#পর্ব_১৬
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে বিছানায় বাবু হয়ে বসেছে মায়া। মনোযোগ নতুন ফোনে। আপাতত ফোন সেটআপ করতে ব্যস্ত সে। একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখন তার ফোন।
অন্যদিকে আরহান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করছে। মুখাবয়ব তার অত্যন্ত গম্ভীর। এমন মনে হচ্ছে কিছু গভীর চিন্তায় মগ্ন বোধহয়। তার ধ্যান ভাঙল মায়ার কন্ঠস্বরে,
__আপার হয়েছে? আমার কাজ শেষ, চলেন"।
আরহান তখনি মায়ার দিকে তাকাল একপলক। কোনো উত্তর করল না তবে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকাল ওর দিকে। মায়ার দৃষ্টি তখনো হাতের মুঠোয় ধরে রাখা ফোনের দিকে। আরহানের মাঝে মাঝে মনে হয়, মেয়েটা বড্ড ইমম্যাচিউর। শুধু হাতে পায়েই বড় হয়েছে যেন। ছোটবেলার সেই স্বভাব, সেই চঞ্চলতা, বাচ্চামো এখনো আঁকড়ে রেখেছে নিজের মধ্যে। তার এখনো সেদিনের কথা মনে পরে
যখন তাদের অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে ধর্মীয়মতে বিয়ে হলো। মায়া সেদিন তার বুকেই মাথা রেখে এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি দিতে দিতে কান্না করেছিল। আর বলছিল,
__আমাকে ওরা বিয়ে দিয়ে দিল। আমার বিয়ে হয়ে গেল। আপনি কিছু করলেন না? আমার বিয়ে হয়ে গেল, এ্যাঁ..."।
ভাবতেই আরহানের ঠোঁটে মুচকি হাসি ফুটে উঠল। এরমধ্যেই মায়া আরহানের দিকে তাকালে হঠাৎ তার মুচকি হাসি দেখে কিছু বুঝল না। ছোট ছোট চোখ দেখল সে আরহান কে। আরহান তখনো নিজের ভাবনায় বিভোর। মায়া বিরক্ত হয়ে বলল,
__ঐ মি.? হ্যালো। কি দেখছেন আমাকে"?
আরহান চমকে উঠল। একটু অপ্রস্তুত হলো বোধহয়। নিজেকে সামলে বলল,
__তোমাকে দেখছিলাম? কই"?
__এ্য ঢং। তো কাকে দেখছিলেন এদিকে তাকিয়ে? আমার ডুবলিকেট কাউ কে"?
__না, আমার ওয়াইফ কে"।
মায়া মুখ ভেংচি দিল। বিছানা থেকে উঠে এসে আরহানের পাশে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজেকে দেখে নিল একবার। সব ঠিকঠাক আছে দেখে বলল,
__চলুন এবার। রিসেপশনের পর নিজের বাড়ি যাব। আহ শান্তি"।
আরহান ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
__নিজের বাড়ি মানে"?
__বুঝেন না নাকি? বাপের বাড়ি যাব"।
__বাপের বাড়ি তোমার বাড়ি? এখন এটা তোমার বাড়ি। এখানে স্থির হও, শান্তি এখানেও ধরা দিবে আপনাআপনি"।
মায়া প্রথমে একটু চোখ উল্টে তাকাল। তারপর বলল,
__হ্যাঁ হ্যাঁ এটাও আমার বাড়ি। এবার চলেন"।
আরহান তপ্ত শ্বাস ফেলল। মায়ার দিকে তাকিয়ে শয়তানি করে বলল,
__এমন ভাবে বলছো যেন আমাকে ছাড়া তোমার চলে না"।
__হাসবেন্ড হয়েছেন তাহলে আপনাকে ছাড়া আমার চলবে কি করে"?
__বাহ। বেশ ভালো"।
*°•
শহরের নাম করা একটি নাইট বার। যেখানে পাপের কোনো শেষ নেই, নেই কোনো অরাজকতা। ছেলেমেয়েদের অগাত মেলামেশা, ঢলাঢলি, মধ্যপান, কোনো বিষয়ের নেই কোনো বাধ্যবাধকতা। যেখানে নাচ গান থেকে শুরু করে চোখের আড়ালে আরো কত কিছুই না হয়ে থাকে। যেখানে মানুষের প্রকৃত রুপ চেনা বড় দায় যেন।
চার থেকে পাঁচজন লোক বসেছে গোল হয়ে। মধ্যখানের টেবিলটায় রয়েছে কিছু লাল পানীয়র সঙ্গে কিছু ডকুমেন্ট ও কিছু ফাইল। লোকগুলো কে দেখে মনে হচ্ছে বড্ড উন্মাদ তারা। একেকজন কোনো কারণে পাগল প্রায়। আর তাদের মধ্যে আলাদা যে ব্যক্তি সে শান্ত স্থির তবে তার ভেতরের খবর অন্যরকম। সংক্ষিপ্ত নাম জে.এফ জোয়াদ্দার। দুই হাতে ছয়টি আলাদা আলাদা আংটি। তিনি নিজের হাত দুটো অস্বাভাবিক ভাবে একে অপরের সঙ্গে ঘর্ষণ করে বললেন,
__কে সে? যে না মুন্ত্রীর বডিগার্ডের মধ্যে পরেছে আর না অন্য কোথাও। তাহলে সে কে? যে এতবড় একটা প্ল্যান ফ্লপ করে দিল"?
তার সামনে বরাবর লোকটি বলল,
__শোনা গেছে তার নাম আরহান সাঈফ চৌধুরী। বয়স আনুমানিক (২৮—৩৪) মধ্যে হবে। নাম লোকমুখে শোনা গেলেও তার চেহারা খুব কম দেখা গিয়েছে যার জন্য তাকে ছায়ার সঙ্গে তুলনা করা যায়। পরিচয় হিসেবে উপদেষ্টা সামনে আসে, তবে কাজ কর্মে শুধু এই পরিচয় যথেষ্ট মনে হয় না"।
আরেকজন বলল,
__শুধু তাই নয়। খুব প্রয়োজন না হলে তাকে কোনো বোর্ড মিটিংয়ে দেখা সম্ভব হয় না। আই রিপিট, জনসম্মুখে খুব প্রয়োজন না হলে তাকে পাওয়া যায় না। আর এটা নিয়ে কোনো আলোচনাও হতে দেওয়া হয় না। তবুও কিছু কিছু বিষয় গুঞ্জন উঠলে শোনা যায় মুন্ত্রী নিজ দায়িত্বে আড়াল করে তাকে"।
অন্যজন বলল,
__ট্যাগ উপদেষ্টা পেলেও তার মধ্যে এক অন্যরকম সিক্রেট কোনো কিছুর ভাইব রয়েছে। আড়ালের অনেক তথ্য তার কাছ থেকে পাওয়া সম্ভব যার জন্য অনেকের অনেক প্ল্যান এরকম ফেইল হয়েছে। এমন মনেহয় রাজনীতির এ মঞ্চে সে এমন এক ব্যক্তিত্ব যার জন্য চাইলেও বর্তমান মাঠ থেকে কাউ কে সরিয়ে দেওয়া অসম্ভব"।
__মুন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়ার সমস্ত প্ল্যানের পিছনে ছিল এই ব্যক্তি। আড়ালে থেকেও যেন ছায়ার মতো কাজ করে। কোথায় থেকে কিভাবে তার কাছে তথ্য যায় তা জানা যায় না। তবে বলা যায় তার এই সিক্রেট কিছুর জন্যই সে উপদেষ্টা মন্ত্রীর। এছাড়াও আমাদের ঐ চারজনকে কোথায় রেখেছে নাকি মার্ডার করেছে তারও কোনো খোঁজ পাওয়া যায় নি। এক কথায় সে তার নিজ কাজের বাহিরে যেয়েও অনেক কিছুই জানে। বলা যায় করতেও পারে"।
জে.এফ এতক্ষণ তাদের সবার কথা খুবই মনোযোগ দিয়ে শুনলেন তারপর মাথা তুলে সবার দিকে তাকিয়ে শান্ত হয়ে বললেন,
__এই ব্যক্তি কে কেউ দেখে নি"?
__আমাদের সোর্স দিয়ে অনুমান মাফিক তার কিছু পিকচার কালেক্ট করা হয়েছে তবে ফেস ক্লিয়ার নয়। কিন্তু সব তথ্য অনুযায়ী এই সেই ফর সিউর"।
বলেই লোকটি কিছু ফটো তার দিকে বাড়িয়ে দিলে তিনি সমস্ত ফটো হাতে তুলে নিলেন। এক এক করে দেখতে লাগলেন সেগুলো। প্রত্যেক টা ফটোতেই আরহানের ফেস স্পষ্ট নয়। এরমধ্যে একটি ফটোতে দেখা গেল আরহান ও মন্ত্রী কে একসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সামনে। যেখানে আরহানের ফেস, মাস্কের আড়ালে থাকলেও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে তার হাত ও গলা। যেখানে ডান হাতের কব্জি থেকে একটু উপরে, বুড়ো আঙুল সাইডে, পরপর দুটো গাঢ় তিল। খুব জুম করে তোলা। এরপর তার গলাতেও অর্থাৎ শার্টের কলার থেকে উপরে একটি তিল। হয়তো এটা চেনার উপায় জন্য তোলা হয়েছে। এরকম আরো নানান অঙ্গ ভঙ্গি থেকে তার কয়েকটি ফটো তোলা। জে.এফ লোকটি সবগুলো দেখে রেখে দিল টেবিলে। খুবই ঠাণ্ডা মাথায় বলল,
__হুম। আরেকটু খোঁজ লাগাও। সামনেই বোধহয় মুন্ত্রীর তরফ থেকে কোনো পার্টি রাখা হবে। যেহেতু ও মুন্ত্রীর তাহলে ওকেও পাওয়া যাবে"।
একটু থেমে বলল,
__যেহেতু এ থাকলে মুন্ত্রীর কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না তাহলে একেই আগে উড়িয়ে দেওয়া হোক। না থাকবে উপদেষ্টা আর না থাকবে তার উপদেশ। হাহা খুবই মজার ব্যাপার টা। আমাদের যা কাজ তা যেকোনো মূল্যে করতে হবে"।
চলবে...
[মন্তব্য করার অনুরোধ রইল। নিরাশ করবেন না]