ফন্ট সাইজ:
থিম:
রাজনীতির রক্তচুক্তি

৩৮তম পর্ব

লেখক: নীলপ্রজাপতি

#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #রাজনীতির_রক্তচুক্তি

মুরাতের চোখ নিচে নামল, ফাইলটার দিকে। তারপর আবার আবরাজের দিকে উঠল। সে এখনো ফাইল খোলেনি। কিন্তু তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, কৌতূহল ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে।

প্রয়াণ চেয়ারে হেলান দিল। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি।

কারণ সে জানে, আবরাজ কখনো কাউকে সরাসরি কিনতে যায় না। সে আগে মানুষকে বুঝিয়ে দেয়, তারা নিজেদের বর্তমান অবস্থানের চেয়ে অনেক বেশি পাওয়ার যোগ্য। আর তারপরই শুরু হয় আসল খেলা।

মুরাত দেমির কয়েক সেকেন্ড ফাইলটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে সেটাকে নিজের দিকে টেনে নিল কিন্তু খুলল না। বরং আবরাজের চোখে চোখ রেখে বলল,

“আপনি ভুল মানুষ বেছে নিয়েছেন, মেয়র সাহেব।”

ঘরের পরিবেশ এক মুহূর্তে বদলে গেল। প্রয়াণের ঠোঁটের হাসিটা একটু চওড়া হলো। মিনহাজও মাথা সামান্য তুলে তাকালো। আবরাজ অবশ্য আগের মতোই শান্ত।

মুরাত এবার চেয়ারে সোজা হয়ে বসল। আত্মবিশ্বাসী কন্ঠে বলল,

“আমি জানি আপনি কী করতে চাইছেন। দলের ভেতরে বিভাজন তৈরি করতে চাইছেন। মানুষ কিনতে চাইছেন। ক্ষমতা বাড়াতে চাইছেন।”

প্রয়াণ হেসে বলল,

“রাজনীতিতে নতুন নাকি আপনি?”

মুরাত এবার তাকে উপেক্ষা করল। তার দৃষ্টি স্থির আবরাজের ওপর। সে ধীরে বলল,

“আপনি হয়তো ভাবছেন সবাইকে কেনা যায়। কিন্তু সবাই বিক্রি হয় না।”

আবরাজ শুধু তাকিয়ে রইল। চোখে কোনো রাগ নেই।

কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। এটাই মুরাতকে আরও অস্বস্তিতে ফেলল। কারণ সে আশা করেছিল, আবরাজ হয়তো রেগে যাবে। অথবা চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না।

আবরাজ ধীরে হাত দুটো জোড়া করল।

“শেষ?”

মুরাত ভ্রু কুঁচকে বলল,

“মানে?”

আবরাজ হালকা হেসে বলল,

“আপনার বক্তৃতা শেষ?”

প্রয়াণ এবার মুখ ফিরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল।

মুরাতের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

আবরাজ ধীরে সামনে ঝুঁকে এসে বলল,

“মিস্টার ডেমির, আপনি ভাবছেন আমাকে এক্সপোজ করবেন।”

কথাটা শুনে মুরাতের চোখ মুহূর্তে বড় হয়ে গেল। আবরাজ শান্ত স্বরে বলল,

“অবাক হবেন না। আপনার মতো মানুষ কী ভাবতে পারে, সেটা আন্দাজ করা খুব কঠিন না।”

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ঠান্ডা হয়ে গেল। আবরাজের চোখে সেই পরিচিত অন্ধকার ঝলক ফুটে উঠল। বলল,

“একটা জিনিস মনে রাখবেন। দাবার বোর্ডে যে খেলোয়াড় পাঁচ চাল দেখে, তার বিরুদ্ধে এক চাল নিয়ে বসলে সাধারণত ফল ভালো হয় না।”

মুরাত দেমির ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সে বুঝতে পারছে না, এই মানুষটা ঠিক কী বলতে চাইছে।

প্রয়াণ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,

“খুব ভুল করলেন, মিস্টার দেমির। এত সুন্দর অফার ফিরিয়ে দিয়ে।”

কথাটা বলেই সে নিজের জ্যাকেটের ভিতরে হাত ঢোকল। মুরাতের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

পরের মুহূর্তেই, একটা পিস্তল বের করল প্রয়াণ।

মুরাতের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সে ভাবল, এবার বন্দুকটা তার দিকেই উঠবে কিন্তু পরের ঘটনাটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।

প্রয়াণ বন্দুক বের করল। আর কোনো সতর্কতা ছাড়াই,

ঠা*স!

শব্দটা পুরো ঘরে প্রতিধ্বনিত হলো। মুরাত চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। গু*লির শব্দে পুরো ঘর কেঁপে উঠল।

মুরাতের চোখ বিস্ফারিত। কিন্তু গু*লিটা তার দিকে যায়নি।

সেটা আবরাজের হাতে লেগেছে। আবরাজ সঙ্গে সঙ্গে

চেয়ার থেকে পিছিয়ে গেল। তার সাদা পোশাকে র*ক্তের দাগ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল। এক মুহূর্তের জন্য পুরো ঘর স্তব্ধ হয়ে গেল।

কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, আবরাজের মুখের ভাব একটুও বদলাল না। সে শুধু নিজের হাতের দিকে একবার তাকাল। তারপর ধীরে মাথা তুলে প্রয়াণের দিকে তাকাল।

প্রয়াণ নির্বিকার, যেন কিছুই হয়নি। সে পিস্তলটা ছুড়ে দিল মুরাতের সামনে।

মুরাত সম্পূর্ণ স্তব্ধ।

“এ... এটা কী?”

সে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও থেমে গেল।

মিনহাজ সামনে এগিয়ে এল। তার মুখে আতঙ্কের অভিনয়। আবরাজের কাঁধ ধরে বলল,

“ভাই আপনার হাত থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।”

সে অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে মুরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মিস্টার দেমির! আপনি মেয়রকে গুলি করলেন?”

মুরাতের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

“না! আমি কিছু করিনি।”

প্রয়াণ ইতিমধ্যেই আবরাজের পাশে হাঁটু গেড়ে বসেছে।

তার হাতে আবরাজের আহত হাত।

“ভাই! ভাই! তুমি ঠিক আছো?”

আবরাজ মুখ শক্ত করে বসে আছে। তার চোখে আতঙ্কের লেশমাত্র নেই। বরং অদ্ভুত শান্ত।

ঠিক তখনই, দরজা ধাক্কা মেরে খুলে একদল পুলিশ ভেতরে ঢুকে পড়ল। যেন তারা আগেই প্রস্তুত ছিল।

সামনের অফিসার গম্ভীর গলায় বলল,

“মুরাত দেমির, আপনাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।”

মুরাত দেমিরের মুখ থেকে যেন সব রক্ত সরে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের সামনে থাকা বন্দুকটার দিকে। কাঁপা কন্ঠে বলল,

“না... না... আমি কিছু করিনি! আমি বন্দুক ছুঁইওনি! আপনারা ভুল করছেন!”

অফিসার তার সামনে পড়ে থাকা পিস্তলের দিকে ইশারা করে বলল,

“আপনি মেয়র আবরাজ খানকে গুলি করেছেন।”

মুরাত হাত নাড়তে নাড়তে বলল,

“না! আমি করিনি! এটা ফাঁদ!”

কিন্তু তার কথা কেউ শুনল না। দুইজন অফিসার তার হাত ধরে ফেলল।

মুরাত ছটফট করতে লাগল। মরিয়া হয়ে আবরাজের দিকে তাকাল। বলল,

“আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে! আমি নির্দোষ! মিস্টার খান! আপনি বলুন! আপনি জানেন আমি করিনি!”

আবরাজ ধীরে মাথা তুলল। তার চোখে ক্লান্তি। ব্যথা।

আর এমন এক নির্লিপ্ত দৃষ্টি, যা দেখে মুরাতের বুক ঠান্ডা হয়ে গেল। আবরাজ একটা শব্দও না বলল না।

মুরাতের কণ্ঠ ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল।করিডোরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো তাকে।

দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই প্রয়াণের মুখের উদ্বিগ্ন ভাবটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটল। মিনহাজও চুপচাপ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।

আবরাজ নিজের হাতের দিকে একবার তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

“রাজনীতিতে সত্য গুরুত্বপূর্ণ না। মানুষ কী বিশ্বাস করে, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রয়াণ হেসে মাথা নেড়ে বলল,

“অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস মানুষকে অন্ধ করে দেয়।”

মিনহাজ ধীরে বলল,

“PRU দলের একজন জেলা মেয়র আজ রাতের মধ্যেই খবরের শিরোনাম হয়ে যাবে।”

আবরাজ উঠে দাঁড়াল। ব্যথা আছে। কিন্তু তার মুখে সেটার কোনো প্রভাব নেই। জানালার বাইরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ইস্তানবুলের আলো একে একে জ্বলছে।

আর ঘরের ভেতর তিনজন মানুষের মুখে ধীরে ধীরে একই ধরনের ঠান্ডা, হিসেবি হাসি ফুটে উঠল।

কারণ তারা জানে, এটা কোনো সমাপ্তি নয়। এটা মাত্র পরবর্তী চালের শুরু।

মিনহাজ একটা ফার্স্ট-এইড বক্স এনে টেবিলের ওপর রাখল। বলল,

“হাতটা দিন, ভাই।”

আবরাজ কিছু বলল না। সে চুপচাপ চেয়ারে বসে আহত হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিল।

মিনহাজ দক্ষ হাতে ক্ষত পরিষ্কার করতে লাগল। গুলিটা হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে। রক্তপাত হয়েছে, কিন্তু প্রাণঘাতী কিছু না।

প্রয়াণ পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। চোখে এখনো সেই সন্তুষ্টির ছাপ নিয়ে বলল,

“পারফেক্ট শট ছিল।”

মিনহাজ ভ্রু তুলে বলল,

“তুমি আরেক ইঞ্চি এদিক-ওদিক করলে সমস্যা হয়ে যেত।”

প্রয়াণ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,

“আমার টার্গেট কখনো ভুল হয় না।”

আবরাজ তাদের কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দিল না।

মিনহাজ ব্যান্ডেজ শেষ করে বলল,

“হয়ে গেছে।”

আবরাজ মাথা নাড়ল। ইতিমধ্যে পুরো ভবনজুড়ে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়েছে। করিডোরে পুলিশ ঘুরছে। প্রবেশপথে অতিরিক্ত চেকপয়েন্ট।

সংবাদমাধ্যমের কাছে খবর পৌঁছে গেছে,

“PRU -দলের আদলার (Adalar) জেলার মেয়র মুরাত দেমির ইস্তাম্বুলের মেয়র আবরাজ খানের ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছে।”

ঘটনাটা স্বাভাবিকভাবেই শহরজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে।

প্রয়াণ সোফায় বসে হালকা হেসে বলল,

“এখন সবাই কেমালের দলের দিকে আঙুল তুলবে।”

আবরাজ এবার ফোনটা হাতে তুলে নিল। স্ক্রিনে একটা নাম ভেসে উঠল। সারফরাজ।

কলটা সংযোগ হতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠ শোনা গেল।

“কি, হলো?”

আবরাজ শান্ত স্বরে বলল,

“কাজ হয়ে গেছে। এবার কেমাল আরসালান নিজে থেকেই গর্ত থেকে বেরিয়ে আসবে।”

প্রয়াণ হেসে ফেলল। বলল,

“চাপ সহ্য করতে পারবে না।”

আবরাজ জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে চিন্তার ছায়া। সে নিচু স্বরে বলল,

“আমি মুরাত দেমিরকে চাইনি। আমি চাই কেমাল নড়ে উঠুক।”

ঘরে আবার নীরবতা নেমে এলো।

মিনহাজ বলল,

“তাহলে পরের ধাপ?”

আবরাজ কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করল। তারপর বলল,

“অপেক্ষা। কারণ কখনও কখনও সবচেয়ে শক্তিশালী চাল হলো, প্রতিপক্ষকে চাল দিতে বাধ্য করা।”

________________****************________________

আবরাজ খান রাতে খান মহলে ফিরে এসেছে। তার হাতে ব্যান্ডেজ। ঘটনার খবর ইতিমধ্যেই টেলিভিশন আর সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।

ঘরের ভেতরে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে সে।

ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল আদ্রিতা।

তার হাতে কয়েকটা কাগজ।

“শুনুন।”

আবরাজ চোখ তুলে তাকাল।

আদ্রিতা কাগজগুলো এগিয়ে দিয়ে বলল,

“আমার কলেজের একটা ফর্মে গার্ডিয়ানের সিগনেচার লাগবে। আর আপনি এখন আমার লিগ্যাল গার্ডিয়ান।”

আবরাজ ফর্মটার দিকে তাকাল। তারপর আদ্রিতার দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল। বলল,

“আমার সিগনেচার কিন্তু খুব দামি।”

আদ্রিতা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“নাটক করবেন না তো? আমার কলেজের জন্য সিগনেচার লাগবে। অন্য কিছু না।”

আবরাজ মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। মনে মনে বলল,

“এবার দেখো লিটিল স্পার্ক তোমায় কি ভাবে জব্দ করি।"

সে বলল,

“করব, তবে একটা শর্ত আছে।”

আদ্রিতা চোখ বন্ধ করে এক সেকেন্ড ধৈর্য ধরার চেষ্টা করল। বলল,

“সিগনেচার করতেও শর্ত? ঠিক আছে, বলুন।”

আবরাজ আহত হাতটার দিকে তাকিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আমি এখন অসুস্থ মানুষ। আশা করি শুনেছো আমাকে গু*লি করা হয়েছে।”

আদ্রিতা শুকনো গলায় বলল,

“মূল কথায় আসুন।”

আবরাজ এবার গম্ভীর মুখ করে বলল,

“এবার থেকে আমায় খাওয়ানো থেকে শুরু করে গোসল করানো সবকিছু তোমায় করতে হবে। যতদিন না আমি পুরোপুরি সুস্থ হই।

আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এমন ভাব করছেন যেন মাথায় গুলি লেগেছে। হাতে সামান্য চোট পেয়েছেন, এর বেশি কিছু না।”

সে টেবিলের ওপর রাখা ফর্মটা শক্ত করে ধরে রাখল।

“নাটক কম করুন।”

আবরাজ ধীরে মাথা কাত করে বলল,

“নাটক?”

“জি, নাটক।”

আদ্রিতার কণ্ঠ এবার আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

“আর আমাকে দিয়ে এসব করানো সম্ভব না। বিশেষ করে আপনার ক্ষেত্রে তো নয়ই। কারণ আপনি সেই মানুষ, যাকে আমি সম্মান করি না।”

কথাটা শুনে আবরাজের চোখ সরু হয়ে এলো।

আদ্রিতা এবার আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। তার ঠোঁটে তিক্ত হাসি ফুটল। বলল,

“আপনি চান আমি আপনাকে নিয়ে চিন্তা করি? যে মানুষটার কারণে আমার ভাই মা*রা গেছে, তার জন্য চিন্তা করার অভিনয়ও আমি করতে পারব না।”

ঘরের নীরবতা এক নিমিষে জমাট বাঁধল। কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলল না।

আবরাজের মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে গেল। সে ধীরে সোফার পেছনে হেলান দিল। তার আহত হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা। কিন্তু এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে সেই ব্যথার চেয়ে অন্য কিছু তাকে বেশি আঘাত করেছে।

আবরাজের মুখ থেকে হাসিটা মিলিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। ধীরে ধীরে তার ঠোঁটের কোণে আবার সেই পরিচিত, হিসেবি হাসি ফিরে এল। বরং সকালবেলার সেই ওষুধের স্ট্রিপটার কথা আবার মাথায় ঘুরে গেল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

“তাহলে ফর্মে সিগনেচার করার কথাটাও ভুলে যাও।”

আদ্রিতা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“মানে?”

আবরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে উওর দিল,

“মানে খুব সহজ। আমি ভেবেছিলাম তুমি অসুস্থ একজন মানুষকে একটু সাহায্য করবে। কিন্তু যেহেতু সেটা তোমার পক্ষে অসম্ভব, তাহলে আমার সিগনেচারও বোধহয় অসম্ভব।”

আদ্রিতার চোখ বড় হয়ে গেল। বলল,

“আপনি সিরিয়াস? এটা আমার কলেজের ফর্ম। আর আপনি এটা নিয়ে ব্ল্যাকমেইল করছেন?”

আবরাজ মাথা কাত করে বলল,

“আমি এটাকে আলোচনা বলি।”

সামনের টেবিলে রাখা ফর্মটার দিকে তাকিয়ে সে বলল,

“তুমি যেমন তোমার শর্তে চলতে চাও। আমিও আমার শর্তে চলি।”

আদ্রিতা বিরক্তিতে গভীর শ্বাস নিল।

“আপনি অসম্ভব মানুষ।”

আবরাজ হালকা হেসে বলল,

“এসব পুরোনো ডায়লগ। নতুন কিছু বলো।”

তারপর আদ্রিতা দাঁত চেপে বলল,

“ঠিক আছে। কী করতে হবে বলুন?”

আবরাজের চোখে বিজয়ের ঝলক ফুটে উঠল।

“এই তো আমার বুদ্ধিমান লিটিল স্পার্ক।”

এক মুহূর্তের জন্য আবরাজের মুখে এমন একরকম দুষ্টু হাসি ফুটল, যা খুব কম মানুষই দেখে। তারপর সে ফর্মটা হাতে তুলে নিয়ে কলমের ঢাকনা খুলল।

“যাও, আগে এক কাপ কফি এনে দাও।”

আদ্রিতা হতভম্ব গলায় বলল,

“কফি? এখন? এত রাতে?

আবরাজ বলল,

“হ্যাঁ।"

আদ্রিতা বলল,

“শুধু, এটাই শর্ত?”

আবরাজ সই করতে করতে বলল,

“না। এটা শুধুমাত্র শুরু।”

সিগনেচার শেষ করে ফর্মটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।আদ্রিতা ফর্মটা ছিনিয়ে নিল। আবরাজ তার মুখের বিরক্তি দেখে মনে মনে বেশ মজা পেল। কারণ সে জানে, তর্কে হারুক বা জিতুক, আদ্রিতা কখনো সহজ প্রতিপক্ষ নয়। আর সেই কারণেই তার সাথে খেলতে আবরাজের এত ভালো লাগে।

আদ্রিতা রান্নাঘরে ঢুকতেই চারপাশে একবার তাকাল।তারপর ধীরে ধীরে কফি বানাতে শুরু করল। কফি মগে ঢালতে ঢালতে তার ঠোঁটের কোণে একটা বিপজ্জনক হাসি ফুটে উঠল। নিজের মনেই বিড়বিড় করল সে।

“খুব শখ কফি খাওয়ার, তাই না? আজ এমন কফি খাওয়াবো যে সারাজীবন মনে থাকবে।”

ইচ্ছা করেই বেশি করে কফিটা ঢেলে দিলো কাপের মধ্যে। মগ থেকে গরম ধোঁয়া উঠছে। সেটা দেখে আদ্রিতার মুখের হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল।

“পারফেক্ট।”

কয়েক মিনিট পর, একেবারে নিরীহ মুখ করে সে ঘরে ঢুকল। বলল,

“এই নিন, আপনার কফি।”

আবরাজ সোফায় বসে ফোন দেখছিল। মগটা হাতে নিয়ে সন্দেহের চোখে তাকাল। বলল,

“এত ভদ্র হয়ে কফি এনে দিলে?”

আদ্রিতা মিষ্টি করে হেসে বলল,

“আপনি তো অসুস্থ মানুষ। আপনার তো যত্ন নেওয়া উচিত তাই না?”

আবরাজ ভ্রু তুলল।

“হুম।”

তার সন্দেহ আরও বাড়ল। তাও সে কিছু না বলে কাপটা হাতে নিয়ে মগটা ঠোঁটের কাছে নিল। এক চুমুক খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে

ওয়াক, থুউউউউউউউউউউ

করে ফেলে দিলো। মুখ পুরো তোতো হয়ে গেছে।

ভ্রু কুঁচকে বলল,

“লিটিল স্পার্ক এটা কি করলে তুমি?"

আদ্রিতা বলল,

“ইসস আপনি ভেবেছিলেন আমি বুঝি ভালোবেসে কফি বানানো আপনার জন্য?”

বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল,

“ম*রে গেলেও বানাবো না।”

আবারাজ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই আদ্রিতার‌ হাতটা ধরে কাছে টেনে নিলো। আদ্রিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবরাজের বুকের কাছে এসে থামলো।

আবরাজ ফিসফিস করে বলল,

“মুখটা তেতো যখন তুমি করেছো, তখন মিষ্টি তাও তোমায় করতে হবে।”

বলেই আদ্রিতাকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে দুই হাত দিয়ে তার গালটা ধরে নিজের ঠোঁটের সাথে তার ঠোঁট স্পর্শ করালো। এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়লো তাদের মধ্যে।

ঘরের আলো নিভে গেল। বাইরে হালকা ঠান্ডা বাতাস বইছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সেই বাতাস পর্দাগুলোকে ধীরে ধীরে দুলিয়ে দিচ্ছে। আসলে সম্পর্কগুলো ভীষণ জটিল। কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। কোনো শব্দ নেই অথচ অনুভূতি গুলো ভীষণ গভীর হয়।

________________****************________________

বারোটা বেজে গেছে। খান মহলের প্রত্যেকটা ঘরেই নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। ইস্তাম্বুলের আকাশ আজ অদ্ভুতভাবে আলোকিত হয়ে রয়েছে।

প্রয়াণ না ফেরায় রাহি মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। তার মনে হয়েছিল প্রয়াণ বোধহয় আজ ফিরবে না।

কিছুক্ষণ পর একটা শক্ত হাত এসে রাহির কোমর জড়িয়ে ধরল। রাহি নড়েচড়ে উঠলো।‌ ‌একটা গভীর পুরুষালি স্বর তার কানের কাছে নীচু গলায় বলল,

“শুভ জন্মদিন আমার ব্যাক্তিগত চাঁদ।”

রাহির ঘুমঘুম চোখে বলল,

“প্রয়াণ?”

প্রয়াণ বলল,

“হুম, আমি!”

বলে ধীরে ধীরে রাহির হাত ধরে বিছানার ধারে বসালো।

নিজে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। রাহির পরণে একটা সাদা টপ আর গোলাপী রঙের লং স্কার্ট। তারপর প্রয়াণ নিজের পকেট থেকে একজোড়া সোনার নুপুর বের করে রাহির পায়ে সযত্ন পরিয়ে দিল।

রাহি তখনও অবাক। ঘটনা গুলো এতো তাড়াতাড়ি ঘটছে যে সব তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রয়াণ খান এতোবছরে কখনোই তাকে জন্মদিনে উপহার দেওয়া তো দূরের কথা একটু ভালো করে দুটো কথাও বলতো না।

প্রয়াণ ধীরে নীচু হয়ে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করলো রাহির পায়ে। সেই স্পর্শে রয়েছে এক অদ্ভুত উষ্ণতা, অদ্ভুত স্থিরতা। কিছুক্ষণ পর রাহি অনুভব করল তার পায়ে গরম জলের ফোঁটা পড়ছে। তার বুকটা ধক করে উঠল। প্রয়াণ কি কাঁদছে?

সে ধীরে হাত রাখলো প্রয়াণের কাঁধে, প্রয়াণ এখনো মাথা নীচু করে রয়েছে।

রাহি হালকা গলায় বলল,

“তুমি কাঁদছো?”

প্রয়াণ মাথা তুলে তাকালো। চোখে পানি চিকচিক করছে। কী অদ্ভুত ব্যাপার এই মানুষটা টা সত্যি কাঁদছে? এটা বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হচ্ছে রাহির। প্রয়াণ চোখ বন্ধ করে একবার গভীর শ্বাস নিল।

তারপর খুব আস্তে বলল,

“আমায় বলতে দাও, রাহি... প্লিজ।”

রাহি অস্বস্তিতে নড়ে বসল। তার পা এখনো প্রয়াণের হাঁটুর ওপর রাখা। প্রয়াণ এক হাত দিয়ে আলতো করে ধরে আছে।

রাহি অপ্রস্তুত হয়ে নিচু গলায় বলল,

“প্রয়াণ, পা ছাড়ো, প্লিজ। এভাবে পায়ে হাত দিতে নেই।”

প্রয়াণ মাথা নাড়ল কিন্তু হাত সরাল না। বরং আরও শান্ত হয়ে বলল,

“আমি জানি আমি অনেক ভুল করেছি। এত ভুল যে শুধু ‘সরি’ বললে সেগুলো মুছে যাবে না।”

ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে চলছে। প্রয়াণ আবার বলল,

“তোমাকে বুঝিনি। তোমার কষ্টগুলো দেখেও অনেক সময় দেখিনি। রাগকে আমার শক্তি ভেবেছি। যেটা আসলে আমার দুর্বলতা ছিল।”

রাহি স্থির হয়ে শুনছে। প্রয়াণ ধীরে তার দিকে তাকাল।

চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। হালকা কাঁপা কন্ঠে বলল,

“আমি নিজের সব ভুল শুধরে নিতে চাই, রাহি। আমি তোমাকে নিয়ে...”

তারপর ঘুমন্ত রাজন্যার দিকে তাকাল।

“আর প্রিন্সেসকে নিয়ে, নতুন করে জীবন শুরু করতে চাই।”

রাহির বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। এত বছর ধরে সে এই কথাগুলো শোনার অপেক্ষা করেছে। কিন্তু যখন সত্যিই শুনছে, তখন বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

সে ধীরে বলল,

“মানুষ কি এত সহজে বদলে যায়, প্রয়াণ?”

#চলবে

#পর্ব_৩৮

#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন