#রাজনীতির_রক্তচুক্তি #পর্ব_৪৯
(এই পর্বটা পড়ার আগে যারা #পর্ব_৪৮ পড়েননি, পড়ে আসুন। নাহলে কিছুই বুঝতে পারবেন না। ৪৮ পর্বের লিংক কমেন্টে।)
•আবরাজ খানের পদত্যাগ ও প্রয়াণ খানের নতুন দায়িত্ব।
আদ্রিতার চোখে জল থাকলেও কণ্ঠস্বর আশ্চর্যরকম শান্ত। সে ধীরে বলল,
“আমি আমার ভাইকে হারিয়েছি। আমি আমার বাবাকে হারিয়েছি। আপনাকে আর হারাতে চাই না। আমি এই বিষয় নিয়ে আর কোনো কথা বলতে চাই না।”
আবরাজ কিছু বলতে যাচ্ছিল।
“লিটিল স্পার্ক, আমি...”
আদ্রিতা থামিয়ে দিল। খুব ধীরে বলল,
“আপনার সিদ্ধান্তটা আমাকে জানিয়ে দেবেন।”
কথাটা বলার পর সে আর একবারও পেছনে তাকাল না। ধীরে ধীরে বারান্দা ছেড়ে ভেতরে চলে গেল। দরজাটা নরম শব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
আবরাজ শূন্য দৃষ্টিতে আদ্রিতার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে, সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
কয়েক মিনিট আগে যে মানুষটা নিজের জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বীকারোক্তি শুনেছে, আজ সেই মানুষটাই যেন সবচেয়ে অসহায়।
সে রেলিংয়ে হাত রাখল। দূরে বসফরাসের দিকে তাকিয়ে রইল। জলের ওপর আলো ঝিলমিল করছে।শহর নিজের মতো বেঁচে আছে কিন্তু আবরাজের কাছে যেন সময়টা থেমে গেছে।
অনেকক্ষণ পর সে ধীরে মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল। নিজেকে প্রশ্ন করল,
“রাজনীতি ছাড়া কি আমি বাঁচতে পারবে?”
উওর টা সে নিজেও জানে না।
আর একটা প্রশ্ন তার মাথায় এলো।
“আদ্রিতা ছাড়া, আরু ছাড়া সে কি বাঁচতে পারবে?”
সেই প্রশ্নের উত্তরও আজ তার কাছে নেই।
এই বিশাল বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকা আবরাজ খানকে প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিপক্ষের সামনে নয়, বরং নিজের জীবনের সামনে পরাজিত, বিভ্রান্ত আর নিঃসঙ্গ মনে হলো।
________________**************____________________
ইস্তাম্বুলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন ভীষণ অস্থির।সাবেক মেয়র কেমাল আরসালানের গ্রেফতারের খবর প্রকাশ্যে আসার পর পুরো শহর যেন দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল।
টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে সারাদিন বিতর্ক লেগে রয়েছে। সংবাদপত্রে একের পর এক প্রতিবেদন চলছে।রাজনৈতিক মহলে উত্তেজনা চরমে।
বহুদিন ধরেই কেমাল আরসালানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ ছিল। আর অরিন্দম চৌধুরীর মৃত্যুর পর তদন্তের গতি আরও বেড়ে যায়। অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
এই খবর শুনেও সারফরাজের শান্তি নেই। কেমাল আরসালান কে নিজের হাতে শেষ না করতে পারলে সারফরাজের শান্তি নেই। তবে তাড়াহুড়ো করলে কিছুই হবে না। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
Grand National Assembly of Turkey -র পরিবেশ সবসময়ের মতোই ব্যস্ততায় ডুবে রয়েছে। সারফরাজ নিজস্ব অফিস কক্ষ বসে ফাইল দেখছে। টেবিলের ওপর একগাদা নথি।
পাশেই দাঁড়িয়ে আছে জায়েদ। বরাবরের সে মতোই নীরব।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টোকা পড়ল। একজন পিয়ন ভেতরে ঢুকে সম্মান নিয়ে বলল,
“স্যার, মেয়র সাহেব এসেছেন।”
সারফরাজ ভ্রু কুঁচকাল।
“মেয়র?”
পরক্ষণেই বুঝতে পারল।
“আবরাজ?”
পিয়ন মাথা নেড়ে বলল,
“জি স্যার।”
সারফরাজ আর জায়েদ দুজনেই একে অপরের দিকে তাকাল। সারফরাজ বলল,
“ভেতরে পাঠান।”
পিয়ন বেরিয়ে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর দরজাটা আবার খুলল। আবরাজ খান ভেতরে ঢুকল। তার সাথে প্রয়াণ ও মিনহাজ।
সারফরাজ ভ্রু তুলে তাকিয়ে বলল,
“ওহ্, পুরো প্রতিনিধি দল নিয়ে এসেছ দেখছি।”
প্রয়াণ গম্ভীর মুখে বলল,
“আমরা আসতে চাইনি।”
সারফরাজ খেয়াল করল, আবরাজের মুখে অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য। সারফরাজ সরাসরি প্রশ্ন করল,
“কি হয়েছে?”
আবরাজ কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিল না। সে একবার চোখ বন্ধ করল। তার বুকের ভেতরের ঝড়টা এখানে উপস্থিত কেউই পুরোপুরি জানে না।
একদিকে আদ্রিতা, আরু তার পরিবার। অন্যদিকে তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় পৃথিবী রাজনীতি। বহু বছরের স্বপ্ন, সংগ্রাম, পরিচয়।
ধীরে ধীরে সে চোখ খুলল। প্রয়াণ, মিনহাজ, জায়েদ সবাই সোফায় বসে আছে। সারফরাজও অপেক্ষা করছে।
অবশেষে আবরাজ শান্ত গলায় বলল,
“আমি মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করতে চাই।”
প্রয়াণ ঠিক সেই মুহূর্তে গ্লাস থেকে পানি খাচ্ছিল। কথাটা শুনে তার মুখ থেকে পুরো পানি সোজা সামনে ছিটকে বেরিয়ে এল। আর দুর্ভাগ্যবশত সামনেই বসে ছিল জায়েদ। জায়েদের মুখ, জামা সব ভিজে গেল।
পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
জায়েদ ধীরে ধীরে নিজের মুখ থেকে পানির ফোঁটা মুছল। তারপর অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল,
“আমি কি কিছু ভুল শুনলাম?”
প্রয়াণ কাশতে কাশতে বলল,
“না ভাই, আমিও এটাই শুনেছি।”
মিনহাজ দুই হাত মাথায় দিয়ে বলল,
“না! না! না। আমি স্বপ্ন দেখছি।”
সারফরাজ স্থির হয়ে আবরাজের দিকে তাকিয়ে আছে।
মনে হচ্ছে তার মস্তিষ্ক এখনও তথ্যটা গ্রহণ করতে পারেনি।
“তুমি কী বললে?”
আবরাজ বিরক্ত মুখে বলল,
“আমি পরিষ্কার বাংলায় বলেছি। আমি মেয়র পদ থেকে পদত্যাগ করতে চাই।”
এবার সত্যিই সারফরাজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
“তোমার জ্বর এসেছে? মাথায় আঘাত পেয়েছো? ডাক্তার ডাকব?”
প্রয়াণও সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“আমারও তাই মনে হচ্ছে।”
আবরাজ চোখ রাঙাল কিন্তু কেউ ভয় পেল না। কারণ সবাই বুঝতে পারছে এটা কোনো হঠাৎ বলা কথা নয়।অনেক রাত না ঘুমিয়ে, অনেক ভেবে নিজের সাথে অনেক লড়াই করে এই সিদ্ধান্তের কথা বলতে এসেছে সে। আর সেই কারণেই ঘরের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
সারফরাজ আবার বসে পড়ল।
এবার তার কণ্ঠ সম্পূর্ণ গম্ভীর।
“আবরাজ, এই পদ পাওয়ার জন্য মানুষ বছরের পর বছর পরিশ্রম করে। কত মানুষ চেয়েও পারে না। ইস্তাম্বুল আজ সম্পূর্ণ ভাবে আবরাজ খানকে মেয়র হিসেবে চায়। তাহলে আজ এই সিদ্ধান্ত কেন?”
আবরাজ ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“কারণ আদ্রিতা চায় নয়তো আমি তাকে বেছে নিই, নয়তো রাজনীতিকে।”
প্রয়াণ, মিনহাজ, জায়েদ, সারফরাজ সবাই চুপচাপ শুনছে। হঠাৎই আবরাজের ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত, ভয়ংকর হাসিটা ফুটে উঠল। যে হাসি দেখলে সবাই বুঝে, কেউ একজন বিপদে পড়তে যাচ্ছে।
আবরাজ আবার বলল,
“আর আমি দুটোকেই বেছে নিলাম।”
কথাটা শুনে সারফরাজ ভ্রু কুঁচকাল। মিনহাজ অবাক।জায়েদ মাথা কাত করল। প্রয়াণ তো আরও বিভ্রান্ত। কেউই কিছুই বুঝতে পারছে না।
আবরাজ টেবিলে আঙুল ঠুকতে ঠুকতে বলল,
“বাইরের পৃথিবী জানবে আবরাজ খান পদত্যাগ করেছে। আর তারপর...”
সে ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে প্রয়াণের দিকে তাকাল।
“অফিসিয়ালি মেয়র পদে বসবে প্রয়াণ খান।”
প্রয়াণের মুখ হাঁ হয়ে গেল। বলল,
“কি.. কী বললে? আমি মেয়র???”
মিনহাজ হো হো করে হেসে উঠল। জায়েদ মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল। সারফরাজ তাকিয়ে রইল।
প্রয়াণ নিজের বুকের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল,
“ভাই, আমার জীবনে অনেক দুঃস্বপ্ন দেখেছি। কিন্তু এইটা একদম নতুন!”
আবরাজ নির্বিকার মুখে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“ইউ ডিজার্ভ ইট প্রয়াণ।”
মিনহাজ সোফায় হেলান দিয়ে হাসতে লাগল। বলল,
“অভিনন্দন, মাননীয় মেয়র সাহেব।”
জায়েদ গম্ভীর মুখে বলল,
“স্যার, আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি কখন থেকে শুরু করবেন?”
প্রয়াণ হতভম্ব গলায় বলল,
“তোমরাও শুরু করেছ?”
সারফরাজ এবার মুচকি হেসে বলল,
“আমি তো ভাবছি প্রথম দিনের ভাষণটা কেমন হবে।”
তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,
“প্রিয় ইস্তাম্বুলবাসী, আমি প্রয়াণ খান এবং আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না আমি এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছি।”
প্রয়াণ অসহায় মুখে আবরাজের দিকে তাকাল। বলল,
“ভাই, তুমি আমার সঙ্গে এমন করতে পারো না। আমি তোমার ছোট ভাই!”
আবরাজ ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,
“আমি সব পারি।”
---------------**************------------------
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে পুরো ইস্তাম্বুল জুড়ে আলোচনা শুরু হয়ে গেল। পরিবারকে আবরাজ কিছুই জানায়নি তখনও। সবকিছুই স্বাভাবিক ভাবেই চলছে। তবে পর্দার আড়ালে কাগজপত্র, দলীয় বৈঠক, প্রশাসনিক হস্তান্তরের প্রস্তুতি সবকিছু দ্রুত এগিয়ে চলছিল।
অবশেষে এক সন্ধ্যায় পুরো ইস্তাম্বুল যেন থমকে গেল।
টেলিভিশনের ব্রেকিং নিউজে লাল অক্ষরে ভেসে উঠল,
"ইস্তাম্বুলের মেয়র আবরাজ খান পদত্যাগ করছেন!"
মুহূর্তের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। সোশ্যাল মিডিয়া
উত্তাল হয়ে উঠল।
পুরো তুরস্কের চোখ টেলিভিশনের পর্দায়। সাংবাদিকের প্রশ্নের পর, আবরাজ খান কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর শান্ত, স্থির কণ্ঠে বলল,
“জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মানুষকে নিজের অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে নির্ধারণ করতে হয়।”
আবরাজ আবার বলল,
“অনেক বছর ধরে আমি রাজনীতিকে সময় দিয়েছি। নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এই শহর আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। মানুষের ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং সমর্থন দিয়েছে।”
তার চোখে এক ঝলক আবেগ দেখা গেল।
“আজ আমি মনে করি, কিছুটা সময় অন্য কিছু দায়িত্বের জন্যও দেওয়া উচিত।”
সাংবাদিক কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু আবরাজ নিজেই আবার বলল,
“আরেকটা বিষয় আমি বিশ্বাস করি। আমাদের পিছনে থাকা নতুন মানুষদেরও সুযোগ পাওয়া উচিত। নতুন চিন্তা, নতুন নেতৃত্ব, নতুন শক্তি এগুলোই একটা শহরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। আমি চলে যাচ্ছি না। আমি শুধু একটা পদ ছেড়ে দিচ্ছি। ইস্তাম্বুল সবসময় আমার শহর ছিল, আছে, থাকবে।”
কথাটা শেষ হতেই চারিদিকে কয়েক মুহূর্তের নীরবতা নেমে এল। কেউ আর কোনো প্রশ্ন করল না। কেউ বাধাও দিল না।
কারণ উপস্থিত সবাই জানত, আবরাজ খানের এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা বা না করা আলাদা বিষয়। কিন্তু তার অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
গত কয়েক মাসে ইস্তাম্বুলে যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, সেগুলো সাধারণ মানুষের চোখে স্পষ্ট। নতুন উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামোগত কাজ, সামাজিক উদ্যোগ, প্রশাসনিক সংস্কার আর উস্কুদারের নতুন মসজিদ প্রকল্প, যা উদ্বোধনের পর থেকেই শহরের অন্যতম আলোচিত স্থাপনা হয়ে উঠেছে।
অনেকেই রাজনৈতিক মতাদর্শে তার সঙ্গে একমত ছিল না। অনেক সমালোচকও ছিল। রাজনীতিতে এটাই স্বাভাবিক। তবুও একটা বিষয় নিয়ে অধিকাংশ মানুষ একমত ছিল। আবরাজ খান নিজের দায়িত্ব থেকে কখনও পিছিয়ে যায়নি।
কয়েকদিন পর এক প্রবীণ রাজনীতিবিদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন,
“কোনো নেতাকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু তিনি কতদিন ক্ষমতায় ছিলেন সেটা দেখা হয় না। তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীন কী রেখে গেছেন, সেটাও দেখা হয়।”
আরেকজন বলেছিলেন,
“মানুষ হয়তো ভবিষ্যতে বিভিন্ন মেয়রের নাম মনে রাখবে। কিন্তু আবরাজ খানের সময়টাকে আলাদা করে মনে রাখবে।”
সোশ্যাল মিডিয়াতেও হাজার হাজার মানুষ নিজেদের মতামত জানিয়েছিল।
সময় কখনোই থেমে থাকে না। শহর ধীরে ধীরে নিজের গতিতে এগিয়ে চলল।
কয়েকদিন পর আবারও পুরো দেশের সংবাদমাধ্যমে ব্রেকিং নিউজ হলো
"ইস্তাম্বুলের নতুন মেয়র হলেন প্রয়াণ খান।"
খবরটা প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়ে গেল।
তবে প্রবীণ রাজনীতিবিদরা বুঝলেন, এটা আবরাজ খানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাল। কারণ পদত্যাগ করার আগে নিজের রাজনৈতিক প্রভাব, জনসমর্থন এবং প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে তিনি কার্যত নিজের উত্তরসূরি তৈরি করে গেছেন।
বিরোধী দল বিষয়টা নিয়ে আপত্তি তুলতে চেয়েছিল।কিন্তু বাস্তবতা হলো প্রয়াণের জনপ্রিয়তাও কম ছিল না।আর সবচেয়ে বড় বিষয়, সারফরাজ তখন জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী মুখ। তাই বিরোধীরা খুব বেশি দূর এগোতে পারল না।
----------------***************-------------------
~ খান মহল ~
খান মহলের প্রয়াণের ঘরটা আজ নীরবতা বিরাজ করছে। রাহি বিছানায় বসে আছে। সে এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না। কীভাবে এতকিছু হয়ে গেল।
প্রয়াণ ধীরে বলল,
“রাহি! রাহি!"
রাহি কোনো উওর দিল না।
প্রয়াণ ধীরে ধীরে এসে রাহির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।
দুই হাত দিয়ে রাহির হাত ধরল। তারপর নিচু গলায় বলল,
“সরি, রাহি।”
রাহি কোনো উত্তর দিল না।
প্রয়াণ আবার বলল,
“আমার তোমাকে আগে বলা উচিত ছিল। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি নিজেও প্রস্তুত ছিলাম না।”
রাহি নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ভালোই ছিলাম আমরা, প্রয়াণ। এই রাজনীতি, এই ক্ষমতা, এই দায়িত্ব আমি কখনো এগুলোর কিছু চাইনি। আমি শুধু আমার পরিবারকে চেয়েছিলাম। তোমাকে চেয়েছিলাম। রাজন্যাকে নিয়ে শান্ত একটা জীবন চেয়েছিলাম।”
প্রয়াণ চুপ করে শুনতে লাগল। রাহি এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“প্রয়াণ আমি চাই না তোমার জীবনটা আবরাজ ভাইয়ের মতো হোক। প্রতিদিন বিপদ, প্রতিদিন শত্রু, প্রতিদিন অনিশ্চয়তা। আমি সেসব চাই না।”
প্রয়াণ কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল।
“হবে না। কারণ আমি আবরাজ খান নই। আর কখনো আবরাজ খান হতে পারবও না। ওর জায়গা ওরই থাকবে।”
রাহি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। প্রয়াণ গভীর শ্বাস নিয়ে বলল,
“তুমি একটা জিনিস বুঝতে পারছ না, রাহি। ভাই মেয়র পদ ছেড়েছে কিন্তু সম্পূর্ণ সরে যায়নি। ইস্তাম্বুলের মানুষ দেখবে মেয়রের চেয়ারে বসে আছে প্রয়াণ খান। তবে ইস্তানবুল চালাবে সেই আবরাজ খান।”
_______________***************__________________
আবরাজ খানের ঘর। আবরাজ শান্তভাবে আরুকে কোলে নিয়ে আছে। ছোট্ট মেয়েটা তার আঙুল ধরে খেলছে। বাইরে পুরো দেশ তার পদত্যাগ নিয়ে আলোচনা করছে। আর সে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে মৃদু হেসে বলল,
“তোমার চাচা এখন ইস্তাম্বুল সামলাবে, ছোট্ট রাজকুমারী। আমি আপাতত তোমাকেই সামলাই।”
আদ্রিতা দরজা খুলে ঘরে ঢুকল। বলল,
“আমি সত্যি ভাবিনি আপনি আমার জন্য মেয়র পদ ছেড়ে দেবেন।”
আবরাজ বলল,
“তুমি কি এখন ভয় পাচ্ছো লিটিল স্পার্ক।"
আদ্রিতা অবাক হয়ে বলল,
“ভয় কেন পাবো আমি?”
আবরাজ হেসে বলল,
“এই যে এখন তোমার হাসবেন্ড বেকার তো এখন তো সংসার তোমায় চালাতে হবে।”
আদ্রিতা কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মনে মনে ভাবল,
"লোকটা নিশ্চিত পাগল হয়ে গেছে।"
পুরো দেশের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক পদ থেকে সরে এসেছে। আর সে সেটা নিয়ে এমনভাবে কথা বলছে যেন চাকরি হারিয়ে বাড়িতে বসে আছে।
আবরাজ আবার বলল,
“আসলে ব্যাপারটা খারাপ না। তুমি ডাক্তার হবে। আমি বাড়িতে থাকব। তোমার টাকায় চলব। এতে খারাপ কী?”
আদ্রিতা চোখ বড় বড় করে তাকাল। আবরাজ মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। সকালবেলা মেয়ে সামলাব। দুপুরে ঘুমাব। বিকেলে তোমার জন্য অপেক্ষা করব। রাতে তোমার টাকায় খাওয়া-দাওয়া করব। একদম পারফেক্ট জীবন।”
আদ্রিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আবরাজ, আপনার খারাপ লাগছে না?”
আবরাজ বলল,
“না, খারাপ কেন লাগবে? এখন সারাদিন তোমার টাকায় চিল করব। এখন আমি গৃহস্বামী।"
আদ্রিতা বলল,
“আবরাজ আমি মজা করছি না।”
আবরাজ ভ্রু তুলল। বলল,
“আমিও সম্পূর্ণ সিরিয়াস। মেয়েরা যদি তাদের হাসবেন্ডের কাছ থেকে প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট পেতে পারে, তাহলে ছেলেরাও তাদের ওয়াইফের কাছ থেকে প্রিন্স ট্রিটমেন্ট পাবে।”
আবরাজ আরুকে ঠিক করে কোলে নিয়ে বলল,
“এখন আমার অনেকগুলো অধিকার আছে। এক নম্বর, সকালে ঘুম থেকে উঠে কফি পাওয়া। দুই নম্বর, সাপ্তাহিক উপহার পাওয়া। তিন নম্বর, মাসিক হাতখরচ পাওয়া। চার নম্বর, বিশেষ বিশেষ আদর-যত্ন পাওয়া যাতে খুব
তাড়াতাড়ি আরুর একটা ভাই-বোন আসতে পারে।”
#চলবে
(আবরাজ-আদ্রিতার একটু ফানি পার্ট দিলাম। 👀 সবসময় সিরিয়াস লিখতে ভালো লাগে না। আবরাজের উচিত প্রিন্স ট্রিটমেন্ট পাওয়া 🤭)
#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা
#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি