#ও_যে_মানে_না_মানা
#পর্ব_১৯
#ইসরাত_আরা_ইতি
একটা বিকট আওয়াজ হয়েছে। চারতলার এ ইউনিটের ভাড়াটিয়া নিজাম সাহেব আর তার স্ত্রী তখন নিচতলার পার্কিং এরিয়ায় ময়লার বালতি জমা রেখে কেবলমাত্র ঘরে ঢুকছিলেন। শব্দটা ছাদের সিঁড়ির মাঝ তাক থেকে এসেছে। সাথে পুরুষালি গলার মৃদু গোঙানি, মেয়েদের চুড়ির রিনিঝিনি আওয়াজ। শুনতে পেয়েই দৌড়ালেন দু'জন। গিয়ে দু'জনের চক্ষু চড়কগাছ। বাড়ির মালিক সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ তার ভাঙা পা নিয় চিতিয়ে পড়ে আছে সিঁড়ির মাঝতাকে, তার বুকের ওপর তার লাল টুকটুকে ছোট মোট নতুন বৌটা। বৌটা উঠে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে খাবি খাচ্ছে,“ঠিক আছেন? হায় আল্লাহ! কোলে কেন নিতে গেলেন আমাকে! একটুও তর সয়না তাইনা? আমার পা নেই? পায়ে হেঁটে যেতে পারতাম না?”
উভয়েই ভিজে পুড়ে জবজবে। বিষ যন্ত্রণায় নীল হয়ে আছে সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফের মুখটা। দাঁতে চেপে রেখেছে দাঁত। নেহায়েৎ পুরুষ বলেই চেঁচাতে পারছিল না। ঐ রাত্তিরেই,হাড় কাঁপানো বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাহবুব ছুটে এলো। রীতিমত একটা হুলুস্থুল কাণ্ড লেগে গেল বাড়িতে। আফিফ তার বৌকে কোলে নিতে গিয়ে পড়ে গিয়ে ফের চোট খাওয়া পায়ে চোট পেয়েছে,কথাটা প্রচারের দায়িত্ব নিয়েছে মুন্না। জনে জনে বলে বেড়াচ্ছে মামা মামীকে কোলে নিছে,মামা মামীকে কোলে নিছে।
আফিফের হাঁটু ছিলেছে আবার। রাত্তিরে পাড়ার মাথা থেকে এক ফার্মাসিস্ট ধরে নিয়ে এলো সৌভিক। লোকটা মুন্নার কথা শুনে বোকার মতো আফিফের মুখের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো বলে বসে,“এই অবস্থায় বৌকে কোলে তুলেছিলে! এটা কেমন কথা”
সৌভিক দিলো ধমক,“এই চুন্নু দাদু। বুড়ো হয়েছো বাতাসে? এসব না বুঝলে ডাক্তারি ছেড়ে কবরে ঢুকে দাও। শালা বুড়ো কোথাকার।”
ফারজু ভাইয়াকে লজ্জা দিতে ঘর থেকে আর বেরোয়নি। মুন্নাকে ধমকে ঘরে টেনে দোর এঁটেছে।
রুমকি হাসছে রান্নাঘরের এপাশে দাঁড়িয়ে। তিতলিকে দেখেই মুখটা গম্ভীর করে ফেলল,প্রথমে বলল“ভাইয়া তোমাকে কোলে তুলতে চাইলো আর তুমি রাজি হলে? কোন আক্কেলে?”
_“খুব জোর করছিল!”
সবকিছু ভুলে গিয়ে রুমকির গাল দু'টো লাল হয়ে উঠলো হঠাৎ। আশেপাশে নজর বুলিয়ে আপুদের অবস্থান একচোট অবলোকন করে নেয়। ধীরে ধীরে মুখটা তিতলির কানের কাছে এগিয়ে এনে বলে,“এসব অনেক রোম্যান্টিক হয় তাইনা?”
তিতলি হাসি চেপে মাথা নাড়ল। রুমকি বলে ফেলে মুখ ফসকে,“জানো মাঝে মাঝে মনে চায় বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই,পরে আপুদের বিবাহিত জীবনের কথা মনে পড়লে আর মনে চায়না। সিঙ্গেল লাইফ ইজ ফার বেটার। কতজনের ওপর যে ক্রাশ খাওয়া যায়। জাংকুক, গং ইয়ো, লি ডং উক, ভি। বিয়ে হলে তো আর এতজনের ওপরে ক্রাশ খাওয়া যায়না। যেমন তোমাকে এখন শুধু ভাইয়াকে নিয়ে আর আপুদের শুধু দুলাভাইদের নিয়ে পড়ে থাকতে হয়। আমি এখন যার তার ওপর ক্রাশ খেতে পারি!”
রুমকির কথাগুলো শুনে তিতলি হাসবে নাকি অবাক হবে বুঝতে পারছে না,তবে এ কথা সত্যি,আফিফ যা বলে,আফিফের এ বোনটি বড়ো এখনো হয়নি। রুমকি মুখ গোমড়া করে ফেলে আবার। মুখ গোমড়া করে চলে যেতেই শ্বাস ফেলে তিতলি। চুপ করে রুমে ঢুকে স্বামীর মুখের দিকে তাকায়। সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে কপালের ওপর হাত ঠেকিয়ে চোখ বুজিয়ে শুয়ে আছে লোকটা। রুমকির তখনকার কথাটা মনে করে খুব হাসছে তিতলি,এটা মোটেই মন খারাপের বিষয় নয় তিতলির কাছে,পুরো দুনিয়া গোল্লায় যাক,ও শুধু এই লোককে নিয়ে পড়ে থাকবে। এই পৃথিবীর বাকিসব বেগানা পুরুষ লোক তিতলির কাছে বিষ। তিতলির চোখ দু'টো অন্ধ হয়ে যাক,তিতলি মরে যাক তিতলির দৃষ্টি কখনো, কোনোদিন অন্য পুরুষে আটকে যাওয়ার আগে। তিতলির শরীরের চামড়া মাংস পুড়ে ছাই হয়ে মাটিতে মিশে যাক এই মানুষটার থেকে কখনো মন বিরূপ হবার আগে। তিতলির খাঁড়া নাকের, ছিমছাম গড়নের,ভারিক্কি দোহারা চেহারার আফিফ ভাই ওরফে স্বামী এই পৃথিবীর সবচে সুদর্শন পুরুষ। যার সান্নিধ্যেই তিতলির নারীত্বের কামনা জাগে,বাসনা জাগে অভিসারের।
বৃষ্টি থেমেছে। জানালা দিয়ে হিম হাওয়াটা ভেতরে ঢুকছে। তিতলি গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিয়ে এসে আফিফের কপাল থেকে হাতটা সরিয়ে দেয়। আফিফ চোখ মেলে তাকায়। তিতলি বলে তখন,“নানী বলেছে কপালে হাত ঠেকিয়ে শুতে নেই পুরুষ লোকের,তবে নাকি সংসারের অভাব অনটন কাটে না।”
শক্ত-মলিন চোয়ালটা হাসল ম্লান,বলল,“তা তোমার নানী আর কি কি বলেছে?”
তিতলি বিছানার একপাশে বসলো ধীরে,বলে,“নানী এও বলেছে পুরুষ লোকের সময়ে অসময়ে অত ধৈর্যহারা হতে নেই,একটু রয়ে সয়ে।”
বলতে বলতে মেয়েটার গলা নেমে আসে। লজ্জা আর অনুতাপে চোখ নামায়। অনুতাপ,কারণ অসুস্থ লোকটাকে তারও ওভাবে প্রশ্রয় দেয়াটা উচিত হয়নি তখন। দোষ তার রয়েছে। আফিফ ঐ নোয়ানো থুতনি টেনে তুলল তর্জনীর ডগায়। যতটুকু লজ্জা ঐ ভাসাভাসা চোখে ছিল, এবার মেয়েটিকে একদম মেরে ফেলতেই বলল,“আজ একটা বাঘের হাত থেকে বেঁচে গেলে। ইউ আর সো লাকি তিতলি!”
তিতলি বেদম কাঁপল ঠিক। পরপর কাঁপা গলায় বলল,“মুখ চালাতেই হবে অসভ্যদের মতো?”
_“আর তো কিছু চালাতে পারি না রে! তখন না হয় মুখ চালানো বন্ধ কর…!”
দুম করে এক কিল বসালো তিতলি আফিফের বাহুতে। মৃদু সুরে চেঁচিয়ে উঠলো,“আল্লাহ রেহাই দাও আমাকে।”
আফিফ গলা নামিয়ে বড্ডো আদরে ডাকে এবার,“তিতলি,বুকে আসো। শোনো!”
“বুকে কী শুনবো?”
_“ইমরান হাশমি গান গাইছে।”
_“কী?”
_“আশিক বানায়া,আশিক বানায়া আপনে। তেরে বিন ছুনি ছুনি নিগাহে…!”
তিতলি হাসছে। হাসতে হাসতে কাঁদছে আবার, লোকটার প্রতি মায়া উতলে পড়ছে,“কষ্ট হচ্ছে?”
_“হু।”
_“সেরে যাবেন।”
_“তোমার কষ্ট হচ্ছে? আমাকে আজ খুব আশা করেছিলে তাইনা? পুষিয়ে দেবো সব! এতো আদর করবো। তখন তুমি বিতৃষ্ণ হয়ে যাবে…”
_“আল্লাহর দোহাই লাগে মুখটায় একটু লাগাম দেন। কিছুক্ষণের জন্য অফ যান।”
_“তাহলে আশিক বানায়া গাইবো? তেরি বিন ছুনি ছুনি নিগাহে,তেরি বিন পেয়াছি পেয়াছি ইয়ে বাহে।”
তিতলি হাসছে। খিলখিলিয়ে হাসছে স্বামীর বুকে মাথা ঠেকিয়ে। চোখ মুছে ভীষণ শান্ত এখন। আফিফ বৌয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ডাকলো আবার,“তিতলি!”
_“হু?”
_“এরপর যখন আমি সুস্থ হবো। তখন যদি দেখি তুমি অসুস্থ হয়েছ তাহলে…!”
_“তাহলে কী? আমাকে মেরে ফেলবেন?”
_“না । ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে জঙ্গলে চলে যাবো। শালা বিবাহিত জীবনের কাঁথা পুড়ি।”
তিতলি এবার হোহো করে হাসছে। নিস্তব্ধ রাতে সে হাসির ঝংকার হিম বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে বাইরের। আফিফ ওর মুখটা চেপে ধরে,“আস্তে হাসো,পাড়ার লোক শুনবে যে আমার আর তর সইছে না।”
তিতলি আরো জোরে হাসে। হাসতেই থাকে। আফিফ ওকে হাসতে দেয়। এবং নিজে চেয়ে চেয়ে দেখে।
_______
আজ ঐ ব্যথা নিয়েই আফিফ নিজে যাবে থেরাপি নিতে,জেদ ধরেছে আফিফ। তিতলি কারণ জানতে চাইলে মুখের ওপর বলে দিলো পুরুষ মানুষের খিচ খেয়ে পড়ে থাকার চেয়ে বিষ খেয়ে মরে যাওয়া ভালো। তিতলি আর কোনো কথা বাড়ায়নি। তার স্বামীর খানিকটা ‘ইগো ইস্যু’ রয়েছে এ তো নতুন জানে না। মানিয়ে তো নিচ্ছেই তিতলি।
নানী শাশুড়ি জুলফা বসার ঘরে বসে পান খাচ্ছিলেন,তিতলিকে শেল্ফ থেকে জুতা বের করতে দেখে বললেন,“সবসময় ঠ্যাং ক্যান বাইরে থাকে তোর?”
আফিফ রেডি হয়ে ক্র্যাচ নিয়ে এসেছে। নানীর মুখে তাকিয়ে বলল,“ও তো আমাকে নিয়ে,আমাকে থেরাপি দেওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে।”
_“না না। এই বারের কথা বলিনি। বৌ মানুষ,ডেইলি ডেইলি বাজারে যাওন ভালো বিষয় না। ভালো দেখায় না। বৌ হইলো ঘরের শরম। ঘরের শরম কাটা ভালো না।”
তিতলি কোনো কথা না বলে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আফিফ জবাব দিচ্ছে,“ও ছাত্রী মানুষ, রুমকির মতো। ক্লাস করতে হবে তো নানী। তোমার মতো বুড়ি হলে না হয় গুজি দেবে ঘরে।”
জুলফা ত্যাক্ত স্বরে বলে,“তোর বড়ো মামা খমখম করে,বৌরে এতো পড়াইস না। তোর এতো কিসের অভাব? টাকা পয়সা কম কি আছে? বৌয়ের কামাইয়ের টাকার এতো লোভ তোর আফিফ?”
তিতলির চোখ দু'টো টলটল করছে। ও অসহায় চোখে লোকটার মুখ দেখছে। সেদিন বিসিএস প্রিপারেশনের কোচিংয়ে ভর্তি করানোর সময়েই তিতলি ভেবেছিল এই লোককে এসব নিয়ে কত বিশ্রী বিশ্রী অপবাদ মাথা পেতে নিতে হবে। লোভী পুরুষ,গায়রত নেই, ব্যক্তিত্ব নেই,বৌ পড়ানো-বৌকে দিয়ে চাকরি করানো আধুনিক কাপুরুষ বলে গালি দেবে এই বাঙালি অশিক্ষিত গোষ্ঠী। এখন তাই হচ্ছে। লোকটা এসব কি করে সামলাবে ভবিষ্যতে? লোকটা উচ্চমাধ্যমিক পাশ। ভাতের চেয়ে ডাল উঁচু হলে সমাজের মুখ থামে?
আফিফ নানির কথার জবাবে বলল,“আমার টাকা পয়সা আছে। শিক্ষা নেই। ঐটা আমার বৌ আনবে। তারপর এই বিল্ডিংয়ের ছাদে আমার বৌয়ের সার্টিফিকেট টাঙিয়ে রাখবো। তুমি দেখবা। ওওও তোমার চোখে তো ছানি পড়েছে। সমস্যা নাই। অপারেশন করিয়ে দেখাবো। তিতলি পারফিউম নতুনটা বের করো।”
তিতলি মুখের হাসি চেপে ধরে ছুটে আসে ওর ঘরে,এসে পেট দুলিয়ে হাসতে থাকে। আফিফ ঘরে আসতেই ওকে পিঠের পেছন থেকে জোরসে জরিয়ে ধরে। কিছুক্ষণ দু'জন কোনো কথা বলে না, এরপর আফিফ পারফিউম লাগিয়ে নিতে নিতে মুখ খোলে,“আর এরপর,তিতলি রানি,বিসিএস দেবেন। প্রশাসন ক্যাডার পেয়ে যাওয়ার পোটেনশিয়াল আছে আপনার মাঝে। বললেন আপনার স্যার। আপনি প্রসাশন ক্যাডার পেয়ে গেলে তখন ছেঁড়ে দেবেন আপনার দোকানদার স্বামীকে? আপনাকে আমি জবাই করবো। কসম।”
স্বামীর পিঠে গাল ঠেকিয়ে তিতলি শ্বাস টানে,চোখ বুজিয়ে বলে,
_“আমি তো আপনার দোকানে রেইড দিতে যাবো। নকল ঘি বেচার অপরাধে আপনাকে অ্যারেস্ট করবো ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে।”
আজ নির্বাচন পূর্ববর্তী অস্থিরতার চাপে শহরে গাড়ির সংখ্যা এমনিতেই খুব কম। আধাঘন্টা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে একটাও অটো পাওয়া যাচ্ছে না যাতে আফিফ খানিকটা পা মেলে বসতে পারবে। উবার এজেন্সি সব বন্ধ। তিতলি ভীষণ রেগেছে।
_“আপনাকে আমি কতবার বলেছি থেরাপি বাসায় বসে নিন। শুনলেন না। এখন ভুগুন।”
_“আরে ধূর। ভুগবো কি? ঠিক আছি আমি। এরপর আজ দোকানেও বসবো। এসব ম্যানম্যানানি ভাল্লাগছে না। নিচে ডিম দিয়ে বসে থাকলে এতদিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বেরিয়ে যেতো।”
তিতলি হাসছে। একটা ছয় সিটের অটো অবশ্য ওরা পেলো। ড্রাইভারের ডান পাশে এক লোক। মাঝের সিটে এক মহিলা,শেষের সিটে আরেক মহিলা। মোট তিনজন যাত্রী। আফিফের সুবিধা হয় শেষের চওড়া সিটে বসে পা মেলে দিলে,মাঝের সিটটা বড্ডো সরু এই অটোর। তিতলি দেখেই ভদ্রমহিলাকে অনুরোধের সুরে বলল,“আপা আপনি একটু মাঝের সিটে আসবেন? আসলে আমার স্বামীর পায়ে খানিকটা সমস্যা। উনি এখানে বসবেন,আপনি সরলে আমি ওনার পাশে বসতাম।”
মহিলা দেখতে মায়া মুখী হলেও জিভটা ছুড়ির ফলা। খ্যাক করে বলে উঠলো,“আমি কেন সরতে যাবো? উনি বসলে বসুক আমার পাশে। আমার কোনো সমস্যা নেই। আপনি অন্য জায়গায় বসুন।”
আফিফ এই অটোতে উঠবে না তবুও তিতলি জোর করে আফিফকে বসালো ঐ সিটে কারণ গাড়ি আর পাওয়া নাও যেতে পারে। আফিফ উঠে বসতেই ভদ্রমহিলা নাক কুঁচকে বললেন,“হাতটা সরিয়ে বসবেন প্লিজ!”
তিতলি কিছু বলতে যাবে তার আগেই আফিফ ধীরে ধীরে নামলো অটো থেকে,তিতলিকে চোখ রাঙিয়ে সামনের সিটে এসে বসতেই অটোওয়ালা বলল,“পেছনে বসবেন না?”
_“না। এতো সুন্দর মহিলাদের পাশে বসি না।”
ভদ্রমহিলা খেইখেই করে উঠলেন,“আপনি আমাকে অপমান করছেন।”
তিতলি চেতে উঠলো,
_“পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া শুরু আপনি করেছেন। আমরা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে একটু সাহায্য চেয়েছি। করেননি ইটস্ ওকে। আমার স্বামী আপনার পাশে বসতেই আপনার কেন মনে হলো উনি হাত বাড়িয়ে খামচে ধরবে আপনাকে? কথায় কথায় পুরুষকে অপমান করার মোটিভ নিয়ে চলেন কেন আপনারা কিছু মেয়েরা অথচ তাদের থেকে হেল্প নেওয়ার বেলায় এক চুল ছাড় দেন না এই আপনারাই। দিনশেষে পুরুষের সাহায্যও তো লাগে!”
বৌটা বড্ডো ঝগড়ুটে,মুখটা আফিফ চেপেই ধরে তিতলির। তিতলি বলতে চায় আরো। কেন তার স্বামীকে এভাবে তাচ্ছিল্য করা হলো এর প্রতিবাদ ও করতে চায়। এবার চেঁচিয়ে উঠল,“একটা অসুস্থ মানুষ, তাকে হেল্প করবেন না ঠিক আছে,এমন ভাবে ট্রিট করেছেন যেন সে ইভটিজার। মাই হাজবেন্ড ইজ নট এন ইভটিজার। হি ইজ ইনোসেন্ট। ইন ফ্যাক্ট,ইফ ইনোসেন্স ওয়্যার এ পারসন,দেয়ার উড বি এ কম্পিটিশন বিটুইন দ্য টু। ওকে?”
চোখ জ্বলছে তিতলির। আফিফ মেয়েটাকে টেনে রাস্তায় সরিয়ে আনলো। রাস্তার দোকানিরা উৎসুক হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। চেনাজানা ছোকরা গুলো ছুটে এসে জানতে চাইলো,“কোনো সমস্যা ভাই?”
আফিফ চোখের ইশারায় তাদের থামিয়ে দিয়ে এক হাতে ক্রাচে ভর দিয়ে আরেক হাতে তিতলিকে টেনে নিয়ে সরে এলো। ভিড় কমার পরে ওরা আরেক অটোতে উঠলো। এই অটোটা একদম খালি। আফিফ তিতলির হাতটা ধরে রেখেছে শক্ত করে। একটু একটু করে,আফিফের বাঘিনীর রাগ কমে জল হতে শুরু করতেই আফিফ খানিকটা হেসে পরিবেশটা সহজ করতে চাইলো,“আমার পাশে এক পরী বসেছিল গো তিতলি।”
তিতলি কথা বলছে না। আফিফ বলতে থাকে,“হি ইজ ইনোসেন্ট। এমন ভুল ধারণা রাখবে না বোকা মেয়ে। কোনো মানুষ সাধু হয়না।”
_“আচ্ছা আপনি লুইচ্ছা। এখন থামেন। জ্ঞান দিয়েন না।”
আফিফ থতমত খেয়ে আশেপাশে তাকায়। বৌয়ের রাগ কমেনি। শ্বাস ফেলে এক হাতে গলা পেঁচিয়ে ধরে বসে থাকে তিতলির। যতক্ষণ না রাগ কমে ততক্ষণ ওভাবে ধরে বসে থাকে। তিতলি চেঁচামেচি করে তখন ক্লান্ত,মাথাটা স্বামীর কাঁধে এলিয়ে দিয়ে বলে,“ছাড়েননা কেন?”
_“কারণ আমি লুইচ্ছা!”
আফিফ জবাব দিতেই দু'জন হাসে। তিতলি আরো শক্ত করে,ঐ অটোতেই গা ঘেঁষতে শুরু করে স্বামীর। আফিফ বলে,“এতো কাছে এলে কেন?”
তিতলি মুখটা স্বামীর কানের কাছে নিয়ে বলল,“আমিও তো ওটাই।”
_________
আজ হালকা নয়,খানিকটা বেশিই শীত পড়েছে। হাড় হিম করা শীত যাকে বলে। তবে আকাশে মেঘ জমছে। বৃষ্টি হলেও, সন্ধ্যার পরে হবে। আজ ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ। তারেক রহমানের দলীয় প্রার্থীর প্রচারণার বিকট আওয়াজ সকাল থেকে এ তল্লাটের এ মাথা ও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মোড়ের মাথার জাফর দফাদার আবার খাস বিএনপি। ২০০৪ এ পৌরসভার ওয়ার্ড কমিশনার ছিল। তাই ঠাটবাট একটু বেশি,দল জিতবে সেই আন্দাজ আগেই করে রেখে দুই দুইটা গোরু কিনে রেখেছেন। মাইকের আওয়াজের মাঝেই কলিং বেল বাজে। পলাশতলী থেকে গণী চাচা এসে এক কলসি খেজুরের রস দিয়ে গিয়েছেন। বিকেলে আসমা এসে আফিফকে পিঠা বানিয়ে দিয়ে যাবে,এই রস দিয়ে। পৌষ-মাঘে সপ্তাহে সপ্তাহে পিঠা না হলে নাকি সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফের চলে না। তিতলি আগে ধারণা করলেও বিয়ের পর থেকে দেখছে লোকটা ভোজন রসিক বেশ। তিতলিরও যত্ন করে নিজের চামড়া পুড়িয়ে রাঁধতে ভালো লাগে। যেদিন আফিফ বলে আজ তরকারি মজা হয়নি, সেদিন অবশ্য লোকটাকে ভালো লাগে না।
আজ রান্নার দিকে মন নেই তিতলির। তিতলি আজ সারাদিন ছোটাছুটি করেছে কেক পেস্ট্রি বানানোর ইনগ্রিডিয়েন্টস কিনতে। আজ দোসরা ফেব্রুয়ারি সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফের জন্মদিন। এই জন্মদিনে একটা সময় আম্মা সিন্নি রেঁধে খাইয়েছে আফিফকে। জন্মদিন নিয়ে অবশ্য এখন এই লোকটির কোনো উৎসাহ উদ্দীপনা নেই, এরপর তো দীর্ঘকাল কাটিয়েছে প্রবাস জীবন। জন্মদিনের দিন হয় কারো বাড়ির বৈদ্যুতিক লাইন ঠিক করতে গিয়েছে,নয়তো বিল্ডিংয়ে পেইন্ট করেছে। বোনরা উইশ করতে এলে দিয়েছে ঝাড়ি। বোনরা একটা সময়য়ের পরে ভাইয়াকে উইশ করা ছেড়ে দিয়েছে ভয়ে। আজ ভাবী এসে নতুন করে ভাইয়ের এই দিনটা নিয়ে আমোদে মেতেছে দেখে তাদের যে খারাপ লাগছে তা ঠিক নয় তবে তিতলির সাথে অন্তর্দ্বন্দ্বের পর্দাটা এখনো সমানে ঝুলছে ওভাবেই তাই এদিকে বিশেষ মাথাব্যথা দেখায়নি কেউ। ফারিয়া নিজের ঘরে শুয়ে আছে। রুমকি পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। ফারজু বাচ্চাদের পড়াচ্ছে। সোহেল বাচ্চাদের হাতখরচার টাকা পাঠিয়েছে সেই টাকা দিয়ে দু'টো ব্যাগ কিনেছে তৌকির মুন্না।
তবে কেক নিয়ে বাচ্চারা ভীষণ উৎসাহী। তৌকির মুন্না, রিনি,অনিক খুব লাফালাফি করছে দেখে তিতলি ওদের জন্য বিকেলেই মস্ত এক চকলেট কেক বানিয়ে দিয়েছে। এরপর বানিয়েছে আফিফের জন্য লাভ শেইপের একটা ছোট কেক। এই কেক বানাতে গিয়ে নানী শ্বাশুড়ি জুলফার সাথে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়েছিল তিতলিকে। জন্মদিনের কেক বানানো যাবে না। কিন্তু তিতলি বানাবেই। এরপর যুদ্ধে জয়ী তিতলি যখন কেক রেডি করে রুমে রাখতে যাচ্ছিল অমনি ঘটলো আরেক অঘটন। ছোট্ট মুন্না ঐ লাভ শেইপের কেকটা দেখে বায়না জুড়ে দিলো সে ওটা খাবে এখন। জুলফার সাথে যুদ্ধ করে এমনিতেই মেজাজ তুঙ্গে তিতলির। বাচ্চাদের এই ঘ্যানঘ্যানানি আর সহ্য হয়নি। এই কেকটা তো ওর স্বামীর জন্য কত আবেগ নিয়ে বানিয়েছে। যেহেতু জন্মদিন পালন করলে আফিফ রেগে যেতে পারে তাই ভেবেছে স্বামী গভীর রাতে পরিশ্রম শেষে দোকান থেকে ফিরলে দু'জন এমনি এমনি একসাথে কাটবে,খাবে,বাড়তি কিছু নয়, মোমবাতি থাকবে না। ও গলা খানিকটা চড়া করেই বলে ফেললো,“তোমাদের জন্য একই কেক বানিয়ে দেয়া হয়েছে মুন্না,ওটা খাও। এটা তোমার মামা এলে খাবে।”
ফারজু দাঁড়িয়ে তিতলির ঐ চড়া গলা শুনলো পেছন থেকে। শুনে এসেই সপাৎ করে ছেলের গালে এক চড় বসিয়ে দিতেই আঁতকে উঠলো তিতলি।
_“খেলি না কেক তখধ? এতো খেতে মন চায় কেন? এতো খেতে মন চায় কেন? কত খাবি?”
তিতলি নিজেকে সামলে নেয় অতিদ্রুত। গিয়ে ফারজুকে ফেরালো তখন,“আপা মারবেন না। বোঝে না তো। এই নিন কেকটা, ও খাক।”
মুন্না ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে। ফারজু ধাক্কা দিয়ে সরালো তিতলিকে। কেকটা ছিটকে পড়ে গেলো নিচে। এরপর ছেলেকে টানতে টানতে ঘরে গিয়ে দরজা লাগালো ফারজু। ফারিয়া,রুমকি,জুলফা প্রত্যেকেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আর তিতলি বোকার মতো মেঝেতে লেটকে যাওয়া লাভ শেইপের কেকটার দিকে তাকিয়ে আছে। যেটা সে বড্ডো আবেগ নিয়ে স্বামীর জন্য বানিয়ে ছিল।
আফিফ বাড়িতে ফিরে কেক সমাচার শুনেছে। বাড়িতে ফিরেছে মাথায় বৃষ্টি নিয়ে। এসব শুনেছে অবশ্য জুলফার কাছে। জুলফা বলেছেন খানিকটা রসিয়ে কষিয়েই,“তোরে কইছিলাম আফিফ মাইয়াডার ডিফোর্স করাইয়া ঘরে তুলিস না,তোর বৌ ভালো হইলেও বনবে না এগো লগে,তখন শুনলি না। সোহেলের লগে ছাড়াছাড়ি করাইলি। এখন কেক লইয়া বাজাবাজি করে। ফারজুর পোলা মুন্না নাকি তোর ভাগের কেকটা খাইতে চাইছে। তোর বৌ নাকি গোষা করছে হেইয়া লইয়া। ফারজু কানতাছে বোধহয়। দেখ গিয়া!”
আফিফ অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে। তিতলি একটা কেকের জন্য বাচ্চাদের সাথে অভিমান করেছে এটা তাকে চূড়ান্ত বিস্মিত করেছে। সর্ষে পাবদা দিয়ে ভাত খেয়ে আসমার বানিয়ে দেয়া রস চুই খাওয়া অবধি টু টা সাউন্ড করেনি আফিফ। তিতলি লক্ষি বৌটির মতোই মাথায় ঘোমটা টেনে স্বামীকে পাত পেড়ে খাইয়েছে। শেষে রুমে এসে ধরলো আফিফ তিতলিকে,“কেক নিয়ে তুমি সিনক্রিয়েট করেছো?”
সিনক্রিয়েট! তিতলির বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। চোখে পানি এলো,রাগ এলো। গলা ঝেড়ে বলল,“ওদের জন্য আলাদা কেক আমি বানিয়ে দিইনি? ওটা আমি আপনার জন্য বানিয়ে ছিলাম। আপনাকে সারপ্রাইজ দেবো বলে। আপনার জন্মদিন আজ। আমি সিনক্রিয়েট করেছি! এতো বড় কথাটা মুখে আনলেন? কে শেখালো? কারা শেখালো? আপনার বোনরা? হ্যাঁ সিনক্রিয়েট করেছি। স্বামীর জন্মদিনে তাকে কেক খাওয়াতে চাওয়াটা আমার পাপ হয়ে গেছে। আমার ভুল হয়ে গেছে। মাফ করে দেবেন।”
চোখ থেকে রাগ আর ক্ষোভের মিশ্র জল গড়াচ্ছে। আফিফ বোকা বনে গেল পুরোপুরি, ততক্ষণে দৃষ্টি গেল বিছানায়। নতুন বেডশিট,কিছু গোলাপ আর আফিফের গোপনে কিনে রাখা নাইটিটা। গত পরশু দিন কোথা থেকে কিনে এনে আলমারিতে তুলে রেখেছিল,তিতলি তখন দেখে ফেলায় মুখ গম্ভীর করে বলেছিল,“রাতে শাড়ি থ্রিপিস পরে ঘুমাতে ঝামেলা হয় তাই মাহিদা ভাবী কি জানি একটা কিনে দিলো তোমাকে,তুমি পরে দেখে নিয়ো।”
গাঢ় বেগুনি রঙের নাইটিটা। অনেকটা খোলামেলা। তিতলি দেখেই বুঝেছিল এসব কোনো মাহিদা ভাবী কিনে দেননি।
আফিফ হা করে বিছানা দেখছে। মহারানী আজ তার রাজার জন্য প্রথম-অভিসারের আয়োজন সাজিয়ে বসে ছিল! আফিফ গর্ধভ,আফিফ গর্দভ। নিজেকে দুইবার গালি দিয়ে আফিফ তিতলিকে আগলায়,ভারী খসখসে গলাটা নরম করে বলে,“ওভাবে বলিনি তো তিতলি। জানি আমার বৌটা আমার জন্য করেছে সব। আম সো হ্যাপি ফর দ্যাট। আমার জন্মদিন মনে রাখার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। কিন্তু ফারজুর এই সময়ে, তোমার সামান্য আচরণের ত্রুটি বিচ্যুতিতে ও যদি কষ্ট পায়……!”
তিতলি আজ একটু বেশিই অবুঝ হয়েছে। হঠাৎ এতো রাগ উঠেছে। ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,“ফারজু কী মনে করবে,ফারিয়া কী মনে করবে,আসমা কী মনে করবে,রুমকি কী মনে করবে। সবসময় শুধু বোনরা কী মনে করবে সেই চিন্তা। আর বৌয়েরও যে কষ্ট হয়? এই? জোর করে আমাকে চেপে ধরে বিয়ে করার সময় না বলেছিলেন ইনসাফ করবেন,ডেইলি বলেন। কোথায় ইনসাফ। বোনরা কেন তবে আগে থাকে সব কিছুতে?”
আফিফ শান্ত হাতে ধরে রেখেছে অশান্ত মেয়েটাকে। তিতলির কষ্ট কমছেই না। সে সিনক্রিয়েট তো করেনি। আজ রাতের এই বৃষ্টি ঘি হয়ে পড়ছে ওর দহনে। ও তো এই উষ্ণ রাতটা স্বামীর বুকে কাটাতে চেয়েছিল। নিজেকে সঁপে দিতে চেয়েছিল।
আফিফ বলল,“বোনরা তো আমার আগেই থাকবে তিতলি।”
তিতলির ভেজা চোখ জোড়া গোল্লা গোল্লা হয়,“বোনরা আগে থাকবে?”
_“হু।”
তিতলির দম আটকে আসে। অসহায়ের মতো বলে,“আর আমি?”
আফিফ টেনে ওর অবস্থান পরিবর্তন করে নিজের খুব কাছে আনে, ঝোঁকে কিছুটা। যেখানে ঠোঁটের কাছে ঠোঁট,বলে,“তুমি তো আমার মাঝেই। আগেও না,পিছেও না। আফিফের বৌ আফিফই। সে যদি এভাবে রোজ রোজ নিজের অবস্থান ভুলে গিয়ে কান্নাকাটি করে বাচ্চাদের মতো,তবে আমি তাকে মেরে ফেলবো! আমার বৌ আমার জান। জে এ এ এন, জান।”
তিতলি চুপ হয়। লতাগাছটির মতো নেতিয়ে পড়ে আফিফের গায়ে, ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,“বড্ডো ভয়ংকর মাইন্ড গেইমার আপনি।”
আফিফ প্রসঙ্গ ঠেলে বলে,“কেক একটা গেছে তা নিয়ে নিজের দুঃখ পাওয়ারও দরকার ছিল না,ফারজুকে অপরাধবোধে ভোগানোরও দরকার ছিল না। ও বেরিয়ে এসে তখন ভেজা চোখে আমার মুখের দিকে কতক্ষন তাকিয়ে রইল। এসব বুঝতে হবে তো তিতলি। তুমিই তো আফিফ তাইনা? কেক তো আরো বানাতে পারতে তাইনা? চলো এখন একটা কেক বানাও? আমি খাবো।”
_“এখন কেক?”
_“হু। এক্সাক্টলি ঐটা! যেটা ভেঙে গেছে। চলো আমি তোমাকে হেল্প করবো।”
তিতলি চোখ মুছে শ্বাস নেয়। যেন মরা গাছে প্রাণ ফিরে সতেজ,গাছটা আমোদে নাচছে। শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে নেয়। বাড়ির সবাই ততক্ষণে গাঢ় ঘুমে তলিয়েছে। রান্নাঘরের বাতি জ্বেলে বাটিতে ডিম ফাটিয়ে,ময়দা ঢেলে খট খট করছে তিতলি। আফিফ ওকে দেখছে। নির্বাচন নিয়ে একটা দু'টো আলোচনাও জমছে।
_“আমি জামায়াতে ভোট দিবো?”
আফিফ তিতলির কথা শুনে হাসে,বলে,“আচ্ছা দিয়ো।”
_“না না বিএনপিকে দেবো?”
আফিফ জোরেই হাসে,“তোর যাকে ইচ্ছা তাকে দে।”
তিতলি মন খারাপ করে এবার,“কাউকে দেবো না। আমি ভোট কেন্দ্রেই যাবো না আফিফ।”
আফিফ এগিয়ে গিয়ে তিতলিকে পেছন থেকে ধরলো। উষ্ণতা টুকু ভালো লাগছে তিতলির। আফিফ বলে উঠলো হঠাৎ,
_“কেক বানাতে হবে না। রুমে চলো।”
তিতলির হাত থামে। টের পায় ওর কাঁধে আঁছড়ে পড়া বেনসন এন্ড হেজেজের নিঃশ্বাসটুকু বড্ডো ঘন,উতলা। ঢোক গিলে বলল,
_“রুমে গিয়ে নামাজ পড়েন আফিফ।”
_“পড়ে এসেছি জামাতে।”
_“সিগারেটের অভ্যাস ছাড়েন।”
_“আরে বাল, রুমে চলো। জ্ঞানের কথা সব শুনবো। পরে শুনবো।”
_“মেয়েদের থেকেও বেশি মুড সুইং হয় আপনার। এইমাত্র না বললেন কেক বানাতে?”
_“তিতলি চলো। প্লিজ।”
_“আমি কেকটা বানাই? একটু ধৈর্য ধরুন? নানী বলেছে কি মনে নেই?”
আফিফ ধৈর্য ধরলো না। কেক সাজাতে রাখা চকলেট টুকু তিতলির গালে লাগিয়ে একটা চুমু খেলো জোরসে। তিতলি বলল,“এসব কি কান্ড!”
নুয়ে এলো আফিফ ক্র্যাচ নিয়ে,
_“তুমি বুঝি এসব বোঝো না!”
তিতলি চোখ নামায়। আফিফ আরো খানিকটা নোয়,
_“আমি বুড়ো না অতো। রোম্যান্স জানি পাগল। আসো দেখাচ্ছি।”
_“মুখটা বন্ধ করবেন?”
_“তিতলি রুমে চলো। আমি তোমাকে মেরে ফেলবো নয়তো সত্যি সত্যি বলছি।”
লোকটা তিতলির হাত ধরে টানতে টানতে কেমন হাওয়ায় দোলাতে দোলাতে নিয়ে গেলো রুমে। ঘরের সিটকিনি তোলার শব্দ হয়েছে তিতলি শুনলো। ওর খেয়াল তখন হাতের বেগুনি রঙের বস্তুটাতে। লজ্জার মাথা খেয়ে,ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,“এটা পরি?”
ততক্ষণে আফিফ ওর সামনে লাগোয়া। মুখটা এগিয়ে এনে বলল,“না পরলে তো তোমাকে মেরে ফেলবো!”
নিস্তব্ধতায় পাতা পড়ার শব্দের সাথে সাথে ওয়াশ রুমের দরজা খোলার শব্দ হয়। তিতলির এরপর কোনো জ্ঞান ছিল না। যা করার বেলাজ লোকটাই করেছে। কিভাবে টেনে নিয়ে গেলো বিছানায়। ও শুধু কাঁপা গলায় বলল,“আফিফ,আমি কিন্তু অতো সুন্দর না!”
লোকটা বলল,“আমিও।”
_“আমি, আমি কিন্তু কোনো পরীর মতো মেয়ে না।”
নাইটির ফিতেটা লোকটার হাতের নিয়ন্ত্রণে। কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল,“আমি বানিয়ে নিচ্ছি এক্ষুনি। দেখবে তুমি? অভিজ্ঞতা নেই। তবে পারবো হয়তো।”
তিতলি আপ্লুত হয়। চোখের কোনে জল জমে। মাথায় চাপে ফাজলামি। হাতটা সরিয়ে দিয়ে বলে,“আগে বলেন বোনরা আগে না বৌ আগে?”
আফিফ ওর চুলের মুঠি চেপে ধরে বুকে টানে,“জানি না। বৌ আপাতত বুকে। তিতলি,কানটা ভালো করে চেপে ধরো,ওখানে ইমরান হাশমির গান বাজছে?”
তিতলি খিলখিলিয়ে হাসছে,“ছিঃ এই সময়ে আবার কি বিশ্রী জোকস! হ্যাঁ বাজছে।”
_“কোনটা?”
তিতলি কিছু সময় ভেবে জবাব দিতে না পারলে আফিফই দেয়,“আমি বলছি। তুঝে সোচতাহু ম্যায় শাম সুবহাহ্ উসছেহ্ য্যায়দা তুঝে্ অর চাহু তো কেয়া?”
আবেশে ভাসছে তিতলি। এই দুনিয়ার হুশ নেই। হুশ ফের ভারি খসখসে ডাকে,“এই নির্লজ্জ মেয়ে!”
_“হু?”
_“ভালো লাগছে আদর?”
তিতলি কাঁদছে তখন। জবাব দিলো।
_“স্বর্গের মতো!”
একটু থেমে বলল,
“রোজ একটু আধটু অবুঝপনা করলেও এভাবে বুকে টানবেন তো?”
আফিফ পাশে শুয়ে দু'হাতে পুতুল আগলে ধরার মতো আগলে নিলো মেয়েটাকে।
_“বুকের সবটা তোমার,তুমি আসবে যাবে,কেক বানাবে,কেক নিয়ে কাঁদবে।”
চোখ মোছে তিতলি। বলে,“আর আপনি কী করবেন?”
_“আমি? ঐ যে….তুঝে সোছতাহু ম্যায় শাম সুবহাহ উসছে য্যায়দা তুঝে অর চাহু তো কেয়া?”
তিতলি বরের গলা আগলে ধরে ঢুলুঢুলু করে। আফিফ ওকে জাগিয়ে রাখতে ডাকে আবার,“এই নির্লজ্জ মেয়ে?”
_“হু?”
আফিফ হেসে ওর থুতনি চেপে বলে,“আমি আজ রাতে আরেকবার কিন্তু জাগাবো তোমাকে!”
তিতলি হাই তুলে জানতে চায়,“তখন ইমরান হাশমি কোন গান গাইবে?”
আফিফ ওর কানের কাছে মুখটা নিয়ে বলে,“মে চাহু তুঝকো মেরি জা বেপানাহ। ফিদা হু তুঝপে মেরি জা বেপানাহ!
চলমান…..