#ও_যে_মানে_না_মানা
#পর্ব_৫
#ইসরাত_ইতি
_তোমার কি মাথা গেছে? আমি ওভাবে সম্পৃক্ত হবো না এসবে। বোকা নাকি আমি? আমার জীবনের মায়া আছে। দেখি কায়দা করে যদি পারা যায়। ভাবগতিক বুঝতে হবে তো। তোমাকে কি বলেছি সেটা মাথায় রেখো,আমি বলা না পর্যন্ত ঘর থেকে বেরিয়ো না। বোঝা গেছে? যদি কেউ কোনো কারণে থ্রেট দেওয়ার চেষ্টা করে তবে সরাসরি আমাকে কল করবে।
_______
তিতলির দম আটকে গিয়েছে দুশ্চিন্তায়। না চাইতেই এ কোন বিপদ ঘাড়ে নিয়েছে বুঝতে পারছে না। সবাইকে না চিনলেও ঐ শিহাব পার্টির গুজি বাবুকে খুব ভালো করে চেনে সে। একবার পিছে পড়ে গেলে আফিফ ভাইকে খুব ভুগতে হবে ভবিষ্যতে। তিতলি লোকটার ভোগান্তি চায়না। কখনো কারো ক্ষতি না করা সাদাসিধে মানুষটা আফিফ ভাই। কিন্তু এই মরার দেশে সাধারণ মানুষকেই যে বেশি লাঞ্ছিত হতে হয়েছে সবসময়। ওড়না চেপে কপাল মুছে গলা খাঁকারি দেয় তিতলি। আস্তে করে বলে,“এটুকুরও দরকার নেই তো আফিফ ভাই। আনদেখা করেন এসব। কে কাকে থ্রেট দিয়েছে সেসব পুলিশকে বললেই কাজ হবে কেন? পুলিশ তো টাকা খাবে! আপনি বিপদে পড়বেন, ওদের হাতে মার খাবেন পরে। বাদ দিন। এখনো বিয়ে করেননি, নিজের কথা ভাবুন।”
তিতলি ঠাট্টার ছলে কথাগুলো বললেও আফিফ জবাব দেয় সহজ গলায়,“বিয়ে করিনি দেখেই তো নিজের কথা ভাবছি না। বিয়ে করলে তখন আর এসব করতাম না। একটু নিজের কথা ভাবতাম।”
আফিফ ভাই ভারিক্কি মানুষ। সচরাচর বিয়ে-বৌ নিয়ে এমন মশকরা করেন না। আজ করলেন দেখে তিতলির মন প্রশ্রয় পেতে চাইলো। তিতলির খুব জানতে ইচ্ছা করছে লোকটা বিয়ের পরে এমন ছিমছাম, খুব সংসারী গোছের সহজ মানুষ থাকবে কিনা। বিয়ের পরে, ব্যস্ততার মাঝে বৌ কল করলে মেজাজ না দেখিয়ে ঠান্ডা গলায় কথা বলবে কিনা। ফেরার পথে সব ব্যস্ততা মাথায় রেখেও বৌয়ের জন্য চালতার আচার আনতে মনে থাকবে কিনা। বৌকে কাছে পেতে জান,সোনা,লক্ষিটি বলে পা টেনে অনুরোধ করা ভদ্র পুরুষটি হবে কিনা। তিতলির খুব জানতে ইচ্ছে করছে এসব। লোকটা দাদীর সংজ্ঞায়িত আলফা ম্যান নাকি তিতলির মনে আঁকা আলফা ম্যান,আজ এটা জেনে নিতেই মন চাইছে। বেশি কিছু তো চাহিদা নেই তিতলির যৌবনের। একজন আফিফ ভাইয়ের মতো স্বামী,আর এই টুকটাক সব। রান্না বাটি খেলা আর কড়া মিঠা গৃহস্থালি রোম্যান্স। আফিফ ভাই ঠিক এমনই কিনা,তিতলির খুবই জানতে ইচ্ছে করছে আফিফ ভাইয়ের মুখ থেকেই।
_“আচ্ছা রাখো। কাস্টমার এসেছে।”
এসব প্রশ্ন বরাবরের মতো মনে মনেই থাকে তিতলির। ও খুঁজে পায় নিজে কেবল ওর কল্পনার রাজ্যে। তিতলি ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আফিফ কল কাটার পরে তিতলি কল্পনায় সংসার অবধি আর যেতে পারে না। ফারিয়া এসে পেছন থেকে ডাকতেই ওর বিভ্রমের ঘোর কাটে। তাকিয়ে দেখে ফারিয়ার চোখ দুটিতেও প্রকট বিস্মৃতি ঠাশা। চোয়াল ঝুলে আছে খানিকটা,অবাক হয়ে জানতে চাইলো,“ভাইয়ার সাথে কথা বলছিলে?”
_“হু।”
_“কেন?”
এই কেন বলার ধরণটা তিতলির ঠিক পছন্দ হলো না। যেন ধমকাচ্ছে ওকে। আফিফ তিতলির স্বামী হলে এই ফারিয়া নামের মেয়েটি ওর সবচে’ বেয়াদবতম ননদ হবে তা তিতলি জানে। পিছে পিঠে সারাদিন কাঠি করবে তিতলির,আফিফকে দিয়ে মারও খাওয়াবে নিশ্চিত। এটাকে উচিত শিক্ষা দিতে হবে। তিতলি উচিত শিক্ষা দিতে জানে। গলা খাঁকারি দিল তিতলি, ফারিয়ার সাথে মজা নিতে গলায় নাকি সুর টেনে বলে,“কি যে বলি ভাবী তোমার ভাইয়ের কথা! সেদিন শুনলো আমি অসুস্থ। এখন দিনে দুইবার করে কল করে জানতে চায় আমি কেমন আছি। মাথার যন্ত্রণা কমলো কিনা। পুরো পাগল এক লোক। আমি এমন আন্তরিক মানুষ দু'টো দেখিনি ভাবী। আফিফ ভাই আমার ভীষণ কেয়ার করেন সবসময়।”
বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে কথাগুলো বলার সময় চোখজোড়া চকচক করছে তিতলির। দেখছে,ওর সামনে দাঁড়ানো ভাবীর মুখে ছেয়েছে আষাঢ়ের ঘনঘটা। মনের কথা শোনার ক্ষমতা তিতলির নেই,তবে ও যেন স্পষ্ট শুনছে ভাবী ওকে গাল দিচ্ছে,“চুল ধরে একটা ঘুরান্টি মারবো তোকে নির্লজ্জ বাটুস মেয়ে কোথাকার। সবসময় আমার ভাইকে ফাঁসানোর ধান্দায় থাকিস নটাঙ্কির বাচ্চা। জীবনে হতে দেবো না এটা,আমি বেঁচে থাকতে অন্তত না।”
তিতলি হাসছে নিজমনে, স্তম্ভিত ফারিয়াকে ওভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেই কলঘরে ছোটে। এখন এখানে কি কি ঘটবে তা ও ভালো করেই জানে, এজন্য আড়ি পাতার দরকার নেই। ফারিয়া এখন তার আসমা আপাকে কল করে কাঁদো কাঁদো গলায় বলবে,“ও আপা গো! আমাদের ভাইয়া গেলো গো! ভাইয়ার কি হয়েছে গো! ভাইয়া ঐ অবলামুখো ছ্যাঁচড়া চুন্নী মেয়েটাকে কল করে কথা বলে নিয়মিত। ওদের মধ্যে কিছু হচ্ছে না তো? তুমি একটু ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করো,সে কি চায়? আমি কিন্তু ঐ মেয়েকে আমার ভাইয়ের বৌ হতে দেবোইনা।”
▪️▪️▪️
_“থানা ব্যবসা রমরমা ছিল স্বৈরাচারের আমলে। একটা সাধারণ ডায়রি করতে যাও, সেখানে লাগাও পাঁচশ টাকা। মাছির মতো ভনভন করতো খদ্দের। আর আইনের পোশাক পরিহিত সততা বেঁচে খাওয়া বান্দির পুত গুলো নিজের আমল বিক্রি করে জনগণের পেছন মারতো। ভয় তো ছিলো না গায়ে,ওরা ঠিক জানতো হাসিনা আপার স্থানীয় পোষা কুত্তা গুলো ওদের বাঁচিয়ে চলবে। এখন থানা এভাবেই ঝিমায়। দেখো দেখো, কনস্টেবল দু'জন মাছি মারছে। ওদের কোনো খদ্দের গোয়া মারতে যাচ্ছে না তাই। ইন্টেরিমকে যতই গাল দাও, এই সরকার এসেই এই বাঞ্চোদদের সোজা করে রেখেছে। জানো সেদিন ফোন চুরি হয়েছে বলে জিডি করতে এসেছি,মাগনা মাগনা সব কাজ গুছিয়ে দিলো এখানকার সাব ইন্সপেক্টর।”
লোকটা বড্ডো বেশি কথা বলে,সেই সাথে রয়েছে অপ্রয়োজনীয় গালাগাল। আফিফের রাগ হচ্ছে, ইচ্ছে করছে এখান থেকে উঠে যেতে, কিন্তু উঠছে না। দোকান ফেলে ঘন্টাখানেকের জন্য বেরিয়েছে। এখানে বসে এখনো সিদ্ধান্ত হীনতায় ভুগছে,যে কাজটা করতে চাচ্ছে সেটা করবে কিনা। সিসিটিভির ফুটেজ ওর কাছে আছে। কিন্তু এই নষ্টের দেশে সবটা কার্যকরী হবে কিনা সেটাই ভাবনার বিষয়।
_“ঐ দেখো। ঐ দেখো। ঐ আশরাফ বাঞ্চোদটা যাচ্ছে। হাসিনার আমলে কত দাপট ছিল এর। এখন কেমন গুজো হয়ে হাঁটে। মনে হয় যেন পাছায় ফোঁড়া হয়েছে। ইচ্ছে করে গিয়ে পেছন থেকে একটা লাথি মারি।”
আফিফ মুখ ঝামটা দিল এইবার,“একটু কম কথা বলবেন? বড্ডো বেশি কথা হচ্ছে এখানে। অপ্রয়োজনীয় সব।”
লোকটাকে আফিফ চেনেনা। থানার সামনে এই চায়ের দোকানেই দেখা। লোকটা শুধু কথাই বেশি বলে না,চাও খায় বেশি,তাও বিশ্রী রকমের শব্দ করে। একটু পাগল পাগল বেশের। আফিফের ধমকে নির্লজ্জের মতো দাঁত বের করে হাসলো। কথা তো থামালোই না উল্টে জানতে চাইলো,“বারো তারিখের নির্বাচনে তুমি কাকে ভোট দিবে?”
মুখে একটা গালি এলেও ওটা গিলে নিয়ে আফিফ নজর বুলাল আশেপাশে। যা ধারণা করেছিল তা সত্যি সম্ভবত। খুব চেনাজানা দু'টো মুখের উদয় হয়েছে। থানার গোল চত্বরের আশেপাশে গুমোট পায়চারি তাদের। এদের দুজনকেই চেনে আফিফ।
_“ওদিকে কি দেখো? আজ একটা মার্ডার হয়েছে। ডাকাতি কেইস। প্রবাসীর বৌয়ের ফ্ল্যাটে ঢুকে তাকে জবাই করে হত্যা। খুব মার্ডার হচ্ছে ইদানিং। এই পুলিশ মাদারবোর্ড গুলো আসলে বুদ্ধি করেই জনগণের নিরাপত্তা দিচ্ছে না। ওরা ভাবছে,“দেশ থেকে আমাদের আম্মাকে বিদায় করলি! এখন দেখবো তোদের ইন্টেরিম তোদের কিভাবে বাঁচায়। তোরা মারা খাবি আর আমরা মজা নেবো।”
লোকটার কথায় নিরুত্তর থাকলো না আফিফ,বলল,“পুলিশ এখন চাপে আছে সবদিক থেকে। একচেটিয়া দোষ দিয়ে লাভ নেই। রাজনীতির ছকটা বড্ডো ঘোড়েল,আমরা যা ওপর থেকে দেখছি সবসময় সেটা হয়না। ভেতরে অন্যকিছু থাকে। এখন চলছে ডিপ স্টেটের কারবার।”
লোকটা আগ্রহী হয়ে উঠেছে,বলল,“যাই বলো, তারেক রহমানের পোটেনশিয়াল আছে। ফেসবুকে যতই জামায়াতের ভক্ত থাকুক না কেন জিতবে এই তারেক রহমান।”
_“যেই জিতুক। তাতে আপনার লাভ?”
_“সত্যি বলতে কোনো লাভ নেই। আমার মিষ্টি পট্টি একটা মিষ্টির দোকান আছে। আমার জীবন যাবে ইমাম সাহেব, পণ্ডিত মশাই, ঘুষখোর, চোর, লুচ্চা, সাধু, সব শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে মিষ্টি বিক্রি করতে করতে। আর ফেসবুক খুলে জনগনের মারা খাওয়া দেখবো।”
আফিফ হাসলো নিশ্চুপে। লোকটা জানতে চাইলো,“তুমি কোন দল জিতলে খুশি হবে?”
_“আগ্রহ নেই। আমারো জীবন যাবে চাল ডাল বেঁচতে বেঁচতে। একটা সুপার শপের মালিক আমি। বসে বসে জনগনের মারা খাওয়া দেখবো আর রমজানে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়াবো সিন্ডিকেটের চাপে। পাঁচ ওয়াক্ত গিয়ে সিজদা দেবো মসজিদে। তারপর এই নষ্টের দেশে একদিন মরে যাবো।”
আফিফ কথাগুলো শেষ করে উঠে এলো। ঠাঠা রোদের মাঝে ভীষণ গরম লাগায় বুকের বোতাম খুলে হাঁটছে। নিঃসঙ্গ জীবন আজকাল বড্ডো বেশিই বোরিং লাগতে শুরু করেছে। এমন দুপুরে কোনো নারী কল করে যদি ঘরে যেতে আবদার করতো তবে সম্ভবত ভালো হতো। এই উপলব্ধিটুকু বেশ হচ্ছে আফিফের। মানুষের জীবনে আসলে একটা ঘরে ফেরার গান দরকার। যেটাকে সবাই নারীলোকের ঘ্যানঘ্যান বলে। সেটাই পুরুষ লোকের ঘরে ফেরার গান।
ফোনটা বাজছে পকেটে। আফিফ বের করে দেখলো তিতলির কল। তাড়াহুড়ো করে কেটে দিয়ে কল ব্যাক করে জানতে চাইলো,“হ্যাঁ বল! কিছু হয়েছে? কোথাও বেরিয়েছিলিস?”
_“ওজন্যই কল দিলাম। আমার ছাত্রের বাড়ি থেকে কল এসেছে, ওরা পূজার ছুটিতে কক্সবাজার যাবে। তো ফিরবে দেরি করে। আজ,কাল,পরশু গিয়ে পড়িয়ে আসতে বলেছে। আপনি বললেন বাড়ি থেকে বেরুলে আপনাকে জানাতে তাই জানালাম। ঘটেনি কিছু।”
_“আচ্ছা ভালো। কখন যেতে হবে?”
_“আজ বিকেলে। যেতেই হবে। নয়তো রেগে যাবেন ডাক্তার ভাবী। এ মাসে অসুখের কথা বলে ইতিমধ্যে পাঁচ দিন কামাই করেছি। টিউশন ছুটে যাবে। এমন ভালো টিউশন আমি আর পাবোনা।”
_“এতো টিউশনের চিন্তা করছিস কেন? সামনেই তো বিয়ে করবি। জায়গাবদল হলে টিউশনি ছাড়তে হবে। বারোটার দিকে এক পাত্রপক্ষ এলো, আমার কাছে তোর ব্যাপারে জানতে চাইলো। পাত্র মালেশিয়া থাকে,বৌ নিয়ে সোজা মালয়েশিয়া যাবে। কথা বলে মনে হলো তোর ব্যাপারে আগ্রহ আছে।”
তিতলির পুরনো রাগটা ফিরে আসছে। দাঁত চেপে ঢোক গিলে ও প্রসঙ্গ বদলায়,“আপনি থানায় গেছিলেন?”
_“হু। তবে কাজ হয়নি।”
_“কেন কাজ হয়নি?”
_“গুজি বাবুর লোকজন আশেপাশেই আছে। নির্ঘাত জানে আমার কথা। এবং খুব সম্ভবত আমাকে ফলো করে এখানে এসেছে। সকাল থেকে খেয়াল করিনি। এখন গিয়ে দোকানের আশপাশটা দেখলেই বুঝবো। আমার কপালে খুব সম্ভবত দুঃখ আছে রে!”
আসিফের মশকরা গায়ে না মেখে তিতলি বলল,
_“আর ঐ মার্ডার কেসের কি হলো? ফেসবুকে অবধি খবরটা উঠেছে দেখেছেন। সবাই ধারণা করছে ডাকাতি।”
_“হু। এখন ভাবছি, কি করবো।”
আফিফ রাস্তা ধরে সোজা হাঁটছে, চারপাশে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে ধীরে। তিতলিরও ফোন রাখতে ইচ্ছে করছে না। আজ ওর সুপ্রসন্ন কপালের ওপর ও নিজেই বড্ডো প্রসন্ন। হোক না দরকারে, তবুও ওর মতো অবাঞ্ছিত কারো জন্য ঐ ভদ্রলোকের এতটুকু দরদ বড্ডো বেশিই লাগছে তিতলির কাছে। ওর বুক আনন্দে ধুকপুক করছে। পুরনো বাচ্চামি মাথায় চেপে বসতে চাইছে। ভেতর থেকে কেউ ওসকাতে চাইছে।
_“যা তিতলি গিয়ে লোকটাকে বলেই দে। পুরুষ মানুষ। একটা জবাব তো দেবেই। ভালোবাসার প্রস্তাব দিলে মুখের ওপর তোকে চড় তো মারবে না। অমন বিদঘুটে আলফা ম্যান,আফিফ ভাই অন্তত নন।”
পরক্ষণেই সচেতন হয় তিতলি। মানুষ কল্পনাতেই সুখী, তিতলিও ঐ মানুষ হবে। রূপকথার গল্পের নায়িকার মতো আকর্ষণীয় ও নয় যাকে আফিফ বা কোনো ভালো ছেলে এক বলাতেই জীবনে ঢুকতে দেবে। ওকে ওই রাজনের মতো গাঞ্জুটিরাই ভাও দেয়,আফিফ তো ঘুরেও দেখতে চায়না।
_“আফিফ ভাই?”
নীরবতার দেয়াল ভেঙে তিতলি বলল।
_“হু?”
_“হাঁটছেন নাকি?”
_“হ্যাঁ। কিছু বলবি?”
তিতলি ঢোক গিলল। জানে আফিফ মানবে না,ওরও এতো আদিখ্যেতা করার অভ্যেস নেই, তবুও গলা আটকে আটকে বলল,“কাচ্চি হচ্ছে বাসায়। আপনি আসবেন? দুপুরে খেয়ে যান প্লিজ!”
আফিফ ওপাশে নিশ্চুপ থাকলো মিনিটখানেক,পরপর শান্ত সুরে বলে,“রেখে দিস আমার জন্য। রাতে খাবো। সময় নেই, নয়তো আসতাম। আজ এমনিতেই থানার চক্করে ঘন্টা তিনেকের লস হয়েছে। পূজার ব্যস্ততা মানুষের। এক বেলা কামাই করলে হাজার হাজার টাকার লস।”
তিতলি বলে ফেলল,
_“অনেক তো টাকা আপনার। এতো টাকা দিয়ে কি করবেন? সারাদিন এতো টাকা টাকা কেন করেন?”
আফিফ নিঃশব্দে হেসে জবাব দিল,“আজ থেকে দশ বছর আগে একটা শুকনো বনরুটি খেয়ে ইতালির রাস্তায় রাস্তায় কাজের খোঁজে কুত্তার মতো যখন ঘুরছিলাম তুই তখন এই প্রশ্নটা করলে বলতাম,“এত টাকা দিয়ে মাকে শান্তি দেবো। বোনদের স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেবো। বড়ো বিল্ডিং তুলবো বাড়িতে। এসব এখন আছে আমার,সব করেছি জীবনে।
এখন আসলে জবাব পাচ্ছি না তোর প্রশ্নের,এত টাকা দিয়ে আমি কি করবো? হয়তো আরো আরো আরাম কিনবো! কিন্তু টাকা আমাকে কামাতে হবে তিতলি। যতক্ষণ দম আছে।”
তিতলি চুপ হয়ে যায়,যদিও মুখে এসেছিল,“আমাকে আপনার আরামের জায়গা বানান।”
তবে ও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,“রাখছি।”
ফোন কেটে পাড়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে তিতলি। পাশেই সংযুক্তা। এতক্ষণ ওকে খেয়াল করছিল,এবার বলল,“কার সাথে কথা বলছিলি?”
_“পছন্দের মানুষ!”
_“ওরে বাপরে। কে সে?”
_“আছে একজন।”
_“এতকিছু কখন হলো? প্রেম করিস?”
_“না একতরফা।”
_“ওমা! বলিস না কেন?”
_“আমি এসব বলতে পারি না। একটা অসম্ভব কিছু মনে হয়।”
হাসলো সংযুক্তা,মজা করে বলল,“তাবিজ কর। কালো জাদু কর। ঐ তোর একটা দাদী আছেনা? সে তো এইসব করে দেয়। তাকে গিয়ে বল করে দিতে। একদম দিওয়ানা হয়ে ঘুরবে তোর পিছে।”
রাগী চোখে তাকালো তিতলি,“কিন্তু এভাবে তো আসলে মানুষ পাওয়া হয়না। আমি তো প্রেমিক চাই,কাঠের পুতুল নয় যাকে জাদুটোনা করে নিজের করবো। এসব সত্যি হলে, এগুলো করার ইচ্ছা থাকলে আগেই করতাম। ঐ পুরুষটিকে আমি যতটা চাই, ততটা সম্মানও তো করি। তারও তো নিজের পছন্দের ওপর অধিকার আছে। পুরুষ যদি আমার কাছে পুরুষ হয়েই না আসে, যদি আমন্ত্রণ নিয়ে না আসে,একটু জোর হয়ে গেল নিয়ে না আসে তখন একটা কাঠপুতুল দিয়ে কি করবো আমি?”
তিতলি সন্ধ্যা সাতটার দিকে আবার কল পেয়েছে আফিফের। আজ বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে। যখন তিতলি টিউশন পড়াতে গেছিল তখন কল করে বেরিয়েছে,টিউশন শেষে আফিফের দোকানে এলে আফিফ ওকে অটোতে তুলে দিয়েছে। বাড়িতে এসে আফিফের দুপুরে বলা কথাটিরও সত্যতাও মিললো। সত্যিই এক মালেশিয়ান পাত্রপক্ষ নাকি তিতলিকে পছন্দ করেছে। মাহবুব আজ বেশ খুশি, সবচেয়ে বেশি খুশি ফারিয়া। দফায় দফায় স্বস্তির শ্বাস ফেলছে। তিতলি নিশ্চিত, ভদ্রতা বলে কোনো স্বভাব ফারিয়ার মধ্যে না থাকলে ফারিয়া পারলে এক্ষুনি তিতলিকে পাত্রের ঘরে ঠেলে তুলে দিয়ে আসতো। তেমনি উত্তেজিত লাগছে তাকে। পাত্রপক্ষ শুক্রবার আসবে তাই তাদের আপ্যায়নের জন্য কি কি নাস্তা রাখবে তার একটা লিস্টও করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। তিতলিকে দেখতে পেয়েই গদগদ হয়ে,যেমন করে তিতলি ভাবীকে জ্বালিয়েছিল সকালে,অমন করেই বলল,“জানো তিতলি? ভাইয়ার জন্যও একটা মেয়েকে পছন্দ করলাম আমরা বিকেলে। কি যে সুন্দর সেই মেয়ে। নয়াকান্দা বাড়ি তার। ইনশাআল্লাহ, এবার তোমার আর ভাইয়ার,দু’দুটো বিয়ে একসাথে হবে।”
সন্ধ্যা থেকেই তিতলির বুকটা ভার হয়ে আসছিল। কিন্তু ও জানতো ও খুবই শক্ত ধাঁচের মেয়ে, অন্য পুরুষের ঘর করতে ওর বাঁধবে না। এখন কেন তবে বাঁধছে এতো ও বুঝতে পারছে না। নিজেকে শান্ত করতে তিতলি মুখ চোখে পানি ছেটাতে থাকে। যাতে ভাবী ওর মন পড়তে না পারে এজন্য কোরিয়ান ড্রামা সিরিজ দেখতে বসে মুখে মেকি হাসি নিয়ে। এর মাঝে কল আসে আফিফের। তিতলি সাবধানে রিসিভ করতেই ওপাশে রাশভারী গলাটা ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল,“এই তিতলি একটু সামনে আগাও তো। আর ফারিয়ার ফোনটা বন্ধ কেন? শোনো কিছু তাজা মাছ এনেছি। ফারিয়াকে বলো কুটে দিতে, রুমকি পারবেনা এসব। এসে নিয়ে যাও। দৌড়ে এসো। আমার একটা কাজ আছে,বাড়িতে ঢুকবো না!”
তিতলি দৌড়েই নামলো। আফিফ ভাই একটা কথা বলেছে আর তিতলি সেটা অমান্য করবে? তা তো হয়না। বাড়ির দরজায় বাইক থামিয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় অপেক্ষারত আফিফ। ক্লান্ত মুখটা দূর থেকেই, ল্যাম্পপোস্টের আলোতেই,দেখতে পেয়ে তিতলির বুকটা ধক করে ওঠে। মনযোগ আফিফে রেখে দৌড়াতে গিয়ে পরিণতি হয় ভয়াবহ। ঠিক আফিফের সম্মুখে এক হাত সমান দূরত্বে এসেই আছাড় খায়। এই জায়গাটা ঢালাই দেয়া,তাই বিগত ক’দিনের বৃষ্টিতে শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল। পড়ে গিয়ে তিতলি নিজেও বিস্মিত,ওর সালোয়ার ছিঁড়ে গেছে দু পায়ের মাঝখান থেকে,ও ফাটার শব্দ পেয়েছে। আফিফ পেয়েছে কিনা তা বুঝতে পারছে না। মানুষটার মুখ গম্ভীর।
তিতলির কান্নাই পেলো,“হায় আল্লাহ। মানুষটার সামনে বারবার লাঞ্ছিত কেন করো আমাকে!”
আফিফ তিতলির মনের কথা শোনেনি। ও কেবল হাতটা বাড়াচ্ছে, গুটিয়ে নিচ্ছে, আবার বাড়াচ্ছে আবার গুটিয়ে নিচ্ছে। সংকোচ এঁটে আছে ঐ দোহারা মুখের সবখানে। আশেপাশে তাকিয়ে, খুব ক্ষীণ স্বরে বলল,“উঠতে পারবি? নাকি আমি তোকে ধরবো?”
তিতলি ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে ঐ খাড়া নাকের লেপ্টে থাকা কুন্ঠায়। এতটুকু বলতে গিয়েই দমটা বেরিয়ে যাচ্ছে যেন পুরুষটির। মুখচোখ নির্বিকার তিতলির। জবাব দিলো মনে মনে,“আপনি আমাকে বিয়ে করুন, আমি নিজেই আপনাকে বারবার ধরবো।
আমি আপনাকে ঘুম থেকে তুলে টেনে ধরে ছাদে টেনে নিয়ে যাবো রোজ পূর্ণিমায়। কথায় কথায় খামচে ধরবো। আপনি খেতে বসলে পাশে বসে গলা ধরে ঝুলে পড়ে বলব,“এই জানো হয়েছে কি আজ?”
শুতে গেলে মাঝখানে এক সুতা পরিমাণ দূরত্ব মেনে নেবো না কখনো। এ জীবনে যত সংযম দেখিয়ে এসেছি, আমি আমার বিয়ে করা বরটার সাথে ঠিক ততটা বেশরমা হবো। ওই বরটা যদি আফিফ হয় তবে আরো বেশি হবো। কিছুক্ষণ পরপর ঐ শক্ত শক্ত কালসিটে পড়া হাতটা টেনে গায়ে ছুঁইয়ে বেহায়ার মতো আবদার করবো,আমাকে আদর করুন। আপনার বৌটা যদি এই তিতলি হয় তবে বৌটা আদরের বড্ডো ভূখা হবে। আমাকে একবার বিয়েই করে দেখুন না। তখন ধরাধরি কাকে বলে বোঝাবো।”
আফিফ তিতলির ভ্যাবলার মতো চাহনি দেখে বলল,“কি? কি ভাবছিস? ব্যথা পেয়েছিস নাকি? টেনে তুলবো?”
তিতলি সম্মতি না দিয়ে চোখ নামায়। সেদিন কলপাড়ের কথা স্পষ্ট মনে আছে তিতলির। একটুখানি গায়ে ছোঁয়া লেগেছিল বলে তিতলিকে ময়লার মতো ছিটকে ফেলেছিল এইলোক।
কোথায় যেন শুনেছিল তিতলি,মরে গেলেও পছন্দের পুরুষ মানুষটির সামনে মেয়েদের ভারত্ব হারালে চলবে না। ছেলেরা ছ্যাঁচড়া মেয়েদের ভাও কম দেয়। তিতলি যে খুব দামী, তিতলির একটা চুল ছুঁতে হলেও সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফকে মোহরানা দিতে হবে এই বিশেষ বার্তা টুকু দিয়ে তিতলি নিজে উঠে দাঁড়াতে চাইলো। ও ধীরে বলে,“পারবো আমি উঠতে।”
কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জুতাজোড়ার তলি আঠালো। তাল হারিয়ে,আবার পড়ল পা বাঁকিয়ে, নিজেকে বাঁচাতে খামচে ধরল আফিফেরই শার্ট। ঝুলে রইল বাঁদরের মত,কলাগাছে যেমন করে ঝুলে থাকে বাঁদর। টানা হেচড়ায় আফিফের বোতাম ছিঁড়ে বুকের কাছ থেকে অর্ধেকটা হা করে আছে। বলিষ্ঠ লোমশ বুক, উন্মোচিত হতেই তিতলি চোখ বড়ো বড়ো করে দেখলো কতক্ষণ। পরপর হুঁশ ফিরতেই তিতলি মুখ আঁধার করে চোখ ছলছল করে তাকালো ঐ মুখে। আফিফ হতভম্ব হয়ে নিজের শার্ট দেখছে। তিতলি দু'পাশে মাথা নাড়ছে,মনে মনে আওড়াচ্ছে,“আফিফ ভাই আমি ছ্যাঁচড়া নই। সত্যিই অমন মেয়ে নই। একটু যা আপনাকে পছন্দ করি,গায়ে পড়তে চাইনা বিশ্বাস করুন।”
সময় গড়ায়। আফিফ চুপচাপ,খুব সহজ হাতে তিতলিকে সরিয়ে দিয়ে শার্ট ঠিক করে নিজের। পরিস্থিতি সহজ করতে বলে,“মাছের ব্যাগ নিয়ে বাড়ি যা। আমার সময় নেই, যাচ্ছি আমি সদর হাসপাতালে। আসমার ছেলে গলায় কাঁটা বিধিয়েছে। জুলহাস বাড়িতে নেই।”
বলতে বলতে লোকটা শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে বাইকে চেপে বাইক স্টার্ট করলো। তিতলি বলে উঠলো,“এভাবে ছোটাছুটিই করতে থাকবেন? খাবেন না? কাচ্চি গরম করে দিতাম। একটু বসতেন।”
আফিফ চোখ তুলে তাকাতেই তিতলি চোখ নামিয়ে নিলো। মনে মনে লোকটার সাথে ফস্টিনষ্টি করা বেহায়া তিতলির সাহস হলো না তার অভ্যন্তরীণ ছটফটানি মানুষটাকে বুঝতে দেওয়ার। আফিফ বলল,“আরেকদিন কখনো খাবো। আমি ছাড়া আমার বোনদের কেউ নেইরে। ছুটতেই হবে।”
সাঁইসাঁই করে বাতাসের বেগে বাইকটা উধাও হলো। তিতলি বেশ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল কারণ ওখানে লোকটার পারফিউমের ঘ্রাণ পাচ্ছিল।
এরপর ছুটে এসে ফারিয়ার হাতে মাছগুলো ধরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে কল করলো আফিফকে,বাইক থামিয়ে কলটা রিসিভ করে আফিফ। চিন্তিত গলায় বলে,“হ্যাঁরে! বল কি হয়েছে?”
তিতলি কাঁদছে খুব, ভীষণ কাঁদছে, শ্বাস টেনে বলল,“আমি মালেশিয়ান পাত্রকে বিয়ে করবো না আফিফ ভাই।”
#চলমান….