ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৫৮তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৫৮ [অন্তিম পর্ব]

#Esrat_Ety

[ ৫৮ পর্বের ১ম অংশ ]

[এটা অন্তিম পর্বের ১ম অংশ। ২য় অংশ এখনই পোস্ট করা হবে 🌼]

ক্যালেন্ডারের পাতায় টিক চিহ্ন এঁকে দিয়ে আরো একটি দিনের সমাপ্তি ঘটায় আলো। আজ উনত্রিশে এপ্রিল। ডেলিভারির তারিখ চৌঠা মে। মাত্র পাঁচদিন হাতে সময়। অভিজ্ঞদের মতানুযায়ী আলোর শারীরিক যন্ত্রণা একটু একটু করে শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু আলো তেমন কিছুই টের পাচ্ছে না। অবশ্য দিনে অসংখ্যবার একজন দুষ্টু প্রাণ নিয়ম করে ফুটবল খেলছে পেটের মধ্যে। মাকে জানাচ্ছে,"মা আমি আসছি। তুমি আর বাবা তৈরি তো?"

দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ হয়। খোলার আগে আয়নায় একবার নিজেকে দেখে নেয় আলো। তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যায়।

দরজা খুলে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে থাকে আলো। সামিন এদিক ওদিক তাকিয়ে আলোকে শুরুতেই একটা চু'মু খেয়ে ঘরে ঢুকে দরজা চাপিয়ে দেয়। আলো গম্ভীর হয়ে আছে। সামিন আলোর হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজে বিছানায় বসে আলোকে কোলে বসায়। আলো রাগী দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন আলোর পেটে হাত রেখে আদুরে কন্ঠে বলে,"জ্বা'লিয়েছে নাকি আজ খুব? মেজাজ এতো চ'টে আছে কেন?"

আলো সামিনের হাত সরিয়ে দিয়ে বলে,"আপনি আমাকে না জানিয়ে ডক্টর আফসানার সাথে কথা বলেছেন?"

সামিন আলোকে উঠিয়ে নিজেও উঠে দাঁড়ায়। হাত ঘড়ি খুলে টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বলে,"হু।"

_কেন? আচ্ছা আপনি কেন বুঝতে চাইছেন না আমি একটা নরমাল ডেলিভারি চাই। আপনি এতো জে'দ করছেন কেন?

_জেদ তো তুমি করছো। যেখানে তোমার শরীর বুঝতে চাইছে না সেখানে আমি বুঝে কি করবো? বাড়াবাড়ি করবে না আলো একদম। বেবি সি-সেকশনের মাধ্যমেই হবে।

আলোর ইচ্ছে করছে রাগে নিজের চুল ছিঁ'ড়তে। কিন্তু তাকে উত্তেজিত হলে চলবে না। সামিন গাঁয়ের মুজিব কোট খুলে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ওয়াশ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নেয়।

আলো তোয়ালে বের করে দাঁড়িয়ে আছে। পরী দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায়। মৃদু আওয়াজে বলে,"আসবো ভাবী?"

_কেনো? কি কাজ?

কাটকাট বলে ওঠে আলো।

পরী চুপচাপ ঘরে ঢুকে দাঁড়িয়ে থাকে । আলো তার দিকে শীতল দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে। পরী আলোর দৃষ্টি দেখে ভ'য় পেয়ে যায়। আমতা আমতা করে বলে ওঠে,"ভাইয়া এসেছে?"

_ভাইয়ার জন্য এই ঘরে আসোনি। কেনো এসেছো ঝেড়ে কাশো। ইশমাম পাঠিয়েছে? কেনো ওর সাহস নেই? তোমাকে দিয়ে পথে শিশির কাটায়!

পরী নিচু স্বরে বলে ওঠে,"তোমার কাছে বলতে নাকি লজ্জা পায় উনি।"

আলো চুপ করে থেকে বলে ওঠে,"তিন তিনবার মানুষটাকে দুজন মিলে ফিরিয়ে দিয়েছো। এখন এতদিন পরে মনে হচ্ছে তোমরা দুজন দুজনকে পছন্দ করো। আমাদের বললে আর আমরা নাচতে নাচতে রাজি হয়ে যাবো? কি ভাবো কি আমাদের?"

পরী চুপ করে থাকে। কেনো যে লা'জ শরমের মাথা খেয়ে এখানে এলো!

আলো অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ঠোঁট টিপে হেসে নেয়। তারপর কন্ঠে গাম্ভীর্য ভাব এনে বলতে থাকে,"আমাকে বলেছো বলেছো। এই কথা ইয়াসার মির্জাকে বলতে যেও না। কাঁচা খেয়ে নেবে দুটোকে। আর একটা কথা, তোমার না সামনের মাসে এক্সাম? তুমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে!"

_ভাবী,উনি চাইছিলেন আমেরিকা যাওয়ার আগে বিয়েটা....

_বিয়ে? সে আর হচ্ছে! যাও এখান থেকে।

পরী মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সামিন ওয়াশ রুম থেকে বেরিয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"কে এসেছিলো?"

_পরী।

_আবার কি?

_সেই এক গান।

সামিন মৃদু হেসে ফেলে। আলো বলে ওঠে,"বলছিলাম কি! এবার একটু কঠোর হয়ে যাচ্ছি না আমরা ওদের প্রতি? ওরা তো ওদের যায়গায় ঠিক , দেখুন এটা ২০২৩ সাল, আমরা জোর করে দু'জনের বিয়ে দিয়ে দিলাম আর ওরা সংসার করতে শুরু করলো এটা তো আশা করলে চলবে না, তারচেয়ে দুজন নিজেরা নিজেরা ধীরে ধীরে একে অপরের প্রতি অনূভুতি জরো করেছে এটাই তো ভালো হয়েছে তাইনা? আর সবাই কি আলো নাকি যে জোর করে বিয়ে হলেই মানিয়ে নেবে!

শেষের লাইনটা সামিনকে খোঁ'চা মে'রে বলে আলো,সামিন আলোকে টেনে নিজের কাছে এনে বলে,"আচ্ছা! মানিয়ে নিয়ে খুব দুঃখ হচ্ছে দেখছি!"

_দুঃখ না! কষ্ট হচ্ছে! আমার পেটে কষ্ট হচ্ছে। লা'থি দিচ্ছে।

চাপা স্বরে চেঁচিয়ে বলে ওঠে আলো।

সামিন তৎক্ষণাৎ হাঁটু গেড়ে বসে পরে। পেটের ওপর থেকে শাড়ির অংশটা সরিয়ে উন্মুক্ত পেটে চু'মু খায়। পেটে কান পেতে উচ্ছসিত গলায় বলে,"ওয়েল ডান আম্মা! কিন্তু আম্মা,এখন যতো পারেন শা'য়েস্তা করে নিন মাকে। বাইরে এলে আর পারবেন না মায়ের সাথে। আমি যেমন পারিনা। সবাইকে লেজে*গোবরে করে রাখে এই মহিলা।"

আলো হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে। সামিন মাথা তুলে আলোর দিকে তাকায়। উঠে দাঁড়িয়ে বলে,"ভূরিভূরি ম্যাটার্নিটি ড্রেস এনে দেওয়া হয়েছে। তারপরও শাড়ি কেনো পরো? একটু আরামদায়ক কিছু পরো।"

আলো ম্লান হেসে বলে,"মাত্র দশঘন্টা কাছে পাই আপনাকে,তার মধ্যে আটঘন্টা ঘুমান। বাকি থাকে দুঘন্টা,ঐ দুঘন্টা একটু সেজেগুজে আপনার সামনে থাকতে ভালো লাগে মেয়র সাহেব।"

সামিন আলোকে আগলে নিয়ে বলে,"তুমি আমাকে এখনও মেয়র সাহেব কেন ডাকো? তোমার স্বামী একজন সাংসদ সেটা ভুলে যাও নাকি? "

_সে আপনি সাংসদ, মন্ত্রী, মিনিস্টার যাই হোন না কেনো। আমার কাছে আপনি বরাবর আমার মেয়র সাহেব থাকবেন।

সামিন মৃদু হেসে আলোর কপালে চু'মু খেয়ে বলে,"তুমি খুব রাগ করো আমি তোমাকে সময় দিতে পারিনা বলে? অথচ আমি কথা দিয়েছিলাম সবসময় তোমার পাশে থাকবো।"

আলো হেসে বলে,"মোটেও রা'গ করি না। আচ্ছা আজ খবরে দেখলাম কবীর আলমগীরকে কানাডার বাড়িতে ঢুকতে না দিতে ওখানকার বাংলাদেশী অভিবাসীরা এ্যাম্বাসিতে আন্দোলন করেছে। ও এখন কোথায় পালাবে?"

_কোথায় আবার, ইতালি। ওর ছোটো ভাইয়ের কাছে। জুঁইও তো সেখানে। ওখানকার একজন বিজনেস ম্যানকে বিয়ে করে নিয়েছে।

_আর জাবির? ওর তো সাজা এখনও শেষ হয়নি!

_হু,তবে ওর ফুপা ঢাকা সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। চেষ্টা চালাচ্ছে।

আলো শুকনো গলায় বলে,"ওকে জামিন দিয়ে দেবে? এতো বড় একটা স্কা*উন্ড্রেলকে!"

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"ওকে স্কা*উন্ড্রেল বলছো,আমার গায়ে লাগছে।"

_ওমা ! তা কেনো?

_ওই তো। আমিও তো তোমাকে তুলে এনেছিলাম।

আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন হেসে ফেলে। তারপর

আলোর গালে একটা চু*মু খেয়ে বলে,"আমি খেতে যাচ্ছি। তুমি রেস্ট নাও।"

***

পেছন থেকে জাপ্টে ধরতেই ইশিতা লাফিয়ে ওঠে প্রথমে। তারপর নিজেকে ধা'তস্থ করে শান্তকে একটা ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"কি হচ্ছে কি! সবসময় এমনভাবে জাপটে ধরো মনে হয় যেনো লাফিয়ে লাফিয়ে চোর ধরছো।"

শান্ত নিস্তেজ গলায় বলে,"বাপের বাড়ি আসলেই দেখছি গলার জোর বেড়ে যায় খুব। বাড়িতে তো খুব পতি'ভক্তি দেখাও।"

ইশিতা হেসে ফেলে। শান্তর গলা থেকে টাইয়ের নট খুলতে খুলতে বলতে থাকে,"এলে কেনো?"

_একা একা অত বড় বিছানায় ঘুমাতে পারি না। এমনিতে তোমার বাপের বাড়ি আসার আমার কোনো শখ নেই!

ইশিতা বলে,"হুম! সেটা খুব বোঝা হয়ে গিয়েছে আমার।"

শান্ত এগিয়ে গিয়ে ইশিতার কোমর জড়িয়ে ধরে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে ওঠে,"কি ব্যাপার। আজ একটু বেশিই সুন্দর লাগছে দেখছি!"

এমন সময় ইশমাম ঘরে ঢুকে পরে। শান্ত আর ইশিতা লাফিয়ে দুজন দুদিকে সরে দাঁড়ায়। ইশমাম বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে। ইশিতা চেঁ'চিয়ে ওঠে,"নক করে ঢুকতে পারিস না স্টু'পিড! তুই কি বড় হবি না!"

শান্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,"এইজন্য তোমার বাপের বাড়ি আমি আসতে চাইনা।"

_তো আসো কেন? নেমন্তন্ন ছাড়া শশুর বাড়িতে কোনো জামাই এতো ঘনঘন আসে এটা তোমায় না দেখলে জানতামই না। আমার ভাইদের দেখেছো কখনো ঘনঘন শশুর বাড়ি যেতে?

ইশমাম ঠান্ডা গলায় বলে।

_আমি তো আমার বৌয়ের প্রোপার্টি বুঝে নিতে আসি।

হাসতে হাসতে শান্ত বলে।

ইশিতা কপাল কুঁচকে ইশমামকে বলে,"তুমি তুমি কি বলছিস? দুলাভাই তোর। আপনি বল!"

_তুই আমার থেকে তিন মিনিটের বড় মাত্র। আমার আপু নোস!

শান্ত গা থেকে ব্লেজার খুলতে খুলতে বলে,"তো শা'লা! কি দরকারে এলে এই ঘরে?"

ইশমাম দরজা চাপিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে যায়। ইশিতা বলে,"কি? আবার সেই ঘ্যান ঘ্যানানি? আমার কাছে এসে কোনো লাভ নেই। আমি কিছু পারবো না।"

শান্ত দুই ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে ওঠে,"কি? পরীর ব্যাপারে? তো ইয়াসার মির্জার সাথে কথা বললেই তো হয়। এতো ভ'য় পাওয়ার কি আছে!"

_কে কথা বলবে? তুমি বলবে? ভাইয়া তিন তিনবার ওদের বিয়ের কথা উঠিয়েছে,ওরা তিন তিনবার ভাইয়াকে রি'জেক্ট করেছে। এখন আর ভাইয়া মানবে না। ইয়াসার মির্জার রা'গ সম্পর্কে তোমার কোনো আইডিয়া নেই।

ইশিতা শান্তর দিকে তাকিয়ে বলে।

শান্ত বলে,"শালাবাবু আমেরিকা যাওয়ার আগে অন্তত যদি আংটি বদল করে রাখা যেতো তাহলে বেশ হতো। ছয়মাস পরে আমেরিকা থেকে ফিরলে না হয় বিয়েটা দিয়ে দিতাম।"

ইশমাম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইশিতা বিরস মুখে বলে,"সেটাই! কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে? হু উইল বেল দ্যা ক্যাট! আমি তো পারবো না বাবা! বড় ভাবীই যেখানে পারছে না সেখানে আমি তো দুধ ভাত।"

ইশমাম চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। করিডোর থেকে নিজের ঘরে যাওয়ার পথে পরীর সাথে দেখা। দুজন দুজনকে দেখে অন্যদিকে তাকিয়ে হাঁটতে থাকে। তারপর পাশ কাটিয়ে চলে যায়। ইশমামের প্র'জেক্টের ব্যস্ততা,পরীর লেখাপড়ার ব্যস্ততায় যেটুকু কথা হয় তা ফোনকল কিংবা মেসেজে। সামনাসামনি কখনই অনূভুতি ব্যক্ত করা হয়ে ওঠেনি কারো।

খাবার টেবিলে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। ইলহাম ইরফানকে নিয়ে নিচতলার লিভিং রুমে পায়চারি করছে। ইরফানের এগারো মাস পূর্ন হতে চলেছে। বাবা তাকে ছড়া শোনাচ্ছে,সে হাসতে হাসতে কুটিকুটি হচ্ছে।

খাবার টেবিলে খেতে বসেছে সামিন,শান্ত,ইশমাম।

ইশিতা আর রিতু পরিবেশন করে দিচ্ছে। খেতে খেতে সামিন আড়চোখে ইশমামের দিকে একপলক তাকায়, কিছু সময় পরে ইশমামকে শুনিয়ে শুনিয়ে রিতুকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,"পোনা চাচা গ্রাম থেকে ফোন দিয়েছিলো। পরীর জন্য একটা ছেলে দেখেছে। ছেলে ডাক্তার। বয়স বেশি না। ভালো ঘরের, পরীর ছবি দেখেই বেশ পছন্দ করে ফেলেছে।"

ইশমাম খাওয়া থামিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। সামিন ইশমামের দৃষ্টি উপেক্ষা করে বলতে থাকে,"ছেলের ঠিকানা দিয়েছে আমায়। ভাবছি কাল দেখা করবো। পোনা চাচা বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তার অনেক ইমোশন। তাই বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দেই। কি বলো রিতু? তোমার ভাবীও সবসময় বলে।"

রিতুর ভাসুরের থেকে চোখ সরিয়ে ইশমামের দিকে তাকায়। শান্ত আর ইশিতাও খাওয়া থামিয়ে ইশমামের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশমামের খাওয়া হয়ে গিয়েছে তাই জলদি জলদি হাত ধুয়ে উঠে পরে।

সামিন চুপচাপ খেতে থাকে। হঠাৎ করে ফোনের ভাইব্রেশনের শব্দে তাকিয়ে টেবিলের ওপর ইশমামের ফোনটা দেখতে পায়। ফোনটা ভুলে ফেলে রেখে গিয়েছে। সামিন হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রেখে বলে,

"সান্ত্বনা পুরস্কার! এটা আবার কেমন নাম? কে ফোন দিচ্ছে ইশমামকে!"

ইশমাম দ্রুত পায়ে ছুটে এসে ছো মে'রে সামিনের হাত থেকে ফোন কে'ড়ে নিয়ে চলে যায়। সামিন সবার মুখের দিকে তাকায়। সান্ত্বনা পুরস্কার কে আবার! সে বুঝতে পারছে না!

ইশিতা আর শান্ত হাসি চাপিয়ে রেখে চুপচাপ খাচ্ছে।

***

ইরফানের পাশে ঘুমন্ত ইহানকে শুইয়ে দেয় ইলহাম । ইহান এতক্ষণ আলোর কাছে ঘুমিয়ে ছিলো। সেখান থেকেই তুলে আনা হয়েছে।

ইলহাম রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"আমাদের জন্য বিছানায় আর কোনো জায়গা রইলো না যে রিতু!"

_মেঝেতে বিছানা পাতবো?

_সেটাই করো। দু'জনে কিভাবে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে দেখো। ভাবটা এমন যেনো এই মুল্লুক আমার! দু'টোর মধ্যে একটা গু'ন্ডা গু'ন্ডা ভাব আছে, আমি খেয়াল করেছি। বড় বাবার মতো হবে দুজন সম্ভবত, পলি*টিশিয়ান।

_হ্যা, তেমনই হোক! বাবার মতো রে*পিস্ট না হলেই হলো!

ইলহাম থমথমে মুখ নিয়ে রিতুর দিকে তাকায়। রিতু হাসতে হাসতে বলে,"দুঃখিত! এই কান ধরলাম। আর বলবো না!"

ইলহাম কোনো কথা না বলে বড় আলমারি থেকে ম্যাট্রেস বের করে মেঝেতে বিছিয়ে দেয়। রিতু সুন্দর একটা বিছানার চাদর বিছিয়ে দেয়। ইলহাম একটা বালিশ এনে রাখে। রিতু ইলহামকে দেখে, হাতে হাতে সব কাজে রিতুকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। ইরফানের দেখভাল করতে সবসময় সচেষ্ট থাকে। চেহারায় কেমন একটা মুরব্বি মুরব্বি ভাব এসেছে। পোশাক আশাকের স্টাইল নিয়ে অতটা ভাবে না আগের মতো। নয়টা-পাচটা অফিস করে বাড়িতে এসে একটা টিশার্ট আর ট্রাউজার পরে ইরফানকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করে, ইহানকে পড়াতে বসায়। ফোন ঘাটে না আগের মতো, ক্লাবে যায়না।

রিতু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওয়াশ রুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে আসে। ইলহাম রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"এটা কি পরেছো!"

রিতু নিজের দিকে তাকিয়ে ইলহামের দিকে তাকায়, তারপর বলে,"কেনো! নাইটড্রেস।"

ইলহাম তাকিয়ে থাকে,কয়েক মূহুর্ত পরে বলে,"শাড়ি পরো।"

_কেন? ভালোলাগছে না? জুঁই পরলে তো তখন নিশ্চয়ই মুগ্ধ হয়ে দেখতেন।

ইলহাম রিতুর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে ঠান্ডা গলায় বলে,"জুঁইদের নাইট*ড্রেস পরতে হয় বয়*ফ্রেন্ডকে মুগ্ধ করতে। রিতুরা শাড়ি পরেই স্বামীদের মুগ্ধ করতে পারে।"

রিতু গিয়ে নাইট*ড্রেস পালটে একটা সুতির শাড়ি পরে আসে। ইলহাম কিছুক্ষণ তাকিয়ে রিতুকে দেখে বলে ওঠে,"ঘুম আসছে না। চলো বারান্দায় গিয়ে বসি।"

***

প্রায় ত্রিশ মিনিট যাবত কানের সাথে ফোনটা চেপে ধরে রেখেছে। গম্ভীর কন্ঠে শুধু হু হা করে যাচ্ছে।

আলো জানালার কাছে দাঁড়িয়ে জোৎস্না দেখছিলো।‌ মাথা ঘুরিয়ে সামিনকে একপলক দেখে তারদিকে এগিয়ে আসে। পেটে হাত চেপে ধীরে ধীরে তার পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখে। সামিন ফোনে কথা বলতে বলতে তাকে আগলে নেয়।

দীর্ঘসময় পরে ফোন কেটে আলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,"কি হয়েছে? শরীর খারাপ করেছে?"

_না। হাত পায়ে কেমন একটা করছে শুধু।

সামিন উঠে আলোকে বিছানায় উঠিয়ে তার হাত পায়ের তালুতে মাসাজ করে দিতে থাকে আলোর বারণ সত্তেও।

_কার সাথে এতক্ষণ কথা বলছিলেন আপনি? মোটে দুঘন্টা আপনার সাথে কথা বলার সময় পাই। তার ভেতর থেকেও আধাঘণ্টা আপনি যদি রাজ*নীতিকে দিয়ে দেন তাহলে তো সেটা মানা যায়না!

সামিন মৃদু হেসে বলে,"আজ ক্ষ*মা করে দাও । আসলে জেলা দল থেকে অনেককে ছাঁটাই বাছাই করতে হচ্ছে। নয়তো দলকে ডুবিয়ে ছাড়তো কবীর আলমগীরের মতো।"

_সভাপতি হতে না হতেই ক্ষমতা দেখাতে শুরু করে দিয়েছেন?

_না, জনগণের কল্যাণে করতে হচ্ছে। এরা হচ্ছে কাল কে*উটে। একসময় নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থে আমাকে দল থেকে বের করতে চেয়েছিলো।

আলো কিছুক্ষণ সামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,"আচ্ছা আপনি কখনো দুর্নীতি করেন না? রাজনীতিতে কেউই ১০০ % সৎ থাকতে পারে না।"

সামিন হেসে ফেলে,হাসতে হাসতে বলে,"ছোটো খাটো দূর্নীতি করা হয়। একেবারেই যে করি না এমন নয়।"

আলো শীতল চোখে সামিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সামিন উচ্চশব্দে হাসছে। আলোর গালে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,"দূর্নীতি করলে আজ কানাডায় একটা বাড়ি থাকতো। বৌয়ের নামে চার পাঁচটা ব্যাংক একা*উন্ট থাকতো। অবশ্য সবে তো সব শুরু। দেখি কি হয়।"

_কানাডায় বাড়ি করার কি প্রয়োজন? আমাদের শান্তিনীড়ের বাড়িতে কি শান্তি কম পরেছে!

_এই দেখো! এখন তুমিই কিন্তু রাজ*নীতি নিয়ে পরে আছো।

আলো প্রসঙ্গ পালটে বলে ওঠে,"কাল কি আপনি ব্যস্ত থাকবেন?"

_হ্যা। কাল অপজিশন পার্টির সাথে বৈঠক আছে।

_কেন? কোন আনন্দে?

_প্রেসক্লাবে ভাঙচুরের ঝামেলা নিয়ে বসতে চাচ্ছি। একটা মধ্য*স্থতা করা দরকার।

_ফের ঐ সাগর নিজের গদিতে শক্ত পোক্ত হয়ে বসেছে।

_হুম। মাঝখানে যখন হজ্ব করতে গিয়েছিলো তখন বেশ অবাক হয়েছিলাম। ভাইয়ের মৃ*ত্যু, শমশের ভুঁইয়ার স্ট্রো*কের পরে বিছানা নেওয়া। ভেবেছি আর মাথা তুলে দাড়াতেই পারবে না।

_এখন তবে? ওকে নিয়ে যে আমার ভয়। সাংঘাতিক একটা লোক।

সামিন হেসে ফেলে, তারপর বলে,"আমি তো খুশি হয়েছি!"

_কেন?

আলো অবাক হয়ে জানতে চায়।

সামিন বলে,"রাজনীতির পথটা স্মুথ হলে মজা কোথায়? ওর মতো নির্লজ্জ বি'ষাক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দরকার। হাড্ডাহাড্ডি ল*ড়াই না হলে ভালো লাগবে না।"

আলো তাকিয়ে আছে সামিনের কথা শুনে। সামিন বলতে থাকে,"তাছাড়া গল্প কি এখানে শেষ? গল্প চলতে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। না ও ওর গদি ছাড়বে,না আমি আমার গদি ছাড়বো। আমাদের ছেলেমেয়েরাও ওর ছেলেমেয়ের সাথে ল'ড়বে।"

আলো বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ কারন্ত শব্দ করে বলে ওঠে,"কখনোই না। আমি ইহান,ইরফান, আমাদের মেয়ে, বা এই পরিবারের কোনো ছেলেমেয়েকে রাজ*নীতিতে জড়াতে দেবো না। ওরা ডাক্তার হবে,গবেষক হবে।"

_না,ওরা পলিটি*শিয়ানই হবে। ইহান ইরফান আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের মেয়েদের তুলে এনে বিয়ে করবে। ভাবা যায় কতটা থ্রি*লিং হবে ব্যাপারটা?

হাসতে হাসতে বলে সামিন।

আলো কপাল কুঁচকে, ক'ট'ম'ট দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বলে,"হ্যা। খুব থ্রি*লিং। আর আপনার কন্যা যদি আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর ছেলের সাথে ভেগে যায় তাহলে ব্যাপারটা আরো থ্রি*লিং হবে!"

সামিন হেসে বলে,"সে দেখা যাবে। আগে আমাদের গল্প শেষ হোক। তারপর না হয় ওদের গল্প শুনবো!"

আলো একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"এসব বাদ দিন। আপনি ইশমাম আর পরীর বিয়েটা কেনো দিচ্ছেন না? অনেক তো নাটক করলেন! এবার বিয়ে দিয়ে দিন।"

আলোকে শুইয়ে দিয়ে সামিন পাশে কাত হয়ে শুয়ে আলোকে আগলে ধরে বলে,"পরীর এক্সাম শেষ হোক। নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া আরো দৃঢ় করুক। ধৈর্য্যের পরিক্ষা কি সামিন ইয়াসার মির্জা একা দেবে? সবাই দিক!"

***

পুরো প্র*জেক্ট টা আরো একবার রিভিশন দিয়ে ইশমাম ফোন টা হাতে নেয়। রাত প্রায় বারোটা বেজে গিয়েছে।

"প্রেম মানুষের জীবনে কতবার আসে?"

পরী ফোনের নোটিফিকেশনের শব্দে হাতের একাডেমিক বইটা পাশে সরিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে ইশমামের মেসেজটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটার নিত্যদিনের কাজ হলো কথোপকথন কোনো অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা,যার উত্তর দেওয়া পরীর সাধ্য নয়।

সে কিছু একটা চিন্তা করে মেসেজটার উত্তর পাঠিয়ে দেয়,"যতবার মানুষের স

সান্ত্বনা পুরস্কার পেতে ইচ্ছে করে। ততবারই জীবনে প্রেম আসে। প্রেম বড্ড স্বস্তা ব্যাপার ইশমাম মির্জা।"

ইশমাম পরীর উত্তর দেখে কিছুক্ষণ হাসে। তারপর বলে,"এজন্যই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"

পরী কোনো উত্তর দেয়না। ইশমাম লেখে,"ঘুমাও। বেশী রাত জাগলে মারুফা চাচীর ভু'ত এসে আড্ডা দিতে চাইবে তোমার সাথে।"

_আসবে না। আয়াতুল কুরসি পড়েছি।

ইশমাম হেসে ফেলে,লিখতে থাকে,"বুদ্ধি সুদ্ধি আগের থেকে একটু বেড়েছে।"

***

হুট করে অসহ্য লাগতে শুরু করেছে। প্রচন্ড ঘামছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পায় সামিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আলো ধীরে ধীরে উঠে বসে, খুবই অস্থির লাগতে শুরু করেছে তার। রেহেনার কাছে যেমনটা শুনেছে সেরকম অনূভুতি হচ্ছে। সামিনকে ডাকতে গিয়েও ডাকে না। লোকটা যদি ভ'য় পেয়ে হসপিটালে নিয়ে সি-সেকশন করিয়ে দেয়! ঐ মাথা খা'রাপ লোককে ডাকা যাবে না। হতে পারে এটা ফলস পেইন, আলো পেটে হাত চেপে ধীরপায়ে বিছানা থেকে নেমে ওয়াশ রুমে ঢোকে।

কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে চাপা স্বরে চেঁচাতে থাকে। সামিনের কানে প্রথমে সে চিৎকার পৌঁছায় না। পর মুহুর্তে লাফিয়ে উঠে আলোর কাছে ছুটে গিয়ে আলোকে ধরে,"কি হয়েছে? কি হয়েছে?"

আলো দাঁতে দাত চেপে বলতে থাকে,"রিতুকে ডাকুন! পরীকে ডাকুন, শিগগিরই!"

_ওদের কেনো? আমাকে বলো?

_আপনি কি মেয়ে? শিগগিরই ওদের ডাকুন পাগল লোক কোথাকার।

চেঁচিয়ে ওঠে আলো!

চলমান....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন