#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে
#পর্বসংখ্যা_১৫
#Esrat_Ety
ইশমাম আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলোর চোখ মুখ তীব্র ক্ষো'ভে ফে'টে পরতে চাইছে। ইশমাম এক কদম সামনে এগোতেই আলো দুই কদম পিছিয়ে গিয়ে রাগে ফুঁ'স'তে থাকে। ইশমাম আলোর পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে নরম সুরে বলে,"এসব কিভাবে হলো অদ্রিতা?"
_বেড়িয়ে যাও তুমি। বেড়িয়ে যাও।
_অদ্রিতা...
আলো ইশমামের দিকে তে'ড়ে যায়, চেঁচিয়ে বলতে থাকে,"লজ্জা করে না? লজ্জা করে না ভাইয়ের বৌয়ের ঘরে পারমিশন না নিয়ে ঢুকতে?"
আলোর কথায় ইশমাম চোখ নামিয়ে নেয়। আলো একবার দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটার দিকে তাকিয়ে ইশমামের দিকে তাকায়। বিড়বিড় করে বলতে থাকে,"সেজন্যই এতো মিল। সেজন্যই সামিন ইয়াসার মির্জার নামে কোনো বা'জে কথা শুনতে পারতে না তুমি। আমারই ভুল। আমিই বোকা। আমিই বুঝতে পারিনি।"
ঝরঝর করে কেঁ'দে দেয় আলো।
_ঘৃ'ণা করো না আমাকে অদ্রিতা। তোমাকে হারাতে চাইনি আমি। তাই বলিনি সত্যিটা।
ইশমামের এই কথায় আলো দুচোখে পানি নিয়েও তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে,তেজী কন্ঠে বলে ওঠে,"হারাতে চাওনি? হারিয়ে তো ফেলেছো! বেশ হয়েছে। বেশ হয়েছে। এটাই তোমার উচিত শিক্ষা।"
ইশমাম আহত চোখে আলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। আলো বলতে থাকে,"বাবা টিচার, মা গৃহিণী। বাবা মা সম্পর্কে মিথ্যা বলতে বাঁধলো না একটুও? তুমি তো সামিন ইয়াসার মির্জার চেয়েও নি'কৃ'ষ্ট। ছ'ল'না করে পেতে চেয়েছিলে আমায়। নাকি কখনো চাওনি। ভেবেছিলে কিছুদিন টাইম পাস করে ছেড়ে দিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাবে। অদ্রিতা নামের বোকা মেয়েটা টেরই পাবেনা।"
_অদ্রিতা।
ইশমাম আর কিছু শুনতে চাইছে না আলোর মুখে। আলো বলতে থাকে,"ধিক্কার জানাই তোমাকে। তোমার থেকে তো সামিন ইয়াসার ঢের ভালো। যা করেছে সামনাসামনি করেছে, তোমার মতো প্রতারনা করে....."
আর কিছু বলতে পারে না আলো। পুরো শরীর ভেঙ্গে কান্না আসছে। কাঁ'দ'তে কাঁ'দ'তে মেঝেতে বসে পরে। ইশমাম আলোর দিকে অসহায়ের মতো দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত পরে কান্নাটা দ'মি'য়ে আলো বলে ওঠে,"একেবারে সামিন ইয়াসার মির্জার হাতে গড়া পা'ষ'ণ্ড তুমি। একবারও ভাবলে না একটা মেয়ের ইমোশন নিয়ে এভাবে খেলা ঠিক না। কি উদ্দেশ্যে ছিলো বলো? তুমি ভালো করেই জানতে তুমি মির্জা বাড়ির ছেলে জানতে পারলে আমি তোমাকে বরদাস্ত করবো না তবুও কোন উদ্দেশ্য,কোন আশায় তুমি রিলেশন কনটিনিউ করেছিলে? বলো!"
ইশমাম কিছু বলে না। আলো চেঁচাতে থাকে,"বেড়িয়ে যাও, বেড়িয়ে যাও এখান থেকে। ওই মুখ আমি দেখতে চাই না। বেড়িয়ে যাও প্র'তা'র'ক।"
শেষের কথাটা অত্যন্ত উচ্চস্বরে বলে আলো। নিচতলা থেকে আলোর চি'ৎ'কা'র শোনা যাচ্ছে। ইশিতা রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"কাকে বেড়িয়ে যেতে বলছে?"
রিতু চিন্তিত ভঙ্গিতে সামিনের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ইশমাম ধীরপায়ে ঘর থেকে বের হয়। রিতু অবাক হয়ে ইশমামের দিকে তাকিয়ে আছে। ইশমাম রিতুর দৃষ্টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
***
লিভিং রুমে ঢুকে সামিন দাঁড়িয়ে পরে। ইশিতা আর রিতু তার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"জ্ঞান ফিরেছে? ডাক্তার কি বলেছে?"
_ডাক্তার দেখানোর প্রয়োজন হয়নি। জ্ঞান তার আগেই ফিরেছে। একটু আগে গিয়ে দেখি জ্বর এসেছে হঠাৎ।
"ও"
শুকনো মুখে বলে সামিন সিঁড়ির দিকে যায়। তারপর দাঁড়িয়ে রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"ইশমাম কিছু খেয়েছে?"
_কি আর খাবে ভাইজান। বড় ভাবী যে ব্যাবহার টা করলো তারপর আর খাবার পেটে যায়?
"মানে?"
গম্ভীর কন্ঠে শব্দটি উচ্চারণ করে সামিন,ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ফুলির মায়ের দিকে।
ফুলির মা বলতে থাকে,"জ্ঞান ফেরার পরে মে'জা'জ দেখাইয়া আমাদের সবাইরে ঘর থিকা বাহির কইরা দিলো। ইশমাম ভাইয়া ভাবীরে দেখতে গেছিলো ঘরে,ভাবী খুব বাজে ব্যবহার কইরা ইশমাম ভাইয়ারে ঘর থেকে বের কইরা দিছে। ইশমাম ভাইয়া সেই যে ঘরের দরজা বন্ধ করছে এখনো খোলে নাই। কেউ ডাকলেও সাড়া দিতেছে না ভাইজান।"
সামিনের রাগ উঠে যায়। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে চলে যায়। ইশিতা ফুলির মাকে ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"বেশি কথা বলো তুমি!"
দরজা খোলা। সামিন একবার উঁকি দিয়ে আলোকে দেখে নেয়। গুটিসুটি মেরে মাথা নিচু করে বিছানায় বসে আছে চুপচাপ। ঘরে না ঢুকে সামিন সোজা ইশমামের ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজায় টোকা দিয়ে বলে,"ছোটো।"
ইশমাম কোনো সাড়া দেয়না। সামিন জোরে ডাকতে থাকে,"ছোটো দরজা খোল।"
কিছুক্ষণ পর ইশমাম দরজা খুলে দেয়। সামিন তার ভাইকে দেখে। কেমন বিধ্বস্ত রূপ ধারণ করেছে ইশমামের মুখ। সামিন বলে ওঠে,"কি বলেছে ও তোকে? গা'লা'গা'ল করেছে?"
ইশমাম ধীরে ধীরে চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকায়। সামিন বলে,"তুই নিচে চল। খাবি।"
_ভাইয়া তুমি যাও। আমি খাবো না এখন।
নিস্তেজ কন্ঠে জবাব দেয় ইশমাম। সামিন ধমকের সুরে বলে,"খাবি না মানে? তুই কেনো খাবি না। ও অন্যায় করেছে। ওকে শাস্তি পেতে হবে। তুই নিচে চল। চল বলছি।"
সামিন ইশমামকে জোর করে নিচে পাঠিয়ে দেয়। ইশমাম রোবটের মতো হাটছে, জগতের কোনো কিছুর দিকে তার কোনো হুস নেই যেন।
ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দিয়ে আলোর দিকে রা'গী দৃষ্টিতে তাকায় সামিন। আলো সামিনের অস্তিত্ব টের পায় কিন্তু মাথা তুলে তাকায় না। সামিন আলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে তার শক্ত হাতে আলোর থুতনি ধরে মুখটা উঁচু করে আলোর চোখের দিকে তাকায়। আলোর চোখ দু'টো দেখে সামিন থ'ম'কে যায়। দেখেই মনে হচ্ছে কাঁদছিল এতক্ষণ। সামিনের হুট করে রা'গ পরে যায়। আলোর থুতনি থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বিছানায় একপাশে বসে পরে। ভেবেছিলো ধ'ম'কে নিয়ে যাবে কিন্তু আলোকে দেখে আর ধ'ম'কা'তে ইচ্ছে করছে না। নিচু স্বরে বলে,"আমার সাথে জড়িত সব মানুষকে তুমি ঘৃণা করো ঠিকাছে, ইশমাম নতুন মানুষ। আমার কোনো অন্যায়ের আগে পিছে ও নেই। একটু ভদ্রতা বজায় রাখা যেত না?"
আলো চুপ করে থাকে। সামিন নিজেকে নিজে বলে,"কাকে কি বলছি। সোজা আঙ্গুলে এই ঘি কখনোই উঠবে না। জানা কথা।"
বাইরে খুব বৃষ্টি হচ্ছে। সামিন উঠে দাঁড়িয়ে আলোর হাত ধরে। আলো সামিনের দিকে তাকায়। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"চলো আমার সাথে।"
***
"আজ হঠাৎ এলি যে!"
পরী পেছন থেকে বাবার ডাক শুনে দাঁড়িয়ে পরে। ছাতাটা একটু উঁচুতে তুলে বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,"ইশিতা আপু ডেকেছে। আর ক্লাসও ছিলো না আজ।"
পোনা বলে,"ও।"
পরী ধীরপায়ে হেটে সদর দরজার দিকে যায়। ছাতাটা পোর্চের নিচে পানি ঝরার জন্য রেখে দেয়। গায়ের ওড়নাটা ঠিক ঠাক করে ভেতরে ঢোকে। করিডোর পেরিয়ে লিভিং রুমে ঢুকতেই দেখতে পায় সিঁড়ি বেয়ে নামছে ইশমাম। পরী থ'ম'কে দাঁড়িয়ে পরে। চার বছর আগের দেখা ইশমাম ভাইয়ের সাথে এই লোকটার বিস্তর ফারাক। স্বাস্থ্যও কিছুটা ভালো হয়েছে। পরীর ভাষ্যমতে আগে খ্যাংরা কাঠির মতো দেখতে ছিলো। আগে গালে মাংস ছিলো না বলে চোখ দুটো বড় বড় লাগতো। এখন গাল দুটো বেশ ভরাট তাই চোখ দুটোকে ছোটো লাগছে। অবশ্য একটা জিনিস বদলায় নি। ইশমামের মুখের বিধ্বস্ত অবস্থা। এই লোকটা সবসময় মুখ এমন করেই রাখে। দেখলে মনে হয় সকাল থেকে বাথরুম আটকে রেখেছে সিরিয়াল পায়নি বলে,আর পাঁচ মিনিট দেরী হলে বিরাট বড় কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সেই টেনশনে সে অস্থির!
ইশমাম নিচে নামতেই পরী অনেকটা জড়তা নিয়ে বলে,"কেমন আছেন ইশমাম ভাইয়া।"
ইশমাম পরীর দিকে একপলক তাকিয়ে শুকনো গলায় বলে,"ভালো।"
এতোটুকু বলে সে ডাইনিং-এর দিকে চলে যায়। পরী ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। সব কিছু বদলে গেলেও এই মহাশয়ের ব্যাবহার একটুও বদলায় নি। কেউ কেমন আছেন জিজ্ঞেস করলে তাকেও যে জিজ্ঞেস করতে হয় সেটা এই লোকটা এখনো শেখেনি। কিংবা যতটুকু জানতো আমেরিকায় গিয়ে সব খেয়ে বসে আছে। পরী কপাল কুঁচকে দোতলায় ইশিতার ঘরের দিকে যায়। সে থোরাই কেয়ার করে এসব রামগরুরের ছানাদের।
***
আলোর হাত ধরে টানতে টানতে সামিন ডাইনিং টেবিলের সামনে এনে দাড় করায়। ইশমাম মাথা নিচু করে বসে আছে। সামিন একটা চেয়ার টেনে ইশমামের পাশে বসে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"আমার ভাই এখন ভাত খাবে। তুমি ওর বড় ভাবী। ওর প্লেটে মাংস তুলে দাও।"
ইশমাম ভাইয়ের দিকে তাকায়। তার দৃষ্টি এলোমেলো। আলো শুকনো মুখে সামিনের দিকে একবার তাকিয়ে ইশমামের দিকে তাকায়। সামিন বলে,"হা করে দেখছো কি? এ বাড়ির বৌ তুমি, তোমার দেবর খেতে বসেছে। তার প্লেটে মাংস তুলে দাও।"
আলো হাত বাড়িয়ে মাংসের বাটি ধরে। আবারো চোখ তুলে একবার ইশমাম, একবার সামিনকে দেখে। ঘৃণায় একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় তার ভেতর থেকে। সামিনকে হতবাক করে দিয়ে আলো মাংসের বাটি উল্টে দেয় ইশমামের প্লেটে। তারপর মাছ ভাজার বাটি, তারপর রোস্টের বাটি, তারপর দইয়ের বাটি। সবকিছু ঢেলে দেয় ইশমামের প্লেটের উপর।
ইশমাম নিজের প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, হতভম্ব ভাব কাটিয়ে কিছু বলার আগেই আলো চলে যায় সেখান থেকে।
রিতু দৌড়ে এসে সামিনকে শান্ত করে বলে,"ও ভাইয়া। ভাবীর শরীর ভালো নেই। জ্বর গায়ে। খামোখা তাকে জোর করবেন না প্লিজ। আমি দিচ্ছি ইশমাম ভাইয়াকে খাবার বেড়ে।"
ইশমামের সামনে থেকে সবকিছু পরিষ্কার করে রিতু নতুন করে খাবার বাড়তে শুরু করে। ইশমাম পাথরের মতো বসে আছে। সামিন বলে,"তুই খা।"
ভাইয়ের কথায় বাধ্য ছেলের মতো ইশমাম কিছুটা খেয়ে হাত ধুয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"আমি ঘরে যাই ভাইয়া? খুব ঘুম পাচ্ছে! বড্ড ক্লান্ত আমি!"
***
ঘরে ঢুকে দরজার সিটকিনি তুলে দিয়ে সামিন আলোর দিকে তাকায়। আলো তার দিকে তাকিয়ে আছে। তাকে দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে গায়ে জ্বর বেড়েছে। আলোর দিকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"আমি ভুলে গিয়েছিলাম তুমি ভরা জনসভায় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতার গালে চ'ড় মেরে দেওয়া মেয়ে,তোমাকে এতো সহজে পোষ মানানো যাবে না।"
_পোষ মানিয়ে কি করবেন? আপনার বাড়ি, আপনার ঘর, আপনার রাজত্ব, আপনার পোষা লোক সব, আপনার ক্ষমতা,আপনার গায়ের জোর। পোষ মানার ধার ধারেন কেনো?
আলোর কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। সামিন আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলোর পুরো শরীর জ্ব'লে যাচ্ছে। নিজেকে কিছুটা ধাতস্থ করে বলে,"কেনো বিয়ে করেছেন? চেহারা দেখার জন্য নয় নিশ্চই। কিসের অপেক্ষা করছেন আপনি। কেনো নিজের স্বার্থ হাসিল করে আমাকে ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না? তাহলেই তো পুরোপুরি প্রতিশোধ নেওয়া হয়ে যায়। আমিও মুক্তি পাই। আমি আপনার এই কা'রা'গা'র থেকে মুক্তি চাই ইয়াসার মির্জা। না আমি আপনাকে কখনো স্বামি হিসেবে মানবো,না আপনি আমায় কখনো স্ত্রী হিসেবে পাবেন। যদি আমাকে লা'ঞ্চি'ত করার ইচ্ছে থাকে,করে আমাকে মুক্তি দিন। আমি আপনার কাছে অনুরোধ করছি ইয়াসার মির্জা। আলো আপনার কাছে হার স্বীকার করে নিলো আজ । আমি শুধু মুক্তি চাই। আপনি, আপনার বাড়ির প্রত্যেকটা লোকের মুখ আমি দেখতে চাই না। দয়া করে মুক্তি দিন আমায়। কথা দিচ্ছি আমার পরিবার নিয়ে আমি খুলনা চলে যাবো আজীবনের জন্য। আর কখনো আপনার সাথে লাগতে আসবো না। কখনোই না।"
উন্মাদের মত ঘোর লাগা কন্ঠে আলো বলে কথা গুলো। জ্বরে তার গা পু'ড়ে যেতে চাইছে। সামিন আলোর চোখের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে হুট করে আলোর কপালে হাত দেয়। প্রচন্ড গরম আলোর শরীর। চোখ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। আলো সামিনের হাত সরিয়ে দেয় নিজের কপাল থেকে। সামিন বলে,"এখন হাত সরিয়ে দিচ্ছো কেনো? এই মাত্র কতকিছু বললে। আমি যেন আমার যা ইচ্ছা করে তোমাকে ছু'ড়ে ফেলে দেই।"
আলো শাড়ির আঁচল খামচে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। অস্ফুট স্বরে বলে,"আপনি খারাপ,আপনারা সবাই খারাপ। জঘন্য আপনারা।"
_নতুন কথা না এটা। তোমার গায়ে ভীষণ জ্বর। চুপ করে বসে থাকো। আমি ওষুধ নিয়ে আসছি।
_চাই না আপনার দয়া। উপহাস করবেন না আর আমার সাথে। আল্লাহ কে ভয় করুন ইয়াসার মির্জা।
সামিন চুপ করে থাকে। আলো ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতে চায়। সামিন হাত দিয়ে আলোর পথ আটকে বলে,"বিছানায় শুয়ে রেস্ট নাও। বাইরে তোমার কোনো কাজ নেই।"
আলো ঘৃণার চোখে সামিনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জে'দ দেখিয়ে ছুটে বারান্দায় চলে যায়। বাইরে প্রচুর বৃষ্টি পরছে। নিমিষেই ভিজে যায় আলো। সামিন আলোর পিঠের দিকে তাকিয়ে আছে। আলো একটু পর পর কেঁ'পে কেঁ'পে উঠছে, হয়তো প্রচন্ড জ্বরে, হয়তোবা কান্না করছে। কিছু সময় যেতে সামিন একটা ছাতা নিয়ে বারান্দায় যায়। গিয়ে আলোর পাশে দাঁড়িয়ে আড়চোখে আলোকে দেখে। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে আলো। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"ভেতরে চলো আলো। তোমার গায়ে জ্বর।"
আলোর নীরবতা সামিনের রাগ উঠিয়ে দেয়। সামিন ধমকে ওঠে,"আলো আমার জেদ সম্পর্কে তোমার কোনো ধারণা নেই। কিছুই দেখাইনি তোমায় এখনো। চুপচাপ ভেতরে চলো।"
আলো নিশ্চুপ। সামিন দাঁতে দাঁত চেপে ছাতাটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ঝড়ো হাওয়া ছাতাটাকে উড়িয়ে নিয়ে বাগানে ফেলে দেয়। নিজেও ভিজে যায় সামিন।
তারপর আলোকে টানতে থাকে। আলো সামিনকে ধা'ক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ক্ষেপে গিয়ে সামিন আলোকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়। আলো পুরুষালি শক্তির সাথে পেরে ওঠে না। সামিনের বুকে অনবরত কি/ল ঘু/ষি মা'র'তে মা'র'তে ডুকরে কেঁ'দে ওঠে সে। সামিনের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ঘরে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দেয় আলোকে সামিন। তারপর আলমারি থেকে একটা শাড়ি বের করে এনে আলোর হাতে দিয়ে বলে, "আমি ওষুধ আনতে যাচ্ছি। দশমিনিট পরে এসে দেখি যেন শাড়িটা পাল্টানো হয়ে গিয়েছে নাহলে আমি কি করবো আমি নিজেও জানি না আলো।"
তেজী কন্ঠে কথাটি বলে সামিন ঘরের বাইরে চলে যায়। আলো অসহায়ের মতো কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে হাতের শাড়িটার দিকে তাকায়।
***
জ্বর বেড়ে গিয়েছে। নিঃশ্বাস নিতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তার। কাঁপা কাঁপা হাতে শাড়ীর কুচি ঠিক করে আঁচল তুলে দেয় শরীরে। পেছন থেকে আঁচলের অগ্রভাগ ডান কাঁধে টেনে নেয়। প্রচন্ড শীত লাগতে শুরু করেছে। ওয়াশ রুম থেকে বের হয় বিছানায় গিয়ে কিছুক্ষণ গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। একটু পরে আর বসে থাকতে না পেরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। কিছু সময় চলে যেতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় আলো।
ওষুধ নিয়ে এসে সামিন দেখে আলো ঘুমিয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ আলোর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ওষুধের বক্সটা বিছানার সাথে লাগোয়া টেবিলে রাখে। তারপর আবারো আলোর মুখের দিকে তাকায়। জ্বরে চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। সামিন মনে মনে নিজেকেই নিজে বলে ওঠে,"কি চাচ্ছো তুমি সামিন ইয়াসার! এই মেয়েটার তেজ কমিয়ে দিতে তোমার দুমিনিট সময় লাগবে না। অথচ তুমি তার সাথে এতো সভ্যতা দেখাচ্ছো। মেয়েটার কাছে নিজেকে ক্লিন রাখার এতো কেনো দায় তোমার। ও তো তোমার স্ত্রী, তোমার সম্পত্তি! জোর করে বিয়ে করেছো, তাহলে এখন কেন এতো ভদ্রতা দেখাচ্ছো!"
***
বন্ধ করে রাখা সিলিং ফ্যানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ইশমাম। তারপর উঠে বসে ল্যাপটপে হাত দেয়। আমেরিকাতে তার বেস্ট ফ্রেন্ড এ্যালেক্স কে একটা মেসেজ লিখতে থাকে সে। ইংরেজীতে লেখা মেসেজটির অর্থ হলো,"ছোটো বেলা থেকে আমি সবসময় ভাইয়ার দামী টি-শার্ট,দামী জুতা,দামী ঘড়ি ভাইয়ার থেকে কেড়ে নিয়েছি এ্যালেক্স, কখনো কখনো বলার প্রয়োজনও বোধ করিনি। ভাইয়ার পছন্দের সব জিনিস আমি পছন্দ করে ফেলতাম। ভাইয়াকে না জানিয়ে সেগুলো নিয়ে নিতাম। ভাইয়া কখনো প্রতিবাদ করতো না এ্যালেক্স। ভাইয়া আমাকে ভালোবাসে তাই প্রতিবাদ করতো না। আমিও ভাইয়াকে ভালোবাসি। আজ ভাইয়া সেই সবকিছুর শোধ একসাথে তুলেছে এ্যালেক্স। আমার পছন্দের মানুষটাকে আমায় না জানিয়ে নিয়ে নিয়েছে ভাইয়া। আমার কি প্রতিবাদ জানানো উচিত এ্যালেক্স?"
মেসেজটা পাঠানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এ্যালেক্সের নাম্বার থেকে অনবরত ফোন আসতে শুরু করে। ইশমাম ফোনটা রিসিভ করে না। তার ফোন,ল্যাপটপ থেকে অদ্রিতা আলো নামের মেয়েটির সমস্ত স্মৃতি পরম যত্নে মুছে ফেলতে থাকে।
***
রাত তখন সাড়ে নয়টা। আলোর জ্বর কিছুটা কমেছে। সে বিছানায় চুপচাপ বসে আছে।
নিচে হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে। অনেকদিন পরে ভাই-বোন সব এক হয়ে খাবার টেবিলে বসে খাচ্ছে। ইশমাম চুপচাপ মাথা নিচু করে খাবার নাড়াচাড়া করছে। ইলহাম ইশমামের দিকে তাকিয়ে বলে,"পাখির মতো খুটছিস কেনো? সমস্যা কোথায়? সারাদিন রুমে ম'ট'কা মেরে পরেছিলি। বাংলাদেশ ভালো লাগছে না?"
ইশমাম কিছু বলে না। সামিন কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে,"ঠিকাছে। খেতে না চাইলে ঘরে গিয়ে ঘুম দে। রাতের গভীর ঘুমটা এখন প্রয়োজন তোর।"
ইশমাম সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। তারপর দোতলায় উঠে যায়। সামিনের খাওয়া হয়ে গেলে সিতারার দিকে তাকিয়ে আলোর কথা জিজ্ঞেস করে,"খেয়েছে? "
সিতারা শুকনো মুখে বলে,"না খাবার,না ওষুধ। কিছু ছুঁয়ে দেখেনি ভাইজান।"
সামিন উঠে দাঁড়ায়।
আলো বিছানা থেকে নেমে ঘর থেকে বের হয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। ইশমাম নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মুখোমুখি দুটো ঘর। আলো ইশমামের দিকে তাকায়। ইশমামের দৃষ্টি সে পড়তে পারছে না আজ । তার মুখ ভাবলেশহীন।
"এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেনো!"
পি'শা'চ কন্ঠ শুনে আলো ইয়াসারের দিকে তাকায়। সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে,"খাবার খাওনি, ওষুধ খাওনি কেনো?"
আলো কিছু বলে না। সামিন তখনো ইশমামকে দেখতে পায়নি,তার সম্পূর্ণ মনোযোগ আলোর দিকে ছিলো। আলোর নীরবতা দেখে সামিন আলোর হাত ধরে ঘরে ঢুকায়। তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। ইশমাম একদৃষ্টে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।
ল্যাপটপের সামনে বসে এ্যালেক্সকে একটি মেসেজ লেখে,"ভাইয়ার ওপর রাগ করার আগে আমি মরতে চাই এ্যালেক্স। আমি ঐ মানুষটার ওপর রাগ করতে পারবো না কিছুতেই।"
মেসেজটি দেখতে পেয়ে এ্যালেক্স আবারো ভিডিও কনফারেন্সে ফোন দিতে শুরু করে। ইশমাম মেসেজটি ডিলিট করে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দেয়।
***
খাবারের প্লেটটা আলোর সামনে রেখে ধমকের সুরে বলে,"খাও। খাও বলছি।"
আলো মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। সামিন বলে,"সব কিছু জোর না করলে হবে না দেখছি!"
_ওই একটা জিনিসই তো আপনি করতে জানেন। জো'র। কা'পু'রু'ষ কোথাকার।
আলোর মুখে কা'পু'রু'ষ শব্দটা শুনে সামিন আলোর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর খাবারের প্লেট টা টেবিলে রেখে ঢাকা দিয়ে ডিভানে গিয়ে শুয়ে পরে। না খেলে না খাক। কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজের মন্দ করতে চায় তাহলে তার কি। যথেষ্ট মানবিকতা দেখিয়েছে সামিন। এখন কি পা ধরে খাওয়াবে নাকি!
আলো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিছানায় গিয়ে বসে পরে। দীর্ঘসময় অতিবাহিত হয়। সামিন তখনো ঘুমায়নি। সে ওদিকে ফিরে আলোর কর্মকাণ্ড বোঝার চেষ্টা করছে। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একবার ঘুরে তাকায় সে। আলো চুপচাপ বসে আছে। সামিন কিছু একটা বলতে যাবে ঠিক তখনই দরজায় ধাক্কা দেয় ইশিতা। জোরে জোরে চেঁচাতে থাকে সে। সামিন উঠে দরজা খুলে দেয়। ইশিতা কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তনাদ করে বলে ওঠে,"ইশমাম স্লিপিং পিলস খেয়ে নিয়েছে ভাইয়া !"
#চলমান.....