১৪.৯.২৫, বৃহস্পতিবার। বিকাল পাঁচটা। বাবুগঞ্জ সদর।
কামিজের নিচে উল্টো পাজামা পরে পুরো পাড়া ঘুরে এসে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। এমন অঘটন আমি মাঝেমধ্যে ঘটাই। এতে আমি বিব্রত হইনি। সবসময় যে পাজামা ঠিক করে পরতে হবে সংবিধানে এমন কথা কেউ লিখে রাখেনি। বড়ো একটা জীবনে মানুষ ছোট ছোট ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক,এসব নিয়ে লজ্জা পাইনা। এখন নিজের দোলনাটাতে চিতিয়ে শুয়ে ডায়রিটা হাতে নিলাম। এই ডায়রিটাকে গতকাল নিউমার্কেট থেকে নিয়েছি পুরনোটা হারিয়ে যাওয়ায়। ভাবছি যখন সবকিছু নতুন করে লিখতে হবে তাহলে প্রথম পাতাতে আফিফ ভাইকেই রাখি। আগের ডায়রিটা প্রথম পাতাতে অবশ্য জাংকুক ছিল। এখন সে আবেগ মরে ভূত হয়ে গেছে।
আফিফ ভাই। ভালো নাম সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ। আমার ভাবীর একমাত্র বড়ো ভাই। বয়স একত্রিশ ছুঁই ছুঁই। দেখতে, উমমম কিভাবে যে বলি….না অমন সিনেমার নায়ক সুলভ কেউ নয়। মাঝারি মানানসই উচ্চতার, ছিমছাম গড়নের শক্তপোক্ত দেখতে এক লোক। স্কিন নরমাল ডার্ক, চেহারা-কাঠামো চলনসই, এবড়োখেবড়ো কিচ্ছুটি নেই, বরং ওনার খাঁড়া নাকটা বেশ টানে আমাকে। আমার দাদী পুরুষ লোকের খাঁড়া নাক নিয়ে একটা কথা বলতেন সবসময়। পুরুষের নাক কতটা খাঁড়া তার ওপর নির্ভর করে নাকি তার ব্যক্তিত্ব। খাঁড়া নাকের পুরুষরা নাকি আচরণে প্রভাবশালী আর আধিপত্যশীল হয়, পৌরুষে টইটম্বুর। ওই ইংরেজীতে উপহাস করে বলে না? “সো কলড আলফা।”
ওটা বুঝিয়েছে দাদী। দাদীর চোখে আদর্শবান আলফা ছিলেন তার স্বামী মানে আমার দাদু, কারণ দাদু এক সাথে তিনটা বৌকে পেলেছে। একবার তো তিন বৌকে একসাথে প্রেগন্যান্ট করেছিল নাকি। আর আমার দাদুর নাকটাও খাঁড়া। চেঙ্গিস খানের মত বিশাল শরীর। ছবিতে দেখেছি।
তবে আমার আফিফ ভাই হলেন আলফা উইদাউট মাসেল অ্যান্ড অ্যাবস! খুব বেশি টসটসে মাসেল নেই, বরং শার্ট পরলে ভুঁড়ি খানিকটা সামনে উঁকি মারে,টের পাই আমি।
আফিফ ভাইয়ের দু'হাতে মাসেলের ওজন কম থাকলেও তার চালচলনের ঠাটবাটে নেই। বড্ডো ভারিক্কিই ওটা। মাটিতে কদম ফেললে মাটি দেবে যাবে দেমাগের ওজনে। ছাপোষা, মধ্যবিত্ত,পরিশ্রমী পুরুষের দেমাগ নিয়ে হাঁটাচলা করে সবসময়। চোখে মুখে সবসময় অস্থির গম্ভীরতাময় একটা ভাব লেগে থাকে। নিয়ম করে দোকানে বসতে হবে, ইনকাম বাদ দিয়ে এক বেলা নষ্ট করে বিছানায় গড়ানো যাবে না। পুরুষ লোক হয়ে রাত ন’টার আগে ঘরে ফেরা যাবে না। পাড়ার ড্রেনে ময়লা জমেছে? মিউনিসিপ্যালিটির লোককে ধমকে,ঘাড় ধরে এনে সেই ময়লা পরিষ্কার করাতে হবে। পাড়ার কোনো মেয়েকে বাইরের কেউ টিজ করেছে? দলবল নিয়ে গিয়ে বিহিত করতেই হবে তাকে! কোনো উৎসব এলে ছেলেপান লাগিয়ে গোটা পাড়া সাজাতে হবে! সে কিন্তু নিজে এসবে নামে না। বিদেশ থেকে ফিরে একটা ছয়তলা বাড়ি করেছে যে,সবসময় সেই ছয়তলা বাড়ির ছাদে উঠে পেছনে হাত বেঁধে টানটান দাঁড়িয়ে দেখবে সব। পুরো পাড়ায় ছরি ঘোরাবে কর্তৃত্বের। রিনা কাকি বলে “আফিফ আসলে ছয়তলা বাড়ি করেছেই এই পাড়ায় নজর রাখার জন্য।”
এই দাম্ভিকতাটুকুর জন্য অবশ্য মুরব্বি সমাজে তিনি বেশ আদরেরই লোক। সালিশ বৈঠকে মুরব্বিরা চেয়ার দেখিয়ে বসিয়ে দেয় এখনি। যে কোনো সম্মিলিত কাজে ওয়াহিদুল আফিফের মতামত আলাদা করে নেয়া হয়। সেই আফিফের প্রেমেই আমি পড়েছি। মাঝেমাঝে সুখ সুখ শিহরণ হয় ভাবলে, তো মাঝেমাঝে বুক চাপড়াই, পড়বি তো পড় এমন এক পুরুষের প্রেমে পড়ে এ কাল খোয়াতে হলো তিতলি?
ও আরেকটা কথা মনে পড়েছে,দাদী বলতেন “ওই তিতলি! বিয়ে করলে কোনো খাঁড়া নাকের পুরুষরে করবি! এরা হয় হ্যাডমওয়ালা। বাচ্চা নিলে এদের বাচ্চা পেটে ধরবি। ভোতা বিলাইয়ের মত মিনমিন্যা পুরুষের বাচ্চা পেটে ধইরা মজা নাই রে। হ্যাডাম ওয়ালা পুরুষের হাতে মাইর খাইয়াও শান্তি। নারী জীবন স্বার্থক।”
আফিফ ভাইয়ের খাঁড়া নাকটা দেখলেই দাদীর ঐ কথাটা মনে পড়ে যায়। পেট চেপে হেসে ফেলি প্রতিবার। আফিফ ভাই তথাকথিত আলফা মানে দাদীর ভাষায় হ্যাডমওয়ালা কিনা এ ব্যাপারে আমি বেশ গবেষণা চালিয়েছি। আচরণে কোনো গণ্ডগোল নেই। বাড়াবাড়ি কিছু উগ্রতা,ফালতু হিংস্র দেমাগ নেই। রোজ দেখি সকাল আটটায় বাজারের ব্যাগ নিয়ে তাজা সবজি কিনতে যায়, শপে বসে। শপে মেয়ে ঢুকলে প্রয়োজনের অধিক তাকায়না। দামে মেয়েদের ছাড় দেয়না,সে মেয়েরা হাসাহাসি করে ঢুলে পড়লেও। পাড়ার ছেলে পুলেদের নিয়ে বড়ো স্ক্রিনে হৈচৈ করে খেলা দেখে প্রতি সিজনে। প্রতি গরমে দায়িত্ব নিয়ে ছেলেপুলেদের সাথে জেগে থেকে এলাকা পাহারা দেয়। জুম্মাবারে মসজিদে যায় পাঞ্জাবি পরে। এ পাড়া মাড়িয়ে যাওয়ার সময় মসজিদের সেই জিলাপি এনে ভাবীর হাতে দেয়, কখনো দেয় আমাকে। এটা সেটা বাড়িতে এনে আমাকে দেখলেই ডাকবে,“এই তিতলি! ধরো ধরো ধরো! আমার সময় নেই,ভাত খেয়ে আবার দোকানে বসতে হবে!”
এই এতটুকুই গবেষণা করতে পারি মানুষটাকে আগপিছু। সবসময় একটা ছোটাছুটি ভাব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে এই ব্যস্ত মানুষটি। সত্যি বলতে বয়ঃসন্ধিতে পপ সিঙ্গার, বলিউডের তাবড় তাবড় বডিওয়ালা নায়ক, বিটিএসের নামকরা দু'জন সদস্যের জন্য ঘুমখোয়ানো আমি কখন কিভাবে এই সাদামাটা মানুষটির প্রেমে পড়েছি তা আমি জানি না। আগে গল্প উপন্যাসের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল আমার। বিদেশি থ্রিলার প্রেমী আমি,মাফিয়াদের গল্প পড়তাম। তাবড় তাবড় মাফিয়া। দুই সুদর্শন মাফিয়া একজন নায়িকার জন্য যুদ্ধ লাগিয়েছে,একে অপরকে ছিঁড়ে ফেলছে। নায়িকাকে জোর করে বিয়ে করে বিলাসবহুল লাইফ দিচ্ছে,আর সকাল সন্ধ্যা রোম্যান্স থেরাপি। আমি তখন ভাবতাম অমন কেউ যদি আমাকে বিয়ে করতো জোর করে ! ইশ! জীবনটা একদম জমে যেত তবে!
সেই আমি এখন বেহায়ার মতো এমন সাদামাটা এক লোকের প্রেমে পড়েছি এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার। এটা নিঃশব্দে ঘটেছে কিন্তু প্রকাণ্ড ছিল উপলব্ধির সেই শব্দটুকু। এটা প্রথম টের পেয়েছি আফিফ ভাই তার দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পাঠ চুকিয়ে দু’বছর আগে যখন দেশে ফিরলেন সেবার। এর আগে কিশোরী থাকতে বুঝিনি,তখন লোকটাকে আমার প্রচণ্ড বোরিং লাগত। লাগত আনস্মার্ট আর মুরব্বি। তাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম ঐদিন, আমাকে আবার তাদের বাড়ি থেকে কেউ পছন্দ করেনা। দাওয়াত করেছিলেন চক্ষুলজ্জায়। গিয়েছিলাম ভাইয়ার হুকুমেই,আমার জীবন আবার ভাইয়ার হুকুম ছাড়া দুই কদম চলেনা। খেতে বসার সময় ভাবীর বোনরা কোনোরকম পাতে তরকারি তুলে দিয়ে ওপাশে নিজেদের হাসি আড্ডায় ব্যস্ত পড়ল। আমি মুসাফিরের মত একা বসে খাচ্ছি। আফিফ ভাই এসে একটা নুনের বাটি সামনে রেখে পাশে বসলেন। আমার মুখে সহজ চোখে চেয়ে বললেন,“কম হয়েছে এটা তরকারিতে। ফারজু রান্না করেছে। আমি নুন কম হলে খেতে পারিনা। তুমি এটা দিয়ে খাও! ডালটা ভালো লাগবে।”
আমি চুপচাপ খাচ্ছিলাম। সে আমার পাশে পুরোটা সময় চুপ থাকলেন। আমি খেয়ে উঠে হাত ধুতেই টিস্যুও খুঁজে দিলেন। একদম সহজ ও স্পষ্ট আচরণ। আমার টিউশন আছে বলে যখন আমি তাড়াহুড়ো করে বেরুবো তখন বোনদের ডেকে ডেজার্ট দিতে বললেন,আমাকে না খাইয়ে ছাড়বেন না।
এই খুবই সাধারণ একটি ঘটনা। খুবই হাস্যকর! কেউ নুনের বাটি নিয়ে এগিয়ে আসলে তার প্রেমে পড়ে মানুষ? হ্যাঁ পড়ে! আমার মতো মেয়েরা ঐ অতটুকুতেই প্রেমে পড়ে। বিষয়গুলো নিজেরা চাক্ষুষ না হলে কেউ বুঝবে না। ঐ সময়টিতে আমি পুরুষটার চোখে যতটুকু বিনয় দেখেছি, মনযোগ দেখেছি, বোনদের আচরণের দরুন সুতীব্র অপরাধবোধ দেখেছি চোখে আর ধৈর্য দেখেছি আমার পাশে বসে থাকার,তাও চোখ নামিয়ে। যেন তার উপস্থিতি আমাকে খেতে সংকোচে না ফেলে দেয়।
আমি এরপর থেকে আফিফ ভাইয়ের ওই স্বাভাবিক কাজ-বাজেই খুঁজতে থেকেছি স্মার্টনেস। ঐ কি যেন বলে? পৌরুষ। ইংরেজিতে মেয়েরা বলে না “ম্যানলি?”
পুরুষত্বের আসল মাধুর্য। আফিফ ভাই শার্টের বোতামে ঝামেলা হলে সেটা ঠিক করাতে হাতে নিয়ে এ বাড়িতে ভাবীর কাছে ছুটে আসে,খুব অনুরোধ করে বোনকে ওটা ঠিক করে দিতে,বোন কাজটা করে দিলে আবার পঞ্চাশ টাকা বকশিস দেয়,ওটা আমার কাছে ম্যানলি। মাঝেমাঝে লুঙ্গি পরে একটা ঢিলেঢালা টিশার্ট গায়ে চাপিয়ে গলির মাথায় গিয়ে পাগলা কুকুর গুলোকে ভাগিয়ে দিয়ে আসে যাতে পাড়ার বাচ্চাদের না কামড়ায়,ওটা আমার কাছে ম্যানলি। মোড়ের মাথায় সবজির ভ্যান থামিয়ে হাতে তুলে সবজি দেখেন কোনটা ভালো কোনটা পঁচা,ওটা আমার কাছে ম্যানলি। পাড়ার মাঠে নেমে একা একা কখনও কাঁচের টুকরো খুঁজে পরিষ্কার করে মাঠ, যাতে বাচ্চাদের পায়ে না লাগে ওটা আমার কাছে ম্যানলি। তিন বোনের শ্বশুরবাড়িতে প্রতি সিজনে কেজি কেজি সিজনাল ফলমূল কিনে নিজে বয়ে নিয়ে দিয়ে আসে,তখন তার ঘামে ভেজা মুখটা আমার কাছে ম্যানলি লাগে। রোজ নিয়ম করে বাইকটাকে বাড়ির উঠানে নামিয়ে গোসল করানোর সময়ে একমনে বালামের গান শোনেন, হেরে গলায় আবার গুনগুনও করেন, ওটাও আমার কাছে ম্যানলি! বোনের বাড়িতে খেতে এলেও প্লেটটা কখনো টেবিলে না রেখে হাতে তুলে নিয়ে সিঙ্কে রেখে ধুয়ে ফেলে, ওটা আমার কাছে ম্যানলি! সারাজীবন একটা ভালো সাবানেই তার রুপ চর্চা হয়েছে,আর একটাই পারফিউম সবসময় ব্যবহার করেন,ওটা আমার কাছে ম্যানলি। দোকানের সামনে থেকে হেঁটে এলে আমাকে ডেকে রিকশায় তুলে দেয় শাসনের সুরে, তবে কখনো নিজের বাইকে চড়ার অফার করেনা। ওটাও আমার কাছে ম্যানলি! আর এভাবেই ছাপোষা আফিফ ভাই,পুরোটাই আমার কাছে ম্যানলি। আমার এ কালের মহামারীর ন্যায় শরীরে ঠেশে বসা এক শিহরণ। এখানে যদি বিয়ে নাও হয় আমার, বুড়ো বয়সে অন্তত নিজের নাতী নাতনিকে আয়েশ করে গল্প শোনানোর মত একটা চকচকে চরিত্র এই আফিফ ভাই! শুভ্রতা,ম্যানলিনেস আর পজিটিভিটির এক অনন্য মিশেল। আমার আলফাম্যান!
ওহহ, আমার পরিচয়টা লিখি। আমি জিনাত সুলতানা তিতলি। মাস্টার্স পড়ছি, পাশাপাশি দু'টো টিউশন করাই। বয়স ছাব্বিশ। দেখতে একদম অ্যাভারেজ। গায়ের রং ফরসা তবে নাকটা ভোঁতা। উচ্চতা চার ফুট নয়। ঐ যে কিছু মেয়ে থাকেনা,সাইজে খাঁটো বলে বিয়ে হচ্ছে না। প্রতিটা সম্বন্ধ ভেঙে যায় মেয়ের উচ্চতার দোহাই দিয়ে। ওটাই আমি। খুব রূপবতী হলে অবশ্য এক পাশ মানিয়ে যেত, কিন্তু আমি অমন নই। এ ধরণের মেয়েদের ত্রিশ পেরুলে কোনো বিপত্নীক লোকের সাথে বিয়ে হয়। আমার অবস্থাও হবে এমন,খুব সম্ভবত! সে নিয়ে আপাতত ভাবছি না। আচ্ছা আফিফ ভাইকে লিখে শেষ করি আগে…
মূল কথা হচ্ছে, ভীষণ পরিশ্রমী এক লোক। চব্বিশ ঘন্টা দৌড়াবে। উনিশ বছর বয়সে পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে ইতালি পাড়ি জমিয়েছিলেন চার বোনের দায়িত্ব নিতে। পর্যাপ্ত অর্থসম্পদ কামাই করে এনে আবার এই দেশেই থিতু হয়েছেন বোনদের দেখবে বলে। বোনরাও ভাই অন্ত প্রাণ। ইদানিং উঠেপড়ে লেগেছে ভাইকে বিয়ে করাতে। হাতে ধরে আছে পাত্রীদের লম্বা লিস্ট। কোনোটিই মনে ধরেনা তাদের। বছরখানেক তো এভাবেই কাটালো। আফিফ ভাই অবশ্য বিয়ে করছেন না একটা নির্দিষ্ট কারণে। তাদের সবচে’ ছোট বোনটা,নাম রুমকি। ওর বিয়ে দিয়ে তবেই বাড়িতে বৌ তুলবে বলে ধ্যান করেছেন। মাঝেমাঝে এ বাড়িতে এলে মজা করে বলে,“দেরি যখন হয়ে গেছে বিয়েটা পরেই করব বুঝলি তিতলি! আজকালকার মেয়েদের যা স্বভাব চরিত্র। বনিবনা হয়না ননদ ভাবীতে। আমি কোনো ঝামেলায় নেই বাবা।”
আমাদের উভয়ের খুব কাছের আত্মীয় মুরসালিন চাচা, একবার ভাবীর কানে অবশ্য তুলেছিলেন কথাটা,“তোমরাও ভালো মেয়ে খুঁজছো। আমাদের তিতলির জন্য সম্বন্ধ খুঁজছে মাহবুব। তো এখানেই নয় কেন? দু'জনকে মানাবে ভালো।”
ঐ দিনই, ভীষণ আক্রোশে ক্ষেপে উঠেছিল ভাবী। অমন মূর্তি আমি কখনো দেখিনি আর। একদম গোখরোর মতো ফনা তুলে বলেছিল,
“ঐ মেয়েকে করবো আমার ভাইয়ার বৌ? পাগলা কুত্তায় কামড়েছে নাকি? ঐ মেয়ে কোন মায়ের পেটে হয়েছে তা জানেন না? প্রয়োজনে একটা ছাড়াছাড়ি করা মেয়ে এনে দেবো ভাইয়াকে তবুও ওকে নয়।”
ভাবী আমাকে এত কেন অপছন্দ করে তা আজ লিখবো না, আরেকদিন। আজ শুধু আফিফ ভাইকে নিয়ে লিখবো। আফিফ ভাই স্বভাবে খুবই স্বল্পভাষী হলেও পুরোপুরি পাগলা ধরণের এক মানুষ। সারাদিন কথা বলবে না বলবে না কিন্তু যখন বলবে তখনই সেরেছে! তাকে অন্যসময় নিরামিষ লাগলেও রাজনীতির দিকে খুব আগ্রহ দেখি। যাকে সামনে পাবেন তাকে ধরে নিজের জ্ঞান ঝাড়বেন। সেদিন তার দোকানে গিয়েছিলাম,আমাকে বললেন,“এ কোনো সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে না তিতলি। এ হচ্ছে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা মার্কা নির্বাচন। জুলাই আন্দোলনের ঘাড়ে চেপে কিছু সিন্দাবাদের ভূত এসেছে দেশে। একদম বাঁশি বাজাতে বাজাতে নিয়ে গর্তে ঢোকাবে তোদের বুঝলে। জনগনও খুব খাচ্ছে এদের ঢপের মোয়া। শা’লা আমার দেশে ফেরাটাই ভুল হয়েছে। বোন চারটা না থাকলে কক্ষনো মারাতাম না এ পাড়া!”
[ আফিফ ভাই আমাকে কখনো তুই করে বলেন আবার কখনো তুমি। আমি খেয়াল করে একটা বিষয় আবিষ্কার করেছি। তার মন ফুরফুরে থাকলে আমাকে তুই বলে,মন বেজার থাকলে তুমি। ]
আফিফ ভাই খুবই সোজাসাপ্টা লোক, সরাসরি রাজনীতি করে না কিন্তু মুখে তেলায় না কাউকেই। সমান তালে সবাইকে ধোবে। এ কারণে জুলাই পরবর্তী সময়ে দুই তিনটা দলের মাথার লোকের থেকে হুমকিও খেয়েছেন। তারা বলে গেছে এ পাড়ায় ব্যবসা করা দেখিয়ে দেবে। আফিফ ভাই এসব ভয় পায়না। তিনি নিশ্চিন্ত মনে দোকান খোলে রোজ, তার পালসারটা রোজ রাত ন’টায় আবার গলির রাস্তায় ঢোকে। এক মিনিটও দেরি নয়।
আফিফ ভাই ভয় না পেলেও আমি বেশ ভয় পাই এসব। মানুষটাকে নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তা হয়। বৌ হলে খুব শাসন করতাম,ঠোঁটকাটা স্বভাবটা পাল্টে ফেলতাম। বৌ নই তাই শুধু দুশ্চিন্তা করি একা একা আর……..
চরের মসজিদে আজান হতেই কলমের গতি কমে আসে তিতলির। হতভম্ব মুখ তুলে আশেপাশে তাকায় ও, ব্যস্ত হাতে ওড়না টানে মাথায়। এই না কেবল আসরের নামাজ পড়ে ডায়রিটা হাতে নিলো? এর মাঝেই মাগরিব। কত শব্দ লিখেছে ডায়রিতে তা বুঝতে পারছে না,তবে মনে হচ্ছে কেটে আবার লিখতে হবে। কথাগুলো গোছালো হয়নি। কেমন অগোছালো হয়েছে আফিফ ভাইয়ের পরিচয়পর্ব।
ডায়রি বন্ধ করে দোলনার বাইরে পা রেখে তিতলি আশেপাশে তাকায়। গোটা ঘরময় নিশ্ছিদ্র নীরবতা বিরাজমান। ভাবী কোথাও নেই। সামনের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, পেছনের দরজায় বাইরে থেকে তালা। দেখেই মেজাজ পুরোপুরি গরম হলো তিতলির। এই মহিলাকে কতবার বলেছে,তিতলিকে একা এভাবে ফেলে যাতে পাড়া ঘুরতে না নামে,তিতলির একা ঘরে থাকতে বেশ ভয় লাগে। কে শোনে কার কথা। তিতলিকে তিলে তিলে কষ্ট না দিতে পারলে রাতে ভালো ঘুম হয়না সম্ভবত আফিফ ভাইয়ের ছোট বোনটির। হতো যদি অমন দজ্জাল ননদ,তবে তিতলিও ভাইয়াকে দিয়ে মার খাওয়াতো এই মহিলাকে,সত্যি সত্যি। পুরোপুরি সাইকোপ্যাথ হয়ে গেছে মহিলা। সবার ওপরে রাগ সবসময় তিতলির ওপর ঝাড়ে।
সুপ্ত শ্বাস ফেলে তিতলি ভয়টুকু গিলে নেয়। নামাজ পড়ে এসে সামনের বড়ো বারান্দায় চটের বস্তা বিছিয়ে নারকেল ছিলতে বসে। আদেশ দিয়েছিলেন রানীমা বিকেলে,নারকেল ছিলে না দিলে যদি আবার কথা শোনায় বাড়িতে এসে?
সামনের দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হয়, তিতলি উঠে মাথায় ওড়না টানতে টানতে জানতে চাইল,“কে?”
_“আমি।”
গলাটা আফিফ ভাইয়ের। শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যাওয়ার মতো খসখসে ভারী একটা গলা। শুনলেই গা দুলে ওঠে তিতলির। তবে ভ্রু কুঁচকেছে ওর।
জবাব দেওয়ার ঢং দেখো! “আমি!”
যেন উনি জেনে বসে আছে এই গলা তিতলির অতি চেনা। একবার বললেই দরজা খুলে দেবে গদগদ হয়ে। সেই তো সামনে দিয়ে হেঁটে গেলে ভালো করে দেখেও না!
তিতলি বিরক্ত নিয়ে বলল,“আমি টা কে?”
_“আমি আফিফ,তিতলি। দরজা খোলো!”
তুমি করে বলছে এখন,তার মানে আফিফ ভাইয়ের মন উদাস। তিতলিরও মন উদাস হয়।
“আহা কি হয়েছে আমার সন্টুমন্টু পছন্দের মানুষটার?”
তিতলি মনেমনে প্রশ্নটি করে দরজা খুলে দেয়। ক্লান্ত মুখে ঘাম জমে আছে কপালে, দৃষ্টি সহজ ভঙ্গিতে তিতলির চোখেই। দেখামাত্র বলল,“কি করছিলে? তখন থেকে ডাকছি।”
_“নারকেল ছিলছিলাম আফিফ ভাই। শুনতে পাইনি।”
আফিফের পেছন থেকে সৌভিক ভাই মাথা বের করে হাসলো।
_“আমিও এসেছি। ভাবলাম পানি খেয়ে যাই।”
_আসুন। আপনার না আজ ইন্টারভিউ ছিল?
_ছিল। দিয়েছি,এবারো হবেনা সম্ভবত। কি যে এক জ্বালায় আছি তিতলি। চাকরিও হচ্ছে না,কেউ মেয়েও দিচ্ছেনা বেকারকে। শালা এর থেকে একটা পারশিয়ান বিড়াল হয়ে জন্মালে বেশ হতো। অন্তত মেয়ে লোকের কোলে উঠে বসে থাকতে পারতাম সারাদিন। মেয়েরাই তখন আমার দায়িত্ব নিতো,এখন এই বেতারকে কেউ গছেনা।
তিতলি হাসে খিলখিলিয়ে। সৌভিক ভাইয়া ভীষণ মজার লোক,আফিফ ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও, হাঁটাচলা একসাথে। প্রায়ই আসেন বাড়িতে।
তবে অমন মজা শুনে আফিফ নির্বিকার। দৃষ্টি তিতলির হাতে। বলল,“হাতে লাগবে। খুব ইমার্জেন্সি বুঝি? দাও আমি ছিলে দিই।”
তিতলি সাথে সাথে মাথা হেঁট করে নাড়ল ঘাড়,হাতের দা’টা আফিফকে দিতেই আফিফ বসল ঝুঁকে। নারকেলে কোপ বসিয়ে বলল,“ফারিয়া কই?”
_“জানিনা। সম্ভবত মৌসুমী ভাবীর বাড়িতে গেছেন। ফোন সাথে নেয়নি। কল করেছিলাম।”
_“তুমি বাড়িতে একা?”
_“জি।”
_“এটা কেমন কথা! ওর মাথায় কি বুদ্ধি শুদ্ধি নেই!”
তিতলি ভ্রু কুঁচকে নেয় আবার, ঠোঁট উল্টে আসে কষ্টে। মনে মনে আফিফ ভাইকে নালিশ করে,“একদম আফিফ ভাই। আপনার বোনের মাথায় বুদ্ধি শুদ্ধি নেই।”
মুখে বলেনা কিছু,চেয়ে চেয়ে লোকটাকে গিলতে থাকে গোগ্রাসে। ইদানিং শুকিয়ে যাচ্ছে, বৌ না থাকলে তো শুকাবেই! আহারে!
সৌভিক কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পানি খেয়ে চলে গেল। ফারিয়া তখনো ফেরেনি। আফিফ নারকেলটা ছিলে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“আচ্ছা। মাহবুব আমার কাছে কিছু টাকা ধার চেয়েছিল। ওটা দিতে এসেছি। ফারিয়াতো নেই,আসুক। তুমি থাকো তবে।”
যেমন সাদামাটা ভাবে ঘরে ঢুকেছিলেন, অমনভাবে বেরিয়ে গেলেন মানুষটা। কিন্তু ঠিক গেলেননা। তিতলি পা টিপে টিপে এগিয়ে গিয়ে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখল, বৈঠকখানার বেঞ্চিতে বসে আছেন চুপচাপ।
পানসে মুখটা গদগদ হয়ে হেসে উঠল তিতলির। চকচক করছে চোখ দুটো। ও জানতো এটাই হবে, এ যে আফিফ। ওর আলফা ম্যান। তিতলির সবটুকু শিহরণ। এই মানুষটা এখন বৈঠকখানায় বসে থাকবে যতক্ষণ অবধি না ফারিয়া আসবে। ভুলেও ঘরে ঢুকবেন না।
তিতলিও সাধে না, চুপচাপ একগ্লাস লেবুর শরবত বানিয়ে হাতে ধরিয়ে দিয়ে আসে। ওর হাত ঠকঠক করে কাঁপে। ঘরে এসে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।
ভাবী চায়না, ভাইয়াও শুনলে মানবে না, আফিফ ভাই জানেন না, তিতলিও কখনো জানাতে পারবেনা। একটি সত্যি সবসময় তিতলির ডায়রিতে লুকিয়ে থেকে যাবে।
সব জেনেও,সব বুঝেও তিতলির অবস্থা ঐ গানের লাইন দু’টোর মতো,
“কাদমো কো সামহালে, নাজরোকা কেয়া কারে?”
লাইনটা মাথায় ঘুরছে তিতলির,এটাও ডায়রিতে লিখে ফেলা দরকার।
চলমান…..
#ও_যে_মানে_না_মানা
#সূচনা_পর্ব