#পর্ব_০৩
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
গোধূলি লগ্ন। ছাদের এককোণে বেঞ্চের উপর পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে মায়া। নিশ্চিতে প্রকৃতি উপভোগ করছে সে। কখনো হাতের নখ দেখছে তো কখনো আবার গুনগুন করছে। অন্যদিকে তার থেকে কিছুটা দূরে ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে আরহান। ফোনে ব্যস্ত সে। কারোর সঙ্গে কথা বলছে। সে সময় নিয়ে কথা শেষ করে ঘুরে দাঁড়াল। ফোনটা পকেটে রেখে হাত দুটো পিছনে বেঁধে অমায়িক ভাবে আরামে দাঁড়িয়ে গুরুগম্ভীর ভারী গলায় বলল,
__হ্যাঁ তো তুমি কি যেন বলছিলে"?
চোখ তুলে তাকায় মায়া। প্রথমে আরহান কে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। চুলগুলো হাত দিয়ে ঝাপটা মেরে পিছনে দিয়ে দুই হাত বুকে গুজে। টান টান হয়ে আরহানের চোখে চোখ রেখে জবাব দেয়,
__মি. আরহান সাঈফ। আমি আপনাকে বিয়ে করব না"।
আরহানের অভিব্যক্তি পরিবর্তন হয় না। সে একই ভঙ্গিমায় নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে মায়া কে দেখে চলেছে। মেয়েটার অ্যাটিটিউড অন্যরকম। আকর্ষণীয়। আরহান কে নিশ্চুপ দেখে ভ্রু কুঁচকে আসে মায়ার। তিক্ষ্ণ চোখ করে বলে,
__ঐ হ্যালো মি. । আমি আপনাকে বিয়ে করব না। শুনতে পেয়েছেন"?
__তো না করার কারণ কি? আমার মধ্যে কিসের কমতি"?
__আমি আপনাকে বিয়ে করব না সেটাই বড় কমতি"।
আরহান হাসে। কয়েক কদম এগিয়ে আসে মায়ার দিকে। আরহান কে এগিয়ে আসতে দেখে মায়ার কপালে ভাঁজ পরে তবে নিজ জায়গা থেকে চুল পরিমান সরল না। স্ট্রং হয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। আরহান এগিয়ে এসে একহাত দূরে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে এক মোহনীয় গলায় বলে,
__আর আরহান সাঈফ চৌধুরী কখনো নিজের মধ্যে কমতি রাখে না, ইউ নো"?
মায়া ভ্রু জোড়া কুঁচকে নেয়। আরহানের ঠোঁটে হাসি দেখে তার গা জ্বলে যাচ্ছে। এই ছেলে কে কিছুইতেই বিয়ে করবে না সে। সে এবারে নিজের বা হাতের আঙ্গুল তুলে। নখগুলো বেশ বড় বড় আর ধারালো। ওভাবেই মেজাজের সাথে বলে,
__ঐ বেডা। তোর ভেতরে তুই কমতি রাখিস, না রাখিস আমার জানার দরকার নাই। আমি তোকে বিয়ে করব না। তুইও করবি না। না বলে দিবি, সোজা কথা"।
মূহুর্তে চটে যায় আরহান। মুখের অভিব্যক্তি কঠিন হয়, পিছনে বাঁধা হাতদুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়। তার মা ছাড়া কেউ তাকে তুই তুকারি করার সাহস করুক এটা তার মোটেও পছন্দ নয়। সে দুজনের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনে। মায়ার তাক করা আঙ্গুল ফট করেই নিজের হাতের মধ্যে চেপে ধরে। হকচকিয়ে যায় মায়া। চোখ বড় করে কঠিন চোখে তাকায় আরহানের দিকে। আরহান পাত্তা দেয় না। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
__তেজ ভালোই আছে। আই লাইক ইট। তবে তেজ টা ভুল জায়গায় দেখানো হয়েগেছে"।
এই বলে সে মায়ার যত্নে রাখা স্বাদের নখ অপর হাত দিয়ে ভেঙে দেয় মূহুর্তেই। মায়া হা হয়ে গেছে। রাগ বাড়ছে তরতর করে। আরহান ওর হাত ছেড়ে উল্টো ঘুরে। ছাদ থেকে যেতে যেতে বলে,
__কি বলেন তো, আপনার এই তেজ আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আরহানের জীবনে এরকম তেজি নারীই মানানসই। রেডি থাকেন, দেখা হবে"।
আরহান চলে যায়। মায়া হয়ে যায় ক্ষিপ্ত বাঘিনী। নিজের আঙ্গুলের দিকে দেখে আবারো তাকায় আরহানের যাওয়ার পানে। রাগে দুঃখে ঝটফটিয়ে বলে,
__ঐ শুন। ঐ হ্যালো। আমি তোকে বিয়ে করব না। বেয়াদব বেডা শুন"।
সে আর শুনল কি কথা টা? উমহুম সে হনহন করে চলে গেছে নিচে। ওদিকে ছাদের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল সুরভী আর মায়ান। এতক্ষণ দুজনের কথপোকথন হা হয়ে গিলছিল বলা চলে। আরহান কে হনহন করে আসতে দেখে দুটোতে দৌড়। এক দৌড়ে আটতলার পেরিয়ে সাত তলার মধ্যসিরিতে গিয়ে থেমেছে। সুরভী বুকে হাত দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছে তো মায়ান চশমা ঠেলে হা করে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। সুরভী একটু স্থির হলে বলল,
__কি ডেঞ্জারাস কি ডেঞ্জারাস"!
মায়ান জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে হাতের ফোনটা উঁচু করে সামনে ধরল। স্ক্রিনে মায়া আর আরহানের ছাদের ছবি দেখা যাচ্ছে। পরপর অনেক গুলো ছবিই তুলেছে সে। সেগুলো এক এক করে দেখতে দেখতে বলল,
__শুধু কি ডেঞ্জারাস? মনেহয় কোনো মুভির প্রোমো দেখলাম, ওয়াহ! দিল খুশ হো গেয়া মেরা"।
__তোর মজা লাগল? ভাব একবার দুটোতে এরকম হলে সংসার কিভাবে করবে? নিত্যপত্যি ঝগড়া লাগবে শুধু। না না। আমার মনেহয় বিয়ে না হওয়ায় ভালো"।
নিজের কথা শেষ করে মায়ানের দিকে তাকাতেই মুখ বন্ধ হয়ে গেল সুরভী। মায়ান কেমন একটা অদ্ভুত এক্সপ্রেশন দিয়ে রেখেছে। সুরভী মেকি হাসি দিল। মায়ান চশমাটা ঠেলে নাক ফুলিয়ে বলল,
__ওয়েএ ধোঁকেবাজ। একদম আপুর পক্ষ নিবে না নাইলে তোমার বিয়েতে আমি ভাংড়ি দিব। (তারপর একটু থেমে ন্যাকামির সুরে বলল) দেখ আপু, তোমার এই ইনোসেন্ট ভাইয়ের সুখ কি তোমার সহ্য হচ্ছে না? বিলিভ মি, আপুর জন্য আরহান ভাই একদম পারফেক্ট"।
*°.
রাতের বাজে নয়টা। ডাইনিং টেবিলে চুপচাপ হয়ে বসে আছে মায়া। এখনো পোষাক পাল্টায় নি। সে কিছুটা বাঁকা হয়ে বসেছে, একহাত গালে দিয়ে অন্যহাতে সামনে রাখা বাটি থেকে কাঁটা চামচের সাহায্যে টুকরো টুকরো আপেল মুখে তুলছে। রাতের খাবার খেয়ে আরহানরা চলে গেছে কিছুক্ষণ আগে। মায়ান সোফায় শুয়ে ফোনে গেম খেলছে। বিয়ে ঠিক হয়েছে সাতদিন পর। এই সাতদিন সময় শপিং করা+ মেহমান দাওয়াত করা। মায়া সে চিন্তায় বাচ্ছে না যেন। সুরভী ও চলে গেছে সন্ধ্যাবেলা।
মায়ার অন্যমনষ্ক হয়ে খাওয়ার মধ্যেই মাহমুদ সাহেব আর আশা বেগম আসলেন। তারা মেহমানদের এগিয়ে দিতে গিয়েছিলেন। মাহমুদ সাহেব এসে টেবিলে মায়ার পাশের চেয়ারে বসল। মায়ার তাতেও হেলদোল হলো না। মাহমুদ সাহেব হেসে বললেন,
__আরে আমার বাচ্চাটা বড় হয়েগেছে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে আজ"।
মায়া চোখ তুলে তাকায়। কাঁটা চামচ টা দিয়ে জোরছে থাবা মারে আপেলের টুকরো তে। খুব তিক্ষ্ণ শব্দে বলে,
__আব্বু। তোমার কি আনন্দ হচ্ছে মেয়ে কে তাড়াতাড়ি বিধবা দেখার জন্য"?
__এমা ছি ছি। এসব কি কথা আম্মু"?
মায়া চোখ পাকিয়ে তাকায়। আশা বেগম হা হুতাশ করে সরে পরেন সেখান থেকে। মাহমুদ সাহেব একটু থেমে বলেন,
__দেখ আম্মু। কোন কাজে জীবনের নিশ্চয়তা আছে বলো তো? ধরো তোমার বিয়ে একটা ডাক্তারের সঙ্গে দিলাম কিন্তু হসপিটাল থেকে আসার সময় যে এ'ক্সি'ডে'ন্ট হবে না তার কি গ্যারান্টি? আবার ধরো ইন্জিনিয়ার, কাজে মাথায় যে ছাদ ভেঙে পরবে না তার কি গ্যারান্টি? আবার ধরো....
__থাক থাক আর লেকচার দিতে হবে না। এমনে ওমনে গ্যারান্টি না থাকলেও আমি মেরে দিব সিউর পিউর গ্যারান্টি বুঝছো"?
তারপর চেয়ার থেকে উঠে পরল। নিজের ঘরের দিকে যাওয়ার সময় একবার ফিরে তাকাল পিছনে। মাহমুদ সাহেব মুচকি হাসছেন। মেয়ে তার বেশ জব্দ হয়েছে আহা। নির্ঘাত ছেলেটাও জব্দ করেছে। মায়া চোখ উল্টে মুখ ভেংচে মনে মনে বলল,
__তোমার বিয়ের গুষ্টি কিলায়। নিকুচি করেছে বিয়ের। খাড়াও"।
চলবে....
[কি আশ্চর্য মন্তব্য করেন না কেন আপানারা? গঠনমূলক মন্তব্য করার অনুরোধ রইল]