ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগলো চোখে

৫৯তম পর্ব

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে

#পর্বসংখ্যা_৫৮_অন্তিম_পর্বের_২য়_অংশ

#Esrat_Ety

[৫৮ পর্বের ২য় অংশ]

শান্তকে দেখে ইশিতা কপাল কুঁ'চ'কে তার দিকে তাকিয়ে আছে। শান্ত ঘাবড়ে যাওয়া মুখ করে বলে,"কি? কি করলাম আমি?"

_তুমি আবার লুঙ্গি পরেছো?

দাঁত খিচিয়ে বলে ইশিতা।

_হ্যা পরেছি , তো? আচ্ছা তোমার এই লুঙ্গির সাথে কি সমস্যা একটু বলো তো!

_লুঙ্গি একটা অ'শ্লীল পোশাক। দেখলে আমার হাড় জ্বলে যায়।

_লুঙ্গি অ'শ্লীল পোশাক!?

শান্ত যারপরনাই অবাক হয়ে যায়। তারপর আবার বলে ওঠে,"এটা একটা ঐতিহ্যবাহী পোশাক বাঙালির। তুমি অ'শ্লীল বানিয়ে দিলে? তোমার পূর্বপুরুষ রা অ'শ্লীল পুরুষ?"

_আমার পূর্বপুরুষ রা লুঙ্গি পরতো না।

_কিন্তু আমার পূর্বপুরুষ পরতো। তাই আমিও পরবো। আর তাছাড়া আমি উঠে এসেছি গ্রাম থেকে। তোমার ভাইদের মতো সাহেব নই, সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি!

_এক্ষুনি এটা পাল্টে এসো বলছি। নয়তো আমি বিছানায় উঠতে দেবো না তোমাকে।

_কাম অন ইশু, এপ্রিলের গরম। তোমাদের এসিতে কাজ হয় না। এটা পরে ঘুমালে একটু আরাম লাগে,হাওয়া বাতাস ঢুকতে পারে‌।

_ছিঃ কি কথা বার্তার ছি'ড়ি!

কান চেপে ধরে ইশিতা শান্তকে ধ'মক দেয়।

বাইরে সামিনের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যায়। ইশিতা শান্তর দিকে তাকায়। শান্ত বলে,"ঐ যে শুরু হয়ে গেলো! আমি আজ ভাবীকে খানিকটা অসুস্থ দেখেই বুঝেছি আজ কিছু হবে! চলো এবার, আমাদের হসপিটাল ছুটতে হবে। তার আগে লুঙ্গি টা পাল্টে আসি আমি!"

পরী সামিনের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। সামিন এগিয়ে যায়, পরী বলে ,"আমাদের এক্ষুনি বেরোতে হবে ভাইয়া। চলুন।"

***

"তুমি কি পাগল হলে নাকি সামিন? বলেছি তো নরমাল ডেলিভারি পসিবল। তারপরেও সি-সেকশন নিয়ে পরে আছো। এটা কোন ধরনের শখ?"

_আপা ওর কষ্ট হবে।

নরম গলায় বলে ওঠে সামিন।

_আলে আলে! কি কথা! পৃথিবীতে ভূরিভূরি মেয়েরা মা হচ্ছে! তাদের তো আর কষ্ট হচ্ছে না! যাও, যাও গিয়ে বাইরে অপেক্ষা করো। আমাদেরকে আমাদের কাজ করতে দাও।

ডক্টর আফসানা ভেলিভারি রুমে আলোর প্রেশার চেক করতে করতে বলে। আলো চাপা আওয়াজে আর্তনাদ করে যাচ্ছে। পরী তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সামিন করুণ দৃষ্টি দিয়ে তার বৌয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিনের চোখে আলোর চোখ পরতেই আলো চেঁচিয়ে উঠে ডক্টর আফসানাকে বলে,"আপা আপনার আল্লাহর দোহাই লাগে এই আ'হাম্মক লোকটাকে এখান থেকে সরান। উনি আমাকে টেনশন দিচ্ছে। ওনাকে প্লিজ বাইরে বের করে দিন।"

সামিন দাঁড়িয়ে থাকে । ডক্টর আফসানা ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"যাও সামিন। বের হও।"

সামিন তবুও দাঁড়িয়ে থাকে। পরী প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে এসে সামিনের হাত ধরে টেনে ভেলিভারি রুম থেকে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।

বিশাল ওয়েটিং রুমে মির্জা বাড়ির সব লোক এবং আতাউর আলমের পরিবার বসে আছে। রেহেনা একপাশে বসে দু'চোখ বন্ধ কর তাসবিহ পাঠ করছে। সামিন গিয়ে চূ্পচাপ তার পাশে মাথা নিচু করে বসে থাকে। রেহেনা মাথা ঘুরিয়ে একপলক তাকে দেখে বলে,"শান্ত থাকো। আল্লাহ সহায় হবেন।"

তারপর আবারও তাসবিহ পাঠ করতে থাকে। ভেলিভারি রুম থেকে মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে, যা খুবই অস্পষ্ট!

হঠাৎ কোনো পুরুষালি নাকি কান্নার আওয়াজ কানে যেতেই সামিন মাথা তুলে তাকায় । ওয়েটিং রুমে দূরেই তার মুখোমুখি বেঞ্চিতে বসে আছে আতাউর আলম। টিস্যু পেপার হাতে নিয়ে চোখ চেপে ধরে কেঁদে যাচ্ছেন তিনি। আর কিছুক্ষণ পরপর এক একটা দীর্ঘশ্বাস বের করে বলে যাচ্ছে,"আমার মা! আমার মা!"

আজান আয়াত বাবার দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।

সামিন আতাউর আলমের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখে চ কারন্ত শব্দ করে বলে ওঠে,"এই কেউ ওনাকে এখান থেকে নিয়ে যাও তো! ওনাকে দেখে আমার টেনশন বেড়ে যাচ্ছে!"

আতাউর আলম কান্না থামিয়ে সামিনের দিকে একপলক তাকায়। তারপর আবার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলে,"আমার মা ‌। মা রে!"

সামিন ঘার ঘুরিয়ে রেহেনার দিকে তাকিয়ে বলে,"ওনাকে আপনি বিয়ে করেছিলেন কি দেখে মা?"

রেহেনা সামিনের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলে,"তখন আমার বাবাকে বোঝানোর জন্য যদি তুমি থাকতে!"

***

ইশিতার হাতে পরীর ফোন। ইশমাম ফোন দিচ্ছে। ইশিতা ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ইশমাম বলে ওঠে,"হ্যা হ্যালো! তোমরা কোন ফ্লোরে একটু বলবে? আমি তো ভুল করে শিশু ওয়ার্ডে চলে গিয়েছিলাম!"

_আমরা সেকেন্ড ফ্লোরে ইশমাম। ওখানের রিসিপশনিস্ট কে বললেই দেখিয়ে দেবে।

ইশমাম ইশিতার গলার আওয়াজ পেয়ে চুপ হয়ে যায়‌। ইশিতা বলতে থাকে,"পরী ছাড়াও আমরা এখানে আছি। আমাদেরকেও ফোন দিয়ে প্রশ্নটা করা যায়। আমার বড় ভাই দু'টো না হয় এখন বৌ পাগল হয়েছে। তুই তো বিয়ের আগেই দেখিয়ে দিচ্ছিস! বৌ ছাড়া চোখে কিছু দেখিস না।"

ইশিতার কথা শুনে ইশমাম ফোনটা কেটে দেয়।

***

"আপা আর কতক্ষন লাগবে! আমার দম বেরিয়ে যাচ্ছে!"

আলোর আর্তনাদে রুম ভারি হয়ে যাচ্ছে। দুজন নার্স আলোর হাতে পায়ে মাসাজ করে দিচ্ছে।

আফসানা খুবই ধৈর্য্য ধরে তার কাজটা করে যাচ্ছে। ঘড়ি ধরা একঘন্টা তের মিনিটের চেষ্টার পরে সামিন ইয়াসার মির্জার কন্যা তার মায়ের কষ্ট আর না বাড়িয়ে অবশেষে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন।

পৃথিবীতে এসেই তিনি সবার কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে। গলার আওয়াজ টা তার একেবারেই মায়ের মতো উঁচু। হম্বিতম্বি একেবারেই বাবার মতো।

নার্স এসে কাপড়ের পুঁটলিতে মোড়ানো ছোট্টো পুতুলটাকে তার বাবার কোলে দিয়ে বলে,"অভিনন্দন। আপনার ওয়াইফ ঠিক আছে।"

কাঁপা কাঁপা হাতে সামিন তার কন্যাকে কোলে তুলে নেয়। চারপাশ থেকে মৌমাছির মতো ছুটে আসে সবাই সামিন ইয়াসারের কন্যাকে দেখবে বলে।

সামিন কতটা আবেগী হয়ে গিয়েছে তা কেবল পৃথিবীতে যে প্রানীগুলো বাবা হয়েছে তারাই বুঝতে পারবে। অন্য কেউ বুঝতে পারবে না। কাউকে কন্যার মুখ দেখতে না দিয়ে হেঁটে একটা নিড়িবিলি স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে কন্যার মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। চোখের কোণে পুরুষালি অনূভুতি জমা হয়েছে,যা অন্য কেউ দেখে ফেলে হেসে ফেলবে।

আতাউর আলম পেছন থেকে বলে ওঠে,"আমাকে দাও।"

সামিন ঘুরে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,"আপনাকে কেন দেবো?"

_আমার নাতনি! আমি আজান দেবো ওর কানে।

_আমার মেয়ে। আমি আজান দিতে জানি। আপনি আপনার মেয়ের কাছে যান।

আতাউর আলম কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলে ওঠে,"ও তুমি আজান দিতে জানো? আমি তো জানতাম তুমি শুধু ভাষণ দিতেই জানো।"

সামিন শশুরের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। আতাউর আলম চলে যায়। সামিন মাথা ঘুরিয়ে আবারও মেয়ের দিকে তাকিয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পরে। মাথা নিচু করে কানের কাছে মুখ নিয়ে আজান দিয়ে মেয়ের কপালে চু'মু খায়।

দু'চোখের কোণে দুফোঁটা পিতৃত্বের অনূভুতি নিয়ে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে,ধরা গলায় বলে ওঠে,"আমার আম্মা তুমি। তুমি ইনশিরাহ বিনতে সামিন। তুমি কষ্টের পরে স্বস্তি।"

ইনশিরাহ চোখ দুটো পিটপিট করছে। হাত দুটো মুঠি করে রেখেছে। সামিন আবেগতাড়িত হয়ে বলে ওঠে,"নাকটা একেবারে মায়ের মতো পেয়েছো।"

দু'চোখ বন্ধ করে আবারও চু'মু খায় মেয়ের কপালে। তারপর হাত দিয়ে ভেজা চোখের কোণ মুছে ইনশিরাহকে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,"আমার দুর্বলতা শুধু তোমাকেই দেখালাম। তুমি ছাড়া পৃথিবীতে কেউ কখনও সামিনের চোখে পানি দেখেনি। তুমি কাউকে বলে দিওনা লজ্জার কথা! ঠিকাছে আম্মা?"

***

পরী রুম থেকে বেরিয়ে একপলক ইশমামের দিকে তাকিয়ে ইশিতার কাছে এসে ফোনটা হাতে নেয়।

ইশিতা বলে ওঠে,"তোকে না বলে তোর ফোনের কল রিসিভ করেছি। আসলে কলটা আমার ভাইয়ের নাম্বার থেকে ছিলো তাই ভাবলাম আমার রিসিভ করার অধিকার আছে।"

পরী লাজুক মুখটা নামিয়ে রাখে। ইশিতা বলতে থাকে,"প্রথমে কে আগে প্রস্তাব দিয়েছে? তুই না ও?"

_উনি।

_হু। জানতাম। ছেলেরা একটু এগিয়ে থাকবে স্বাভাবিক। তা তুই রাজি হলি কেনো?

পরী একপলক ইশমামের দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়ে ইশিতাকে বলে ওঠে,"কেউ আশ্রয় চাইলে, ফিরিয়ে দিতে নেই।"

***

সামিনকে দেখে নার্স দুজন কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। আলো একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে সামিনের দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েকে কোলে নিয়ে সামিন এগিয়ে এসে বেডের একপাশে বসে পরে। আলোর ক্লান্ত দুটি চোখে জড়ো হচ্ছে বাবা মেয়ের প্রতি মুগ্ধতা!

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলে ওঠে,"মেয়ে একেবারে তোমার গায়ের রং পেয়েছে আছিয়া। আমার মতো সাদা মুলা হয়নি।"

আলো হাসতে থাকে। সামিন এক হাত বাড়িয়ে আলোর মাথায় বুলিয়ে দিয়ে বলে ওঠে,"তুমি অসম্ভব স্ট্রং একটা মেয়ে। আমার এতো মানসিক শক্তি নেই। মেয়েটা তোমার মতোই হোক।"

***

অক্টোবর শেষ হতে না হতেই বেশ শীত পরতে শুরু করেছে। সামিন মেয়ের যত্নে আগে ভাগেই শীতকে মোকাবেলা করার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

নরম,গরম পোশাক পরিয়ে মাথায় খুব সন্তর্পনে একটা টুপি পরিয়ে দিতে দিতে আলোর দিকে তাকায়। আলো বিরক্ত হয়ে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। পরক্ষনেই বলে ওঠে,"এভাবে প্যাকেট করছেন কেন ওকে? ও কি আপনাকে বলেছে ওর শীত লাগছে?"

সামিন ইনশিরাহকে কোলে তুলে নিতে নিতে বলে,"বলতে হবে না। আমি বুঝি।"

আলো রোদ থেকে তুলে আনা কাপড় গুলো ভাজ করে আলমারিতে তুলে রেখে দিতে দিতে বলে,"এখন আপনার ব্যস্ততা কোথায়? সারাদিন বাড়িতে মেয়ের কাছে বসে থাকেন। এখন সব ব্যস্ততা কোথায় গেলো?"

সামিন আলোর কথায় কোনো জবাব না দিয়ে ইনশিরাহকে নিয়ে ইশমামের ঘরে যায়। ইশমাম জরুরি কাগজ পত্র সব গুছিয়ে নিচ্ছিলো। সামিনকে দেখে বলে,"কিছু বলবে?"

_তোর ফ্লাইট কখন?

_সকাল সাড়ে আটটায়।

সামিন চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বলে ওঠে,"পরীর এক্সাম আজ শেষ হয়েছে। ভনিতা না করে বলি, যদি আংটি পরিয়ে রেখে যেতে চাস তাহলে আংটির অর্ডার দিচ্ছি আমি। যদি রেজিস্ট্রি করে রেখে যেতে চাস তাহলে কাজী ডাকবো। তোকে পাচ মিনিট সময় দিলাম ভাববার জন্য। ভেবে আমাকে জানা।"

ইশমাম বোকার মতো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। সামিন ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে হাসছে। ইশমাম বলে ওঠে,"তুমি কি আমার সাথে মজা করছো?"

_অবশ্যই না।

ঠান্ডা গলায় বলে সামিন। তারপর মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইশমামকে বলতে থাকে,"সিদ্ধান্ত জানা। আমার হাতে সময় কম। তোর হাতেও সময় কম। আংটি না রেজিস্ট্রি? কোনটা?"

ইশমাম কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অস্পষ্ট ভাবে বিরবির করে বলে ওঠে,"রেজিস্ট্রি করলেই তো ভালো হয়,নয়তো আবার দেখা যাবে অন্য কেউ এসে এটাকেও তুলে নিয়ে বিয়ে করে ফেললো।"

সামিন মেয়ের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে ছিলো,ইশমামকে বলে,"কিছু বললি?"

_না না, না ভাইয়া, না। কিছুই বলিনি।

সামিন গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,"কাজী ডাকবো?"

_তোমার ইচ্ছা।

সামিন চুপচাপ ইনশিরাহকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। রিতু আর আলো দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। চাপা স্বরে রিতু বলে ওঠে,"কি বললো?"

সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলে ওঠে,"পরীকে সাজাও।"

তারপর আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,"পাঞ্জাবি বের করে দাও আমার। কাজী আনতে যাচ্ছি!"

***

সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ কাজী ডেকে ইশমাম আর পরীর রেজিস্ট্রি সেরে ফেলেছে সামিন ইয়াসার মির্জা।

পরী বোকার মতো সবার মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে সাইন করে দিয়েছে পেপারে। বিয়ের ঠিক পাঁচ মিনিট আগে রিতু একটা শাড়ি নিয়ে পরীর ঘরে ঢুকে বলে,"এটা পরো।"

পরী কিছু বুঝতে না পেরে বলে ওঠে,"শাড়ি কেনো?"

_কারন তোমার বিয়ে।

_কার সাথে?

_যার সাথে হলে খুশি হবে তারই সাথে। চটজলদি পরে নিচে এসো,কাজী এসেছে নিচে।

গায়ের শাড়ীটা ভারি খসখসে। পরীর ইচ্ছে করছে এক টানে খুলে ফেলে সালোয়ার কামিজ পরতে। কিন্তু সে ভদ্র মেয়েটির মতো গুটিসুটি মেরে ইশমামের বিছানায় বসে আছে। বিছানার পাশের একটা টেবিলে রিতু একটা দুধের গ্লাস রেখে গিয়েছে। পরী গ্লাসটি থেকে চোখ সরিয়ে পুরো ঘরে চোখ বোলাতে থাকে। এই ঘরে সে কখনো আসেনি এর আগে। এখন থেকে এটা তার স্বামীর ঘর। কথাটা ভাবতেই পরীর অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।

যেমন অগোছালো লোক,যার যেমন অগোছালো জীবন,তার ঠিক তেমন অগোছালো ঘর।

ইশমাম এসে দরজার বাইরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢোকে।তখন রাত প্রায় বারোটা।

পরী ইশমামের পায়ের আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকায়। ইশমাম ম্লান হেসে বলে ওঠে,"ভাইয়া অমন পাগল। আমি নিজেও জানতাম না এমনভাবে বিয়ে হবে আমাদের! সবকিছু মাথার ওপর দিয়ে গিয়েছে।"

পরী হেসে ফেলে। তারপর বলে,"আপনার ঘরটা এতো অগোছালো কেন? কি বিশ্রী!"

ইশমাম হাত থেকে হাতঘড়ি খুলতে খুলতে বলে ওঠে,"আমার সবকিছুই অগোছালো হয়ে পরে আছে। তুমি গুছিয়ে দাও।"

মাথামোটা পরী ভেবেছে ইশমাম তার ঘর গোছানোর কথাই বলেছে, সে বিছানা থেকে নেমে,মাথার ঘোমটা সরিয়ে আচল কোমরে গুজে ঘর গোছাতে শুরু করে। ইশমাম মাথা ঘুরিয়ে পরীর কান্ড দেখে হা করে পরীর দিকে তাকিয়ে থাকে।

***

আলোর শুরুতে বড্ড ঘুম পাচ্ছিলো। কিন্তু বাবা মেয়ের কান্ড দেখে ঘুম কে'টে গিয়েছে তার। সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামিন আর ইনশিরাহকে দেখছে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে সামিন ঘুম পা'ড়ানি গান গাওয়ার চেষ্টা করছে। আলোর কাছে সে দৃশ্য বড় মধুর লাগছে।

"খুকু ঘুমালো,পাড়া জুড়ালো,বর্গী এলো দেশে।

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দেবো কিসে?"

এতো টুকু গেয়ে সামিন থামে। তারপর আহ্লাদী গলায় মেয়েকে বলে ওঠে,"বাংলাদেশ একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র আম্মা! এখানে ধান বেঁচে খাজনা দিতে হয়না।"

ইনশিরাহ চোখ পিটপিট করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো

শাড়ির আঁচল মুখে চেপে হাসছে সামিনের দিকে তাকিয়ে। এই লোকটা এতো পাগল কেনো!

সামিন আবারো গাইতে শুরু করে,

"খুকু ঘুমালো পাড়া জুড়ালো, বর্গী তো নেই দেশে....."

_আপনি খুব বাজে গান করেন মেয়র সাহেব।

আলো মৃদু আওয়াজে বলে। সামিন মেয়েকে মৃদু দোলাতে দোলাতে জবাব দেয়,"জানি। তবে আমি খুব সুন্দর আদর জানি। মেয়ে ঘুমিয়ে গেলে দেখাচ্ছি!"

***

"আমরা বোধ হয় পৃথিবীর প্রথম স্বামী স্ত্রী যারা বাসর ঘরে ঘর গোছাচ্ছি।"

ইশমামের বইয়ের তাক গোছাতে গোছাতে বলে ওঠে পরী। ইশমাম নিজের অগোছালো জামাকাপড় সরিয়ে নিয়ে একটা আলমারি ফাঁকা করে পরীকে বলে,"এটা তোমার। তোমার জামাকাপড় এটাতে রাখবে।"

পরী এসে ইশমামের ব্যাগ গুছিয়ে দিতে দিতে বলে,"আপনার ফ্লাইট কয়টায়?"

_সকাল সাড়ে আটটায়।

_আপনার তো ঘুম প্রয়োজন। আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। আমি আপনার সবকিছু গুছিয়ে দিচ্ছি।

ইশমাম পরীর দিকে তাকিয়ে বলে,"সবকিছু গুছিয়ে দেবে?"

পরী ইশমামের ব্যাগে তার শার্ট গুলো সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলে,"হ্যা! সব। কি কি গোছাতে হবে বলুন।"

ইশমাম পরীর দিকে তাকিয়ে আছে। অসম্ভব রূপবতী নারীর পরনে একটা কফি কালারের বেনারসী। খুবই মোহনীয় লাগছে তাকে।

পরী মাথা তুলে ইশমামের দিকে তাকায়। তারপর বলে,"কি হলো! বলুন কি কি গোছাতে হবে,ব্যাগ ছাড়া?"

_জীবন।

ইশমাম অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে। পরী ইশমামের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইশমাম বলতে থাকে,"একটা জীবন গোছাতে হবে।"

***

রাত দেড়টার কাছাকাছি। ইনশিরাহ বাবার কোলে ঘুমিয়ে গিয়েছে। সামিন খুবই সন্তর্পনে মেয়েকে দোলনায় শুইয়ে দিয়ে আলোর দিকে তাকায়। আলো সামিনের দৃষ্টি দেখে লজ্জা পেয়ে যায়। সবসময় মেয়েকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে ঘুমায় মানুষটা, কিছু কিছু রাত শুধু আলো থাকে তার বুকে। আজ সম্ভবত সেই রাত ‌।

আলো বিছানা থেকে নেমে নিচু স্বরে বলে,"কমলা রঙের শাড়ি পরতে হবে?"

সামিন চুপ করে থাকে। আলো শাড়ি পাল্টে চুলে খোঁপা করে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। সামিন এক দৃষ্টে সেদিকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে যায়, পেছন থেকে আলোর কোমর জড়িয়ে ধরে আলোর কাঁধে থুতনি ঠেকায়। আলো ধীরে ধীরে সামিনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলে ওঠে,"শরীরে মেদ জমছে আমার।"

_এতোটুকু জরুরী। নয়তো কৃত্রিম লাগে সে সৌন্দর্য। এখন আমি তোমার দুধরনের সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হই। একজন স্ত্রীর সৌন্দর্য, আমার সন্তানের মায়ের সৌন্দর্য।

আলো চুপ করে থাকে। সামিন বলে ওঠে,"আমারও তো ভুড়ি বেড়ে যাচ্ছে। মাথার চুল উঠে যাচ্ছে।"

আলোও নিচু স্বরে বলে ওঠে,"এতো টুকু জরুরী। নয়তো কৃত্রিম লাগে। এখন আমি আপনার অসংখ্য সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হই। একজন অসাধারণ স্বামীর সৌন্দর্য,স্নেহপরায়ন বাবার সৌন্দর্য, একজন দায়িত্বশীল বড় ভাইয়ের সৌন্দর্য,একজন ন্যায়পরায়ণ নেতার সৌন্দর্য।"

সামিন মৃদু হেসে আলোকে কোলে তুলে নেয়। আলোর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে ওঠে,"মেদ বেরেছে,সাথে ওজনও।"

আলো হেসে ফেলে। সামিনের কাছে সে হাসি বড় মধুর লাগে। আলোকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে কপালে চু*মু খায়। তারপর ঘোর লাগা দুটো চোখে আলোর মুখের দিকে একপলক তাকায়। বরাবরের মতো লজ্জায় লাল হয়ে আছে মুখটা। বাতি নিভিয়ে স্ত্রীকে কাছে টেনে নিয়ে ভালোবাসতে চায় তাকে, অনুমতি চায় বরাবরের মতো। দু'জনের অনূভুতি যখন একে অপরকে সম্মতি দিলো , ঠিক সেই আবেগী মুহুর্তে ইনশিরাহ গলা ফাটিয়ে কাঁদতে শুরু করে দেয়।

সামিন উঠে বাতি জ্বেলে আলোর দিকে তাকায়। আলো তার দিকেই তাকিয়ে আছে, সামিন বলে ওঠে,"এটা আমার মেয়ে না শ'ত্রু। এর থেকে তো বিরোধী দল আমাকে বেশি মায়া করে।"

আলো মুখে শাড়ির আঁচল চেপে হাসছে। সামিন উঠে গিয়ে ইনশিরাহকে আবারও কোলে তুলে নিয়ে কান্না থামায়। আলো শুয়ে শুয়ে বাবা মেয়েকে দেখতে থাকে।

সামিন মৃদু দুলতে থাকে মেয়েকে কোলে নিয়ে,

"খুকু ঘুমালো,পাড়া জুড়ালো, বর্গী এলো দেশে......"

থেমে আবারও বলতে থাকে,"মা একটা নতুন গান বাঁধতে হবে বুঝলে। এখন দেশে বর্গী নেই। বাংলাদেশ একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্র।"

মেয়ের সাথে যতরাজ্যের গল্প জুড়ে দেয় সামিন ইয়াসার মির্জা। তবে কোন রূপকথার গল্প নয়! রাজ*নীতির গল্প। ইনশিরাহ চোখ ছোট ছোট করে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। আলো দেখছে তাদের দুজনকে।

ইনশিরাহ ঘুমিয়ে যায়, ঘুমিয়ে গিয়েছে আলোও। সামিন ইনশিরাহকে আলোর পাশে শুইয়ে দিয়ে দু'জনের দিকে তাকিয়ে থাকে চোখে এক সমুদ্র মুগ্ধতা নিয়ে।

তার চোখে চকচক করছে পবিত্র কোনো আলো। যে আলো লেগেছিল তার বধূকে দেখে।

~~~~~~~~~সমাপ্ত~~~~~~~

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন