#পর্ব_১৭
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
একটু থেমে বলল,
__যেহেতু এ থাকলে মন্ত্রীর কিছু করা সম্ভব হচ্ছে না তাহলে একেই আগে উড়িয়ে দেওয়া হোক। না থাকবে উপদেষ্টা আর না থাকবে তার উপদেশ। হাহা খুবই মজার ব্যাপার টা। আমাদের যা কাজ তা যেকোনো মূল্যে করতে হবে"।
__কিন্তু তার আগে তাকে চিহ্নিত করতে হবে আমাদের"।
জে.এফ জোয়াদ্দার কেমন চোখে তাকালেন তখন। মুখ বিকৃত করে বললেন,
__আরে বা* এর জন্যই তো মন্ত্রীর পার্টির কথা বললাম। মাথায় কি কোনো বুদ্ধি নেই রে? ননসেন্স কোথাকার"।
সামনের লোকটি মাথা ঝুঁকে নিল। পাশেরজন মাথা নেড়ে সম্মতি দিয়ে বলল,
__ওকে ওকে। এরপরের টা তাহলে আমরা বুঝে নিব। আমাদের কাজ ওকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া"।
__ হ্যাঁ"।
*°•
রিসেপশনের আয়োজন হয়েছে পুরো দমে। ইতিমধ্যেই মায়ার পরিবারের সবাইও এসে পৌঁছেছে। শুধু পৌঁছায় নি মায়া এবং আরহান। তারা এখনো ঘর থেকেই বের হতে পারে নি।
ওদিকে অস্থির সুরভী ও মায়ান। দুজনেই তাদের দেখা পাওয়ার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। তারা দুজনেই এক কোনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মায়ান একটু উদ্বিগ্ন হয়ে সুরভী কে উদ্দেশ্য করে বলে,
__আশ্চর্য! তোমার বান্ধবী এখনো কেন নামছে না"?
ওমনি সুরভী মুখ কুঁচকে ফেলল নিজের। কপালে ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট ছোট করে বলল,
__আমার বান্ধবী? তোর কিছু না? আর তুইও যেখানে আমিও সেখানে। আমাকে জিজ্ঞেস করিস কেন"?
মায়ান সুরভীর কথায় পাত্তা না দিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চশমা টা একটু ঠেলে বলল,
__তোমার বান্ধবী যা ঝগড়ুটে। মনেহয় আমার ইনোসেন্ট দুলাভাই কে জালিয়ে মারছে"।
__দাঁড়া, মায়া আসলে বলছি আমি এসব"।
__সে তো দাঁড়িয়েই আছি মিস আর আপনার বেইমানির কথাও জানি। হু"।
মায়ানের কথার বলার স্টাইল দেখে সুরভীর নিজের কপাল নিজে চাপড়াতে ইচ্ছে করছে। অন্যদিকে তাদের এত আলাপ আলোচনার মধ্যেই করিডোর ধরে হেঁটে আসছে মায়া ও আরহান। দুজনকেই দেখতে বেশ লাগছে। আরহান বলা যায় একটু সামনে সামনে হাঁটছে ফোনের ধান্দায় আর মায়া পিছন পিছন। মায়া এতে বিরক্ত হলো একটু। চলা থামিয়ে লেহেঙ্গা সামলে বলল,
__এ। আমি বউ মানুষ কোথায় আমার হাত ধরে নিয়ে হাঁটবেন, তা না করে আপনি আগে আগে চলেন কিভাবে? হ্যাঁ"।
মায়ার কথায় থেমে গেল আরহান। নিজে সম্পূর্ণ না ঘুরে শুধু মাথা ঘুরিয়ে দেখল মায়া কে। শান্ত ভাবে ফোনটা পকেটে রেখে ওভাবেই বলল,
__কেন? তুমি না সব সামাল দিতে পারো। তাহলে এখন আমি ধরব কেন"?
__আপনি আমার হাসবেন্ড তাই"।
__অন্যসময় তো মনে থাকে না"!
__কারণ অন্যসময় আপনি জিজ্ঞেস করেন না"।
__তো এখন জিজ্ঞেস করছি"?
__করা লাগে"?
__আমারো তো একই কথা"।
মায়া এবার লেহেঙ্গা টা ছেড়ে দাঁড়াল। কোমরে এক হাত রেখে অন্যহাতের শাহাদাত আঙ্গুল নাকের উপর দিয়ে ভাব নেওয়ার ভঙ্গিতে স্লাইড সেকেন্ড না যেতেই। খানিক ন্যাকামির সুরে লিপস্টিক মাখা ঠোঁট উল্টে টেনে টেনে বলল,
__এমন করেন কেন..."?
আরহান ওর কান্ড দেখে বিরবির করে কিছু বলল তারপর কয়েক কদম পিছিয়ে এসে সুন্দর করে মায়ার হাত ধরে চলতে লাগল। সঙ্গে বলল,
__যদি কয়েক বছর আগে বুঝতে পারতাম তোমার মতোন ত্যাড়া বাচ্চা মেয়ে কপালে আছে আর তাকে আমাকেই মানুষ করতে হবে তাহলে শাশুড়ি কে একটু হেল্প করে আসতাম মাঝেসাঝে"।
__আমাকে একদমই বাচ্চা বাচ্চা বলবেন না। আমি অনার্স শেষ করছি বুঝছেন? এর আগেও বলছেন, কিছু বলি নি"?
__তো? তাও তুমি সব দিক দিয়েই আমার ছোট। পড়ালেখা, বয়স, ম্যাচিউর এমনি হাইটও। অনার্স ই শেষ নয় বুঝছো? পড়ালেখা করো আর একটু ম্যাচিউর হও"।
__এ্যাঁ....। আমি কিন্তু একদিক দিয়ে আপনার সমানে সমান। ভুলে যাবেন না"।
__আর সেটা কী"?
__আমি আপনার স্ত্রী। আপনার অর্ধাঙ্গাংশ। আপনার অর্ধেক আমি, হু"।
__বাহ! তুমি যে আমার অর্ধেক সে বুঝ আছে"?
__অবশ্যই মি. হাসবেন্ড। দেখবেন, যেদিন আপনার আমাকে খুব প্রয়োজন হবে সেদিন কত ম্যাচিউর হয়েগেছি। এখন একটু আমাকে সামলান কষ্ট করে। হেহে"।
মায়ার এমন কথায় আরহান মনে হলো এক মূহুর্তের জন্য ফ্রিজ হয়েগেল। হয়তোবা কয়েক সেকেন্ড, এরপরই মায়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে ফেলল। তারা নিচে নামতেই ঘিরে ধরল সবাই। মায়ান ও সুরভী দ্রুত তাদের কাছে এগিয়ে আসল। মায়ান আৎফুল্ল হয়ে বলল,
__কি দুলাভাই আপু কেমন আছো তোমরা? একেকজন অক্ষত আছো দেখছি হেহে"।
__তুমি চাইছিলে হসপিটালে খাবার নিয়ে আসতে"?
হালকা হেসে বলল আরহান। সুরভী মায়া কে জিজ্ঞেস করল,
__কেমন আছিস"?
আরহান মায়া দুজনেই তাদের কথার উত্তর করতে লাগল। মায়ার মা বাবা শশুর শাশুড়ি সবাই আসল ওদের কাছে। সকলের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময় থেকে শুরু করে পরিচিত হওয়া, খাওয়া দাওয়া সবই হলো। নিয়মমতো মাহমুদ সাহেব মি. চৌধুরী কে আরহান ও মায়া কে আজ নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলেন। তারাও কোনো আপত্তি জানালেন না।
—
রাত্রির সময় বারোটা। আকাশজুড়ে তাঁরার মেলা, জানালা দিয়ে আসা হালকা স্নিগ্ধ আলো প্রাণ যেন জুড়ানোর মতো। আরহান শশুর বাড়িতে ব্যক্তিগত মানুষটির বিছানায় আধশোয়া হয়ে রয়েছে। হাতে নিজ ল্যাপটপ ও দুইকানে গুজা ব্লুটুথ। খুবই মনোযোগ দিয়ে করছে কিছু। আশপাশ খেয়াল নেই বললেই চলে। সমস্ত ধ্যান জ্ঞান তার স্ক্রিনে। এরমধ্যেই মায়া আসল ঘরে। এসেই তিক্ষ্ণ দৃষ্টি দিল আরহানের দিকে। সে এত মনোযোগে কি করছে তাই বোঝার চেষ্টা করল কিছু সময়। খানিকবাদে দৃষ্টি সরিয়ে দরজা আটকে ভেতরে ঢুকল। এগিয়ে জানালার পর্দাগুলো মেলে দিয়ে এসে আবারো আরহানের দিকে তাকায়।
যখন দেখল আরহানের মনোযোগ পাচ্ছে না তখন একটা মুখ ভেংচি দিয়ে বিরবির করল কিছু। তারপর ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা কিটক্যাট চকলেট বের করল। প্যাকেট খুলে চকলেট খুঁটতে লাগল সামনের দাঁত দিয়ে। আরহান এতেই কোনো ভ্রূক্ষেপ করল না। মায়া এবার চকলেট টা নিয়ে বিছানায় উঠে সামনেই গেল তার। চোখের সামনে চকলেট টা ধরে বলল,
__ঐ মি.। খাবেন"?
আরহান মায়ার হাত দেখে এক কান খালি করল। মায়ার দিকে সরাসরি দৃষ্টি দিয়ে বলল,
__কিছু বললে"?
মায়া মুখ বিকৃত করল। চকলেট টা টান দিয়ে নিয়ে নিজেই খেতে লাগল। আরহান কিছু বুঝল না। তবে এতরাতে মায়া চকলেট খাচ্ছে দেখে বলল,
__এটা কি চকলেট খাওয়ার সময়"?
মায়া নিজেও এক বালিশ নিয়ে আধশোয়া হয়ে আরামে বসল। রয়ে সয়ে উত্তর করল,
__না। ঘুমানোর সময় এটা"।
__তো ঘুমাচ্ছো না কেন"?
__একই প্রশ্ন আমারো"।
আরহান অদ্ভুত দৃষ্টি দিল। কয়েক সেকেন্ড নিল কিছু ভাবতে এরপর খুব দ্রুতই ল্যাপটপ টা মায়ার কোলে দিল। চটফট বিছানায় ভালো হয়ে শুয়ে বলল,
__এই নাও। এখন আমি ঘুমাব তুমি প্লিজ কয়েকটা ইমেইল ওখানে দেখ সব ঠিকঠাক আছে, সেন্ড করে দাও জায়গা মতো"।
মায়া হতভম্ব হয়ে গেছে। মূহূর্তে কি হলো বুঝতেই তেঁতে উঠল।
__এটা কি হলো"?
__কি হলো? তুমি আমাকে ঘুমানোর সুযোগ দিলে তার জন্য লাভ ইউ। গুড নাইট"।
বলেই আরহান ঘুরে গেল। মায়া তো হা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। চোখ পিটপিট করে একবার আরহান কে তো আরেকবার ল্যাপটপের দিকে তাকাচ্ছে।
__এ্যাঁ। মামা বাড়ি আবদার নাকি হ্যাঁ? নিজের কাজ নিজে করেন ধরেন"।
__মামা বাড়ি নয় তবে শশুরবাড়ির আবদার"।
__জানালা দিয়ে ফেলে দিব এটা"।
__দিয়ে দেখ তোমাকে যদি ছাদ থেকে না ফেলেছি তখন বইলো"।
__আপনাকে আমি বিছানা থেকে ফেলে দিব"।
বলেই মায়া ল্যাপটপ টা রেখে আরহান কে ধাক্কা দিতে শুরু করল কিন্তু তাকে নড়চড় করাতে পারল না। উল্টো আরহান মায়া কে টান দিয়ে ফেলে দিল নিজের কাছে। মায়ার দুইহাত চেপে ধরে ভীষণ ভারী কন্ঠে বলল,
__তোমার এসব মারপিটের কোয়ালিটি অন্য কাউ কে দেখাবে, আমাকে নয়"।
বলতে বলতেই আরহান হঠাৎ থেমে গেল। মনে হলো মনোযোগ ঘুরে গেল তার। মায়াও থেমে গেল হঠাৎ আরহান কে স্থির হতে দেখে। বুঝল না কিছু তবুও মনেকরল এখন কিছু না করাই ভালো। আরহান তখন একহাতে মায়া কে ধরে রেখেই অন্যহাত, যেই কানে ব্লুটুথ আছে এখনো সেটায় নিয়ে গিয়ে চাপ দিল। একটু পরই মায়া কে ছেড়ে উঠতে নিলে বাঁধা পেল। মায়ার খোলা চুল আটকে গেছে আরহানের বুকে। শার্টের বোতামের মধ্যে ফেঁসে গেছে একদম। মায়ার চুলে টান আসায় সে কোনোরকম উঠে দুজনেই চুলগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে আরহান বলল,
__আমি একটু বাহিরে যাব। তুমি গেট আটকে দিয়ে এসে ঘুমিয়ে যাও, ঠিক আছে"?
মায়া চোখ তুলে বলল,
__এত রাতে বাহিরে কি কাজ"?
আরহান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে শার্ট টা টেনেটুনে ঠিক করে বলল,
__প্রয়োজন আছে একটু। তুমি দরজা আটকে দিয়ে এসো"
__এখন রাতের প্রায় একটা বাজতে চলছে। এইসময় বের হলে কখন আসবেন"?
__বেশি সময় নিব না"।
চলবে...
[আশা করি গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং]