#রাজনীতির_রক্তচুক্তি #অন্তিম_পর্ব
ইস্তাম্বুলের সকালগুলোর মধ্যে এক ধরনের জাদু আছে। এমন এক জাদু, যা কোলাহল শুরু হওয়ার আগের কয়েকটি নীরব মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অনুভব করা যায়।
ভোরের প্রথম আলো ধীরে ধীরে বসফরাসের জলের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যের সোনালি আভায় জলরাশি চিকচিক করে ওঠে, যেন কেউ অসংখ্য হীরের কণা ছড়িয়ে দিয়েছে।
দূরে সীগালেরা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। তাদের ডাক মিশে যায় শহরের ঘুম ভাঙার শব্দের সঙ্গে। একের পর এক মসজিদের মিনার আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।আর ভোরের আজান ভেসে আসে চারদিক থেকে। সেই সুরে যেন শত শত বছরের ইতিহাস মিশে আছে।
বসফরাসের তীর ধরে হাঁটতে বের হওয়া মানুষদের মুখে থাকে প্রশান্তি। শহরটা তখন অদ্ভুত এক ভারসাম্যে থাকে। একদিকে হাজার বছরের ইতিহাস। অন্যদিকে আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা।
আর এই দুটোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে ইস্তাম্বুল। যা দুই মহাদেশকে যুক্ত করা এক অনন্য শহর।
হয়তো এ কারণেই ইস্তাম্বুলের সকাল এত মনোমুগ্ধকর।কারণ এখানে প্রতিটি সূর্যোদয় শুধু একটি নতুন দিনের শুরু নয় বরং নতুন আশা, নতুন সম্ভাবনা আর নতুন গল্পেরও সূচনা।
আজ রবিবার হওয়ায় পুরো বাড়িতেই এক ধরনের অলস শান্তি। আবরাজ এখনও ঘুমিয়ে। আর তার বুকের ওপর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছে ছোট্ট আরু।
আবরাজও ঘুমের মধ্যেই এক হাত দিয়ে মেয়েকে আগলে রেখেছে। তার মুখে এমন এক প্রশান্তি, যা কয়েক মাস আগের আবরাজ খানকে দেখে কেউ কল্পনাও করতে পারত না।
ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা খুলে আদ্রিতা বেরিয়ে এলো। তার চুলগুলো হালকা ভেজা। ঘরে ঢুকেই তার চোখ গেল বিছানার দিকে। তারপর নিজের অজান্তেই তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। একজন ইস্তাম্বুলের সাবেক মেয়র। যার নাম শুনে একসময় বিরোধীরা সতর্ক হয়ে যেত। যার একটি সিদ্ধান্ত পুরো শহরের গতিপথ বদলে দিতে পারত। সে এখন নিজের মেয়ের বালিশ হয়ে ঘুমাচ্ছে।
আদ্রিতা ধীরে ধীরে বিছানার পাশে এসে বসল। আরুর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। মেয়েটা ঘুমের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে আবার বাবার বুকের আরও কাছে সরে এলো।
আদ্রিতা হেসে বলল,
"পুরোপুরি বাবার মেয়ে।"
কথাটা শুনে আবরাজ আধো ঘুমের মধ্যেই বলল,
"অবশ্যই।"
আদ্রিতা চমকে তাকাল। বলল,
"আপনি জেগে আছেন?"
"না।"
আদ্রিতা বলল,
"তাহলে কথা বললেন কীভাবে?"
আবরাজ চোখ বন্ধ রেখেই বলল,
"ঘুমের মধ্যেও নিজের প্রশংসা শুনতে পাই।"
আদ্রিতা চোখ ঘুরিয়ে ফেলল। আবরাজ এবার ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তারপর নিজের বুকের ওপর ঘুমন্ত আরুর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"দেখো তো, কী সুন্দর করে ঘুমাচ্ছে।"
আদ্রিতা বলল,
"রাতে তিনবার আমাকে উঠিয়েছে। আর ভোর পাঁচটা থেকে আপনাকে আঁকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।"
আবরাজ বলল,
“কারণ ও জানে ওর বাবা বেশি ভালো।
আদ্রিতা বলল,
“সেইই, ওর বাবা তো খুব ভালো।”
*
*
*
দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরও নয়টি মাস। সময় থেমে থাকেনি। জীবনও নয়। পরিবর্তন এসেছে সবার জীবনে।
ছোট্ট আরু এখন এক বছরের। সারাদিন টলমল পায়ে পুরো খান মহল ঘুরে বেড়ায়। কখনো আবরাজের পেছনে। কখনো আদ্রিতার পেছনে। আর যখন কেউ তাকে কোলে নিতে চায় না, তখন এমন মুখ করে কাঁদে যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায় তার সঙ্গেই হয়েছে।
রাজন্যা এখন চার বছরের। আগের চেয়ে অনেক বেশি কথা বলে। স্পষ্ট শব্দেই কথা বলে। প্রয়াণের মতো জেদি হয়েছে। আর রাহির মতো মিষ্টি।
সৃজা ছয় বছরে পা দিয়েছে। নিজেকে এখন বড় আপু মনে করে সে। প্রিয়ান্তি ও সারফরাজের সেই প্রতীক্ষিত সন্তান এখন দুই মাসের। আহমেদ ম্যানশনে এখন প্রায় প্রতিদিনই সৃজার নতুন নতুন পরিকল্পনা শোনা যায়।
---------------**************--------------------
খান মহলের সেই সকালটা শুরু হয়েছিল একদম সাধারণভাবেই। আবরাজ ড্রয়িংরুমে বসে আছে। কোলে আরু। ছোট্ট মেয়েটা আজকাল খুব কথা বলার চেষ্টা করে। যদিও বেশিরভাগ সময়ই তার কথাগুলো শুধু সে নিজেই বোঝে।
আরু অনেকক্ষণ ধরে ই....উঃ.... আউউউউউ.... ইইউউউউ এসব করে যাচ্ছে।
হঠাৎ সে ছোট্ট আঙুল তুলে আবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
"বা...বা...।"
ঘরটা এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আদ্রিতা পাশেই ছিল, সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। আবরাজ প্রথমে বুঝতেই পারল না।
আরু আবার হাসল। তারপর দুই হাত বাড়িয়ে বলল,
"বা.... ব্বা...।"
এইবার আর কোনো সন্দেহ রইল না। ছোট্ট মেয়েটার জীবনে প্রথম স্পষ্ট শব্দ উচ্চারণ করেছে সেটাও হলো বাবা।
আবরাজ বলল,
“আবার বলো আরু।”
মেয়েটা কি বুঝল কে জানে, তবে আবরো হাসিমুখে বলল,
“বা...ব্বা...।”
আবরাজ অসংখ্য চুমুতে মেয়ের মুখ ভরিয়ে দিতে লাগল। তার বুকের ভেতর উষ্ণ অনুভুতি বিরাজমান। প্রথম বার বাবা ডাক শোনার মধ্যে যে পরম শান্তি রয়েছে যা একমাত্র সেই পুরুষ অনুভব করতে পারবে, যে বাবা ডাক শুনেছে।
_________________*************________________
দুই বছর পর ***************
সময় নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। আর তার সঙ্গে বদলে গেছে মানুষ, পরিস্থিতি, শহর, এমনকি পুরো একটা যুগও।
আজকের ইস্তাম্বুল আর কয়েক বছর আগের ইস্তাম্বুল এক নয়। শহরটা এখন অনেক বেশি শান্ত। অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। অনেক বেশি নিরাপদ।
যে এলাকাগুলো একসময় অবহেলায় পড়ে ছিল, সেখানে আজ আধুনিক আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেছে। যেখানে অসাম্য ছিল, সেখানে নতুন আইন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেখানে মানুষের কণ্ঠস্বর শোনা হতো না, সেখানে এখন প্রশাসন মানুষের কাছে জবাবদিহি করে।
শহরটা অনেক বদলেছে। আর সেই পরিবর্তনের পেছনে ছিল কিছু মানুষের বছরের পর বছর পরিশ্রম।
আদ্রিতা চৌধুরী খান এখন একজন পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার। অনেক রোগীর ভরসার নাম। যে মেয়েটা একসময় নিজের জীবন নিয়েই অনিশ্চিত ছিল, আজ সে অসংখ্য মানুষের জীবনে আশা ফিরিয়ে দিচ্ছে।
আবরাজ খান কখনোই নিজের স্ত্রীর কোনো কমতি রাখেনি। সময় যতই বদলাক, দায়িত্ব যতই বাড়ুক, আদ্রিতা আর আরুর জন্য তার সময় সবসময়ই আলাদা ছিল। আরু আসার পর তাদের ঘর ভরে উঠেছিল হাসিতে। তাই নতুন করে আর কিছু পাওয়ার কথা তারা খুব একটা ভাবেনি।
কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে বড় উপহারগুলো আসে তখনই, যখন মানুষ সেগুলোর জন্য অপেক্ষাও করে না।
সেদিনের বিকেলটাও ছিল ঠিক তেমনই। আদ্রিতার মনে সকাল থেকেই অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজের শরীরে কিছু পরিবর্তন সে লক্ষ্য করেছে। প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি। ব্যস্ততা, কাজের চাপ এসব ভেবেই এড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজ আর সন্দেহটা উপেক্ষা করতে পারল না। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্য পরীক্ষা করেছিল। আর এখন, তার হাতে ধরা ছোট্ট রিপোর্টটার দিকে সে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে।
ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে জল চিকচিক করল। মুহূর্তের মধ্যেই তার মনে ভেসে উঠল ছোট্ট আরুর মুখ। তার সেই খিলখিল হাসি।তারপর মনে পড়ল আবরাজের সেই শান্ত হাসিটা। যে হাসিটা একসময় খুব কম মানুষই দেখেছে।
আদ্রিতা আলতো করে রিপোর্টটা বুকে চেপে ধরল। তার বুকের ভেতর আনন্দে কেঁপে উঠছে। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। দ্রুত গাড়িতে উঠে খান মহলের উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
ভাগ্য ভালো, আবরাজও ঠিক তখনই বাড়ি ফিরেছে। ঘরে ঢুকতেই আদ্রিতা তাকে দেখতে পেল। আবরাজ কোট খুলছিল। পরের মুহূর্তেই আদ্রিতা দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল।
আবরাজ একেবারে অবাক হয়ে বলল,
"আরে? কী হয়েছে লিটিল স্পার্ক?"
আদ্রিতার শ্বাস দ্রুত চলছে। উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে।
আবরাজ মুচকি হেসে বলল,
"আজ নিজে থেকে জড়িয়ে ধরছ? আমার তো মনে হচ্ছে আজ অনেক আদর-যত্ন পাওয়া যাবে।"
আদ্রিতা কিছু বলল না। শুধু আরও শক্ত করে তাকে জড়িয়ে ধরল। আবরাজ এবার সত্যিই চিন্তিত হয়ে গেল। বলল,
"সব ঠিক আছে তো?"
আদ্রিতা ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ দুটো ভিজে। কিন্তু মুখে অপার সুখের হাসি বিরাজ করছে। সে ধীরে ধীরে আবরাজের ডান হাতটা ধরে নিজের পেটের ওপর রাখল।
আবরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। আদ্রিতার চোখে তখন আনন্দের জল চিকচিক করছে। সে আস্তে করে বলল,
"আপনি আবার বাবা হতে চলেছেন, আবরাজ।"
কথাটা শুনে আবরাজ স্থির হয়ে রইল কিছুক্ষন। সে বলল,
“সত্যি? আমি..."
আদ্রিতা মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“হ্যাঁ। আমি প্রেগন্যান্ট আবরাজ।"
পুরুষ নাকি কাঁদে না! তবে আবরাজের চোখ ভিজে উঠল। একসময় যে মানুষটা ভাবত তার জীবনে আর নতুন কিছু পাওয়ার নেই, আজ জীবন তাকে আবারও এক অমূল্য উপহার দিল। আবরাজ ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর আলতো করে আদ্রিতার পেটের ওপর কপাল ঠেকিয়ে দিল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
"ধন্যবাদ। আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সৌভাগ্যবান মানুষ বানানোর জন্য।"
_________________************__________________
মানুষ জন্ম থেকেই খারাপ হয় না। কাউকে খারাপ বানিয়ে তোলা হয়। কখনও পরিস্থিতি, কখনও সমাজ, কখনও বিশ্বাসঘাতকতা, কখনও বা অসহনীয় কষ্ট তাকে সেই পথে ঠেলে দেয়।
কে বেশি শাস্তি পেল, আর কে কম শাস্তি পেল, সেই হিসাব করতে বসলে হয়তো জীবন শেষ হয়ে যাবে। কারণ সত্যি বলতে, এই কেউই কম কষ্ট পায়নি।
প্রত্যেকেই হারিয়েছে, প্রত্যেকেই ভেঙেছে। প্রত্যেকেই কোনো না কোনো যুদ্ধ লড়েছে নিজের ভেতরে। কিন্তু সব যুদ্ধের শেষ রক্তপাত দিয়ে হয় না। কিছু যুদ্ধের শেষ হয় শান্তি দিয়ে।
আবরাজ খান, একটা সময় যে মানুষটা ক্ষমতা, প্রতিশোধ আর রাজনীতির মাঝখানে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল, সে আজ জীবনের সবচেয়ে শান্ত জায়গাটায় এসে পৌঁছেছে।
তার কোলে থাকা ছোট্ট আরু আজ তার মেয়ে। হ্যাঁ, এটাই তার পরিচয়। এটাই সত্য। এর চেয়ে বড় কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার স্ত্রী আদ্রিতা। যে এসেছিল আবরাজের জীবনে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় হয়ে। আর সেই ঝড়ই শেষ পর্যন্ত তার এলোমেলো জীবনটাকে গুছিয়ে দিয়েছে।
প্রয়াণ খান, একজন মানুষ, যে জন্ম থেকেই তুলনার শিকার হয়েছে। প্রতিটি পদক্ষেপে বিচার হয়েছে। তার প্রতিটি ভুল বড় করে দেখা হয়েছে। সুখ শব্দটা তার জীবনে কবে এসেছিল, সে নিজেও হয়তো জানত না। এক সময় তার জীবনে অসংখ্য মানুষ ছিল। কিন্তু আজ তার হৃদয়জুড়ে আছে শুধু তার স্ত্রী রাহি। যে হাজার কথা শুনেও পাশে থেকেছে। যাকে বারবার বলা হয়েছে চলে যেতে। তবু যে ভালোবেসে গেছে প্রয়াণ কে, নিঃস্বার্থভাবে।
তাদের একমাত্র কন্যা রাজন্যা আজ তাদের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রমাণ।
সারফরাজ আহমেদ জীবনে যা একবার হারিয়েছিল, আজ যেন তা দ্বিগুণ হয়ে ফিরে পেয়েছে। সে পেয়েছে তার বাটারফ্লাই, প্রিয়ান্তিকে। যে তার জীবনে আবার রঙ ফিরিয়ে এনেছে। আবার বাঁচতে শিখিয়েছে।
সৃজা পেয়েছে একজন মাকে। যে তাকে জন্ম দেয়নি, কিন্তু মায়ের মতোই আগলে রেখেছে। যে নিজের সন্তানের চেয়েও আগে সৃজার সুখের কথা ভেবেছে।
আর আজ তাদের পরিবার পূর্ণ হয়েছে ছোট্ট সারহান আহমেদের আগমনে।
সময়ের বহমান স্রোতে কেটে গেছে আরও দেড় বছর।খান মহল আজ আবারও হাসিতে ভরা। ছোট্ট আরু এখন বড় আপু হয়ে গেছে। আদ্রিতা ও আবরাজের ভালোবাসার আরেকটি সুন্দর অধ্যায় আদ্রিজ খান।
বর্তমান.................._____________
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। আরু বড় হয়েছে। আবরাজ ও আদ্রিতার পুত্রসন্তান তাদের জীবনে এসেছে। যার নাম আদ্রিজ খান।
আদ্রিজও ধীরে ধীরে হাঁটতে শিখছে, কথা বলতে শিখছে। খান মহল এখন আগের চেয়েও বেশি প্রাণবন্ত কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়টা অন্য।
আবরাজ খান এখনও তার ছোট্ট আরুকেই সবচেয়ে বেশি আদর করে। এমন নয় যে সে আদ্রিজকে ভালোবাসে না। বরং ছেলেটার জন্যও তার ভালোবাসার কোনো কমতি নেই। কিন্তু আরুর জন্য তার হৃদয়ে যে জায়গাটা আছে সেটা অন্যরকম। একটা আলাদা জায়গা। একটা অনন্য সম্পর্ক।
আজও অফিস থেকে ফিরেই প্রথম প্রশ্ন থাকে,
"আমার আরু কোথায়?"
আরু দৌড়ে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার বুকে। আর আবরাজ এমনভাবে তাকে জড়িয়ে ধরে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা সে ফিরে পেয়েছে। আদ্রিজ মাঝে মাঝে এই দৃশ্য দেখে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সেও দৌড়ে এসে বাবার পায়ে জড়িয়ে ধরে।
তখন আবরাজ এক হাতে আরুকে আর অন্য হাতে আদ্রিজকে তুলে নেয়। কিন্তু সবাই জানে বাবার হৃদয়ের সিংহাসনে এখনও আরুরই রাজত্ব।
আর এই সব কিছুতে সবচেয়ে বেশি খুশি হয় আদ্রিতা। কারণ বহু বছর আগে সে একটা ভয় পেয়েছিল।
ভয় পেয়েছিল, যদি একদিন নিজের সন্তান আসার পর আরুর নিজেকে একা মনে করে। যদি মনে করে তার জায়গাটা কেউ নিয়ে নিয়েছে। যদি মনে করে সে আর আগের মতো প্রিয় নয়।
তবে আজ আদ্রিতা নিশ্চিন্ত। কারণ সে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটা ভুল ছিল না। আবরাজ শুধু কথা দেয়নি। সে তার প্রতিটি কাজে সেই কথা প্রমাণ করেছে।
-----------------*************-----------------
রাজন্যা এখন স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ফলে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, বাবা বাড়ি ফিরলেই সারাদিনের সব গল্প এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলা। আজও তার ব্যতিক্রম হলো না।
প্রয়াণ সোফায় বসে আছে। তার সামনে ছোট্ট রাজন্যা।রাজন্যার একটা হাত নিজের হাতে নিয়ে খুব সাবধানে নখ কেটে দিচ্ছে প্রয়াণ।
রাজন্যা একটানা কথা বলেই যাচ্ছে।
"বাবা জানো আজকে আমি স্টার পেয়েছি।"
"বাবা জানো তানহা আমার পেন্সিল নিয়েছিল।"
"বাবা জানো আমি আজকে টিফিন পুরো শেষ করেছি।"
"বাবা জানো আমাদের ম্যাম বলেছে আমি খুব সুন্দর ছবি আঁকি।"
প্রয়াণ মাথা নেড়ে বলল,
"বাহ।"
রাজন্যা হাত নাড়াতে নাড়াতে বলল,
"আর জানো বাবা?"
"হুম?"
"আজকে একজন ছেলে ক্লাসে কেঁদেছিল। কারণ ওর আম্মু দেরি করে নিতে এসেছিল।"
প্রয়াণ নরম গলায় বলল,
"ও আচ্ছা।"
রাজন্যা আবার বলল,
"তখন আমি ওকে বলেছি কাঁদো না।"
প্রয়াণ এবার মুচকি হেসে বলল,
"আমার মেয়ে তো খুব সাহসী।"
রাজন্যা গর্বে বুক ফুলিয়ে বলল,
"হ্যাঁ, কারণ আমি তো তোমার মেয়ে।"
প্রয়াণের হাত থেমে গেল। কথাটা শুনে তার বুকের ভেতরটা নরম হয়ে গেল। একসময় সে ভাবত জীবনে বড় কিছু করতে হবে। নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। সবার স্বীকৃতি পেতে হবে। আজ তার সামনে বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটা এক বাক্যে তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার দিয়ে দিল।
"আমি তো তোমার মেয়ে।"
প্রয়াণ আলতো করে রাজন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
"হ্যাঁ। তুই আমার মেয়ে।"
রাজন্যা আবার নতুন গল্প শুরু করল। প্রয়াণ হেসে ফেলল। গল্পটা যে কোথায় শেষ হবে, সে নিজেও জানে না। কিন্তু তাতে তার কোনো আপত্তি নেই।
ইস্তাম্বুলের মেয়র হিসেবে দিনের পর দিন মিটিং করতে তার ক্লান্তি লাগে। কিন্তু রাজন্যার এই অন্তহীন গল্পগুলো সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনতে পারে।
রাত এগোলে, রাহি রাজন্যাকে খাইয়ে, গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়ের পাশেই সে শুয়ে আছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে তাকে জড়িয়ে ধরল।
রাহি একটু চমকে উঠলেও পরমুহূর্তেই মুচকি হাসল। প্রয়াণ তার পিঠে মুখ গুঁজে রেখেছে। চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে তার চুলের ঘ্রাণ।
রাহি আস্তে করে বলল,
"মেয়ে আছে, প্রয়াণ।"
প্রয়াণ আরও একটু কাছে সরে এলো।
"মেয়ে তো ঘুমাচ্ছে, জান। প্লিজ।"
তার গলায় এমন এক আবদার ছিল যেটা শুনে রাহির হাসি আরও চওড়া হয়ে গেল।
প্রয়াণ তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তারপর সময় না নিয়ে রাহির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট মিলিয়ে দিলো। রাহি একটু থেমে, নিজেও সেই চাওয়ায় প্রশয় দিল। হাত দিয়ে চেপে ধরল প্রয়াণের শার্ট।
স্ত্রীর উৎসাহ পেয়ে আরো উন্মাদ হয়ে উঠল সে। রাহি চোখ বন্ধ করে অনুভব করছে প্রয়াণের এই উন্মাদ স্পর্শ গুলো।
কিছুক্ষণ পর প্রয়াণ ছাড়লো রাহিকে। রাহি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলো।
প্রয়াণ ফিসফিস করে বলল,
“তোমার মধ্যে আমি আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চাই আজীবনের জন্য।”
রাহির চুলগুলো এলোমেলো। তার মুখে রক্তিম আভার ছাপ। সে দু-হাত বাড়িয়ে প্রয়াণ কে নিজের দিকে টেনে নিল। নিজের সম্পূর্ণ সত্তা দিয়ে চায় ভালোবাসার মানুষটাকে।
প্রয়াণ ধীরে উঠে গেল। রাহি তাকিয়ে রইল, বোঝার চেষ্টা করছে, কি করতে চাইছে প্রয়াণ!
কিছুক্ষণ পর প্রয়াণ রাহিকে কোলে তুলে নিল। বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
রাহি বলল,
“প্রয়াণ?”
প্রয়াণ জবাব দিল,
“ভেতরে মেয়ে ঘুমাচ্ছে। বেশি শব্দ হলে উঠে পড়বে। যাতে অসুবিধা না হয় তাই এখানে এলাম।"
বারান্দার শেষ প্রান্তে এসে থামলো। রাহিকে সযত্নে শুইয়ে দিল কনভার্টিবল সোফার ওপর। তারপর নিজের শরীরের ভারটা ছেড়ে দিলো তার শরীরের ওপর।
মুখ গুঁজে দিল রাহির গলায়। রাহির ভীষণভাবে অনুভব করল স্বামীর উষ্ণ নিঃশ্বাস। ধীরে ধীরে প্রয়াণ হাত রাহির সমস্ত অঙ্গ জুড়ে বিচরণে ব্যস্ত হয়ে গেল।
রাহির শ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে চোখ খুলে প্রয়াণ কে দেখছে আবার চোখ বন্ধ করে হারিয়ে যাচ্ছে এক গভীর উন্মাদনায়।
প্রয়াণ রাহিকে পেয়ে নিজেকে সর্ব সুখী অনুভব করল। ভালোবাসার এক গভীর স্রোতে ভেসে গেল তারা। চারপাশে শুধু তাদের নিঃশ্বাসের মৃদু সুর, আর একে অপরকে আগলে রাখার অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
------------------*************----------------
বিকেলের দিকে আহমেদ ম্যানশনের এক কোণে দেখা গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য।
দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সারফরাজ আহমেদ মেঝেতে বসে আছে। আর তার সামনে রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে সৃজা।
আজ তার হঠাৎ ইচ্ছে হয়েছে নেইলপলিশ পরবে। আর অবশ্যই সেটা পরিয়ে দেবে তার আব্বু।
সারফরাজ অবিশ্বাস্য ধৈর্য নিয়ে ছোট্ট ব্রাশটা হাতে ধরে আছে।
"নড়বে না।"
সৃজা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
"আমি নড়ছি না।"
কথাটা বলেই আবার নড়ে উঠল। সারফরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
"সানশাইন।"
"হুম?"
"তুমি যদি আরও চারবার নড়ো তাহলে এই নেইলপলিশ তোমার নখের বদলে দেয়ালে লাগবে।"
সৃজা খিলখিল করে হেসে উঠল।
অন্যদিকে ছোট্ট সারহান পাশে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু দেখছে। তার চোখেমুখে এমন ভাব যেন পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সে গ্রহণ করছে।
মাঝে মাঝে বাবার হাতের দিকে তাকাচ্ছে। আবার তার আপু হাতের দিকে তাকাচ্ছে। হয়তো সে মনে মনে ভাবছে, বড় হয়ে বাবার মতো সেও নেইলপলিশ পরাতে পারবে।
রাত ধীরে ধীরে নেমে এলো। সৃজা ঘুমিয়ে পড়েছে। সারহানও অনেকক্ষণ আগেই বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। প্রিয়ান্তি দুজনকেই বিছানায় শুইয়ে দিয়ে আস্তে করে দরজা টেনে দিল।
তারপর দুজনে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দূরে ইস্তাম্বুলের রাতের আলো দূরে ঝলমল করছে।
সারফরাজ ধীরে প্রিয়ান্তিকে কোমর জড়িয়ে কাছে টেনে নিল। প্রিয়ান্তি মাথা তুলে তার দিকে তাকাল।সারফরাজ নিচু হয়ে তার কপালে একটা দীর্ঘ, স্নেহভরা চুমু খেল। তারপর কপালটা কয়েক মুহূর্ত সেখানেই রেখে মৃদু স্বরে বলল,
"ধন্যবাদ, বাটারফ্লাই। আমার জীবনে আসার জন্য। আমার ঘরটাকে আবার ঘর বানানোর জন্য।"
প্রিয়ান্তির চোখ নরম হয়ে এলো। সে চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
সারফরাজ ধীরে তার গাল ছুঁয়ে বলল,
"যদি কোনোদিন জীবন আমাকে আবার নিঃস্ব করে দেয়, যদি আবার সবকিছু ভেঙে পড়ে, তাহলে তুমি আবার এভাবেই আমার জীবনে এসো। আবার আমার পৃথিবীটাকে রঙে ভরিয়ে দিও। আবার আমার ঘরে হাসি ফিরিয়ে দিও। আবার আমাকে মনে করিয়ে দিও যে বেঁচে থাকা কতোটা সুন্দর।"
প্রিয়ান্তি হালকা হেসে ধীরে ধীরে বলল,
"পৃথিবীর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ মানুষটাকে আমি আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি। এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে?"
কথাটা বলেই প্রিয়ান্তি আলতো করে মাথা গুঁজে দিল স্বামীর বুকে। পরম উষ্ণতায় ভরে উঠল তার হৃদয়। সারফরাজের বাহুবন্ধনে নিজেকে আগের মতোই নিরাপদ মনে হলো তার। কারণ এই মানুষটার বুকই তার সবচেয়ে প্রিয় আশ্রয়।
_________________**************_________________
~ খান মহল ~
প্রয়াণের ঘরটা আধো অন্ধকারে ডুবে রয়েছে। বিছানায় রাজন্যা ঘুমিয়াচ্ছে। গায়ে নরম কম্বল দেওয়া।
বাইরে বসফরাসের ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। রাহির শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে। সে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে তার কোমর জড়িয়ে ধরল।
রাহি মুচকি হাসল। বলল,
"মেয়র সাহেব, চুপিচুপি আসার অভ্যাস এখনও গেল না?"
প্রয়াণ তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে বলল,
"পরের বারও এভাবেই আমার জীবনে এসো, চাঁদ। যদি আরেকটা জীবন থাকে, যদি আবার শুরু করার সুযোগ পাই তাহলে, সেই জীবনেও আমি তোমাকেই ভালোবাসব। সেই জীবনেও তোমাকেই আমার ঘর বানাব। সেই জীবনেও তোমাকেই আমার স্ত্রী হিসাবে চাইবো।"
রাহির চোখ ভিজে উঠল। সে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু প্রয়াণকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বসফরাসের ঠান্ডা বাতাস তাদের চারপাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে যেন পৃথিবীর আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
রাহি মুখ লুকিয়ে রাখল প্রয়াণের বুকে। এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। কাঁপা কন্ঠে বলল,
"ভালোবাসি, প্রয়াণ। ভালোবাসি আমার প্রণয়ের প্রথম পুরুষ কে। ভালোবাসি আমার সন্তানের বাবাকে। ভীষণ ভালোবাসি আমি তোমায়।"
ইস্তাম্বুলের আলো রাতের আকাশে ঝলমল করছে। আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে আছে দুইজন মানুষ। যারা শেষ পর্যন্ত একে অপরের কাছেই শান্তি খুঁজে পেল।কাউকে বদলে নেওয়ার থেকে তার সমস্ত ভাঙাচোরা, সমস্ত অসম্পূর্ণতা নিয়ে তাকে নিজের করে নেওয়াই ভালোবাসা।
_________________**************_________________
খান প্যালেসের রুফটপ।
আবরাজের বাহুবন্ধনে সম্পূর্ণ আবদ্ধ হয়ে রয়েছে আদ্রিতা। তার মুখের উজ্জ্বলতাই আবরাজের ভালোবাসার প্রমাণ।
আবরাজ মৃদু হেসে বলল,
"জানো, লিটিল স্পার্ক।"
আদ্রিতা তার দিকে তাকাল।
আবরাজ আকাশের অসংখ্য তারার দিকে তাকিয়ে বলল,
"মানুষ বলে আকাশে হাজার হাজার নক্ষত্র থাকে। কিন্তু আমার আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটা হলে তুমি।"
আদ্রিতা লজ্জা মিশ্রিত হাসি হাসল। আবরাজ মৃদু হেসে বলল,
"সমুদ্রের গভীর স্রোতকে বাইরে থেকে দেখা যায় না। কিন্তু তার গভীরে থাকে অদৃশ্য এক টান। তোমার প্রতি আমার ভালোবাসাটাও ঠিক তেমন। আমার এই হৃদয়ের গভীরে, সমুদ্রের সেই অনন্ত স্রোতের মতোই তুমি প্রবাহিত হও।"
বাতাসে আদ্রিতার চুল উড়ে উঠল। আবরাজ আলতো করে সেগুলো সরিয়ে দিল। বলল,
"জীবন আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে। আবার অনেক কিছু কেড়েও নিয়েছে। কখনও কখনও মনে হয়, আমার জীবনের পথটা যেন ঝড়ে ভরা একটা সমুদ্র ছিল।যতবার ভেবেছি তীরে পৌঁছে গেছি, ততবারই নতুন ঢেউ এসে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।"
তার আঙুলগুলো আলতো করে আদ্রিতার হাত ছুঁয়ে গেল।
"কিন্তু সেই দীর্ঘ পথের শেষে, আমি তোমাকে পেয়েছি। তবে আজ বুঝি কিছু হারানোও দরকার ছিল। কারণ সবকিছু পেলে হয়তো তোমাকে পাওয়া হতো না।"
সে ধীরে ধীরে আদ্রিতার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে দিল।
"তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি, লিটিল স্পার্ক। যদি আবারও জীবন আমাকে হাজারটা পথের সামনে দাঁড় করায়, তাহলে আমি প্রতিবার তোমার দিকেই হাঁটব।"
আদ্রিতা দুহাত দিয়ে আবরাজের গাল টা ধরে বলল,
"মানুষ সূর্যাস্তের সৌন্দর্যের কথা বলে। আমিও বলি, সূর্যাস্ত সুন্দর। কিন্তু তার চেয়েও সুন্দর আপনার এই দুই চোখ। কারণ সূর্যাস্তের রং কিছুক্ষণ পরই মিলিয়ে যায়, আর আপনার চোখের গভীরতায় আমি প্রতিবারই নতুন করে নিজেকে খুঁজে পাই। আপনার এই দুই চোখের গভীরতাতেই, আমি বারবার হারিয়ে যেতে চাই।"
কথাটা শেষ হওয়ার পর আবরাজ হালকা হেসে আদ্রিতার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
_________________**************_________________
”ইস্তাম্বুলের রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হয়ে উঠল। বসফরাসের জলরাশি নিঃশব্দে বয়ে চলল নিজের গন্তব্যের দিকে।
দূরে শহরের আলো ঝলমল করছে, আর আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য নক্ষত্র।
সময় কখনো থেমে থাকে না। গল্পও নয়। একটি অধ্যায় শেষ হলে আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়।
আজ গল্পের সমাপ্তি ঘটল। তার মানে এই নয় যে তাদের পথচলা থেমে গেল। বরং আগামীকাল সূর্য উঠলেই তারা আবার এগিয়ে যাবে নতুন দিন, নতুন স্বপ্ন, নতুন দায়িত্ব আর নতুন ভবিষ্যতের দিকে।
আবরাজ, আদ্রিতা, প্রয়াণ, রাহি, সারফরাজ, প্রিয়ান্তি প্রত্যেকের জীবনেই এখনও অসংখ্য অজানা সকাল অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করছে নতুন হাসি, নতুন স্মৃতি, নতুন গল্প।
কারণ জীবনের সবচেয়ে সুন্দর বিষয় হলো, এর কোনো শেষ নেই। একটি গল্প শেষ হয়, কিন্তু জীবন চলতে থাকে।
আর সেই চলমান জীবনের মতোই, ইস্তাম্বুলের বুকের ওপর লেখা তাদের গল্পটাও সময়ের পাতায় রয়ে যাবে চিরকাল।”
-- সমাপ্ত --
#লেখনীতে_নীলপ্রজাপতি
[নারীর ভালোবাসা ভয়ংকর সুন্দর। 🫶
এই গল্পের তিনজন পুরুষই তার প্রমাণ।
একজন পুরুষ ভালোবেসে নিজের ক্ষমতা, অহংকারের নেশাকে ত্যাগ করেছে। কারণ শেষ পর্যন্ত সে বুঝেছে, ভালোবাসার কাছে ক্ষমতাও তুচ্ছ।
আরেকজন নিজের উগ্র, বেপরোয়া স্বভাবকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছে। সঠিক পথ বেছে নিয়েছে। কারণ তার পাশে এমন একজন ছিল, যে তাকে শুধু ভালোবাসেনি, বরং তার ভেতরের মানুষটাকেও সবসময় বিশ্বাস করেছিল।
আর একজন সারা জীবন মরীচিকার পেছনে ছুটে ভেবেছিল সেটাই ভালোবাসা। কিন্তু জীবনের প্রতিটি ধাপে নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার পর, তার জীবনে এক প্রজাপতির আগমন হয়েছিল। সেই বাটারফ্লাই-ই তাকে আবার বাঁচতে শিখিয়েছে, আবার হাসতে শিখিয়েছে, আবার ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
মা হিসেবেও প্রতিটি নারী অপার মমতাময়ী। 🫶
কারণ মা হওয়ার জন্য শুধু জন্ম দেওয়াটাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন এক বিশাল হৃদয়ের। এই গল্পের নারীরা সেই প্রমাণ।
তারা কেউ জন্ম না দিয়েও মা হয়েছে। নিজের সন্তানের থেকেও হৃদয় দিয়ে আগলে রেখেছে আরেকটি সন্তানকে। রক্তের সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে তারা শিখিয়েছে, মাতৃত্ব আসলে ভালোবাসার আরেক নাম।
আর সেই ভালোবাসার স্রোতেই পুরুষগুলোও শিখেছে পিতৃত্বের এক নতুন রূপ। শিখেছে, বাবা হওয়া শুধু একটি পরিচয় নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তে সন্তানের পাশে দাঁড়ানো, তাকে নিঃশর্তভাবে ভালোবাসা এবং নিজের হৃদয়ের সবচেয়ে সুন্দর জায়গাটুকু তার জন্য রেখে দেওয়ার নামই পিতৃত্ব।
ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে না, বরং তাকে পূর্ণতা দেয়। আর সেই পূর্ণতার সবচেয়ে সুন্দর রূপই হয়তো পরিবার। ❤️]