ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৩১তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৩১

#Esrat_Ety

অ্যাডভোকেট শাহজাহান শিকদারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আলো। শাহজাহান শিকদার টিস্যু পেপার দিয়ে নিজের চশমার কাঁচ পরিষ্কার করতে করতে নরম গলায় বলে,"দেখো মামুনি। মিউচুয়াল ডি'ভো'র্স , এটা একটা লম্বা প্রসেস। কাগজ পত্র রেডি করতে একটু টাইম লাগবে। এতদিন যখন অপেক্ষা করতে পারলে, আরেকটু না হয় করো।"

আলোর মুখ শুকিয়ে যায়। সে বলে,"এমন কথা আমি জীবনেও শুনিনি আংকেল।‌"

শাহজাহান শিকদার মৃদু হাসে। তারপর বলে,"আইন তো আর মুখের কথা না মা। যে আইন দুটো মানুষকে একে অপরের সাথে সারাজীবনের জন্য জু'রে দেয় সে আইন তো একদিনে ভাঙা সম্ভব না তাইনা? অনেক নিয়ম আছে। আমি কাগজ পত্র রেডি করছি। তারপর তোমাদের ডাকবো। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়ি যাও।"

আলোর কাছে শাহজাহান শিকদারের জবাব পছন্দ হয়না। তার ৬ষ্ঠ ইন্দ্রীয় বলছে এই লোকটা কারো শিখিয়ে দেওয়া কথা বলছে। কিন্তু এখন আলোর করনীয় কি!

শাহজাহান শিকদারের চেম্বার থেকে বের হয়ে আলো বিরসমুখে উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটছে। আজকের অর্ডারের ভেলিভারি সকাল বেলাতেই ভেলিভারি বয়কে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে। আপাতত হাতে কোনো কাজ নেই তার।

"অদ্রিতা আলো?"

পুরুষ কন্ঠ শুনে আলো চ'ম'কে ওঠে, তারপর ঘুরে তাকায়। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার একজন ব্যাচমেট।

আলো মুখ হাঁসি হাঁসি করার চেষ্টা করে বলে,"রাকিব!"

_তুমি তো নিখোঁজ হয়ে গিয়েছো বিয়ে করে। সোস্যাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে না, ফোন নাম্বার নেই। কেমন আছো তুমি?

আলো ম্লান হাসে।

_ভালো। তুমি?

রাকিব বলে,"আমি আছি আরকি। তা তোমার স্বামী কোথায়? সমাজ সেবা করছে? আর মেয়রের বৌ এভাবে রাস্তায় রাস্তায় হাটছো কেনো? গাড়ি কোথায়?"

আলো কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। রাকিব বলে,"চলো এক যায়গায় বসে কথা বলি। বেশ লম্বা সময় পরে দেখা হলো আমাদের।"

ইহান আজ বেশ খুশি। কারন তার বড়বাবা অনেকদিন পরে তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। গাড়ির ব্যাক সিট টা পুরোটা খেলনা দিয়ে ভর্তি করে ফেলেছে । তার চোখে মুখে খুশি চকচক করছে। সামিন ড্রাইভ করতে করতে বারবার ইহানের দিকে তাকাচ্ছে। সে নিজেও মজা পাচ্ছে ইহানের আনন্দ দেখে।

"বড় বাবা দেখো পচা আন্টি!"

গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে ইহান। সামিন অবাক হয়ে বলে,"কোথায়?"

ইহান হাত তুলে দেখায়,"ওই যে দেখো।"

সামিন হুট করে গাড়ির ব্রেক কষে। তারপর ইহানের হাত লক্ষ্য করে সেদিকে তাকাতেই তার হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায় রা'গে। দূরেই আলো একটা ছেলের সাথে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করছে, হাসাহাসি করছে। সামিনের মস্তিষ্ক থেকে সেই রা'গ পুরো শরীরে ছড়িয়ে যেতে মিনিট খানেক সময় নিলো না। পুরো শরীর জ্ব'লে যাচ্ছে রাগে। সে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘদিন পরে আলোর মুখে সে হাসি দেখছে। কে ঐ ছেলেটা! আলোর প্রাক্তন নাকি! তাড়াতাড়ি সামিনকে ডিভোর্স দিয়ে ঐ প্রাক্তনকে বিয়ে করার পরিকল্পনা করছে বুঝি!

সামিন একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে,"খাওয়াচ্ছি তোমাকে আইসক্রিম আছিয়া!"

***

"স্যার এগুলো কিসের কাগজ?"

সিনথিয়া অতীশ পালের দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে তাকিয়ে আছে।

অতীশ ফাইলটার দিকে একপলক তাকিয়ে বলে,"জরুরি কাগজ। সামিন ইয়াসারের বৌয়ের লোনের পেপার।"

_কিন্তু স্যার। তাকে তো লোন টা দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে একজন দিনমজুরের মেয়ে পেয়েছে।

_জানি। কাগজ গুলো রাখো। প্রত্যেক সপ্তাহে অদ্রিতা আলো লোন পরিশোধ করতে এলে, তার সই আর টাকাটা রেখে দেবে।

সিনথিয়া হা হয়ে থাকে।

_স্যার আমি কিন্তু কিছু বুঝতে পারছি না।

_ইয়াসার মির্জা আমাদের মাধ্যমে তার স্ত্রীকে টাকাটা দিয়েছে। এসব কথা তার স্ত্রীকে জানাতে নিষেধ করেছে। তাই তার স্ত্রী লোনের টাকা ভেবে প্রত্যেক সপ্তাহে টাকা পরিশোধ করতে এলে টাকা টা চুপচাপ রেখে দেবে। ইয়াসার মির্জা ওনার বৌয়ের নামে একটা একাউন্ট খুলেছে। সেখানে টাকা ট্রান্সফার করতে হবে।

সিনথিয়ার মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। সে হতভম্ব হয়ে বলে,"স্যার হচ্ছে কি আসলে! আমাদের কাজ কি এখন মিথ্যাচার করা? এটা তো ধোঁকাবাজি একপ্রকার।"

অতীশ পাল বলে,"ধোঁকাবাজি কোথায়? স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা দেখলে না? এমন দেখেছো কোথাও? এখন যাও, নিজের মুখ বন্ধ রাখো। আমাদের এজেন্সির আইনের ঝামেলা যেভাবে সামিন ইয়াসার মির্জা সামলায় তেমনি তার এই ঝামেলা টাও একটু সামলে দাও। আর হ্যা নতুন এম্প্লয়ি দুটোকে বলে দিও। তারা যাতে গণ্ডগোল না করে বসে!

***

ছাদে সবাই চুলের তেলের কাঁচামাল গুছিয়ে নিচ্ছে। আজ শুধু এক্সপেরিমেন্ট হবে। আলো একপাশে একটা চেয়ারে বসে আছে চুপচাপ। আজও হিয়া আসেনি। অনেকটাই ভয় পেয়ে গিয়েছিলো সেদিন। ফোনে বলেছে গায়ে জ্বর এসেছে।

শেফালী আর বিউটি হাতে হাতে সবটা গুছিয়ে নিচ্ছে। সানজিদা বড় একটা স্টোভের ওপর বৃহৎ আকারের একটা কড়াই রেখে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"মাত্র চারদিন ভেলিভারি দিয়েছি আচার। এখনি বেশ ভালো ভালো রিভিউ পাচ্ছি। আমার মতে আচার টা নিয়ে এগোনোই ঠিক হবে। তেল নিয়ে এগোতে রিস্ক আছে।‌"

_বিজনেসে রিস্ক না নিলে এগোনো যায়না সানজিদা আপু। আমাদেরকে রিস্ক টা নিতেই হবে।

সেফালী আর বিউটি আলোর কথায় সায় দেয়। এমন সময় আজান আসে। আলো আজানের দিকে তাকিয়ে মজার ছলে বলে,"যখন তখন আমাদের ফ্যাক্টরিতে ঢুকবি না, আমাদের প্রোডাক্টের সিক্রেট ইনগ্রিডিয়েন্ট সম্পর্কে আমরা কাউকে জানাতে চাইনা।"

আজান বলে,"আপু নিচে একজন ভেলিভারি বয় এসেছে।"

_ডেলিভারি বয়?

আলো অবাক হয়ে যায়। তারপর বলে,"আমাদের সব অর্ডার তো হাতে পেয়েছি! আবার কি!"

_তা তো জানি না আপু। তুমি নিজে এসেই দেখো।

আলো গাঁয়ে ওড়না জড়িয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামে। দেখতে পায় সদর দরজার কাছে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। আলো জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় লোকটার দিকে,বলে,"কিসের পার্সেল? আর পার্সেল কোথায়?"

মুখ থেকে মাস্ক খুলে ফেলে লোকটা বলে,"ম্যাম গেইটের বাইরে।"

আলো কিছু বুঝতে পারছে না। লোকটা বলে,"আসুন। দেখে নিয়ে যান!"

আলো লোকটার পিছু পিছু যায়। গেইটের বাইরে বিশাল বড় একটা আইসক্রিমের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে।

আলো হতভম্ব হয়ে যায়। লোকটা বলে,"আপনার হাজবেন্ড আপনার জন্য পাঠিয়েছেন।"

আলো এদিক ওদিক তাকায়। তার মুখে কোনো কথা আসছে না। এমন সময় আলোর ফোন বেজে ওঠে। সামিনের নাম্বার থেকে ফোন। আলো ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে সামিন বলে,"পার্সেল পেয়েছো? এখন যত ইচ্ছা ততো আইসক্রিম খাবে বাড়িতে বসে বসে। বাইরের ছেলেদের সাথে রাস্তায় বসে হা হা হিহি করা, আইসক্রিম হাতে তাদের গায়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছরে পরা এসব আর যেন করতে না দেখি। ওসব বে'হা'ল্লা'প'না আমার সাথে ডি'ভো'র্স হয়ে গেলে করবে। যতদিন কাগজে কলমে তুমি আমার বৌ, আমি যদি দেখি আমার বৌ ভ্র'ষ্টা'চা'রী হচ্ছে তাহলে উল্টো পাল্টা কিছু করে দিতে এই ফে'রা'উ'নে'র হাত কাঁপবে না আছিয়া।"

সামিন ফোন কেটে দেয়। আলো পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। পাশ থেকে লোকটা বলে,"ম্যাম আমি আসি।"

আলো শুকনো মুখে আইসক্রিমের ভ্যানটার দিকে তাকিয়ে থাকে। পেছন থেকে শেফালী বলে,"করবে কি এখন? আইসক্রিমের ব্যাবসাও শুরু করবে তুমি?"

আলো নিস্তেজ কন্ঠে বলে,"সানজিদা আপুকে বলো তাদের বস্তিতে খবর দিতে। বাচ্চারা এসে তাদের পছন্দ মতো নিয়ে যাক। আর তোমরাও নাও। এখান থেকে নিয়ে যাও যার যা লাগে।"

আজান আমতা আমতা করে বলে,"আপু থানারোডের এতিম খানায় কিছু দিয়ে আসবো?"

_যা ইচ্ছা কর।

একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে আলো বাড়ির ভেতর চলে যায়। নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পরে সে।

ফোন কেটে সামিন ফোনটাকে আ'ছা'ড় মারে। সে প্রানপন চেষ্টা করেছে আলোকে কোনো কঠিন কথা না শোনাতে, কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। তার উ'গ্র রা'গ'টা আবারো একবার আলোর কাছে তাকে ঘৃ'ণা'র পাত্র করে দিলো। কিন্তু সে কি করবে, সহ্য করতে পারেনি আলোর সাথে ঐ ছেলেটাকে!

***

"কি করছো আব্বু?"

আলো ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আতাউর আলমের দিকে তাকিয়ে আছে। আতাউর আলম মাথা তুলে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"ও আলো। আয়!"

আলো ভেতরে ঢোকে। আতাউর আলম বলে,"কি আর করবো। একটা নিবন্ধ লেখার চেষ্টা করছিলাম। একটা বেসরকারি নিউজ এজেন্সি থেকে রিকোয়েস্ট পেয়েছি। টাকা দেবে।"

আলো বাবার বিছানায় বসে,"মস্তিষ্কে চাপ পরে এমন কিছু তোমাকে করতে হবে কেন? বাদ দাও তো। টুক টাক চলছে তো সব। আজান আয়াতের স্কলারশিপের টাকা, তোমার দেশের বাড়ির জমি চাষের টাকা, আমার টিউশনির টাকা। চলে যাচ্ছে তো আব্বু। ব্যাবসা টা একবার দাঁড়াতে দাও আমার।"

আতাউর আলম ম্লান হাসে। তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"কোথাও যাচ্ছিস?"

আলো উঠে দাঁড়ায়।

"হ্যা আজ লোনের টাকা পরিশোধ করতে হবে। মাসে চারটা কিস্তি। এজেন্সিতে যাচ্ছি।"

আলো উঠে চলে যায়। আতাউর আলম মেয়ের যাওয়া দেখে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। কতটুকু বয়স মেয়েটার। অথচ এই বয়সে কতটা বুঝদার। নিজের কাধে কত দায়িত্ব তুলে নিয়েছে। মুখে একটা ক্রিম পর্যন্ত মাখে না। এই সাধারণ কিন্তু অসাধারণ মেয়েটির জীবনটা কেমন অগোছালো হয়ে গিয়েছে! গুছিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। কেউ না।

***

আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে ক্যাশ কাউন্টারের দিকে যায়। আজ এজেন্সি এতো ফাঁকা কেনো! আজ তো কিস্তির তারিখ। ক্যাশ কাউন্টারে একটা অচেনা মেয়ে বসে আছে। আলোকে দেখে একটা হাসি দিয়ে বলে,"হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ ম্যাম?"

_আমার লোন পরিশোধের প্রথম দিন।

_আচ্ছা, আপনি আমাকে আপনার আইডি নাম্বার দিন ম্যাম। এবং কাগজ গুলো।

আলো তার হাতের কার্ড টা মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়। কিছুক্ষণ ডেস্কটপে তাকিয়ে থেকে মেয়েটা বলে,"ম্যাম আপনি ভুল কার্ড দিয়েছেন। এই নামে কাউকে লোন দেওয়া হয়নি।"

আলো অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। তারপর বলে,"মানে? অদ্রিতা আলো আমি।"

_জ্বী ম্যাম‌। এটা তো আপনার নাম। কিন্তু আমাদের লিস্টে যে তিন জন মেয়েকে লোন দেওয়া হচ্ছে তাদের নাম, শাহিনুর ইসলাম, রুমানা মুক্তি এবং জান্নাতুল ফেরদৌস। আপনি চেক করে দেখতে পারেন।

আলো বোকার মতো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকে।

ক্যাশ কাউন্টারের মেয়েটাকে দূর থেকে সিনথিয়া হাত নে'ড়ে ইশারা করছে কিছু না বলতে কিন্তু মেয়েটা কোনোদিকে না তাকিয়ে গড়গড় করে কথা বলেই যাচ্ছে আলোর সাথে। আলো অসহায়ের মতো একবার হাতের ফাইল, একবার টাকা, একবার ক্যাশকাউন্টারের মেয়েটার দিকে তাকাচ্ছে।

***

"ভাই একটা গান শুনবেন?"

সামিন তৌফের কথায় তার দিকে না তাকিয়ে বলে,"দূর হ। ব্যাস্ত আমি।"

সব ছেলেরা চুপ হয়ে যায়। সামিন কিছুক্ষণ পরে বলে ওঠে,"তোর ভাবীর কোনো খবর আছে?"

_জ্বী। আজ সকালে দেখলাম কোথাও যাওয়ার জন্য রিকশা ঠিক করছে। রিকশা ওয়ালার সাথে রিকশা ভাড়া নিয়ে দশমিনিট ঝগড়া করলো। রিকশা ওয়ালা ত্রিশ টাকা ভাড়া চাচ্ছিল কিন্তু ভাবী পঁচিশ টাকার উপরে এক টাকাও দেবে না।

সব ছেলেরা হেসে ফেলে। সামিন রাগী দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকিয়ে বলে,"হাসার কি আছে? সব কটাকে চ'ড় মারবো। কতটা হিসেবী আমার বৌ দেখেছিস? এমন মেয়েই তো সংসারের উন্নতি করে। আমি আমার বৌকে নিয়ে গর্ব করি।"

সবাই চুপ হয়ে যায়। সামিন তৌফের দিকে তাকিয়ে বলে,"তারপর কি হয়েছে? ঐ রিক্সাওয়ালা জিতেছে নাকি আমার বৌ?"

_আপনার বৌ ভাই।

***

বৃদ্ধা রিকশা ওয়ালা একবার ঘাড় ঘুরিয়ে আলোর দিকে তাকায়। তারপর নরম গলায় বলে,"কাদতেছো কেনো মা?"

আলো তার জবাব দেয় না। ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ধরে কেঁদে যাচ্ছে।তার শরীরটা একটু পরপর কেঁপে কেঁপে উঠছে। রিকশা ওয়ালা আমতা আমতা করে বলে,"কোথায় নামায়া দিমু মা?"

আলো কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করে বলে,"সামিন ইয়াসারের পার্টি অফিসে।"

সামিন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। এখন তাকে বের হতে হবে। তার দলের ছেলেরাও সামিনের দেখাদেখি উঠে দাঁড়ায়। এমন সময় সবুজের ফোন আসে। সামিন ফোনটা রিসিভ করতেই সবুজ বলে,"ভাই ভাবী উপরে যাচ্ছে। কাঁদছে সে।"

ফোনটা রাখার সাথে সাথে দরজা ঠেলে আলো ভেতরে ঢোকে। সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। আলো প্রায় ছুটে গিয়ে সামিনের শার্টের কলার ধরে।

"আর কতবার? কতবার আপনি আমাকে অসম্মান করবেন ইয়াসার মির্জা?"

গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না আলোর। সে হাঁপাচ্ছে। সামিন নরম গলায় বলে,"কি হয়েছে আলো, আমি কখন তোমাকে অসম্মান করলাম?"

আলো সামিনকে ঝাঁকুনি দিয়ে বলে,"নাটক বাজ লোক। জুতো মেরে গরু দান করা হচ্ছে? খুব টাকা আপনার তাইনা? সেটাই দেখাচ্ছেন সব খানে? আমাকে ধোকার মাধ্যমে টাকা দেওয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? বলুন! কে দিয়েছে?"

সামিন ঘামতে থাকে। আলো জেনে গিয়েছে সবটা,এখন এই জেদী মেয়েটাকে সে কিভাবে সামলাবে!

আলো আবারো কলার ধরে,"সাহস কি করে হয় আমাকে ছোট করার? দয়া করার!"

সামিন আলোর নরম ছোটো দুটো হাত তার কলার থেকে সরিয়ে দিয়ে নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আলোর চোখের দিকে তাকায়, নরম গলায় বলে,"সরি আলো। আমি তো সবটা ঠিক ঠাক করতে চেয়েছি তোমার লাইফের।"

আলো চেঁচিয়ে ওঠে,"কি ঠিক করতে পেরেছেন? আমার বাবা একটা পঙ্গু লোকের মতো বাড়িতে পরে আছে, পেরেছেন ঠিক করতে? লোকজন রাস্তা ঘাটে আমাকে আপনার "খে'য়ে ছে'ড়ে দেওয়া মাল" বলে, পেরেছেন ঠিক করতে?"

কান্নায় ভেঙে পরে আলো। কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পরে। সামিন কিছুক্ষণ আলোকে দেখে হাঁটু গেড়ে তার মুখোমুখি বসে পরে। আলো বলতে থাকে,"এখন আপনি সবাইকে ভালো মানুষী দেখাচ্ছেন আপনার। সবাইকে নিজের অর্থ,ক্ষমতা,নাটক দিয়ে মুগ্ধ করতে চাইছেন তাইনা?"

সামিন নরম গলায় বলে,"এভাবে আমার অনুভূতির ভুল ব্যখ্যা দিও না আলো। আমি অনুতপ্ত, যা যা করেছি সবটা নিজের অনুশোচনা থেকে।"

_অনুশোচনা? সামিন ইয়াসারের অনুশোচনা হয়েছে কখনো?

সামিন আলোর চোখে চোখ রাখে। তারপর বলে,"তুমি দেখতে পাওনি বলে হয়নি,এমন টা তো নয় আলো। আমি তো নিজে নিজেকে জানি। আমি কতটা অন্ধকার মানুষ ছিলাম তা আমি জানি আলো। তুমি আমার জীবনে আলো হয়ে এসেছিলে। মানলাম সবটা আমার অ'প'রা'ধ। আমি অ'প'রা'ধী। কিন্তু একজন অ'প'রা'ধীও যে কখনো শুধরে নিতে পারে নিজেকে সেটা কেন তুমি মানতে পারছো না?"

_শুধরেছেন? কি শুধরেছেন আপনি? যে ভয়ংকর অ'প'রা'ধ আপনি করেছেন তার শাস্তি আপনি জানেন? পেয়েছেন শাস্তি? বুক ফুলিয়ে সমাজে মহান সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অবৈধ ভাবে প্রতিপক্ষকে বসিয়ে রেখে ভোটে জিতেছেন, লজ্জা করে না এই চেয়ারে বসতে? তারপর সবকিছুর উপরে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন আপনি।সবকিছু আপনার নিয়ন্ত্রনে চলছে, আমাদের বিয়ে, আমাদের ডি'ভো'র্স, উকিল, আমার জীবন। সবকিছু আপনিই নিয়ন্ত্রণ করছেন। শুধরেছেন টা কি আপনি? পাক্কা নাটকবাজ আপনি।

সামিন আলোর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলোর কান্নার বেগ বাড়ছে। সে উঠে দাঁড়ায়। সামিন নরম গলায় বলে,"ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে আলো। আমার অনূভুতি গ্রহণ করতে না পারো কিন্তু অসম্মান করো না অন্তত।"

আলো সামিনের দিকে তাকায়।

"ভালোবাসা? চাই না আপনার ভালো বাসা। চাই না আমি।"

উন্মাদের মতো ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করতে থাকে আলো। আলোর গায়ের ওড়না নিচে পরে যায়। সামিনের দলের ছেলেরা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সামিন গিয়ে আলোকে ধরে ফেলে। ওড়না উঠিয়ে আলোর শরীর ঢেকে দিয়ে আলোর চোখের দিকে তাকায়। আলো উন্মাদের মতো বিড় বিড় করে সামিনের চোখে চোখ রেখে বলে,"আপনার শাস্তির আসা আমি করিনা। আপনি রাজ করতে দুনিয়ায় এসেছেন, মন ভরে রাজ করুন। মেয়র হন,এমপি হন, অর্থবান হন। যা ইচ্ছা হন। শুধু আমাদের ছাপোষা পরিবার টাকে ছেড়ে দিন।

একটা কথা আপনাকে বলে দেই। আজ থেকে কখনো যদি আমি দেখতে পাই আপনি আমাকে আপনার ক্ষমতা,অর্থ দিয়ে দয়া দেখিয়ে,আমার আত্মসম্মানে আঘাত করছেন তাহলে আমি সু'ই'সা'ই'ড করবো সামিন ইয়াসার মির্জা। আমি মানুষের কাছ থেকে আপনার "খেয়ে ছে'ড়ে দেওয়া মা'ল" অপবাদ মাথায় নিয়ে বাঁচতে পারবো কিন্তু আপনার থেকে দয়া নিয়ে নয়। এর থেকে ভালো আমি আ'ত্ম'হ'ত্যা করব।"

কথাটা শুনে সামিন আলোকে ছেড়ে দেয়। আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে হাঁপাতে থাকে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তার ব্যাগ টা কাঁধে তুলে নেয়। তারপর যতখানি তেজ নিয়ে এসেছিল সামিনের সামনে ঠিক ততখানি নিস্তেজ হয়ে চলে গিয়েছে ।

সামিন দাঁড়িয়ে থেকে তার ছেলেদের মুখের দিকে তাকায়। সবাই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে নিস্তেজ কন্ঠে বলে ওঠে,"শেষমেশ ঐ আছিয়া ফে'রা'উ'ন'কে ডু'বি'য়ে'ই ছাড়লো রে রাহাত।"

***

বেশি রাত হয়নি। গলির রাস্তায় এখনো বড় ট্রাক চলছে। রিকশার বেল বাজছে। আলো মাথা তুলে উঠে বসতে চায় কিন্তু পারে না। মাথা ভারি হয়ে আছে তার। বেলা বারোটায় বাড়ি ফিরে সেই যে ঘরে ঢুকেছে এখনো বের হয়নি। রেহেনা এসে বারবার ডেকে গিয়েছে। বলেছে একটু একা থাকবে সে। মাথা ঘুরিয়ে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত আট-টা বেজে গিয়েছে। এখন না উঠলে আব্বু আম্মু বেশ চিন্তায় পরে যাবে। তাই কষ্ট হলেও উঠে বসে আলো। ওয়াশ রুমে ঢুকে চোখে মুখে পানি দিয়ে বের হয়। আজ কোনো অর্ডার নেয়নি সে। সেই মানসিক পরিস্থিতিতেও আলো ছিলো না।

হুট করে আলোর ঘরের দরজা ঠেলে আয়াত ভেতরে ঢোকে। আলো মাথা ঘুরিয়ে আয়াতের দিকে তাকিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই আয়াত হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,"আপু ইয়াসার ভাইয়া!"

আলো কপাল কুঁ'চ'কে ফেলে। আয়াত বলতে থাকে,"শিগগিরই বসার ঘরে এসো।"

আলো দ্রুত পায়ে হেঁটে বসার ঘরে যায়। বসার ঘরে আতাউর আলম, রেহেনা, আজান দাঁড়িয়ে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। আলো তাদের থেকে চোখ সরিয়ে টিভির দিকে তাকাতেই থ'ম'কে যায়। একটা লোকাল চ্যানেলে খবরের হেডলাইনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সে,

"নবনির্বাচিত তরুণ মেয়র সামিন ইয়াসার মির্জা তার পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছেন।"

সংবাদ পাঠিকা বলতে থাকে,"আজ সন্ধ্যা ছয়টা নাগাদ তিনি নিজের বাসভবনে বসে সাংবাদিকদের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।"

আলো খবরটা শুনে টিভির স্ক্রিনে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। স্ক্রিনে একটু পরপর সামিন ইয়াসারের একটা শুভ্র পাঞ্জাবির উপরে মুজিব কোট পরা হাস্যোজ্জ্বল ছবি দেখানো হচ্ছে। আলো কিছু বুঝতে পারছে না বিষয়টা। সে তার আব্বু আম্মুর দিকে তাকাচ্ছে।

টিভির রিমোট হাতে নিয়ে সে পরপর কয়েকটি চ্যানেল পাল্টাতে থাকে। প্রত্যেকটা লোকাল চ্যানেলে একই খবর। একটা চ্যানেলে দেখাচ্ছে জনগণের প্রতিক্রিয়া। সবাই সামিনের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে নারাজ। দলের ছেলেগুলো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কিছু একটা বলছে।

আলো টিভি অফ করে দেয়। কলিং বেল বেজে ওঠে। আজান গিয়ে দরজা খুলে দিতেই ইশিতা আর রিতু ভেতরে ঢোকে। রিতু কাঁদছে। ইশিতা এসে আলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় কান্না আটকে রেখে বলে ওঠে,"ভাইয়া পুলিশ কা'স্ট'ডি'তে আলো। সে সবকিছুর জবানবন্দি দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছে পুলিশের কাছে।"

আলো বোকার মতো ইশিতার দিকে তাকিয়ে আছে। রিতু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। তারপর ধরা গলায় বলে ওঠে,"তুমি জিতে গেলে ভাবী।"

আলো চুপ করে রিতুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ তার ফোন বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে একটা নাম্বার দেখে সে বুঝে যায় ওটা কার নাম্বার। রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ইশমাম বলে ওঠে,"অদ্রিতা।"

চলমান......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন