ফন্ট সাইজ:
থিম:
ও যে মানে না মানা

১৫তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#ও_যে_মানে_না_মানা

#পর্ব_২০

#ইসরাত_আরা_ইতি

ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ,২০২৬। নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের আজ পাঁচ দিন। এই তল্লাটে ও দলের সমর্থক ভারী ছিল বিধায় তারেক রহমান শপথ গ্রহণের চারদিন পরেও উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়েনি মোটেই। দফায় দফায় আনন্দ মিছিল। এইমাত্রও একটা বিরাট সংখ্যক তরুণের গাদানো দল গলা ফাটাতে ফাটাতে তিতলির সামনে থেকে বেরিয়ে গেছে। তিতলি দাঁড়িয়ে আছে সদর রোডের একটা ব্র্যান্ডেড পোশাক শোরুমের সামনে। বাকি জনতার মতো সেও উৎসুক হয়ে মিছিল দেখছে,আচমকা মুখ ফসকে বেড়িয়ে গেলো,“হঠাৎ করে শহরের সব ছেলেপুলে বিএনপি হয়ে গেল? সব মানুষ বিএনপি হয়ে গেল?”

পাশের মুরব্বি লোকটা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তিতলির দিকে কেমন করে তাকাতেই তিতলি নিজের মুখ চেপে ধরে এপাশে সরে এলো। বারো তারিখ সে আর আফিফ উভয়েই ভোট দিয়েছিল। মজার বিষয় হচ্ছে ওরা স্বামী স্ত্রী কে কাকে ভোট দিয়েছে কেউ কাউকে বলেনি,এটা রহস্য করে রেখেছে নিজেদের মাঝে। নির্বাচনের দু’দিন পরে সৌভিক সিঙ্গাপুর চলে গিয়েছে,যাওয়ার আগে ও সত্যি সত্যি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছে,“বায় বায় শাউয়োর দেশ।”

ইনফিনিটি, রিচম্যান ঘুরে ঘুরে পা ব্যথা বানিয়ে শেষে একটা শার্ট পছন্দ করল তিতলি। তখন ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা। আজ সোয়া নয়টা থেকে সোয়া দশটা পর্যন্ত একটা ক্লাস ছিল তিতলির। এরপরের ক্লাসটা হয়নি। একটা আইসক্রিম কিনে শীতের উষ্ণ দুপুরে ওটা কামড়ে খেতে খেতে রোদের মধ্যে হাঁটতে বেশ লাগছে তিতলির। হাতের শপিং ব্যাগে দুলছে শার্টটা, দাম সাড়ে তিন হাজার টাকা। এই টাকা তিতলির। বিয়ের আগে টিউশনির টাকা গুলো ভাইয়াকে দিয়েছিল,এগুলো বিয়ের পরের। একটা টিউশনি ধরে রেখেছে হাতে। সপ্তাহে তিনদিন যেতে হয়। লোকটা মানবে কি মানবে না ভেবে হাতে পায়ে মালিশ করতে করতে মাসখানেক আগের রাতে বলেছিল,“টিউশনি করানো ভালো তাইনা বলেন? যারা আমার মতো গভার্নমেন্ট জবসিকার তাদের পড়াশোনাটা চর্চায় থাকে। স্টুডেন্ট নাইনে পড়ে। সাইন্সের সাবজেক্ট। ও বাড়িতে কোনো পুরুষ লোক লোক নেই।”

লোকটা একবার বলাতেই মেনেছে। বিয়ের পরে উপার্জন করা টাকা দিয়ে তাই তিতলি শুরুতে স্বামীর জন্যই উপহার কিনলো,এমনিতেও জন্মদিনে কিছু দেয়া হয়নি। এরপর তিতলি কিছু ঝাঁপিও কিনেছে রাস্তার ভ্যান থেকে। এসব করতে করতে বারোটা তখন বেজেছে গেছে। তিতলি বাড়িতে এসে তাড়াহুড়ো করে বোরখা হিজাব খুলতে লাগল রান্নাঘরে ঢুকবে বলে। কিন্তু রান্না ঘরে গিয়ে দেখে ফারিয়া আর ফারজু রান্না করছে,রান্না প্রায় শেষের দিকে। দু'জনের সাথে তিতলির চোখাচোখি হলো,তিতলি কিছু বললো না। পাশেই আফিফ। লোকটা আজ দোকানে বসেনি। তিতলিকে দেখে বলল,“লাচ্ছি বানিয়েছে ওরা। ঘরে রাখা আছে। গিয়ে খেয়ে নাও। রান্না হয়ে গেছে। তোমার পড়া থাকলে পড়ো।”

তিতলি চুপচাপ মাথা নেড়ে চলে এলো এপাশে। লাচ্ছি খেয়ে ঘর ঝাড়ু দিলো। আজ তুলির মা আসেনি। এরপর রুমকির ঘরে উঁকি দিলো। মেয়েটার দু'দিন ধরে আবার জ্বর খুব। জ্বরের মাত্রা দেখতেই তিতলি এসে বড্ডো সংকোচে হাতটা কপালে রেখেই চমকে গেলো। রুমকি শুয়েছিল,গা পুড়ে যাচ্ছিল আগুন হয়ে। প্রশ্ন করল,

_“জ্বর কত? মেপেছো?”

_“১০২!”

_“মাথায় পানি দিয়েছো?”

_“রান্না শেষে ফারজু আপা দিয়ে দেবে বলল।”

শ্বাস ফেলে ঠিকঠাক ভাবে কথা বলতে পারছে না মেয়েটা। চোখ জ্বলছে। তিতলি কারো অপেক্ষায় না থেকে নিজেই বালতি মগ টেনে এনে মাথার কাছে বসে। বালিশ টেনে তাতে রেক্সিনের পাটি বিছিয়ে রুমকির মাথাটা টেনে শোয়াতেই রুমকি চোখ মেলে। বিস্মিত হয়ে চেয়ে থাকে তিতলির মুখটায়। এই গত পরশুও ও তিতলির সাথে একটা অহেতুক কারণে বাজে ব্যবহার করেছে। কারণটা হচ্ছে,টিচার নিভ্রান ভাই এলে তিতলি অতিরিক্ত উঁকিঝুকি মারে অতিথিঘরে। যেখানে রুমকির সাথে তৌকিরও ম্যাথ পড়ে নিভ্রানের কাছে। তিতলির কাছে এ নিয়ে জানতে চাওয়ায় তিতলি বলল,“আমি তোমার অভিভাবক। আমি উঁকিঝুঁকি দিতেই পারি।”

ভাইয়ার পরে তিতলি নামের পুঁচকে এক মেয়ে ওদের অভিভাবক সেটা রুমকি মানতে পারেনি,শুনিয়েছে দু’কথা। আজ সেই তিতলিকে অন্যরকম লাগছে। মায়ের মতো। আপুদের বিয়ের পরে,রুমকি যখন একা জ্বরে পড়ে থাকতো,ভাইয়ার তো এতটা সময় হতোও না সবটা সামলে দেখার। এভাবে রুমকির চুলের ভাঁজে ভাঁজে পানি ঢুকিয়ে মাসাজ করে জ্বর নামানোর কায়দাটা বড্ডো আরামের। আম্মা আগে করতো। আম্মার পরে আপারা, এখন এই মেয়েটা।

তিতলি হুট করে হাত থামায়,রুমকিকে চেয়ে থাকতে দেখে ফিচেল হাসে,বলে,“কী দেখছো? বড্ডো ছ্যাঁচড়া আর নির্লজ্জ আমি চাইনা? সেটাই দেখছো?”

রুমকি বলেনা কিছু। বলে চলে তিতলি। তখন দরজার বাইরে ফারজু,ফারিয়া,আসমা তিন বোন দাড়িয়ে।

_“তোমার ফারিয়া আপার সাথে, তোমাদের সাথে আমার মা বাজে ব্যবহার করেছে। পরবর্তীতে তার বিপরীতে তোমার ফারিয়া আপা, তোমরা আমার সাথে করেছো। এখন এর বিপরীতে আবার আমি ভাবী হয়ে,সুপরিয়র হয়ে তোমাদের সাথে বাজে ব্যবহার করবো। এই সার্কেলটা তো ভাঙতে হবে রুমকি। ভাঙতে হয়। সুন্দর কিছু দেখতে হলে নিয়ম ভাঙতে হয়।”

রুমকি কোনো কথা বলছে না। আফিফ হিসেবের খাতা নিয়ে ক্যালকুলেটরে যোগ করতে করতে রুমকির ঘরের সামনে এসেই দাঁড়িয়েছে তখন। তিতলির কথাগুলো সেও শুনেছে। এরপর আসমা,ফারজু,ফারিয়াকে ধীরে বলল,“এভাবে আড়ি পাতা পাপ‌। ভাবীর কথা শুনতে মন চাইলে ভাবীর সামনে যা।”

ওরা তিন বোন ধরা পড়ে যাওয়ায় লজ্জা পেয়ে চলে যায় যে যার কাজে। তিতলি রুমকির মাথা মুছিয়ে ওকে এক স্লাইস পাউরুটি আর নাপা ওয়ান খাইয়ে দিয়ে চলে এলো। জ্বর না কমলে বিকেলে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ঘরে এসে তিতলি থমকায়। তিতলির ফোন বাজছে,দিয়েছে ইউনিভার্সিটির জুনিয়র এক ছেলে। আফিফ তার সামনেই। আজ এখানে আবার এক কান্ড হবে, মানসিক ভাবে প্রস্তুত হয়েই কলটা রিসিভ করে তিতলি। আফিফ শুরুতেই বলল,“ফোনটা লাউডে দাও।”

তিতলি স্পিকার অন করলো। ওপাশ থেকে একটা ছেলে বলল,“তিতলি আপু আমি অনার্স ফার্স্ট ইয়ার থেকে রবিন। আপনার কাছে পাঠকচক্র গ্রুপের এ মাসের ডোনেশনের টাকাটা আছে? মোর্শেদ ভাই বললেন।”

_“জি ভাই। তুমি নাম্বার দাও। মোটা পঁয়তাল্লিশশ’ টাকা। আমি পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

_“এই নাম্বারেই আপু।”

_“আচ্ছা। তা তুমি আমার নাম্বার এই নাম্বারটা কোথায় পেলে?”

_“তানিয়া আপু দিলেন।”

_“আচ্ছা রাখো।”

তিতলি কল কেটেই বিরস মুখে আফিফের চেহারা দেখলো। যা ভেবেছে তাই। লোকটার প্রচন্ড রাগ উঠেছে।

_“কাকে কাকে দিয়ে রেখেছো তোমার এই পার্সোনাল নাম্বার?”

_“আমি তানিয়াকে বকে দেবো!”

_“তুমি যে কি বকা বকবে তা আমি বুঝতে পেরেছি!”

আজ তিতলিও ঝগড়াতে ছাড়বে না,বলল,“লাউড বাড়াতে বললেন কেন? সন্দেহ করেন বৌকে?”

_“সন্দেহ নয়। আমি শুনতে চাই আমার বৌ পড়াশোনার বাইরে আর কোন কোন সার্কেলে মেশে। আমার অধিকার আছে জানার।”

_“ওটাই সন্দেহ। আপনি জানেন আমি কেমন মেয়ে। তবুও সবসময়…!”

তিতলি রেগেমেগে বেড়িয়ে আসে বেলকোনিতে। আফিফ পিছুপিছু,ধমকে বলে,“অ্যাই অ্যাই, স্বামীর সাথে তেজ দেখাচ্ছো?”

_“জি!”

আফিফ পুরো ভস্কে গেল তেজী বৌয়ের তেজী জবাবে। বলল,“তোমাকে সন্দেহ করিনি তিতলি। আমি জানি ছেলেদের সাথে মিশবে না। কিন্তু তোমার বয়স কম, যদি পড়াশোনা বাদে ভুল সার্কেলে জড়িয়ে নিজের ক্যারিয়ার নষ্ট করো? আমি এজন্য…! আচ্ছা সব বাদ, যাও গিয়ে পড়তে বসো।”

_“না,আপনি আমায় সন্দেহ করেন। আপনার আচরণ তাই বলে। এখন কথা ঘোরাচ্ছেন। আমি বাইরাইন্না মেয়ে তাইনা? এটা জানেন আপনি? আমি চোখ ফোঁটা মেয়ে? আমি খারাপ মেয়ে,তাই লাগাম টানছেন!”

_“তিতলি মুখ সামলে কথা বলবে। তুমি বলতে বলতে বেশি বলে ফেলো।”

_“আপনি মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনি জানেন না আপনি জোর করে কাকে ঘরে তুলেছেন। আমি দেখতে খাটো হলে কি হবে, আমার জিভ পাঁচ ফুটের। আমাকে কথা শোনাতে এলে আমিও ছাড়বো না।”

_“তিতলি শাট আপ! আমি রেগে যাচ্ছি।”

_“ইউ শাট আপ! সবসময় পারেন শুধু আমার সাথে। বোনদের সামনে গেলে তো একদম মিউ মিউ। আর বৌয়ের সামনে হালুম হালুম? আপনার হালুম হালুম শোনার আমার টাইম নাই। যান ভাগেন।”

আফিফ এবার তিতলির হাত চেপে ধরলো,“তিতলি ঘরে গিয়ে পড়তে বসবে। এনাফ ইজ এনাফ। অনেক বলে ফেলেছো। শাসন করেছি তোমাকে। কোনো ভুল করিনি আমি। এখন চুপচাপ পড়তে বসবে। আমার কথার নড়চড় করলে ফল ভালো হবে না।”

_“আজ আমি খারাপ ফল দেখতে চাই।”

তিতলি ফুঁসছে। উঁহু। স্বামী স্ত্রী উভয়েই ফুঁসছে। আফিফ কপালের ঘাম মুছে শার্টের হাতা গুটিয়ে নিয়ে বলল,“তবে রে। সামান্য বিষয় নিয়ে এতদূর। রুমে চলো। বোঝাচ্ছি তোমাকে। খবর হচ্ছে তোমার। আজ তোমার একদিন কি আমার একদিন।”

তিতলিও খামচে ধরলো লোকটাকে,লোকটার হাত,“হ হ। রুমে চলেন। আপনি আমাকে কী বোঝাবেন,বোঝাবো তো আমি আপনাকে। আমি আপনার খবর করবো,শক্তি কি আমার গায়ে কম? আজ আপনার একদিন কি আমার একদিন।”

রুমের দরজা লাগানোর পরে ওরা কে কার খবর করেছে বোঝা গেলো না। তবে ঘন্টাখানেক পুরো ঘরটা কেমন নীরব হয়ে রইল। একটা কাথার নিচে দু'টো নগ্ন শরীর একে অপরের সাথে লেপ্টে আছে। শ্বাস চলছে ধীর গতিতে। তিতলি মুখ গুঁজে রেখেছে স্বামীর বুকে। আফিফের হাত ওর মাথায়। নীরবতা শুরুতে সেই ভাঙ্গে,বলল,“রাগ কমেছে আপনার ম্যাডাম?”

_“না। আপনার?”

_“আমারো না।”

ওরা দু'জন হেসে ফেলল। কিছুক্ষণ হাসল খিলখিলিয়ে। তিতলি বলে,“আজ ইমরান হাশমি গান গাইলেন না যে?”

_“আজ অন্য গান গাইবো?”

_“গান।”

_“তাহলে......আরেকটু মেশো আমার সাথে! আরেকটু ঝগড়া করো...!”

তিতলি না না করতেই ওর কানের খুব কাছে মুখটা নিলো আফিফ,

“কোনো এক আকাশ তাই, তোকে পেতে চায়

তোর প্রেমে বুঁদ হয়ে এত আয়োজন

মন খারাপের রাতে

তোকে প্রয়োজন

তাই এত আয়োজন…”

তিতলি ওর ঠোঁটে হাত চেপে বলল,“কিন্তু এখন তো দিন।”

আফিফ হেসে নিজেকে শুধরে নিয়ে আবার গায়,“কোনো এক আকাশ তাই,তোকে পেতে চায়.

তোর প্রেমে বুঁদ হয়ে এত আয়োজন

ঝগড়া করার দিনে

তোকে প্রয়োজন

তাই এত আয়োজন…।”

তিতলি মৃদু শ্বাস ফেলে আদুরে গলায় বলল,

_“আগে বলেন প্রেম কী?”

_“লুচ্চামি আর ভদ্রতামির মাঝামাঝি যার অবস্থান।”

তিতলি হাসছে। খিলখিলিয়ে হাসছে। আফিফ মুগ্ধ হয়ে ওর সেই হাসি দেখছে। এরপর আস্তেধীরে বলল,“আরেকটা গাইবো?”

_“জি অবশ্যই। আপনার গানের গলা মোটামুটি ভালো। শোনাই যায়।”

_“থ্যাংক ইউ বৌ। প্রশংসা মন্দ করো না। এবার ইংরেজি গান গাইবো। আমার ইতালিয়ান উচ্চারণ। ন্যারেশন ভুল করলে শুধরে দিয়ো,হেসো না। কেমন?”

তিতলি মাথা নাড়ে। আচমকা টের পায় কাঁথার নিচ থেকে লোকটা তার হাতটা তিতলির শরীরে দখলদারিত্ব বসিয়েছে। তিতলির প্রশ্নাত্মক চাহনি দেখে আবার বললোও,“ইংরেজি গান। ইংরেজি রোম্যান্স।”

তিতলি হাঁসফাঁস করে। লোকটা ওকে টেনে নিয়ে গায়,

“All I dream of is your eyes,

All I long for is your touch

And darling, something tells me,

that's enough, mmmm..

You can say that, I'm a fool

And I don't know, very much

But I think, they call, this love.

One smile, one kiss,

two lonely hearts

is all, that it takes

Now, baby,

you're on my mind,

every night, every day

Good vibrations getting loud

How could this be anything,

anything else?

When

All I dream of is your eyes

All I long for is your touch

And darling, something tells me

that's enough, mmmm..

You can say that, I'm a fool

And I don't know, very much

But I think, they call, this love..

Oh, I think, they call this love..

তিতলি স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। আফিফ গান থামাতেই বলল,“আপনি অনেক ভালো ভালো ঘরের মেয়ে পটাতে পারতেন।”

_“কিন্তু আমার তকদিরে তিতলি ছিল। যার বুকের কাছে, যখন বয়ঃসন্ধিতে তার শরীরে ভীষণ মেদ জমেছিল,তখন শরীর ফেটে কিছু স্ট্রেচ মার্কস হয়েছে, ঐ বুকে। বাচ্চাওয়ালা মেয়েদের মতো বুড়ি শরীর নাকি তার,তার ভাষায়। এজন্য তার কি যে লজ্জা প্রথম রাতে। স্বামীর কাছে আসতে গিয়ে নিজের খুঁতের গ্লানির চোটে কতক্ষণ কেঁদেছিল। যে এইমাত্রও আমাকে ওখানটা উন্মুক্ত করতে দেয়নি। এখন আমাকে চুমু খেতে দাও।”

তিতলি কেঁপে উঠে চোখ বুজলো, কাঁপা গলায় বলল,“আফিফ মুখ বন্ধ করেন।”

আফিফ এক ঝটকায় তিতলির হাত সরিয়ে ওখানটায় ঠোঁট বসায়,বলে,“এরপর সবসময়, ঝগড়া কিংবা ভালোবাসাবাসিতে, মারামারি কিংবা মন কষাকষিতে, আদর কিংবা খুনসুটিতে, এমনি এমনি, ধরো তুমি রান্নাঘরে খুব ব্যস্ত থাকবে। ঘেমে নেয়ে একাকার। আমার তখন তোমার এই জায়গাটাতে চুমু খেতে মন চাইলে তুমি ঘরে এসে আমার আবদার পূরণ করে যাবে। আমাকে ফেরাবে না বলো! অ্যাই বলো না!”

ছোট ছোট গোলগোল হাত দু'টো মুঠিতে পুড়ে চুমু খাচ্ছে আফিফ কথাগুলো বলতে বলতে। তিতলি লজ্জায় পারলে মরে যেতো। মৃদু মাথা নাড়ে,বাধ্য মেয়ের মতো। সে আফিফকে ফেরাবে না,ওয়াদা করলো। এরপর ধীরে ধীরে উঠে বসে নিজেকে কাথায় ঢেকে কতক্ষণ বসে থেকে আইঢাঁই করে,মনের ভেতর থেকে ভয় সরছে না ওর। লোকটার যে ফালতু ইগো ইস্যু,শার্টটা নিয়ে কাহিনী করলে তিতলি কাঁদতে কাঁদতে আজ মরেই যাবে।

আফিফ ওকে খোঁচা দিলো,“বসে আছো কেন? ফ্রেশ হতে যাও! তুমি বেরুলে আমি ঢুকবো। নাকি আমার সাথে যাবে!”

আফিফ হাসছে। তিতলি ওসব পাত্তা না দিয়ে বলল,“একটা জিনিস দেখাবো আপনাকে। আপনার ভালো না লাগলে বলবেন ভালো লাগেনি, কিন্তু আমাকে বকবেন না প্লিজ?”

আফিফ মাথা নেড়ে ওকে অভয় দিতেই তিতলি ড্রয়ার খুলে শার্টটা বের করে দেখালো।

_“আপনার জন্য। আমি কিনেছি। একটু পরে দেখাবেন না বকে?”

আফিফ অবাক হয়ে শার্টটা নিলো। উঠে অবাক হয়েই শার্টটা পরতে পরতে বলল,“এসব কেন?”

_“জন্মদিনের লেইট উপহার। টাকাটা পেতে দেরি হয়ে গেলো।”

আফিফ বৌয়ের মুখ দেখছে। নিজের গায়ের শার্ট দেখছে। ও বকলো না। তিতলি ওতে সাহস পেয়ে পা দুলিয়ে বসে বিছানায়। বলে,“এতো টাকা আপনার। নিজের জন্য মাত্র কয়েকটা শার্ট কিনে রেখেছেন। পাড়ার ছেলেরা কি বলে বেড়ায় আপনার নামে জানেন? আফিফ কিপটামি করে চার তলা বিল্ডিং তুলেছে।”

কথাটা শুনেই মুখ বাকায় আফিফ,“এহহহহ। আমার আন্ডারওয়্যারের দাম জানে ওরা? গিয়ে দেখো ওদের আন্ডারওয়্যারের কয়টা করে ফুটো। আমার এক একটার দাম চার হাজার টাকা। চারটা আন্ডারওয়্যার দিয়ে বছর পার করে দেওয়া যায়। নেহাত অপচয় পছন্দ করি না। টাকা কামাই করতে কষ্ট হয়। নয়তো মাসে মাসে কিনতাম।”

তিতলি হাসছে। আফিফ শার্টটা পরে নিজেকে আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে।

_“তিতলি ভুঁড়িটা না থাকলে আমাকে সত্যি সত্যি হটেস্ট লাগতো এই শার্টে। মাই গড। তোমার চয়েজ মাশাআল্লাহ!”

তিতলি কতক্ষণ হা করে চেয়ে থাকে লোকটার মুখের দিকে,“আপনার পছন্দ হয়েছে?”

_“ভাবছি জিমে গিয়ে ভুঁড়ি কমানোর পরে এই শার্ট পরবো।”

তিতলি ছুট্টে গিয়ে পেছন থেকে জাপ্টে ধরে আফিফকে,“লাভিউ। লাভিউ লাভিউ।”

আফিফ জিমে যাওয়ার ধার ধারেনি আর। ঐ শার্ট পরেই সারাদিন কাটিয়েছে এরপর।

সৈয়দ ওয়াহিদুল আফিফ একে একে নিজের প্রতিটা বোনকে দেখালোও বৌয়ের কিনে দেওয়া উপহারটা,তাও গলা বাড়িয়ে বাড়িয়ে “এই রুমকি দেখ তোর ভাবী দিয়েছে। আসমা তোর ভাবী কিনে দিয়েছে। ফারজু তোর ভাবী কিনে দিয়েছে।”

সন্ধ্যা থেকে তিতলির চোখ ছলছল করছে। তিতলি বুঝলো,তিতলি এমন একটা মানুষকে বিয়ে করেছে সেই প্রকৃত আলফা ম্যান। আর কেউ নয়,এই পৃথিবীর আর কোনো পুরুষের এমন হবার ক্ষমতা নেই। লোকটাকে টেনে বেহায়ার মতো রুমে ঢোকাতে ইচ্ছে করছে তিতলির। কিন্তু লোকটা তার বোনদের নিয়ে পিকনিকের আলোচনা করতে ব্যস্ত। বিকেলে তৌকির এসে হঠাৎ ধরলো,“মামা চলো আমরা সবাই মিলে পিকনিক করি বাইরে।”

চলছে সেই নিয়ে বিরাট আলোচনা। মাঝখানে চা চাইলো। তিতলি তাকে ব্যস্ত থাকতে দেয়।

তিতলি এপাশে দাঁড়িয়ে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদে। কি যে সুখ লাগছে। লোকটা তাকে ছুঁয়ে আদর করলে যেমন সুখ লাগে,তেমন।

চলমান…..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন