#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী
লেখিকা: সালসাবিল সারা
পর্ব - ৩
(কপি করা নিষেধ)
__________________
“তোমার বুকের এই বার্থ মার্কে আমি লাভ বাইট দিতে চাই….আই লাভ ইউ, নুসাইবা। কাছে আসো। আমার কাছে আসো।এতটা কাছে আসো যেনো তোমার গলার লাল তিলতা চুমুতে আরো লাল হয়ে যায়।আমি অবসেসড তোমার প্রতি..তোমার জন্যে আমি উন্মাদ। কাম নুসাইবা…কাম টু মি..”
ফিসফিস এই শব্দটা আরো দৃঢ় হয়। সাথে পুরুষালি এক হাতের স্পর্শ নুসাইবার পুরো শরীরে বিচরণ করে। কে এই বিশাল পুরুষ? তার শরীরের এমন ম্যাস্কিউলিন মাতাল ঘ্রাণ মেয়েটার মস্তিষ্ককে কাবু করছে। কিভাবে সম্ভব এটা? লোকটার চেহারা স্পষ্ট না। পুরো এক কালো ছায়া। কিন্তু এমন বাজে ছুঁয়ে দিচ্ছে কেনো? তার গলার,বুকের খবর লোকটা কিভাবে জানে? লোকটা আরো নিকটে আসে। আঁধার আর ছায়ার এক বিস্তৃত লীলা খেলা চলছে। নুসাইবার প্রাণ বেরিয়ে আসার উপক্রম। সে খুব চেষ্টা করছে বিশাল লোকটাকে সরিয়ে দিতে। ঘুষি দেওয়ার জোর নেই। লোকটার মুখ আরো এগিয়ে আনে আরো এগিয়ে আনে…
নুসাইবা তার বাকশক্তি ফিরে পেয়েছে যেনো। সে চিৎকার দিয়ে উঠে,
“না না না! ডোন্ট টাচ মি। আইল কিল ইউ!”
এক চিৎকারে সে চেয়ার থেকে পড়তে নেয়। অদিতি দৌড়িয়ে আসে পাশের রুম থেকে। সম্মুখে বসা নুসাইবা ঘেমে অস্থির। কেঁপে উঠছে চোখের পাতা। অদিতি তার দিকে এগিয়ে যায়। কাঁধে হাত রাখে,
“কিরে? কি হলো?”
নুসাইবা জোরে শ্বাস নেয়। খানিকক্ষণ আগের দৃশ্যগুলো কেবল এক ভয়ানক স্বপ্ন ছিল।
“ঐ কিছু না। চোখ লেগে এসেছিল স্কেচ করার সময়। দুঃস্বপ্ন।”
মেয়েটা আবারো ফোস করে শ্বাস ছাড়ে।
পানির ফ্লাস্ক আঁকড়ে ঠোঁটে নেয়। গলায় যেনো জন্মের পিপাসা। খানিকটা পানি সে একেবারে খেয়ে ফেলে।
এরপর আবার হাঁপিয়ে উঠলে অদিতি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়,
“রিল্যাক্স। কাজের চাপ কম নে।”
“এই কাজ করি বিধায় আমার মানসিক চাপ কমে। তুই জানিস।”
হালকা হাসে নুসাইবা। মারাত্মক মায়াবিনী। অদিতি চেয়ে রয় তার সুন্দরী সইয়ের পানে। অথচ মেয়েটার জীবনে কিনা কি দুর্বিষহ অতীত?
“জানি। আন্টির কি অবস্থা এখন? উনাকে নিয়ে তোর দুঃস্বপ্ন দেখা দিনদিন বেড়েই চলছে।”
অদিতির চেয়ার টেনে বসে।
“কি আর অবস্থা? প্রত্যেকদিন সেম প্রশ্ন সেম রুটিন। আমি মিথ্যে বানিয়ে বলতেই থাকি।”
নুসাইবা পলক ফেলে। দৃষ্টি তার স্কেচ বুকে।
“আন্টিকে এটা বুঝানো দরকার ব্যাপারগুলো। এক বাটপারের জন্যে এইভাবে জীবন থেমে থাকে না।”
“মা সহ্য করতে পারবে না। তার বোনের ছেলে দুই পরিবারকে আলাদা করেছে। ইনফ্যাক্ট নানু মাকে অভিশাপ দিয়েছে খারাপ লোকটার জন্যে। মেয়ের সাথে ধোঁকাবাজি আর নানুর অভিশাপ কিছুই মেনে নিতে না পেরেই মায়ের ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে।তবে স্মৃতির পাতা এখনো আগেই আটকে। মেয়ের যে কখনো বিয়েই হয়নি এটা অব্দি মনে নেই মায়ের। এখন এইসব অতীত ঘাটতে গেলে মায়ের মস্তিষ্কে চাপ পড়বে। আর ডাক্তার বলেছে মায়ের উপর এক্সট্রা কোনো মানসিক চাপ আসলে উনি আর বেঁচে থাকবেন না। চান্স নেই। একদম নেই।”
কথাগুলো বলতে বলতেই চোখ ভরে আসে মেয়েটার। নুসাইবা মাথা নুইয়ে নেয়। শক্ত করে ফেলে হাতের মুঠো। অতীত কোনোভাবে মনে আনতে চায় না। যাদের জন্যে তার মায়ের এমন দুরবস্থা তারা কতই না সুখে আছে!
মায়ের দোষ কি ছিল? কেবল হেনার নিজ বোনকে বিশ্বাস করা? তার ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করা? অতঃপর মেয়ের সাথে প্রতারণা করেছে তারা আর ফলাফল ভোগ করছে কেবল হেনা আর তার মেয়ে দুইটা। ইয়াসিন বরাবরই চেষ্টায় থাকে কিভাবে তার ছোট্ট সংসার নিয়ে সুখে থাকা যায়। অথচ সুখ কি আর টাকা দিয়ে কেনা সম্ভব? না। কখনোই না।
“আপন মানুষ কিভাবে পিঠে ছুরি মারে এটা তোর খালাকে না দেখলে কখনোই জানতাম না। আর ঐ কুলাঙ্গারকে তো ইচ্ছা করে তার মেইন মেশিনটা কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিই। শালা।”
অদিতি টেবিলে শব্দ করে চড় দেয়। নুসাইবা এত কষ্ট এতটা বিষাদ সহ্য করেছে অথচ কখনো অলয়কে গালি দিতেও তার রুচিতে আসেনি। এতটাই জঘন্য ছিল সেই এক বান্দা।
নুসাইবা মাথার ওড়না ঠিক করে। অদিতিকে বলে উঠে,
“বাজে মানুষের কথা বাদ। ওদের ব্যাপারে কথা বলার আমার কোনো ইন্টারেস্টই নেই। আমার লাইফে ওরা এক্সিস্ট করে না। মাকেও আগে পরে আমি আমার নিয়ম করে বুঝিয়ে বলবো। তবে সময় লাগবে। অন্তত স্বাভাবিক হতে মায়ের বছর তিন চারেক তো লাগবেই। অলরেডি আমি মাকে সঠিকভাবে উত্তর দিই না কিছুর এই ব্যাপারে। ধীরে ধীরে চুপ করে গেলে মা এমনিতেও সব ভুলে যাবে আমার বিশ্বাস।”
অদিতি আরো কথা আগাতে চায় এই ব্যাপারে। কিন্তু তার সইয়ের টানা টানা সুন্দর চোখ দুইটি দেখে ব্যথাটা আর বাড়ানোর ইচ্ছা জাগলো না। সেথায় কি জল মানায়? না। একদম মানায় না।
“আরে চিল। প্যারা নিস না। দেখবি তোর জীবনে এমন একটা তুফান আসবে যে তুফানে তোর সব দুঃখ সবটা ভুলিয়ে দেবে। কখনো তো প্রেম করিসনি কিন্তু তোর শোয়ামী দেখবি তোকে প্রেমের উপরে প্রেমে ভরিয়ে রাখবে,আদর সোহাগে মাতোয়ারা করে তোকে …”
বাকিটা আর বলতে পারেনি অদিতি এর আগেই শোরুমে কাস্টমার আসে। সে তাদের জবাব দিয়ে নুসাইবাকে আবার বলে উঠে,
“স্কেচটা অস্থির হচ্ছে। ক্যারি অন। আমি কাস্টমার এটেন্ড করি।”
নুসাইবা হা হয়ে থাকে তখনো অদিতির বলা পূর্বের বাক্যের। কি বলছিল ঠোঁটকাটা মেয়েটা! সঙ্গে মনে আসলো স্বপ্নের কথা…দুঃস্বপ্ন। এমন ইরোটিক স্বপ্ন কখনো দেখেনি মেয়েটা। তার সরল জীবনে এমন কথাবার্তা সে ভেবেও দেখেনি ইহকালে। সবটা ভবিষ্যত হাজব্যান্ডের জন্যে যত্নে রেখেছে সে। তবে আজ এমন দৃশ্যে মেয়েটার হাল বেহাল। দরদর করে কয়েক ফোঁটা ঘাম কপাল দিয়ে নেমে আসে।
পরক্ষণে সে মাথায় চাপড় দেয়। আলগোছে বলে উঠে,
“আজকে থেকে ভালো করে স্কেচে ফোকাস করতে হবে। কিসব শয়তানি কাজকারবার মনে আসছে। ছিঃ।”
লাঞ্চ ব্রেকে নুসাইবা আর অদিতি শোরুম ক্লোজ করে এগিয়ে যায় পাশের ক্যাফেতে। বৃষ্টি এখন নেই। তবে ভেজাভাব চারিদিকে দৃশ্যমান।
শোরুমের এবং তার সামনে বিল্ডিংগুলোর মাঝে উপরে যে ফাঁকা জায়গা ছিল সেখানে যেনো কিসের কাজ চলছে। নুসাইবা একটু অবাক হয়। গলি থেকে এই জায়গা আসতে হেঁটে আসা লাগতো। বৃষ্টির জন্যে যা ছিল বিরক্তিকর। কিন্তু হঠাৎ এইখানে কাজ করার কোনো অভিব্যক্তি খুঁজে না পেয়ে সে অদিতিকে জিজ্ঞাসা করে,
“কিরে এইখানে আবার কি হচ্ছে?”
“আজ সোসাইটি থেকে এপোলজি লেটার এসেছিল অন্যদিকের রোড বন্ধ থাকায় আর এই উপরের জায়গাগুলোতে ছাউনী না দেওয়ার কারণে। তারা আজ থেকে কাজে লেগেছে। কাল থেকে নাকি ছাউনী থাকবে। আর ঐ রোডের কাজটাও শেষ হবে দ্রুত।”
“শোরুম থেকেই পেছনের দিক দিয়ে কাজ এগিয়ে যাবে নাকি?”
নুসাইবা কিছুটা অবাক হয়।
“আরে না। শোরুম এর দিক থেকে শুরু হয়ে একদম গলি অব্দি কাজ চলবে।”
অদিতি জবাব দেয়।
“তাহলে শোরুমের পরের জায়গাটা?”
“আমাদের দরকার কি? আমরা শোরুম অব্দি পাচ্ছি এটাতেই শুকরিয়া।”
“হ্যাঁ,তাও ঠিক।”
নুসাইবা আর কথা আগায় না। অথচ সে জনেই না,শোরুম অব্দি এই ছাউনী তার পাগলাটে প্রেমিকের অর্থের জোরে হচ্ছে যা সে সোসাইটিকে পে করেছে। নুসাইবা কথার ছলে হাসে। চুপ করে অদিতির হাত ধরে রাস্তা পার হয়।
দশ হাত দূরে পার্ক করা রোলস রয়েসে এই দৃশ্যে বুকে হরতাল হয় বাংরুশ মন্সটারের। সে কল্পনা করতে থাকে নুসাইবার পাশে তাকে। যে তার হাত ধরে সযত্নে রাস্তা পার করে দিচ্ছে। লোকটা তার প্রতি এতটা উন্মাদ যে তার খোঁজ অব্দি নেয়নি। ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করেনি। তার দরকার কেবল এই পাঁচ ফুট এক ইঞ্চির মেয়েটাকে। যাকে সে হাসিল করে নিবে যেকোন ভাবেই।
সে ঐ ক্যাফের সামনে গাড়ি থামায়।
বেঞ্জামিন গাড়ি থেকে বের হলে এলেক্স তার পাশে দাঁড়ায়। হাতের আইপ্যাডে কিছু যাচাই করে বলে,
“সামনের ক্যাফেতে এসেছেন, মিস্টার আলতাফ। বলেছেন দুই ঘণ্টা ধরে উনি ওয়েট করছেন আপনার জন্যে। সাথে এটাও বলেছেন অস্ত্রের নেক্সট ডিজাইন উনি না দেখেই সব পেমেন্ট করবেন।”
“ডোন্ট ফলো মি।”
বেঞ্জামিন একাই এগিয়ে যাচ্ছে।
এলেক্স মাথা চুলকে উঠে। আগামাথা বুঝলো না। নরমালি এইসব মিটিংয়ে এলেক্স, ইথেন, দোয়াদ সবসময় থাকে। গতকাল থেকে লোকটা এমন অদ্ভুত ব্যবহার করছে কেনো সেটা একটুও ঠাহর করতে পারলো না তারা।
“বস একাই যাচ্ছে কেনো?”
রাশিয়ান ভাষায় প্রশ্ন করলো ইথেন।
“ডোন্ট নো। হয়তো ডিলারের সাথে একা কিছু ডিল করবেন।”
এলেক্স বলে উঠে।
“নিজের দেশে এসে আমাদেরকে পর করেছে বস। ভেরি স্যাড।”
দোয়াদ কথাটা বললে বাকি দুইজন হেসে উঠে হো হো করে।
“ নাহ। বস কিছু একটাতে মন দিচ্ছে যে জিনিসটা আমাদেরকে উনি দেখাতে নারাজ।”
নাক চুলকে বলে ইথেন।
“উহু, বস নিশ্চয় পার্সোনাল কিছু ডিল করতে ঐ ক্যাফেতে গিয়েছে। নাহয় এতো ফাইভ স্টার ক্যাফে থাকতে ঐ ছোট ক্যাফে যাবে? না। কখনো না।”
এলেক্সের কথায় বাকিরাও তাল মেলায়।
_______________
ক্যাফেতে সচরাচর অনেক মানুষজন থাকে। তবে আজকে শুধু কেবিনের দিকে একটা লোককে বসে থাকতে দেখে অবাক বনে নুসাইবা। চুলগুলো কানের পাশে একটু গুঁজে দেয়।মাথার ওড়না আরো টেনে অদিতির দিকে এগিয়ে বলে,
“আজকে কেউ নেই কেনো রে?”
“জানিনা। জলদি খেয়ে বেরুতে হবে আমার। তুই একটু শোরুমে থাকিস। সুকান্ত ফোন করছে বারবার ওর মায়ের শরীর খুব খারাপ,হাসপাতালে আমাকে দেখবেন বলছেন।”
“সমস্যা নেই। তুই যা সময় নিয়ে। আমি আছি শোরুমে। কোনো কাস্টমার প্রিবুকিং করেছে?”
নুসাইবা চাউমিনের চামচ মুখে পুরে দিয়ে বলে উঠে।
“প্রিবুকিং…প্রি…”
বলতে বলতে অদিতি কেশে উঠে। দরজা দিয়ে তখন প্রবেশ করছিল কেউ। নুসাইবা অস্থির হয়ে পড়ে। সে দ্রুত উঠে অদিতির কাছে যায়। পেছন থেকে সুজের হিলের কটকট শব্দ আসছে। কিন্তু মেয়েটা সেদিকে ফেরার ইচ্ছে দেখায়নি।তার পরে যাওয়া ঘোমটা কাঁধ থেকে তুলে সে আবারো অদিতির দিকে পানি এগিয়ে দেয়,
“পানি খা।”
এত্ত মিষ্টি সুর! বেঞ্জামিনের সচল কান ঐ কেবিনে ঢুকতে ঢুকতেই শুনতে পায় মেয়েটার মিষ্টি কন্ঠস্বর। মুহূর্তে পুরো শরীরে শিহরণ জাগে। বাঁকা দৃষ্টিতে দেখতে ভুললো না মেয়েটার অবয়ব। কি নিদারুণ তার তুলতুলে মেয়েলী ছিমছাম কাঠামো। মাথায় কাপড় তুলে দেওয়ার দৃশ্যে ভেতরটা আপনাআপনি নড়ে উঠে। সে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“মাইন মাইন মাইন…ইউ আর ওনলি মাইন,মাই জিঞ্জার কিটেন।”
কেবিন রুমে ঢুকেই সে পর্দা টেনে দেয় তার সামনের লোকটার দিকের। অথচ তার দিকে পর্দা কিছুটা হেলিয়ে রেখেছে। সামনের লোকটার কথা শোনার পাশাপাশি প্রানভরে দেখছে তার প্রাণ ভোমরাকে।
________________
“ হয়েছে কি তোর? এমন বিষম খেয়েছিস!”
নুসাইবা অদিতিকে শান্ত করিয়ে বলে উঠে।
“জানিনা দোস্ত। মনে হচ্ছিল সুকান্তের মায়ের খারাপ কিছু হবে। এটা ভাবতেই আমার গলায় খাবার আটকে আসে।”
“কিছু হবে না। আল্লাহ ভরসা। এত চিন্তা করিস না তো।”
বলেই মেয়েটা মিষ্টি করে হাসে। আর সেই মিষ্টি হাসি এতটা কাছ থেকে দেখে বেঞ্জামিনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে যায়। তার দৃষ্টি একবিন্দু নড়েনা।
সম্মুখে বসা লোকটা ভয়ে আড়ষ্ট। কিন্তু কিছু বলার সাহস দেখাচ্ছে না। শেষমেষ লোকটা মুখ খুলে,
“মিস্টার বেঞ্জামিন আমি আপনার ডিজাইনের জন্যে…”
“হুশ!!!”
বেঞ্জামিন বাকি কথা শোনার আগেই চেকে এমাউন্ট বসিয়ে তাকে সাইন করার ইশারা দেয়।
লোকটা বেঞ্জামিনের অস্ত্রের নতুন ডিজাইন পাচ্ছে দেখে খুশিতে চকচক। সে দ্রুত সিগনেচার দেয়। বাংলাদেশে বেঞ্জামিনের অন্যতম সবচেয়ে দামী কাস্টমার এই লোক। কয়েকবার দেখা হয়েছে তাদের। কখনো লোকটা তার সাথে ভালো করে কথাও বলেনি। কিন্তু তাও,খুশি সে। সেই সুবাদে বলে উঠে,
“মিস্টার বেঞ্জামিন আপনাকে কিভাবে যে ধন্যবাদ দিই?”
যখন লোকটা খেয়াল করলো বেঞ্জামিন পর্দার একটু ফাঁকে কিছু দেখছে সে নিজের দিকের পর্দা সরিয়ে নেয় বেশ খানেক। নুসাইবার গায়ের রং আর চুলের সৌন্দর্য আগে থেকেই লোকটা উপভোগ করছিল। তাহলে কি বেঞ্জামিন…
“আপনিও কি সেই ফর্সা মেয়েটাকে দেখেছেন? অনেক সুন্দরী। আপনার ভালো লাগলে বলুন,মেয়েটার খোঁজ নিয়ে পাঠাবো আপনার কাছে?”
বেঞ্জামিন দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। নুসাইবা তখন অদিতির সাথে রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে গেলো।
“মাদারফাকার।”
বেঞ্জামিন খুব সহসাই বলে। লোকটার বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে। অথচ মাথা ভর্তি নোংরামি!বয়সের রেহাজও করেনি পারভার্ট লোকটা।
বেঞ্জামিনের পড়নে কালো শার্ট গায়ে আঁটসাঁট লাগানো। মুহূর্তে তার খয়েরী চোখ রক্তিম হয়ে উঠলে ঘেমে উঠে আলতাফ। সে কিছু বলার আগেই বেঞ্জামিন তার কলার চেপে ধরে। হাতের আঘাতেই নাক ভেঙে দেয়। রক্তে তার অবস্থা করুণ। চেকটা নিয়ে তার মুখে গুঁজে দেয়,
“ফাঁক ইওর চেক,বাস্টার্ড।”
বেঞ্জামিন আর দাঁড়ায় না। উঠে পড়ে। কেবিন থেকে বেরুনোর সময় লোকটার দিকে আবারো শিথিল দৃষ্টিতে কিছু পরখ করে।
পরে গটগট করে হেঁটে যায়।
মেজাজ তার সপ্তম আসমানে উঠে। হাতের শিরাটা টানটান হয়।
আলতাফ বেঞ্জামিনের কাহিনী কিছুই বুঝলো না। তবে সে বিনা কারণে লোকটার মেজাজ খুইয়েছে এটা বুঝতে পেরেছে। গাড়িতে উঠতে নিলে আলতাফকে এলেক্স খবর দেয় বেঞ্জামিন তাকে তার বাংলোতে ডাকিয়েছে।
আলতাফ ভয়ে ভয়ে রাজি হয়। না হয়েও উপায় নেই। সিংহের দৃষ্টি থেকে শিকার বাঁচবে না কখনো। আর সে সেখানে পৌঁছা মাত্রই বেঞ্জামিন তার সিগারেট সরায় ঠোঁট থেকে। শার্টের বোতাম খোলা অনেকটা। পুরুষালি খাঁজ কাটা শরীর দৃশ্যমান। সেটা বুঝাচ্ছে লোকটা কতটা শক্তিশালী!
আলতাফ কিছু বুঝে উঠার আগেই বেঞ্জামিন তার ছুরি দিয়ে বুকের মধ্যে আঘাত করে আলতাফের। লোকটা কেঁপে উঠে।
সেই আঘাত বুক থেকে পেটের নিচ অব্দি পৌঁছে। লোকটা যন্ত্রণায় হাতজোড় করে। কিন্তু বেঞ্জামিন কারো দয়ার মাঝে নেই। সে ওভাবেই হাত দিয়ে খুবই মর্মান্তিক এক ঘটনার সৃষ্টি করে। যেটা দেখে এলেক্স নিজেই অবাক! বেঞ্জামিন খুন করে। তবে আজ ছুরির আঘাতের পর,নিজ বেয়ার হাতে এমন করতে দেখে একটু অবাকই হলো। শেষে যখন আলতাফের রুহ বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায়,তখন বেঞ্জামিন ছুরি লোকটার চোখের মধ্যে খিঁচে দেয়। পরক্ষণে তার কানে কানে বেঞ্জামিন দাঁতে দাঁত চেপে অত্যন্ত ভয়ানক সুরে বলে,
“ঐ মেয়েটাকে গভীরভাবে দেখার ক্ষমতা শুধু আমার। আমি ব্যতীত যারা বাজে নজর দেওয়ার সাহস করবে তারা সবাই এমন কুৎসিত মরবে। দ্যাট গার্ল হ্যাজ আরন বেঞ্জামিন’স হার্ট,লাইফ __ এভরিথিং। শি আউন্স আরন বেঞ্জামিন। ডাই… ইউ ফিলথী ডগ।”
এলেক্স বুকে ফুঁ দেয়। কথাগুলো শুনল না সে। ইথেন এসে এলেক্সকে কিছু বলতে নিলে এলেক্স তার মুখ চেপে ধরে। এখন একটা বাড়তি শব্দ হলেও বেঞ্জামিন না তাদের উপর ক্ষেপে উঠে!
______________
অদিতি চলে গেলে নুসাইবা কিছুক্ষণ সময় কাটায় শোরুমে। ঘুরে ফিরে তার স্কেচ দেখে। গুণগুণ গান করে। জানালার ফাঁকে বাহিরে দেখে। চারিদিকে সুনসান। বৃষ্টি আসবে ভাব এমন। এইদিকের এলাকায় মানুষজন একদম নেই বললেই চলে। এপার্টমেন্ট যা আছে সবগুলোর পেছন দিক হওয়ায় মানুষের যাতায়াত নেই। কেবল গাড়ির শব্দ,আর প্রাইভেট গাড়ির যাতায়াত ছাড়া।রাতের আটটা বাজে এখন। শোরুমে সে এতসময় থাকে না। অদিতি থাকে। গাড়ি আসার সময় হয়ে আসছে। ড্রাইভার কতটুকু এসেছে সেটা জানার জন্যে ফোন দিয়েছিল। তবে ফোন দিয়েও লাভ হয়নি। ড্রাইভার ফোন তুলছে না। ভ্রু কুঁচকে আসে মেয়েটার।
শোরুম বন্ধের সময় কাছাকাছি হয়।বাহিরে ক্লোজড বার ঝুলিয়ে,সে ভেতরের দিকে যায়। পেছনের দিকে দরজায় তালা দিয়ে ফিরতে নিলে অনুভব করে শোরুমে কেউ প্রবেশ করেছে। সে মিহি সুরে আওড়ায়,
“এখন ক্লোজিং টাইম। কাল আসুন।”
সে একটু এগোতে নিলেই হঠাৎ চারিদিকের লাইট বন্ধ হয়ে যায়। নুসাইবা ঘাবড়ে উঠে। হাতপা ঠান্ডা হয়ে আসে তার। অথচ সে এগোতে নিলে একটা ছায়া তাকে ঘিরে নেয়। কেমন এক ম্যানলি সুবাস চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। বৃহৎ সেই ছায়ায় মেয়েটা ঢেকে যায় যেনো।
নুসাইবা চিৎকার করতে চায়। কিন্তু সেই চিৎকার বেরুনোর পূর্বে মেয়েটা অনুভব করে তার শরীর কাঁপছে। নুসাইবা অন্ধকারকে জমের মতো ভয় পায়। মেয়েটা হঠাৎই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়তে চাইলে প্রশস্ত একটি হাত তাকে আঁকড়ে নেয়। প্রথমবার মেয়েটার এমন নরম সত্তা স্পর্শ করে বেঞ্জামিন তার খেয় হারায়। উন্মাদ সে মেয়েটার সত্তা কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের সোফায় গা এলিয়ে বসে।
মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে মেয়েটাকে দেখে নয়ন ভরে। যে চোখে নেই একটুও হিংস্রতা। অথচ ভয়ানক এই লোক আজ আলতাফকে ভয়ানক মৃত্যুর সাথে পরিচয় করিয়েছে নিজ হাতে।
বেঞ্জামিনের নিজস্ব সত্তার উপর দৃষ্টি দেওয়া? একবিন্দু ছাড় নেই। দুনিয়া উজাড় করে দিবে সে,যদি এই মেয়ের দিকে কেউ বাজে দৃষ্টি অব্দি দেয়!
বেঞ্জামিন খুবই কাছে নিয়ে যায় তার মুখ নুসাইবার মুখের সামনে। জ্বলজ্বল করে তার ধারালো দৃষ্টি মেয়েটার জন্যে। নুসাইবার মুখে বিন্দু ঘাম। সেথায় আঙুল স্পর্শ করে বেঞ্জামিন আলগোছে। প্রেমিক পুরুষ তার প্রেয়সীর অধরে আলতো আঙুল স্পর্শ করায়। ধীর সুরে বলে উঠে,
“কিস করে দিই,হ্যাঁ? কালকে তোমার ছবিতে কিস করেছি,আর আজকে সরাসরি তোমাকে করি?”
কথাটা বলেই সে নিজের ঠোঁটে হাসির অস্তিত্ব পায়। একটা প্রশান্তি খুঁজে পায়। মেয়েটার গলার কাছে নাক নিয়ে গাঢ় নিশ্বাস ফেলে,
“একটু স্পর্শ করি এইখানে নাকটা?উহু,বেঞ্জামিন তোমাকে তোমার সজ্ঞানে স্পর্শ করবে, সাইবা।”
পরক্ষণে বেঞ্জামিন তার বলিষ্ঠ দেহের সাথে আলগোছে মেয়েটাকে জড়িয়ে নেয়। তার পুরুষালি হাতের দানবীয় স্পর্শ মেয়েটার পিঠে।
নুসাইবার জ্ঞান তখনো কঠোরভাবে ফিরেনি।ঐভাবে মেয়েটা অজ্ঞানে বুদ হয়ে রইলো তার জন্যে উন্মাদ এক পুরুষের বক্ষস্থানে। বেঞ্জামিন তার এলো চুলে ফুঁ দেয়।বাহিরে আবারো বৃষ্টি নেমেছে। সেই শব্দ তার সদা বিরক্ত লাগলেও আজ যেনো তাদের নীরবতায় এক নতুন সুর হয়ে নামছে। বেঞ্জামিন মেয়েটার চুলের এক গোছা আঙুলে পেঁচিয়ে নেয়। অত্যন্ত ভারী পুরুষালি কন্ঠে বলে উঠে,
“তুমি মেয়েটা আমার মতো মনস্টারকে হাত করেছো। কে বলবে তুমি আঁধারে ভয় পাও? যেখানে স্বয়ং আঁধারের রাজা তোমার কদমে খুন হয়!”
চলবে……..
কপি করা নিষেধ।
সবাই পোস্টে রিয়েক্ট,কমেন্ট করবেন। পর্বে যদি আমার মন মতো রিয়েক্ট না হয়,অন্তত 1কে রিয়েক্ট আশা করছি তোমাদের কাছে। আমি অসুস্থ অবস্থা তোমাদের জন্য লিখছি। অন্তত 1কে রিয়েক্ট দাও প্রত্যেক পর্বে সুন্দরীরা। বেঞ্জামিন আর নুসাইবার রোমান্টিক দুনিয়ায় তোমাদের সবাইকে স্বাগতম।