#পর্ব_১৮ (১ম অংশ)
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaajh_Nur
নিস্তব্ধ ঘর। জানালার পর্দা গলিয়ে রাতের হিম বাতাস প্রবেশ করছে ভেতরে। মেঝেতে ঢলাঢলি করছে শেষ রাতের চাঁদের আলো। বিছানায় মায়া আবছা ঘুমে আচ্ছন্ন। আরহানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন চোখ লেগে গেছে হয়তো নিজেও বুঝতে পারে না।
ঘুমটা হালকা হলো বালিশের পাশে ফোনের রিংটোনে। সে চোখ খুলল অতি কষ্টে। বিছানা হাতড়ে ফোনটা হাতে নিয়ে চোখের সামনে ধরল। ফোনে এখন লো লেভেলের আলো থাকলেও হঠাৎ চোখ খোলায় আলোটি চোখে ধরল বেশ। একটু পর সয়ে আসতেই দেখল আনসেভ একটি নাম্বার। কপালে ভাঁজ পরলেও ফোনটা রিসিভ করল সে। ঘুম জড়ানো ভারী ঠান্ডা কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
__হ্যালো! কে"?
ওপাশ থেকে তখনি গম্ভীর দৃঢ় আওয়াজ আসল,
__এসে দরজা খুলো"।
তড়িৎ গতিতে চমকে উঠল মায়া। চটফট আরহানের নাম্বার ও সময় দেখে নিল। চারটা বাজতে এখনো দশমিনিট বাকি। মায়া দ্রুত বিছানা থেকে উঠে গেল। ড্রয়িং রুম পেরিয়ে যেয়ে নিঃশব্দে দরজা খুলতেই দেখতে পেল কাঙ্ক্ষিত মুখটি। আরহান চোখ তুলে এলোমেলো মায়া কে এক পলক দেখে ভেতরে ঢুকে গেল। মায়াও দরজা লাগিয়ে গেল পিছু পিছু। ঘরে ঢুকে লাইট অন করেই চোখ ছোট ছোট করে তাকাল আরহানের দিকে। আরহান বিছানায় ফোন ছুঁড়ে মায়ার দিকে দৃষ্টি দিতেই সে নিম্ন স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
__এত রাতে আপনি গিয়েছিলেন কোথায়"?
__দরকার ছিল"।
__এত রাতে দরকার"?
__জরুরী"।
মায়া ঠান্ডা শীতল চোখে তাকাল তার দিকে। দুজনের দৃষ্টিই একেঅপরে নিবদ্ধ। মনে হচ্ছে চোখে চোখেই প্রয়োজনীয় কথা সেরে নিচ্ছে দুজন। আরহান এবার দৃষ্টি সরিয়ে শরীরের শার্ট টা খুলে মায়ার কাঁধে রাখলে মায়া তাতেই আরো চোখ মুখ কুঁচকে ফেলল। শার্টটা হাতে নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
__এটা কি হলো? বদ অভ্যাস হচ্ছে নাকি এটা"?
আরহান বেশ সরল জবাবে জানতে চায়,
__কোনটা"?
__এইযে বাহির থেকে এসে শার্ট খুলে বউয়ের হাতে ধরায়া দেওয়া। আগে যখন বউ ছিল না তখন? নিজের কাজ নিজে করেন"।
সে শার্ট টা বারিয়ে দেয় আরহানের দিকে। আরহান তা অগ্ৰাহ্য করে এগিয়ে যায় ফ্রেশ হতে। চলতি পথে বলে,
__আগে বউ ছিল না তাই করছি। এখনো যদি নিজের কাজ নিজে করি তাহলে বউ আনলাম কেন"?
মায়া দৃষ্টি সরু করে বলল,
__সিরিয়াসলি"?
__জ্বী"।
মায়া আর কোনো কথা বলল না। এই মধ্যরাতে অর্ধ ঘুম চোখে তার প্যাঁচাল পারার ইচ্ছা জাগছে না। সে শার্ট টা আপাতত ওভাবেই রেখে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। ঘুম কাতুরে মেয়ের ঘুম হচ্ছে না এটা নিয়ে নিয়ে তার আফসোস এর শেষ নেই।
আরহান ফ্রেশ হয়ে বের হলো কিছুক্ষণের মধ্যেই। গায়ে একটি টিশার্ট জড়িয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পরল মায়ার পাশে। মায়া অপর পাশে মুখ করে শুয়েছে। আরহান বিছানায় এসেছে অনুভব করতেই কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলতে শুরু করল,
__রাজনীতিবিদ মানুষ। ভালোই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন বুঝতে পারছি। যা আমার মোটেও পছন্দ না। যদি কিছু হয় না, অন্য মানুষ কি হাড়গোড় ভাঙবে তার আগে অর্ধেক আমিই ভেঙে হসপিটালে পৌঁছে আসব বললাম"।
আরহান মায়ার প্রত্যেক টা কথা শুনল মনোযোগ দিয়ে। সরূ চিকন ঠোঁটের কোণ জুড়ে এক চিলতে হাসি গেল। এরপরই মায়ার দিকে একটু এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হলো তার। খোলা চুলগুলো একহাতে পেঁচিয়ে নিয়ে মায়াকে পিছিয়ে নিয়ে নিজের সঙ্গে আরো ঘনিষ্ঠ করল। মায়া আরহানের কান্ডে জড়োসড়ো হয়েছে কিছুটা। চুল টান দেওয়ায় মুখের আকৃতি পাল্টে গেছে তবুও কিছু বলল না। নীরব দর্শক হলো আরহানের কাছে। আরহান সুযোগ টা লুফে নিল। মুখ এগিয়ে কানের লতিতে নিয়ে খুব ছোট স্বরে বলল,
__কেন? চিন্তা হয় হাসবেন্ডের জন্য"?
মায়া নিজ হাতে আরহানের হাত থেকে চুলগুলো আলগা করার চেষ্টা করতে করতেই প্রশ্নের উত্তরে সরাসরি নাকচ করে বলল,
__না। যাও হচ্ছিল তাও আমার চুল ধরায় চলে গেছে। চুল ছাড়েন তো বা*। ভালো লাগে না"।
চলবে...
[মন্তব্য করবেন গঠনমূলক 🤨]
#পর্ব_১৮ (২য় অংশ)
#হাওয়ায়_সুরগান
#Sharmin_Shaahj_Nur
__না। যাও হচ্ছিল তাও আমার চুল ধরায় চলে গেছে। চুল ছাড়েন তো বা*। ভালো লাগে না"।
মায়ার কথাটা বলতে দেরি। সাত সাত আরহানের মায়ার মাথায় চাপড় দিতে দেরি হলো না। তবে যা দিয়েছে তা খুবই হালকা। মায়া তাতেই মুখ থেকে অস্ফুট স্বর বের করে আরহানের দিকে ঘুরল। হাত চালিয়ে দিল আরহানের গায়ে। বুকের মধ্যে ছোট ছোট হাত তুলে চাপড় দিতে দিতে প্রশ্ন করে
__আপনার সমস্যা কি হ্যাঁ"?
আরহান ওর হাত থামিয়ে এক দৃঢ় কন্ঠে বলল,
__ভাষা খারাপ করাটা আমার সমস্যা। মনে থাকে যেন এটা"
মায়া মুখ ভ্যাঙ্গালো। আরহান ওকে ছেড়ে নিজে একটু দূরে সরে এসে সোজা হলো। চোখের উপর হাত তুলে বরফের ন্যায় শীতল কন্ঠে বলল,
__ঘুমাও যাও"।
__নিজে ঘুমা। (একটু থেমে) ওয়েট"।
কথাটা শেষ করেই ক্ষণিকের মধ্যে কিছু একটা ভাবল মায়া। আরহানের অতি নিকটে চেপে এসে চোখের উপর থেকে হাত সরিয়ে এনে বাহুর উপর মাথা রেখে আরো এগোলো তার কাছে। বুক বরাবর মাথা তার। এরপর আরহানের গালে হাত রেখে নিজের দিকে ফিরে নিল আরহানের মুখ।
__সারারাত তো ঘুমান নাই তাহলে এখন আর ঘুমানোর কি দরকার? আমার আর ঘুম আসছে না এটা আপনার দোষ। তাই ঘুমানো নিষেধ এখন আপনার"।
আরহান বিরক্ত হলো যেন। না চাইতেও তার হাতটি আগলে ধরল মায়া কে তবে মুখে বিরক্তি প্রকাশ করে বলল,
__তুমি যে একদম বাচ্চাদের মতো ইমম্যাচিউর তা জানো? বরং তার থেকেও বেশি"।
__জানব না কেন? আমার কি ম্যাচিউরিটি দেখানোর সময় হয়েছে, যে দেখাব"?
__তো এই সময় টা কখন হবে? বাচ্চা কাচ্চা হলে? তাহলে চলো প্রসেসিং স্টার্ট করি"।
মায়া মুখ বিকৃত করে নিল। নিজ হাতেই আরহান কে ঠেলে সরিয়ে দূরত্ব করল নিজেদের মধ্যে। ভ্রুজুগল কুঁচকে বলল,
__ঘুমান যান"।
__কেন এখন কেন হ্যাঁ"?
*°•
সকাল নয়টার দিকে আরহানের ঘুম ভেঙ্গে গেল মায়ার গলার আওয়াজ পেয়ে। দরজার বাহির থেকে আসছে সে আওয়াজ। এমন শোনাচ্ছে যেন চেঁচামেচি করছে কিছু নিয়ে।
হঠাৎ মায়ার আওয়াজ কানে আসায় আরহান চট করে চোখ খুলল। বিচলিত ভাবে ঘরের এদিক ওদিক দেখে উঠে বসল সে। কয়েক সেকেন্ড থম মেরে থেকে এরপর উদ্দেশ্যে বের হলো ঘর থেকে।
ড্রয়িং রুমে মায়ানের সঙ্গে চিল্লাচিল্লি করছে সে। মায়ান স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে মায়ার সামনে আর মায়া হাতে একটি খাতা নিয়ে মায়ানের দিকে রেগে তাকিয়ে আছে। ওদিকে আশা বেগম ও মাহমুদ সাহেব নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। আশা বেগম রান্না ঘরে আর মাহমুদ সাহেব পত্রিকা নিয়ে সোফায়। ভাই বোনের মধ্যে আসেন নি তারা। মায়া হাতের খাতা টি দেখিয়ে দেখিয়ে বলছে,
__এই পরিয়েছি আমি? কোনোরকম পাস করার জন্য? আবার তুই রেজাল্ট লুকিয়ে রাখছিস আমার থেকে। ওয়াহ "
মায়ান মুখ ছোট করে মেঝেতে নজর রেখেই বলল,
__টেস্ট ই তো ছিল। কি হয়েছে"?
__ওও টেস্ট ছিল? তাহলে আমার থেকে লুকালি কেন"?
__তুমি কি ফ্রি ছিলে নাকি? আজব! আজ ঠিকই দেখিয়ে দিতাম"।
__হ্যাঁ এই জন্যই তো আমাকে না দেখিয়েই নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল আবার। তাই না"?
__যদি তাই করব তাহলে তুমি এখন খাতাটা কোথায় থেকে পেলে"?
মায়া তখনি মায়ানের কানের লতি ধরে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
__তুই বোধহয় ভুলে যাস যে তোর ব্যাগ সুযোগ পেলে আমিই গুছিয়ে দেই, আমিই চেক করি। জাস্ট তোর অপেক্ষায় ছিলাম সকাল থেকে, আমাকে দেখিয়ে নিয়ে যাস কি না। বোধমাস কোথাকার"।
মায়ান ঘার হেলে ব্যাথা কম করতে মায়ার হাত ধরে বলছে,
__ছাড়ো ছাড়ো লাগছে আমার। ডাইনি বুড়ি বাড়ি না থাকলে বাড়িটা কত শান্তি থাকে। ছাড়ো। আব্বু ছাড়তে বলো কিন্তু"।
মায়ান চিল্লালেও কেউ কানেই তুলল না বরং মাহমুদ সাহেব আরহান কে রুমের দরজার কাছে দেখে উৎসাহিত হয়ে কাছে ডাকলেন
__আরে সাঈফ তুমি ওদিকে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো এসো বসো। দেখ আজ পেপারে কি বেরিয়ে"।
মায়া ও মায়ানও সেদিকে দেখল তবে মায়া এখনো মায়ানের কান ছাড়তে নারাজ। আরহান শশুর মশাই এর কথা শুনে বিনয়ের সঙ্গে তার পাশে গিয়ে বসতেই মাহমুদ সাহেব আস্তে করে বললেন,
__ওদিকে কান দিও না বুঝলে তো। ছেলে মেয়ে দুটোই কেউ কারোর থেকে কম না। ওরাই একে অপরের জন্য যথেষ্ট"।
ওদিকে মায়ান আরহান কে ডাক দিয়ে বিরক্তিকর কন্ঠে বলল,
__এইযে দুলাভাই। তোমার ওয়াইফ কে সামলাও। দেখ আমার বউ এর হাসবেন্ডের কান লাল করে দিল"।
আরহান তাকাল। মায়ানের কথায় হাসি হাসল তার তবে তা দমিয়ে রেখে মায়াকে বলল,
__মায়া ছাড়ো ছোট সাহেব কে। ব্যাথা পাচ্ছে"।
মায়া ওমনি আরো চেপে ধরল ওকে। কটমট করতে করতে বলল,
__পাক। ফাজলামি লাগে নাকি? আমি কষ্ট করে পড়াই নি? এরপর যদি রেজাল্ট খারাপ হয় না তখন দেখিস"?
__এরপরও তুমি পড়াবে"?
মায়া তখনি ওকে ছেড়ে কন্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বলল,
__তোর জন্য আমি অলওয়েজ ফ্রি"।
*°•
ফাঁকা ঘরের বিছানার মধ্যখানে ফোন টা তার নিজ আওয়াজ তুলে বেজেই চলেছে। বিকেলের ঝলমলে রশ্মি জানালার ফাঁক দিয়ে এসে পরছে মেঝেতে। বাথরুম থেকে অনবরত পানির আওয়াজ আসছে। ফোনটা বন্ধ হয়ে আবারো বাজতে শুরু করল। ব্যক্তিটি বের হলো শুধু একটি তোয়ালে পরে। সারা শরীরে পানির কোনা চিকচিক করছে। ফিড বডির সঙ্গে গটগট পায়ে এসে ফোন হাতে তুলে রিসিভ করল। কানে দিতেই আওয়াজ আসল,
__কাল রাতের সাতটা থেকে আয়োজন করা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে বেশ কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবে আর ধারণা করা যায় তার মধ্যে সেও ব্যক্তিও একজন। এটা ফ্যামিলি পার্টি হতে চলেছে। ড্রেস কোড ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট অর, ব্ল্যাক এ্যান্ড ব্ল্যাক। থীম আসছে বাটারফ্লাই। নির্দিষ্ট কিছু কার্ড, কোড, চিহ্ন, পরিচিতি"।
ব্যক্তিটি নিঃশব্দে ফোন রাখল। ঠোঁটের কোনে খেলে যায় উজ্জ্বল হাসি। বিরবির করে বলে,
__তিল"।
চলবে....
[বড় বড় মন্তব্য করা যাই। অত্যন্ত আরহানের বিষয়ে কিংবা তার এবং মায়ার কেমিস্ট্রি]