[১৮+
এবং দুর্বলচিত্তের মানুষদের এ পর্বটি না পড়ার পরামর্শ দেয়া হলো]
চিঠি দিও
৩৬
_______________
গতকাল মধ্যরাত
(উর্বশী হত্যার আখ্যান):
রাতের রানী নিশিপদ্ম। নামের সাথে যার কাজের অদ্ভুত মেলবন্ধন। মিঠেল সুবাসের শ্বেতকায় ফুলটি গূঢ় অন্ধকারে কিন্তু গাছ আলোকিত করে ফুটে থাকে। পশ্চিম আকাশে সূর্য ঢলে পড়ার পর প্রকৃতি যখন একটু একটু করে তমসায় ডুবিয়ে নেয় নিজেকে, ঠিক তখুনি কুঁড়ি থেকে একটু একটু করে নিজেকে প্রকাশ করতে শুরু করে নিশি শোভা নিশিপদ্ম। এবং সকাল হলেই আবার টুপ করে ঝরে যায়৷
উর্বশী বুঝি সেই নিশিপদ্মের একজন মানব মূর্তি। সৌম্যা সোমলতিকা। যে শুভ্রতা ছড়ায় কেবল রাতে। যার সমস্ত আকর্ষণ আঁধার কাটলেই পালিয়ে যায়৷
উর্বশী ঠিক সেই বিষণ্ন সুন্দর ভায়োলিনের সুর,যা বিষাদমণ্ডিত সুরের কলতান হৃদয়ের অতল স্পর্শ করলে অনুভূতিরা বিবশ হয়ে পড়ে।
অতনুর কাছে অবশ্য উর্বশী নামক মেয়েটার সংজ্ঞা ভিন্ন। ওর কাছে উর্বশী ক্ষণস্থায়ী প্রয়োজনমাত্র; বিকল্পক মানুষ। ওর জেদ,ওর ইনভেস্টমেন্ট।
উর্বশীকে অস্ত্র বানিয়ে নিজাম চৌধুরীর সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার পরিকল্পনা বহুদিন আগের৷ অনেক আগে অতনু ভেবেছিল, কখনো সুযোগ এলে উর্বশীকে নিজামের মিস্ট্রেস বানিয়ে ওঁর বিশ্বাস অর্জন করবে, এরপর উর্বশীর হাতেই ওকে খু* করাবে। কিন্তু রওনকের সাথে হাত মেলানোর পর পরিকল্পনায় কিছুটা ভাটা পড়ে যায়। আজ হুট করে এতদিন পর যখন নিজামের নজর আসমার ওপর গিয়ে পড়ল, ঠিক তখনই পুরনো চিন্তারা পুনরায় মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠতে লাগল ভেতরে। এবং দুর্ভাবনা সব বাদ দিয়ে উর্বশীকেই বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করল অতনু।
একটা নতুন শুরুর আকাশকুসুম ভাবনা নিয়ে যখন উর্বশী ব্যস্ত, ঠিক তখনই সদর দরজায় সেই চিরপরিচিত ঠকঠক শব্দ। অচীরে ভাবনার অতল ফেঁড়ে বেরিয়ে এলেও উর্বশীর বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় মানুষটা সত্যি এসেছে। অতনুরও অভ্যেস দু'বার নক করেই নিস্তব্ধ হয়ে যাওয়া৷ তাই সন্দেহের অবকাশ থাকে না। চিত্তানন্দে, কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে সে একপ্রকার ছুটে যায় ভারী পাল্লার দরজার দিকে। নিমেষমাত্র ব্যয় না করে এরপর দোর খুলে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষটার প্রশস্ত বুকে, যার সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য প্রত্যেক মুহুর্ত সে উন্মুখ থাকে, উন্মনা থাকে তার সর্বাঙ্গ। এতদিনে এই অনাকাঙ্ক্ষিত খুশির মুহুর্তে মানুষটার আগমন চার চাঁদ লাগিয়ে দেয় তার আনন্দে। আদুরে বেড়ালছানার মতো বুকের গহীনে ঢোকবার চেষ্টা করে আষ্টেপৃষ্টে সে বেঁধে নেয় অতনুকে নিজের সাথে আরও শক্ত করে।
ওদিকে নেশায় আংশিক মাতাল অতনুকে এসব অদৃশ্য ভালোবাসার ডোর, অনুরাগ-অনুরক্তি বিন্দুমাত্র স্পর্শ করে না। কামনায় দগ্ধ হয়ে সে উর্বশীর স্পর্শকাতর অংশে হাতের চাপ বাড়িয়ে দিয়ে পীনোন্নত চূড়ায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। খারাপ লাগলেও উর্বশী বারণ করে না। আজ সমস্ত মন কেমনের অনুভূতি সাইডে রেখে মানুষটার ইচ্ছে মতোই নিজেকে তার অঙ্গনায় রূপান্তরিত করতে চায়। অঙ্কশায়িনী থেকে তার অর্ধাঙ্গিনীরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এর বিপরীতে যতটা সইতে হয় হোক।
অতনুর পিপাসু ক্ষুধার্ত চোখজোড়া উর্বশীর ভাবনার অন্ত খোঁজায় সময় নষ্ট করতে চায় না বরাবরের মতো। কোনোরকমে বাঁ হাতে ছিটকিনি আটকে দিয়ে পাঁজাকোলা করে ওকে তুলে নিয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ায়। উর্বশীও সানন্দে ভালোবাসায় বিলীন হতে তৎপর। নিজের সমূহ মেলে দিয়ে তীব্র আকাঙ্ক্ষায় দু-হাত বাড়িয়ে সে অধিকার করে নিতে চায় নিজের স্বপ্ন পুরুষকে। তা দেখে অতনু ঠোঁট টেনে হাসে।
ঘোরগ্রস্তের মতো গলায় নাকমুখ ঘষে ঘষে বিড়বিড় করে,
"তুমি আমাকে পাগল করে দিচ্ছ আসমা;শেষ করে দিচ্ছ আমায়"
অতনুর আবেগঘন স্পর্শগুলো উর্বশীকে নিয়ন্ত্রণহীন করে দেয় সবসময়। কিন্তু আজ? পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্তরঙ্গতার নাজুক মুহুর্তে মাতাল কণ্ঠে "উর্বশীর" পরিবর্তে "আসমা" নামটা নিমেষে সমস্ত ঘোর কাটিয়ে দিলো। উর্বশী এবং অতনু দু'জনেরই। বিবর্ণ ফ্যাকাশে এবং আহত দৃষ্টিতে উর্বশী অতনুর দিকে এমনভাবে চাইল যেন কেউ প্রাণবায়ুটাই টেনে নিয়ে গেল তার থেকে।
ওদিকে বিহ্বল অতনু মস্তিষ্ক এবং প্রকোষ্ঠ উভয় থেকেই আসমা নামটা জোর করে সরাতে চেয়েও অপারগ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে উঠে পড়ল তার অঙ্কশায়িনীর আকর্ষণীয় দেহপল্লবী থেকে। এবং বিছানার এককোণে কিছুটা বিরক্তি, কিছুটা আক্রোশ চেপে রেখে বসে রইল সে নিশ্চুপ। এক শরীর সাঁতরে পার হতে অন্য শরীরের কল্পনা নতুন নয়। কিন্তু আজ কেন যে বিষয়টা এত কদর্য মনে হচ্ছে!
তবে কি তার আসমাকে এমন নোংরা অবস্থানে কল্পনা করা পছন্দ নয়, নাকি মেয়েটাকে নিয়ে জমা হচ্ছে তীব্র অনুভূতির পসরা।
উর্বশীর মনে হচ্ছিল গলন্ত শিশা কেউ কর্ণদ্বয়ে ঢেলে দিয়েছে তার। বুকের ভেতর শাবলের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত, র'ক্তা"ক্ত করে ছেড়েছে একটা নাম "আসমা"
ছোট্ট একটা ইঙ্গিতেই যেন তার সমূহ জেনে গেছে ক্ষণিক পূর্বের দেখা কল্পনার শিশ মহল পুনর্বার বাস্তবতার আঘাতে চূর্ণবিচূর্ণ হতে চলেছে অতিসত্বর।
পরাজয়ের নত স্বীকার করে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কাপড়গুলো ঠিকঠাক গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বুকভরা দীর্ঘশ্বাসে সে অতনুর বিপরীতে বসল। এবং কিঞ্চিৎ আর্দ্র-আহত স্বরে বলল,
-- আমি তোমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছি বাংগালী বাবু।
অজানা আক্রোশে ইতোমধ্যেই অতনুর মাথা খারাপ হওয়ার জোগাড়। তন্মধ্যে হুট করে এমন সংবাদে অতনুর বিহ্বলতা বাড়ল। অবুঝের মতো বিস্ময়াভিভূত সে পুনরায় জিজ্ঞেস করল,
-- কি?
এবার ফিরে তাকাল উর্বশীও। সরে গিয়ে অতনুর ঠিক পাশে বসে ওর একটা হাত নিজের জঠরের ওপর রেখে আবেগপূর্ণ স্বরে বলল,
-- তোমার অংশ বেড়ে উঠছে এখানে। বাবা হচ্ছ তুমি, আর আমি মা।
অশ্রুসিক্ত আবেগপ্রবণ কথার বিপরীতে একরাশ গাম্ভীর্য পুঞ্জীভূত হলো অতনুর মধ্যে। হাত ছাড়িয়ে নিয়ে ছোট্ট শ্বাস ফেলে সে বলল,
-- কতদিন হলো জানতে পেরেছ?
এই প্রশ্নটাই কি না কে জানে! একটা টিমটিমে আশার আলো ধরা দিলো উর্বশীর কাছে। সানন্দে উঠে গিয়ে কাঠের আলমারি থেকে রিপোর্ট নিয়ে এসে অতনুর হাতে তুলে দিতে দিতে বলল,
-- বেশি নয়, অল্প ক'দিন। ডাক্তার বললেন বাবুর বয়স স্রিফ থ্রি উইকস। অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে ওর জন্য আমাদের।
উচ্ছ্বসিত বাক্যগুলো শ্রবণ করতে করতে ফাইলটা নামিয়ে রাখল অতনু। খুলে দেখার আগ্রহ তার মধ্যে নেই। শুধু যে উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছিল তার ভাবনা স্মরণ করিয়ে দিলো লক্ষে পৌঁছতে হলে কোনো বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া মানা। এছাড়া তাদের বংশের প্রদীপ এমন নাম-পরিচয়হীন, অস্বীকৃত কোনো সম্পর্ক থেকে নিশ্চয়ই আসবে না। অতনু নিজেই তা মানতে পারবে না। তাই উর্বশীর আনন্দের উৎসবে ভাটা ফেলে সে বলল,
-- কালকেই ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেব। একসময় গিয়ে অ্যাবর্শনটা করে আসবে।
-- মানে?
বিস্ময়াহত হবার পালা এবার উর্বশীর। সাথে বেশ খানিকটা ভীতসন্ত্রস্ত।
-- আ..অ্যাবর্শন মানেটা কি! আমি, আমি ওকে চাই। ও আমার;আমাদের সন্তান। আমি ওকে ফেলব না। কিছুতেই না।
-- পাগলামি কোরো না। এখন এসবের সময় নয়।
-- এখন নয় তো কখন! আমি এ যাবৎ তোমার সব কথা শুনে এসেছি বাংগালী বাবু। কোনো কথার অবাধ্য হইনি। লেকিন ইয়ে বাত, এইটে আমি মানতে পারব না। আমার সন্তানকে কিছুতেই হত্যা করতে পারব না আমি। কিছুতেই না।
রীতিমতো আর্তনাদ করে উঠে ভূতগ্রস্তের মতো ধপ করে বসে পড়ল উর্বশী। এইমাত্র যা যা শুনলো সব যেন ওর কাছে দুঃস্বপ্ন মনে হচ্ছে। ঘুম ভাঙলেই কেটে যাবে এমন দুঃস্বপ্ন।
অতনু এতক্ষণে বোধহয় উর্বশীর ভেতরে চলমান দ্বন্দটা উপলব্ধি করতে পারল। কিন্তু এরপরেও সে প্রতিক্রিয়াহীন৷ হাত মুড়ে ইস্পাত-দৃঢ় স্বরে পুনর্বার বলল,
-- তাহলে তুমি আমাকে হারাবে উর্বশী। ওকে যদি রাখতে চাও তাহলে আমার সাথে সমস্ত সম্পর্কের ইতি টেনে দিতে হবে। আমার ছায়া মাথার ওপর না থাকলে কোন পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে নিশ্চয়ই তা অজানা নয়। সিদ্ধান্ত এখন তোমার।
বলে দরজার দিকে পা বাড়াতে নিচ্ছিল অতনু। থেমে গেল আহত স্বরের প্রশ্ন শুনে,
-- তোমার সাথে আদতে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল বাংগালী বাবু? কোনো সম্পর্ক আছে! আমি কি হই তোমার?
-- সেটা নিশ্চয়ই আমায় বলতে হবে না উর্বশী। তুমি নিজেই ভালোমতো জানো।
-- খদ্দের আর...
কথা সম্পূর্ণ করল না উর্বশী। ওদিকে অতনুর মেজাজ ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। তাই তো সমর্থন করেই সে বলল,
-- ঠিক। আর আমি নিশ্চয়ই চাইব না। অতনু হাওলাদারের অংশ এমন কোনো নারীর গর্ভে বেড়ে উঠুক যার জন্মই অন্ধকার কোনো কালকুঠুরিতে হয়েছিল। তুমি নিজেই তো একটা অভিশপ্ত ফুল। যে আসবে সেও সব খারাপ নিয়েই আসবে। এমন বর্জ্য আমার প্রয়োজন নেই উর্বশী।
-- মুখ সামলে কথা বলো৷ বর্জ্য নয় ও। আমার সন্তান। আমার ভালোবাসার...
একটু থামল উর্বশী। বলল,
-- তুমি আমায় শুধু ভোগ্যপণ্য মনে করে থাকতে পারো। কিন্তু আমি.. আমি তো তোমায় ভালোবেসেছি।
-- ভালোবাসা!
রুক্ষ হাসলো অতনু।
-- নিজের জন্মপরিচয় বারবার ভুলে যাও কেন? ভোগের বস্তুই তো তুমি। একটা পতিতা। পতিতা হয়ে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখার মতো স্পর্ধা আসে কোত্থেকে?
অশ্রুপূর্ণ চোখে এবার উর্বশীও হাসে, তাচ্ছিল্যের হাসি। প্রশ্ন এড়িয়ে দাঁতে দাঁত চেপে দৃঢ় গলায় বলে,
-- এবার এই পতিতাই হবে তোমার স্ত্রী। অতনু হাওলাদার। এত সহজে আমার অধিকার ছেড়ে দেব না আমি। আমার সন্তানকে বাবার পরিচয় দিতেই হবে তোমার। নইলে এতদিন ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে পাপের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছ, সেটাতে ভাঙন ধরাতে এক মিনিটও লাগবে না আমার।
এমন ফাঁকা ধমকিতে অতনু ভয় পাবে না তা তো জানা। যেন মজার কিছু শুনেছে এমনভাবে অট্টহাসিতে সে ফেটে পড়ল।
যে হাসি মধ্যরাতে ছোট্ট ফ্ল্যাটটার চার দেয়ালে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে গমগম করতে লাগল। মিনিটখানেক পাগলের মতো হাসার পর হুট করে শান্ত হয়ে গেল অতনু। শিকারি দৃষ্টি উর্বশীর সর্বাঙ্গে বুলিয়ে খুব শান্ত স্বরে বলল,
-- ঝামেলা বাড়িও না উর্বশী। আগামীকাল গিয়ে ওই বর্জ্য ফেলে দিয়ে এসো। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করিয়ে দেব আমি। কেউ কিচ্ছু...
অতনুর কথা অসম্পূর্ণ রয়ে গেল উর্বশীর রোষপূর্ণ চিৎকারে।
-- বলেছি না বর্জ্য নয়। ও আমার সন্তান। আমার ভালোবাসার চিহ্ন। নিজের রক্তকে এভাবে অপমান করো না অতনু দোহাই লাগে।
-- বর্জ্যকে বর্জ্য বললে ভুল হয় না উর্বশী। আমার সিদ্ধান্ত আমি জানিয়ে দিয়েছি। পুনরায় যদি নষ্ট গলি মাড়ানোর শখ না থাকে তবে যেমনটা বলছি চুপচাপ মেনে নাও। আজ রাতটুকু তোমায় সময় দিলাম। কাল সকালে জিপ পাঠাব। সোজা হসপিটালে যাবে নাকি কুঠির উদ্দেশ্যে তোমার ব্যাপার।
বৃথা তর্কে সময় ব্যয় করার চেয়ে প্রস্থান উত্তম বলে মনে হলো অতনুর। পাঞ্জাবির পকেট থেকে সিলভারের মদের বোতল বের করে গলায় ঢেলে এগতে উদ্যত হলো ও।
বেশিদূর যেতে পারল না যদিও। আবারও থামতে হলো উর্বশীর দ্বিতীয় ফাঁকা ধমকিতে,
-- ধ্বং'স করে দেব আমি তোমাকে। কুঠিতে দিয়ে আসবে তো! কুঠি যদি মাড়াতেই হয় তাহলে তোমার শেষ দেখেই আমি ওদিকে পা বাড়াব। আমার কিছু হারানোর নেই অতনু। কিন্তু তোমার আছে। দিনের পর দিন এস্টেট ব্যবসার নাম করে মাদকের চোরাচালান বাড়িয়ে কালো টাকার পাহাড় জমাচ্ছ, গুম-খু* হ**ত্যা*য় যেভাবে হাত রাঙাচ্ছ সেসব আমি জানি না ভেবেছ! আমার কাছে তোমার সব রহস্য জমা আছে। আমি যদি মুখ খুলি ভোরের আলো ফুটলে তোমার নাম-নিশানা পৃথিবীর বুকে থাকবে তো?
এরপরেই অতনু বুঝতে পেরেছিল একটা এসপারওসপার না হওয়া পর্যন্ত উর্বশীর চ্যাপ্টার ক্লোজ হবে না।
মদের বোতল ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ছুটে এলো সে উর্বশীর কাছে। একসময় মাদকের মতো নেশাক্ত হতো যে চুলের ঘ্রাণে সেই চুলের মুঠি শক্ত করে চেপে ধরল। একইসাথে ঘৃণা, যন্ত্রণা এবং অবিশ্বাসের অদ্ভুত মেলবন্ধন দৃষ্টিতে ফুটিয়ে উর্বশী গুমরে উঠলে সাপের মতো শীতল দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়ে বরফ কঠিন গলায় অতনু বলল,
-- অনেক র ক্তে হাত রাঙিয়েছি সিস্টার।
টাটকা র ক্ত আমার কাছে নেশার মতো।
কখনো তোমার রক্তে হাত রাঙাতে হবে সত্যি ভাবিনি।
ভালই তো ছিলে আমার হাতের পুতুল হয়ে। জীবন্ত বোবা পুতুল। আজ হঠাৎ কণ্ঠ পেয়ে গেলে। খুব কথা শিখেছ না! আমাকে ধ্বংস করবে। করো, আজ এই মুহুর্তে আমার হাত থেকে বেঁচে ফিরতে পারলে তোমাকে সমস্ত স্বাধীনতা দিয়ে দেব। বিশ্বাস হলো না?
তোমার দিব্বি।
ক্রমশ হাতের চাপ বাড়াতে বাড়াতে অতনু ফের স্বগতোক্তি করল,
-- কোনো নর্দমায় আমার বংশের বীজ অঙ্কুরিত হোক সেটা যে আমি চাই না। নিজের রক্ত, দুঃখ তো লাগছে অবশ্যই। কিন্তু তুমি তো আর কোনো বিকল্প রাখলে না।
কথাটার বিপরীতে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানোরও সুযোগ উর্বশী পেল না, তার পূর্বে তলপেটে প্রবল যন্ত্রণায় ছিঁটকে সরে যেতে হলো তাকে।
দু চোখ ভরা অসহায়ত্ব এবং করুণা নিয়ে সে দেখল একদিন ভালোবেসে তার মায়ের রেখে যাওয়া যে খঞ্জরটা সে অতনুর হাতে উপহারস্বরূপ সঁপেছিল, সেই খঞ্জরের ধারালো উর্ধ্বাংশ চিরে দিয়েছে তার জঠরের কোমল ত্বকের পাশাপাশি এতদিনের জমানো ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং নতুন জীবন শুরুর সমস্ত আকাঙ্ক্ষাকে।
উর্বশীর ভীতসন্ত্রস্ত মনে ক্ষীণ আশা রইল তার গর্ভজ এখনও বিলুপ্ত হয়নি, সৃষ্টিকর্তার তৈরি সুরক্ষা কবচ চিরে খঞ্জরটা তার মানিক অবধি পৌঁছতে পারেনি। এতটুকু আশায় সে চিৎকারযোগে সাহায্যের প্রার্থনা করতে চাইল। কিন্তু তার মনোবাঞ্ছা ওপাশের মানুষটা সূঁচালো দৃষ্টি দিয়েই মেপে নিয়েছিল। তাই তো সাহায্যের প্রার্থনা করবার পূর্বে পাথরসম তার হাতদুটো সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরল উর্বশীর কোমল কণ্ঠদেশ। দেয়ালে শক্ত করে চেপে ধরে তার অসম্পূর্ণ কথা কণ্ঠমনির নীচে বিলুপ্ত করে দিলো। শ্বাস নেবার বাসনায় হাত-পা ছোঁড়ার চেষ্টা করল উর্বশী। দুচোখ তার ভরা দিঘি। নিঃশ্বাসের সংকটে কিংবা ভালোবাসার বিপরীতে অপ্রত্যাশিত প্রতিঘাত সয়ে দিঘির জল টলটলে নোনা অশ্রুর আকার ধারণ করে উথলে পড়তে শুরু করল। ওপাশের নির্জীব মানুষটা এসবের খোঁজ অবধি নেয়ার চেষ্টা করল না। ক্রোধানলে ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে দেখল সে সবটাই। কিন্তু ভালোবাসাহীন শুকনো খড়খড়ে তার হৃদয়টাকে এসবের কিছুই স্পর্শ করতে পারল না। একসময় উর্বশীর প্রতিরোধের শক্তি কমে গেল। হয়তোবা ভাগ্যের কাছে হেরে, বেঁচে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাটাও সে হারিয়ে ফেলল। দমবন্ধকর পরিস্থিতিতে অস্পষ্ট স্বরে কেবল এতটুকু উচ্চারণের চেষ্টা করল,
"একদিন তুমি ঠিক খুঁজবে আমায় দেখো, উপলব্ধি করবে আমার শূন্যতা। সেদিন আমি দুহাত ভরা ভালোবাসা নিয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করব না। তোমার এই বিশ্বাসঘাতকতা একদিন শ্বাপদ হয়ে তোমায় তাড়া করে ফিরবে। ক্ষত-বিক্ষত করে দিলে যন্ত্রণায় প্রলেপ লাগানোর হাতদুটো আর পাশে পাবে না। এগুলোর একটাকেও আমার অভিশাপ ভেবে ভুল কোরো না। উর্বশীর জীবন গোটা একটা দীর্ঘশ্বাস। আর দীর্ঘশ্বাসের অনলটাই তোমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করে দেবে"
প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে একটু একটু করে অসীমের পথে যাত্রা করার সময় উর্বশীর করুণ আর্তি জানানো চোখ দুটো খোলা রইল না। আকাঙ্ক্ষার ঝাঁপিটা আলগোছে বন্ধ করে একরাশ ঘৃণা জমিয়ে সে চোখ দুটো মুঁদে নিলো। মৃত্যুর মুহুর্তে তার সজাগ স্নায়ু জাগতিক কোনো ভাবনায় সময় ব্যয় করতে চাইল না, তবুও ঘুরেফিরে কি করে যেন জঠরের অন্দরে লুকিয়ে থাকা অস্তমিত প্রাণটার কথা খুব মনে পড়ল তার। অঙ্কুরে বিনষ্ট বীজটার জন্য তার বন্ধ দুচোখের পাতা বেয়ে কষ্টের ঢল নেমে গেল। সেই তার জীবনের শেষ অশ্রু। এরপর সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ হয়ে গেল আঁধারে নিমজ্জিত নিশিপদ্ম; উর্বশী। শেকড় থেকে উপড়ে ফেলা গাছে ফুল আর কখনো ফুটবে না। নিগুঢ় আঁধার রাতে টিমটিম আলো সাজে কেউ আর সাজবে না।
এই করে চিরকালের তরে ফুরিয়ে গেল উর্বশীর গল্প।
এক পৃথিবী ভালোবাসা নিজ হাতে ধ্বংস করার অনেকক্ষণ পরেও অতনুর ক্রোধ কমল না। ক্রোধে অন্ধ মস্তিষ্কের নতুন ভাবনার অবকাশ তখনই এলো যখন উষ্ণতায় মাতিয়ে দেয়া দেহটা নিস্তেজ-শীতল হয়ে ঢলে পড়ল তার তালুর নীচ দিয়ে। চকিতে সরে এলে অবলম্বনহারা নিষ্প্রাণ দেহটা গুমোট শব্দযোগে শক্ত মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ অতনু নিস্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখল দৃশ্যটা। তার ভেতরে কোনোরূপ মায়া কিংবা করুণার জন্ম হলো না। শুধু কিসের একটা তাড়নায়, নিজের ওপর প্রবল আক্রোশে দু-হাত বজ্রমুষ্ঠি পাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে সে উচ্চারণ করল,
"হোলি শিট"
এরপর খুব অকস্মাৎ, খুব অকস্মাৎ তার দৃষ্টি চলে গেল প্রাণহীন কমনীয় দেহটার উন্মুক্ত জঠরে। কে জানে বাৎসল্য কোনো আবেগ লেশমাত্র তাকে ছুঁয়ে গেল কি না! পাথুরে চোখে সে শুধু রক্তে মাখামাখি তলপেট আর পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া কালচে শোণিত ধারা দেখতে দেখতে পকেট থেকে ফোন বের করে রওনকের নম্বর ডায়াল করল।
ক্লান্ত লাগছিল তার খুব। সত্যিকার অর্থে সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু প্রথমবার ঠকতে হলো। সেদিনের ছেলে এতবড় স্পর্ধা দেখাল তাকে।
এত সহজে বিশ্বাসঘাতকতা ভুলবে না অতনু। যে ওর পথে কাঁটা হতে আসবে, তাকেই সমূলে উপড়ে ফেলে দেবে।
এটাই অতনুর নীতি।
____________
বর্তমান:
ছোটো ছোটো শহরে টুকটাক কি খু*-খারাবি হলো এসব নিয়ে পেপার-পত্রিকা ওয়ালারা মাথা ঘামাতে বিশেষ আগ্রহবোধ করে না। শুধু গোটা দেশের আনাচে-কানাচের খবর ছাপাতে হয় বলে হেলাফেলায় হয়তোবা ছোট্ট করে কোনো কলাম লিখে দেয়। এখন ওসব কলামে পত্রিকা পাঠকের চোখ পড়ল নাকি পড়ল না, কতটুকু আগ্রহবোধ তারা করল এসব নিয়েও প্রতিষ্ঠান বদার্ড থাকে না। অথচ এবার? সেই ছোটো শহরের ছোট্ট নিউজ নিয়ে গোটা দেশ তোলপাড় হওয়ার জোগাড়। সরকারের দ্বিতীয় দফা নির্বাচনের বেশিদিন নেই। নতুন মন্ত্রণালয় গঠনের সময়, নানাবিধ আলোচনা-সমালোচনা তো উঠবেই। তবে রংপুর আসন নিয়ে সমালোচনা যেন একটু বেশিই। সমালোচনার প্রেক্ষিতে যুক্তিসঙ্গত কারণও অবশ্যি আছে। গুরুভার পেতে না পেতেই করাপ্টেড হয়ে গেলে লোকের চোখে শেল বিঁধবেই। আমজনতা কিই আর চায়! ভোটের বিপরীতে তাদের টুকটাক চাহিদাগুলো সময়ের মধ্যে যেন পূরণ করে দেয়া হয়। এইতো নাকি!
সূদুর রংপুর থেকে চিঠির অপেক্ষা এবার করতে হয়নি। সাত সকালে হাওলাদার বাড়ির কোনো এক ছেলে পেপার মেলে ধরতেই অনুজের এমন ভয়াবহ সংবাদ শুনে গোটা পরিবারে তা চাউর করে দিয়েছে।
অতনুর বাবা রাঙ্গা সাহেব ভীষণ কোমল হৃদয়ের একজন মানুষ। দূরে থাকায় ছেলের পলিটিক্সের মাঠে পজিশন কেমন, ইম্প্রেশন কেমন এসব নিয়ে কোনো আলোচনাই তাঁর কানে যায়নি। যতটুকু শুনেছে, দেখেছে, তা ছুটিছাটায় নিজ শহরে ফিরলে কিছু উদ্যমি ছেলের অবিরাম মিছিল-মিটিং কিংবা পাড়ার মানুষদের অতিরিক্ত সমীহ ব্যাস। এর বাইরে ছেলে কি করছে, কোনো অপকর্মে জড়িয়েছে কি না এসব নিয়ে রাঙ্গা সাহেবের মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হয়নি। তার সবসময়ই মনে হয়েছে যার মাথায় সৎ-নিষ্ঠাবান বড়বাবা রঞ্জু সাহেবের হাত আছে সে কখনও বিপথগামী হতেই পারে না। আদর্শবান ভাইয়ের সাহচর্যে অন্য দুই ছেলেকে সত্যিকার মানুষে গড়ে উঠতে দেখে তিনি ভেবেছিলেন সেজ এবং ছোটোটিও বুঝি বাকি দুই ভাইয়ের মতই হবে। কিন্তু আজকের এই বিধ্বংসী খবর তার এতদিনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাস সব যেন বিদীর্ণ দর্পনের মতো চূর্ণবিচূর্ণ করে দিলো এক নিমেষে।
নাহ্ শতভাগ বিশ্বাস যে তিনি করেছেন তা নয়। তবে নরম হৃদয়ের ওপর হঠাৎ আঘাত! অমন নিপাট ভদ্রলোক গোছের মানুষদের জন্য ক্ষতিকর বৈকি!
অচীরে তিনি হাই প্রেশারের কবলে পড়ে অসুস্থ হয়ে গেলেন। আবিদ অফিশিয়াল কাজে রাঙামাটিতে। সে খবরটা শুনে ওখান থেকেই রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে। এদিকে বেচারা আশিন পড়ে গেল ঝামেলায়। অসুস্থ বাবা নাকি কাঁদতে কাঁদতে পাগলপ্রায় মাকে সামলায়, নাকি সবাইকে নিয়ে রওয়ানা হয়। হিমশিম খেয়ে গেলেও বেচারাকে সবটা সামলে নিতে হলো অনেক প্রচেষ্টার পর। বাসের টিকেট না পেয়ে এক কলিগের আত্মীয়ের গাড়ি ভাড়া করে অবশেষে সবাইকে নিয়ে রওয়ানা হলো রংপুরের উদ্দেশ্যে।
কে জানে অতনুর কেইসটার কতটা অগ্রগতি হবে। ঝামেলাহীন মুক্তি মিলবে নাকি, বিসর্জনের বিপরীতে বলাটা বড্ড কঠিন।
চলবে,
Sara
★ উক্ত গল্পে ব্যবহৃত সব রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্ম কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোনো সংযোগ নেই।
★ এবং গল্পের ১৮+ টার্ম পড়তে অস্বস্তি হলে এড়িয়ে যাওয়ার পরামর্শ। এই গল্পের কিছু ডার্ক সাইডও আছে যা মেনে নিতে হবে। যতটা পারা যায় শালীনতা রেখে লেখার চেষ্টা করি তবুও অস্বস্তি হলে এড়িয়ে যান।