ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৪র্থ পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৪

#Esrat_Ety

"কতবার করে বলেছি ছেলেটাকে ধমকাবে না,কথা কি কানে যায়না? গণ্ডারের চামড়া নাকি তোমার গায়ে?"

ভাতের লোকমাটা ইহানের মুখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে প্লেটে রেখে রিতু নিচু স্বরে বলে,"জোর না করলে খেতেই চায়না একেবারে।"

ইলহাম চোখ রাঙানি দিয়ে বলে,"জোর করতে হবে না। মির্জা বাড়ির ছেলেদের ওপরে জোর চলে না। তারা তাদের ইচ্ছা মর্জির মালিক। আমার ছেলের যখন মন চাইবে তখন খাবে।"

তারপর ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,"তুমি যাও বাবা। দাদার ঘরে গিয়ে খেলো।"

বাবার আস্কারা পেয়ে ইহানের ঠোঁটজোড়া প্রশস্ত হয়ে যায় হাসিতে। একছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। রিতু খাবারের প্লেট নিয়ে বসে আছে। ইলহাম কিছুক্ষণ রিতুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"হাত ধুয়ে দরজা টা বন্ধ করে আসো।"

রিতু চমকে উঠে ইলহামের দিকে তাকায়। ইলহাম নিচু স্বরে বলে,"শাড়িটা পাল্টে এসো। এই রঙটা আমার পছন্দ নয়।"

হঠাৎ করে রিতুর বুকে সুক্ষ্ম যন্ত্রনা হতে শুরু করে। একেই বোধহয় বলে পুরুষ মানুষ। নিজের প্রয়োজনের সময় এরা ঠিকই নমনীয় হয়ে কথা বলে। রিতুর মনে হচ্ছে তার জন্মই হয়েছে কারো বৌ নামের যৌন দাসী হয়ে থাকার জন্য। কারো অর্ধাঙ্গিনী হয়ে সম্মানিত হওয়ার জন্য রিতুর মতো হার হাভাতে মেয়েদের জন্ম হয়নি।

"কি হলো,বসে আছো কেনো। আমাকে ভাইয়ার সাথে পার্টি অফিসে যেতে হবে সন্ধ্যায়। তাড়াতাড়ি।"

রিতু একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হাত ধুয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে এসে আলমারি থেকে একটা নীল রঙের পাতলা জরজেটের শাড়ি বের করে ওয়াশ রুমে ঢুকে পরে নেয়। ধীর পায়ে স্বামীর পাশে এসে বসতেই হ্যাচকা টান মেরে তাকে নিজের কাছে নিয়ে নেয় ইলহাম। ঘোর লাগা কন্ঠে বলে ওঠে,"আজকাল খুব বার বেরেছো না তুমি? মা মারা যাওয়ার পরে পুরো সংসারের চাবি পেয়ে গিয়ে নিজেকে অনেক কিছু ভাবতে শুরু করেছো? স্বামী কাছে ডাকলে গায়ে লাগে না!"

রিতু শ্বাস নিতে পারছে না। তার বুকের যন্ত্রনাটা বেড়েই যাচ্ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু এই মুহূর্তে চোখে পানি দেখলে ইলহাম আরো রেগে যাবে। রিতু গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,"ভুল ভাবছেন।"

ইলহাম কোনো কথা বলে না। নিজের স্বামী হওয়ার হক আদায় করতে ব্যস্ত হয়ে পরে। রিতু দুচোখ বন্ধ করে অনুভূতি শূন্য হয়ে পরে থাকে।

দীর্ঘসময় পরে ইলহাম সেই চিরাচরিত ধমকের সুরে বলে,"তোমার বাবা ফোন করেছিলো। কাল বাড়িতে আসবে। ফোন করে বলে দিও যেন ভালো জামাকাপড় পরে আসে। আচ্ছা ওনার কি ভালো জামাকাপড় নেই? মাসে মাসে তো টাকা পয়সা ভালোই পাঠাও ও বাড়িতে। কিনে নিতে পারে না? ফকিন্নির মতো ঘুরে বেড়ায়।"

রিতু নিস্তেজ কন্ঠে বলে,"ফকিন্নির মেয়েকে বিয়ে করেছিলেন কেনো তবে?"

ইলহাম কপাল কুঁচকে বলে,"মুখে মুখে কথা তো ভালোই চালাতে শিখে গিয়েছো। এতো সাহস পাচ্ছো কোথায়?"

রিতু চুপ হয়ে যায়। দীর্ঘসময় কেউ কোনো কথা বলে না, তারপর রিতু মৃদু স্বরে বলে ওঠে,"মাঝে মাঝে মনে হয় আমি আপনার বৌ না হয়ে আপনার ঐ সব রক্ষিতাদের মতো কেউ হলেই ভালো হতো। আপনার থেকে অন্তত একটু মিষ্টি কথা তো শুনতে পারতাম!"

***

"আতাউর আলম তো সুস্থ হয়ে উঠছে। মনে হয়না সে তার সিদ্ধান্ত থেকে সে সরে দাঁড়াবে। তোমার একজন প্রতিদ্বন্দ্বী কিন্তু বেড়ে গিয়েছে এবং জনগণের কাছে তার অবস্থান কিন্তু বেশ শক্ত পোক্ত!"

সামিন বাবার কথায় হালকা হেসে বলে,"ভালোই তো! তা না হলে নির্বাচনের মজা টা কোথায়?"

_মানুষ তোমাকে ছাত্রনেতা হিসেবে গ্রহণ করেছে, কিন্তু এই শহরের মেয়র হিসেবে আতাউর আলমের মতো একজন বয়স্ক,জ্ঞানী এবং সাদাসিধে ব্যক্তিকে রেখে তোমার হাতে শহরের দায়িত্ব তুলে দেবে বলে আমার মনে হচ্ছে না! আমি সন্দিহান।

সামিন ইয়াসারের কলম থেমে যায় বাবার কথায়। সে কিছু পেপার্সে সাইন করছিলো।

ইমতিয়াজ মির্জা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"বলছি রাজনীতি টা একটু মন দিয়ে কর। তারপর একটু সময় গেলে,সরাসরি এমপি পদের জন্য লড়বি।"

_তুমি কি ভয় পাচ্ছো?

ছেলের সরাসরি প্রশ্নে আমতা আমতা করে ইমতিয়াজ মির্জা বলে,"সাতবছর আগে তোর মেজো ভাইয়ের অপকর্মের দাম আমি এমপি পদ খুইয়ে দিয়েছি। মানুষ জনের কাছে বর্তমানে আমার গ্রহণযোগ্যতা কতখানি তা তো নিশ্চিত না। তার উপরে সেদিনের সেই ভাইরাল ভিডিও। টাকা দিয়ে নিউজ চ্যানেল গুলোকে সামলে নিয়েছি। কিন্তু বিষয়টা নিয়ে এখনো কথা হচ্ছে। তোকে সবাই ভয় পায় তাই হয়তো সামনে কিছু বলছে না।"

_সেটাই। এই ভয়টাই আমার দরকার।

তারপর কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,"আতাউর আলম সাদাসিধে মানুষ। রাজনীতি সাদাসিধে মানুষ দিয়ে হয়না বাবা। এদের জন্য উপযুক্ত পেশা শিক্ষকতা। দীর্ঘজীবন সাংবাদিকতা করেছে,এই শহরে টিকতে পেরেছে এটাই অনেক।

ইমতিয়াজ মির্জা ছেলের সাহস এবং আত্মবিশ্বাস দেখে অবাক হয়। সেও প্রচন্ড সাহসী ছিলো কিন্তু তার বড় ছেলে তাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। যদি এই সাহসটা ভালো কাজে লাগাতে পারে তাহলে অনেক দূর যেতে পারবে।

সামিন ইয়াসার বলে,"নির্বাচনে হারার কথা ভেবে চিন্তা করো না,কারন জিতবো আমিই। সেটা যেভাবে হোক। "

_ঐ মেয়েটার ব্যাপারে কি করলি? বলেছি মামলা দিয়ে দে, ওর বাবাকেও একটু দমিয়ে রাখা যাবে।

_ওটা সম্পূর্ণ আমার ব্যাপার। তুমি ওটা নিয়েও ভেবো না।

_ভীষণ সাহস মেয়েটির। বাবার জন্য সন্দেহের বশে,কোনো রকম যাচাই-বাছাই না করেই সামিন ইয়াসারের গাঁয়ে হাত তোলে। আতাউর অনেক লাকি, এমন একটা মেয়ে পেয়েছে।

_তুমি মেয়েটার প্রশংসা করছো নাকি আমাকে অপমান করতে চাইছো বাবা?

_কোনোটিই না।

হঠাৎ করে সামিন ইয়াসারের ফোন বেজে ওঠে। ফোনের দিকে তাকিয়ে সে খুশি হয়। ইমতিয়াজ মির্জার দিকে তাকিয়ে বলে,"ছোটো ফোন করেছে।"

_কথা বলো। জিজ্ঞেস করো কবে ফিরবে দেশে। বাড়ির ব্যাবসা ইলহাম একা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এতটুকু দায়িত্ব তো নিতে বলো।

সামিন ইয়াসার ফোন কানে তুলে নিয়ে বলে,"বল ভাই।"

ওপাশ থেকে কেউ বলে ওঠে,"ভাইয়া।"

_হ্যা বল ভাই। ঠিক আছিস তুই?

_ঠিক আছি। ভাইয়া একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

_কি কথা? বল।

_ওই ঝামেলাটার কি হলো? তুমি মেয়েটিকে কিছু বলেছো পরে?

সামিন কিছুটা অবাক হয়ে বলে,"সব কথা রেখে ওই কথা জিজ্ঞেস করছিস কেনো?"

_না মানে,আমি চাইনা তুমি কোনো ঝামেলায় জড়াও। তাই আর কি।

সামিন শুকনো হাসি হেসে ভাইকে আশ্বস্ত করে বলে,"আরে ধূর। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবো নাকি আমি। আমি এখন আমার ইলেকশন নিয়ে ভাবছি। মনোনয়ন পেয়ে গেছি দল থেকে ‌!"

_অভিনন্দন ভাইয়া।

ম্লান হেসে বলে ওপাশের ব্যক্তি। সামিন বলে,"তুই ফিরে আয় ছোটো। বাবা আসতে বলছে তোকে। বাড়ির ব্যবসা সামলাবি। এখানে এলে তোকে বিয়ে করিয়ে দেবো আগে। বিদেশী বৌ নিয়ে আসিস না সাথে করে খবরদার।"

ওপাশের ব্যক্তি হেসে বলে," আর তুমি কবে করছো?"

সামিন,"তুই বিয়ে করে রিভিউ দিবি। তারপর।"

দুইভাই ফোনে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে। তারপর ফোন রেখে পুনরায় নিজের কাজে মন দেয় সামিন ইয়াসার।

***

আতাউর আলমকে গতকাল বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। তার আগমন উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয় স্বজনের ঢল নেমেছে। দূর দূরান্ত থেকে সবাই উড়ে উড়ে আসছে। রেহেনা রান্নাঘরে চায়ের পানি বসিয়ে কপাল কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, কিন্তু রাগটা প্রকাশ করতে পারছে না সে। এই নেমক হারাম গুলোর জন্য দফায় দফায় চা বানিয়ে সে ক্লান্ত। অসুস্থ মানুষকে দেখতে এসেছে নাকি দাওয়াত খেতে এসে তা এরাই ভালো জানে। আতাউর আলমের ঘর থেকে নাটকের সংলাপ শোনা যাচ্ছে। অভিনয় করছে আতাউর আলমের চাচাতো ভাই। ভাইয়ের প্রতি দরদ যেনো উথলে উঠেছে এখন। অথচ দূর্ঘটনার দিন আলো গিয়ে এতো করে বললো তার সাথে থানায় যেতে, থানায় সাধারণ ডায়েরী করবে সে,তখন গর্তে লুকিয়ে ছিলো সরীসৃপ টা।

রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় আলোদের গৃহপরিচারিকা সীমা। রেহেনা চুলা থেকে চায়ের পাতিল নামিয়ে বলে,"উঠেছে আলো? গিয়ে বল চা খেতে ডেকেছি।"

_আপা তো বাড়িতে নেই খালা। কোথাও গিয়েছে।

রেহেনা অবাক হয়ে তাকায়। এই সাত সকালে কোথায় গিয়েছে মেয়েটা না খেয়ে !

গলির মোড়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে সে। পরনে তার সাদা এবং নীল রঙ মিশ্রিত প্রিন্টের সালোয়ার কামিজ। হাত উঠিয়ে বারবার হাত ঘড়িতে সময় দেখছে সে। এ কদিনের ধকলে চোখের নিচে কালি জমে গিয়েছে। কিন্তু গাঁয়ের ওই উজ্জ্বল শ্যামলা ধরনের রঙের সাথে চোখের নিচের কালি বেশ মানিয়েছে। খুব একটা অদ্ভুত লাগছে না। আলো এবার বেশ বিরক্ত হয়। আধাঘণ্টা ধরে এখানে দাঁড়িয়ে আছে অথচ কোনো খালি রিকশা খুঁজে পাচ্ছে না সে। দীর্ঘ সময় পরে একটা রিকশা পেয়ে গেলে সে উঠে পরে রিকশায়। আজ আলোর বাবা আতাউর আলমের জন্মদিন। বাবাকে সারপ্রাইজ দিতে তার জন্য অল্প কিছু আয়োজন করবে আলো, সকাল সকাল সেজন্যই বের হয়েছে সে।

কিছুদূর যেতেই রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে দেয়। কাছে কোথাও থেকে মাইকের আওয়াজ আসছে। আলো বিরক্ত হয়ে বলে,"কি হয়েছে ভাই?"

_আপা সামনের রাস্তায় জ্যাম। আইজ এইখানে সমাবেশ। পার্কের সামনের রাস্তা পুরাডা আটকা। বিরক্তিতে আলোর মুখ তেতো হয়ে যায়। ডানপাশে একটা এ্যাম্বুলেন্স তাদের মতো আটকা পরেছে। এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার বাইরে নেমে কারো সাথে ফোনে কথা বলছে।

আলোর বেশ খারাপ লাগছে। নিশ্চয়ই রোগীটি পরে পরে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে। সামনে নির্বাচন আর এখন সব রাজনৈতিক দল রাস্তাগুলোকে নিজেদের বাপের সম্পত্তি মনে করে আটকে রেখে ঘেউ ঘেউ করতে থাকবে। আলোর বাবা এই শহরের মেয়র হলে সে শহরের ভোল পালটে ফেলবে,আলো নিশ্চিত।

কয়েক মুহূর্ত পরে একটি গাড়ি এসে তাদের সামনে থামে। রিকশাওয়ালা অতি উৎসাহী হয়ে বলে,"ইয়াসার ভাই আসছে আপা। আইজ এইখানে ভাষণ দিবো।"

আলোর মেজাজ বিগড়ে যায়। রাস্তা আটকে মাফিয়াগিরি করা একমাত্র ইয়াসার মির্জার পক্ষেই সম্ভব। কোনো কিছু না ভেবেই আলো রিকশা থেকে নেমে পরে। ইয়াসার মির্জার দলের একটা ছেলে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিতেই সে বাইরে নেমে দাঁড়ায়‌। আলো বাতাসের গতিতে ইয়াসার মির্জার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। সকাল সকাল অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে আলো নামের মেয়েটিকে নিজের মুখোমুখি আবিষ্কার করে ইয়াসারের চোয়াল লম্বা হয়ে যায়। সে কিছুটা অবাক হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী একজন শ্যামবতীর দিকে তাকিয়ে আছে।

"কি হচ্ছে এখানে? রাস্তাটাকে নিজেদের সম্পত্তি মনে করছেন নাকি?"

আলোর ধমকে ইয়াসারের ঘোর কাটে। পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরে সে প্রচন্ড বিরক্ত হয়। সেই ফাজিল মেয়েটা সব সময় এভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসছে তার কাজে বাধা দিতে। সেদিন পা ধরেও একটু ভয় ঢোকেনি মনে, আবার চেঁচিয়ে কথা বলছে ইয়াসারের সাথে!

ইয়াসার আলোকে কিছু না বলে জামিলের দিকে তাকায়, জামিল বলে,"এই যে আপা! আপনার সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে একটু বলবেন?"

_সমস্যা কোথায় হচ্ছে মানে? রাস্তা ব্লক করে জনগণের ভোগান্তির ব্যবস্থা করে বলছেন সমস্যা কোথায় হচ্ছে?

ইয়াসারের পেছনে দাঁড়িয়ে রাহাত ফুয়াদকে বলে,"দেখছেন ভাই? এই মেয়ে ভাঙে তবু মচকায় না। সেদিনের পা ধরার কথা বেমালুম ভুলে গেছে।"

ইয়াসার আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভোগান্তি কোথায় হচ্ছে? বড় গাড়ি গুলো তো চলে যাচ্ছে একটার পর একটা। রিকশা গুলোকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না,আর হবেও না। হাই-ওয়েতে রিকশা ওঠার নিষেধাজ্ঞা আছে,তা কি জানেন না আপনি? বিশিষ্ট জ্ঞানী, সুনাগরিক ভোটার!"

ইয়াসারের কটাক্ষ শুনে আশেপাশে তার ছেলেগুলো হো হো করে হাসতে থাকে। আরাফ নামের ছেলেটা ইয়াসারকে বলে,"বেডি মানুষ ভাই! ব্রেইনের ওজন কয়েক গ্রাম কম আছে।"

আলো ক্ষেপে গিয়ে বলে,"তাহলে এই এ্যাম্বুলেন্সটা এখানে আটকা পরে আছে কেনো? জবাব দিন।"

এ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার আলোর চেঁচামেচি শুনে কান থেকে ফোন নামিয়ে সেদিকে যায়। এ্যাম্বুলেন্স থেকে রোগীর পরিবারের একজন লোক নেমে আসে। আলোকে উদ্দেশ্য করে বলে ,"ম্যাডাম আমাদের আটকে রাখেনি। এ্যাম্বুলেন্স টা হঠাৎ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। অন্য একটা এ্যাম্বুলেন্স আসছে,একটু সময় লাগবে।"

আলো সামিন ইয়াসারের দিকে তাকায়। সামিন ইয়াসার কটমট দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলোর দিকে তার রাগী দৃষ্টি রেখেই রোগীর পরিবারের লোককে গম্ভীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,"কতক্ষন লাগবে?"

লোকটি কন্ঠে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,"আধাঘণ্টা তো লাগবেই। আমার বৌটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। প্রেগন্যান্ট সে।"

সামিন ইয়াসার রাহাতকে বলে,"রাহাত। গাড়ি ঘোরা। ওনার ওয়াইফকে হাসপাতালে নিয়ে যা।"

রাহাত এক মুহুর্ত চিন্তা না করে মাথা নাড়িয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। গর্ভবতী মহিলার স্বামী এবং অন্যান্যরা ধরাধরি করে রোগীকে সামিন ইয়াসারের গাড়িতে বসায়। যন্ত্রনায় ভীষণ কাতরাচ্ছে মহিলাটি।

আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। সামিন ইয়াসারের দিকে কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে গর্ভবতী মহিলার স্বামী গাড়িতে উঠে বসে। গাড়ি চলতে শুরু করে।

সামিন ইয়াসার কয়েক মুহূর্ত আলোকে দেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"তুমি একটা ফটকা চালাক মেয়ে।"

আলো চুপ করে থাকে। হঠাৎ করে বলে,"পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার চমৎকার ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছেন,খুব ভালো নাটক দেখালেন আজ। আপনার মতো একটা গিরগিটির নতুন একটা দয়ালু রূপ আবিষ্কার করে আমি একটুও অবাক হইনি। এই রূপ ক্ষণে ক্ষণে বদলায়,বদলাবে। আবার কোনো গরীবকে ধরে লাথি মারবেন, অথবা কোনো মেয়ের ওড়না ধরে টান দেবেন‌। আপনাদের ফ্যামিলি হিস্ট্রি তো তাই বলে।"

আলো রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রাস্তার ডান পাশে চাপা গলির রাস্তায় ঢুকে পরে।

সামিন ইয়াসার কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। ফুয়াদ পেছন থেকে বলে,"তুই বুনো ওল হলে ও তো দেখছি বাঘা তেঁতুল।"

_না, ও একটা মেয়ে। শুধু আর শুধু মাত্র একটা মেয়ে। দুর্বল প্রজাতির প্রাণী। এবং এটা ওকে বুঝতে হবে। আমি বোঝাবো।

সামিন ইয়াসার দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে।

***

"ফজিলাতুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ!"

_জ্বি ভাই।

সামিন ইয়াসার নড়েচড়ে বসে,নিমন্ত্রণ পত্রটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে।

_আপনাকে অতিথি হিসেবে যেতে হবে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

_নিষেধ করে দে। আমি পারবো না,কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি খুব। বারবার মিছিল, মিটিং করতে হচ্ছে এখন এসব অনুষ্ঠানে গিয়ে মেয়েদের নৃত্য দেখার সময় নেই।

কথাটি বলে সামিন নিমন্ত্রণ পত্রটির একটা লেখার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

জামিল মাথা নাড়িয়ে বলে,"ঠিকাছে ভাই। আমি ফোনে জানিয়ে দিচ্ছি।"

"ওয়েট।"

জামিল দাঁড়িয়ে পরে সামিনের কথা শুনে। সামিন নিমন্ত্রণ পত্র থেকে চোখ তুলে জামিলের দিকে তাকিয়ে বলে,"এই কলেজে তো ওই মেয়েটাও পড়ে তাই না?"

_কোন মেয়েটা?

জামিল কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে বলে,"ওও ওই ফটকা মেয়ে আলো? হ্যা,ও এই কলেজেই পড়ে।"

_ওর নাম অদ্রিতা আলো না? ফোর্থ ইয়ার। ডিপার্টমেন্ট অব ইংলিশ?

_হু, কেনো ভাই?

সামিন নিমন্ত্রণ পত্র উঠিয়ে জামিলের দিকে তুলে বলে, স্বেচ্ছাসেবকদের লিস্টে ওর নাম। অনুষ্ঠান হোস্ট করবে সে এবার।

_তো?

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জামিল ইয়াসারের দিকে তাকায়।

_প্রিন্সিপালকে বল আমি যাবো।

সামিন ইয়াসার নিমন্ত্রণ পত্রটির দিকে তাকিয়ে বলে।

জামিল খানিকটা অবাক হয়ে তাকায়। ইয়াসার তার দিকে তাকিয়ে বলে,"ওর আমার ক্ষমতা দেখার খুব শখ। ওকে একটু দেখিয়ে আসবো। কি বলিস?"

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন