#ও_যে_মানে_না_মানা
#পর্ব_৬
#ইসরাত_ইতি
ঘর অন্ধকার করে বসে ছিল শিহাব। অন্ধকারের মধ্যে হাতের সিগারেটটা এক ছটাক আগুন ঝরাচ্ছিল। তাবিব মজুমদার দরজা ঠেলে ছেলের ঘরে উঁকি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঢের সময় ধরে। সিগারেটের শলাকা কেবল হাত বদল হচ্ছে শিহাবের,ডান হাত থেকে বাম হাতে। ফুঁকছে না শিহাব। তাবিব মজুমদার লম্বা লম্বা কিছু শ্বাস ফেলে বাতি জ্বেলে গিয়ে শুরুতেই ঠাশ করে এক চড় বসালেন ছেলের গালে,“আর সময় পাইলা না? আর সময় পাইলা না? বারো তারিখ নির্বাচন আর তুমি মাগীবাজি করতে গিয়া আকাম ঘটাও। কুলাঙ্গার একটা। ঘরে বৌ থাকতে বাইরে যাইতে হয় কেন? এতো সুন্দর বৌ আইনা দিছি,তাও বাইরে যাইতে হয় কেন তোর হারামজাদা? তাও বিবাহিত মেয়েদের কাছে। বলদার ঘরের বলদা।”
শিহাব গালে হাত চেপে বসে আছে চুপচাপ। বাবার চড় খেয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অধিক দুশ্চিন্তায় পাথর হওয়া যাকে বলে।
_“মারতে গেছিলা কেন?”
_“রাগের মাথায় আব্বা। বেয়াদবি করতেছিল। তার ওপর একটা ফাইল রাখছিলাম ওর কাছে। দিতে পারতেছিলো না। ভাবছিলাম ফাইলটা আটকায়া রাইখা ব্ল্যাকমেইল করবো। গালিও দিতেছিল। মারার ইচ্ছা ছিল না, হিট অব দ্য মোমেন্ট হয়ে গেছে!”
তাবিব মজুমদার বসলেন ছেলের পাশে। দীর্ঘ সতের বছর অপেক্ষার পরে, নানা সময় জেল হাজত খেটে,এতো ত্যাগের বিনিময়ে ভেবেছিলেন এবার সংসদের একটা গদি তার কপালে জুটবে। অপদার্থ,দুশ্চরিত্র ছেলের কল্যাণে সে গুড়ে বালি। ফোঁস করে একদলা হতাশা বের করে দিয়ে বলেন তাবিব,“যা হইছে হইছে। থানা আমি সামলাবো। এসপির নারী কেলেঙ্কারির লিংক আছে আমার হাতে। চাপ দিলেই সব ধামাচাপা। তুমি এদিকটা দেখো। স্বাক্ষ্য প্রমাণ সব লোপাট করো। আগে বলো, স্বাক্ষী আছে কোনো?”
চুল টেনে মৃদু শ্বাস ফেলে শিহাব,
_“হু। থ্রেট দিছিলাম যে, সেই ঘটনা বাজারের মধ্যে এক দোকানদার আর তার আত্মীয় দেখেছে।”
_“ওহহ। ওতে কিছু হয়না।”
_“হয় আব্বা। দোকানদার শালাকে আজ সারাদিন থানার সামনে ঘুরঘুর করতে দেখছে বাবুর লোক।”
তাবিব এবার অনেক্ষণ চুপ করে রইলেন। কিছু একটা ভাবলেন যেন, এরপর শক্ত গলায় বললেন,“ধরে এনে ছেঁচে দাও দু'টোকে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরে সব শালা মার্টিন লুথার কিং হয়েছে। ধোন নাই বন্দুক কান্ধে,চাউল নাই সোয়া সের রান্ধে। শালা শালীকে ধরে এনে ডলা দাও। এই কাহিনী বাইরে চালান হলে বহুত রোষানলে পড়বা কিন্তু পাবলিকের। কালই ধরে আনো দুইটাকে। তারপর বাটাম দাও। আমার নির্বাচনে কোনো বাধা চাইনা তোমার লুচ্চামির জন্য। আগেই বলে দিলাম।”
_______
রাত এগারোটা বেজে আটচল্লিশ মিনিট। মাহবুব বাড়িতে এলে আজ ভারি অবাক হলো ফারিয়ার আচরণে। ইদানিং ফারিয়ার শরীর ভালো নেই তা সত্যি, কিন্তু আজ মুখের আনাচ কানাচ বড্ডো ফকফকে হয়ে আছে প্রফুল্লতায়।
লেবুর শরবত বানিয়ে মাহবুবের হাতে দিয়ে গদগদ হয়ে বলল,“এই শোনো আমি কিন্তু সব পরিকল্পনা গুছিয়ে রেখেছি শুক্রবারের জন্য। ভাবছি খাদিজা মামীকে ডেকে নেবো। তিনি কত ভালো পিঠা বানান। আচ্ছা পাত্রপক্ষ পরে কি জানালেন?”
ফারিয়ার উপচেপড়া খুশির কারণ একটু একটু করে আন্দাজ ঠিকই করতে পেরেছে মাহবুব। কিন্তু কেন জানি মাহবুব খুশি হতে পারছে না। তার নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে সুপ্ত একটা বাসনা তৈরি হয়েছিল,তিতলিকে যদি আফিফ ভাই পছন্দ করে নেয় তবে বেশ হবে। বোনটা হাতের নাগালে এবং ভালো পুরুষের দায়িত্বে থাকবে। নিজের বোন সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা আছে মাহবুবের, একটু যা অসুখ বিসুখে ভোগে প্রায়শই কিন্তু আজকালকার দুনিয়ায় একশোতে একটা হয় এমন ভদ্র সভ্য মেয়ে। কোথাও কোনো বদনাম করার সুযোগ দেয়নি কাউকে। আফিফ ভাইয়ের কানে মাহবুব সুযোগ বুঝে কথাটা পাড়লে মানলেও মানতেন আফিফ ভাই। খুব সুন্দরী না হলেও চেহারা সুরত তো ফেলে দেওয়ার মতো নয় তিতলির। কিন্তু ওই সাহস হয়নি মাহবুবের। জীবনে যত কষ্ট ফারিয়াকে সে দিয়েছে, নির্লজ্জের মতো বোনের জন্য ভিক্ষা চাওয়ার সাহস তার হয়ে ওঠেনি।
_“কিগো! কথা বলছো না যে?”
রোজকার তুলনায় ফারিয়া মাহবুবের প্রতি একটু বেশি নরম-সহজ আজ। মাহবুব এতেও খুশি হতে গিয়েও হতে পারেনা। মাথায় অন্য একটি ভাবনা এসে মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে কিলবিল করছে। এই ক’দিনে,একটু একটু তারও সন্দেহ হচ্ছে তিতলির মনে আফিফের জন্য কিছু চলছে। বড়ো ভাই হওয়ায় সরাসরি জানতেও চাইতে পারছে না কিছু। পুরোটাই জটিল। জটিলতাকে জটিলতার মতো থাকতে দিয়ে মাহবুব চুপচাপ শরবত খায়। তিতলির ঘরের দরজা বন্ধ দরজায় ওর নিস্প্রভ দৃষ্টি। গ্লাসটা রেখে নিভু স্বরে ডাকলো ও,“তিতলি!”
সাড়া দিলো তিতলি,গলা বেশ ভার তার,“হ্যাঁ ভাইয়া?”
_“এদিকে আয় কথা আছে।”
_“সকালে বলি ভাইয়া? আমার মাথা ধরেছে বেশ।”
বালিশের নিচে মাথা ঢুকিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ডায়রি,কলম। ও আসলে বলতে পারেনি কথাগুলো তখন ফোনে,দুম করে কল কেঁটে তখন থেকে একইভাবে পড়ে আছে বিছানায়। বুকের ছটফটানি কমছে না। ঠিক রাত দশটা নাগাদ আফিফ কল দিলো। হসপিটালের ইমার্জেন্সি থেকে ভাগ্নের গলার কাঁটা বের করে ওদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া খাচ্ছিল। তিতলি না চাইলেও পারেনি উপেক্ষা করতে পুরুষটাকে, ফোনটা রিসিভ করে কানে চেপে ধরতেই ওপাশ থেকে বলল আফিফ,“হ্যাঁ তিতলি। কি হয়েছে তখন কেটে দিলি ওভাবে? খুলে বল! সমস্যা কি পাত্রের মধ্যে? ছেলে একটু খাঁটো বলে?”
শেষের প্রশ্নটা খুব সাবধানে করেছে আফিফ,যদিও জানে এটা করা উচিত হয়নি কিন্তু তিতলির আচরণ তাঁর কিছু ঠিক লাগছে না। মা বাবা নেই,একজন পোক্ত অভিভাবক নেই। মাহবুব সারাক্ষণ আটকে থাকে ফারিয়া আর দাম্পত্য কেন্দ্রিক ঝামেলা নিয়েই। অল্পবয়সী মেয়ে, জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা থাকতেই পারে। আফিফ ভাবলো মেয়েটা হয়তো কোথাও আঁটকে গিয়েছে তাই ওকে বের করা দরকার।
তিতলি ভীষণ রকমের আহত হয়েছে আফিফের এমন প্রশ্নে। উঠে বসে নিঃশব্দে চোখ মুছলো। ও যেন কথাই হারিয়েছে। ওপাশে ঐ নির্বোধ লোকটা আবার বলে উঠলো,“হয়তো এমন কিছু,তাইনারে? ছেলেকে আমি দেখেছি,একটু খাঁটোই। আজকালকার তোদের মতো মেয়েদের কাছে ঐ উচ্চতা খাঁটো লাগবে। কিন্তু সব কিছু তো পারফেক্ট পাওয়া যায়নারে তিতলি। বাকি যেগুলো আসে তারা আবার তোকে খাঁটো বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যারা মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে এভাবে জাজ করে,তুইও কি তাদের মতো হবি বল?”
তিতলি কথাই বলতে পারছে না। বুকের কাছটা খামচে ধরে কাঁপছে কেবল। আজ এই মুহূর্তে লোকটাকে এই পৃথিবীর সবচে’ আহাম্মক এক লোক মনে হচ্ছে। অতি বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন আহাম্মক এক লোক।
আফিফ শ্বাস ফেলে ধীরে,ফের বোঝানোর সুরে বলে,“বিয়ে করতে চাসনা এখন, চাকরির প্রিপারেশন নিতে চাস,ঠিক আছে তবে। এমন হলে আমি মাহবুবকে বোঝাবো। কিন্তু বড়ো কোনো সমস্যা না থাকলে এই পাত্র হাতছাড়া করিস না, ছেলে অমায়িক, ভালো থাকবি।”
তিতলি চুপচাপ বিছানার হেডসাইডে পিঠ এলিয়ে দিলো। ক্রমশ বুঝতে পারছে সে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এবার নিজেকে গাল দিতে ইচ্ছে করছে অথচ তিতলি জানতো তিতলি খুবই স্ট্রং একটা মেয়ে। সময়ের বালি ঝরে ক্রমে ক্রমে,তিতলি বহু প্রচেষ্টার পরে নিজের গলা সামলে নিয়ে জানতে চাইলো,“আচ্ছা ওসব বাদ দিন। ভাবী আর আসমা আপাদের নাকি নয়াকান্দার সেই পাত্রীকে খুব মনে ধরেছে,আপনি দেখেছেন?”
_“হ্যাঁ দেখলাম!”
_“তা কেমন সে পাত্রী?”
_“ভালোই।”
ঢোক গেলে তিতলি, ওড়না গলায় চেপে ঘাম মুছে বলে,“পাত্রী লম্বাচওড়া, সুন্দর আছে তাইনা?”
_“ওভাবেও খেয়াল করিনি। ফারিয়ারা কি থেকে কি করছে ওরাই ভালো জানে। আমার নিজের এতো পছন্দ অপছন্দ নেই। না আছে এই নিয়ে মাথাব্যথা। মেয়ের চরিত্র আচরণ ভালো হলেই হলো। আশা করছি ফারিয়ারা ভালো মেয়েই খুঁজবে।”
তিতলি এবারো চায়নি,তবুও ওর চোখ বেয়ে দরদর করে জল ঝরছে। এরপর আর কিছুই বলতে পারেনি মেয়েটা,না শুনতে পেরেছে। প্রচন্ড অভিমানেই কলটা কেটে দিয়ে ফোনটা বন্ধ করে দিয়েছে।
_____
দপদপে মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম ভেঙেছে ওর। ফারিয়াও ভালো ব্যবহার করছে সকাল থেকে। নাস্তা বানিয়ে মুখের সামনে ধরেছে। তিতলির পছন্দের ঝালঝাল নুডলস। এসব বিষাক্ত লাগলেও তিতলির আচরণ সহজ,ভাবীর সহিত ত্যারাবাঁকা প্রতিক্রিয়া দেখায়নি কোনো। বারবার হাই তুলছিলো দেখে ফারিয়া বলল,“ঘুম ঠিকঠাক দিয়ো তো তিতলি এই ক'দিন। চোখের নিচে কেমন কালি জমছে। আজকে থেকে মুখে কিছু মাখো। আমার ঘরে মুলতানি মাটি আছে আড়ং আর্থের। খুব ভালো, দাঁড়াও তোমাকে এনে দিচ্ছি। মেখে বসে থাকো কিছুক্ষণ। আজ টিউশন করাতে যাবে তো? আসতে যেতে মাথায় কাপড় রাখিয়ো কেমন?”
তিতলি চুপচাপ শুনে গিয়েছে ওসব কথা। ফারিয়ার মুখের ক্রুর হাসিও নজরে পড়েছে।
ফারিয়া সুযোগ পেয়ে আরো দুইঘা দিলো,“ভাইয়ার পাত্রীকেও আমরা শনিবার দেখতে যাবো। আসমা আপা তো বেশ কয়েকবার স্কুলে গিয়ে দেখে এসেছে। ক্লাস টেনে পড়ে। তবে ফিগার আর চেহারা একদম নারীসুলভ। ভাইয়ার মন মতো হবেই এটা। ভাইয়ার জন্য তো কত অনার্স পড়ুয়া মেয়ে দেখলাম। তার আবার একটু কমবয়সী মেয়ে পছন্দ কিনা। অনার্স মাস্টার্স পড়ুয়া মেয়ে তার আবার পছন্দ না।”
তিতলির টিউশনি ছিল বেলা এগারোটায়, ফারিয়ার উৎপাত সইতে না পেরে ও যেনতেনভাবে নাস্তা খেয়ে সকাল দশটাতেই ঘর ছেড়েছে।
টগবগে রোদ্দুর মাথায় নিয়ে মেইনরোড ধরে হেঁটেছে মেয়েটা। এরপর অলিগলি ছাড়িয়ে কেজি স্কুল রোড। রিকশা পায়নি এমন নয়, সময় কাটাতেই হাঁটা। উদ্দেশ্যহীনভাবে এভাবে,হতাশাময় জীবনের ধূলিঝড়া গল্পের মগ্নতা নিয়ে রাস্তা মাপতে গিয়ে খেয়াল করেনি আজ ওর আশে পাশের চিত্র খানিকটা অস্বাভাবিক।
একদল ওকে ফলো করছে এই বিষয়টা ধরা পড়েনি ওর চোখে। ঠিক কেজি স্কুল রোডের পশ্চিম মাথায়,যেখানে পরিত্যক্ত শ্মশান ঘাটটা রয়েছে। ও মাথায় গিয়ে তিতলির পা থামে। পেছনের সিএনজি থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছেলে দুটো ওকে ঘেরাও করতেই তিতলির হুশ ফেরে, পরপর অনতিবিলম্বেই কাটে ঘোর। একটাকে তিতলি খুব ভালো করে চেনে। তাবিব মজুমদারের দলের এক চুনুপুটি। শিকদার নাঈম নাম। তিতলির বান্ধবী রুমানার এককালে প্রেম ছিল এর সাথে। রুমানা ছেঁড়ে দিয়ে পরবর্তীতে আমেরিকান সিটিজেন সিপ পাওয়া এক বুড়ো লোককে বিয়ে আমেরিকা চলে গেছে। এই ছেলে সেই দুঃখে হাতও কেটেছিল বেশ কয়েকবার।
ওকে অবাক হবার সুযোগটুকু না দিয়ে ছেলেটা বলে,“ও তিতলি তুই!”
_“তোমরা!”
_“কাজ আছে তোর সাথে। শিহাব ভাই দেখা করতে চায়। চিনিস তো তাকে? চল আমাদের সাথে।”
পুরো ব্যাপারটা মস্তিষ্কে খেলাতে সর্বোচ্চ মিনিট খানেক লেগেছিল ওর। এরপর ঘেমে উঠে তিতলি হাত কামড়ে বলল,“কেন? মগের মুল্লুক?”
_“তা আমরা কি জানি! শিহাব ভাই জানে। কথা আছে তোর সাথে! ভালোয় ভালোয় ওঠ!”
_“নাইম ভাই! আপনি আমার সাথে এমন আচরণ কিভাবে করতে পারছেন? আমাকে তো আপনি চেনেন। নাকি চিনতে পারেননি ঠিকঠাক?”
নাঈম ওকথায় বিশেষ ভ্রুক্ষেপ না দেখিয়ে ধীরে বলল,“আফিফ কি হয় তোর? তোদের দু'জনের সাথে কথা আছে ভাইয়ের। আরে সিম্পল টকিং। আফিফও আছে সেখানে! আয় না! সময় নষ্ট করিস না!”
তিতলি চেঁচাবে সে উপায় আর রইলো না। নাঈমের পাশেই,যে হাট্টাগাট্টা ছেলেটি দাঁড়িয়ে ছিল, পকেট থেকে একটা চাইনিজ চাকু বের করতেই তিতলির দম আটকেছে গলায়। বুকের পায়রাটা জবুথবু হয়েছে মহাতঙ্কে। বড়ো বড়ো দু'টো ঢোক গিলে তিতলি বলল,“আফিফ ভাইয়ের সাথে কথা বলতে চাই আমি আগে।”
কম্পিত ডান হাতটা ব্যাগ হাতরাচ্ছে ওদিকে। ফোনটা যে সেই রাতে অফ করে বিছানায় রেখেছিল, ওরপর আর ফিরেও চায়নি। সকালে নিয়েছে কি নেয়নি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মাঝেই সেই হাট্টাগাট্টা ছেলেটার জোড়ালো একটা ধমকে কেঁপে উঠলো তিতলির পা-মাথা। মাথায় চক্করও দিয়ে উঠেছে প্রকাণ্ড রূপে। যেন ওর পায়ের তলার মাটি সরেছে খানিকটা। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক ওদিক কতক্ষণ দৃষ্টি ঘুরিয়ে,একটা পথচারীর অপেক্ষায় ছটফট করছিল তিতলি। তবে লাভ বিশেষ হয়নি!
আফিফ তখন দোকানের বেচাকেনায় বড্ডো ব্যস্ত। আজ,হাটের দিন। অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে তুলনামূলক বিক্রি বেশি হচ্ছে ! এতো ব্যস্ততার মাঝেও তিতলির ব্যাপারটা মাথা থেকে সরছে না। রাত থেকে কম চেষ্টা করেনি সে। বারবার ফোন বন্ধ পেয়েছে। কিছুক্ষণ আগে ফারিয়ার সাথে কথা বলে জানতে পেরেছে টিউশনে গিয়েছে তিতলি। এই কারণে অবশ্য কিছুটা নিশ্চিন্ত মনে অপেক্ষায় আছে আফিফ,ফিরলে তো এই পথ দিয়েই ফেরে রোজ। তখন ডেকে না হয় জানতে চাইবে ঘটনার বিশদ,বিয়েতে তিতলির এত কেন আপত্তি! কেন কাল ওভাবে কল কেটেছিল!
ঠিক দুপুর সাড়ে এগারোটা নাগাদ আফিফের দোকানের সামনে গাড়িটা দাঁড়িয়েছে। গুজি বাবু নেমে আশেপাশে তাকিয়ে মুখ থেকে পানের পিক ফেলে এদিকটাতেই আসছিল,দেখতে দেখতে আফিফ নিজের ক্যাশে তালা লাগায় শুরুতে। ঘাবড়ে ও যায়নি ঠিক, তবে ভবিষ্যতের খানিকটা আঁচ করে মনে মনে কথা ও সিদ্ধান্ত গুছিয়ে নিয়েছে, গিয়ে ঢুকেছে ওয়াশ রুমে।
_“সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ না?”
ওয়াশ রুম থেকে বেরুতেই বাবু নামের হ্যাংলা পাতলা লম্বাটে লোকটা কুঁজো হয়ে দাঁড়াল ওর সামনে। আফিফ চুপচাপ মাথা নেড়ে গম্ভীর হয়ে বলল,“জি। কি দরকার?”
_“শিহাব মজুমদার ডেকেছেন আপনাকে। কথা বলবেন আপনার সাথে।”
_“স্যরি যেতে বাধ্য নই আমি!”
বাবু ফিচেল হাসলো,লোকটার হাসিটা খুব বিশ্রী। একটু ঝুঁকে বলল,
_“আপনার এক আত্মীয়ার তার কাছে আছে। জিনাত সুলতানা তিতলি নাম। চেনেন তো? তিনিও আপনার সাথে দেখা করতে চান। উঠুন গাড়িতে প্লিজ।”
__________
এটা তাবিব মজুমদারের দলীয় ক্লাবঘর। সদর ছাড়িয়ে তালতলা রোডের অপজিটে পুরনো মনসা মন্দিরের সামনে। সুদীর্ঘ সতের বছর তালা পড়ে থাকলেও বিগত একবছর যাবত খোলা হয়েছে। চাঁদাবাজি করে দল চালানোর উপযুক্ত একটা মিটিং ঘর। চব্বিশঘণ্টা খোলা থাকে। যুবা বয়সী ছেলেদের পাঁচ বেলা মসজিদে খুঁজে না পাওয়া গেলেও এখানে এসে তাদের সুপ্রিয় অভিভাবকদের পা চাটতে ঠিকই দেখা যাবে পাঁচ বেলা।এটা যেন রাজনৈতিক সেক্টরের ধরাবাঁধা রীতি।
গাড়ি থেকে নেমে উদ্ভ্রান্ত মুখে এদিক ওদিক তাকাতেই শুরুতেই একটা ধাক্কার মতো খায় আফিফ। টোট ব্যাগটা বুকের সাথে চেপে ধরে কাঁদছিল তিতলি,এই ক্লাবঘরের মিটিং রুমে বসে আছে সে। জানালা থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মুখটা।
বাবু পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে শুরুতেই পাশের ছেলেটাকে বলল,“তার ফোনটা নিয়ে নাও!”
_“ফোন কেন নিতে হবে?”
আসিফের প্রশ্নে সামান্য হাসলো বাবু,“কাজ আছে তাই। ভাই নিড়িবিলিতে কথা বলতে চায়,আপনার ফোনটা থাকলে সমস্যা। পরে দিয়ে দেয়া হবে।”
_“আপনাদের ভাই কোথায়?”
_“আসতেছে! ভেতরে গিয়ে অপেক্ষা করেন। আপনার রিলেটিভ ভেতরেই আছে।”
রাগে আফিফের হাত মুঠি হয়ে এসেছে। বড়ো বড়ো পা ফেলে হন্তদন্ত হয়ে গিয়ে রুমে ঢুকে শুরুতেই তিতলি উঠে দাঁড়াল। চাহনি দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটা চমকেছে খানিকটা। আফিফ ওকে একটা ধমক দিলো চাপা স্বরে,“ফোন বন্ধ করে রেখেছিস কেন তুই ছাগল? আমি কতবার কল করেছি রাত থেকে, আইডিয়া আছে কোনো?”
তিতলি জলচাপা চোখজোড়া নিচে নামালো। পানি মুছে অস্ফুটে বলল,“ফোন বাড়িতে ফেলে এসেছি ভুলে। চার্জ নেই তাই অফ হয়ে গেছিল রাতে। আমি ঘুমিয়ে গেছিলাম।”
আফিফ আর কিছু বলতে পারছে না। দৃষ্টি ঘুরিয়ে, ধীরে আশপাশটায় বুলিয়ে শান্ত সুরে বলল,“একটা কথাও বলবি না তুই। যা বলার আমি বলবো।”
_“ওরা আমাদের ডেকে পাঠিয়েছেন কেন?”
_“হুমকি দিতে স্রেফ। ডোন্ট প্যানিক। আমি আছি।”
তিতলি শান্ত হতে পারছে না। আফিফের কাছ থেকে শুরুতেই লোকগুলোর ফোন কেড়ে নেওয়ার বিষয়টা উদ্বেগজনক। আজ এখানে ওদের চূড়ান্ত অপদস্থ করা হবে এটুকু আঁচ তিতলি পেয়েছে।
নাঈম এসে বাবুকে টেনে একপাশে এনে কানে কানে বলল,“আনলাম তো দু'টোকে ধরে। ভাই কোথায়? এদের দিয়ে করবো কি আমরা? আমরা বলবো সব?”
তিতলি অধৈর্য হয়ে সিনক্রিয়েট শুরু করে দিয়েছে,“এই আমাদের ছাড়ুন। কথা যা বলার,এখুনি বলে আমাদের ছাড়ুন।”
বাবু মুখ ঘুরিয়ে একটা ধমক মারলো তক্ষুনি,“চোওওপ শালির বে!”
শালি বলে আর গালটা শেষ করতে পারেনি বাবু,একটা প্রকাণ্ড চড়ে ওর চিমসানো গালটা এধার ওধার হয়েছে। চড়ের শব্দে বাকিদের চোখ ছানাবড়া। তিতলি লাফিয়ে উঠে দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে পিঠ। হাতের ব্যাগটা নিচে পড়েছে, শীর্ণকায় দু'হাতে চেপে ধরে আছে নিজের মুখ। হতবাক চোখজোড়া আফিফের লালচে হয়ে ওঠা মুখটাতে আটকেছে।
গালে হাত চেপে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আছে বাবু। চড়ের বিপরীতে পাল্টা আঘাত করলো না আর, ধীরে ধীরে হাতের ফোনটা নাঈমের কাছে রেখে বলল,“এই কুত্তার বাচ্চার ফোন এটা। সামলে রাখ। ভাই আসতেছে। ওদিকে থানা থেকে একটা কল এসেছে তাই ব্যস্ত একটু। ঘন্টাখানেক আগে কথা হয়েছে,ভাই বলল বসিয়ে রাখতে। তুই এই মাল দুইটারে মিটিং ঘরে আটকায়া রাখ। আমার যেন দ্বিতীয় বার না বলতে হয় একটা কথাও।”
__________
তখন প্রায় সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছে। দুপুর বেলাতে হালকা খটকা লাগলেও ফারিয়া অতটা পাত্তা দেয়নি। কিন্তু বিকেলের পরে আর পারলো না। মাহমুদকে কল করে বলল,“শুনছো! তিতলি তো বাড়িতে ফেরেনি। ওর ফোনটা অবধি ঘরে ফেলে চলে গেছে। ওর বান্ধবীদের সবার বাড়িতে কল করেছি। যে বাড়িতে টিউশন করায়, ডক্টর আশা, তাকেও কল করেছি। তিতলি কোত্থাও নেই।”
মাহমুদ বাড়ির পথেই রওনা দিয়েছে, আজ বড্ডো মাথাব্যথা ছিল বলে দোকান বন্ধ করেছে। গলির পথে ঢুকতেই ফারিয়ার কলটা পেয়েছিল। কল কেটে ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢুকেছে। এরপর থেকে হাপাচ্ছে।
_“কিছু বলে যায়নি?”
_“না তো। টিউশন পড়াতে গিয়েছে,এ কথাই তো বলল। কি হয়েছে বলো তো!”
মাথায় হাত পড়েছে মাহমুদের। একটা খুব অযাচিত চিন্তা যে তার মাথায় আসেনি তা নয়। তবুও,তিতলি একজন বিবেচনা বোধ সম্পন্ন মেয়ে হয়ে এমন কিছু করবে তা বিশ্বাস করেনা মাহমুদ। যেখানে তিতলিকে বিয়ের জন্য ওভাবে জোর চাপ দেয়া হয়নি আজ অবধি।
_“এখন কি করবো? অপেক্ষা করবো? দিন দুনিয়া ভালো নয় গো! সুমত্ত মেয়ে মানুষ। রোজ খবরের চ্যানেল খুললেই কত নিউজ দেখি। পরশুও একটা অঘটন ঘটলো। সেদিন দু'টো রেইপ!”
ফারিয়ার কথায় বেশ খানিকটা ভেঙে পড়েছে মাহমুদ,আরো বেশি অস্থিরতা নিয়ে বলল,“হ্যাঁ গো! থানায় যাবো? আচ্ছা আফিফ ভাইকে কল করে দেখি না হয় আগে। তিনি কি বলেন দেখি!”
আফিফের নাম্বারটা বন্ধ। দোকানের নাম্বারটাও। শেষটায় ফারিয়া কল করে বসল কর্মচারী কাউসারকে। কাউসার বলল,“আফা আমিই বাড়িতে কল করতে যাচ্ছিলাম। ভাই তো সেই এগারোটায় বেড়িয়ে গিয়ে ফেরেনি এখনো। এদিকে দোকানে সাড়ে তিন হাজার টাকার হিসাব মিলাতে পারছি না। উল্টোপাল্টা হলে ভাই বকবে আমাকেই। কি করি বলেন তো? দুইটা নাম্বার বন্ধ!”
ফারিয়ার মনে হলো ওর কানে তালা লেগে গিয়েছে। “ভাই তো সেই এগারোটায় বেরিয়েছে, ফেরেনি এখনো।” এই কথাটার পরে ও যেন কিছুই শুনতে পায়নি। কল কেটে কিছুক্ষণ বোকা মুখে মাহামুদের দিকে তাকিয়ে থেকে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল,“ভাইয়াও তো দোকানে নেই এগারোটার পর থেকে। মানে কি! দু'জন পালাইছে নাকি।”
________
দরজাটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে পুরো আধো অন্ধকার হয়ে আছে। ভ্যাঁপসা, স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ চারপাশে। দু পাশের দেয়ালের ঐ ঘুলঘুলিটা না থাকলে এই খানিকটা আলোও বোধহয় আসতো না। বসে বসে হাত কামড়াচ্ছে তিতলি, ফোঁপানির তোড়ে গা কাঁপছে খানিক পরপর।
আফিফ গজ তুলো নিজের কপালের ক্ষততে চেপে তিতলির মুখের দিকে চেয়ে আছে। তখন ঐ ধাক্কাধাক্কিতে, ওদের হকিস্টিকের বারি খেয়ে কপাল যেভাবে কেটেছে,তাতে ওষুধ না ছোঁয়াতে পারলে ভুগতে হতো বেশ। জানোয়ার গুলো মায়া করে ফার্স্ট এইড বক্স দিয়ে গেছে, এটা ভালো লক্ষণ। তার মানে ওদের খুন করার পরিকল্পনা আপাতত নেই।
_“ওরা কি আমাদের মেরে ফেলবে আফিফ ভাই?”
আফিফ বুঝতে পারছে না আসলে। হাতড়ে হাতড়ে জবাব দিলো,“আরে নাহ। কথা বলবে!”
_“আপনি তখন ওভাবে চড়টা মেরেছেন কেন বলুন তো! ক্ষেপে গেলো সবাই। আমরা যে কিছু করতাম না,থানায় যেতাম না,এটা এখন এরা বললেও বিশ্বাস করবে না। নির্ঘাত মারবে আমাদের। এটা এখন আয়না ঘর আমাদের। আচ্ছা আফিফ ভাই? আমি চেঁচাবো জোরে? কেউ শুনলেও তো শুনতে পারে। পাশেই তো পাঞ্জেগানা মসজিদ।”
আফিফের মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে মায়া লাগলো এবার,কপাল থেকে হাত সরিয়ে নরম সুরে বলল,“আগে আমাকে পরিস্থিতি বুঝতে দে! উল্টোপাল্টা করা যাবেনা হঠকারী হয়ে। এসে কিনা হাত বেঁধে দেয়। শিহাব আগে আসুক। দেখি কি বলে।”
তিতলি চোখ মোছে না। ওভাবেই কাঁদতে কাঁদতে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে।
_________
সন্ধ্যা ছয়টা তখন। পুরো পাড়ায় খবর রটে গিয়েছে যে মুন্সী বাড়ির তিতলি পালিয়েছে। তাও আফিফের সাথে। রটিয়েছে ও পাড়ার সায়মা। আফিফের সাথে তিতলির বহুদিনের সম্পর্ক,তা পরিবারে কেউ মানছে না বলেই এই কাণ্ড।
মুরব্বিরা বলেছেন,“আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে! এ তো ভালো ব্যাপার হতো। পালানোর কি দরকার ছিল?”
ঘটক চাচা এসে এই গুজবে জোর দিয়ে বলল,“কথাটা আমি মাহমুদ আর ওর বৌয়ের কানে আগেও তুলেছিলাম। প্রায়ই তো দেখতাম দু'টোকে এক অটোতে যাচ্ছে। মাহমুদের না থাকলেও তিতলির ভাবী অর্থাৎ আফিফের বোনের আবার এই বিয়েতে আপত্তি ছিল। সেজন্যই আফিফ শেষে মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে কিনা!
ফারিয়া বুক চাপড়ে কাঁদছে সন্ধ্যার পর থেকে,“ওও ভাইয়াগো। এ তুমি কি করলে গো! এই ছিল তোমার মনে! শেষে ঐ বাট্টু, শয়তান মায়ের শয়তান মেয়েটিকে বিয়ে করবে গো! ও আল্লাহ গো, আমাদের চার বোনের কপাল পুড়লো গো! ভাই থেকেও আজ থেকে নাই হয়ে যাবে গো।”
মাহবুব এসে দুই দফায় ধমকেছে ওকে,“চুপ করো! তোমার মাথা ঠিক আছে? সবার সামনে কেন নিজেদের বাড়ির মানসম্মান নষ্ট করছো? অপেক্ষা করো! আমি থানায় যাচ্ছি!”
হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে ফারিয়া,“চুপ তুমি থাকো। একটা অসভ্য বোন তোমার। কিভাবে আমার ভোলাভালা ভাইয়াকে ফাঁসিয়ে নিলো।”
_“হ্যাঁ, যেভাবে তুমি আমাকে ফাঁসিয়ে নিয়েছিলে একদিন তাইনা?”
চুপ থাকেনি মাহবুবও। লেগেছে স্বামী স্ত্রীতে ঝগড়া। ফারিয়া সইতে না পেরে তার মুখটা ছুটিয়ে দিয়েছে আবার,“কুত্তার বাচ্চা। সেই শাস্তি তো তোর শাকচুন্নী মা আজীবন আমাকে দিয়েছে!”
_“আর তুমি আজীবন তিতলিকে কিসের শাস্তি দিয়ে এসেছো? ও কিছু করেছে তোমার সাথে কখনো?”
সব রেখে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া থামাতে ব্যস্ত হয়েছে সবাই। ছুটে এসেছে মাহবুবের বাকি দু'জন ভায়রা ভাই। তারা ঝামেলা থামানোর চেষ্টা করলেও আসমা,ফারজু আর রুমকি এসে আগুনে ঘি ঢালার মতো চেঁচালো,“ভাইয়া ঐ মেয়েকে বিয়ে করে আনুকনা। আমরাও দেখবো ঐ বাট্টুস মেয়ে কিভাবে আমার ভাইয়ের সংসার করে!”
_______
গুজি বাবুর এক লোক মাগরিব নাগাদ উঁকি দিয়েছিল ঘরে। আফিফ ক্ষেপে উঠে বলল,“ভাই সমস্যা কোথায়? আপনারা বললেন শিহাব এসে কথা বলবে,এভাবে আটকে রাখার মতলব কি? সারাটা দিন ধরে কিছু না খেয়ে আটকে আছি। মতলব কি?”
_“মতলব জেনে তোর কাজ কি শালা?”
আফিফ রাগ চেপে রেখে শান্ত সুরে বলল,
_“আশ্চর্য! গালি দিচ্ছেন কেন! আমি ভাই ডাকলাম আপনাকে! আর আপনি গালি দিচ্ছেন।”
_“চুপ! তোর ভাই ডাকার গুষ্টি কিলাই!”
_“আচ্ছা তা কিলান। কিন্তু আমাদের ছাড়েন। এবং ঐ ঘুষিটার জন্য দুঃখিত। মাথা ঠিক ছিল না তখন। আপনাদের কথা দিচ্ছি, আপনারাই যা বলবেন তাই করবো। মেয়ে মানুষ আছে সাথে। বদনাম রটে যাবে, ছেঁড়ে দিন!”
নেশাখোরের মতো আচরণ, তিতলি নড়চড়ে উঠে নিজের ওড়না সামলে নিলো আগেই যখন দেখলো লোকটা অহেতুক কারণে ওর গোটা শরীরে নজর বুলাচ্ছে। ব্যাপারটা আরো আগেই নজরে পড়েছে আফিফের, ও চুপচাপ চেয়ার থেকে নেমে,একদম ফ্লোরে বসে আড়াল করে ফেলল তিতলিকে।”
_“শিহাব ভাই কখন আসবে? প্লিজ বলুন। লক্ষি ভাই!”
লোকটা একটু নরম হলো,
_“তাবিব মজুমদার হঠাৎ স্ট্রোক করেছেন। সময় লাগবে।”
ভীষণ অবাক আফিফ।
_“স্ট্রোক করেছেন কেন?”
_“আমি কি জানি! তুই চুপ কর! ছাগল! বেশি কথা বলে।”
আফিফ দাঁতে দাঁত চেপে নিয়ে এবারের গালিটাও হজম করে নিলো। আজ সাথে,এভাবে একটা মেয়ে না থাকলে কলিজা এফোঁড়ওফোঁড় করে দিতে ছাড়তো না এই কুত্তা গুলোর,তাতে মারা পড়লেও ওর ক্ষতি ছিল না। কিন্তু এখন আপাতত হাত পা বাঁধা ওর, বাইরের পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। নইলে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। সব আক্রোশ যদি তিতলির ওপর দেখায় সেটাই ভয় আফিফের!
লোকটা আবার দরজা বন্ধ করে চলে যায়,তিতলি আবার ফুঁপিয়ে উঠেছে ততক্ষণে।
আসিফের মেজাজ হচ্ছে গরম,“কাঁদলে বেরুতে পারবো এখান থেকে?”
_“না কেঁদেও তো বেরুতে পারছি না। আপনাকে কি করবে তা জানি না, তবে মেয়ে হিসেবে আমার সাথে যে খুব বাজে কিছু করবে তা তো জানি আফিফ ভাই।”
ভেতরকার অস্থিরতা এবার আর আফিফকে বসে থাকতে দিলো না। এশার আজান পড়তেই ছটফটিয়ে উঠে দরজায় লাগালো বেশ কিছু লাথি,“এই। আমি এখন কথা বলতে চাচ্ছি। কল লাগান শিহাব ভাইকে। কল লাগান বলছি!”
এপাশ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর নেই। দরজাটা স্টিলের। দফায় দফায় লাথি পড়ে ঝনঝন করছে দীর্ঘসময় ধরে। কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো অবস্থা। সেই আওয়াজটুকু একটা নির্দিষ্ট সময় পরে যখন ছাপিয়ে গেল। আফিফ তিতলির কান্নার শব্দে আবার ঘুরলো চোখ গরম করে। হুট করে আবার রাগটা পড়ে গিয়ে থিতু হলো আফিফ,দু কদম এগিয়ে গিয়ে বলল,“শরীর খারাপ লাগছে? এভাবে বসে আছিস কেন?”
তিতলি শ্বাস অবধি ছাড়ছে না। এমন ভাবে মেরুদন্ড টানটান করে যন্ত্র হয়ে আছে। আফিফ রাগ দেখালো,“কি রে বল?”
_“আমার জামার মধ্যে বিশা ঢুকেছে আফিফ ভাই। কাটা দিচ্ছে। বিষ লাগছে পিঠে। আমি মরে যাবো!”
ঘটনার আকস্মিকতায় চোখজোড়া গোল্লা গোল্লা হয়েছে আফিফের। কান্নায় ভেঙে পড়েছে তিতলি। মেয়েটার যে খুব কষ্ট হচ্ছে তা স্পষ্টত বোঝা যায় ওর রক্তবর্ণা মুখটা দেখে। সময় নিয়ে বলল আফিফ,
_“হাত ঢুকিয়ে ফেলে দে আহাম্মক?”
_“আমি পারবো না,আমি মরে যাবো।”
তিতলির খিঁচুনি উঠেছে। সারাদিনের দুশ্চিন্তার সাথে শারীরিক যন্ত্রণা মিলেমিশে একাকার। পুরনো অ্যাজমা ফিরে আসছে মনে হচ্ছে, কিন্তু সাথে ইনহেলার নেই।
আফিফ দু’মিনিট ভাবলো। এরপর ধীরে গিয়ে সামনে বসে লম্বা একটা দম ছেড়ে বলল,“আমি তোকে ছুঁয়ে দিলে তোর সমস্যা আছে?”
তিতলি কাঁপল প্রচণ্ড বেগে।
ডাগর ডাগর চোখজোড়া মেলে দেখতে লাগলো আফিফের শান্ত মুখটা। আফিফ চোখ নামিয়ে বলল,“আমি ওটা ফেলে দিচ্ছি।”
কাঁদতে কাঁদতে দু'পাশে মাথা নেড়ে তিতলি দম আটকে বলল,“এখান থেকে মনে হচ্ছে আর বের হতে পারবো না। তাইনা আফিফ ভাই? খারাপ কিছু হবে আমাদের সাথে?”
_“ধূর বোকা। আগে এদিকে আয়। সাহস রাখ,পোকাটা এক্স্যাক্টলি কোথায় পিঠের? আগে বল,আমি ছুঁয়ে দিলে সমস্যা আছে?”
বলতে বলতে আফিফ পকেট থেকে রুমাল বের করে ডান হাতে পেঁচিয়ে হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিতেই তিতলি সরে গিয়ে আরেকটু কুঁকড়ে যায়,প্রায় ফিসফিসিয়ে, ওভাবেই কেঁদে বলে,“না সত্যিই এটা। আমরা বেরুতে পারবো না। তাই মনে হচ্ছে আপনাকে একটা কথা বলি। বলবো? আমি আপনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি আফিফ ভাই।”
#চলমান……