#রাজনীতির_রক্তচুক্তি #পর্ব_৫০
~ আহমেদ ম্যানশন ~
প্রিয়ান্তি বিছানার কিনারায় বসে আছে। তার হাতে ধরা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট। সেখানে ফলাফল স্পষ্ট। কিন্তু তার মুখে সেই আনন্দ নেই, যেটা এমন মুহূর্তে থাকার কথা।
সামনেই সারফরাজ বসে আছে। অনেকক্ষণ ধরেই সে প্রিয়ান্তিকে বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রিয়ান্তি শুধুই চুপ করে আছে।
অবশেষে সারফরাজ বলল,
“কী হলো, বাটারফ্লাই? এমন করছ কেন? তোমার তো খুশি হওয়ার কথা।”
প্রিয়ান্তি ধীরে মুখ তুলল। তার চোখে অদ্ভুত এক দুশ্চিন্তার ছাপ। বলল,
“আমি খুশি নই।”
সারফরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কেন?”
প্রিয়ান্তি সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“কারণ অন্য একজন এলে সানশাইনের ভালোবাসাটা কমে যাবে।”
কথাটা শুনে সারফরাজ অবাক হয়ে প্রিয়ান্তির দিকে তাকিয়ে রইল। এতক্ষণ সে ভেবেছিল প্রিয়ান্তি হয়তো চিন্তা করছিল নতুন দায়িত্ব নিয়ে কিন্তু না। মেয়েটা চিন্তা করছে সৃজাকে নিয়ে। সেই সৃজা, যে তার রক্তের সম্পর্কের মেয়ে নয়।
সারফরাজের বুকের ভেতর হঠাৎ উষ্ণ একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল। সে ধীরে ধীরে প্রিয়ান্তির পাশে গিয়ে বসল। নরম গলায় বলল,
“বাটারফ্লাই, তুমি জানো সানশাইন পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবান মেয়েদের একজন।”
প্রিয়ান্তি অবাক হয়ে তাকাল।
সারফরাজ মৃদু হেসে বলল,
“কারণ তার এমন একজন মা আছে, যে নিজের সন্তানের খবর পাওয়ার পরও প্রথমে সৃজার কথা ভাবছে।”
প্রিয়ান্তির চোখ ভিজে উঠল। সে আস্তে বলল,
“আমি চাই না ও কখনও মনে করুক আমি ওকে কম ভালোবাসি। ও তো অনেক কষ্টের পর হাসতে শিখেছে। আমি চাই না সেই হাসিটা হারিয়ে যাক।”
সারফরাজ ধীরে তার হাতটা ধরল। বলল,
“আমি জানি। তোমার ভালোবাসা সানশাইনের প্রতি কোনোদিন কমবে না। কারণ ও তোমার একটা অংশ।”
প্রিয়ান্তির চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ল। সে নিচের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে বলল,
“আমার প্রথম সন্তান সবসময় সানশাইনই থাকবে। হয়তো আমি ওকে জন্ম দিইনি কিন্তু মা হওয়ার অনুভূতি আমি ওর মাধ্যমে পেয়েছি। প্রথমবার ‘মাম্মা’ ডাকটা ওর মুখ থেকেই শুনেছি।”
সারফরাজ স্থির হয়ে শুনছে। প্রিয়ান্তি আরও বলল,
“প্রথমবার রাত জেগে যে সন্তানের জন্য চিন্তা করেছি, সেটা সানসাইন। প্রথমবার কারও হাসি দেখে নিজের সব কষ্ট ভুলে গেছি সেটাও সানসাইন।”
তার ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“তাই, পরে আমার যে সন্তানই হোক না কেন, আমি হয়তো তাকেও ভালোবাসব। কিন্তু সানশাইনের জন্য আমার হৃদয়ে যে জায়গাটা আছে, সেটা কেউ কোনোদিন নিতে পারবে না।”
সারফরাজের গলা শুকিয়ে গেল। সে জানত প্রিয়ান্তি সৃজাকে ভালোবাসে। কিন্তু এতটা এত গভীরভাবে ভালোবেসে যেটা সে নিজেও পুরোটা কখনো পারেনি।
কয়েক মুহূর্ত পর সারফরাজ ধীরে এগিয়ে এসে প্রিয়ান্তির কপালে আলতো চুমু খেল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“এই কারণেই সানশাইন এত ভাগ্যবতী। আর এই কারণেই আমি প্রতিদিন নতুন করে তোমার প্রেমে পড়ি, বাটারফ্লাই।”
প্রিয়ান্তি চোখ তুলে তাকাল।
সারফরাজ মৃদু হেসে বলল,
“রক্তের সম্পর্ক মানুষকে পরিবার বানায় না। কখনো কখনো ভালোবাসা পরিবার বানায়। আর তুমি অনেক আগেই সৃজার মা হয়ে গেছ।”
প্রিয়ান্তি হঠাৎ সারফরাজের দুই হাত শক্ত করে ধরল।তার চোখ দুটো ভেজা কিন্তু কণ্ঠে অদ্ভুত দৃঢ়তা।
“আপনি আমাকে একটা কথা দিন।”
সারফরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী কথা, বাটারফ্লাই?”
প্রিয়ান্তি একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনি সবসময় সানশাইনকে সবার থেকে বেশি ভালোবাসবেন। আমি আপনার ব্যাখ্যা শুনতে চাই না।” আপনি শুধু বলুন, ইয়েস অর নো।”
ঘরটা নীরব হয়ে গেল।
সারফরাজ এবার ধীরে ধীরে তার হাত দুটো নিজের হাতে নিল। তারপর শান্ত গলায় বলল,
“নো।”
প্রিয়ান্তি থমকে গেল। তার চোখে সঙ্গে সঙ্গে কষ্টের ছায়া নেমে এলো। কিন্তু সারফরাজ তাকে কথা বলতে না দিয়েই বলল,
“কারণ আমি আমার সন্তানদের মধ্যে তুলনা করব না। সানশাইন আমার মেয়ে। আমার প্রথম সন্তান। ওর জন্য আমার হৃদয়ে এমন একটা জায়গা আছে, যেটা কেউ নিতে পারবে না। কিন্তু আমি কোনোদিন ওর ভাই বা বোনকে কম ভালোবাসব না।”
প্রিয়ান্তি চুপ করে শুনতে লাগল।
সারফরাজ মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসা কোনো প্রতিযোগিতা না, বাটারফ্লাই এখানে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় বলে কিছু নেই। যেদিন নতুন বেবি আসবে, সেদিন আমার হৃদয় দুই ভাগ হবে না। বরং আরও বড় হবে।”
সে একটু ঝুঁকে প্রিয়ান্তির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“আর একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি। সানশাইন কোনোদিন আমার ভালোবাসা নিয়ে অনিরাপদ বোধ করবে না। কারণ আমি প্রতিদিন তাকে সেটা বুঝিয়ে দেব।”
অবশেষে প্রিয়ান্তির ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
খবরটা ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো আহমেদ ম্যানশনে যেন উৎসবের পরিবেশ তৈরি হয়ে গেল। সবাই ভীষণ খুশি।
বাড়ির বড়রা নতুন অতিথিকে নিয়ে আগেভাগেই পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন।
সারফরাজ তো দিনের মধ্যে অন্তত দশবার করে প্রিয়ান্তিকে জিজ্ঞেস করছে,
“বাটারফ্লাই, ঠিক আছ তো? কোনো অসুবিধা নেই তো?"
সবার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খুশি যে মানুষটা, সে হলো সৃজা। যখন থেকে সে জেনেছে তার একটা ছোট ভাই বা বোন আসতে চলেছে, সেদিন থেকে তার উত্তেজনা আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্রিয়ান্তি সোফায় বসে আছে। সৃজা তার পাশে। সে একটানা কথা বলেই যাচ্ছে।
প্রিয়ান্তির মা হওয়ার খবরটা আহমেদ ম্যানশন থেকে খান মহলেও পৌঁছে গেছে। খবরটা শোনার পর পুরো পরিবারই ভীষণ খুশি। বিশেষ করে শর্মিষ্ঠা খান। তিনি তো একসঙ্গে খুশি আর অবাক। তার মেয়ে মা হতে চলেছে। এই অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
সৃজা তো আগেই উত্তেজিত ছিল। এখন রাজন্যাও দ্বিগুণ খুশি।
সময় নিজের নিয়মেই বয়ে চলেছে। দেখতে দেখতে আরও তিন মাস কেটে গেছে। ছোট্ট অদ্রিজার বয়স এখন তিন মাস। গোলগাল মুখ। বড় বড় চোখ। এবং সারাদিন সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু।
আমাদের সম্মানিত "গৃহস্বামী" আবরাজ খান সত্যিই গত তিন মাস ধরে বাড়িতেই আছেন। অন্তত বাইরে থেকে তাই মনে হয়।
সকালে অদ্রিজাকে নিয়ে হাঁটছেন। দুপুরে দুধের বোতল গরম করছেন। বিকেলে মেয়েকে কোলে নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন। রাতে ঘুম পাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছেন।
পুরো ইস্তাম্বুলের কাছে তিনি এখন একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবেক মেয়র।
তবে বাস্তবতা একটু ভিন্ন। কারণ প্রয়াণ খান মেয়রের চেয়ারে বসেছে ঠিকই কিন্তু ইস্তাম্বুলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো এখনও রহস্যজনকভাবে খান মহলের এক নির্দিষ্ট ঘরে পৌঁছে যায়। আর সেগুলো রহস্যজনকভাবেই সমাধান হয়ে ফিরে আসে।
একদিন প্রয়াণ বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
“ভাই, তুমি যদি সব সিদ্ধান্তই নাও, তাহলে আমি মেয়র কেন?”
আবরাজ তখন কোলে অদ্রিজাকে নিয়ে নির্বিকারভাবে বলেছিল,
“অভিজ্ঞতা অর্জন করছিস।”
প্রয়াণ বলেছিল,
“কীভাবে?”
আবরাজ শান্ত গলায় উত্তর দিয়েছিল,
“আমার কথা শুনে।”
ইস্তাম্বুলের আকাশ জুড়ে প্রায় সন্ধ্যা নেমেছে। দূরে বসফরাসের জল চিকচিক করছে। আর খান মহলের রুফটপে আবরাজ খান নিজের তিন মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে হাঁটছে।
“জানো আরু আজ তোমার চাচা আবার একটা ফাইল নিয়ে এসেছিল। ফাইলটা নিজে পড়ার বদলে আমার কাছে নিয়ে এসেছে।”
অদ্রিজা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে অস্পষ্ট একটা শব্দ করল।
আবরাজ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
“হ্যাঁ। আমিও হতাশ।”
তখনই পেছন থেকে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন শাহবাজ খান। তিনি সামনে থাকা দৃশ্যটার দিকে তাকিয়ে কয়েক মুহূর্ত নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ভেতরে ভেতরে তার রাগ বাড়তে লাগল। কারণ তিনি জীবনে অনেক কিছু কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা একদমই না।
তিনি নিজের হাতে একটা যন্ত্রমানব তৈরি করেছিলেন।
একজন মানুষ যে বিশ্রাম নিত না। অনুভূতি দেখাত না।দুর্বলতা প্রকাশ করত না। যার কাছে রাজনীতি ছিল ধর্মের মতো। ক্ষমতা ছিল দায়িত্বের মতো।
আর আজ সেই একই মানুষ একটা মেয়েকে নিয়ে ছাদে হাঁটছে। শিশুর সঙ্গে দেশের বাজেট নিয়ে আলোচনা করছে।
শাহবাজ খান অবশেষে গলা খাঁকারি দিলেন। আবরাজ ঘুরে তাকালো। কোলে ছোট্ট অদ্রিজা। বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, আব্বু।”
শাহবাজ খান কয়েক সেকেন্ড ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর শাহবাজ খান বললেন,
“এভাবেই তোমার জীবন চলবে কি?”
আবরাজ চুপচাপ তাকাল।
শাহবাজ খানের কণ্ঠ এবার ভারী হয়ে উঠল।
“তোমাকে আমি কীভাবে বড় করেছি, আবরাজ? কত বছর ধরে তৈরি করেছি? আর তুমি নিমেষের মধ্যে সব ধূলিসাৎ করে দিলে।”
তিনি কয়েক পা এগিয়ে এলেন।
“আমি চেয়েছিলাম তুমি ক্ষমতার শিখরে উঠবে। তোমার নাম পুরো দেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে। আর তুমি একটা বাইরের মেয়ের জন্য সব ছেড়ে দিলে!”
শাহবাজ খানের চোখ এবার অদ্রিজার দিকে গেল।
“আর এই বাচ্চা... এ তোমার রক্তের না। তোমার নিজের সন্তানও না। তবু তুমি তাকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দাও। তুমি বুঝতে পারছে নিজের মুর্খের মতো পরিবর্তন টা?”
আবরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর অদ্রিজার মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে ধীর গলায় বলল,
“বাইরের মেয়ে নয়, আব্বু। আদ্রিতা আমার স্ত্রী। আর অদ্রিজা আমার মেয়ে।”
সে একবার মেয়ের দিকে তাকাল। তারপর বলল,
“জন্ম দিলেই বাবা-মা হওয়া যায় না। সন্তানের পাশে দাঁড়াতে হয়। তাকে নিজের বলে গ্রহণ করতে হয়। আর আমি সেটাই করেছি।”
শাহবাজ খান বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়লেন। বললেন,
“তুমি বুঝতে পারছ না, মানুষ তোমাকে নিয়ে হাসছে। তুমি নিজের জায়গায় প্রয়াণকে বসিয়েছ। প্রয়াণ কিছুই পারে না।”
কথাটা শেষ হতেই আবরাজের চোখে হালকা কঠোরতা ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আব্বু, আপনি সবসময় প্রয়াণকে ছোট করেন কেন? সেও তো আপনার সন্তান। সে আমার ভাই। আমি চোখ বন্ধ করে তার ওপর ভরসা করতে পারি।”
শাহবাজ খান কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলেন।
আবরাজ আবার বলল,
“হয়তো সে আমার মতো নয়। হয়তো সে আমার মতো রাজনীতি বোঝে না। কিন্তু তার নিজের শক্তি আছে। আর যদি আমি তাকে সুযোগই না দিই, তাহলে সে নিজেকে প্রমাণ করবে কীভাবে?”
সন্ধ্যার বাতাস বয়ে গেল। অদ্রিজা বাবার শার্ট মুঠো করে ধরে আছে।
আবরাজ নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আপনি আমাকে সবসময় জিততে শিখিয়েছেন, আব্বু। কিন্তু একটা জিনিস শেখাননি, কাউকে নিজের ছায়া থেকে বের হয়ে হাঁটার সুযোগ দিতে হয়।”
সে আবার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“প্রয়াণ আমার জায়গা নেয়নি। সে তার নিজের জায়গায় দাঁড়াতে শিখছে।”
শাহবাজ খান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
“তুমি জানো কার কথা বলছ? ও একটা অপদার্থ। কোনো কাজ ঠিকমতো করতে পারে না। শুধু মারপিট, রাগ আর ঝামেলা করতে পারে। তুমি বলো তো, প্রয়াণ কি কখনও খান পরিবারের সম্মান উঁচুতে নিয়ে যেতে পেরেছে?”
তিনি থামলেন না।
“এমনকি নিজের বিয়েটাও কীভাবে করেছে? পুরো পরিবারকে মানুষের সামনে মাথা নিচু করতে হয়েছে। আর আজ তুমি বলছ সে তোমার জায়গা সামলাবে?”
আবরাজ চোখ বন্ধ করল। একটা দীর্ঘ শ্বাস নিল। তারপর খুব ধীরে চোখ খুলল। বলল,
“আপনি জানেন, আব্বু প্রয়াণের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য কী?”
শাহবাজ খান ভ্রু কুঁচকালেন।
আবরাজ বলল,
“সে কোনোদিন নিজের ব্যর্থতার সঙ্গে একা লড়েনি। সে সবসময় তুলনা হয়ে এসেছে। আবরাজ এটা পারে।আবরাজ ওটা করেছে। আবরাজের মতো হও।’
আবরাজের চোখ এবার সরাসরি বাবার দিকে।
“আপনি কি জানেন, একটা সন্তানকে বারবার বলা যে সে যথেষ্ট না, এটা কতটা ভয়ংকর?”
শাহবাজ খান চুপ করে রইলেন। আবরাজ বলল,
“আপনি ওর ভুলগুলো দেখেন। আমি ওর আনুগত্য দেখি। আপনি ওর রাগ দেখেন। আমি দেখি, পরিবারের জন্য ও কতদূর যেতে পারে। আপনি ওর ব্যর্থতা দেখেন।আমি দেখি, বারবার পড়ে গিয়েও সে উঠে দাঁড়ায়।”
শাহবাজ খান স্থির হয়ে গেলেন। আবরাজের কথাগুলো যেন সরাসরি কোথাও আঘাত করল।
আবরাজ ধীরে বলল,
“আপনি আমাকে শক্তিশালী বানিয়েছেন, আব্বু। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু প্রয়াণকে ছোট করতে করতে আপনি বুঝতেই পারেননি, ও শুধু আপনার স্বীকৃতিটা চেয়েছিল।”
কথাটা শেষ হতেই চারদিক আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।দূরে ইস্তাম্বুলের আলো জ্বলছে। বসফরাসের ওপর রাত নেমে এসেছে। ঠিক তখনই ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছায়া ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো।আবরাজ প্রথমে খেয়াল করল। তারপর শাহবাজ খানও তাকালেন। প্রয়াণ অনেকক্ষণ আগেই ছাদে এসেছিল।কিন্তু কেউ খেয়াল করেনি। সে নীরবে দাঁড়িয়ে নিজেকে নিয়ে বলা প্রতিটা কথা শুনেছে।
প্রয়াণের মুখে শান্ত ভাব। সে হালকা হেসে বলল,
“ভাই, তুমি আবার আমার জন্য আবেগী বক্তৃতা দিয়ে ফেলেছ দেখছি।”
আবরাজ বলল,
“সত্যি কথাই বলছি।”
প্রয়াণ এবার শাহবাজ খানের দিকে তাকাল। তার মুখে হাসি থাকলেও চোখে জমে আছে বহু বছরের ক্লান্তি। সে ধীরে বলল,
“চিন্তা করবেন না, আব্বু। ভাইয়ের জায়গা কেউ কোনোদিন নিতে পারবে না। আমি তো আর-ই পারব না।”
সে হালকা হেসে মাথা নাড়ল। বলল,
“পৃথিবীর সবার সামনে দাঁড়িয়ে মারপিট করতে পারি। ঝামেলা সামলাতে পারি। কিন্তু আবরাজ খানকে ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আর সত্যি বলতে, সেই চেষ্টাও আমি কোনোদিন করিনি আর করবও না।”
কথাটা বলার সময় তার কণ্ঠে অভিযোগ ছিল না।
ছিল বহু বছর ধরে মেনে নেওয়া একটা সত্যি।
আবরাজ কয়েক সেকেন্ড ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে প্রয়াণের কাঁধে হাত রাখল। প্রয়াণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আবরাজ তাকে নিজের বুকে টেনে নিল। একটা শক্ত, নিঃশব্দ আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল। যেখানে কোনো রাজনীতি নেই। কোনো পদ নেই। কোনো ক্ষমতা নেই। আছে শুধু দুই ভাই।প্রয়াণ কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল।
তারপর সেও আবরাজকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল একদম প্রয়াণসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“আই লাভ ইউ, ভাইইই!”
আবরাজ চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে ছিল। কথাটা শুনে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল। সে বলল,
“জানি। এটা তুই দিনে অন্তত দশবার বলিস। নতুন কিছু বল।”
প্রয়াণ আবরাজের কাঁধে মুখ রেখে দুষ্টু হেসে বলল,
“তোমায় আমি বিয়ে করে নিতাম, যদি ভাবি আগে বিয়ে না করত তোমায়।”
আবরাজ সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোর মাথা ঠিক আছে?”
প্রয়াণ একদম গম্ভীর মুখ করে মাথা নাড়ল। বলল,
“অবশ্যই। দেখো না, তুমি হ্যান্ডসাম।”
আবরাজের ভ্রু আরও কুঁচকে গেল।
প্রয়াণ একটা একটা করে বলতে লাগল।
“সুন্দর, ধনী, ক্ষমতাবান আর বোনাস হিসেবে একটা বাচ্চাও আছে।”
কথাটা শেষ হতেই আবরাজ নির্বিকার মুখে অদ্রিজাকে এক হাতে ধরে অন্য হাত দিয়ে প্রয়াণের মাথায় একটা হালকা চাপড় দিল।
প্রয়াণ বলল,
“আ'হা, নি'র্যা'ত'ন!”
আবরাজ শান্ত গলায় বলল,
“আগে বললে ভেবে দেখতাম। এখন আর উপায় নেই।”
প্রয়াণের মুখ হাঁ হয়ে গেল। বলল,
“কীইই? ভাই! তুমি আমার সঙ্গে ফ্লার্ট করছ?”
আবরাজ কাঁধ ঝাঁকিয়ে উওর দিল,
“তুই তো শুরু করেছিস।”
__________________************___________________
রাত নেমেছে ইস্তাম্বুলে। দূরে বসফরাসের কালো জলের ওপর শহরের হাজারো আলো ঝিকমিক করছে। মিনার থেকে ভেসে আসা রাতের নীরব সুর যেন ধীরে ধীরে শহরটাকে জড়িয়ে ধরছে। খান মহলের ছাদটাও এখন অনেকটাই শান্ত হয়ে গেছে।
প্রয়াণ জীবনে অনেক জায়গায় সে হেরেছে। অনেকবার ভুল করেছে। অনেকবার মানুষ তাকে অবমূল্যায়ন করেছে। তার নিজের বাবাও হয়তো কখনও তাকে আবরাজের মতো চোখে দেখেননি।
তবে একটা জায়গায় সে খুব বড় ভাবে জিতে গেছে। সে পেয়েছে আবরাজ খানকে। একজন বড় ভাইকে, যে কখনও তাকে নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেনি। যে নিজের জায়গা ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করেনি। ভাইয়ের প্রতি বিশ্বাস হারায়নি।
কিছু সম্পর্ক রক্তের কারণে মূল্যবান হয়। আর কিছু সম্পর্ক মূল্যবান হয় কারণ সেখানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা থাকে।
প্রয়াণের কাছে আবরাজ শুধু বড় ভাই নয়। আবরাজ একটা নিরাপদ আশ্রয়। একটা ভরসা। একটা ছায়া।
আর হয়তো এই কারণেই, জীবনের শত ব্যর্থতার পরেও প্রয়াণ নিজেকে কখনও সম্পূর্ণ পরাজিত মনে করেনি।
কারণ তার পাশে সবসময় রয়েছে আবরাজ খান।
#চলবে
(অবশেষে হাফ সেঞ্চুরি তে পৌঁছে গেলাম। রাতে ৯:৩০ এর মধ্যে আরো একটা পর্ব দেবো 🫶😗 রেসপন্স করবেন সবাই 🫶)
#সম্পর্কের_নতুন_সূচনা #লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি