ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

১৬তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_১৬

#Esrat_Ety

ইশিতার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে সামিন। বোনের আ'ত'ঙ্কি'ত মুখ দেখে তার ভেতরটা কেঁ'পে উঠলো যেন! রুদ্ধশ্বাসে ছুটে গেলো ইশমামের ঘরে। ইশিতা ভাইয়ের পিছু পিছু ছুটে গেলো। আলো বিছানার উপর পাথর হয়ে বসে আছে। তার দৃষ্টি দরজার বাইরে।

ইশমাম বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। বিড়বিড় করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। ইলহাম ওকে ধরে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। রিতু ভীত চোখে তাকিয়ে আছে ইশমামের দিকে।

সামিন গিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"কি হয়েছে! ছোটোর কি হয়েছে!"

ইলহাম আ'ত'ঙ্কি'ত কন্ঠে বলে বারোটা পিলের বারোটাই খেয়ে নিয়েছে ভাইয়া।"

সামিন গিয়ে ইশমামকে ধরে ফেলে। পিটপিট করে ভাইয়ের দিকে তাকানোর চেষ্টা করছে ইশমাম,চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে,তাই পারছে না তাকাতে। সামিন আঁ'ত'কে ওঠে,"এ্যা'ম্বু'লে'ন্স ডাক। কুইক।"

_আমি ঠিক আছি ভাইয়া,আই এ্যাম টোটালি ফাইন!

ঘোরের মধ্যে বিড়বিড় করতে থাকে ইশমাম।

ইশিতা চেঁচাতে থাকে,"কোন দুঃখে এটা করলি গ'র্দ'ভ! জবাব দে!"

_শাট আপ ইশু! চারটা খেয়েছি মাত্র। এক চ'ড় মারবো তোকে....

ইশমাম কথাটি শেষ করতে না করতেই সামিন সজোরে একটা চ'ড় মারে ইশমামের গালে। তাল সামলাতে না পেরে বিছানার ওপর গিয়ে পরে সে। সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,"ওকে বমি করাতে হবে।লবণ গোলা পানি নিয়ে এসো রিতু। তাড়াতাড়ি।"

_ভাইয়া স্টপ। প্লিজ যাও তোমরা।

বিড়বিড় করতে থাকে ইশমাম।

রিতু নিচে ছুটে যায়। ইলহাম ঘুমের ঔষধের পাতাটা সামিনের হাতে দিয়ে বলে,"দেখো। হাই পাওয়ারের। বারোটার বারোটাই গিলেছে।"

_সত্যি বলছি ভাইয়া, চারটা খেয়েছি।

বিছানায় উপুড় হয়ে পরে থাকা ইশমাম অস্ফুট স্বরে বলে।

রিতু লবণ গোলা পানি এনে সামিনের হাতে দেয়। সামিন ইলহামের দিকে তাকিয়ে বলে,"ওকে ধর শক্ত করে তোরা।"

ইশিতা আর ইলহাম ইশমামকে শক্ত করে ধরে রাখে। ইশমাম পিটপিট করে তাকাচ্ছে সামিনের দিকে। সামিন ইশমামের থুতনি ধরে জোরপূর্বক লবণ গোলা পানিটা ইশমামকে গেলাতে থাকে। কিছুক্ষণ যেতেই হড় হড় করে বমি করে দেয় ইশমাম। সামিন একটু সময় নিয়ে আবারো লবণ পানি খাইয়ে দেয় ইশমামকে। বমি করে ইশমাম পেটে যা ছিলো সব বের করে দেয়। ইশিতা আর ইলহাম ভাইকে শক্ত করে ধরে রেখেছে।

পুরোটা উগরে দিয়ে ইশমাম পুরোপুরি ভাবে নিস্তেজ হয়ে পরে। রিতু পানি এনে সামিনের হাতে দেয়। সামিন ইশমামের চোখে মুখে পানি ছেটাতে থাকে।

আলো ধীরপায়ে হেটে ইশমামের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

সামিন একটা চেয়ার টেনে ইশমামের সামনে বসে, ভাইয়ের দুই বাহু ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলে,"কয়টা খেয়েছিস! বল !"

_কসম ভাইয়া। চারটাই খেয়েছি।

এখনো ঘোর কাটেনি ইশমামের। সামিন ধমক দিয়ে বলে,"পুরো পাতা খালি কেনো? বল।"

_এগুলো আমি রেগুলার নেই ভাইয়া,ডাক্তারের পরামর্শে। আগেই খেয়েছি বাকি আটটা। সত্যি বলছি ভাইয়া!

_চারটা কেনো খেতে গেলি? চারটা খাওয়ার কি প্রয়োজন ? বল। কোন মেয়ের জন্য খেয়েছিস!

ইশমাম বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করে বলে,"কি শুরু করেছো ভাইয়া। প্লিজ যাও এখান থেকে ভাইয়া। ঘুম আসছিলো না তাই খেয়েছি। এবার যাও।"

সামিন দ্বিতীয় বারের মতো ভাইয়ের গালে এক চ'ড় বসিয়ে দেয়।

ইশমাম গালে হাত দিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। সামিন গর্জে ওঠে,"আমাকে বোকা পেয়েছিস? আমি কিছু বুঝি না তাইনা? সারাদিন আমি তোকে লক্ষ্য করেছি। দেবদাস হয়েছিস তুই! দেবদাস! অ'প'দা'র্থ কোথাকার!"

_ভাইয়া প্লিজ স্টপ। এসব কিছুই না!

সামিন চেঁচিয়ে বলে ওঠে,"হুট করে দেশে আসা, সারাদিন মনমরা হয়ে থাকা, ঘুমের ঔষধ নেওয়া। আবার বলছিস কোনো মেয়ের জন্য না এসব? আমি ব'ল'দ? ব'ল'দ তোর ভাই?"

ইশমাম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন নরম হয়ে যায়। কাতর কন্ঠে বলে ওঠে,"সামান্য একটা মেয়ের জন্য এরকম একটা স্টেপ নিয়েছিস। একবারও আমাদের কথা ভাবলি না তুই? কোন মেয়ে বল! কোথাকার মেয়ে! বিদেশী নাকি এদেশীয়? তুই আমায় নাম ঠিকানা দে। আমি ঐ মেয়েকে তোর পায়ের কাছে এনে রাখবো। তুই এক্ষুনি নাম বল।"

আলো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সামিনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট জোড়া তার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে ঐ পি'শা'চ'টা'র কথা শুনে। ইশমাম ভাইয়ের চোখের দিকে তাকায়, মনে মনে বলে ওঠে,"কাকে পায়ের কাছে এনে রাখবে তুমি ভাইয়া। তুমি তো তাকে নিজে বুকে টেনে নিয়েছো!"

সামিন নরম গলায় বলে,"আমার ভাই, সামিন ইয়াসারের ভাই এতো সহজে হার মেনে নিয়েছে? বাবা ঠিকই বলে,তুই একটা অ'প'দা'র্থ।"

ইশমাম ম্লান হাসে। নিচু স্বরে বলে,"ঠিকই বলেছো ভাইয়া। আমি তাই।"

সামিন ইশিতার দিকে তাকিয়ে বলে,"কিভাবে টের পেলি ও এই অকাজ করেছে?"

_ওর ফোনটা খাবার টেবিলে ফেলে রেখে এসেছিলো। আমেরিকা থেকে এ্যালেক্স নামের ওর কোনো বন্ধু অনবরত ফোন দিচ্ছিলো। ফোনটা রিসিভ করতেই সে বলে ইশমাম নাকি সু'ই'সা'ই'ড করার চেষ্টা করছে, ওকে আটকাতে হবে। আমি আর মেজো ভাইয়া ছুটে এলাম। দেরী না করে ডুপ্লিকেইট চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখি ম'রা'র মতো পরে আছে গাধাটা।"

সামিন ইশমামের দিকে তাকায়, দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"এতো দূর? এতো দূর? কোথাকার কোন এ্যালেক্স টের পেলো তোর কষ্ট আর আমরা ভেসে এসেছি? আমাদের বলা যেতো না?"

ইশমাম মাথা নিচু করে রাখে। সামিন গম্ভীর কন্ঠে ইশিতাকে বলে,

"ওর ব্যাগ, জিনিস পত্র সার্চ কর‌ । আরো স্লিপিং পিলস আছে নাকি দেখ। বাজেয়াপ্ত কর সব।"

ইশিতা মাথা নাড়িয়ে ইশমামের লাগেজ খোলে। ইশমাম বলে,"স্টপ ভাইয়া। অনেক গোয়েন্দাগিরি করেছো। ট্রাস্ট মি, আমি সু'ই'সা'ই'ড করতে চাইনি, এ্যালেক্স একটু পাগল। আর ওষুধ নিয়ে গেলে কি হবে? সুইসাইড করতে চাইলে তো সিলিংয়ের সাথে ঝুলে পরতে পারি। হাতের শি'রা কা'ট'তে পারি।"

সামিন ইশমামের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ করে ইশমামের চোখে পরে যায় আলো। আলো নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ইশমাম ঠান্ডা গলায় তার ভাইকে বলে,"এখন প্লিজ তোমরা যাও। তুমি যাও ভাইয়া। বড় ভাবী বিরক্ত হচ্ছে। ভাবীকে নিয়ে ঘরে যাও। আই এ্যাম টোটালি ফাইন।"

সামিন মাথা ঘুরিয়ে আলোকে দেখে। তারপর ইশমামের দিকে তাকিয়ে বলে,"মেয়েটা কে বলবি না তো?"

ইশমাম কঠিন গলায় বলে,"না।"

_বেশ। আমি বের করে নেবো। তারপর ঘা'র ধরে আমার ভাইয়ের পায়ে এনে ফেলবো। কতবড় সাহস! আমার ভাইকে কষ্ট দেয়!

ইশমাম মাথা নিচু করে মেঝের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে‌ । ইশিতা আরো দুই পাতা ঘুমের ঔষধ খুঁজে বের করে এনে সামিনের হাতে দেয়। সামিন ওষুধ গুলো নিতে নিতে ঠান্ডা গলায় বলে,"এগুলো আমি নিয়ে যাচ্ছি। ঘুম না পেলে না ঘুমিয়ে থাক। দরকার নেই ঘুমের।"

সামিন হনহন করে বেরিয়ে যেতে নেয়। আলোর সামনে এসে থ'ম'কে দাঁড়িয়ে আলোর দিকে তাকায়। আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে মাথা নিচু করে। ইশিতা এসে বলে,"জ্বর সেরেছে আলো? শরীর ঠিক আছে তোমার?"

আলো মাথা নাড়িয়ে সামিনের ঘরের দিকে যায়। সামিন ইশমামের দিকে আরো একবার তাকিয়ে বলে,"ফ্রেশ হয়ে চুপচাপ শুয়ে থাক। সকালে কথা হবে।"

***

ঘরে ঢুকে সোজা গিয়ে ডিভানে গা এলিয়ে দেয় সামিন। অনেক রাত হয়ে গিয়েছে। কাল কিছু ইম্পরট্যান্ট কাজ রয়েছে। এখন একটু ঘুমিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দু'চোখ বন্ধ করার আগে আলোর দিকে একবার তাকায় সে। থমথমে মুখ নিয়ে বিছানায় বসে আছে চুপচাপ। সামিন আনমনে হেসে ফেলে, গুটিসুটি মেরে বসে থাকার কোনো প্রতিযোগিতা হলে এই মেয়ে ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করতো। মায়ের গর্ভে শিশুরা যেভাবে হাত পা গুটিয়ে রাখে। এই মেয়েটাও সেভাবেই বসে থাকে। সামিন বেশ অবাক হয়, সাইজে ছোটো খাটো একটা মেয়ে। তুলে একটা আছাড় মারা যায়, কোলে তুললে মনে হয় একটা শিমুল তুলার বালিশের সমান ওজন, সেই মেয়ের তেজ কত ! আবার সেই মেয়ে সামিনকে প্রানে মারারও হুমকি দেয়। কারন সে কারাতে জানে, তাই সে বিশ্বাস করে নিজে একটা বালিশ হয়ে ছিয়াত্তর কেজি ওজনের ইয়াসার মির্জাকে ঘায়েল করবে। কতটা আত্মবিশ্বাসী এই মেয়ে!

***

ইট পাথরের শহরের শেষ রাত জাগা পাখিটাও যখন ঘুম ঘুম চোখে ঢুলছে। তখন আলো জেগে। এতক্ষণ শুয়ে ছিলো,এখন উঠে বসে আছে সে। মাথা ঘুরিয়ে ডিভানে ঘুমিয়ে থাকা সামিনের দিকে তাকাতেই কপাল কুঁচকে ফেলে। এবার দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে পেরেছে সে। যে লোকটা নিজে একটা ক্রি'মি'না'ল,যার মেজো ভাই শ্লীলতাহানির মামলার আ'সা'মী তাদের ছোটো ভাই তো ঠ'ক , ধান্দাবাজ হবেই!

একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় আলোর ভেতর থেকে! সারাজীবন ছেলেদের এক হাত দেখে নেওয়া চালাক চতুর উপাধি পাওয়া মেয়েটা কি না পরেছিলো একটা ঠকবাজের পাল্লায়! দেখে নেবে, সব ক'টাকে আলো দেখে নেবে!

আগুন জ্বলে ওঠে আলোর চোখে মুখে। আবার নিমিষেই তা নিভে গিয়ে মুখ মলিন হয়ে যায়। পেটে হাত চেপে বসে থাকে সে ‌। প্রচন্ড খিদেয় তার পেটে ব্যাথা হতে শুরু করেছে। চোখে ঝাপসা দেখছে। জ্বর নেই আপাতত গায়ে,তাই খিদেটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বেশ‌। আলো কিছুক্ষণ বসে থেকে আর টিকতে পারলো না। মাথা ঘুরিয়ে দেখে টেবিলের উপর প্লেটটা এখনো ঢাকা দিয়ে রাখা আছে। হাত বাড়িয়ে প্লেট টা নিয়ে ঢাকনাটা সরাতেই একটা বাজে গন্ধ আলোর নাকে লাগে ‌‌। প্লেটে ভাত, মাংস এবং পাতলা ডাল দেয়া হয়েছিলো। দীর্ঘসময় অতিবাহিত হওয়ায় সেটা বাসি হতে শুরু করেছে। প্লেট টা ঢেকে আবারো টেবিলের উপরে রাখে। হঠাৎ করে মায়ের কথা মনে পরে আলোর। মা কখনোই আলোকে না খেয়ে রাতে ঘুমাতে দিতো না। কখনোই না। চোখ দিয়ে দুফোঁটা তরল গড়িয়ে পরতেই আলো সাথে সাথে তা মুছে সামিনের দিকে তাকায়। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে,"দা'ন'ব একটা।"

গা থেকে চাদর সরিয়ে নেমে পরে আলো। পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে সন্তর্পণে দরজার সিটকিনি খুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ধীরপায়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে লিভিং রুম পেরিয়ে ডাইনিং রুমের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। এদিক ওদিক তাকিয়ে ফ্রিজের কাছে এগিয়ে গিয়ে ফ্রিজের দরজা খোলে। তেমন কোনো খাবার নেই ফ্রিজে। আছে কিছু শুকনো ভাত এবং কিছু ফল। এই মুহূর্তে আলোর ভাতের খিদে পেয়েছে তাই ভাতের বাটিটা ফ্রিজ থেকে বের করে নেয় সে। জীবনে কখনো আলো তরকারি ছাড়া শুধু ভাত খেয়ে দেখেনি, সামিন ইয়াসারের জন্য আজ সেই সৌভাগ্য তার হয়েছে। ভাত টা ঠান্ডা হয়ে আছে। কিন্তু কি আর করা,এটাই গিলতে হবে।

এদিক ওদিক না তাকিয়ে বাটিটা টেবিলে রেখে একটা চেয়ার টেনে বসে পরে সে। লবন মেখে ভাতের লোকমা তুলে মুখে দিতেই কপাল কুঁচকে ফেলে আলো। ঠান্ডা, শুকনো ভাত, পেটের ভেতর যেতে চাইছে না তবুও অনেক কষ্টে গিলে ফেলে। শুকনো ভাত তাই দ্রুত খেতে গিয়ে গলায় আটকে যায় হঠাৎ, কাশতে কাশতে আলো টেবিলের উপর দেখতে থাকে, গ্লাসের পানি শেষ। কোথাও পানির জগ দেখতে পাচ্ছে না সে। হঠাৎ করে কেউ তার সামনে একটা পানির গ্লাস রাখলো। আলো চ'ম'কে উঠে পেছনে তাকায়। সামিন তার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো উঠে দাঁড়িয়ে যায়। সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,"খেতে বসার আগে সাথে পর্যাপ্ত পানি নিতে হয়।"

সামিনকে এভাবে দেখেই আলোর কাশি থেমে গিয়েছে। সামিন আলোর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিয়ে ভাতের বাটিটার দিকে তাকায়। মৃদু স্বরে বলে,"সরাসরি বাটিতেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছো! একটা প্লেটে তুলে নিতে!"

আলো কি বলবে কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। এভাবে এই লোকটার হাতে ধরা পরে তার লজ্জায় মাটির ভেতরে ঢুকে যেতে ইচ্ছে করছে।

_আমি ভেবেছিলাম পালাচ্ছো। দ্রতপায়ে সিঁড়ি ভেঙে দেখি তুমি এখানে উদরপূর্তি করছো।

আলো চলে যাওয়া ধরলে সামিন তার হাত টেনে ধরে। আলো এক ঝটকায় সামিনের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। সামিন বলে ওঠে,"শুধু ভাত খাচ্ছিলে কেনো? কাউকে ডেকে তুলতে।"

আলো কোনো কথা বলে না। সামিন বলতে থাকে,"সামিন ইয়াসার মির্জা প্রতি মাসে অসংখ্য দুঃস্থ পরিবারের বাজার করে দেয় । আর এখানে তার স্ত্রী জে'দ দেখিয়ে না খেয়ে পরে এসে চুরি করে শুকনো ভাত খায়। তরকারি ফ্রিজেই রাখা। একটু খুঁজলেই পেয়ে যেতে।"

_একদম আমাকে স্ত্রী বলবেন না। অবৈধ বিয়ে ওটা। আমি আপনার স্ত্রী নই।

আলো তেতে ওঠে। সামিন আলোর দিকে এক কদম এগিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"বলবো আমি। কি করবে তুমি? কি ক্ষমতা তোমার? শোনো তাহলে বলছি, তুমি আমার স্ত্রী, তুমি আমার স্ত্রী,তুমি আমার স্ত্রী, তোমার বাপ আমার শশুর,তোমার মা আমার শাশুড়ি, তোমার ভাইয়েরা আমার শা'লা। তুমি আমার স্ত্রী।"

কথাগুলো উচ্চারণ করে সামিন এক মুহুর্ত থামে। তারপর কন্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলে,"এই যে বললাম। কি করবে তুমি? করো তো দেখি! কারাতে করবে? কুংফু কারাতে?"

আলো হুট করে একদলা থুতু ছুড়ে মারে সামিনে গায়ে। সামিনের গলার কাছটায় লেগেছে । সামিন সাথে সাথে কপাল কুঁচকে ফেলে। আলো তার চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে আছে। সামিন দাঁতে দাঁত চেপে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে আলোকে হতভম্ব করে দিয়ে তার শাড়ীর আঁচল ধরে। আলো শি'উ'রে ওঠে। সামিন আলোর আঁচল দিয়ে নিজের গলার কাছটা পরিষ্কার করতে করতে বলে,"তুমি একটা উন্মাদ মেয়ে আলো।"

আলো নিজের আঁচল সামিনের থেকে টেনে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,"আর আপনি একটা জা'নো'য়া'র।"

সামিন আলোর দিকে তাকায়। তেজী কন্ঠে বলে,"জ্বর চলে গিয়েছে? তোমার জ্বর তোমার তেজের মতো আলো। হুট করে আসে আবার হুট করে মিইয়ে যায়।"

আলো কিছু বলে না। সামিন বলতে থাকে,"উদরপূর্তি হয়ে গেলে ঘরে চলো। আমি রাত জেগে তোমাকে এখানে বসে পাহারা দিতে পারবো না।"

***

শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছিলো আলো। তাই আজ অনেকটা দেরী করে উঠেছে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে বেশ কাহিল লাগছে নিজেকে। শরীর এখনো খুব ক্লান্ত। ধীরে ধীরে উঠে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে পি'শা'চ'টা ঘরে নেই। জানালা থেকে তেজী রোদ আলোর নরম ত্বক পু'ড়ি'য়ে দিতে চাইছে। দুহাতে গাল ঢেকে কপাল কুঁচকে আলো বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বিছানা থেকে নেমে সোজা ওয়াশ রুমে চলে যায়। মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে ওয়াশরুমের আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকে সে‌। আলোর গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। কিন্তু আজ তাকে আরো অনেকটা বেশী উজ্জ্বল লাগছে। সারাদিন বন্দীশালায় আ'ট'কে থাকে সে,তাকে সূর্যের বেগুনী রশ্মি ছুতে পারে কই! মাত্র ক'দিনেই গায়ের রং এতোটা বদলে গিয়েছে! হাত বাড়িয়ে তার টুথব্রাশ তুলে নিতেই চোখে পরে সামিন ইয়াসারের টুথব্রাশ। নিজে যেমন দানব আকৃতির তেমনি তার টুথব্রাশ টাও দানব আকৃতির। আলোর ইচ্ছে করছে টুথব্রাশ টাকে ওয়াশ রুমের কমোডের মধ্যে চুবিয়ে রেখে দিতে। ঐ লোকটার জন্য এর চেয়ে ভালো আপ্যায়ন আলোর জানা নেই। নিজের ইচ্ছেকে দমিয়ে ফেলে হাত মুখ ধুয়ে আলো বের হয়ে যায় ওয়াশ রুম থেকে। হেটে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে দোতলার লিভিং রুমের কাছে যেতেই দাঁড়িয়ে পরে আলো। ইশমাম দাঁড়িয়ে আছে। আলো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ইশমামকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলে ইশমাম মৃদু স্বরে বলে,"অদ্রিতা।"

***

সামিনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আতাউর আলম দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। সামিন ভেতরে ঢোকে। সামিনের পিছু পিছু কয়েকজন লোক ব্যাগ হাতে ঢোকে। বসার ঘরের একপাশে ব্যাগ গুলো রেখে তারা চলে যায়। রেহেনা ধীরপায়ে বসার ঘরের দিকে এসে থমকে দাঁড়ায়। চোখ মুখ আ'ত'ঙ্কে ছেয়ে যায় তার।

আতাউর আলম নিচু স্বরে কিন্তু কন্ঠে ঘৃণা নিয়ে বলে,"এগুলো কি!"

সামিন সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে বলে,"প্রথম বার শশুর বাড়িতে এসেছি। খালি হাতে তো আসা যায় না। আমি সামিন ইয়াসার মির্জা!"

রেহেনা ব্যাকুল কন্ঠে বলে,"বাবা আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। আমরা কোনো থানাপুলিশ করিনি। কাউকে কিছু বলিনি। তুমি নির্বাচনেও জিতে গিয়েছো। এবার অন্তত আমার মেয়েটাকে ছেড়ে দাও। কথা দিচ্ছি আমরা সব ছেড়ে ছুড়ে অনেক দূরে চলে যাবো ‌"

সামিন রেহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"কাউকে কিছু বলেন নি ভালো করেছেন, আমার বাবা চেন্নাই থেকে আসলে বড় সর রিসিপশন অনুষ্ঠান করে আমিই সবাইকে জানিয়ে দেবো আমি বিয়ে করেছি। আর আপনার মেয়েকে ছেড়ে দেওয়ার কথা যদি বলেন তাহলে বলবো,সামিন ইয়াসার একবার যে জিনিসটা নিজের নামে করে নেয় সেটা সে হাত ছাড়া করে না।"

রেহেনা ভেজা চোখে তাকিয়ে আছে সামিনের দিকে। আতাউর আলম বলে,"কি চাইছো তুমি ইয়াসার। আর কি চাইছো? মেয়েটাকে অন্তত একটু কথা বলতে দাও আমাদের সাথে।"

_দেবো। জামিলের জ্ঞান ফিরুক। একেবারে নেমন্তন্ন করে নিয়ে যাবো আপনাদের আমার বাড়িতে। মেয়েকে প্রান ভরে দেখে আসবেন।

আতাউর আলম অবাক চোখে তাকিয়ে আছে ইয়াসারের দিকে, বলে,"জামিলের সাথে আমার কি সম্পর্ক?"

_কু'পি'য়ে'ছে'ন আবার বলছেন কি সম্পর্ক!

_কেন এক কথা বারবার বলছো ইয়াসার। আমি তো বলেছি এসবে আমি জরিত নই। থানায় হুমকি টা আমি এমনিই দিয়েছিলাম,রাগের মাথায়। কোনো উদ্দেশ্য ছিলো না আমার!

ইয়াসার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে, তারপর বলে,"হেনা। জামিলের স্ত্রী। আপনার মেয়ের বয়সী। সাত মাসের গর্ভবতী। আপনার লোক তার সামনেই তার স্বামিকে কু'পি'য়ে'ছে। আচ্ছা এতো ভং ধরে থাকেন কিভাবে আপনি? মানুষের সামনে ইনোসেন্ট ফেইস নিয়ে ঘুরে বেড়ান,সিম্প্যাথি নেন তাদের!"

আতাউর থমথমে মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছে ইয়াসারের দিকে। ইয়াসার বলে,"আজ উঠি। মেয়ের জন্য চিন্তা করবেন না। সে ভালো আছে। অবশ্য তার ভালো থাকা আপনাদের উপর নির্ভর করছে। চুপচাপ থাকুন এবং জামিলের জন্য দোয়া করতে থাকুন,যদি মেয়ের সাথে কথা বলতে চান তো!"

***

আলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ইশমাম নিচুস্বরে বলে,"সামনা সামনি তুমি বেশি সুন্দর অদ্রিতা!"

আলো অগ্নি দৃষ্টি দিয়ে ইশমামের দিকে তাকায়,কন্ঠে ঝাঁঝ নিয়ে বলে,"আমি তোমার ভাইয়ের স্ত্রী ইশমাম। তোমার ভাবী হই।"

ইশমাম হেসে ফেলে, ঠান্ডা গলায় বলে,"আমি ভাবীকেই বলেছি কথাটা। ছোটো দেবর তোমার। একটু মশকরা করলাম!"

আলো কপাল কুঁচকে চলে যেতে নেয়। ইশমাম বলে,"ভাইয়া তোমাকে তুলে এনে বিয়ে করেছে?"

আলো দাঁড়িয়ে পরে। ইশমাম বলে," ভাইয়াকে আমি ছোটো থেকে দেখছি। এতোটা প্রতিশোধ পরায়ণ ছিলো না সে। তোমার ঐ একটা চ'ড় তাকে এলোমেলো করে দিয়েছিলো।"

আলো শীতল চোখে ইশমামের দিকে তাকায়। কন্ঠে বিদ্রুপ নিয়ে বলে,"কাল রাতে কি নাটক করেছিলে ওটা? কেনো বলে দিচ্ছো না নিজের ভাইয়াকে সব। সাহস নেই তাই না? বলে দাও সবটা, তারপর দুই ভাই সাপ আর বেজি হয়ে কা'ম'ড়া কা'ম'ড়ি করে ম'রে যাও। এটাই আমি চাই।"

ইশমাম ম্লান হাসে, নরম সুরে বলে,"সেটা কখনো হবে না অদ্রিতা। আমি ভাইয়ার জন্য নিজের জীবন দিতে পারি। তুমি তো আমার জীবনের মাত্র একটা অংশ ছিলে। ভাইয়া যখন ধরে নিয়েছে তুমি তার। তার মানে তুমি তার।"

আলো দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। ইশমাম বলে,"মায়ের পরে পৃথিবীতে আমি ভাইয়াকে বেশি ভালোবাসি। সেই ভালোবাসার কাছে সবকিছু তুচ্ছ।"

_তোমরা সবাই এক। সবাই জ'ঘ'ন্য। তোমরা ই'ব'লি'শের বিশেষায়িত বংশ। তোমাদের নাম রাখা ভুল হয়েছে। তোমাদের নামের পাশে ই'ব'লি'শ শব্দটা এফিডেভিট করে বসিয়ে নেবে।

"ইন্তেখাব ই'ব'লি'শ"

"ইমতিয়াজ ই'ব'লি'শ"

"ইশতিয়াক ই'ব'লি'শ"

"ইয়াসার ই'ব'লি'শ"

"ইলহাম ই'ব'লি'শ"

"ইশমাম ই'ব'লি'শ"

আলো কন্ঠে তেজ নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে শব্দগুলো। ইশমাম আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে আলোর চোখে তাদের পরিবারের প্রতি ঘৃণার পরিমাণ দেখতে থাকে।

#চলমান....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন