চিঠি দিও
৫৬
_______________
"শাপলা টকিজ"- এর ঠিক পেছনে লোকালয় এড়িয়ে দোচালা একটি ঘর। নাহ্ ঠিক আবাসিক ধাঁচের নয়; বরং অবসর পার করার মতো বানিয়ে রাখা৷ অল্প কিছু সংখ্যক বেতের সোফা, একটি মাঝারি সাইজের টেবিল এবং ক'খানা চেয়ারের সমন্বয়ে সাজানো ছোট্ট ছিমছাম ঘর, অতনু হাওলাদারের একটি গোপন আস্তানা হিসেবে খ্যাত। এই আস্তানা সম্পর্কে বাইরের মানুষ খুব কমই জেনে থাকবে, কারণ অতনু আলগোছে সকলের থেকে বিষয়টি আড়াল করে গিয়েছে। অবশ্য আড়াল করার মতোই ঠিকানা এটি। ভাল কাজে তো ব্যবহৃত হয় না। আঁধার যতটা অবগুণ্ঠনে থাকে তত মঙ্গল। আলোয় এলে তাকে বিলীন হতে হয়,নতুবা দ্যুতি দখল হয়ে যায়৷
জায়গাটা শুধুমাত্র অতনুর গোপন অনুচরদের নিয়ে তৈরি। যে কাজগুলোতে সে এতদিন নিজে ইনভলভ হতে চাইত না সেগুলোর জন্য কতগুলো ছেলেকে রাখা ছিল, যারা নিপুণভাবে এসাইনমেন্ট কমপ্লিট করত কেউ বুঝতেও পারত না৷ যেমন আজকের ঘটনাটাই। অতনু শুধু একবার বলেছিল ওদের, পুলিশের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। ব্যাস চোখের সামনে দিয়ে তুড়ি বাজিয়ে নিয়ে এসেছে, কেউ কিচ্ছু করতে পারেনি। নিশ্চিত কেউ বুঝতেও পারেনি সারিতে আত্মীয়ের ভীড়ে লুকিয়ে ছিল ওর দুর্ধর্ষ সব অনুচররা। যখন রকিবুলের পাশে থেকে সরে অন্য সারিতে গেল অতনু, তখনই মূলত নিজস্ব পরিকল্পনাগুলো ওদের জানিয়ে দিয়েছিল। ছেলেগুলো কাজের মানতে হবে৷ এ অবধি যতগুলো গোপন অভিসারে সঙ্গ দিল সব সাকসেসফুল।
প্রথম যখন ওদের নিয়ে এলো সীমান্ত থেকে তখনও কিছুটা সংশয় ছিল। যাযাবর গোত্র; কতটা পোষ্য হবে কে জানে! ওদের প্রথম এসাইনমেন্ট ছিল রওনককে পথ থেকে সরানো। ব্যর্থ হলো। সংশয় তখন বেড়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে নিজেদের ওপর বিশ্বাস ওরা নিজেরাই ফিরিয়ে এনেছে যদিও; শুধু রওনককে কখনো পরাজিত করতে পারেনি।
মাথার ওপর ঝুল শেডে হলুদ বাল্ব ডানে বাঁয়ে দোল খাচ্ছে। টিমটিমে আলোটাকে নিজের চারপাশে ঘূর্ণিপাক খেতে দেখতে দেখতে বোতল থেকে ব্র্যান্ডি ঢেলে নিচ্ছে অতনু।কাঠের টেবিল ভেসে যাচ্ছে গাঢ় লাল রক্তস্রোতে।অতর্কিত হামলা থেকে সেও যে সুস্থভাবে বেঁচে ফিরেছে তা নয়। ধাতুর হ্যান্ডকাফ খোলা কি মুখের কথা! তার ওপর রুদ্ধ হাতটা জিপের সাথে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল ওর। দুর্ঘটনা যখন ঘটল, জিপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ার সময় হাতের চামড়া কেটে আটকে গেছে হ্যান্ডকাফের সাথে। চতুরতার সাথে চাবি জোগাড় করতে না পারলে ঐ হাত কেটে রেখে আসতে হতো অতনুকে। অনুচরগুলো টেবিলের পাশেই মাটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রয়েছে। তাদের ঘোলাটে দৃষ্টি আঘাতপ্রাপ্ত হাতে স্থির নাকি মদের বোতলে অতনু ধরতে পারছে না। ছেলেগুলোর চাহনি অদ্ভুত। চট করে বোঝা যায় না। সময় নিয়ে গ্লাস খালি করে নাকমুখ কুঁচকে অতনু মেঘমন্দ্র স্বরে বলে উঠল,
-- রইল বাকি শুধু একটা কাজ; এরপর থেকে তোরা চিরকালের জন্য মুক্ত। অতনু হাওলাদার নিজে একদিন যে খাঁচায় তোদের বন্দি করেছিল, আজ সে খাঁচা ভেঙে খোলা আকাশে উড়িয়েও দেবে।
আচমকা মনিবের মুখে অদ্ভুত কথা শুনে স্বাভাবিকভাবে ছেলেগুলো চমকে উঠল। ভ্রু কুঁচকে একে অপরের মুখ চেয়ে একজন উপযাচক হয়ে বলল,
-- কিন্তু আমরা তো এই জীবনে অভ্যস্ত ভাই।
শুনে অতনু হাসল।
-- সময়ের সাথে বদলে যেতে শেখ। যা বলছি আমি তোদের ভালো ভেবেই বলছি। মন্ত্রীর অপমৃত্যু হয়েছে। এই শহরে এবার ক্ষমতার হাতবদল হবে। ডানপন্থীরা নিজে থেকে রাজত্ব ছেড়ে দিচ্ছে। তোরাও সময় থাকতেই দল পাল্টে ফেল। নতুনদের বিশ্বস্ত হয়ে ওঠ। ঝামেলামুক্ত থাকতে পারবি।
এ পর্যায়ে ছেলেগুলোও হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল,
-- ভাই আমাদের রক্তেই দোষ, বিশ্বস্ততা পোষায় না। তবু আপনি বলতেছেন...
আপনি চাইলে ঐ ক্ষমতা আমরা আপনার হাতেও আইনা দিতে পারি। বিশ্বাস করেন।
ওদের উত্তেজিত হতে দেখে অতনু হাত তুলে থামাল। বলল,
-- ওসব চিন্তা বাদ দে। গোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে ঝামেলা করে সুবিধে করতে পারবি না। তারচেয়ে আমি যা বলছি চুপচাপ মেনে নে।
-- আর ভাই আপনি?
-- আমি!
ক্ষীণ ঠোঁট প্রসারিত করে সোফায় গা এলিয়ে দিলো অতনু। কতক নিশ্চুপ থেকে বলল,
-- অতনু হাওলাদারের গল্প তো শেষ৷ আমি আর নেই, কোথাও নেই।
এরপর স্তব্ধ হয়ে রইল। কারোর আর ঘাঁটানোর সাধ্য হলো না তাকে। কেবল পূর্ব ইশারা মতো দু'জন চোখে চোখে আলাপ সেরে রওয়ানা হলো অতনুর বাড়ির উদ্দেশ্যে;আসমাকে নিয়ে আসতে। টেলিফোনে তাকে নির্দেশ দেয়াই আছে মাঝরাত্তিরে সব নিস্তব্ধ হয়ে গেলে সে যেন পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গলির মুখে এসে দাঁড়ায়। অতনু লোক পাঠাবে তাকে নিয়ে যেতে; ঐতো তাদের নতুন জীবনের পথে।
পরিকল্পনামত আসমা তৈরি হয়েই ছিল। বাড়ি যদিও এখনো নিস্তব্ধ হয়নি। সদ্য পাওয়া ক্ষত ঘণ্টা কয়েকে সেরে ওঠা মুখের কথা নয়। তার ওপর অতনুকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাওয়ার খবর। পরিস্থিতি এখনও কিছুটা উত্তপ্ত। তবে এত সবকিছুর ভেতর একটা জিনিস ভাল হয়েছে আত্মীয়স্বজনের শোরগোল এড়ানো গেছে। যারা সন্ধ্যায় থাকবে বলে পণ করেছিলেন, অতনুকে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমালোচনার তুবড়ি ছুটিয়েছিলেন বলে শিল্পী নিজে তাদের বাড়িছাড়া করেছেন। যদিও এসব নীতিবিরুদ্ধ, অভদ্রতার কাজ, তথাপি নীতিবান মানুষটাই যখন আজ চলে গেলেন। তার পর ওসব নিয়ে কে মাথা ঘামায়!
আসমার ধারণা অতনু তার পাশাপাশি নিজের বাবা-মা অথবা ভাইকেও কল করেছিল, নইলে ঐ সময়ে অতবড় দাঙ্গা বেঁধে গেল শহরে, এসব শুনেও তাদের ছুটোছুটি নেই! কেবল ভেতর ঘরে চাপা স্বরে কতক আলোচনা হয়ে যে যার মতো শুতে চলে গেল। আসমাকে কেউ আজ ডাকল না। অবশ্য তার এসবে মাথা ব্যথাও নেই। সে তো বরং এই চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পরের পরিকল্পনাগুলো নিয়ে নিজের মধ্যে ভীষণ ব্যস্ত।
সময় কাটছে জলস্রোতের মতো স্বাভাবিক ছন্দে। অধীর আসমা অপেক্ষা করছে একটা ডাকের। অপেক্ষার শকট অবশ্য ধীর গতিতেই এগলো। ঠিক মধ্যরাতে ঘরের বহির্মুখী জানালায় বারকয়েক ঠক ঠক শব্দে সচকিত আসমা উপলব্ধি করতে পারল বিদায়ের শমন এসেছে তার। চিরকালের তরে এই পথ ছেড়ে দেয়ার ডাক দুয়ারে হাতছানি দিচ্ছে। গুছিয়ে তো নেয়াই ছিল সবটা, এখন শুধু হাতে ধরে বেরিয়ে যাওয়া বাকি। এক স্থানে বেশিদিন থাকলে না চাইতেও গোপনে মায়া জন্মে মানুষের;আসমা তো সেখানে পরিবারের সদস্য হয়ে ছিল। বিদ্রোহী মস্তিষ্ক কোমল হৃদয়ের মমতাকে অগ্রাহ্য করতে পারল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাসের সাথে আলো-আঁধারির বাড়িটাকে শেষ বারের মতো দেখে নিলো আসমা৷ মন ভরলে এরপর ধীরপায়ে লাগেজ হাতে রওয়ানা হলো অজানার উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে একটিবার পিছু ফিরলে চৌকাঠের পাশে শাশুড়ির অবয়ব দৃশ্যমান হলো বোধহয়। মিনিটখানেক সেদিকে তাকিয়ে থেকে নিঃশব্দে সে প্রস্থান করল৷ এরপর আর কক্ষনও এই বাড়িতে তার ফেরা হবে না। না বউয়ের পরিচয়ে আর না অন্য কোনো পরিচয়ে। সময় বহমান, ঠিক নদীর স্রোতের মতো।
___________
গলির মুখে গাড়ি প্রস্তুত ছিল আসমার জন্য। ও আসামাত্র একটি ছেলে এগিয়ে গিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে ব্যাগ তুলে ওকেও নির্দেশ দিল উঠে বসার। গাড়িতে বসতে বসতে আসমা খেয়াল করল তিনজন ছেলে উপস্থিত এখানটায় যারা কিনা কলের পুতুলের মতো একেকটা কাজ করে যাচ্ছে কিন্তু ভুলেও আসমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে না৷ তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল ঠোঁটের কোণে। অতনুর নির্দেশ বুঝি? বেশ।
কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আসমার জানা নেই। জানতে আগ্রহবোধ করছে না তেমন নয়৷ আগ্রহের সাথে বরং ভয়ও লাগছে খানিক। অনেকদিন পর সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে মধ্যরাতে তার যাত্রা। জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে ঠিক, নিজেকে শক্তও করে নিয়েছে ও;কিন্তু সেদিন রাতের স্মৃতি ভুলতে পারেনি। সেদিনও তো এমন অপরিচিত কতগুলো মানুষ এসে...
হুট করে গাড়িতে জোর একটা ব্রেক কষায় চিন্তার জাল ছিন্ন হলো আসমার। আঁতকে উঠে সামনে তাকালে দেখতে পেল অপরিচিত, নিস্তব্ধ একটা গলিতে পুরনো ধাঁচের দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে তারা। শুধু তারাই নয়, স্বল্প তফাতে মূর্তিমান অতনু হাওলাদারও উপস্থিত।
গাড়ি থেকে নেমে নিঃশব্দে এগিয়ে যেতে যেতে আসমার হৃদয়ে শখানেক প্রশ্নের উদ্ভব হলেও ও বুঝে উঠতে পারল না সব প্রশ্নের যুক্তিযুক্ত উত্তর আদতে পাওয়া হবে নাকি হবে না! তথাপি নীচু কণ্ঠে তরঙ্গের মতো বেজে উঠল,
-- কোথায় নিয়ে এলে আমাকে?
এতক্ষণে মূর্তিমান ব্যক্তিসত্ত্বা ফিরে তাকাল৷ পাথরকোঁদা চোখজোড়া অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল যেন। মেঘমন্দ্র স্বর গুমরে উঠল,
-- এটা তোমার আদরের ননদের শ্বশুরবাড়ি।
পলকে কানের পর্দায় কেউ গলন্ত শিশা ঢেলে দিয়েছে উপলব্ধি হলো আসমার। বজ্রাহতের মতো সে শুধল,
-- কি করতে চাইছ কি তুমি!
-- দেখতে পারবে। এক্ষুণি দেখতে পারবে।
আসমাকে দ্বিতীয় কোনো বাক্য ব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে পিছু ফিরে চোখের ইশারা করল অতনু তার অনুচরগুলোকে। মাথা নেড়ে বিদ্যুতের গতিতে তারা কোত্থেকে মশাল এনে দেশলাইয়ের সাহায্যে আগুন জ্বালালো ওটাতে। দমবন্ধ করে দৃশ্যটা অবলোকন করতে করতে আসমার মনে হলো পুরো এলাকার বাতাস এতক্ষণ ভারী হয়ে ছিল দাহ্য পদার্থের উৎকট গন্ধে সে খেয়াল করেনি। অতনুর উদ্দেশ্য কি তাহলে..
ভাববার সময়ই পেল না আসমা। তন্মধ্যে বিস্ময়াহত তার হাতে জোরপূর্বক মশালটা ধরিয়ে বাড়ির দেয়ালে লাগিয়ে দিল অতনু। তৎক্ষণাৎ অগ্নিবলয় জোর কদমে ছুটে পুরো বাড়িকে জাপ্টে নিয়ে এক বিন্দুতে মিলিত হলো। পাশে থেকে বরফ শীতল কণ্ঠস্বর কানে আঘাত করল এই বলে,
-- অবশেষে তোমার দায়মুক্তি হলো।
শুনে ছটফটিয়ে সরে যেতে যেতে আসমা গুমরে উঠল,
-- মানে!
-- এই যে তুমি আমার পরিবারের মানসম্মান নিয়ে খেললে। আমার বোনটাকে আমারই শত্রুর সাথে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলে, ঘরের মানুষ হয়ে এতবড় শত্রুতা করলে। স্বামী হিসেবে এসব অপরাধের দায় থেকে তোমাকে মুক্ত করা আমার কর্তব্য নয়?
-- স্বার্থপর, অমানুষ তোমার বোন আছে ঐ চারদেয়ালের ভেতর।
সকরুণ ক্লান্ত স্বরে উচ্চারণ করে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ল আসমা৷
তা দেখে উচ্চশব্দে হাসতে আরম্ভ করল অতনু। হাসতে হাসতেই তার চোখজোড়া জ্বলে উঠল। বজ্রমুষ্ঠিতে আসমার বাহু ধরে তাকে দাঁড় করিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
-- বললে না স্বার্থপর। স্বার্থের সামনে এই অতনু হাওলাদারের কাছে কারোর স্থান নেই। না বোনের আর না অন্য কারোর। অপরাধ করেছে ও, খেসারত তো দিতেই হতো।
-- তুমি একটা অমানুষ। পাষাণহৃদয়ের হিংস্র জন্তু। এতবড় পাপ করানোর আগে মেরে ফেললে না কেন আমাকে? হোয়াই ডিডন্ট ইউ জাস্ট কিল মি!
জলন্ত অগ্নিশিখার আঁচ অতনুর হিংস্র চেহারাটাকে আরও হিংস্র করে তুলল। হাতের চাপ বাড়িয়ে আরও নিকটে টেনে নিল ও আসমাকে, ঠিক বক্ষপিঞ্জরের কাছে৷ তীব্র ঘৃণায় পুনর্বার ছটফটিয়ে সরে যেতে চাইল আসমা;ওর চোখের তারায় তীব্র অনলের আঁচ৷ যে আঁচে অতনু হাওলাদারকে ভস্ম করে দেয়ার বাসনা প্রবল। দৃষ্টির ভাষা অতনু দেখেও দেখল না, বুঝেও বুঝল না। কেবল ক্রোধান্ধ আসমাকে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ করে দিয়ে তুষার শীতল স্বরে উত্তর দিল,
-- বিকজ আই লাভ ইউ। আর যাকে ভালোবাসি তাকে মারব, সাধ্য আছে! থাকলে সেদিনই মেরে ফেলতাম যেদিন মিথ্যে পরিচয়ে আমায় ভালোবাসার কথা বলেছিলে। নাটক সাজিয়ে আমায় বিয়ের ধর্না দিয়েছিলে।
আসমার মনে হলো সে বুঝি এবার শঙ্কা হারিয়ে পড়েই যাবে। অতনু তাহলে জানতো তার পরিচয়! জেনে-বুঝে নিঃশব্দে এতদিন শত্রুর সাথে বসবাস করেছে।
ওকে দুর্বল হতে দেখে অতনু বাঁকা হাসল। বলল,
-- এখনো তো পুরোটা শোনোইনি। আগেই দুর্বল হলে চলবে!
রাগে অন্ধ হয়ে অতনু বলতে চাইছিল সবটা। কিন্তু ওর গতি রোধ করে ওকে টেনে বাস্তবতায় আছড়ে ফেলল চারিপাশ থেকে ভেসে আসা প্রতিবেশীদের কলরব। মানুষ পোড়া গন্ধ এবং আর্তচিৎকার ওদের কর্ণদ্বয়ে প্রবেশ না করলেও প্রতিবেশীদের কানে ঠিক পৌঁছেছে। তাই তো ছুটে আসছে ওরা দগ্ধ মানুষগুলোকে বাঁচাবে বলে।
এই পরিস্থিতিতে কেউ দেখে ফেললে সবাই একসাথে ফেঁসে যাবে উপলব্ধি হতেই ছেলেপেলেকে নির্দেশ দিয়ে আসমাকে টেনে নিয়ে গাড়িতে বসল অতনু। চোখের পলকে গাড়ি উড়িয়ে স্থান ত্যাগ করলেও কারো কারো নজরে ঠিক পড়ে গেল গাড়িটা। তাই তো লাঠিসোঁটা নিয়ে কতগুলো লোক ছুটেও এলো এদিকটায়। তবে সুবিধে করতে পারল না।
ওদিকে গাড়ি এগোতে এগোতে যতক্ষন পর্যন্ত দৃষ্টিসীমায় দেখা যায় অতনু তাকিয়ে রইল রাক্ষুসে আগুনের থাবায় একটু একটু করে বিলীন হওয়া দোতলা বাড়িটাকে। ভেতরের মানুষগুলো বেঁচে ফেরার সুযোগ নেই। পুরো বাড়ির দরজায় বাইরে থেকে কড়া লাগিয়ে দেয়া হয়েছে৷ এবার বুঝবে রওনক অতনু হাওলাদারের সাথে বেঈমানী করার ফল। আর কতদিন পালিয়ে থাকবে ও? আপনজনদের মৃত্যু সংবাদ ওকে ঠিক টেনে আনবে এই সাজানো-গোছানো মৃত্যুপুরিতে। এরপর শত্রুকে নিজ হাতে বধ করবে অতনু। মিটিয়ে নেবে সব লেনাদেনা। আর ততদিন অবধি.. ওকে বেঁচে থাকতে হবে।
পেছনের দৃশ্য সম্পূর্ণ আঁধার কালো হয়ে গেলে ঘাড় ফিরিয়ে নিজের পাশে চোখ রাখল। বাহুলগ্না অচৈতন্য স্ত্রীকে দেখে হৃদয়নিংড়ে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো একটা। আসমাকে ও জানতে দেবে না রওনক-উপমা ঐ বাড়িটায় ছিল না। ওরা তো সেদিনই পালিয়ে গিয়েছে শহর ছেড়ে বহুদূর, যার হদিস অতনু এখনও জানে না৷
থাকুক সে কয়েকদিন আত্মদহনে। অতনুর আত্মদহনের কাছে এ দহন কিছুই নয়।
_________
এ অবধি নিজের জীবনটাকে রওনক জুয়া খেলায় বাজি রেখেছিল। রাজনীতি রাজনীতি করে নিজের সুখ-স্বপ্ন-ক্যারিয়ার বিসর্জ্জন দিয়ে অসমান একটা পথ অনুসরণ করে হাঁটছিল। পথ চলতে শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব ওর হয়নি। বাবা-ভাই, এমনকি শিক্ষকও অনেকবার ওকে সতর্ক করেছেন, ক্যারিয়ার নিয়ে আরেকটু সিরিয়াস হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন৷ কিন্তু ও গায়ে লাগাতে চায়নি। তাই আজ বাস্তবতার মাটিতে পা রাখার পর সত্যিকার জীবনটাকে দিনকে দিন বিষ তেঁতো মনে হতে শুরু করেছে ওর কাছে। যে রওনকের পকেট থৈ থৈ করত টাকা, প্রতিবেলা কমসেকম জনাদশেক ছেলেকে পাশে বসিয়ে না খাওয়ালে ওর শান্তি হতো না;আজ সেই রওনককে কি-না অন্যের বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছে এমন খোঁটাও শুনতে হচ্ছে! বাড়ি নিজের, আবাদি জমি, পুকুর যা থেকে শস্য এবং মাছ আসে সবকিছুতেই তো রওনকের আইনগত অধিকার রয়েছে। তাহলে আজ সংসার পেতেছে বলে, তিনবেলা খাবার খাচ্ছে বলে চাচা-চাচি এভাবে তার সম্মান খোয়াতে উঠে পড়ে লেগেছেন কেন? কিছুই বুঝতে পারছে না রওনক।
চাচা-ফুপুর সাথে সম্পর্ক বরাবরই তার মুখে মুখে। তাই বাবা বললেও এতদিন সম্পত্তি নিয়ে রেষারেষিগুলোতে ইচ্ছে করে রওনক মাথা ঘামানোর চেষ্টা করেনি। যা দেখেছে তার বাপ-ভাই সময়ে সময়ে এসে দেখেশুনে ঠিকঠাক করে গেছে। তাহলে সেসময় হাত তুলে নেয়াই কি ওর কাল হলো!
মুখের সামনে একটা পত্রিকা মেলে ভাবুক রওনক এসব এলেবেলে যুক্তি মেলানোর চেষ্টা করছে সাতসকালে উঠে। ওদিকে উপমা চাচি শাশুড়িকে কাজে সাহায্য করতে গিয়েছিল, কিন্তু তিনি কথা শুনিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে রওনকের পাশেই মেঝেতে পাটি বিছিয়ে বসে একা একা মন খারাপ দূর করার চেষ্টা করছে। বার কয়েক আঁড়চোখে মানুষটার দিকে তাকিয়ে বলার চেষ্টা করেছে যদিও, তৎক্ষনাৎ ফুপু আম্মার সতর্কবাণী মনে পড়ায় থেমে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফুপু আম্মা তাকে বলেছেন, মেয়ে মানুষকে সহনীয় হতে হয়। কাদামাটির মতো কোমল হলে সবাই খুরপি চালিয়ে আঘাত করার বাহানায় থাকে। তাই নিজেকে পিতলের মতো শক্ত করতে হয়। ঘাতক আঘাত করতে এলে, নিজেই যেন পাল্টাঘাতে কাবু হয়ে পড়ে। আর সহনীয় হওয়ার প্রথম শর্ত সমস্ত কষ্ট, যন্ত্রণাকে বুকে চেপে নিজেকে স্বাভাবিক রাখা। উপমাকে এমনি করে তো কেউ জীবনপাঠ পড়ায়নি, সবসময় সে নিজের ইচ্ছেমতো চলেছে। যা করতে ইচ্ছে হয়েছে করেছে, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করেছে। কিন্তু ফুপু আম্মা বলছেন সংসার জীবনে নিজের সুখের স্বার্থে হলেও কিছু জিনিস মুখ বুঁজে সইতে হয়। উপমা যদিও কথাগুলো মনে মনে মানতে পারেনি, তবু যে সংসারের জন্য এতকিছু সে সংসারের স্বার্থ তাকে বারংবার প্রতিবাদী হতে থামিয়ে দিচ্ছে। নিজের সংশয় নামক জালে জটিলভাবে জড়িয়ে পড়ছে রোজ।
অসহ্যকর অনুভূতিটাকে বিদায় করতে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আধভাঙা আয়না হাতে তুলে নিলো উপমা। চোখ সরু করে পুরো মুখের প্রতিচ্ছবিতে দৃষ্টি বুলিয়ে অকস্মাৎ তার ঠোঁটের কোণে ফাল্গুনী রোদের দেখা মিলল। তৎক্ষনাৎ রওনকের শার্টের হাতা টেনে ধরে সে সোৎসাহে শুধল,
-- ব্রনটা সুন্দর না?
নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ রওনকের কোথাওই ছিল না। তথাপি জোরপূর্বক সে পত্রিকায় চাকুরির খবরগুলো ঘাটাঘাটি করছিল;নিতান্ত হেলায়। এবারে উপমার মৃদু ধাক্কায় তাও ক্ষুণ্ণ হলো।
চোখ তুলে সপ্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে তাকালে সামনেরজন পুনরায় গালের ব্রনগুলোতে আঙুল ঠেকিয়ে দাঁত বের করে শুধল,
-- সুন্দর না?
নিমেষে ভাঁজ পড়া কপাল প্রশস্ত হলো রওনকের। অপলক ক্ষণকতক তাকিয়ে রইল সে প্রিয়তমার মায়াময় মুখপানে। পত্রিকা সরিয়ে মৃদু হেসে করতলে প্রিয়তমার মুখখানা আগলে নিয়ে ব্রনগুলোতে ছোটো ছোটো ঠোঁট স্পর্শ দিয়ে বলল,
-- খুব মিষ্টি। একেকটা রসগোল্লা।
এতখানিও আশা করেনি উপমা। তাই তো কাঠবেড়ালির মতো সলজ্জে মুখ লুকিয়ে নিলো পেতে রাখা প্রিয়তমের প্রশস্ত করতলে। ঠিক সেসময়টায় মিষ্টি সকালে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত সুন্দর মুহুর্তটাতে একপোচ কালি মেখে দিতে আত্মীয় নামক কোনো ঘাতক উপস্থিত হবে ওরা কেউ কল্পনা করেনি৷ ককর্শ স্বরের ভৎসনা সুন্দর মুহুর্তটাকে ছিটকে পড়ে বিদীর্ণ হওয়া কাঁচের মতো যখন শত টুকরোয় বিভাজন করে দিলো, কেবলই তখন চমকে উঠে সচকিত হলো দু'জন। মুখ তুলতেই দেখল একদম ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আচারের বয়াম হাতে চাচি জলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন ওদের দিকে। কোঁচকান মুখ এবং চোখের ভাষায় তার অজস্র ঘৃণা উপচে পড়ছে। তেঁতো মুখে তিনি বলছেন কতগুলো অপ্রীতিকর কথা,
-- দিনের আলোয় ভরা বাড়িতে এমন বেলেল্লাপনা করবে বলে এসেছিলে বাপু তোমরা। বাপের বাড়ির মান-সম্মানের কিছু চিন্তা তো তোমাদের নেই। কিন্তু আমাদের তো আছে। অসহায় দেখে ঠাঁই দিয়েছি, তিনবেলা খাওয়ার খাওয়াচ্ছি আর বেহায়ার মতো হাত গুটিয়ে অন্ন ধ্বংস করছো নয়তো খোলা ময়দানে নষ্টা ছেলে-মেয়েদের মতো..
ছিঃহ্ বলতেও মুখে বাঁধে আমার।
চিৎকারে বাড়ি মাথায় তুলে আবার এমনভাবে তিনি মুখ ফেরালেন যেন নগ্ন নারী-পুরুষকে বিবাহবহির্ভূত যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হতে দেখেছেন।
দিনে-দুপুরে পাড়াপড়শির সামনে অপ্রীতিকর এসব মিথ্যাচার আত্মসম্মানে তীরবিদ্ধ করল যেন রওনকের। অপমানে কান ঝাঁঝাঁ করে উঠলে নিশ্চুপ থাকতে পারল না আর। তারস্বরে বিরোধ করে উঠে বলল,
-- মুখ সামলে কথা বলুন চাচিআম্মা। মুরব্বি হন বলে এতদিন কিচ্ছু বলিনি, সব অপমান মুখ বুঁজে সহ্য করেছি। তবে আজ আপনার কথাবার্তা সব মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
-- কি করবা তুমি আমারে এখন। মারবা? হাত তুলবা মায়ের বয়েসী চাচির ওপর। হ্যাঁ! গুণ্ডা কোথাকার।
-- চাচি!
হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তেড়েই যাচ্ছিল রওনক। পাশে থেকে উপমা টেনে ধরায় থামতে বাধ্য হলো। সেই সুযোগে রওনকের চাচি আঁচল চাপা দিয়ে এমন মরাকান্না জুড়ে দিলেন, যেন রওনক সত্যি সত্যি হাত তুলেছে তার ওপর। শীতকালে এমন বেলায় গ্রাম পুরো সজাগ। গ্রামের মানুষ তো বলতে গেলে সূর্য ওঠার আগেই সজাগ। তাই মিছে মরাকান্না শুনে নিমেষে লোক জড়ো হতে সময় লাগল না। রওনকের চাচা এবং চাচাত ভাইয়েরা গিয়েছিল জমিজমা দেখতে। দেখে তারাও মাত্রই বাড়িতে উপস্থিত। তন্মধ্যে ঘটনা ঘটে যাওয়ায় ভদ্রমহিলা দ্বিগুণ সাহস পেলেন। দল ভারী করে লেগে গেল মল্লযুদ্ধ। এপারে অগুণতি শত্রু আর অপরপারে শুধুই রওনক এবং উপমা। উপমার যদিও তীব্র অপমানে নীচু মস্তকে শোনা ছাড়া উত্তর দেয়ার উপায় ছিল না। থাকবে কি করে? নিজের বাড়িতে এর পূর্বে এমনধারা ছোটোলোকি আচরণ তো কাউকে করতে দেখেনি, না ও গ্রাম্য পলিটিক্স বোঝে। এছাড়া ফুপুআম্মার সেই কথাটা...
অন্যদিকে মাথা গরম রওনক এক কথা দুকথায় সেই পুরনো পারিবারিক ঝামেলা উত্থাপিত হয়ে চাচা-ভাইদের সাথে হাতাহাতি পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ার জোগাড়। গ্রামের মানুষ এগুলেও সব বরং চাচার দলেই ভিড়ছে, মুরুব্বি ক'জন যদিও রওনককে সাপোর্ট দিচ্ছেন। তবে তাঁদেরও টালমাটাল অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে উপমা কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। শেষে মাথায় কাপড় তুলে দিয়ে সে তরতরিয়ে ছুটল ফুপু আম্মার কাছে। সকালেই তিনি আগামী শুক্রবার মসজিদে সিন্নি দেবেন বলে ইমামের সাথে কথা বলতে গিয়েছেন। সকাল বেলাটা আরবি পড়িয়ে ইমাম ফাঁকা থাকেন, এই সময়ে কথা বললে সুবিধা। ভাগ্যিস রওনক তাকে মসজিদের পথ চিনিয়েছিল। তাই পায়ে হেঁটে অতটা যেতে বেশি কষ্ট হলো না উপমার। কপাল ভাল তাই ফুপুও রওয়ানা দিয়ে অর্ধেক পথ এসে গিয়েছেন। শেষ অবলম্বনকে নিকটে পেয়ে উপমারও তর সইল না। ছুটে গিয়ে বুকে পড়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির সমস্ত ঝামেলা সে ফুপু আম্মাকে সংক্ষেপে খুলে বলল।
শুনে তিনি এক মুহুর্ত দেরি করলেন না৷ পথ দিয়ে গরুর গাড়ি যাচ্ছিল। তাতে চেপে উপমাকে বসিয়ে চোখের পলকে উপস্থিত হলেন বাড়িতে।
বাড়ি এসে দেখেন ছোটোভাইয়ের ছেলেরা রওনককে পেটাবে বলে লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রস্তুত। রওনকও কি কম যায়! সেও ইতমধ্যে মেরে চাচাত ভাইদের নাকমুখ ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। ওরা কেউ জানে না রওনকের দেরাজে একটা সিলভার রঙের "নাইন এমএম" চকচক করছে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে বিষাক্ত বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিতে ওর হাত একবিন্দু কাঁপবে না এই ভয়ানক সত্যিখানা উপস্থিত কেউ উপলব্ধি করতে পারছে না। রওনক চায়ও না এমনকিছু হোক। তাই তো বজ্রমুষ্ঠি পাকিয়ে কোনোরকমে নিজের রাগের পারদকে নিয়ন্ত্রণে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ভাইবোনের ফ্র্যাকশন হলেও মনভার হলে বোনের সাথে পারিবারিক কিছু বিষয় নিয়ে প্রায়শই আলোচনা করতেন শাহজাহান সাহেব। সেই সুবাদে রওনকের অন্য জীবনটার সত্যি তাঁর কাছে দিনের আলোর মতো চকচকে। দেউড়িতে উপস্থিত হয়ে ভাস্তের হিংস্র চাহনি এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা সবটা লক্ষ করে রওনকের ফুপু আঁতকে উঠলেন। অবিলম্বে ঝামেলা থামাতে দুপক্ষের মাঝখানে উপস্থিত হয়ে ধমকে উঠলেন তিনি,
-- এখন কি সম্পত্তি নিয়া এক ভাই আরেক ভাইয়ের প্রাণ নিবা তোমরা!
ফুপুর কণ্ঠস্বরের শক্তিতেই কি-না চিড়বিড়িয়ে উঠতে চাওয়া রওনকের রাগটা চট করে কিছুটা নেমে গেল। বোঁজা চোখ মেলে তাকাল সে ফুপুর দিকে। ভাস্তের রক্তাভ চোখে তাকিয়ে তিনি কিছুটা চমকে উঠলেও নিজেকে সামলালেন। চারদিকে দৃষ্টি বুলিয়ে গ্রামের অনাহূতদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে রওনকের হাত ধরে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন। পিছু নিলো উপমাও। দুজনকে ঘরবন্দী করে দৃঢ় স্বরে নির্দেশ দিলেন,
-- এক্ষুনি, এই মুহুর্তে বউকে নিয়া তোমার বড় দাদুর বাড়িতে রওয়ানা হবা তুমি রওনক।বারবার সাবধান করছিলাম এইখানে থাকবা না যতদ্রুত সম্ভব গোছায় নিয়া চইলা যাবা। কিন্তু তোমার জেদ!
-- কোত্থাও যাব না আমরা ফুপু। এই সম্পত্তি আমার আব্বার। চাচার যতখানি অধিকার আছে এই বাড়িতে, আমারও ততখানিই আছে।
-- রওনক কথা বাড়ায়ো না। এইটা অধিকার নিয়ে তর্ক করার সময় না। এইভাবে ফাঁকা বুলি দিয়া তুমি অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবাও না। তোমাকে আইনের সহায়তায় যা করার করতে হবে। নিজের জেদ নিয়া থাকলেই সব হয় না। যারে আনছো তার কথাও চিন্তা করা লাগবে।
উপমার হাত টেনে রওনকের সামনে নিয়ে গেলেন তিনি। ক্রন্দনরত স্ত্রীকে দেখে রওনক পুনর্বার দমে গেল। তীব্র রোষে মুষ্টি পাকিয়ে দেয়ালে আঘাত করল একবার। এরপর উপমার হাত চেপে ধরে বলল,
-- কাপুরুষের মতো পালিয়ে যাওয়া আমার ধাঁতে নেই ফুপু। আমি আবারও আসব। এবার এলে সব জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেব, বলে দেবেন আপনার ভাইকে।
সশব্দে দরজা খুলে নিজেদের সমস্তটা গুছিয়ে হোন্ডায় চেপে এরপর রওয়ানা হলো তারা পাশের এলাকায় রওনকের বড় দাদুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। যেতে যেতে তীব্র মনোকষ্টে দীর্ঘশ্বাসের সাথে উপমার কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এলো,
-- ওরা তো আপনার আপনজন রওনক।
রওনক শুনতে পেল কথাটা। তাচ্ছিল্য হেসে খানিক বাদে সে উত্তর দিলো,
"আঘাত সবসময় আপন মানুষের থেকেই আসে উপমা"
চলবে,
Sara