখে চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“এই বিল্ডিংটা ভেঙে নতুন বানিয়ে দিলেই তো হয়।”
আরিন্দাম সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললেন,
“না। এগুলো ঐতিহাসিক স্থাপনা। ভাঙা যাবে না।”
প্রয়াণ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“তাহলে টাকা বেশি লাগবে।”
মিনহাজ শান্ত গলায় বলল,
“কিন্তু রাজনৈতিক লাভও বেশি হবে।”
প্রয়াণ এবার তাকাল মিনহাজের দিকে। বলল,
“হুম, ঠিক বলেছিস।”
আবরাজ কিছু বলল না।
সে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভবনটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মাথার ভেতরে ইতিমধ্যেই হিসেব শুরু হয়ে গেছে।কোন এলাকায় কত টাকা লাগবে। কোথায় নতুন রাস্তা হবে। কোথায় সংস্কারের নামে নিজের প্রভাব আরও শক্ত করা যাবে।
কিছুক্ষণ পর আবরাজ শুধু বলল,
“খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হবে।”
________________*****************_______________
বিকেল প্রায় পাঁচটা।
ইস্তানবুলের প্রশাসনিক ভবন
Istanbul Metropolitan Municipality Building -এর একটি ব্যক্তিগত বৈঠক কক্ষ।
বাইরে সাংবাদিক, কর্মকর্তা আর নিরাপত্তারক্ষীদের ব্যস্ততা। কিন্তু ভেতরের ঘরটা সম্পূর্ণ নীরব।
দীর্ঘ টেবিলের একপাশে বসে আছে আবরাজ খান। তার সামনে খোলা কয়েকটা ফাইল। হাতে একটি কলম। চোখে সেই পরিচিত ঠান্ডা স্থিরতা।
ডান পাশে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে মিনহাজ। প্রয়াণও আছে ঘরে, তবে চুপচাপ বসে পর্যবেক্ষণ করছে।
টেবিলের অপর পাশে বসে আছে মুরাট দেমির। সে PRU দলের এক জেলার মেয়র। ঘরের বাতাসে অদৃশ্য উত্তেজনা ভেসে বেড়াচ্ছে।
মুরাত ডেমির ধীরে সামনে ঝুঁকে বলল,
“আপনি আমাকে এখানে ডেকেছেন নিশ্চয়ই শুধু সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য না।”
আবরাজ ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টানল।
“আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, মিস্টার ডেমির। তাই অপ্রয়োজনীয় কথা বলে সময় নষ্ট করবো না।”
মুরাত দেমিরের মুখের পেশীগুলো এক মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে এই ঘরে তাকে শুধু আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তাকে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রয়াণ ধীরে ধীরে উঠে এসে টেবিলের পাশের একটা চেয়ার টেনে বসল। তার ঠোঁটে সেই চেনা, অস্বস্তিকর হাসি।
“কেমাল আরসালান বোধহয় আপনাকে খুব একটা খুশি রাখতে পারছে না, তাই না?”
মুরাত কিছু বলল না।
প্রয়াণ টেবিলের ওপর আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল,
“দেখুন না, এত বছর দলের জন্য কাজ করলেন। আর শেষ পর্যন্ত আপনাকে বানানো হলো শুধু আদলার (Adalar) জেলার মেয়র।”
তার কণ্ঠে বিদ্রূপ স্পষ্ট। সে সামান্য ঝুঁকে এসে বলল,
“ইস্তানবুলের সবচেয়ে ছোট জেলাগুলোর একটা। অথচ আপনার দলের অন্য লোকগুলোর হাতে কত ক্ষমতা।”
ঘরের বাতাস আরও ভারী হয়ে উঠল। মুরাতের গলায় যেন কিছু আটকে গেল। সে ধীরে এক ঢোক গিলল।
মিনহাজ চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে।
আবরাজ অবশ্য একটুও তাড়াহুড়ো করল না।
সে কলমটা টেবিলে রেখে মুরাতের দিকে তাকাল।
তার ঠোঁটে মৃদু হাসি। সে ধীরে ধীরে বলল,
“সুতরাং, আপনি কি মনে করেন না যে আপনার যোগ্যতা এর চেয়ে অনেক বেশি?”
মুরাত এবার সরাসরি আবরাজের দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না। আবরাজ সেই নীরবতাকে ভাঙল না। কারণ সে জানে, অনেক সময় মানুষ নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা নিজে মুখে স্বীকার করার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করাই সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
অবশেষে মুরাত ধীরে বলল,
“রাজনীতিতে যোগ্যতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও আছে, মিস্টার খান।”
প্রয়াণ হেসে ফেলল।
“হ্যাঁ। আনুগত্য।”
“আর ক্ষমতা।” শান্ত গলায় যোগ করল মিনহাজ।
আবরাজ মাথা সামান্য কাত করে বলল,
“কিন্তু আনুগত্যেরও একটা মূল্য থাকে, তাই না মিস্টার দেমির।”
সে সামনে রাখা ফাইলটা ধীরে মুরাতের দিকে ঠেলে দিয়ে বলল,
“আর আমি সবসময় ন্যায্য মূল্য দিতে পছন্দ করি।”
#চলবে
#পর্ব_৩৭
#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি