ফন্ট সাইজ:
থিম:
চিঠি দিও

৩৫তম পর্ব

লেখক: সিনিন তাসনিম সারা

চিঠি দিও

৩৫

_______________

শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়েছে আসমা ঘণ্টা তিনেক পার হয়ে যাবে। ভূতগ্রস্তের মতো একমনে বসে ভিজছে সে। তুষার সদৃশ গায়ের বরণ ইতোমধ্যে ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। পোড়া পায়ের ক্ষততে তীক্ষ্ণ পানির ধারা ঝেঁপে নামতে নামতে কাঁচা চামড়া উঠে গিয়ে জ্বলতে আরম্ভ করেছে। তবে ঐসব যন্ত্রণা মোটেও স্পর্শ করছে না আসমাকে৷ সাবান নিয়ে অনবরত হাতে-পায়ে সর্বাঙ্গে ডলে ডলে শরীরের অজানা কদর্য দূর করার চেষ্টা করছে সে। নিজের শরীরটাকে আজ আবারও অচ্ছুৎ নোংরা কিছু মনে হচ্ছে ওর। ঘৃণায় ইচ্ছে করছে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় সর্বাঙ্গে। ও নিশ্চয়ই ভীতু একটা মেয়ে। ইচ্ছেটাকে বাস্তবায়ন করতে পারছে না ভয়ের অবদমনে।

নিজের ওপর তীব্র আক্রোশে ক্ষয় হয়ে যাওয়া সাবানের টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল আসমা বাথরুমের মেঝেতে। করতলে মুখ লুকিয়ে আর্ত্মচিৎকারের সাথে ফুঁপিয়ে উঠল। মস্তিষ্কের ভেতর ঘণ্টার মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কিছুক্ষণ পূর্বে বলা অতনুর নোংরা নোংরা কথাগুলো। সে না অর্ধাঙ্গী হয় অতনুর! স্বার্থ হাসিলে নিজের বিবাহিতাকে কেউ কীভাবে প্রস্তাব দিতে পারে অন্য কারোর বিছানায় যাওয়ার? রূহে কাঁপন লাগে না এক মুহুর্তের জন্যও! অভিমান, অনুযোগ, কষ্ট-যন্ত্রণা কিচ্ছু নয়;শুধু ঘৃণার পারদ হৃদয়ের অন্তরীক্ষ স্পর্শ করে ফোয়ারার মতো লুটিয়ে পড়ছে আসমার বুকের ভেতরের শক্ত জমিনে। বলার অপেক্ষা রাখে না চোখের কার্নিশে ঘনঘোর বর্ষাধারাও ঘৃণার সর্বোচ্চ বহিঃপ্রকাশ ছাড়া অন্যকিছু নয়। অতনুর প্রতি তার এ অসীম ঘৃণার পরিসমাপ্তি কখনও হওয়ার নয়। তথাপি অতনুর শাস্তিটা সে বোধহয় হালকাভাবেই দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আজকের পর তার শুষ্ক নির্জীব হৃদয়ে মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠতে চাওয়া মায়া-মমতার পথটুকু চিরজীবনের তরে বন্ধ হয়ে গেল। অতনুর নিধন তার হাতেই লেখা আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে নৃশংস, ঘৃণ্যতম উপায়ে পশুটার জীবনের ইতি টেনে না দেয়া পর্যন্ত একদণ্ড শান্তিতে থাকতে পারবে না আসমা। কোনোভাবেই না।

অনর্গল বয়ে যাওয়ার পর ট্যাংকির পানিটুকু ফুরিয়ে গেলে আপনা থেকে শাওয়ার বন্ধ হয়ে গেল। হাঁটুতে মাথা গুঁজে প্রতিক্রিয়াহীন চুপচাপ বসে রইল আসমা। গতকাল পরিকল্পনামত রাক্ষসগুলোর খাবারে স্ট্রিকনিন মিশিয়ে দিলে আজকের এতগুলি প্রহসনের অবকাশ থাকতো না৷ কেন যে শেষ মুহুর্তে মায়া জন্মে গেল!

এই মায়া-ই আসলে এক ভয়ংকর জিনিস৷ এতকিছুর পরেও একে নিজ অন্তরে ঠাঁই দিয়ে পদে পদে নিজের পরিসমাপ্তির পথে এগতে হচ্ছে। নাহ্ আর নয়। এবার যে মায়া কাটাতে শেখা বড্ড দরকার। শুরুটা কার মাধ্যমে করা যায়? কাকে ও সবচাইতে বেশি ভালোবাসে এই পরিবারের? ভাবতে হলো না। কারণ উত্তরটা ওর অবচেতন অনেক আগে থেকেই জানে; উপমা।

বেশ, তবে উপমাকে মোহরা বানিয়ে ওর ধ্বংস-ধ্বংস খেলা শুরু হয়ে যাক। অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেল; আর দেরি নয়৷ লোহা গরম থাকতেই ওতে হাতুড়ি মারা উচিৎ। ঠান্ডা হয়ে গেলে পরে সেই লোহা দিয়ে আর কাজ নেই। তেমনই বুকের ক্ষতটাও এখন তাজা; প্রতিহিংসায় উন্মুখ। এখনই সঠিক সময় নিজের ওপর হওয়া অন্যায়গুলো দ্বিগুণ করে ফিরিয়ে দেয়া। এরপরে মায়া জন্মে গেলে আবারও একটা হারের সম্মুখীন হতে হবে। যা আসমা কিছুতেই চায় না।

জলন্ত দৃষ্টি সীমানার বাইরে আজ কোনো সহানুভূতির চিহ্ন নেই। রিপুর তাড়না সত্যিকার অর্থে আজ আসমাকে মানুষ থেকে নিষ্ঠুর হৃদয়হীন কোনো জীবে পরিণত করে দিয়েছে; যাকে ক্রোধ ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখাতে পারছে না।

______

এদিকে অতনুর চোখজোড়ায়ও ধিকিধিকি বহ্নিশিখার তেজ। অথচ দেখলে মনে হবে কোনো পাথরের মূর্তি সাজিয়ে রাখা হয়েছে বুঝি আলো-আঁধারির ঘরে। আসলে ক্রোধ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে ও ভীষণ শান্ত হয়ে যায়; হতে শিখেছে। কারণ অপরিমেয় ক্রোধ বাঁধনছাড়া হয়ে গেলে ওর হাতে অপরাধও যে অপরিমেয় হয়ে যায়৷ প্রমাণ তো চোখের সামনে। গতকাল রাতে ক্রোধটা মাত্রার বাইরে বেরিয়ে না গেলে আজকের এই দুর্দিনের সূচনাই হতো না।

স্মৃতিতে গতকাল রাতের দৃশ্যগুলো একের পর এক প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে অতনুর। বজ্রমুষ্ঠি পাকিয়ে চূড়ান্ত ধৈর্যের সাথে রোমন্থন করছে ও ঘটনাগুলি। এতকাল যা অন্যের সাথে হতে দেখে এসেছে সেসব কখনও নিজের সাথে হতে পারে এমন ধারণা অতনুর ছিল না।

কিছু ভুলের পরিণাম বুঝি এভাবেই দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে।

সময়-গতকাল মধ্যরাত

(উর্বশী হত্যার আখ্যান):

রাত্রিবেলা আসন্ন নির্বাচন এবং শওকতকে এমপি বানানোর পরিকল্পনা নিয়ে টুকটাক আলোচনার পর রওনক বেরিয়ে গেলে তবেই একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলার ফুরসত পেলেন নিজাম। পুরো আলোচনায় যদিও তার মনযোগ এর কমতি টের পাওয়া যায়নি তবুও রওনক যাওয়ার পর আসরের প্রসঙ্গ যে ভিন্ন বুঝতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হলো না অতনুর। সে অবশ্য আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলছিল না। নিজামকে প্রস্তুত হওয়ার সময় দিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে স্কচের গেলাসে ছোটো ছোটো চুমুক বসাচ্ছিল।

লোকে বলে, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি নাকি বরাবরই মানুষের আগ্রহ বেশি। কথাটা আসলে মিথ্যে নয়। এ যাবৎ অতনুর যতগুলি খারাপ অভ্যেস গড়ে উঠেছে সব কিন্তু একটা করে বারণ শোনার পরপরই। এই যেমন ড্রিংক করার অভ্যেস। সেই কলেজ জীবনে বড়বাবার বারণ শুনে ভীষণ আগ্রহী হয়ে প্রথমবার মদের বোতলে তার চুমুক বসানো। সেই শুরু। এরপর অল্পসল্প সিপ নিতে নিতে কখন হেভি ড্রিংকারে পরিণত হয়েছে নিজেই টের পায়নি।

ইদানিং তো এমন হয়েছে চোখের পলকে এক দু বোতল সাবাড় করলেও নেশাটা ঠিক চড়ে না। নেশায় অবশ্য মজা পাওয়া যায় কোনো উদ্ভিন্নযৌবনা নারীসঙ্গ পেলে। আর অতনুর জন্য সেই নারীসঙ্গটা কে,নতুন করে নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।

হ্যাঁ, একমাত্র উর্বশীই এতকাল তাকে নেশার আসল মজাটা চিনে নিতে সাহায্য করেছে। ওকে ছাড়া মদের আড্ডাও আজকাল বড় ফিঁকে মনে হয় অতনুর কাছে।

ড্রিংকের সময় উর্বশীর নামটা মাথায় এলে ওর সান্নিধ্য পাবার জন্য খুব উতলা হয়ে উঠল অতনুর শরীর। মনে হলো বিরক্তিকর বুড়োটার ভারী ভারী কথার বোঝা নামিয়ে জিপ নিয়ে একটানে উর্বশীর ফ্ল্যাটে চলে যায়। ওর মাখনসম শরীরটা অধিকার করে নিয়ে সমস্ত দুশ্চিন্তা-দুর্ভাবনা প্রোথিত করে দেয় যুগান্তরের তৃষিত অতলান্ত সমুদ্রকুণ্ডে। সান্নিধ্যের তৃষ্ণা জাগলে নির্ভাবনায় মদের সাথে উর্বশীর বিবস্ত্র শরীর কল্পনায় আঁকার চেষ্টা করে অতনু। পরিবেশ, পরিস্থিতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে গ্লাস হাতে ব্যাকরেস্টে এলিয়ে পড়ে ক্ষনিকের জন্য চোখের পাতা এক করে নেয়।

কি অদ্ভুত! জাগ্রত শরীরের রিরংসায় আজ উদ্ভিন্নযৌবনা বিবসনা কোনো দেহের ভাঁজ আর চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে না। পরিবর্তে চক্ষু শীতলকারি অকল্মষ শ্রী আর অপ্রতিম সৌন্দর্যের ধূসর অবয়ব ভেসে উঠতে দেখলে মৃদু কম্পনে নড়ে ওঠে অতনুর সমূহ। পলকে যেন তার ঘোর কেটে যায়। হালকা কেশে ঝট করে চোখ খুলে সোজা হয়ে বসার চেষ্টা করে সে।

অপরদিকে তারই মুখোমুখি বসা নিজাম চৌধুরীর কামনায়ও একই নারীর প্রতিরূপ। যাকে শয্যাসঙ্গীনি বানানোর ফন্দিফিকিরে সে দীর্ঘক্ষণ যাবৎ নিমজ্জিত। কিন্তু একা একা এ কর্ম সাধন করা যে অসম্ভব পর্যায়ের। এতকাল যার পরোক্ষ সাহায্য ছাড়া এসব ব্যাপারেও চলতে আগ্রহবোধ করেনি নিজাম, আজও নিশ্চয়ই তার সাহায্য ছাড়া কিছু হওয়ার নয়। কিন্তু এবারের সঙ্গীনি যে তার অনুচরের অর্ধাঙ্গিনী...

কয়েক মুহুর্তের জন্য কথাটা মাথায় খেললেও হুট করে নিজামের মনে হলো বিয়ে, বন্ধন এসবে অতনুর তীব্র অনাগ্রহ বলেই জানে নিজাম। অতনু শুধু দুটো জিনিসকে ভালোবাসে। এক. টাকা আর দুই. ক্ষমতা।

টাকা আর ক্ষমতার বাইরে অন্য কোনো কিছুর

সাধ্যি নেই ওকে বশ করার। কে জানে ওভারকনফিডেন্সের তাড়নায়ই কি না! নিজের চিন্তাশক্তির লোপ ঘটিয়ে একদম হুট করেই

জুয়ার চালের মতো অতনুর অলক্ষ্যে বাজি রেখে বসল নিজাম আসমাকে।

ঘোর কেটে গেছে বহুক্ষণ। বলার অপেক্ষা রাখে না, নিজের স্ত্রীকে জড়িয়ে বসের সম্মুখ নোংরা প্রস্তাবে অতনু যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়ল চোখের পলকে। অন্যের স্ত্রীকে শয্যাসঙ্গীনি বানানোর প্রস্তাব যে এমন নির্ভীকচিত্তে দেয়া যায়, দেখে সহসা সে চমকে উঠল। শুয়ো পোকার মতো কিলবিলিয়ে গুচ্ছ গুচ্ছ রাগ ওর মস্তিষ্কের শিরা ধমনীকে এমনভাবে পেঁচাতে শুরু করল যেন ফেটে জরাজীর্ণ হয়ে যাবে মস্তিষ্ক। তৎক্ষনাৎ রিভলভার উঠিয়ে ছ'টা গুলি ভরে দিতে ইচ্ছে হলো শুয়োরটার মাথায়। কিন্তু এতদিনের চড়াই-উতরাই ভেঙে অর্জিত পদটা এক নিমেষে বিলীন হয়ে যেতে পারে এমন আশংকার সংকেত নিঃশব্দে ওকে পাঠিয়ে দিলো ওর মস্তিষ্ক। নিমেষে ক্রোধ প্রশমিত করে রাজ্য এবং রানী দুটোই অক্ষত রেখে কীভাবে প্রতিপক্ষকে ঠেকানো যায় তারই প্রচেষ্টা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল অতনু। স্ত্রীকে অন্য পুরুষের লালসায়, কামনায় সহ্য করার পরেও খুব সহজ ভঙ্গিমায় হাসতে হাসতে বলতে হলো,

-- মজা করেন বস!

প্রস্তাবে যে বিন্দুমাত্র কৌতুক নেই তা অতনু যেমন জানতো, তেমনই তার রুক্ষ হাসি এবং শীতল কণ্ঠ নিজামকে উপলব্ধি করিয়ে দিল, তার অনুগত অনুচর অতনু এবং আসমার স্বামী অতনুর মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। দুই সত্ত্বা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণরূপে আলাদা। এবং যতখানি সহজে সে আসমাকে কল্পনা করে ফেলেছিল তার চেয়ে সহস্রাব্দগুণ দুর্বোধ্য ওকে হাসিল করা।

তথাপি নিজামের মনে হলো সে বুঝি রাজনৈতিক প্রলোভনে অতনুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারবে। বুঝতে পারেনি অতনু এতদিনে মুঠো খুলে বেরিয়ে যাওয়া জলে পরিণত হয়েছে। দাবার দান সে কতখানি জানে! কিস্তিমাত করার সমস্ত কৌশল তো অতনুর নখদর্পনে৷

ফলে রাজনৈতিক প্রলোভনের বিষয়টা যখন এলো তখন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে উষ্মাহীন গলায় অতনু তার আসনটাই চেয়ে বসল। রানীর বিপরীতে সমস্ত আধিপত্যের একচ্ছত্র অধিপতি হতে চাইল। এক প্রস্তাবের বিপরীতে পাল্টা প্রস্তাবে নিজাম নাকাল হলো বৈকি! সাথে বুঝি খানিক কৌতুকও বোধ করল। বিনিময়ের প্রভেদ কয়েক মুহুর্তের জন্য নির্বাক বিবশ করে দিলো তাকে। এরপর সম্বিত ফিরে পেলে চোয়ালদ্বয় পাথরের ন্যায় শক্ত হয়ে উঠল স্বাভাবিকভাবে।

নাহ্ অল্পে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ তার ধাতে নেই, তবে বাক্যবাণে অপমান করার চেষ্টায় কোনো ত্রুটির অবকাশ রাখতে চাইল না মন্ত্রী সাহেব। বনবিড়াল কখনও বাঘ হতে পারে না কথার আঘাতে বুঝিয়ে দিল অতনুকে ভালোমতো। অতনু অবশ্য সেসব গায়ে মাখল না। সে নিজেও জানে তার চাহিদা নিছক বালকসুলভ শোনায়। তথাপি সে নিজামকে বোঝাতে চাইল তার স্ত্রী বিনিময়যোগ্য নয়। কতটা বোঝাতে পারল কে জানে। আলগোছে বাক্যবাণের তীব্রতা এড়িয়ে সহাস্যে দৃঢ় স্বরে বলল,

--" তাহলে রানীর কথা ভুলে যান"

এ পর্যায়ে অতনুর হাসি দেখে নিজামের মাথা খারাপ হবার যোগাড়। এতদিনের পোষ্য আজ তার মুখের ওপর না বলার সাহস দেখায় ভাবতেই সে রাগের বশে হুমকি দিয়ে বসল, এতদিন যাবৎ অতনুকে যা দিয়েছে সব ফিরিয়ে নেবে, শুধু তাই নয় আসমাকেও শয্যাসঙ্গীনি বানিয়ে ছাড়বে এটা তার চ্যালেঞ্জ।

ওসব ফাঁকা হুমকি ধোপে টিকবে না জেনেই অতনু বেরিয়ে পড়ল তৎক্ষনাৎ। জিপ ঘুরিয়ে এরপর আর নিজের বাড়ির রাস্তা মাড়ানো হলো না তার। অবিন্যস্ত চিন্তার জট খুলতে খুলতে অবচেতনে কখন সে উর্বশীর বাড়ি পৌঁছে গেল নিজেই বুঝতে পারল না। ব্রেক কষার পর ফ্ল্যাটটার সদরগেটে দৃষ্টি নিবদ্ধ হলে তখন উপলব্ধি হলো তার জীবনের সমস্ত সমস্যার সমাধান এই গেইট পেরোলেই যেন বেরিয়ে যায়। রাগটুকু না কমলেও ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল অতনুর। কোথায় তার আধিপত্যের প্রমাণ নেই?

সে যা চায় সর্ব উপায়ে তা হাসিল করে ছাড়ে না কি!

_____________

পূর্বে তেমন রাত জাগার অভ্যেস ছিল না উর্বশীর। যে শরীরের মোহে সে একসময় দো-জাহানের কত বড় বড় বাদশা-শেখ, জমিদার গোছের লোকদের নিজের দিওয়ানা বানিয়ে রাখত, সে শরীরটাকে সুস্থ এবং আকর্ষণীয় রাখার জন্য অনেক কঠিন কঠিন নিয়ম তাকে পালন করতে হতো। একটা সামান্য মশার কামড়ের দাগও তার শরীরের ওপর বরদাস্ত ছিল না কুঠিতে থাকা অবস্থায়। কিন্তু জীবনের সব নিয়ম, কানুন, গতিপথ পাল্টে গেল এই একটা মানুষের আগমনে। অতনু তার জীবনে মামুলি পতঙ্গ হয়ে ঢুকে তার মতো জলন্ত কয়লাকে কীভাবে ভক্ষণ করে নিলো টেরই পেল না উর্বশী। তবুও সে বোধহয় খুশী ছিল। রোজ রোজ বিকৃত মানুষগুলোর অত্যাচারের থেকে একজনের অধীনস্থ হয়ে থাকা ঢের সুখের ছিল তার কাছে। তবে ক্ষণস্থায়ী সুখটাও বিলীন হয়ে গেল তখন, যখন উপলব্ধি করল তাকে অধিকার করে ফেলা লোকটা কখন তার নিষ্প্রভ হৃদয় পিদিমে ভালোবাসার বহ্নিশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছে তারই অগোচরে। এবং এই ভালোবাসা তাকে কেবল দহন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না কখনোই না। ঠিক তখন থেকে ওর জীবনের সমস্ত অর্থই যেন ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করল। অতনুর বিয়ের খবর শোনার পর তো জীবনের প্রতি কোনো আগ্রহই অবশিষ্ট ছিল না উর্বশীর। একবার ইচ্ছে করতো সমস্ত বাঁধা ঠেলে জোর করে অতনুকে নিজের ডোরে বন্দী করে নেয় সে, পরক্ষনেই আবার মনে হতো ভালোবাসার সাথে জোর কিসের? সে যেমনি করে অতনুকে ভালোবাসে, অতনুর হৃদয়ে তেমনি করে তো তার নাম লেখা নেই। বরং সেখানে তো... সেখানে তো ভীষণ যত্নে অতনু সেই মানবীর নাম লিখেছে যাকে সে স্বেচ্ছায় আর ভীষণ মর্যাদায় অর্ধাঙ্গীরূপে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ঐ স্বীকৃত সম্পর্কের কাছে উর্বশী কিছুই না;কেউ না৷

দুশ্চিন্তা আর একরাশ যন্ত্রণা নিত্য সঙ্গী করে মরমে মরমে মরে যেতে যেতে এতদিনে কি মনে করে সৃষ্টিকর্তা মুখ তুলে চাইলেন উর্বশীর পানে। খুব অদ্ভুত সময়ে এবং অদ্ভুত পরিস্থিতিতে একজনকে বাঁচার অবলম্বন করে পাঠালেন ওর দুয়ারে। ঠিক অতনুর অনুকৃতিরূপে ওর চিহ্ন নিয়ে আগত ছোট্ট প্রাণ দৈবভাবেই যেন ঠাঁই পেয়ে গেল উর্বশীর জঠরে। অনাদরে অতিষ্ঠ শরীরটায় বাসা বেঁধে ফেলা রোগের পথ্য খুঁজতে গিয়ে এই নতুন প্রাণের সন্ধান এলো উর্বশীর কাছে।

সেই থেকে অদ্ভুত অনুভূতির তাড়না মেয়েটার চোখের ঘুম পুরোপুরি কেড়ে নিলো। অজানা অতিথি কতখানি সৌভাগ্য নিয়ে, কতখানি রূপ মাধুর্য নিয়ে এই ধরনীর বুকে পা রাখতে চলেছে এসব দুর্বোধ্য ভাবনায়ই দিবসরজনী কেটে যাচ্ছে তার। নাহ্ সে অতনুকে কিছু জানায়নি। জানাতে পারেনি। নিষ্ঠুর লোকটা কবে তার কোন ডাকে সাঁড়া দিয়েছে? নিজের ইচ্ছে না হওয়া অবধি, বরং বলা ভালো সান্নিধ্যের তাড়না অনুভব না করা অবধি উর্বশীর ছায়াও তো দর্শন করে না সে। সেখানে কীভাবে তাকে নতুন অতিথির আগমনী বার্তা শোনাবে উর্বশী?

ইদানীং ভীষণ অভিমান হয় উর্বশীর। একটা মানুষ এতখানি সৃষ্টিছাড়া, এতখানি নিষ্ঠুর কি করে হতে পারে? তার হৃদয়ে কি কখনোই উর্বশীর জন্য কোনো অনুভূতির পসরা সাজবে না? কখনো উর্বশীর অনুপস্থিতি তাকে প্রেতরূপে তাড়া করে ফিরবে না? ঐ পাথররূপী বুকটাতে কখনো শূন্যতার সৃষ্টি হবে না! হবে বৈকি। হতেই হবে। উর্বশী জানে, এই দেবশিশুটির পদার্পণে তার রিক্ত জীবনের আদল সম্পূর্ণরূপে পাল্টে যাবে। পাল্টাতেই হবে। সেও এবার স্বীকৃতি পাবে। প্রিয় মানুষটার অর্ধাঙ্গি রূপে, তার সন্তানের মায়ের রূপে।

এবং সেই দিনটির অপেক্ষা উর্বশীর কাছে ভীষণ আগ্রহের;ভীষণ আনন্দের।

চলবে,

Sara

★রিভাইজ দেয়া হলো না 😔

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন