#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_৫
#Esrat_Ety
চায়ের কাপে দ্বিতীয় বারের মতো চুমুক দিয়ে কপাল কুঁচকে সেদিকে তাকিয়ে থাকে শমশের ভুঁইয়া। কোন ফাঁকে একটা ক্ষুদ্রাকার মাছি এসে বসে আছে চায়ে। ঠিক বসে নয়, মরে পরে আছে। শমসের ভুঁইয়া তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে মাছিটাকে ঠেলে কাপ থেকে উঠিয়ে একটা টিস্যু পেপারের উপর রাখে। পুনরায় চায়ের কাপ উঠিয়ে মুখের কাছে নেয় চুমুক দেবে বলে। পাশে বসে শমশের ভুঁইয়ার কাণ্ড দেখছিলো তার একনিষ্ঠ কর্মী জায়েদ আলী, বাঁধা দিয়ে বলে,"করছেন কি? আরেক কাপ চা আনিয়ে দিচ্ছি। ওটা রাখুন।"
শমসের ভুঁইয়া জায়েদ আলীর কথা না শুনে চায়ের কাপে তৃতীয় চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রাখে। তার দৃষ্টি টিস্যু পেপারের উপরে রাখা মাছিটার দিকে। এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে জায়েদ আলীকে বলে,"রাজনীতি হলো এই চায়ের কাপের অমৃত চা, তাতে দুয়েকটা মাছি এসে পরবে, স্বাভাবিক। তাই বলে চা টা খাবো না? আলবত খাবো। মাছি গুলোকে পরিষ্কার করে খাবো। যারা যারা রাজনীতি নামের অমৃত সুধা পান করতে চাইবে,তাদের মাছি পরিষ্কার করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।"
কথাটি বলেই শমশের ভুঁইয়া মুখ হাসি হাসি করে ফেলে। নিজের বলা কথাটি তার নিজেরই বেশ পছন্দ হয়। জায়েদ আলী বলে,"মাছি পরিষ্কার করার জন্য তো আপনাকে নোবেল দেওয়া উচিত। যেভাবে আতাউর আলম মাছিটাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিলেন!"
_কি? আতাউর আলম মাছি? হা হা হা। বেশ ! বেশ বলেছো জায়েদ। ও তো একটা মাছিই।
জায়েদ আলী বলে,"পরিকল্পনা টা তো ভালোই করেছিলেন, ঠ্যাং ভেঙে ঘরে পরতে থাকতো। মেয়র হবার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যেত। কিন্তু বেঁচে গেলো কপালের জোরে।"
_হ্যা জায়েদ। ওর কপাল ওকে বারবার সাথ দেয়। কতবার যে বেঁচে গিয়েছে আমার হাত থেকে।
_তবে ভাই উপকারের মধ্যে একটা উপকার হয়েছে, আপনার নাম সামনে আসেনি। মাঝখান থেকে ফেঁসে গিয়েছে সামিন ইয়াসার। আতাউরের মেয়েটা চড় মেরে হুলুস্থুল কাণ্ড করে ফেলেছে দেখেননি। ভাবা যায়? কত সাহস এই মেয়ের। একেবারে বাবার কপি। একটা মামলা ঠুকে দিলেও বেশ হতো ! সময় মতো ওর কানে সামিন ইয়াসারের নামে বিষ ঢেলে কাজের কাজ হয়েছে।
_আতাউরকে যে গাড়িটা ধাক্কা দিয়েছে তার নাম্বার প্লেট দেখেনি তো কেউ?
_নাহ। সুযোগ ই ছিলো না দেখার। ঘুটঘুটে অন্ধকার ছিলো, লোকজন তেমন ছিলো না।
_ওর মেয়েকে কিভাবে ম্যানেজ করেছিলি?
_আতাউর আলমের চাচাতো ভাই খোরশেদ কাজটা করেছে। তবে কিছু পয়সা খরচ করতে হয়েছে। শালা আস্ত দালাল,টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না।
তারপর জায়েদ আলী নিজের মুখটা শমশের ভুঁইয়ার কানের কাছে এগিয়ে এনে বলে,"বলতে বলেছি কিছুদিন আগে আতাউর আলম কিশোর গ্যাং-এর নামে যে আর্টিকেল লিখেছেন,সেটার জের ধরে সামিন ইয়াসার এসব করেছে।"
শমশের ভুঁইয়া পৈশাচিক হাসি হাসে। জায়েদ আলী বলতে থাকে,"মেয়েটা তেজী আর সাহসী হলেও মাথায় বুদ্ধি কম। অন্ধের মতো বিশ্বাস করে ইয়াসারকে চড় মেরে দিয়েছে। হিতে যে বিপরীত হতে পারে বুঝতে পারেনি।"
_ভিডিও করেছিলো কে?
_আমাদের দলের একটা ছেলে।
_আচ্ছা ইয়াসার এতো চুপচাপ আছে কেনো বলোতো? একটা মেয়ের হাতে চড় খাওয়ার পরে তো ওর তুলকালাম কাণ্ড বাঁধানোর কথা ! বিষয়টি বেশ অদ্ভুত লাগছে। যাই হোক ওরা যদি সাপে নেউলে হয়ে যায় তাহলে তো আমারই লাভ। মাঝখান থেকে মণিটা এই সাপুড়ে নিয়ে নেবে। সাপুড়ে শমশের ভুঁইয়া। হা হা হা।
***
আতাউর আলমের চোখ বেঁধে দিতে তার দিকে উদ্যত হচ্ছে আজান। পেছন থেকে আলো তার ভাইকে বলে ওঠে,"আরে ভীতুর ডিম তোকে আব্বুর চোখ বেঁধে ফেলতে বলেছি,কিডন্যাপ করে আনতে নয়। এতো পা টিপে টিপে এগোচ্ছিস কেনো? তাড়াতাড়ি যা।"
আজান আলোর তাগাদা পেয়ে দ্রুত গিয়ে আতাউর আলমের চোখ বেঁধে দেয়। আতাউর আলম চমকে উঠে বলে,"কি হচ্ছে!"
আলো হেসে দিয়ে বলে,"এক মিনিট আব্বু।"
তারপর দৌড়ে গিয়ে জন্মদিনের কেকটা নিয়ে এসে আতাউর আলমের বিছানার পাশে রাখে। সবকিছু সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে আতাউর আলমের চোখ খুলে দিয়ে আলো বলে,"ট্যান ট্যানা! সারপ্রাইজ!"
আজান আয়াত চেঁচিয়ে ওঠে,"শুভ জন্মদিন আব্বু। শুভ বায়ান্নতম জন্মদিন।"
আতাউর আলমের মুখে হাসি ফোটে তার ছেলে মেয়েদের পাগলামি দেখে। বাচ্চাদের মতো কন্ঠে বলে ওঠে,"করেছিস কি!"
আলো তার বাবার মাথায় একটা বার্থডে ক্যাপ তুলে দিয়ে আদুরে কিন্তু নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে,"শুভ জন্মদিন আমার জন্মদাতা পিতা। তুমি হাজার বছর বেঁচে থাকো। আমাদের আগলে রাখো।"
আতাউর আলম হেসে মেয়ের মাথায় হাত রাখে। রেহেনা ঘরের পর্দা সরিয়ে অভিযোগের সুরে বলে,"হ্যারে! তোদের কি চক্ষুলজ্জা বলতে কিচ্ছু নেই? আমার থেকে টাকা নিয়ে কেক-ফেক আনিয়ে আমাকে আর দাদীকে রেখেই খাচ্ছিস! একবার তো মুখের বলাটাও বলতে পারতি!"
আলো লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে। আয়াত বলে,"তোমাদের দুজনকে বলে কি লাভ? বললেই তো বলতে এইসব জন্মদিন পালন করা হারাম,হারাম।"
রেহেনা বেগম ঘরে ঢুকে আয়াতের কান মলে দিয়ে বলে,"এসব হারাম হালালের পার্থক্য যদি বুঝতি তাহলে শুধু শুক্রবার মসজিদে যেতি না জিলিপির লোভে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তি। আরেকটাকে দেখো, চুল খোলা রেখে বাইরে যায়। বেগানা পুরুষদের সব দেখিয়ে আসে। ফাজিল মেয়ে কোথাকার।"
কথাটি বলে আলোর দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকায় রেহেনা।
আতাউর আলম তার স্ত্রীকে বলে,"রেহেনা তোমাকে বোধ হয় মা ডাকছে। যাও গিয়ে দেখো।"
রেহেনা বলে,"কই আমি তো শুনিনি।"
_আমি শুনেছি। যাও যাও, তারাতাড়ি যাও।
রেহেনা চিন্তিত মুখ নিয়ে শাশুড়ির ঘরের দিকে যায়। আজান বলে,"আধা ঘন্টায় থামানো যেতো না বাবা!"
আলো ছুড়ি এনে বাবার হাতে দিয়ে বলে,"নাও এবার কেক কাটো। আমার খুব খিদে পেয়েছে।"
আতাউর আলম হেসে আলোর হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে কেক কাটে, তারপর একে একে তার তিন ছেলেমেয়েকে কেক খাইয়ে দেয়।
***
আজ থেকে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছে সামিন ইয়াসারের লোকজন। দুপুর পর্যন্ত দলের কর্মীদের নিয়ে শহরের তিনটা মহল্লায় চক্কর দিয়ে এসেছে। সূর্য্যের তাপটা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। সামিন ইয়াসারের কপাল বেয়ে টপটপ করে নোনা জল গড়িয়ে পরছে। পাঞ্জাবির বুক এবং পিঠের দিকটা ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে। এসবের অভ্যাস তার আছে কিন্তু আজ একটু বেশিই কাহিল হয়ে পরেছে সে। বাড়ি থেকে ইশিতা বারবার ফোন দিচ্ছে। ফোনটা সাইলেন্ট করে পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে রাখতে তার দলের ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলে," কি? কি বুঝলি? জনগণের রেসপন্স কেমন?"
_ভাই এভাবে তো কিছু বোঝা যায়না। তবে আশি শতাংশ নিশ্চিত এরা আপনার দিকে ঝুঁকে আছে। আপনার মতো তরুণ জননেতাকে রেখে শমশের ভুঁইয়া আর ওই আতাউর আলমের মতো দুটো বুড়োকে কে ভোট দেবে?
সামিন ইয়াসার আরাফের কথাতে বেশ স্বস্তি পায়। একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে বলে,"আজ এখানেই থাকবে নাকি?"
জামিল বলে,"না ভাই। যতক্ষন শরীরে হাঁটার শক্তি থাকবে ততক্ষণ থামা যাবে না। কাল থেকে হয়তো আতাউর আলম নামবে তার লোকজন নিয়ে। এভাবে বসে থাকলে হবে না।"
_গুড। তুই আমার যোগ্য কর্মী জামিল। তোর ছেলে হলে তোকে একটা মটরসাইকেল দেবো।
"কিন্তু জামিল ভাইয়ের তো মেয়ে হবে।"
সবুজ কথাটি বলে ইয়াসারের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইয়াসার বলে,"মেয়ে হলে ওর মেয়েকে স্বর্নের আংটি দেবো। ছেলে হলে মটরবাইক,মেয়ে হলে অলংকার।"
জামিল ইয়াসারের কথায় খুশি হয়। ইয়াসার একবার হাতঘড়িতে সময় দেখে বলে,"ঐ মেয়েটার আপডেট কি?"
সবাই ইয়াসারের কথা শুনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে। রাহাত ফিসফিসিয়ে সবুজকে বলে,"ভাই দিনে যতবার ওই মেয়েটার নাম নেয় আমরা দিনে ততবার নিজেদের বৌয়ের কথাও ভাবি না।"
_হুস।
ঠোঁটে আঙুল দিয়ে রাহাতকে চুপ করিয়ে দেয় সবুজ। নিচু স্বরে বলে,"ভাইয়ের "চটকনা" খাওয়ার শখ হইছে? ওই মেয়েটার ওপর ভাই ভীষণ ক্ষ্যাপা। আমি ভাইকে আট বছর ধরে চিনি। এতো সহজে ভাই মেয়েটার পিছু ছাড়বে না।"
ইয়াসার গম্ভীর কন্ঠে বলে,"কি সমস্যা? মেয়ে মানুষের মতো গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করছিস কেনো? কি কথা হচ্ছে?"
সবুজ আর রাহাত দু'জনে মাথা নেড়ে বলে,"তেমন কিছু না। সাংসারিক কিছু আলাপ ভাই।"
_কি আলাপ? তেল লাগবে,নুন লাগবে,আটা লাগবে এসব? কতবার বলেছি এইসব স্ত্রীলোকের মামলায় জরাবি না। জীবনটা ভাজাভাজা করে দেবে। আমার মতো চিরকুমার থাকার শপথ নে। তখন শুনলি না।
জামিল কথার মাঝখানে বলে ওঠে,"ভাই মেয়েটাকে নির্বাচনের পরে দেখে নিলে হয়না? দেখার তো মেলা সময় পাবেন।"
_না। ওর খবরাখবর নিয়মিত আমি চাই। কথাটা দ্বিতীয়বার মনে করাতে চাই না আমি।
দলের ছেলে গুলো মাথা নাড়ায়। একজন মেয়র পদপ্রার্থী, বিশিষ্ট জননেতা হাত ধুয়ে একটা পাঁচ ফুটিয়া মেয়ের পেছনে পরে আছে সেটা মানতে ইয়াসারের একনিষ্ঠ ভক্ত এবং কর্মীদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু ভাইয়ের কথা না শোনার মতো ভুল তারা করবে না। দলের সাধারণ সম্পাদকের পদটা যে সবার চাই!
***
মাথায় কারো হাতের স্পর্শ পেয়ে আলোর ঘুম কেটে যায়। পড়তে পড়তে কখন সে বইয়ের ভেতরে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পরেছিলো তা সে জানেনা। গত সপ্তাহে যত নির্ঘুম রাত সে কাটিয়েছে তার খেসারত তাকে এখন দিতে হচ্ছে। সামনে প্রথম ইনকোর্সের ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে ডিপার্টমেন্ট। পড়াশোনার ভীষণ চাপ। মাথা তুলে তাকাতেই দেখে আতাউর আলম তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো হাই তুলে বলে,"টের পাইনি আব্বু।"
আতাউর আলম একটা চেয়ার টেনে মেয়ের পাশে বসে। আলো সামনে খুলে রাখা বইটা বন্ধ করে বইয়ের সাড়িতে সাজিয়ে রেখে বলে,"কিছু বলতে এসেছিলে?"
আতাউর আলম নরম গলায় বলে,"সেদিন রাগের মাথায় অত বড় একটা পদক্ষেপ নিয়ে ফেললি আম্মু। আমার ভীষণ চিন্তা হচ্ছে।"
আলো একটা হাসি দিয়ে বলে,"তুমি ভয় পাচ্ছো? আতাউর আলম ভয় পাচ্ছে?"
_ঠিক ভয় না মা। তুই একটা মেয়ে। আর ওরা যা ভয়ংকর।
_ভয় পেও না। ভুলে যেও না তোমার মেয়ে কারাতে জানে। জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয়।
আতাউর আলম মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেলে। হাসি থামিয়ে মেয়েকে বলে,"সব সময় গায়ের জোরে কাউকে বিপদে ফেলতে হয় না মা। বিপদে আরো অনেক ভাবে ফেলা যায়।"
আলো বাবার দিকে তাকায়। সত্যিই তো! সেদিন তো ইয়াসার তাকে গায়ের জোরে হেনস্থা করেনি। তার সাথে ছলনা করে তাকে দিয়ে পা ধরিয়েছে।
আতাউর আলম বলে,"সাত বছর আগে ওদের পরিবার নিয়ে যে আর্টিকেল টা বের করেছিলাম তার জন্য ওদের ডাউনফল শুরু হয়। ইয়াসারের মেজো ভাইটার নামে শ্লীলতাহানির মামলা হয়েছিলো। টাকা দিয়ে বিষয় টা ধামাচাপা দিয়ে দিয়েছিলো ইমতিয়াজ মির্জা। গ্রাম থেকে একটা গরীব ঘরের মেয়েকে ধরে এনে ওর সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় যাতে একটু শোধরায় ছেলেটা,শুধরেছে কিনা জানিনা তবে পলিটিক্স থেকে দূরে সরে গিয়েছে। এখন শুধু সামিন ইয়াসার একাই পলিটিক্সের সাথে যুক্ত। ওরা তিন ভাই এক বোন। ছোটোজনকে কখনো দেখিনি,শুনেছি বিদেশে পরে আছে। আমেরিকাতে।
ইমতিয়াজ মির্জার ছোটো ভাই নিজের ভাইয়ের নাম ব্যবহার করে পুরো শহরে আতঙ্ক সৃষ্টি করে বেরাতো। আর্টিকেল টা বের হবার পরে জনগণ ভীষণ ক্ষেপে যায়। ফলশ্রুতিতে এমপি পদ হারিয়ে ঘরে বসে থাকে ইমতিয়াজ মির্জা। সবকিছুর সাথে আমি জড়িত ছিলাম। ওদের শত্রুও বলা যায়।
_জানি তো এসব কথা। আবার বলছো কেনো? আর তুমি চিন্তা করো না আমার জন্য। কিচ্ছু হবে না আমার। আচ্ছা ইমতিয়াজ মির্জার ছোটো ভাই এখন কোথায়?
_ইশতিয়াক? কোথায় আবার। পালিয়েছে কানাডা। আর দেশে ফেরেনি। এতো কিছুর পরে ইয়াসার মির্জাকে জনগণ কিভাবে গ্রহণ করে নিচ্ছে সেটাই বুঝতে পারছি না।
_কেনো আবার? সবটাই তো টাকা আর জনগণের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। ছাত্রনেতা বলে কথা।
_হ্যা ঠিক বলেছিস। ওদের অনেক টাকা। রিয়েলস্টেটের বিজনেস থেকে প্রচুর উপার্জন হয়।
আলো কিছু বলবে তার আগে ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। আলো অনায়াসেই বুঝতে পেরে যায় ফোনটা কে দিচ্ছে। একটা হাত বাড়িয়ে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখে আলো। আতাউর আলম বলে,"কে ফোন দিয়েছে? কথা বল।"
_গ্রামীনফোনের অফিস থেকে। তুমি বলো।
_না,আর কি বলবো। কাল তো তোর কলেজে প্রোগ্রাম আছে। এখন ঘুমিয়ে পর। বেশি রাত জেগে পড়ার দরকার নেই। আমার কাছে সিজিপিএ ডাজ নট ম্যাটার এট অল!
আলো হেসে তার আব্বুকে শুভরাত্রি বলে। আতাউর আলম চলে যেতেই তড়িঘড়ি করে দরজা বন্ধ করে ফোন বের করে ইশমামকে ভিডিও কল দেয়। রিং বাজার সাথে সাথে ফোনটা রিসিভ করে রেখে দেয় ইশমাম। আলো লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে,"মুখটা দেখাও প্লিজ। তোমার রুমের এসি দেখে কি করবো? আজ আমাদের বাসায় এসি নেই বলে শো অফ করছো নাকি?"
ইশমাম ফোনটা মুখের সামনে নেয়। অভিমানী গলায় বলে,"কোথায় ছিলে? এতক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছি।"
_আব্বু ছিলো পাশে।
_তো ? আব্বুকে বলতে পারতে না যে আব্বু তুমি যাও তোমার হবু জামাই ফোন দিচ্ছে,আমি কথা বলবো!
আলো হাসে। ইশমাম বলতে থাকে,"সবসময় আমাকে বলো। অথচ তুমি নিজেই তো তোমার পরিবারকে ভয় পাও। তাদের কেনো বলো না আমার কথা?"
আলো মাথা চুলকে বলে,"আম্মু জুতাপেটা করবে।"
_আচ্ছা জুতাপেটা হতে হবে না।
কিছুক্ষণ দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর আলো বলে,"আমার না তোমার চেহারাটা খুব কমন লাগে ইশমাম। কার সাথে যেন খুব মিল।"
ইশমাম মৃদু হেসে বলে,"হতেই পারে। পৃথিবীতে একই চেহারার সাতজন থাকে,জানো না?"
_একটা ব্যাপার বেশ হাস্যকর। আমাদের দুজনের সামনাসামনি কখনো দেখা হয়নি। ব্যাপার টা যুগ অনুযায়ী কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
_একটুও না। যে শুনবে সেই হাসবে। ভাববে আমরা কত বোকা।
_আচ্ছা তোমার বাবার কথা বলেছিলে টিচার। তো উনি কি রিটায়ার্ড করেছেন?
ইশমাম চুপ করে থাকে। তার গলায় কথা আটকে আটকে আসছে। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে বলে,"না।"
আলোকে কিছু বলতে না দিয়ে পুনরায় বলতে থাকে,"একটা কথা বলি অদ্রিতা?"
_হুম, বলো।
_নাহ কিছু না। আচ্ছা ঘুমাও এখন। কাল তো তোমার কলেজে প্রোগ্রাম হোস্ট করতে হবে। রাখছি। বাই!
ইশমাম ফোন কেটে দিলে আলো ঘুমানোর প্রস্তুতি নেয়। অপরপাশে সুদূর ফ্লোরিডায় নিজের ডরমেটরিতে,ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে দুচোখ বন্ধ করে থাকে ইশমাম। অদ্রিতা আলো নামের মেয়েটির সাথে প্রথম পরিচয়ের দিনগুলো স্মৃতিচারণ করতে থাকে সে।
করোনা মহামারীর সময়ে একটা অনলাইন ফোরামে আয়োজিত একটা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় তারা দুজনেই ছিলো প্রতিযোগী। বাংলাদেশী মেয়ে শুনেই খানিকটা কৌতুহলী হয়ে অদ্রিতা আলোর সাথে আলাপ চারিতায় জরিয়েছিলো ইশমাম। হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করলো সাংবাদিক আতাউর আলমের মেয়ে আলো। ততদিনে আলোর প্রতি তীব্র ভালোলাগার অনূভুতি, ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছিলো। ইশমাম বরাবর সবার কাছে নিজের পরিবার নিয়ে কথা কম বলে,নিজের বাবা-চাচাদের পরিচয় দিতে তার আত্মগ্লানি হয়। আলোর কাছে নিজের আসল পরিচয় দিতে গিয়েও দেয়না। সাংবাদিক আতাউর আলমের মেয়ে আর যাই করুক মির্জা বাড়ির ছেলের সাথে সম্পর্কে জড়াতে চাইবে না। এবং এটাই সত্যি,আলো মির্জাদের ঘৃণা করে, প্রচন্ড ঘৃনা করে।
যত দিন যাচ্ছে ইশমাম টের পাচ্ছে সে নিজেই নিজের মিথ্যে জালে আটকা পরছে। কি হবে সামনে? অদ্রিতা সবটা টের পেলে কি করবে? বড় ভাইয়াকে ইশমাম কিভাবে মানাবে? সবটা ভেবে ইশমামের হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছে।
চলমান........