গল্প - #হৃদয়ে_চলছে_চৈতন্য_চৈত্র - ৮
লেখিকা - #বিলাইর_মা (ছদ্মনাম)
"যদি নিশ্বাসে নাম তোমার লিখা আমার মনে ভিতরে"
রায়লা আবেশের পাশে বসে আবেশকে কে শুনিয়ে শুনিয়ে গান গাচ্ছিলো, কিন্তু পুরোটা গাওয়ার পূর্বেই আকসা এসে রায়লা আর আবেশের মাঝ বরাবর বসে পড়ে। আবেশের দিকে রাগী চোখে চেয়ে রায়লার মতো করে গাইলো,
"পুরো দুনিয়ায় জ্বালিইয়া দিমু যদি চোখ আর কান যায় ওই দিকে"
আবেশ আকসার এমন করে তাকে শাসানি দেখে এক প্রকার বোকা বনে যায়। বোকার মতো করেই শুধালো,
"আমি আবার কি করলাম? তুই অমন কইরা আমার দিকে তাকাশ কেন?"
আকসা জবাব করলো না। নিকের হাতে থাকা প্যাড বুকে কি যেনো দেখতে থাকলো, আবেশও আর কথা বারালো না।
আবেশ আসার সুবাদে আজ বাড়িতে কাজিনদের মিলন মেলা শুরু হয়েছে। আবেশের মামাতো, খালাতো সব ভাইবোন আজ এসেছে। ওরা সকলের দিকে এসেছে। এখন পরন্ত বিকেল তারা ঠিক করেছে আজ সারা রাত গল্প করবে। অনেক বছর পর তারা সব ভাইবোন একসাথে হয়েছে। মূলত আবেশের কারণে তারা এতোদিন একসাথে হলেও ফাঁকা ফাঁকা লাগে এসেছে। আজ আবেশও আছে।
আকসার বড় মামার এক ছেলে দুই মেয়ে — বড় মেয়ে মালিহা, তার পর মাহিম, তার পর মইসা।
বড় খালার দুই ছেলে হায়াত, আর আরিফ। হায়াত আবেশের সমবয়সী, আর আরিফকে তো সকলে চেনে, আকসার ডান হাত।
আকসার গান শুনে মালিহা বলে উঠে,
"আরে আমার আকসা রানি, রেগোনা আমার ভাইয়ের উপর, কারণ সে তো তোমার হানি।"
সবাই এক চোট হেসে উঠলো। একসময় রেজা বলে, খুশিতে,
"আপু, তোমার গানের গলা তো অনেক সুন্দর। তাই আজকে তুমি তোমার পছন্দের একটা গান গাও না প্লিজ, আপু।"
সকলেই একসাথে চেঁচিয়ে উঠলো,
"না, প্লিজ ওই গানটা না।"
আবেশ অবাক হলো কারণ সে জানে আকসার গানের গলা অনেক সুন্দর। তাহলে কেনো তাকে মানা করছে গাইতে? তাই রায়ানের কানের কাছে মুখ নিয়ে জানতে চাইলো কাহিনি কি।
আবেশের মতো করে বলতে শুরু করলো,
"আরে ভাইয়া, তোমার বউ চার-কি-পাঁচ বছর আগে একদিন পরন্ত বিকেলে একজন লোককে দেখে উস্ঠা খাইছিলো। তাকে দেখেই তার ওপর মন দিয়ে বসেছিলো। তাকে সে প্রায় দুই বছর পর্যন্ত খুঁজেছে, পায়নি। ওই বেডারে আকসা দেখেছিলো এক বিষ্টি ভেজা ওয়েদারে। তার পর এখন যেই গানটা গাইবে, সেই গানটা বাজতে ছিল নাকি ওই সময়টা। তার পর থেকে যখন তাকে মনে হয়, তখনি আমাদের কাউকে না কাউকে জাগিয়ে তুলে হলেও গানটা গাইবে। আর সেই কাহিনি রিপিট করবে। এই হচ্ছে তোমার বউয়ের কাহিনি।"
আবেশ মন দিয়ে রায়ানের কথা শুনে, পর একটা বাকা হাসলো, কারণ এবার পথ পেয়েছে আকসাকে তার জীবন থেকে বের করার। সে মনে মনে দর কসা কসা করতে শুরু করে।
আকসা মাহিমকে দিয়ে তার রুম থেকে তার গিটারটা আনিয়ে নিয়েছে। এতক্ষণে গিটারটা এনেই আকসার হাতে দিলো। কালো রঙের গিটারটা আকসার অনেক সখের। এই জিনিসটা সে তার টিফিনের টাকা জমিয়ে কিনেছিলো। এটা তার জীবনের প্রথম গিটার। এটা ধরা পরে না, অনেক দিন পরে তার আরো চারটি গিটার আছে, সে গুলো আরো অনেক দামি। কিন্তু দিন শেষে তার এই গিটারটাই পছন্দের শিষ্যে।
গিটারে আঙুল দিয়ে টুংটাং আওয়াজ বের করে গাইতে শুরু করলো।
দৃষ্টিতে যেনো সে
"রাজ পুতিন"
"খুন হয়ে যাই আমি"
"প্রতি দিন"
"নামধাম জানি না"
"তার কিছু"
"তবুও দিলাম আমি"
"তার পিছু"
"কালো সানগ্লাসটাই"
"কেন এতো সুখ"
"হেই যুবক"
"রং চটা জিন্সের"
"প্যান্ট পরা"
"জ্বলন্ত সিগারেট"
"ঠোঁটে ধরা"
"লাল শার্ট গায়ে তার"
"বুক খোলা"
"সানগ্লাস কপালে"
"আছে তোলা"
"রাখনা ঠেকে কেনো"
"ঐ দুটি চোখ"
"হেই যুবক"
আবেশ তাকিয়ে আছে। কারণ এই মেয়েকে গান গাইতে থাকা অবস্থায় এতো ভালো লাগছে তা তার জানা নেই। হায়াত আবেশের ঘোর লাগা নজর দেখে, ঠাট্টা করে বলে,
"চোখ তো নামতে চায় না, মুখে বলে 'তারে আমি চাই না', এইতো আমাগোর আবেশের মনের ভাবোনা।"
হায়াতের কথায় আবেশ আকসার দিকে নামিয়ে চোখ নামাতেই রায়ান বলল,
"বাহ ভাই, বাহ! তুমি তো সেই ছন্দ পারো।"
হায়াত একটু ভাব নিয়ে কলার উচালো। এর মধ্যেই আবেশ আকসাকে বলে উঠে,
"তোর ফাস্ট লাভ তো দে, দেখছি ছাপরি রে, আকসা।"
"আপনি অন্তত এ কথা বললেন না। আপনার চাইতে তো ইস্টাইলিস্ট আছে সে।"
"তা তো বোঝাই গেলো।"
"কি বোঝা গেল শুনি? শোনেন, সে আপনার মতো চুলগুলো অন্তত কাউয়ার বাসা বানায় নাই, তাকে অন্তত বেডা লাগে। আপনারে তো তাও লাগে না। আরিবাকে দেখতে এসে কয়দিন পর আপনাকে পছন্দ করে যাবে। আপনার যেই বড় বড় চুল।"
"কিহ, তুই আমাকে মেয়ে বললি? তুই কি বুঝবি স্টাইলের, তুই তো থাকিস বেডা গো মতো।"
তাদের ঝগড়া দেখে হায়াত চেঁচিয়ে উঠলো,
"আরে, আরে, তোরা থাম ভাই। থাম, আমি বলি শোন।"
সকলে তার কথায় মনোযোগ দেয়। হায়াত আবার বলল,
"আকসা তো তার প্রম প্রেম নিয়ে বননা দিলে গান শোনালো। তুইও তোর প্রথম প্রেম নিয়ে ওকে গানে গানে বননা করে দে, তোর সেই নীল কুমারীর কথা।"
সকলে একই সাথে চেচিয়ে উঠে,
"হ্যাঁ ভাইয়া। তোমার গান শুনতে চাই প্লিজ ভাইয়া।"
এর মধ্যে বিপত্তি ঘটে। আকসাকে নিয়ে তার হাতের গিটার সে কাউকে দিতে চাচ্ছে না। এই বাড়িতে আকসার কাছেই গিটার আছে। হায়াত আকসার কাছে গিটার চাইলে আকসা বলে,
"এটা আমার, আর আমার জিনিস। তো আমি এতো সোজা ভাবে দিবো না।"
"তাহলে তুই কি দিলে দিবি?"
আকসা একটু হেসে হাত দিয়ে ইশারা করলো টাকার দিকে।
হায়াত জানে, যতক্ষণ টাকা না দেওয়া হবে, ততক্ষণে এ গিটার দিবে না। তাই মানিব্যাগ থেকে তিনশো টাকা বের করে বলল, নে।
আকসা টাকা নিলো, কিন্তু গিটার ছাড়লো না। তাই হায়াত আবার জিজ্ঞেস করলো,
আকসা বলল আরো দুইশত চাই তার।
হায়াত বলল, "তোর থেকে তোর গিটার না নিয়ে একটা গিটার কিনে আনা তো আরো ভালো ছিলো। ভন্ড রাজনীতি বীদ।" তার পর আরো দুইশত টাকা বের করে আকসার সামনে ধরতেই, এক প্রকার ঝরের বেগে আকসা টাকাটা নিজ দখলে নিয়ে নিলো। তারপর টাউজারের পকেটে ভরে ফেললো।
আবেশ গিটার হাতে নিয়ে টুংটাং আওয়াজ তুলে গাইতে শুরু করে।
যখন খোলা চুলে হয়তো মনের ভুলে,
"তাকাতো সে অবহেলে দু চোখ মেলে"
"হাজারো কবিতার, বেকারো সবই তার"
"হাজারো কবিতার, বেকারো সবই তার"
"তার কথা কেউ বলে না"
"সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা"
"সে প্রথম প্রেম আমার নীলাঞ্জনা"
সকলে হাতের তালির শব্দে জমজমাট হয়ে উঠে, তাদের আড্ডার মহল। হাজারো খুনশি মজা তামাশা মিয়ে সময়টা অনেক মধুময় হয়ে উঠে।
---
📊শব্দ সংখ্যা:- ৮০৫(প্রায়)