#ও_যে_মানে_না_মানা
#পর্ব_২
বর্ষা শেষ হয়েছে সেই কবে। দুই মাস আগে। এখন আশ্বিন। এই মরশুমের মাথায় খুব সম্ভবত গন্ডগোল আছে। লাগাতার বৃষ্টির আজ চারদিন, অবশ্য আজকে একটু রেহাই পেয়েছে দুনিয়া। এগারোটার দিকে চড়া একটা সূর্য উঠে উঠানের কাঁদামাটি চটচটে করে দিয়েছে। শেষপ্রান্তে এসে আজ দিনটা ভীষণ রকম স্বচ্ছ। রোদটা মিঠ মিঠা। অতিরিক্ত কট্টর দাবদাহ নেমে গেছে আগেই। তিতলি জানালা ঘেঁষে চেয়ার টেনে বসে হুমায়ূন আহমেদের একটা বই পড়ছিল। বইটা পড়ে মেজাজ চরমে। একটা পাগলা আচরণের নায়ক, পেশায় বেকার,যার প্রধান কাজ গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানো, অকাজের পাজি,মাঝেমাঝে দার্শনিক সব কথা বলে সবাইকে চমকে দেয়। তার জন্য গল্পে দুই বোন পাগল। প্রধান নায়িকা ছোট বোন। বড়ো বোনের সাথে নায়কের সম্পর্ক ছিল শুনে ছোট বোন সুইসাইড করতে যায় পুকুরের জলে ডুবে। মানে, ফাজলামির সীমা পাড় করা কাহিনী। কেনো দেশে আর কোনো ছেলে নেই? দুই বোনের এক ছেলেকে ভালো লাগতে হবে কেন? এতো আবেগ কোথা থেকে আসে তোদের? নেকুপিসুর দল!
গালিটা যেন বুমেরাং হয়ে তিতলির গায়েই পড়ল তখন। নেকুপিসু তো সে নিজেও কম নয়,নইলে দুনিয়ায় এত এত ছেলে থাকতে আফিফ ভাইকেই কেন? রাতের অর্ধেক সময় নষ্ট করে কল্পনায় তার সাথে সংসার করে। একটা মধ্যবিত্ত সংসার। সে সংসারে তিতলি রান্নায় নুন কম দিলে, অভিযোগ না করে চুপচাপ পাতে নুন নিয়ে খায় ঐ ভদ্রলোক। চুমু খেতে এলে তার খাঁড়া নাকের সাথে রোজ তিতলির বোচা নাকের সংঘর্ষ হয় সেই সংসারে।
বসার ঘরে আওয়াজ হচ্ছে। ঘরের কোণে টিভির পর্দায় খবর চলছে। নতুন গড়ে ওঠা একটা রাজনৈতিক দলের দু’জন মাঠপর্যায়ের নেতার মুখে ক্ষতর দাগ, গতকাল মার খেয়েছে জনসভায়। সংবাদ পাঠকের ভাষা নির্লিপ্ত। গড়গড়িয়ে বলে চলেছে দেশে যা কিছু দৃশ্যমান সবটাই,তবে রাঙিয়ে চাঙিয়ে। এইসবের মাঝেই ভাবী সারাদিন বসে থাকে অস্থির চোখে। ভাইয়ের সাথে স্বভাব-চরিত্রে বিস্তর ফারাক থাকলেও এই বেলায় ঠিক ভাইয়ের মতো, রাজনীতিতে খুবই আগ্রহ। ইদানিং শোনা যাচ্ছে, পাড়ায় মহিলা সমাজে একটা দলের হয়ে খুব প্রচারণা চালায়। যে দলটিকে আবার আফিফ ভাই দুই চোখে দেখতে পারেনা মোটেই।
_“কোথায় যাচ্ছ?”
তিতলিকে পা টিপে টিপে সদর দরজার কাছটাতে যেতে দেখে ফারিয়া জানতে চাইল। দৃষ্টি টিভিতে। ভাবী প্রয়োজন ছাড়া তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলেনা কখনো। তবে এতে তিতলিরই সুবিধা। ও ইচ্ছামত ভেঙিয়ে দিতে পারে মহিলাকে। এইমাত্র জিভ বের করে ভেঙিয়েই বলল মনে মনে,“রংঢং করে তোমার ভাইয়ের মাথা ঘোরাতে যাচ্ছি!”
মুখে বলল,“টিউশন আছে।”
_“তুমি সায়মার কাছ থেকে স্যানিটারি প্যাড এনেছো ধার করে?”
_“হু। তখন ইমার্জেন্সি হয়ে গেছিল ভাবী। হুট করে পিরিয়ড শুরু হয়েছে।”
_“তাই বলে কেউ স্যানিটারি ন্যাপকিন ধার করতে যায়?”
আজ সারাদিনে তিতলিকে কথা শোনানোর জন্য কিছু পায়নি ভদ্রমহিলা। দিনশেষে কলিজা ঠাণ্ডা করা একটা প্রসঙ্গ পেয়েছে তাই শুনিয়ে দেবে ইচ্ছেমতো। তিতলিও শান দেয় জিভে,“আমার মতো মধ্যবিত্তরা স্যানিটারি প্যাড ধার করে।”
_“ধার করার কিছু নেই। আমার কাছ থেকে নেবে প্রয়োজন পড়লে। তাছাড়া পাড়ার মোড়েই তো ফার্মেসি,বাইরে ধার করতে হবে কেন? সায়মা কোনো মেয়ে হলো? পেছনে পেছনে সবার কাটি করে। তোমার ব্যাপারে বলে বেড়ায় তোমার নাকি আসাদের সাথে সম্পর্ক আছে। এমনিতেই তোমার বিয়ে দিতে পারছে না তোমার ভাইয়া। বাইরে কম নেমো তো! আসাদের সাথে অত মিশবেনা। মানুষ দু’টো কথা রটানোর সুযোগ পায়।”
তিতলি খানিকটা শক্ত হলো ভাবীর কথায়,
_“বিয়ে দিতে পারছে না বললে কেন? এটা তো কোনো চাকরির ইন্টারভিউ দিতে নামিনি আমি,যে হচ্ছে না,তাই হতাশ হতে হবে। বিয়ে কেন, আল্লাহর হুকুম না হলে গাছের পাতাও নড়ে না!”
_“তাই বলে তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাতে পারবে না তোমার ভাই। সম্বন্ধ একটার পরে একটা দেখতেই হবে! পরে গিয়ে যদি ভালো কাউকে না মেলানো যায়?”
_“তবে আমি যয়নাব দাদীর থেকে তুকতাক করা পানি এনে তোমার ভাইকে খাইয়ে তার গলায় ঝুলে পড়ব।”
মনে মনে জবাব খানা দিয়ে তিতলি টোট ব্যাগ নিয়ে বাইরে পা রাখে। ভাবীর ওপরে মেজাজ ওঠেনি সেরকম আজ। আসলে ভাবীর প্রতি তিতলির অনুভূতি মাঝে মাঝে বড্ডো বিভ্রান্তিময় থাকে। আজ থেকে ১১ বছর আগে এই ঘরে এসেছিল ভাবী। পাশের পাড়ার সৈয়দ বাড়ির টিনেজার মেয়ে,ক্লাস টেনে থাকতে তিতলির ভাই মাহবুবের সাথে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। তিতলির মা কখনো যাকে মানেইনি,উল্টো যত ধরণের মানসিক অত্যাচার আছে জীবদ্দশায় সব করে গিয়েছে। ফারিয়ার বাচ্চা হয়না বলে ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ের প্ররোচনা দিয়েছে বারবার, খাবার লুকিয়ে রেখেছে, পড়তে দেয়নি, ছেলেকে কান পড়া দিয়ে বৌকে মার খাইয়েছে মাঝেমাঝে। আফিফ বিদেশ থেকে সব শুনতো, বেশ কয়েকবার বলেওছিল বোনকে, না পোষালে ছাড়াছাড়ি করে নিতে। ফারিয়াই যায়নি। মানুষ হাসবে বলে যায়নি। দাঁত কামড়ে সংসার করে গেছে তিতলির ভাইয়ের।
সেই মেয়ে নিজের ঐ মৃত জল্লাদ শাশুড়ির রেখে যাওয়া বুড়ি ধারি মেয়েকে কোলে নিয়ে গদগদ করবে না তা তো নিশ্চিত। তবে ভাবী মাঝেমাঝে একটু অতিরিক্তই করে। ইদানিং তিতলি টের পায়, ভাবীর মেজাজ হারালে ভাইয়া মারও খায় ভাবীর হাতে। অবশ্য শুনলে মজাই লাগে তিতলির। ভাইকে মনে মনে গাল দেয়। ‘বেশ হয়েছে। বয়স থাকতে মা আর বৌয়ের মধ্যে ব্যালেন্স করতে পারিস নি। এখন খা বৌয়ের কিল ঘুষি! আহাম্মক লোক কোথাকার।’
এই সবকিছুর দায় ফারিয়া সবসময় তিতলির মাথায়ও রেখেছে। তিতলি ননদ হিসেবে ছিল সাপোর্টিভ, বাকি যা কিছু অসঙ্গতি ছিল তা কেবল মায়ের সাথে পেরে উঠতো না অত ছোট বয়সে,সে কারণে ছিল। তাই হয়তো ফারিয়ার ভরসার স্থল হতে পারেনি কখনো। ফারিয়ার চোখে তিতলির মা জাহানারা কটকটি হলে তিতলি তার শয়তান মেয়েটা। মায়ের সমানে সমান। এখন শাশুড়িটা তিন বছর হলো ব্রেইন স্ট্রোক করে মরেছে তাই ফাঁকা মাঠে ইচ্ছে মতো গোল দিচ্ছে আফিফ ভাইয়ের এক সময়ের অবলা বোনটি। এখন কখনো স্বামীকে ধরে মারে,কখনো ননদকে খোঁচায়।
কলেজ রোডে টিউশন দু’টো। দু'জনের বাবা ডাক্তার। তিতলি ইংরেজি আর ম্যাথ পড়ায় দু’টোকে। মফস্বলে দুই ঘর থেকে মোট সাত হাজার পাচ্ছে, এটাকেই জ্যাকপট ধরে ভীষণ খুশি তিতলি। হরমোনাল সম্পর্কিত নানাবিধ জটিলতার জন্য মাসে মাসে কাড়ি কাড়ি ওষুধ যেটা খেতে হয়,তার জন্য অন্তত ভাইয়ার কাছে হাত পাততে হয়না। হঠাৎ অনলাইনে একটা থ্রিপিস পছন্দ হলে কিনে নিতে পারে নির্দ্বিধায়। গত দুই বছরে চব্বিশ হাজার জমিয়ে একটা ডিপিএস করেছে। খুব বেশি একটা প্রেশার দেয়া হয়না মাহবুবকে। সদরে লাইব্রেরি আছে তার,যেখানে বিজনেসের অবস্থা ভালো যাচ্ছে না খুব একটা।
শেষ বিকেলের রোদ এখন নরম, ক্লান্ত। সারা বেলা রহম করে আবার বৃষ্টির ঝিরিঝিরি ছাট ঝরতে শুরু করেছে। কলেজ রোড থেকে টিউশন শেষ করে তিতলি যখন মেইন রোডে উঠেছে তখন বৃষ্টির ফোঁটা গুলো পয়সার মতো গোল। শরীরে লাগতেই জ্বলছে যেন। শীতে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে ও ছুট লাগিয়ে সোজা উঠলো গিয়ে আফিফের দোকানেই। মেইনরোডের পাশে অবস্থিত এটা, বছর তিনেক আগে পঁচিশ লাখ অ্যাডভান্স দিয়ে বিল্ডিংয়ের নিচতলা ভাড়া নিয়েছিল। দোকানের নাম নুরজাহান স্টোর। নিজের মায়ের নামে দোকানের নাম রাখা। রোজ কোনো না কোনো বাহানায় এই পথে আসে তিতলি। পথটা বড্ডো ঘোরা হলেও ওর ঐ পরিশ্রমী মুখটা দেখতে বেশ লাগে। শার্টের হাতা ফোল্ড করে রাখা বলিষ্ঠ হাতটা সবসময় ক্যাশের বিলিং কম্পিউটারে ব্যস্ত থাকে। কখনো উঠে কাস্টমারের পেছন পেছন হেঁটে তাদের প্রয়োজন জানতে চায়। কখনো বাইরে নেমে ধূলাট রাস্তায় পানি ছিটিয়ে দিয়ে আসে যাতে দোকানের কাঁচ না নষ্ট হয় ধূলাবালি উড়ে,দোকান বন্ধ করে মসজিদে ঢোকে সময়মতো। আবার এসে গম্ভীর মুখটা নিয়ে ক্যাশে বসে। তাকে অনেক টাকা উপার্জন করতে হবে,অনেক টাকা! এমন ভাব!
তিতলি শুধু এই পথ দিয়েই যায়না, নানা বাহানায় দোকানেও ঢোকে মাঝেমধ্যে। ঢুকলেই হাতে একটা দশ টাকার চকোফান বিস্কিট ধরিয়ে দেন আফিফ ভাই।
তবে আজ কোনো বাহানা নয়,সত্যি সত্যি তিতলির হাতে কোনো ছাতা নেই আর ভিজলে ঠাণ্ডায় ধরে যাবে,সে মহা বিপদ। তাই ও এসেছে।
আফিফ বেচাকেনা করছিল তখন। দোকানের একপাশে আবার ডিসপেনসারি রয়েছে। ওখানে আজ কর্মচারীটা নেই। আফিফই সামলাচ্ছে। গিয়ে এক মেয়ে কাস্টমারকে স্যানিটারি প্যাড দিলো নির্বিকার ভঙ্গিমায়, কাগজে মুড়ে জিনিসটা মেয়েটির ব্যাগে রাখলো মেয়েটা সামনে ব্যাগ পাততেই। নজর তুলে মেয়েটির মুখটাও দেখলো না লোকটা। আবার গিয়ে একজন কাস্টমারের বিল করে দিলো। তিতলিকে পেয়ে ব্যস্ততা কমিয়ে চেয়ার টেনে দিয়ে বলল,“বসো। বৃষ্টি কমলে গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আসবো।”
তিতলি বসে পা দোলাতে দোলাতে চুপচাপ দেখছে তাকে। হঠাৎ জানতে চাইলো,
_“আজ কোনো কর্মচারী নেই দোকানে?”
_“না,একজনের ওয়াইফের ডেলিভারি হবে। আরেকজন নিজের প্রেগন্যান্ট বৌকে ডাক্তারি চেকআপে নিয়ে গেছে।”
কর্মচারীরা জীবনযুদ্ধে এগিয়ে গিয়েছে আর মালিক পিছিয়ে আছে। তিতলি মনে মনে হাসলো শুনে। হঠাৎ এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,“দোকানে একজন নারী কর্মচারী রেখে দিতে পারেন তো! মেয়েদের ডিল করতে পারবে ভালো! আপনি তো দেখছি রোবট হয়ে যান নারী কাস্টমার এলেই।”
আফিফ মুসরি ডালের প্যাকেট গুলো চেক করতে করতে জবাব দেয়,“মেয়েদের ডিল করার কি আছে? মুদি বেচাকেনার কাজকারবারই তো! চাল চাইবে চাল দেবো,ডাল চাইবে ডাল দেবো, ওষুধ চাইবে ওষুধ দেবো। এই সামান্য ব্যাপারেই যদি মহিলা কাস্টমারকে স্বস্তি দিতে না পারি তবে আর এ দেশে ব্যবসা কেন? অন্য কোনো পর্দাশীল রাষ্ট্রে চলে যাবো যেখানে সব আলাদা আলাদা।”
আবার রাজনৈতিক প্রসঙ্গে ঢুকে যাবে আলোচনা। তিতলি আগেই সাবধান হয়। ধীরে বলে,“এমনিই বলেছি। অন্যকিছু মিন করিনি।”
_“আমিও সোজা কথা বলেছি। মুদি দোকানে মেয়েদের সামলাতে নারী কর্মচারীর প্রয়োজন নেই, আমরা কামড়াই না কাস্টমার ধরে! কেবল বেচাকেনা করি। বরং একটা নারী কর্মচারী রেখে দিলে পুরুষরা এসে বেহাংলাপনা দেখাবে। তখন আরেক বিপদ। দোকান সামলাবো নাকি নারী কর্মচারীর নিরাপত্তা দিবো,ক'জনকে ধরে ধরে মারবো? বাংলাদেশী ইতরদের কথা বোলো না, এরা কেন জানি নিজের চরকায় তেল দিতেই পারে না! ঐ মোড়ে চিতই পিঠা বানাতে বসে না ফুলি মেয়েটা? ওকে ঘিরে কতগুলো শুয়োরদের অহেতুক ভিড় লেগে থাকে সবসময়। দেখলে ইচ্ছে করে ফেড়ে দিই।”
তিতলি কতক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে থেকে অস্ফুট স্বরে বলল,“আপনি বাংলাদেশী পুরুষদের মধ্যে পড়েন না?”
আফিফ বল সাবানের বক্স গুলো সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রেখে বলল,
_“পড়ি। তবে আমি একটু ব্যস্ত পুরুষ। মোড়ের ফুলি তার কাজ করবে, চিতই পিঠা বেঁচে সংসার চালাবে, যা ইচ্ছা করবে। তাকে দাঁড়িয়ে দেখার মতো ফাঁকা সময় আমার নেই।”
বৃষ্টির ছাঁট খানিকটা কমে এলে আফিফ তিতলিকে বলে,“এখন সম্ভবত তোমার যাওয়া উচিত।”
এর মাঝেই দোকানে দলবল নিয়ে ঢুকেছে দেশের অন্যতম বড়ো রাজনৈতিক দলের স্থানীয় এক পাতি নেতা। এদের কাজ বড়ো বড়ো প্রতিষ্ঠানে ঢুকে চাঁদা সংগ্রহ করা। তিতলি এর আগেও দেখেছে এমন আরো কয়েকটি দল আফিফ ভাইয়ের এখানে এসেছিল, ঐ এক কারবার, তাদের চাঁদা দিতে হবে। আফিফ ভাই অবশ্য দেন না টাকা। মানুষটা হিসেবি,পরিশ্রমে উপার্জিত এক পয়সা হাত খুলে কাউকে অকারণে দিতে রাজি নন। প্রতিবার এসব লোকের সাথে আফিফ ভাইয়ের তর্কাতর্কি লাগে,আজ কি হবে ভাবতেই ভয় চেপেছে তিতলির মনে। অস্থির চোখ দু'টো কাঁচ গলিয়ে বাইরে রাখছে বারবার।
দলের মাথা আহসানুল, ডাকনাম যবেদ। বিগত সরকারের আমলে টানা সতের বছর গর্তে ঢুকে বসে থাকলেও, সরকার পতনের পরে খুব লাফাচ্ছে, ফাঁকা মাঠ পেয়ে কোলা ব্যাঙ হয়েছে। উত্তেজনা এতই আকাশ ছুঁয়েছে যে এখন শোনা যাচ্ছে বৌ রেখে আরেকটা বিবাহ করেছে লুকিয়ে, কুমড়াখালিতে। কি রেখে কি করবে যেন দিশা খুঁজে পাচ্ছে না। হাঁটলে একটু বেঁকে হাঁটে,পা ছড়িয়ে। পাইলস আক্রান্ত রোগীদের মতো পশ্চাৎদেশ দুলিয়ে।
আজও টাকা চাইলে আফিফ সোজা না করে দিলো। বরং ওদের সামনেই নিজের ক্যাশবক্স গুছিয়ে নিতে নিতে বলল,“কেটে পড়ুন।”
যবেদ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,“জনসেবার জন্য টাকাটা চাইছি। এমন ব্যবহার প্রত্যাশিত নয় আপনার থেকে।”
আফিফ হিসেবের খাতায় নজর বুলিয়ে জবাব দেয়,
_“জনসেবা করার জন্য আমার দু'টো ঠ্যাং আছে। আমি গিয়ে আমার ঘাম ঝরানো টাকা এতিমখানায় দিয়ে আসবো। এই সামান্য ব্যাপারে কোনো রাজনৈতিক দলকে মাধ্যম বানাতে হবে না। আর ব্যবহারের কথা কি বলছেন? যে যেমন তার সাথে তেমন ব্যবহার করতে হয়। আগে নিজের দলের লোকের বাচনভঙ্গি সুন্দর করুন। ধায় ধমক খাটবে না আমার জায়গাতে। আপনি এসে সালাম দিবেন,আমিও সালামের জবাব দিবো হাসিমুখে। আপনি বলবেন “কুত্তার বাচ্চা।” আমিও তবে বলবো,জি বলেন “শুয়োরের ছানা।”
পরিস্থিতি আশ্বিনি আবহাওয়ার মতো গুমোট। তিতলি ঠোঁট চেপে হাসছে। যবেদের মুখ শুকিয়ে আমসত্ত্ব। আফিফ চোখ তুলে শান্ত গলায় বলে,“মানুষের না কে সুন্দর ভাবে নিতে শেখেন। এতো বড়ো একটা দুনিয়া,সবাই আপনাদের পছন্দ করবে না সেটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। আমাকেও তো অনেকে করেনা, ঐ সামনের দোকানের মওলা ভাই করেনা। মসজিদে দেখা হলেও সালাম না দিয়ে পাছা ফিরিয়ে থাকে। আমি তাকে গিয়ে দাঁত খিচানি দিইনি তো! কেউ যদি পাছা ফিরিয়ে থাকতে চায় তাকে সেই স্বাধীনতা দেয়া উচিত।”
যবেদ আশাহত ও চুড়ান্ত অপমানিত হয়ে দলবল নিয়ে বেরিয়ে যেতেই তিতলি পেট চেপে হেসে উঠল। আফিফ নির্বিকার, মনযোগ নিজের কাজে। হাসি থামিয়ে তিতলি বলল,“আপনার ভয় লাগেনা এদের? এমন বলেন কি করে?”
_“ভয় লাগে। লাগবেনা কেন? যেকোনো সময় এসে পাথর দিয়ে থেঁতলে দেবে মাথা অথবা রাত্তিরে বাড়িতে গিয়ে হাত পায়ের রগ কেটে আসবে। তবে সব বুঝেও মেজাজ ঠিক রাখা যায়না আসলে। বিদেশে এই সিস্টেম নেই। দিনরাত গাধার খাটুনি খেটে, পিৎজা ডেলিভারি করে মুঠি মুঠি টিপস নিয়ে গিয়ে রাতে বালিশের নিচে ওসব টাকা রেখে জম্পেশ এক ঘুম দিতাম। টাকাগুলো দিয়ে বোনদের ভালো জীবন গড়ে দেবো,এই প্রত্যাশায় ঘুমটা ভালো হতো। এখানে,এ দেশে নিজের জীবনেরই নিশ্চয়তা নেই। এই তুমি গতমাসের চার তারিখের ব্যাপারটাই ধরো, উত্তরায় শপিং মলে আগুন লেগে কত কত মানুষ মরেছে। ঠিক আমলাদের স্ক্যান্ডাল ফাঁস হবার গুজবের পরপরই। দেশের এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে,সবার ফোকাস সরিয়ে রাখতে এটা ইচ্ছাকৃত। যখন ক্ষমতার খিদের সামনে আমাদের মতো মানুষকে গিনিপিগ হিসেবে ইউজ করা হয়,তাহলে চুপ করে থেকে লাভ কি? অন্তত দু’টো বলে মরি! জীবন লম্বা নয়! বড়ো হওয়া চাই!”
তিতলি দু চোখে স্থিরতা নিয়ে মানুষটাকে দেখছে। আফিফ দোকানের চাবি খুঁজছে।
_“কিন্তু আমার যে একটা লম্বা জীবনের সফর দেয়ার ইচ্ছে আপনার সাথে আফিফ ভাই! যেখানে দিনগুলো লম্বা হবে, আফিফ-তিতলিময়। রাত গুলো আরো লম্বা হবে, আফিফ-তিতলি ময়। একবার রাত হলে আর ফুরাতেই চাইবেনা। আদরের সময় টুকু লম্বা হবে, আমার অভিমানের সময়টুকু লম্বা হবে, আপনার আমাকে মানানোর সময়টুকু আরো লম্বা হবে। আমি আপনাকে ভাত বেড়ে দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকবো সেই সময়টুকুও লম্বা হবে। আমার প্রতিটা প্রেগন্যান্সি লম্বা হবে। আপনাকে দেখবো, আপনি চমৎকার একজন বাবা হবেন,সেই সময়টুকু লম্বা হবে। আমার মতো বেঁটে খাটো মানুষটাকে রোজ কোলে টেনে এই চর্বিভরাট শরীরের মিথ্যা মিথ্যা প্রশংসা করবেন সেই সময়টুকুও লম্বা হবে। আপনার মতো একটা মহান তবে স্বল্প সময়ের জীবনের শখ নেই আমার। দুনিয়ার ঝঞ্ঝাট থেকে লুকিয়ে আমি একটা লম্বা জীবনই চাই। আমার মরার শখ নেই আফিফ ভাই। আমার অনেক প্ল্যান।”
তিতলি মানুষটার কথাগুলো শুনতে শুনতে আর মনে মনে জবাবটুকু দিতে দিতে এবার তাকায় মানুষটার কড়া পোড়া হাতে। খুব রুক্ষ,খুব কালো সে হাত। ইতালিতে পিৎজা ডেলিভারি করতে গিয়ে রোদে পুড়েছে একসময়। পরিশ্রমী হাতে পরিশ্রমে উপার্জিত টাকায় কেনা দামি ঘড়িটা চকচক করছে এখন। তিতলি যখন আফিফকে নিয়ে দুষ্টু দুষ্টু কল্পনা করে,তখন প্রায়ই ভাবে,কোনো জাদুবলে যদি ওর বিয়ে হয় এই মানুষটির সাথে,এই হাতে তিতলিকে ছুঁয়ে দিলে তিতলি প্রথম দিনেই মরে যাবে সুখের চোটে।
আফিফ একটা চকোফান বিস্কিট ওর দিকে বাড়িয়ে ধরে বলল,“খাও। বৃষ্টি আবার পড়তে শুরু করেছে। থেমে গেলে নামবো। আমিও দোকান বন্ধ করে যাবো আজ, বাড়িতে ভাড়াটিয়াদের নিয়ে মিটিংয়ে বসবো রাত আটটায়।”
রোজ এই চকোফান বিস্কিট। তিতলি হাতে নিয়ে নামলো বাইরে। আফিফ দোকান বন্ধ করে গাড়ি খুঁজছে,আজ বাইক আনেনি সাথে। রোড ঘাঁট এক ঘন্টার বৃষ্টিতেই ভিজে পিচ্ছিল। এর মাঝে একটা অঘটন তিতলির দ্বারা ঘটে গেছে। উষ্ঠা খেয়ে জুতার ফিতে ছিঁড়েছে। আফিফ হা করে ওর পায়ের দিকে কতক্ষন দৃষ্টি রেখে সামনে তাকিয়ে বলে,“আচ্ছা চাপ নেই। ‘ভাই ভাই শু হাউজে’ ঢোকো,এক জোড়া কিনে নাও। চলো।”
জুতা কিনতে গিয়ে তিতলি ফিসফিস করে বলল,“একটু অল্প দামের নিবো, ওপাশের দোকানে ঢুকেন আফিফ ভাই,এটা ভিআইপিদের। আমার কাছে বেশি টাকা নেই এই মাসে!”
আফিফ কাঁচের দরজা ঠেলতে ঠেলতে গম্ভীরতা নিয়ে জবাব দিলো,
_“আমি কিনে দিচ্ছি। বিদেশ থেকে আসার পরে তোমাকে খুব সম্ভবত কিছু ডাভ শ্যাম্পু আর সাবান দিয়েছি,এছাড়া তোমাকে কিছু দেয়া হয়নি আর!”
_“কেন দেননি কিপটে লোক? দিতে তো না করিনি!”
তিতলি মনে মনে আওড়ে মুখে বলে অন্য সুর,“না ভাইয়া প্লিজ। থাক!”
_“আরে বোকা! কেন? আমি তোকে একজোড়া জুতা কিনে দিতে পারিনা?”
তুমি থেকে সরে তুই করে বলছে আবার। তিতলি চোখ তোলে,
_“পারেন তো। আপনি চাইলে আমায় সারাজীবন জুতা কিনে দিতে পারেন। আমি না করবো না। এজন্য আপনাকে একটু চোখ নামিয়ে আমাকে দেখতে হবে। অতটাও খারাপ নই দেখতে শুনতে। খাঁটো আর গায়ে চর্বি খানিকটা,তবে পরিশ্রমী আর সংসারী মেয়ে।”
তিতলি মনে মনে তার কপচপানি অব্যাহত রেখে এগিয়ে যায় আফিফের পিছু। জুতার দোকানের সামনেই মুচি পাড়া। জুতা কেনা হয়ে গেলে আফিফ নেমে বলল,“ছেড়া জুতা জোড়া সেলাই করে নিলে নিতে পারিস এখান থেকে। একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো নয়। পরে ব্যবহার করতে পারবি।”
তিতলি মুগ্ধতা ঠাশা দৃষ্টিতে মানুষটাকে দেখতে দেখতে দুই পাশে মাথা দোলালো। এতটুকু সাবলীলতা ওর ভালো লাগে। মিথ্যে বড়োলোকিপনা আর দেমাগ নেই মানুষটার মাঝে এটা ওর সবচে’ বেশি ভালো লাগে। জুতা সেলাইয়ের পরেই স্ট্যান্ডে অটো দাঁড়িয়ে আছে দেখে আফিফ বলল,“এটাতে ওঠ। এখন ফাঁকা রিকশা পাবি না। লাইনের গাড়িতে যেতে হবে।”
তিতলি ঘাড় বাঁকিয়ে একচোট উঁকি মেরে বলল,
_“আমি যাবোনা,ভেতরে মোতালেব চাচা আছেন।”
_“তো! মোতালেব চাচা কি করবেন?”
আইঢাঁই করে তিতলি, তারপর মুখ বাড়িয়ে ফিসফিস করে,“ওনার সাথে সমস্যা আছে!”
_“কেন? নজর ভালো না? তোকে খারাপ কিছু আচরণ করেছে?”
আফিফ রাগী গলায় জানতে চায়। তিতলি দু’পাশে মাথা দুলিয়ে বলে,“ওনার ভয়াবহ সমস্যা আছে গ্যাসের,যখন তখন পাদেন। সবসময় আমার সামনেই পড়ে এসব।”
আফিফের দৃষ্টি বোকা বোকা। কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলে,“আজ পাদবে না। পাদলে আমরা অটো থেকে নেমে যাবো!”
তিতলি উঠে চেপেছে একপাশে, খুব চেপে বসে মাঝখানে টোট ব্যাগটা দিয়ে রেখেছে। এপাশে বসেছে আফিফ। মোতালেব তিতলিকে দেখেই বলল,“এই সন্ধ্যায় বাইরে বাইরে ঘুরিস কেন রে?’
_“টিউশন ছিল চাচা।”
_“এখনো এতো টিউশন করিস কেন? অনার্স শেষ। বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে!”
_“আপনি কি করে বুঝলেন বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে? মানুষের গায়ে লেখা থাকে এটা? যে এক্সপায়ারি ডেট এত এত এত সালের এত তারিখ!”
কথাটা বলেছে আফিফ। মোতালেব হকচকিয়ে ওঠে। অটোতে ওরা দু'জন ব্যতীত আরো তিনজন রয়েছে। মোতালেবকে অপ্রস্তুত রেখেই আফিফ বলল,
_“অপ্রয়োজনীয় কথা বলা ঠিক নয় এভাবে অন্যের বাড়ির মেয়েদের ব্যাপারে।”
অপ্রয়োজনীয় কথা এড়াতে অটোওয়ালা গান ছেড়েছে। অটোওয়ালা সম্ভবত দেবের ভক্ত। গানের লিরিক্সটা ভাবগত অর্থে অশ্লীল মনে হলেও তিতলির মনে ধরেছে,“তোকে পেলে পাশে,ওরে রাত যদি আসে, আমি সে রাতের চাই না তো ভোর।”
এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই গানটাও আফিফ ভাইয়ের মনে ধরেনি। তিনি সম্ভবত কাউকে পাশে নিয়ে রাত দীর্ঘ করতে চাননা। তিনি সম্ভবত খেয়েদেয়ে জলদি জলদি ঘুমিয়ে পড়ার দলে। তিনি সম্ভবত বৌ পাশে রেখে পূর্ণিমার রাত গুলোতেও নাক টেনে ঘুমাবেন। তাই ড্রাইভারকে খুবই আস্তে করে বলল,“গান চেঞ্জ করো নেছার।”
ড্রাইভার গানটাই বন্ধ করে দেয়। দিতেই কড়ইবাড়ি হাইস্কুলের সাত্তার চাচা আলাপ জুড়েছেন। সেই একই প্রসঙ্গ। রাজনীতি। ঘুরেফিরে আলোচনা ঠেকলো গিয়ে রাষ্ট্রের নারীদের কর্মসংস্থানের ওপর। বঙ্গদেশীয় অধিকাংশ পুরুষের দাদ-খুজলি শুরু হয় যে প্রসঙ্গ নিয়ে। আলোচনার বিষয়বস্তু মেয়েরা বাইরে গিয়ে কাজ করে বিধায় দেশে এতো ঘনঘন ভূমিকম্প হচ্ছে। একাধিক যুক্তি টানে সাত্তার। তার দাবি নারীদের সব গুছিয়ে ঘরে উঠতে হবে। তবেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে।
আফিফ ভাই শুনে হাসেন,মেকি হাই তুলে জবাব দেন,“শা’লা এই দেশে না জন্মালে জীবনেও জানা হতো না দেশের ইকোনমির অর্ধেক চালিকাশক্তিকে অবশ বানাতে মানুষ উঠেপড়ে লাগে এভাবে। আপনাদের এতো পীড়াপীড়ি! মেয়েদের ঘরে ঢোকাতে একদম কুত্তা পাগল হয়ে গেছে সবাই। নিজের মেয়েকে তো ঠিকই ডেন্টালে পড়িয়েছেন। আশ্চর্য দেশ মাইরি! নিজের ঘাড়ে কোপ না খেলে সবাই সব ধরণের আদর্শ মেনে চলতে পারে। কোপটা খেলেই বোঝা যায় কোন সুইয়ে কত ব্যথা।”
সাত্তার চুপ হয়ে গেল। নিজের পক্ষে দুই একটা যুক্তি সাজালেও জাহির করতে পারলো না আফিফের মেজাজ দেখে। তিতলিও চুপচাপ। মানুষটা যখন কথা বলে,একটা ঘোরের মধ্যে চলে যেতে হয় ওকে।
বাড়ির দরজায় অটো দাঁড়াতেই নেমে পড়ল দু’জন। আফিফ ওকে একদম বাড়িতে পৌঁছে দিতে এসে বোনের হাতে নাস্তা খেলো। আলুর পরোটা। ভাইকে পেয়ে ফারিয়া কথাটা তোলে,“আজ বিকেলে মুরসালিন চাচা এসেছিল। জুবাইদা নামের যে মেয়েটিকে দেখা হয়েছিল তোমার জন্য,সে মেয়েটির স্বভাব চরিত্র ভালো না!”
_“কিভাবে বুঝলি?”
_“মায়ের চরিত্র পায় মেয়েরা। শুনেছি মেয়েটির মা চালাক খুব। মা চালাক হলে মেয়ের তালাক হয়। কথায় আছে না?”
আফিফ হাসে শুনে,
_“এটা কোন দার্শনিক বলে গেছেন?”
_“কেউ বলে যাননি। তবে এমন ফালতু মায়েদের মেয়েকে কখনো আমার ভাইয়ের বৌ করবো না। আগেই আসসালামুয়ালাইকুম।”
কথাটি বলতে বলতে ফারিয়া তিতলির মুখে এক পল দৃষ্টি রেখেছে,তা দেখেছে তিতলি। দাঁতে দাঁত চেপেছে রাগে। আফিফ পানি খেয়ে উঠে দাঁড়ায়,
_“আচ্ছা করতে হবে না। আমার জন্য আপাতত বাদ দিয়ে রুমকির জন্য ছেলে দেখ। ভালো,ধার্মিক। ইদানিং কি সব বিটিএস নিয়ে খুব মাতামাতি করে, সারাদিন তাদের ফটো দেখে,লাইভ দেখে। আইডি, হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইল সবখানে চোখ সুন্দর ছেলেটা,নাম সম্ভবত জাংকুক,তার ছবি সেট করে রেখেছে।
ওরা অবশ্য গান গায় ভালোই, দুয়েকটা শুনেছি কবে যেন। ইংরেজি গান। তাই বলে ছবি ভিডিও নিয়ে সারাদিন দেখতে হবে? বিষয়টা তো আমার ভালো লাগেনারে। বিয়ে দিলে ঠিক হবে এটা? আবার দাবী করে সে নাকি বিটিএস আর্মি।”
তিতলি হেসে বলে,“এই বয়সে অমন কেউ কেউ করে,এটা সিরিয়াস কিছু নয় ভাইয়া। এটাকে পাগলা ফ্যান বলে। আপনি ছোট বয়সে মাইলসের ফ্যান ছিলেন না? অমন। দুশ্চিন্তা করবেন না। বয়স হলে এই ভূত নামবে। আমারো নেমেছে।”
_“হু।”
পূর্ণাঙ্গ অহমিকা নিয়ে বেরিয়ে যায় লোকটা। যেতেই,তিতলিও ছুটটে ঘরে ঢুকে দৌড়ে যায় জানালার কাছে। লোকটা হেলেদুলে বড়ো রাস্তা ধরেছে, গুনগুন করে কোনো গান গাইছে হয়তো। তিতলি ওভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বিড়বিড় করে,“বয়স হলে ঠিকই ভূতটা নামে তো আফিফ ভাই! তবে চেপে বসে তার চেয়েও বড়ো একটা ভূত।”
পাড়ার মোড়ের দোকান গুলোতে বাতি জ্বলছে তখনো। সৌভিককে রমিজের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাক ছেড়ে ডাকলো আফিফ। সৌভিক এগিয়ে আসতেই জানতে চাইলো,“আজ তোর প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষা ছিল না? কেমন হয়েছে?”
মুখ বিকৃত করলো সৌভিক,
_“একদম ছাতার মাথা হয়েছে ভাই। সারাদেশে ১৩ জন আটক হয়েছে প্রশ্ন ফাঁস করার দায়ে। আমরা যারা রাতদিন খেয়ে না খেয়ে পড়েছি তাদের গালে চড় মারা হয়েছে আজ। ভাই সরকারের পরে সরকার বদলাবে কিন্তু জাউরাদের দূর্নীতি করার সাহস কমবে না। আমাদের ভাগ্য বদলাবে না কখনো। মেজাজ খিচে ছিল,একটু তাই হাওয়া খেতে বেরিয়েছি। এসে শুনি আরেক খবর।”
_“কি।”
_“রিমুটা ওদের কলেজ পিকনিকে গেছিল। সেই প্রোগ্রামের অতিথি ছিল এখানকার এক নেতা। আশিক তালুকদার। ব্যাটা এখন বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে রিমুকে দেখেই।”
ভ্রু কুচকায় আফিফ,“ওয়েট! কলেজ পিকনিকে এমন লোক যাবে কেন? সে তো স্টুডেন্ট নয় এখানকার।”
_“আরে এটাই তো রীতি ভাই,জানতে না তুমি? এসে স্যারদের কাছে আবদার তুলেছে ‘স্যার আমরাও যাবো,ফ্রিতে।’
এ তো নতুন নয়। গত আমলেও ছাত্রনেতারা এসব করতো। যেই শুনতো মেয়েরা কোথাও যাবে,অমনি তাদেরও যেতে হবে। এখন দলীয় ছাত্রনেতারা নির্বাচনী সভা সমাবেশের ঝামেলায় আটকে আছে, নয়তো তারাও যেত।”
আফিফ মুখ শক্ত করে,“কি বিশ্রী। ভার্সিটির মেয়ে গুলোর নিরাপত্তার ব্যাপার তো। আউটসাইডার এলাউ করেন কি করে প্রিন্সিপাল! কমনসেন্স নেই?”
_“ক্ষমতা আর চাপের কাছে কমনসেন্স আবার কি? ভাই ডিসিশন নিয়েছি এই দেশেই থাকবো না। সবখানে ঘুণপোকা। আমি তোমার মতো ইতালি যাবো। যাওয়ার আগে প্লেনে উঠে ফেসবুকে পোস্ট দেবো,“বায় বায় শাউয়োর দেশ। বিদায়।”
আফিফ তাকিয়ে আছে ঠান্ডা চোখে। সৌভিক নিজের বিশ্রী মন্তব্যে নিজেই কতক্ষণ হাসলো। আফিফ বলে এরপর,“যতটা আরামের ভাবছো প্রবাস জীবন অতটা আরামের নয়। নিঃসঙ্গতার জীবন।”
_“হু, তাই তো তোমার মতো টাকা কামাই করে আবার চলে আসবো। এসে তারপর বিয়ে করবো। তোমার মতো। তা একটার পরে একটা মেয়ে দেখে যাচ্ছে আসমা আর ফারিয়া, তোমার মেয়ে পছন্দ হচ্ছে না? নাকি নিঃসঙ্গ জীবন ভালো লাগে? কোনটা?”
আফিফ জবাব না দিয়ে ম্লান হেসে পা ফেলে বাড়ির রাস্তায়। দরজা খোলে রুমকি। অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে। ভাইয়ের অভিভাবকত্বেই থাকছে এখন। বুয়া এসে রান্নাবান্না করে দিয়ে যায়। সারাদিন গান শোনা আর ঘুমিয়ে কাটানো ছাড়া কোনো কাজ নেই তার। অ্যাডমিশনে ব্যর্থ হয়ে মন ভেঙেছে। এখন আর পড়াশোনায় মন নেই। দরজা খুলে দিয়ে রুমকি হাই তুলে বলল,“খাবার টেবিলে দেয়া আছে ভাইয়া,খেয়ে প্লেট সিঙ্কে রেখো। সকালে ধুয়ে দেবো।”
_“আমি মিটিংয়ে বসবো ভাড়াটিয়াদের নিয়ে। তুই এখন ঘুমাচ্ছিস কেন?”
রুমকি জবাব না নিয়ে রুমে গিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদু শ্বাস ফেলে আফিফ নিজের ঘরে ঢুকে শার্ট প্যান্ট বদলে নেয়। গায়ের পোশাক ঝুরিতে রাখতে গিয়ে দেখে গতকালের রেখে দেয়া শার্ট গুলো এখনো ধোওয়া হয়নি। রুমকিটা কোনো কাজের নয়। এইবারে সৌভিকের কথাটা মাথায় আসে ওর। নিঃসঙ্গতা আফিফের মোটেই পছন্দ নয়। তবে এই কারণে নয় যে ওর একজন জামাকাপড় ধোওয়ার ব্যক্তিগত মানুষ নেই।
উল্টে একজন মানুষ তাকে অন্তত মনে করিয়ে দিতে পারে দু’টো শার্ট এখানে পড়ে আছে। কিংবা বড্ডো অপরাধবোধ নিয়ে বলবে,“আমি শার্ট দু’টো ধুতে পেরেছি তোমার,ঐ তোমার অত ভারী জিন্স ধুতে পারিনি। ওগুলো তুমি ধুয়ো!”
এসব করার লোক নেই বলে নিঃসঙ্গতা তার পছন্দ নয়। এক চোট শুকনো ঢোক গিলে আফিফ হাতের পোষাক গুলো রেখে দেয়। একটা যুগ বড্ডো বেশি কষ্ট দিয়েছে নিজেকে। আর বোধহয় দেয়া ঠিক হবে না। আর আলসেমি করা যাবে না। নিঃসঙ্গতা বড্ডো খারাপ জিনিস।
______
তিতলি শুয়ে পড়ে রাত নয়টার মধ্যে,শুয়ে ফোন চাপে,বই পড়ে। রোজকার মতো কিছুক্ষণ ডায়রিও লিখেছে। মাহবুব রাতে ফেরে সাড়ে নটায়। ভাবীর রোজ ভাইয়ার সাথে ঝগড়া লাগাতে হবে তাই বসে থাকে সোফা ঠেশে। আজও ওভাবে বসে ছিল,আসার পরেই তুলল,“মুরসালিন চাচা বিকেলে এসেছিল, দু'টো খবর আছে!”
ক্লান্ত মাহবুব হাই তুলে বলে,“ভাতটা খেয়ে তারপর শুনি?”
ভাত বেড়ে দিয়ে বলতে থাকে ফারিয়া,“তিতলির জন্য যে পাত্রপক্ষকে দেখাশোনা করা হয়েছে তারা না করে দিয়েছে মেয়ে খাঁটো বলে। আর ভাইয়ার জন্য যে মেয়ে দেখা হচ্ছে সেই মেয়ের স্বভাব ভালো না।”
_“আচ্ছা নতুন কোথাও দেখতে বলো।”
_“তুমি মুরসালিন চাচাকে বাদ দিয়ে অন্য ঘটক দেখো। তিনি রোজ একটা বিচ্ছিরি কথা তোলে।”
_কি বিচ্ছিরি কথা?
_তিতলির সাথে ভাইয়ার বিয়ে দিতে বলে। এসব কখনো মানবো না!
সারাদিন কাজ করে এসে মাহবুবের এই গজগজানি সহ্য হয়না। আজকে বলেই বসে,
_“এভাবে হেলাছেদ্রা করে কথা বলো কেন সবসময় আমার বোনকে? তিতলি কি বিয়ের পাত্রী হিসেবে অযোগ্য?”
_“তা নয়?”
_“না নয়! মাস্টার্স পড়ছে,এক সুশ্রী মেয়ে। ওদিকে তোমার ভাইয়ের টাকা ব্যতীত আর কি আছে? পড়ালেখা কতদূর তার?”
তিতলি এতক্ষণ শুয়ে শুয়ে ভাই ভাবীর ঝগড়া গিলছিলো। এই পর্যায়ে হতবাক হয়ে উঠে বসে বুকে হাত চেপেছে মেয়েটা। ভাইয়া অতি খারাপ একটা কথা বলে দিয়েছে এইমাত্র। লেখাপড়া আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সার্টিফিকেটের উর্ধ্বে রাখে তিতলি তার মনের মানুষটাকে। মানুষটা যোগ্য তার অভিজ্ঞতায় তার ব্যক্তিত্বে। এই কাজটা ভাইয়া ঠিক করেনি। আজ ভাবী এই লোককে মারলেও দেখতে যাবেনা তিতলি।
ঐ লেগে গেল মহাযজ্ঞ। ফারিয়া চেঁচামেচি শুরু করেছে হেরে গলায়,“কি! তুমি আমার ভাইয়াকে অশিক্ষিত বললে? তার কাছ থেকে মাসে মাসে টাকা নেওয়ার সময় তা মনে থাকেনা?”
_“আচ্ছা আমি ওভাবে মিন করতে চাইনি,তুমি বারবার তিতলিকে হেয় করো বলেই…..!”
মিনমিন করে উঠলো মাহবুব। হাতের কাছে যা পারছে সব ছোড়াছুড়ি শুরু করে দিয়েছে ফারিয়া। তার সাথে গালাগাল সমানে চলছে,“মুখ ভেঙে দেবো তোমাদের কত বড়ো সাহস আমার ভাইয়াকে ছোট করো। আবার তার কাছ থেকেই টাকা ধার করো। মুরসালিন চাচাকে তুমিই এসব কথা বলো তাইনা? এসব বুদ্ধি দাও। আর তোমার বোন, রং ঢং করে শুধু আমার ভাইয়ের গায়ে পড়ে। বুঝিনা আমি? আমি কানা?”
এরপর পুরো একঘন্টা মাহবুব খালি শুনে গিয়েছে,ফারিয়া বলে গিয়েছে। তিতলি চোখ বুঁজে থেকে ফোনটা হাতে নিয়েছে দীর্ঘসময় পরে।
মাঝরাতেই আফিফ ভাই শালিসি করতে এলেন। তিতলির থেকে খবর পেয়েই পাঁচ মিনিটের মাথায় উদয় হলেন। পরনে একটা লুঙ্গি আর ঢিলেঢালা টি-শার্ট, হাতে ফোন আর ওয়ালেট। ভয়ংকর অগোছালো অবস্থা। অবশ্য তিতলি অভ্যস্ত এতেই। যবে থেকে লোকটাকে চিনে এসেছে, জেনেছে লোকটা বোনদের জন্য নিবেদিত প্রাণ। চোখ মুখের গুমোট ভাবটুকু দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই লোক ভেবেছে বোন আর বোন জামাইয়ের মধ্যে মারামারি লেগেছে,তাই প্রাণ হাতে নিয়ে লুঙ্গি পরেই ছুটে এসেছে।
তিতলির হাসি পায়না,একটু মায়া লাগে এবার। নিজেকে দুষছে,কল করাটা উচিত হয়নি এই সময়। কিন্তু সে কি করবে? এমনভাবে লেগেছিল দু’টোতে!
মায়া থেকে তিতলি এক কাপ চা করে এনে সামনে রাখে আফিফের। লোকটা বসার ঘরে মোড়লের মতো গম্ভীর মুখে বসে আছে, রাগচাপা দৃষ্টি বোন আর ভগ্নিপতির মুখে। একটু সময় দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো বোনকে,“স্বামীকে কেন কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দেবে আগে? সে অমন গালি খাওয়ার মত কি করেছে? কথা বলার সময় কি ভেবে বলো না কিছু? যা মুখে আসবে তাই বলতে হবে?”
ভাবী চোখ নামিয়ে বসে আছে। রণ মুর্তি এখন ঠান্ডা। যেন নিজের কাণ্ডে নিজেই লজ্জিত। মাহবুবও নির্লিপ্ত,সে সম্বন্ধিকে খানিকটা ভয়ই পায়, উল্টোপাল্টা মুখ খুললে আবার কোন বিপদ ঘটে তাই কুলুপ এঁটেছে।
_“আমি তোমাদের বেশ কয়েকবার বলেছি বনিবনা না হলে সুন্দর একটা সমাধান আছে। তা না করে সাপ বেজি হয়ে যাও। এ’বাড়িতে একটা যুবতী মেয়ে থাকে, সামনে তাকে বিয়ে দেবে। মানুষ কি রটাবে তোমাদের ফ্যামিলি সম্পর্কে?”
তিতলি চোখ তুলে একঝলক দেখল মুখটা, ফ্যাকাশে দৃষ্টি ঘুরে ফের রাখলো নিজের পায়ের নখে। মাহবুব আর ফারিয়া কোনো জবাব দিচ্ছে না। ঝগড়া কি নিয়ে লেগেছে সেই কারণটা আফিফের কানে গেলে এখানে আরেকটা কেলেঙ্কারি হবে তা তারা জানে।
আফিফ দু'জনকে সময় দিয়ে বলল,“আমার নিজের একটা জীবন আছে। সব বোন আর ভগ্নিপতিদের লিখে দেয়া হয়নি সেটা। তোমরা দু’জন প্রয়োজনের অধিক সময় নষ্ট করো আমার । তাড়াতাড়ি বলো, সমস্যা কি নিয়ে? কি নিয়ে ঝগড়া শুরু? আমি সলভ করে দিচ্ছি।”
_“এমনি ভাইয়া। আমার ট্রিটমেন্ট নিয়ে খানিকটা তর্ক হয়েছে আর কিছু নয়।”
_“জি ভাইয়া এটাই।”
ফারিয়ার কথার লেজে মাহবুব তাল মিলিয়ে একটা জবাব দেয়। আরো বেশি গম্ভীর হয়ে পড়ে আফিফ। মানুষটা প্রচণ্ড রেগে গেলে অতি মাত্রায় নির্লিপ্ত হয়ে যায়,এটা জানে তিতলি। আফিফ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“ঘরে যাও দু’জন। ঠাণ্ডা মাথায় বোঝাপড়া করে নাও। আমার তিতলির সাথে কিছু কথা আছে!”
চমকায় তিতলি। প্রশ্নবিদ্ধ মুখে ফারিয়া আর মাহবুব উভয়েই ভেতরের ঘরে ঢুকলে তিতলি বলে ওঠে,“আপনার বোন আমাকে সহ্য করতে পারে না। আমি এতটুকু জানি। এছাড়া তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কি নিয়ে ঝামেলা চলে সে জবাব আমি দিতে পারবো না আফিফ ভাই।”
আফিফ ধীরে সুস্থে বলে,“তুই বোস!”
তুই করে বলছে, তার মানে মন ফুরফুরে এখন। এতো কাণ্ডের পরেও মন ফুরফুরে এটা তিতলিকে অবাক করছে। তিতলিকে আরেকটু অবাক করে দিয়ে আফিফ সরাসরি প্রশ্ন করল,“পছন্দের কোনো মানুষ আছে তোর?”
টানা টানা নিরীহ চোখ জোড়া তুলে তিতলি স্থির করে রাখল উদ্ভাসিত মুখটায়। একটা মুখস্থ মুখ। খাঁড়া নাক,সহজ চোখ। এরপর ঢোক গিলে তিতলি দুই পাশে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয়,তার কোনো পছন্দের মানুষ নেই।
_“না। থাকলে আমাকে বল। আমি মাহবুবের সাথে কথা বলবো।”
_“কেন? ভাবীর মতো আপনারও বুঝি আমাকে এ বাড়ি থেকে বের করার তাড়া খুব? কিন্তু এটা আমার পৈতৃক বাড়ি!”
আফিফ হাসে।
_“না বোকা! সেজন্য না। আমার দোকানে এসে প্রায়ই সন্ধ্যার পরে পাত্রপক্ষ খোঁজ নেয় তোর ব্যাপারে, তো সে কারণে বুঝলাম মাহবুব উঠেপড়েই লেগেছে বিয়ের তোরজোরে। তোর পছন্দের কেউ থাকলে ম্যানেজ করার দায়িত্ব আমার। আর শোন,ঝৈ ঝামেলা যা-ই হোক, দোষ ফারিয়ার হলে আমাকে বলবি। রেগে হোস্টেলে উঠিস না আবার গিয়ে। আমি ওকে বোঝাবো।”
তিতলির খুবই রাগ উঠেছে, প্রসঙ্গটা টেনে রেখে বলে,“পাত্রপক্ষ আপনার দোকানে আসে?”
_“জি!”
_“আপনি কি বলেন পাত্র পক্ষকে?”
_“কি বলবো! তোর প্রশংসাই করি। বলি মেয়ে ভালো। আত্মীয় বলে বলছি না, আপনারা কথাবার্তা আগাতে পারেন এখানে। রান্না ভালো পারে,পড়াশোনায় ভালো। আচ্ছা এই চা’টা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আরেক কাপ এনে দে কষ্ট করে।”
তিতলি উঠলো, চা বানিয়ে ফের এপাশে আসার সময় টুকু পুরোপুরি থমথমে হয়ে থাকলো। মেজাজ হারিয়ে গটগট করে হাঁটতে গিয়ে কাপ হাতে উষ্ঠা খেয়ে আবার পড়লোও আফিফের সামনে। আফিফ টেনে ধরে দাঁড় করিয়ে দিলো ওকে।
_“আস্তে হাঁট। খালি উষ্ঠা খাস।”
মানুষটার গায়ের সেই ঘ্রাণটুকু শুষে নিয়ে তিতলি বরফ জমাট। বোকা মনে কেমন কান্না ভার হচ্ছে ক্রমশ।
_“আপনার এতো দরদ দেখাতে হবে না বেঈমানের বেইমান।”
তিতলি মনেমনে কপচপানি চালিয়ে যায়। এরপর আফিফ চলে যাওয়ার পরে ঘরে ঢুকে একটা নাম্বারে কল করে কাঁপা হাতে। নাম্বারটা রিসিভ করেছে এক মধ্যবয়সী মহিলা।
_“হ্যা কে?”
তিতলি শ্বাস টানে,
_“আপনি কি ঐশির বাড়ির লোক? কড়ইতলা সৈয়দ বাড়ির ছেলে ওয়াহিদুল আফিফের সাথে ঐশির সম্বন্ধ দেখছেন?”
_“জি কেন বলো তো। তুমি কে?”
_“আমি যে-ই হই। আমার নামের মধ্যে জ,স,ত,ল,না আছে। আসল কথায় আসি। নিজেদের মেয়েকে দূরে রাখুন। সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফের সাথে আমার পাঁচ বছরের সম্পর্ক। ফোনে তিনবছর,বিদেশ থেকে ফেরার পরে সামনাসামনি দুই বছর। সিরিয়াস সম্পর্ক। সে আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। আমরা রোজ শিশুপার্কের পেছনে গিয়ে প্রেম করি। রাতের ঘুম নষ্ট করে ভিডিও কলে একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আমি দেখতে একটু কালো বলে তার বোনরা আমাকে পছন্দ করছে না। আফিফ বোনদের মুখের দিকে তাকিয়ে আপনার মেয়েকে দেখছে। কিন্তু তলে তলে ভালোবাসেন আমাকে। যদি এই সম্বন্ধ দেখাদেখি থেকে দূরে না সরেছেন তো মেয়ের ক্ষতি হতে পারে। বিবেচনা এখন আপনাদের।”
কল কেটে এখন শান্তি লাগছে তিতলির। এই মেয়েটিকে চেনে, একসময়ের বান্ধবীর ছোট বোন,নাম্বারটা কায়দা করে জুটিয়েছে। আফিফ ভাইয়ের থিওরিটাই ফলো করা হলো। যে যা করবে তাকে ঠিক তেমনটা ফিরিয়ে দেয়া উচিত। তিতলি দিয়েছেও।
_“আপনি আমার বিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবেন তো? খুব তাড়া আপনার? আমি তবে আপনার বিয়ে পিছিয়ে নেবো। থাকুন বৌ ছাড়া।”
#চলমান……