ফন্ট সাইজ:
থিম:
চিঠি দিও

৫৭তম পর্ব

লেখক: সিনিন তাসনিম সারা

চিঠি দিও

৫৭

_____________

ওবাড়িতে উপমাকে নামিয়ে দিয়ে, দাদীর সাথে কোনোরকমে পরিচয় পর্ব সেরে রওনক বেরিয়েছে উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের উদ্দেশ্যে। মামুলি কিছু সম্পত্তির জন্য ওর বউকে ভরা লোকসমাগমে অপমানিত হতে হয়েছে, বউয়ের হাত ধরে কাপুরুষের মতো বেরিয়ে আসতে হয়েছে কল্পনা করেই রাগে শরীরের রক্ত টগবগিয়ে ফুটছে। এ রাগ ততক্ষণ অবধি কমবে না যতক্ষণ না দলিলপত্র সব গুছিয়ে নিয়ে ছুঁড়ে মারে নিমকহারাম গুলোর মুখে। যে জমিজমা এবং বাড়ির জন্য ওর বউকে এতটা সইতে হলো সেগুলো সম্পূর্ণরূপে বেদখল না করা অবধি রওনকের স্বস্তি ফিরবে না।

রেজিস্ট্রি অফিসে যাওয়ার পর দেখা গেল পুরো অফিস লোকজনে গিজগিজ করছে৷ তিল পরিমাণ জায়গা নেই দাঁড়ানোর মতো। তবে রওনকের ভাগ্যটা ভালোই বলতে হয়। হোন্ডা স্ট্যান্ডে রেখে কোনোরকমে অফিসটায় ঢুকতে না ঢুকতেই অপ্রত্যাশিতভাবে কলেজের এক পরিচিত বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে গেল তার, যে কি-না বছর দুয়েক যাবৎ মুহুরি হিসেবে আছে এখানটায়। রওনকের আগে ভাই-ই তাকে চিনে নিয়ে ডেকে পাঠালেন। প্রথম দেখায় রওনক চিনতে পারল না তাকে। বুঝতে পেরে তিনি সহাস্যে রওনকের পিঠ চাপড়ে নিজের পরিচয় দিলেন,

"আরে তোর মনে নেই ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হতে এসে আমাদের ক্লাবে অতিরিক্ত টাকা চার্জ করছিল বলে তোর বন্ধুসমেত এসেছিলি আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে! আমি তোর সেই জাহাঙ্গীর ভাই রে"

ওপাশ থেকে পরিচয় দেয়ার পর সবটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল রওনকের কাছে। বিস্ময় ছাপিয়ে ভীষণ খুশি হলো সে। এবং খুশিটা চেপে রাখতে না পেরে জড়িয়ে ধরে বলল,

-- আপনাকে দেখে কি যে ভালো লাগছে ভাই বোঝাতে পারব না। এই অসহায় সময়ে এভাবে একটা ছায়া পেয়ে যাব ভাবতেও পারিনি।

রওনকের প্রগলভতায় জাহাঙ্গীর সাহেবের হাসি চওড়া হলো। ডেস্কের ওপর "বিরতি" কার্ড টাঙিয়ে তিনি রওনককে নিয়ে বেরলেন খোলা ময়দানে গড়ে ওঠা ছোটো ছোটো টি-স্টলের একটায়। সেখানেই চা-পানের ফাঁকে সুযোগ বুঝে এ যাবৎ পারিবারিক ঝামেলা সবটা গড়গড় করে ভাইকে খুলে বলল রওনক। ওর মন জানে এই মুহুর্তে ভরসাযোগ্য স্থান এই ভাই ছাড়া আর কেউ হতে পারবে না। কলেজে যখন মাত্র অনার্সে ভর্তি হয় তখন জাহাঙ্গীর ভাই মাস্টার্সের ছাত্র;এ দ্বার- ও দ্বার পাগলের মতো চাকরি খুঁজে ফিরছেন। বাড়ির বড় ছেলে, বিবাহযোগ্যা কুমারী চার চারটে বোন, বৃদ্ধ বাবা-মা; ভরা সংসারের সমস্ত খরচ তাঁর কাঁধে। ভালো বেতনের সরকারি চাকরি তো সোনার হরিণ। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের তেমন বেতন নেই, ঢুকলে ব্যাংক অথবা প্রশাসনের দিকে ঝুঁকতে হয়। কিন্তু উচ্চতায় কম থাকায় প্রশাসনে যাওয়ার সুযোগ নেই। ব্যাংকের পরীক্ষায় পরপর পাশ করেন, ডাক পড়ে, ভাইভা বোর্ডে দাবী ছয় অংকের ঘুষ কিংবা মোটরসাইকেল। নিজে যেখানে খেয়েপড়ে বেঁচে থাকতে কষ্ট হয় সেখানে ঘুষের টাকা গুনবেন কি করে অথবা মোটরসাইকেলই জোটাবেন কোত্থেকে! রওনকের মনে আছে মেসে রিফিউজিদের মতো বসবাস করতে দেখা যেত ভাইকে। দু-সেট মাত্র শার্ট-প্যান্ট, সেগুলোও বড্ড মলিন, একজোড়া জোড়া তালি লাগানো চটি স্যান্ডেল আর অসংখ্য পুরাতন চাকরির বই। টিউশন ছাড়া বের হতেন কালেভদ্রে। বাইরে বেরুলেই "চাকরির কি হলো" প্রশ্নে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বেচারা। শেষ বর্ষের দিকে ক্লাস বড্ড অনিয়মিত, ছাত্ররা আসেনা বললেই চলে। কিন্তু জাহাঙ্গীর ভাই আসতেন। পুরো কলেজ জীবনে যিনি হাতে গুণে ক'খানা ক্লাস করে খালাস, বাস্তবতার যাঁতাকলে পিষে শেষের দিকে কিছুটা মনোযোগী হওয়ার তাড়না জন্মেছিল ভেতরে৷ লোকে কথা ছড়াতো, টিপ্পনী কাটত এই বলে জাহাঙ্গীরের আর চাকরি হবে না, সারাটাজীবন বেকারই কাটাতে হবে। লোকের কথা ফলে যেত বোধহয়, যদি না শেষ মুহুর্তে ভাবী এসে তাঁর জীবন পাল্টে না দিতেন। অবাক লাগছে তাই না? অমন নড়বড়ে একটা পরিস্থিতিতে নতুন জীবন শুরু বড্ড অদ্ভুত লাগছে! কিন্তু যতখানি অদ্ভুত শোনায় ততখানি অদ্ভুত বুঝি নয় বিষয়টা। ভাবীরও একটা বাধ্যবাধকতা ছিল। সম্পর্কের দিক দিয়ে কেউ না হলেও প্রতিবেশীনি ছিলেন তিনি জাহাঙ্গীর ভাইয়ের। ছোটোভাইকে অংক পড়াতো বলে যাতায়াত ছিল ও বাড়িতে। ভাবীর সাথে বার কয়েক দেখাসাক্ষাৎ অবশ্য হয়েছে কিন্তু কোনো অনুভূতি জন্মানো টাইপের কিছু হয়নি। সুন্দরীদের কাতারে তিনি আসলে পড়েন না। মোটামুটি উচ্চতার, স্থুলকায় একজন নারী, গায়ের রঙ যদিও দুধে-আলতা তবে চেহারার গড়ন বিশেষ আকর্ষণীয় নয়। রোগও ছিল বোধহয় কিছু একটা, রওনকের বিশেষ মনে নেই। জাহাঙ্গীর ভাইও তখন নিজের দূর্বিষহ জীবন নিয়ে ব্যস্ত, ওসব প্রেম-ভালোবাসা কিংবা বিয়ের কথা দুঃস্বপ্নেও ভাবছেন না। কিন্তু ঐ, অদৃষ্ট! সৃষ্টিকর্তা তাদের এক হওয়া লিখে রেখেছিলেন, তাই কোনো এক উসিলায় মিলিয়ে দিলেন। খুব সম্ভবত ভাবীর অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে ঠিক হওয়া বিয়ে ভেঙে যায়। পরবর্তীতে পরিবারের মানসম্মান এবং মানসিকভাবে ভেঙে পড়া মেয়েকে সামলে নিতে জাহাঙ্গীর ভাইয়ের কাছে বিয়ের প্রস্তাব রাখেন ভাবীর বাবা, সঙ্গে প্রতিজ্ঞা করেন একটি ভালো চাকরির ব্যবস্থা এবং বিরাট অংকের যৌতুক সঙ্গে দেবেন। ভাইয়ের সামনে জীবন পরিবর্তনের এরচেয়ে ভালো সুযোগ আর ছিল না তাই সুযোগ লুফে নিয়ে তিনিও রাজি হয়ে যান।পরবর্তীতে এই চাকরি শ্বশুরের বদৌলতে বোধহয় পাওয়া।

-- ভাই পুরো বাড়িটা কোনোভাবে ওদের থেকে কেড়ে নেয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন!

আচমকা প্রশ্নটা করে বসে রওনক। জাহাঙ্গীর সাহেব তখন চায়ে চুমুক দিচ্ছেন মাত্র। এ কথায় তার হাত থেমে গেল। মিনিটখানেক থমকে থেকে প্রতুত্তরে বললেন,

-- এই গণ্ডগোলের পর করতে গেলে তুই ফেঁসে যাবি। তাই যা করতে হবে ধীরেসুস্থে সময় বুঝে করতে হবে। কোনোভাবে যদি ওদেরকে এমন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারিস, ওরা বাধ্য হয় লিগ্যালি তোর কাছে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে কিংবা বিক্রি করতে তাহলে সোজা পথেই পেয়ে যাবি। কিন্তু সেটা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। আপাতত নিজের যতটুকু সম্পদ তা বুঝে নে। আর সবচেয়ে ভালো হয় থানায় একটা কেইস করে রাখ। তোর ওপর কোনো অ্যাটাক আসতে পারে এই আশংকায় কেস ঠুকে দে তোর চাচার পরিবারের ওপর। তাহলে পরবর্তীতে কিছু হলেও পুলিশের সন্দেহ সহজে তোর ওপর আসবে না।

এক চুমুকে ঠান্ডা চা শেষ করে কাপ ফিরিয়ে দিলো জাহাঙ্গীর। শুনে রওনক একটু ভাবুক হয়ে পড়ল। ভাইয়ের আইডিয়া ভাল কিন্তু থানায় যাওয়াটা কতটা সমীচীন! রওনকের ইমেজ বিশেষ ভাল নয় কি না। ইতোমধ্যে কোতোয়ালি থানায় ওর নামে অনেক ছোটো ছোটো কেস নথিভুক্ত। শেষে নিজেকেই না ফেঁসে যেতে হয়৷

-- চল রওনক আপাতত সার্টিফাইড কপিগুলো খুঁজে তোকে দেয়ার ব্যবস্থা করি। মূল দলিল শহরের বাড়ি থেকে সংগ্রহ করে নিস।

জাহাঙ্গীরের ডাকে মাথা নেড়ে উঠে পড়ল রওনক। মনে পড়ে গেল চলে আসার সময় বাবার বলা কথাগুলো। হুট করে বিয়ের ঘটনায় তিনি আঘাত পেয়েছিলেন, তারচেয়েও বেশি ওনার মনে দাগ কেটেছিল ভাবীর তাদের সাথে করা দুর্ব্যবহার এবং উপমাকে ত্যাগ না করলে সংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি। ভাই-ভাই লড়তে দেখে একবুক হতাশা নিয়েই তাদের থামাতে ছোটো ছেলেকে কাছে ডেকে শাহজাহান সাহেব বলেছিলেন,

"তুমি আর তোমার ভাই আমার দুটো হাতের মতো রওনক। একটা হাতে আঘাত পেলে আমি যতটা ব্যথা পাই, অপরহাতে আঘাত পেলেও একই ব্যথা অনুভূত হয়। আমি যেমন তোমার ভাইকে ফেলে দিতে পারব না, তেমন তোমাকেও ফেলতে পারব না বাবা। তোমরা দু'জন আমার সন্তান। আমার হৃদপিণ্ডের দুই অলিন্দ। বাবা হিসেবে তোমার এবং তোমার স্ত্রীর শেল্টার দেয়া আমার দায়িত্ব। এ বাড়িতে না হোক, তোমার প্রাপ্য মতো তোমাকে আমি নিরাপত্তা দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টাই করব।

তুমি খুব জেদি ছেলে; সবসময় আমার কথার বিপরীতে গিয়েছ। কিন্তু আজ এই পরিস্থিতিতে আশাকরি বাবার আদেশ মানার চেষ্টা করবে? বৌমাকে নিয়ে গ্রামে চলে যাও। ওখানে আমার পৈতৃক ভিটা, আমার জমি-জমা, পুকুর, বাগান সব আছে। কোনোকিছুর অভাব হবে না তোমার। যতদিন না তোমাদের ওপর থেকে বিপদের ছায়া নেমে যাচ্ছে ততদিন তুমি ওখানেই থাকবে। ওখানে থেকে চাকরি খোঁজার চেষ্টা করবে। তুমি আমার সমর্থ্য ছেলে রওনক। নিশ্চয়ই কোনো চাকরি-বাকরি জুটিয়ে ফেলতে পারবে। বাবার মাথা কখনও নীচু হতে দেবে না"

যে ভরসায় বাবা তাকে পাঠিয়েছিলেন। সে ভরসার জায়গাটা তো রওনক মিথ্যে হতে দিতে পারে না। সে যেমন নিজের প্রাপ্যটুকু বুঝে নেবে, তেমনি সেটাকে আগলে রাখতে যা করা প্রয়োজন করবে।

নৈশব্দে সংক্ষিপ্ত শ্বাস ফেলে জাহাঙ্গীরের পথ অনুসরণে ভেতরে গেল রওনক। এ কাজটা মিটে গেলে চাকরির দরখাস্ত করতে হবে কয়েকটা৷ পত্রিকায় কতগুলো চাকরির বিজ্ঞাপন দেখে ওর মনপুত মনে হয়েছে। যদিও চাকরিগুলো সব বেসরকারি, স্বল্প বেতনের। তবে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিচারে এরচেয়ে ভালো আর কি চাকরিই বা আশা করবে! যদিও রওনকের চাকরিবাকরিতে বিশেষ আগ্রহ নেই। কারো অধীনস্থ হয়ে থাকতে বরাবরই ওর অসন্তোষ। কিন্তু নিজের সাথে সাথে এখন তো উপমাকে নিয়েও ভাবতে হবে। অর্ধাঙ্গীকে কোনোরূপ কষ্ট দিতে ও রাজি নয়। চাকরির মনোভাব তাই সম্পূর্ণটা উপমার খাতিরে। একবার সম্পত্তিগুলো নিজের নামে করে নিক, এরপর ও ব্যবসা শুরু করবে। পুকুর, বাগানের ব্যবসা; একবার লেগে গেলে আর ফিরে তাকাতে হবে না। এরপর রওনক উপমাকে পড়াবে৷ নিজের তো সার্টিফিকেট অর্জন হলো না কিন্তু বউকে তার সমস্ত স্বপ্ন পূরণে সাহায্য করবে। তারজন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন; অল্পখানি সময়৷

______________

শক্তপোক্ত কোনো তক্তপোষের ওপর দীর্ঘক্ষণ শুয়ে থাকলে মেরুদণ্ডে তীক্ষ্ণ ব্যথার সৃষ্টি হয়। তেমনই এক ব্যথা অনুভূত হওয়ায় তীব্র অস্বস্তিতে উঠে বসল আসমা। ঝকঝকে দিনের আলো দৃষ্টিশক্তিতে আঘাত করলে চোখ পিটপিট করে সয়ে নিলো সেটা। সহসা তখুনি পাশে থেকে ভেসে এলো কৌতুকপূর্ণ একটি কন্ঠস্বর,

-- অবশেষে চেতনা ফিরল তবে!

মুখ ঘুরিয়ে কন্ঠের মালিকের দিকে দৃষ্টিপাত করলে ঘৃণায় কপাল কুঁচকে গেল আসমার। তৎক্ষনাৎ মুখ ফিরিয়ে ঘরময় চোখ বোলানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

ওদিকে চৌকাঠে হেলান দিয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে আসমার জ্ঞান ফেরার অপেক্ষা করছিল অতনু। অবশেষে যখন ফিরল, ওর স্বর শুনে ওভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে দেখে পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেল। সিগারেট ছুঁড়ে ফেলে তরতরিয়ে এগিয়ে গিয়ে দু আঙুলে গাল চেপে ধরে জোরজবরদস্তি করে নিজের দিকে ফিরিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,

-- এত ঘৃণা আমার প্রতি যে কণ্ঠ শুনেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ!

-- এ তো কিছুই নয়। তোমার প্রতি আমার ঘৃণার পরিমাণ যতখানি কল্পনা করবে তার চাইতে হাজার গুণ বেশি।

জোরকরে মুখ ছাড়িয়ে তাচ্ছিল্যের সাথে বলল আসমা। শুনে অতনু হেসে উঠল। বলল,

-- লাভ কি! তবু তোমাকে আমার বন্দিনী হয়েই কাটাতে হবে চিরটাকাল৷

-- চিরকাল!তোমার কি মনে হয় চিরকাল এসব চলবে, তোমার একপাক্ষিক জোরজবরদস্তি৷ কখনও ধরা পড়বে না তুমি অদৃষ্টের হাতে?

-- অদৃষ্ট, সেটা আবার কি! অতনু হাওলাদার ওসব অদৃষ্টে বিশ্বাসী নয়৷

বেশ দম্ভের সাথেই বলল অতনু৷ বিপরীতে আসমা নিস্তব্ধ;নিষ্পলক তাকিয়ে রইল কেবল। ওর অবজ্ঞাভরা সে দৃষ্টির ভাষা বুঝতে পেরে চিড়বিড়িয়ে উঠতে চাওয়া রাগটা বাড়ল বৈ কমল না অতনুর৷ বজ্রমুষ্ঠিতে বাহু চেপে ধরে রক্তাভ চোখে পুনর্বার প্রশ্ন ছুঁড়ল,

-- কি চুপ করে গেলে যে! মারার পরিকল্পনা করছ নাকি আমাকে?

অদ্ভুতভাবে এবারেও আসমা নিশ্চুপ৷ বরং জবাব দেবে না বলে এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে অতনুকে ঠেলে সরিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল৷ অতনু স্পষ্ট দেখল ওর চোখজুড়ে কৌতুকপূর্ণ হাসি গাঢ় হচ্ছে। যে হাসিটা ওর স্নায়ুর চাপ লেশমাত্র কমতে দিতে নারাজ। বজ্রনিনাদের মতো চারদেয়ালে কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হলো,

-- ভুলে যেও না আজকের তোমার স্বাভাবিকভাবে চলেফিরে বেড়ানো পুরোটা শুধুমাত্র আমার দয়ায়। আমি না চাইলে কোনোদিনও তুমি ঐ অন্ধকার কালকুঠুরি থেকে বেরতে পারতে না। কীটপতঙ্গের মতো জীবন কাটিয়ে শেষে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হতো তোমায়।

অতনু ঠিক কোন সময়টাকে নির্দেশ করছে বুঝতে অসুবিধে হলো না আসমার। মনে পড়ে গেল অতনু আগে থেকেই সব জানে। জেনে-বুঝেই তো বসবাস করছে তার সাথে। এ পর্যায়ে তার পক্ষেও আর চুপ থাকা সম্ভব হলো না। স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে তাকিয়ে জানালায় হেলান দিয়ে বলল,

-- ভুল করেছিলে তো। নিজ হাতে নিজের ধ্বংসকে আহ্বান জানিয়েছিলে সেদিন। আজ তোমার মৃত্যু সেজে আমি দাঁড়িয়ে আছি চোখের সামনে। পারো তো বাঁচিয়ে নাও নিজেকে।

-- কে মারবে আমাকে? তুমি!

অস্বাভাবিক অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল অতনু। এগিয়ে এসে আসমার কবজি মুঠোয় নিয়ে বলল,

-- এই দুর্বল হাত কারোর প্রাণও নিতে পারে নাকি!

-- অবিশ্বাস্য লাগছে? একদিন তোমার ঔরসজাতের চিহ্ন পৃথিবীর বুক থেকে এই দুর্বল হাতই কিন্তু মিটিয়ে দিয়েছিল।

অসংখ্য উপায়ে এতদিন নিজেকে সংযত করে এলেও আজ স্নায়বিক উত্তেজনায় যা অনুচিত তাই করে ফেলল আসমা। আঁধার কুঠুরিতে আবদ্ধ অবগুণ্ঠিত সত্যিটা, যা কখনো লোকসম্মুখে আসতে দেবে না বলে একদা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল, সেই সত্যিটাকেই কীভাবে যেন উন্মোচিত করে ফেলল অতনুর সামনে। বলা বাহুল্য এতক্ষণে থমকাল অতনু। নিশ্চল পদক্ষেপ টলে উঠে আর্তনাদের সুরে বেরিয়ে এলো,

-- কি? কি বললে!

-- যা শুনেছ তাই।

নিমেষে সাবলীল উত্তর ফিরে এলো অপরপ্রান্ত থেকে।

-- আ..আমার সন্তানকে তুমি..

আসমা তোমার সাহস কি করে হয় এতবড় অপরাধ করার!

ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের মতো তেড়ে আসতে চাইল অতনু। তা দেখে যেন ভারী আনন্দ হলো আসমার। ব্যঙ্গের হাসি হাসতে হাসতে বলল,

-- একজন অপরাধীর মুখে অপরাধের তিরস্কার সত্যি মানায়! অন্যের দিকে তেড়ে আসার আগে বিবেকের আয়নায় নিজেকে দাঁড় করাও। তুমি সেটাই ফিরে পেয়েছ, যা তোমার প্রাপ্য ছিল।

-- আমার প্রাপ্য!

বিড়বিড় করে আওড়ে থেমে গেল অতনু। বড় অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে ভেতরে। যাকে সে দেখল না, ছোঁয়ার সুযোগ পেল না;এমনকি যার আগমনের সংবাদও তার থেকে আড়াল করা হয়েছিল, একখণ্ড সে রক্তপিণ্ডটার জন্য এ কিসের তারল্য হুড়মুড়িয়ে এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল অজানায়! অপত্য স্নেহ?

ইতোমধ্যে এক সন্তানকে নিজ হাতে শেষ করার দহনজ্বালা তার হৃদয়কে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে দিচ্ছিল, এখন আরেকজনের সংবাদ। এ পৃথিবীতে নিজের অংশ রেখে যাওয়ার সুযোগ কি তবে অতনু আর পাবে না?

-- ক..কবে করেছ তুমি এসব? কেন করেছ। বলো, জবাব দাও আমাকে আসমা৷

দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে রক্তাভ চাহনিতে প্রশ্ন করল অতনু। আসমাও যেন নিয়ন্ত্রণ হারাল নিজের ওপর থেকে। তারস্বরে চিৎকার করে বলে উঠল,

-- প্রতিশোধ, শুধুই প্রতিশোধ। তুমি যেমন আমার পুরো পৃথিবী উজাড় করে দিয়েছ, বিনিময়ে তেমনি তোমার অংশকে কুঁড়িতে বিলীন করে দিয়েছি আমি। পৃথিবী তোমার মতো দ্বিতীয় নরপশু চায় না অতনু হাওলাদার। মানসিকভাবে অসুস্থ তোমাদের দেখলে সকলে ঘেন্না করে, ভয় পায়।

-- আসমা!

রুক্ষ একটি চপেটাঘাতে ছিটকে পড়ল আসমা ঘরের মেঝেতে। কিন্তু কই, ব্যথার আভাস লেশমাত্র তো চেহারায় নেই তার। বরং মেঝেতে পড়ে অপ্রকৃতস্থের মতো এক নাগাড়ে হাসতে লাগল সে।

অতনু ভয় পেল, শঙ্কিত হলো৷ কিসের একটা ব্যথা আঁকড়ে ধরল ওর হৃদয়টাকে শক্ত মুঠোয়।

নীচু হয়ে আসমার ঘাড়ের পেছন দিয়ে হাত নিয়ে মুঠোভরা চুল খামচে ধরে বলল,

-- তুমি ভয় পাও না? ভয় পাওনি? এক মুহুর্তের জন্যেও হাত কাঁপেনি তোমার এতবড় একটা অন্যায় করতে গিয়ে। ও আমার ছিল আসমা;আমার, অতনু হাওলাদারের অংশ। আমায় না জানিয়ে আমারই অংশকে শেষ করে দেয়ার দুঃসাহস তুমি পাও কোত্থেকে। একবারের জন্যেও মনে হয়নি অতনু হাওলাদার কখনো জানতে পারলে তোমার কি হাল করবে। চুপ করে আছো কেন? উত্তর দাও।

কোনো জংলী জানোয়ার নিস্তব্ধ বনে অকস্মাৎ হুংকার ছাড়লে যেমন গা ছমছমে ভয় লাগে,পাখির বাসার মতো এলেবেলে ঘরটায় এই মুহুর্তে ঠিক এমনই কোনো অনুভূতির আনাগোনা নিজের মধ্যে টের পেল আসমা৷ ওপাশের মানুষটা যেন বুঝতে না পারে তাই তার আবেগহীন পাথুরে চোখে চোখ রেখে ভারী শীতল স্বরে জবাব দিল,

-- আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না অতনু হাওলাদার। তুমি, তোমার মতো কিছু নরপশু যে মুহুর্তে আমায় অপবিত্র করে দিয়েছিলে, সেই মুহুর্তেই আমার মৃত্যু ঘটেছে। আজ চোখের সামনে যাকে দেখছ সে শুধুই তোমার বিবেক, তোমার ধ্বংস।

এ পর্যায়ে না চাইতেও দৃঢ় বাঁধন টলে উঠে চুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো অতনু৷

মাটিতে ধপ্ করে বসে পড়ল ঠিক কোনো সর্বহারার মতো। হরদম অগ্নিবর্ষিত চোখজোড়া ঝাপসা হয়ে এলো স্নেহ নামক এক অনুভূতির তারল্যে।

"মস্তিষ্কের শিরায় শিরায় অনল শিখা বয়,

নিমিষেই পুড়ে যায় হাজার হিমালয়"

সহসা অতনু বুঝে উঠতে পারল না অন্তরে যে দাবানলের আবির্ভাব ঘটেছে মাত্র, তা বন্ধ করবে কোন উপায়ে? রোষাগ্নিতে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করবে কাকে? নিজেকে, নাকি তার সামনে পুতুলের ন্যায় বসে থাকা এই পাপিষ্ঠাকে, যাকে সে হৃদয়ের সমস্তটা দিয়ে ভালোবাসে।

ওদিকে আসমা, অতীতের দৌরাত্ম্যে কাবু হয়ে নিজের অনাগতকে স্মরণ করে চোখের জল ফেলতে আরম্ভ করেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগে মানিকটা বুকে আসার সংবাদ পেল, এমন পরিস্থিতিতে পেল ওকে অনুভব করার মানসিক স্থিতি নিজের মধ্যে ছিল না। তাই একটা হঠকারী সিদ্ধান্তে ওকে নৃশংসভাবে ত্যাগ করতে উঠেপড়ে লাগল। যখন চিরতরে ও হারিয়ে গেল, তখন থেকে শুরু হলো আত্নদহন৷ কাউকে বোঝাতে পারবে না এই দহনজ্বালা ঠিক কতটা ভয়ানক। যা রোজ একবার করে খুন করে আসমাকে। সংগোপনে হৃদয় অলিন্দ থেকে ঝর্ণাধারার মতো রক্ত ঝরায়। উফফ! কিছু আঘাতের ভার এমন অসহনীয় কেন?

চলবে,

Sara

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন