ফন্ট সাইজ:
থিম:
ও যে মানে না মানা

৮ম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#ও_যে_মানে_না_মানা

#পর্ব_৮

#ইসরাত_ইতি

বেশ কয়েকবার কড়া নাড়ার পরে ওপাশ থেকে আওয়াজ আসে। একাধিক পুরুষ লোকের আওয়াজ।

_“এই ভিতরে কে? ক্যারা ভেতরে? ক্যারা কতা কয়?”

এই গলাটা সম্পূর্ণ নতুন। আফিফ সময় নিয়ে ভাবলো,এরা কারা? ঐ দলেরই লোক নাকি পুলিশ?

_“ভেতরে আমরা দু’জন। আমি সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ। উত্তর কদমতলা ওয়ার্ড নিবাসী, প্রোপাইটার অব নুরজাহান স্টোর। আমার সাথে আমার একজন আত্মীয়া রয়েছে। আপনারা কারা?”

_“আমরা পাঞ্জেগানা মসজিদের মুসল্লি। হাফিজি মাদ্রাসার দুইটা ছেলে ঘরের পেছনে বল টুকাইতে আইস্যা এই ঘরের মধ্যে দরজা ভাঙার আওয়াজ পাইছে। আমনেরা এইহানে কি করেন? লগে মাতারি মানুষ আছে? আকাম কুকাম করেন?”

অকস্মাৎ বুকটা কেঁপে উঠল তিতলির। কথা আর সংলাপগুলো অতি ভয়ংকর এক বার্তা ইতিমধ্যে তার মস্তিষ্কের প্রতিটি কোষে সূচালো সিরিঞ্জ দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে কেউ। জীবনের অভিজ্ঞতা কম নয়। দুম করে একটা বিদঘুটে দুশ্চিন্তা এসে দলাপাকায় ওসবের সাথে। বুকের ধুকপুকুনি বেড়ে চলেছে অবিরাম। অ্যাজমার জন্য ইনহেলার থাকে সাথে আজ সেটাও নেই। পোড়া একটা দিনের দূর্বিষহ ক্লান্তি নিয়ে ও আফিফের চোখে তাকায়। না, সরল একটা জীবন গড়িয়ে এভাবে এমন কালো একটা গিরিখাদে তো ও পড়তে পারেনা। ও তো ভালো মেয়ে। তিতলি সমাজের আর পাঁচটা লক্ষি মেয়ের চেয়েও ভালো মেয়ে। ওর চরিত্রে এমন কালিমা লেপন হতে পারে না।

আফিফ যেন তিতলির চেয়েও বেশি তিতলিকে বুঝে নিলো। বলিষ্ঠ হাতের মুঠি শক্ত করে ফোঁস ফোঁস করে দম ছেঁড়ে শক্ত গলায় বলল,“আমাদের এখানে আটকে রাখা হয়েছে। শিহাব মজুমদারের নির্দেশে।”

_“কেন? ফাইল ধরছে? নিশ্চয়ই আকাম কুকাম করতে গিয়ে ধরা খাইছিলা তাইনা? কিন্তু শিহাব মজুমদার তো বেলা তিনটার পর থেকে পলাতক। বেটায় কট খাইছে। তোমাগো ক্যামনে আটকাইছে হে? মিথ্যা কথা বলো!”

হাতে ঘর্মাক্ত কপালটা মুছে নিয়ে আফিফ চোখ বুজে সাহস জড়ো করে জবাব দেয়,“তা নয়। দরজাটা খুলুন বলছি। একটু দয়া করুন। আমি যে সত্যি বলছি তার প্রমাণ আমার কাছে আছে। একটু কোঅপারেট করুন। দয়া করুন।”

ভিড়ের মধ্যে বেশ ক’জন বেশ উগ্রতা দেখাতে চাইলেও ইমাম সাহেবের নির্দেশ পেয়ে দমে গিয়েছে। তিনি ধীর গলায় বললেন,“ঠিক আছে। দরজা ভাঙার ব্যবস্থা করছি। কিন্তু উপযুক্ত প্রমাণ দেখাতে না পারলে কিন্তু খুবই নারাজ হবো।”

_“জি। বললাম তো। আছে প্রমাণ।”

কি প্রমাণ আছে তিতলি জানে না। ওর ক্ষুধার্ত,ক্লান্ত শরীরটা কাঁপছে। বেশি কাঁপছে বাহুর মাংসপেশী। এটা ওর সাথে প্রায়শই হয়,যেদিন একটু বেশি দুর্বল থাকে কিংবা চা খেয়ে ফেলে চার কাপ। ও ওড়নাটা মাথায় পেঁচিয়ে একদম ঢেকে নেয় নিজেকে। ওদিকে তখন বজ্রাঘাত করে করে ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা চলছে দরজার তালা। নানাজন নানা কথায় ব্যস্ত।

_“পুলিশ ডাকবো নাকি?”

_“চেয়ারম্যান সাবরে ডাকি আগে? তিনি মসজিদে বসে আছেন!”

_“লগে তো মাতারি মানুষ আছে, কয়েকজন মাতারি ডাক দিয়া আনি? আবার কি না কি ঝামেলা হয়! মেয়ে মানুষের গায়ে তো আমরা হাত দিতে পারবো না।”

ইমাম সাহেব বললেন,“শান্ত হও। আগে আমরা দেখি ব্যাপারটা।”

তিতলি নিঃশব্দে কাঁদছিল।‌ আফিফ দ্রুত দ্রুত ওর ব্যাগ গুছিয়ে এনে হাতে ধরিয়ে বলল,“আমি আছি হ্যাঁ? কাঁদিস না। কেবল বের হবি। বাড়ি গিয়ে ঘুম দিবি। মাঝখানে সব আমি সামলে নেবো সব!”

_“আর বাইরেটা? বাইরেটা কিভাবে সামলাবেন? এমন কথা তো বাইরেও শুনতে হবে! আমি ক’জনকে ব্যাখ্যা দেবো?”

তিতলি ভ্যাঁ ভ্যাঁ করেই কেঁদে ফেলল। আফিফ বলল,“আমি ব্যাখ্যা দেবো। প্রয়োজনে এক সপ্তাহ দোকানে যাবো না। পাড়া পড়শী সবাইকে ব্যাখ্যা দিতে থাকবো। তুই আরামে ঘুমাবি ক’দিন। হয়েছে?”

তিতলি গুটিয়ে দেয়ালে ঠেশ দিয়ে দাঁড়ায় এবার,ক্রমশ শরীরের তাল হারাচ্ছে,কখন না আবার পড়ে যায়! ওদিকে পিঠের দশা বড্ডো বেহাল। একটা ছুরি এনে বিষে জর্জরিত মাংসল অংশটুকু কেটে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে।

তালা ভাঙা গেছে। আফিফ শার্ট খুলে টিশার্ট উপরে তুলছে,তিতলি অবাক হলেও চোখ সরায়। পরপর আবার ঘুরে দেখছে লোকটার কান্ড। টিশার্টের নিচে একটা ছোট ফ্যানি ব্যাগ। স্যামসাং গ্যালাক্সির ফোল্ডেবল ফোনটা বের করে তিতলির চোখে তাকিয়ে হাসে ও,“দোকানের সামনে বাবুর গাড়ি দেখেই ওয়াশ রুমে ঢুকে রেকর্ডিং ডিভাইস অন করে রেখেছিলাম। জানতাম আমার হাতের ফোনটা যাবে। এটাতে সিম থাকলে এতো ভুগতাম না রে। কিন্তু খুব পুরোনো ফোন,সেই প্রথম ইতালি গিয়ে কিনেছিলাম,নেটওয়ার্ক আইসি গেছে। ওয়াইফাই কানেক্ট করে কাজ করি মাঝে মাঝে,দোকানে প্রয়োজন পড়লে। সিমে কাজ হয়না।”

_“এটাতে কি লাভ হলো?”

_“যেটুকুই। অন্তত বোঝার মতো! যে আমরা নির্দোষ। তবুও এরা না বুঝলে আমাদের কপাল খারাপ!”

তালা ভেঙে দরজা খুলেছেন ইমাম শরীফুদ্দিন। তিতলি ততক্ষণে সরে দাঁড়িয়েছে আফিফের পেছনে,একদম লুকিয়েছে। বৃদ্ধ অমায়িক চেহারার সজ্জন এক মানুষ,আফিফের শুরুতেই সমীহ এলো। সালাম দিয়ে হাতের ফোনটা বাড়িয়ে দিয়ে গড়গড়িয়ে বলতে লাগল,“ধন্যবাদ আপনাদের আসলে। আপনারা না এলে আরো ভুগতাম আমরা। আগে রেকর্ডিংটা শুনুন। তারপর বিস্তারিত বলছি!”

________

বাবুগঞ্জ সদর থানা থেকে সরাসরি সাংবাদিক আরিফুজ্জামানের রিপোর্টিং – বাবুগঞ্জ সদরে মালেশিয়ান প্রবাসীর স্ত্রী সিনথিয়া শরীফা হত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর মোড়। জানা গেছে ভিক্টিমের পরকীয়ার জের ধরেই এই নির্মম ঘটনা ঘটে। স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা শিহাব মজুমদারের সাথে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল উক্ত নারীর। এরপর তাদের মধ্যকার কলহের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড রচিত হয়। খুনের সময় ভিক্টিম তার স্বামীর সাথে ফোনালাপে যুক্ত ছিলেন এবং ভিক্টিমের স্বামী মইদুল ইসলাম ঘটনার আংশিক রেকর্ড করে রাখতে সক্ষম হন। কল রেকর্ডিং ইতিমধ্যে ফরেনসিকের জন্য পাঠানো হয়েছে। সিনথিয়া শরীফার লাশ ময়নাতদন্ত শেষে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অভিযুক্ত স্থানীয় যুব নেতা শিহাব মজুমদার পলাতক রয়েছেন,তিনি কয়েকদিন আগে সিনথিয়া শরীফাকে হত্যার হুমকি দিয়ে এসেছে তার সত্যতা ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছেন দু’জন স্বাক্ষদাতা। তাদের নিরাপত্তা জনিত কারণে পরিচয় প্রকাশ করা হবেনা। এবং এই ঘটনায় শিহাব মজুমদারের বাবা তাবিব মজুমদার স্ট্রোক করে হসপিটালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বর্তমানে।

খবরটা একদিনের জন্য গরম করে রেখেছিল পুরো কদমতলার আবহ। বসার ঘরের বড়ো স্ক্রিনে দেখাচ্ছে। অবশ্য এই খবরে বাড়ির ভেতরকার কারো আগ্রহ নেই। তারা নিজেদের আলোচনায় ব্যস্ত। ফারিয়া ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বেশ খানিকটা। ওর বিছানার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে আসমা,ফারজু আর রুমকি। বাচ্চারা ওপাশে ফোনে ইউটিউব নিয়ে ব্যস্ত, তাদের মামাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সেটি নিয়ে তাদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই।

মাহবুব নিজের বড়ো ভায়রা জুলহাসকে নিয়ে থানায় এক চক্কর ঘুরি দিয়ে এসেছিল খালি হাতে। পড়শিরা,মাহবুবের আগ্রহ নেই তবুও আগবাড়িয়ে এসে সান্ত্বনার ছলে টিপ্পনী কাটছিল,“থাক গো! মন খারাপ করো না। আফিফ তো লাখে একটা ছেলে। বিয়ে করে এলে চুপচাপ মেনে নাও তো। আর খোঁজাখুঁজি করো না। যারা নিজে থেকে হারিয়ে যেতে চায় তাদের খুঁজে লাভ আছে? ঠিক ফিরবে দেখো! তিতলি পারিবারিক কলহের তোপে পড়ে হঠকারী হয়ে একটা ভুল করেছে তা সত্যি। তাই বলে জীবনসঙ্গী বাছতে ভুল করেনি। বাড়িতে এলে মেনে নাও, নিজের বৌকেও বোঝাও, সে খামোখা জেদ ধরে আছে।”

ফারিয়ার মাথাটা ধরেছে পড়শীদের ওপর গলা ফাটিয়ে চেঁচামেচি করেই,“ঐ মেয়েকে আমার ভাইয়া বিয়ে করতে পারেনা। আপনারা ঘায়ে নুন না ছিটিয়ে এক্ষুনি কেটে পড়ুন নয়তো ঝেঁটিয়ে বিদায় করবো সবাইকে।”

বাড়ি ওরপর থেকে পুরোপুরি ফাঁকা ছিল ঘন্টা দুয়েক। বিছানায় শুয়ে শুয়ে গা কাঁপিয়ে ফুপিয়েছে ফারিয়া,“ভাইয়া এটা কিভাবে পারলো! সে কি দেখেনি আমার জীবন? আমি কতটা ভুগেছি? এতসব কিছুর পরেও ঐ মেয়ের প্রতি প্রেম জন্মায় কিভাবে?”

মাহবুব আর সইতে পারছে না, বারবার তেড়ে গিয়েছে ও ঘরে,“ফারিয়া তুমি অসুস্থ বলে ছেঁড়ে দিচ্ছি। আমার বোনকে এভাবে অপমান করবে না আর। খবরদার! খবরদার না! তোমার ভাইয়ের আক্কেল কেমন এই বয়সে মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করে? যেখানে আমি,মেয়ের অভিভাবক জীবিত।”

তর্কাতর্কি বেশিক্ষণ বাড়তে পারেনি,এর মাঝেই থানা থেকে খবরটা এসেছে। আফিফ তিতলি পাঞ্জেগানার ইমাম সাহেব শরীফুদ্দিনের সহায়তায় থানায় গিয়েছে রাত বারোটায়। দু'জন সহীহ সালামতে আছে,থানার দু'জন কনস্টেবল ঘন্টাখানেক পরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যাবে।

নিশ্ছিদ্র নীরবতায় রাত ঘন হচ্ছে। রুমকির বেশি রাত জাগার অভ্যাস নেই,স্কিন নিয়ে বেশ সচেতন সে। তাই বাচ্চাদের নিয়ে ঘুমিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। জেগে আছে বড়োরা,চেয়ে আছে পথের দিকে। সারাটা দিন ছোটাছুটি করে ওরাও ভারি ক্লান্ত,আফিফ তিতলি এলেই,বিশদ শুনেই ঘুমিয়ে পড়বে এমন প্রস্তুতি সবার।

ঠিক রাত দুইটা নাগাদ পাড়ার বড়ো রাস্তা থেকে সৌভিক ছুটতে ছুটতে মুন্সী বাড়িতে এসে খবর দিল,“পুলিশের গাড়ি বড়ো রাস্তায় ওদের নামিয়ে দিয়ে গেছে। তোমরা শিগগির এসো।”

তাড়াহুড়ো নেই কারো মাঝে,ওরা ধীরে সুস্থেই নেমেছে উঠানে। থানার খবরটা ততক্ষণে কামরুল বেপারি মারফত ছড়িয়ে গিয়েছে এ পাড়া, ও পাড়া,সাত পাড়ায়। কেউ কেউ আবার অতি উৎসুক,গালি খেয়েও ঘরের দরজা জানালা খুলে দাঁড়িয়ে আছে বৃত্তান্ত শুনতে। চোখ থেকে ঘুম উড়েছে তাদেরও। কর্মজীবীরা প্রয়োজনে আগামীকাল অফিস কামাই করবে,তবুও এই কাহিনীর তলানিতে ডুবতেই হবে সবাইকে। এরপর,বেশ ক’দিন ঘটনায় মশলা মেখে অন্যদের চাখার সুযোগ করে দিতে হবে তো!

______

তখন আর হাঁটতে পারছিল না তিতলি। একজন মহিলা কনস্টেবল এক হাতে ধরে রেখেছে ওকে। পিঠের ব্যাথা তো রয়েছেই, ওই গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়েছে পিরিয়ড। এটা অনিয়মিত এসে বেশ ভোগায় তিতলিকে,বেশ তিনবছর যাবৎ ওষুধের ওপর শুয়ে থেকেও পরিত্রাণ মেলেনি।

পাড়ার শিপ্রা কাকী অত রাতেও মুখে ঘোমটা চেপে ল্যাম্পপোস্টের ওপাশে,নুরুল ইসলাম কাকুর বৃহৎ পিঠের পিছে লুকিয়ে আছে। তিতলিকে নিয়ে এদের মা মেয়ের প্রচারণা কাল থেকে শুরু হবে, কৌতুহলী চোখজোড়া দেখতে দেখতে তিতলি মেপে নিলো ওসব। দুর্বলতায় মেয়েটার চোখ মুদে আসছে।

_“হ্যারে! খোরাচ্ছিস কেন? তিতলি কি হয়েছে তোর পায়ে? তিতলি এভাবে হাঁটে কেন?”

প্রশ্নে প্রশ্নে মুন্সিপাড়া গমগমে হয়েছে পুর্ণিমার চাঁদের আলোর নিচে। তিতলি জবাব না দিয়ে সামনে তাকিয়ে হাঁটছে। বড়ো উঠানে ভাইয়ার পেছনে ভাবী,ভাবীর দু’বোন পাথুরে মুর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওই জায়গায় মা দাঁড়িয়ে থাকলে তিতলিকে নিশ্চিতভাবেই বুকে টেনে নিতো এতক্ষণে। মা খারাপ ছিল, হ্যাঁ তিতলি অস্বীকার করেনা,মা অবশ্যই ভাবীর প্রতি নির্মম ছিল। কিন্তু তিতলির জন্য তো মা মা-ই ছিল। ভাবী কখনো মা হয়নি আর তিতলির স্বভাব নেই ভাইয়াকে কখনো,খুব বড়ো অসুখে,জ্বরে কিংবা মানসিক আঘাতেও জড়িয়ে ধরার। তিতলির আর কোনো মানুষ রয়নি জরিয়ে ধরার। কেউ নেই যে ওকে বুকে আগলাবে। তাই ও দ্রুত হাঁটতে চায়। কিন্তু আর কত? সবশেষে ওটা নারীর শরীর, তাই উঠান অবধি আর পৌঁছাতে পারেনি। মাঝপথেই ধপাৎ!

_“আচ্ছা আপনাদের কোনো কান্ড জ্ঞান নেই? দেখছেন মেয়েটা অসুস্থ। এসব কি প্রশ্ন? শুনেছেন না বিশদ? বাকিটা শোনার সময় আছে না? যার যার ঘরে যান।”

আফিফ কেও বিধ্বস্ত লাগছে এবার। কি থেকে কি হয়ে গেল। ও তো নির্ঝঞ্ঝাট এক লোক,সেদিন ভর দুপুরে স্রেফ দোকানদারি করছিল। ঐ ব্যক্তি দু'জন ওভাবে দোকানে ঢুকে পড়ে তাকে এভাবে ফাঁসিয়ে দিল। আর এই বেচারি মাঝখানে ঢুকে গেল অযথাই,

ভাবতে ভাবতে তিতলির অচেতন শরীরে নজর বুলায় আফিফ,যে শরীরটা মাহবুব দু'হাতে আগলে নিয়ে ঘরের দিকে ছুটছে।

_“তিতলি! সোনা বোন! কিচ্ছু হয়নি তো! আমি ভাইয়া! চোখ খোল!”

মাহবুব কেঁদে ফেলেছে। ফারিয়া,আসমা আর ফারজু দাঁড়িয়ে ছিল আফিফের রাগ বাড়িয়ে দিতেই। রাগলোও আফিফ,বজ্রধমকে বোনদের কাঁপিয়ে তুলেছে খসখসে ভারি গলাটা,“মুখের দিকে তাকিয়ে আছিস কেন আহাম্মকের দল! ভেতরে যা! ওকে দেখ! মাহবুব ঠিক নেই। শোহরাব ডাক্তার আসছে। আর আমাকে ঘরের চাবি দিয়ে যা,আমি বাড়ি যাবো, কিছুক্ষণ একা থাকবো!”

এ পাড়ায় আট থেকে আশি কারোর আফিফের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস নেই। অর্থ বলো, গায়ে গতরে সাহায্য বলো, সব কিছুতেই আফিফের নিকট ঋনি প্রত্যেকে। তাই যখন আফিফের ধমক পড়েছে,কেটে পড়েছে তখুনি।

এখন পাড়া ফাঁকা,একদম ঘুটঘুটে নিস্তব্ধতা চারপাশে। ওসমান কাকা,মহিন কাকা আর আফিফের কুকুরটাও আজ পালা করে ঘুমাচ্ছে যেন। মাঝে মাঝে গলির মাথা দিয়ে বড়ো ট্রাক ছুটে চলার আওয়াজ আসছে আবার তা পূর্ণিমার ধোয়াটে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। সামনে সিকান্দার চাচার যমজ দুই মেয়ের এসে.এস.সি.। ওরা ঐ অত রাতে জেগে উঠে গলা ছিঁড়ে পদার্থ বিজ্ঞানের পাতা উল্টানো শুরু করতেই আফিফের বিভ্রম কাটে। হাতে তার রয়ে গেছে তিতলির ব্যাগটা, এটা দেয়া হয়নি বেখেয়ালে। কাল ফিরিয়ে দেবে ভেবে সামনের দিকে হাঁটতে থাকলো জোর কদমে। পাশ থেকে আওয়াজ দিলো সৌভিক,“ঠিক আছো ভাই?”

শার্ট খুলে হাতে নিয়েছে আফিফ,“হু। সময় দে আমাকে। বাড়ি যা। কাল পাড়ার বুড়ো বুড়িদের ডাকিস,বলবি আফিফ মিটিং বসিয়েছে,কথা বলবে। এই বুড়ো বুড়ি গুলো বেশি ত্যাদড় হয়। এদের অনেক চুলকানি। খাউজে ওঠার আগেই মুখ বন্ধ করতে হবে।”

_“এদিকটা তো ল্যাড়াচ্যাড়া হয়ে গেছে ভাই। তোমার বোন রুমকিটা বড্ডো আহাম্মক। শিক্ষিত মেয়ে এতো আহাম্মক হয়? মানুষ আর পেলো না,ঐ সায়মাকেই বলল তোমাকে আর তিতলিকে পাওয়া যাচ্ছে না। আর তারপর থেকেই সব মহলে ছড়িয়ে গেছে কথাটা। মেয়েটার জন্য খারাপ লাগছে গো!”

আফিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে হাঁটতে লাগলো আবার,ধিমি সুরে বলে,

_“জানে,ইজ্জতে বেঁচে ফিরেছে এটাই বেশি। যা গেছে গেছে। আমি তো আর সুপার ম্যান না। আজ ওখানে একটা অঘটন ঘটলে আমার করার কিছুই থাকতো না। তুই যা, আর যেটা বলেছি সেটা করিস। সবাইকে কাল বিকেল নাগাদ ডেকে আনবি বড়ো উঠানে,চা পানের দাওয়াত দিবি। আমার কথা আমি বলবো তখন।”

রাস্তা থেকে সৌভিক সরেছে তখুনি। এখন আফিফ একা,হাতে তিতলির ব্যাগ। চারপাশ থেকে ক্লান্তিরা চেপে ধরেছে শরীর। ঘরে ঢুকে প্রথমে বালতি বালতি পানি খরচা করে শরীর ধুলো ও। এরপর একটু দুধ গরম করে খেয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছে চওড়া কঠোর শরীরটা। ভেবেছিল প্রচন্ড জোরেশোরে ঘুম চেপে বসবে চোখে,আফিফ তিনদিনে স্বাভাবিক হতে পারবেনা। কিন্তু বাস্তবে,আফিফের দু’চোখে এক রত্তি ঘুম নেই। উল্টে নিস্প্রভ চাহনি ঘুরিয়ে বিছানার একপাশে ফেলে রাখা তিতলির আধা-বিধ্বস্ত টোট ব্যাগটা দেখে। কতক্ষন নিজের সাথে নিজেই তর্কাতর্কি করে শেষটায় কি ভেবেই হাত বাড়িয়ে ডায়রিটা হাতে নেয় তিতলির। এটা খুব বড়ো অপরাধ,তবুও নিজেকে অপরাধী মেনে পাতা ওল্টায় একটা।

_“ভাবছি এই ডায়রিতে যখন সবকিছু নতুন করে লিখতে হবে তখন প্রথম পাতাতে আফিফ ভাইকেই রাখি।”

ঐ অতটুকু অবধিই।‌ আর বেশিদূর চোখ বুলানোর ইচ্ছে হয়নি আফিফের। হাত থেকে ডায়রিটা রেখে চোখ বুজে পড়ে থেকেছে বেশ কিছুক্ষণ। বাম হাতে কপাল টিপতে টিপতে এরপর ফোনটা চার্জার থেকে খুলে নিয়েছে। এটা ঐ ক্লাব ঘরেই পড়ে ছিল। আফিফ দোকানের কর্মচারী কাউসারকে কল করে ক্লান্ত গলায় বলল,“হ্যাঁ কাউসার। হ্যাঁ হ্যাঁ বাড়িতে পৌঁছে গেছি। না আর কোনো ঝামেলা নেই। থানায় অভিযোগ দিয়ে এসেছি। শোন সপ্তাহখানেক দোকানে বসবো না আমি, তুই একটু জহিরকে নিয়ে ওদিকটা সামলে নিস। দোকান বন্ধ রাখবি না খবরদার। কাল সকালে দোকান খুলিস। আমি ক’দিন,এদিকে একটু ব্যক্তিগত কাজ গোছাবো।”

_________

প্রায় ফজর সে সময়, পাড়ার এনায়েত মুন্সী আজান দেয়নি তখনো। ঠিক সেসময় চেতনা ফিরেছিল তিতলির। আসলে চেতনা ঠিক কখন ফিরেছিল তিতলিও ঠিক জানেনা,হয়তো আরো আগেই, হয়তো ওর বুঝতে দেরি হয়েছে। মস্তিষ্ক কাজ করছে না আসলে। তালা ভাঙার বজ্রাঘাত গুলো, স্টিলের দরজায় লাথি বসানোর আওয়াজ, সব আবার শুনতে পাচ্ছিলো ও। মিনিট ত্রিশেক হয়েছে কানের ভো ভো কেটেছে। ওটা কেটে গিয়ে এরপর আল রহমান ফার্মেসিতে যে বসে,শোহরাব ডাক্তার, ভীষণ ফ্যাসফেসে গলা যার,তার কথা শুনতে পাচ্ছে এখন,“স্যালাইন চলুক। দুর্বলতা কাটবে। ঘুম কাটলে একটু দুধ,একটু ডিম,একটু বেদানা খাওয়াবে। এমনিতে কোনো জটিলতা নেই। তবুও সেরম মনে হলে মোহনা ম্যাডামকে নিয়ে গিয়ে দেখিয়ো। তিনি কাল উপকূল ডায়াগনস্টিকে বসবেন বিকেল নাগাদ।”

মাহবুব মাথা নেড়ে জবাব দিলো,“ও রেগুলার একজনকে দেখায়, গাইনি সাইডে। সামিয়া ম্যাডাম। দেখি সকাল হলেই নিয়ে যাবো, তিনি ভালো বুঝবেন।”

মাহবুবের গলা নিভু নিভু। তিতলি চোখ খোলার পরে ভাইয়ার মুখের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। একটু আগে ঘটকের ফোন এসেছিল। পাত্রপক্ষ ফোন করে বিয়েতে না করে দিয়েছে, তারা কোনোভাবে শুনেছে তিতলি আত্মীয় ছেলেটির সাথে ভেগে গিয়েছে। ঘটক চাচা যদিও অনুরোধ করেছিল থানায় গিয়ে সত্যতা নিশ্চিত করতে,ওসবে ভ্রুক্ষেপ করেনি তারা, হয়তো তিতলির চেয়েও উপযুক্ত পাত্রী হাতে নিয়ে বসে ছিল। খামোখা আর ঝামেলা গায়ে ল্যাপ্টানো কেন তবে? এ নিয়ে ভাইয়ার ভীষণ শোক হয়েছে। থমথমে কালো মুখটা অন্তত তাই বলছে। তিতলির মাথার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল ফারজু,হাতে দুধের গ্লাস। শোহরাব ডাক্তার যাওয়ার পরে তিতলিকে বলল,“একটু এটা খাবে? ভালো লাগবে। দুর্বলতা কাটবে।”

বমি পাচ্ছে তিতলির,দুধ দেখে আরো পেলো। তবুও পেটের খিদেটা বুঝ নেয়না ওসবের। মুচড়ে মুচড়ে পেট থেকে গলা অবধি উঠছে বস্তুটা, বস্তুটাকে দমাতে তিতলি ক্লান্ত গলায় বলল,“একটু পোড়া মরিচ আর পানি ভাত দেয়া যাবে? পেঁয়াজ আর নুন দেবেন সাথে!”

রক্ত যেন শুধু ঝরছে না। গলিয়ে ফেলছে ওর সমস্ত শক্তি,সমস্ত স্বস্তি, ধীরে ধীরে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বিছানার চাদর, ঘরের গুমোট বাতাস, এমনকি সময়টাও যেন লালচে যন্ত্রণায় রঙিন হয়ে উঠেছে। সকালের রোদটাও,যেটা ঐ জানালার শিক ভেদ করে আসছিল ভেতরে।

তলপেটের ভেতরে কেউ যেন মুঠো বেঁধে চেপে ধরে আছে, নির্দয়ভাবে। ভাত খেয়ে পেটটা একটু সামলে নিয়েছিল তিতলি। এখন চোখ বন্ধ করে, ঠোঁট কামড়ে ধরে পড়ে আছে। স্যালাইন ফুরিয়েছে সেই কখন। ও চিৎকার করতে চায়, কিন্তু শব্দ বেরোয় না। বয়ঃসন্ধির পর থেকেই প্রতি মাসিকে এ এক নিঃসঙ্গ যুদ্ধ তিতলির, যেখানে কেউ পাশে থাকে না, কেউ বোঝে না ওকে। প্রতিটি মিনিট যেন একেকটা দীর্ঘ রাত্রি।

তার ওপর এখন বুড়িধারি বয়সে কপালে জুটেছে পলিস্টিক ওভারি সিনড্রোম।

সকাল নয়টা নাগাদ তিতলির আর সহ্য হয়নি। গলা ফাটিয়ে কেঁদে কেঁটে ভাইয়াকে বলল ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। মাহবুব চট জলদি রেডি হয়ে বোনকে নিয়ে মোড়ের মাথায় বেরুতেই সাক্ষাৎ হয় আফিফের সাথে। দীর্ঘ ছয় ঘণ্টা পরে।

আফিফ ভেবেছিল রাতে ঘুমাবে না, কিন্তু ও সকাল নয়টা অবধি গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল। এরপর ঘুম থেকে উঠে পাড়ায় চক্কর কেটেছে কয়েকটা। মনিরের দোকানের দুধ চা আর রশু মামার দোকানের সিঙ্গাড়া খেয়ে নাস্তা সেরে দোকানের একমাথার বেঞ্চিতে বসে হাওয়া খাচ্ছিল যখন,তিতলি আর মাহবুবকে অটো রিকশা খুঁজতে দেখে জোর পায়ে এগিয়ে এলো।

_“কোথায় যাচ্ছ এখন? কোনো সমস্যা?”

তিতলির মুখের সংকুচিত পেশী নজরে পড়েছে আফিফের। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একপাশে ও। মানুষটার সাথে দৃষ্টি মেলায়নি। মাহবুব অপ্রস্তুতি নিয়ে চারপাশে নজর বুলায়,যেন তার বোনকে সবাই দেখছে,সবাই পাঁচ কথা বানাচ্ছে অমন আশঙ্কায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে তার!

_“ওকে একটু ডাক্তার দেখাবো।”

_“কি সমস্যা? পোকার কামড়ে জ্বর এসেছে?”

_“না। গাইনি সাইডে।”

আফিফ চট করে আরেকবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেখলো তিতলিকে। রোদ পড়ে ঝলমল করছে গায়ের হলুদ রংটা।

_“আচ্ছা যাও। সাবধানে যেয়ো। ক’দিন চুপচাপ থাকো। আমি সামলাবো সব। এই অটো…তাদের নিয়ে যা।”

আফিফ একটা অটো ডেকে দিলো। অটোটা গলির ধুলো উড়িয়ে বড়ো রাস্তায় উঠতেই যখন আফিফ গিয়ে মনিরের দোকানে বসলো, সালাম মুন্সী পাশ থেকে বড্ডো কৌতুহলে বলল,“ডাক্তারের কাছে যায় কেন? কি ওষুখ ও মেয়ের? সকাল থেকে শুনতেছি তিতলি হাঁটতে পারেনা। তোমার চাচী বলতেছিল। মারধোর করছে ওকে নাকি…..?”

বাকি যা কথা গলার খুব কাছে এসেছিল,সালাম ঢোক গিলে সেকথা ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে চুপ হলো যখন দৃষ্টি পড়লো আফিফের টকটকে লাল চোখে। অবশ্য ভীষণ শান্ত আফিফের গলা,“মারধোর করবে কেন? আমি ছিলাম না সাথে? কাল সারাদিন কিছু খায়নি,তার ওপর গায়ে জ্বর। আন্দাজে কথা বলে দিলে তো হবে না-মা চাচীদের মতো।”

_“ঠিক তা না।”

_“বিকেলে যদি বাড়িতে থাকেন,সৌভিক বাড়িতে ডাকতে গেলে আসবেন। আমার বাপ মা নেই। আপনারাই ময় মুরব্বি। আপনাদের সাথে আমার একটা বৈঠক আছে।”

লুঙ্গির একপাশ আঙুলে তুলে ধীরে উঠলো আফিফ। আর কথা বাড়েনা ওখানে। ধুলো ময়লা উড়িয়ে ও জোর কদমে হাঁটতে থাকে বাড়ির দিকে। ও বাড়িতে থেকে গেছে আসমা,ফারজু। রুমকি বাড়িতে এসেছে। এসে দুপুরে রান্নাটা করেছে। টেংরা মাছ ভুনা,ডাল। একটা তরকারিতেও নুন দেয়নি। আফিফ খেতে বসে চুপচাপ,নুন ছাড়াই খেলো।

নিজের অকৃতকার্যের ব্যাপারে যখন অবগতি এলো,রুমকি জিভ কেটে বলল,“নুন দিইনি তো। খেলে কিভাবে ভাইয়া? ও কি! কথা বলছো না কেন! কি ভাবছো?”

আফিফ কিছু আসলেই ভাবছিল। সেই বিগত ভোর রাত থেকে। ভাবতে ভাবতে প্লেট ধুয়ে এসে বিছানায় শুয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ। উঠে আবার আসরের নামাজ আদায় করে। মাগরিব আর এশাও কাটায় মসজিদে। আসমা একাধিক বার ফোন দিয়েছে,রিসিভ হয়নি তা। আদতে কারো কল রিসিভ হয়নি। ঠিক রাত নয়টা নাগাদ আফিফ নিজে এসেছে মাহবুবদের বাড়িতে।

তিতলি ডক্টর দেখিয়ে এসে গোটা দিন রুমেই পার করেছে ঘুমিয়ে। সন্ধ্যায় উঠে সরপুটি মাছের ঝোল মেখে ভাত খেয়ে তলপেটে হট ওয়াটার ব্যাগ চেপে শুয়ে চোখ বুজে বিশ্রাম নিচ্ছিল যখন। ঠিক তখন আজন্ম পরিচিত ভারি খসখসে গলাটা কানে বাজে,বড়ো উঠানে এসে হাক পাড়ে।

_“মাহবুব! বাড়িতে আছো?”

_________

নীল সাদা চেক প্রিন্টের একটা লুঙ্গি আর ঢিলেঢালা পেস্টাল রঙের টিশার্ট পড়ে ছিলেন আফিফ ভাই। চেহার উদ্ভ্রান্তের মতো,চোখের নিচটাতে কেন জানি কালসিটে পড়েছে। একহাতে বারবার সামনের চুল পেছনে ঠেলছিলেন। তিতলি রুম থেকে পর্দা সরিয়ে চেয়ে আছে বোকা চোখে।

অত রাতে মাহবুব ভীষণ অবাকই হয়েছে বটে। সে ভেবেছে সে আবার কিছু করেছে কিনা? ফারিয়া কোনো নালিশ দিয়েছে কিনা!

_“কি হয়েছে ভাইয়া?”

নরম সুরে জানতে চাইলো মাহবুব।

_“আমি একটু কথা বলতে এসেছি। আচ্ছা তিতলি কই?”

সোফা ঘেঁষে বসেছে আফিফ। আসমা আর ফারজুর বরেরা আপাতত বাড়িতে নেই।

_“আছে। ডেকে দেবো?”

আফিফের মুখটা বড্ডো অপ্রস্তুত। ঘাড় নেড়ে বলল,

_“না না। ওর গার্জেন তো তুমি। কথা তোমার সাথে। ও সুস্থ আছে?”

_“জি। বিশ্রাম নিচ্ছে! বলুন।”

আবারো বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর হয়ে থাকে আফিফ। আসমা,ফারিয়া আর ফারজু ওপাশের ঘরের পর্দার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে,পা দেখতে পাচ্ছে তিতলি। দীর্ঘ সময়ের গম্ভীরতা কাটিয়ে আফিফ বলল,“আসলে মিটিং ডেকেছিলাম বিকেলে পাড়াতে। গতকালের বিষয়টা নিয়ে তিতলিকে যাতে কেউ বিব্রত না করে সে সম্পর্কে হুঁশিয়ার করতে। পরে বিকেলে মত পাল্টালাম। ওদের ভাবা না ভাবায় আসলে তো তিতলি বা আমার কিছুই যায় আসেনা। তাই বাদ। এখন কাজের কথায় আসি। মাহবুব, তুমি কথাটা কিভাবে নেবে জানিনা। এবং আমিও কখনো ভাবিনি এটা তোমাকে বলবো।

_“আপনি বলুন তো ভাইয়া, নিসংকোচে!”

_“আমি তিতলিকে বিয়ে করতে চাচ্ছি। তুমি আর তিতলি যদি রাজি থাকো। আজকালের মধ্যেই।‌”

তিতলি তলপেটে হাত চেপে চেয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে। ওদিকে আফিফের বোনরাও হয়তো তাই। এদের ভাইয়াকে এরা সবাই ভয় পায় নইলে এই মুহূর্তে আফিফের ধরে তার মাথা থাকতো না একথা তিতলি জানে।

মাহবুব চুপ করে আছে,যেন এমন একটি কথায় তার কিছু যায় আসেনি অমন ভঙ্গি। আফিফ তাকে পাত্তা না দিয়ে নিজের কথা বলতে থাকে,“আমি আসলে তিতলিকে কখনো এভাবে ভাবিনি। নয়তো তিতলি উপযুক্ত এক মেয়ে। আগেই পাঠাতাম প্রস্তাব। এখন আমিও ভালো মেয়ে খুঁজছি। নম্র ভদ্র। তাই হঠাৎ করে মাথায় এলো। আমি মানুষ হিসেবে কেমন তুমি তা জানো মাহবুব। অত ভালো লোক নই, আবার কোনো মেয়ে সংসার করতে পারবে না এমন লোকও নই। তাই যদি আশ্বস্ত হও,তবে ভেবে দেখো। কথা বাড়াবো না। তুমি একদিনের মধ্যে জানাবে। আমি আকদ করবো দ্রুত, সব আনুষ্ঠানিকতা ধীরে ধীরেই হবে। ফারিয়াকে জানিয়ো,ওকে বলবে এ ব্যাপারে যেকোনো মতামত কিংবা আপত্তি আমাকে জানাতে। তোমরা নিজেরা তর্ক করবে না। উঠছি।”

লোকটা যেভাবে ঘরে ঢুকেছিল সেভাবেই চলে গেল। আফিফ চলে যাওয়ার পরে,মাহবুব এসে বোনের ঘরে ঢুকতেই ভাইয়ার চোখে চোখ পড়ল তিতলির। আর ঐ দৃষ্টিতেই ধরা পড়ে গেল সে ভাইয়ার কাছে। মাহবুব ম্লান হেসে বোনের মাথায় হাত রেখে বলল,“সব ঠিক হবে।‌ তুই মন খারাপ করিস না আর। খুব ভালো হবে। তোর তো কেউ নেই,আমিও তো নেই। তোর একজনকে দরকার, এবং আমি জানি সেটা ঐ আফিফ ভাইয়ার মতোই। ফারিয়াকে আমি বোঝাবো ধীরে ধীরে। কোনো চাপ নেই। আনন্দ কর!”

__________

তিতলির আনন্দ হচ্ছে কিনা তিতলি বুঝতে পারছে না। ও নিজের অস্থির মনটা নিয়ে পেট চেপে ধরেই ছুটে গেল ফারিয়াকে দেখতে।

ফারিয়া কাঁদছিল ঘরে বসে,“শেষ! ভাইয়ার জীবন শেষ! আহারে আমার ভাইয়া! তুমি এই পৃথিবীতে আর মেয়ে পেলে না!”

ফারজু রাগে কথাই বলতে পারছে না। আসমা পাশ থেকে হিসহিসিয়ে বলল,“তোর শ্বশুর বাড়ির দিকের ঐ যয়নাব দাদীর কাছ থেকে সাহায্য এনে এই মেয়ে কিছু করছে? কাউকে বশ করতে তাকে তুকতাক করে নিজের পিরিয়ডের রক্ত খাওয়ায় তো কত বজ্জাত মেয়েমানুষ। গর্জনবুনিয়ার মিতু কি করেছে সোহেলের সাথে,মনে নাই? এই মেয়ে তো এইটা ঐটা বানিয়ে প্রায়ই ভাইয়াকে খাওয়াতো।”

ফারিয়া চোখ মুছে তাল মেলালো ও কথায়,“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ও তো প্রায়ই ওই পাড়ায় যেত। এবার আমি বুঝতে পারছি! এবার বেশ ভালো করে বুঝতে পারছি সবটা! ও নির্ঘাত যয়নাব দাদীর কাছে যেত!”

তিতলি জমাটবাঁধা তীব্র বিস্ময় আর আঘাত নিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল দরজায়। মেয়েটা না চাইতেও,একটুও না চাইলেও চোখ দু'টো নোনাজলে ভরে উঠেছে আচমকা। ঝাঁপসা দেখছে সামনের কাঠের নকশা কাটা কপাটজোড়া। তবে তিতলি দাঁড়িয়ে রইল না, দু'হাতে দরজা ঠেলে দিয়ে ভেতরে পা রাখলো।

ওরা তিন বোন চমকেছে ভীষণ। কথা ভুলে চেয়ে আছে তিতলির রক্তাভ মুখে। তিতলি ওভাবেই আসমার মুখে দৃষ্টি রেখে বলল,“আপনারা আমাকে এতো খারাপ ভাবেন?”

চার বোনের চোখে মুখে অপ্রস্তুতির মিশেল। তিতলির ঘৃণার প্রখরতা এতোই বেশি ছিলো যে ঐ মুখ গুলো আর দেখতে পারছিল না। ওর সহ্য হচ্ছিল না। ছুটে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দোর আঁটে। কিছুক্ষণ হুহু করে কেঁদে নিয়ে বিছানা হাতড়ে ফোনটা হাতে তুলে আফিফের নাম্বারে কল করে। মোড়ের মাথায় মনিরের চায়ের দোকানে গিয়ে বসে ছিল আফিফ, রিসিভ হতেই তিতলি শুনলো সেই সাবেকি,ভারি আর খসখসে গলাটা। যা শুনলে তিতলির গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়।

_“হু?”

_“কথা ছিলো।”

তিতলি ফোপাচ্ছে। কিছুটা উৎকণ্ঠা চাপে আফিফের কপালের ভাঁজে,“কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে?”

_“নাহ!”

_“তো?”

তিতলি খুব স্পষ্ট সুরে আওড়ালো,

_“আমি আপনাকে বিয়ে করবো না। আপনি আর এটা নিয়ে আগাবেন না।”

#চলমান….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন