#প্রেম_শৃঙ্খলে_রুদ্ধ_রূপসী
পর্ব - ৫
লেখিকা: সালসাবিল সারা
(কপি করা নিষেধ)
_________________
“নিজের রুমে এখন আমার কাপড় চেঞ্জ করতেও বিরক্ত লাগে।আমি জানিনা আমার সাথে কি হচ্ছে এইসব। কিন্তু আমার মনে হয় আমার রুমে সর্বদা কারো উপস্থিতি। কেউ আমাকে দেখছে। গভীরভাবে দেখছে। তার উপর সামনের বিল্ডিংয়ে এক রহস্যজনক লোক আর তার কুকুর দুইটা। অদ্ভুতভাবে বিল্ডিংয়ের মাঝে বিচরণ করে। তবে লোকটার অবয়ব ঝাপসা,তাকে দেখিনি একটিবার। সারাদিন তাদের দেখা নেই। কিন্তু রাতে,ঠিক দুইটা কি তিনটার সময় অসহ্যকর দুই কুকুরের ঘেউ ঘেউ আমার মেজাজ ছিঁড়ে নেয়। ব্যালকনিতে গিয়ে বললে লোকটাকে আবার কুকুরদের নিয়ে ভেতরে যায়। অদ্ভুত!”
নুসাইবার কন্ঠে কিছুটা ভীতি,কিছুটা দোটানা। বিরক্তিকর না সেই শব্দ। কেবল অজানা আতঙ্কের মিশ্রণ। সে আরো কিছু কথা ইগনোর করেছে, যেমন সে গভীর ঘুমে থাকলে স্পষ্ট বুঝে কেউ তার পাশে বসে আছে। নাহয় কারো শীতল ঠান্ডা হাত তার ঠোঁটের উপর বিচরণ করে।
উফ! এমন আজাইরা কথা কিভাবে কাকে বলবে? কে বা বিশ্বাস করবে?
“তুই ঐসব টার্কিশ হরর সিরিজ দেখা বন্ধ কর। তাহলে শান্তি পাবি। যেগুলো দেখে তোর মনে বাজে অনুভূতি হয় সেইসব দেখার কোনো মানে হয় না।”
অদিতি স্কেচ দেখা অবস্থায় জবাব দেয়। স্কেচটা মাত্রই নুসাইবা এডিট করেছে।
“আমি হরর সিরিজ দেখা ছেড়েছি কখন তুই জানিস। মাঝে যে একটা কাহিনী হয়েছে আমার জীবনে, এরপর থেকে আঁধারে থাকতে আমার দম বন্ধ লাগে।”
মেয়েটা হাত চেপে বসে। সত্যি সে আঁধারে ভীষণ ভয় পায়। সদা একটা সোনালী রঙের ডিম লাইট রাতভর জ্বলে। কিন্তু ঐ বিশাল অবয়ব যখন তার পাশে উপস্থিত হয় পুরো রুম ঘুটঘুটে আঁধার হয়ে যায় আপনাআপনি। এগুলো মনের ভ্রম সে জানে। ইদানিং বেশি ইংলিশ নভেল পড়ছে। আর নায়িকাদের এমন স্টকার রোমান্স পড়তে পড়তে সে নিজেকেই সেখানে বসিয়ে কল্পনা করছে নিশ্চয়?
নুসাইবা দুইদিকে মাথা নাড়ে। খোলা চুলগুলো হাত খোপা করে আওড়ায়,
“বাদ দে এইসব কথা। তুই আমাকে ফোর্স করে আর কিছু জিজ্ঞেস করবি না। দেখলি তো কেমন অগোছালো জবাব দিলাম,আর তুই আমাকে বকলি!”
এই যাত্রায় অদিতি হেসে উঠে। তার পিঠে হাত রাখে স্নেহে,
“ওহ গড,মেয়েটা এমন সেনসিটিভ হয়েছে! দেখ আমাদের সাথে এমন প্রায়ই কিছু ঘটনা হয় যেটা বাস্তবে হয় না,কিন্তু কল্পনাটা যেনো একদমই বাস্তব। সো এইসব নিয়ে একদম দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আজকে রুমে নিজেকে ইজি করে কাপড় খুলবি,বিশ্বাস রাখবি কেউ দেখছে না। তাহলে ফিল করবি কোনো অকোয়ার্ড লাগছে না।”
“আচ্ছা। আমার আসলেই আজগুবি সব চিন্তা বাদ দিতে হবে। তো বল,স্কেচ এর এডিট ঠিক হয়েছে?”
নুসাইবা তার কালো ফ্রেমের চশমাটা ঠিকভাবে আঁকড়ে নেয় কানের সাথে। যেনো মেয়েটা জীবন্ত পুতুল। পলক ঝাপটিয়ে যখন জবাব দেয়,রূপ উপচে পড়ে।
“ইয়েস সুন্দরী। মারডালা টাইপ হয়েছে একদম। মাখনের চেয়ে মোলায়েম।”
অদিতির জবাবে গালে হাত রেখে হাসে নুসাইবা।
চশমাটা দিয়ে মাথার চাপ আজ কিছুটা কম লাগছে। সে সাধারণত চশমা পড়ে না। কিন্তু অতিরিক্ত মাথায় যন্ত্রণা হলে চোখকে রিলিফ দিতে পড়ে মাঝে মাঝে। গত রাতে ঘুম না হওয়ার দরুণ তার মাথায় যেনো পাথর ভার অনুভব হচ্ছে।
“থ্যাংক ইউ। যাক মাথাটা কিছু হালকা হলো,তোর ডিজাইন পছন্দ হয়েছে শুনে। তোদের বিয়ের কি খবর? কখন বাজছে শুভ ঘণ্টা?”
“টাকার দরকার খুব। বাবা লোন যা নিয়েছে সেটা পরিশোধ এখনো অর্ধেকের কাঁটায় পৌঁছায়নি। স্ট্রোকের ভাব আসছে বাবার।এইদিকে সুকান্ত থেকে আমি লোন নিয়ে এই বিজনেসে ইনভেস্ট করছি। ওর লোনটাও দেওয়া বাকি। সুকান্তর জবে দিব্যি চললেও বাবা,সুকান্তের লোন এইসব ক্লিয়ার না করে আমি বিয়েতে বসতে পারবো না। সুকান্তের মায়ের উন্নত চিকিৎসার জন্যও টাকা লাগবে ওর। বাবার জন্যে খুব চিন্তা হয় ব্যাংক থেকে বারবার নোটিশ দিচ্ছে। কি যে করবো!”
মেয়েটা কেঁদে উঠে। নুসাইবা অদিতির পিঠে হাত বুলিয়ে শান্তনা দেয়। কিছুটা সাহস জুগিয়ে বলে,
“ভালো হচ্ছে আমাদের কালেকশন। অলরেডি বেশ নাম কামিয়েছে। সেলিব্রেটি দিয়ে যদি লাইভ বা প্রোডাক্ট হাইলাইট করতে পারি তাহলে আরো জমবে। মন্ত্রীর মেয়েকেও আমি ফোন করে রিকোয়েস্ট করবো শোরুমের নামটা যেন ম্যানশন করে দেয় ড্রেসের ছবি দেওয়ার সময়ে।”
অদিতি কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করে সইয়ের কথায়। তাকে জড়িয়ে ধরে আলগোছে,
“তুই আমার আসল শক্তি। আমরা পারবো শোরুমকে একটা ভালো পজিশনে নিতে।”
“ অবশ্যই পারব। শুধু কাজ করে যাবো। আর কোনো চিন্তা না।”
ফিক করে হাসে নুসাইবা। তার হাসিতে অদিতিও হেসে দেয়।
অথচ তাদের সুন্দর এই মুহূর্তের চেয়ে ঠিক একশো গুণ চিন্তার মুহূর্ত তৈরি করছে বেঞ্জামিন। যার আছে অঢেল টাকা আর সেই টাকা দিয়ে সবটা কিনে নেওয়ার ক্ষমতা। যার হিংস্রতায় মানুষ মাথা নিচু করে,উঠে দাঁড়ানোর শক্তি খুঁজে পায় না।
গত দুইদিন সে রাশিয়ায় ছিল। তার অস্ত্রের কারখানায় নতুন অস্ত্র লঞ্চ হওয়ার পার্টিতে,সাথে নিজের ব্যবসার অনেক কাজে। সেখানে থেকেও তার নজর চব্বিশ ঘণ্টা যেনো নুসাইবার উপরেই আটকে ছিল। আজ মাত্রই বাংলাদেশে ল্যান্ড করে তাদের বাংলোতে পৌঁছে।
ল্যাপটপের স্ক্রিনে অসংখ্য সিসিটিভি ফুটেজের দৃশ্য। যার সবটা শুধু নুসাইবা ইয়াসিন জামানের। মেয়েটা যে ওড়না ছাড়া নির্দ্ধিধায় রুমে হাঁটছে স্পষ্ট দেখছে বেঞ্জামিন। শার্টের বোতাম খুলে দেয় সে নিজের। এসির মধ্যে থেকেও নিষিদ্ধ চিন্তাভাবনা তাকে অস্থির করে তুলছে। সে ল্যাপটপ নিজের কোলে তুলে নেয়।
নুসাইবা মাত্র শোরুম থেকে এসেছে। সে রুমে পায়চারি করছে সাহস করে কাপড় চেঞ্জ করবে কিনা!
এতদিন ধরে মেয়েটাকে ক্যামেরায় বেঞ্জামিন দেখেছে,রাতে তার পাশে বসে অনুভব করেছে,তার ঠোঁটে আঙুল বুলিয়েছে কিচ্ছুটি বুঝতে পারেনি নুসাইবা। কারণ গভীর ঘুমে মানুষের অনেক কল্পনা হয়,আর সেই কল্পনাকে হাতিয়ার বানিয়েই বেঞ্জামিন মেয়েটাকে জব্দ করেছে। বেঞ্জামিন ভালো ম্যানিপুলেটির এবং সে মানুষকে পড়তে জানে।অথচ তার শিশু প্রেমিকা কিছুই টের পায়নি। একে তো ঘুমে কাদা হলে বেঁহুশ থাকে মেয়েটা। বেঞ্জামিন আগে এমন টাইপের মানুষের কান্ড শুনলে নাক সিটকাতো। তার ঘোর অপছন্দ এমন মানুষ যারা ঘুমালে দুনিয়া ভুলে।
অথচ তার দুনিয়াই এখন এমন এক মেয়ে।
হালকা অধর বাঁকা করে হাসে বেঞ্জামিন। তার চোখজোড়া ছোট হয়ে আসে।
নুসাইবা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তার নিজের অবয়ব কিছুটা মাপে। আর সেটা দেখে লোকটা মুখে হাত রেখে আওড়ায়,
“কিছুদিন আর কিছুদিন…এরপর এই আয়নার সামনে তোমার সাথে চিপকে আমি থাকবো। সাথে থাকবে আমার ব্যাড টাচ,ওনলি ফর ইউ।”
বেঞ্জামিন স্ক্রিনে আঙুল ঘষলে তখনই নুসাইবা কামিজে হাত রেখে খুলতে নিলে সে দ্রুত পাশে ফিরে। বুকটা অস্বাভাবিক গতিতে লাফিয়ে উঠে। মাথার পাশ দিয়ে ঘামের স্রোত নামে। বুড়ো আঙুলে সে কানের পাশের ট্রিম করা চুলে চুলকায়,
“উহু,এখন তাকাবো না এই বেয়ার বিউটির দিকে। এই বিউটির দিকে তাকানোর মজা হবে সামনাসামনি আমার মোহর মেরে…আহ সো ফাকিং সেডাক্টিভ।”
লোকটা রাশিয়ান ভাষায় বিড়বিড় করে উঠে। হাতে তার কিছু ফাইল। যেটা আবারো পড়ে সে মুচকি হাসে। অথচ দৃষ্টি কি স্তব্ধ! কি কঠিন! যে দৃষ্টির দিকে তাকালে ভালো ভালো মাফিয়া তাকে “আব্বা” ডাকে। অথচ সে ছাড় দেয় না। কাউকেই না।
হঠাৎ বেঞ্জামিনের মোবাইল বেজে উঠলে সে আলগোছে ফোন রিসিভ করে,
“তুমি কেমন আছো,আব্বা? ঐখানে সব ঠিক আছে?”
“আম্মি,কেমন আছেন?”
বেঞ্জামিন নিরলস ভঙ্গিমায় জিজ্ঞাসা করে।
“এইতো আলহামদুলিল্লাহ্। তুমি ঠিক আছো?”
পুতুল মোয়ালেম সুরে বলে উঠে।
“ইয়াহ।কখন আসছো?”
বেঞ্জামিনের দৃষ্টি তার আঁকা ছবিতে। যেখানে নুসাইবা প্রাণ খুলে হাসছে।
“আগামী সপ্তাহে। সব খবর নেওয়া হয়েছে ছেলেটার রাশিয়ায়। আর দেশের খবর তুমি নিয়েছ তাই টেনশন নেই। আগামী সপ্তাহে আসবো আমরা। তবে ছেলের আসতে আরো দুই সপ্তাহ লাগবে।”
“ওকে, আম্মি। যত্ন নিবেন।”
“তুমিও আব্বা।”
বেঞ্জামিন ফোন টেবিলে ছুঁড়ে। শার্ট খুলে আলগোছে। শরীরে তার বিভিন্ন জায়গায় ট্যাটুর ছড়াছড়ি। কিন্তু শার্ট পড়লে সেটা বুঝা যায় না। অথচ এখন খাঁজ কাটা শরীরে তার সেই ট্যাটু বড্ড আকর্ষণীয়। সে কপালের চুল পেছন দিকে ঠেলে দেয়। খরশান চোয়াল চরম সুদর্শন।
“সি ইউ সুন,ডার্লিং। বাট তোমার এই সফট লাইফে আমার রাফ এন্ড টাফ বোল্ড এন্ট্রি কিভাবে সহ্য করবে? হাহ? শুড আই কিস ইউ এট আওয়ার ফার্স্ট মিটিং?”
বেঞ্জামিন হাতের ফাইল আরো শক্ত করে মুঠোয় আটকায়।
হুইসেল বাজায় খুবই কামনা নিয়ে।ল্যাপটপে তাকায়, যেনো সে জানে এতক্ষণে নুসাইবা কাপড় পরিবর্তন করেই ফেলেছে। তার অনুমান বা জানাটা একদম সঠিক। নুসাইবা ফতোয়া আর ঢোলা প্যান্ট জড়িয়ে খাটে আরাম করে বসে। মোবাইল নিয়ে সে কিছু করছে। আর সেই দৃশ্যে বেঞ্জামিন আরো উন্মাদ বনে। মেয়েটার এমন সরল রূপে সে আরো ভয়ানক আসক্ত হয় হাজারো বার।হুইসেল বাজানো অবস্থায় সুর তুলে,
“তুমি যেও হও শুধুই আমার,তুমি যা’ই হও শুধুই আমার। বেঞ্জামিন এর হটনেসে ডুবতে তুমি রাজি না হলেও হতে হবে। বিকজ,ইটস আরন বেঞ্জামিন এন্ড ইউ আর হিস ওয়ার্ল্ড।”
___________
গ্রীষ্মের বৃষ্টি সবসময় আনন্দ বয়ে আনে না। এইযে আজ অতি গরমের মাঝে যখন বৃষ্টির রোনাদোল হয় তখন নুসাইবা গাড়িতে। মাঝপথে। শোরুমে যাওয়ার আরো বেশ পথ বাকি। তীব্র বজ্রপাতের সাথে রাস্তায় প্রচুর জ্যাম। এইদিকে অদিতি গত দুইদিন ধরে কেমন গম্ভীর হয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না। পরশু শুধু একটা ব্ল্যাঙ্ক দলিলে স্বাক্ষর নিতে পাঠিয়েছিল।এরপর আর কথাও নেই, সাক্ষাতও না। নুসাইবা কিছু না ভেবে স্বাক্ষর করে। সে জানে,কোনো কাজ ছাড়া অদিতি কখনো সাইন নেয় না।আর সেটা কেনো ব্ল্যাঙ্ক ছিল এটা নিয়েও প্রশ্ন করার ইচ্ছে ছিল না। কারণ অলরেডি অদিতি প্রচুর বিশ্বস্ত তার। ছোট বেলার সই। তাদের বিশ্বাসে কেউ এক চুলও ফাটল ধরাতে পারবে না।
শোরুম ভালো রেসপন্স করছিল এক্ট্রেস জারাকে দিয়ে কাজ করানোর পর। হঠাৎ মেয়েটার কি হলো সে ভাবতে পারলো না। আজ শোরুমে ইমার্জেন্সী যেতে বলায় সকালের নাস্তাটাও করলো না নুসাইবা। গত রাতে শুধু এক স্লাইস পিজ্জা খেয়েছে। খিদে তার শরীরটা গিলে খাচ্ছে। তার উপর বৃষ্টির এই প্রকোপে যানজটের শব্দ অস্থির লাগছে।
সময় গড়িয়ে দশটায় আঘাত করছে। খিদায়, চিন্তায় নুসাইবা বিচলিত। রাস্তায় মানুষের ছড়াছড়ি। কেউ কেউ টঙে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে,কেউ সিগারেট। কপোত কপোতী হাতে হাত ধরে রাস্তায় পায়চারি করছে,লাজুক হাসছে। অথচ নুসাইবা এতক্ষণ বিরক্ত হলেও এই প্রেমিক যুগলদের দৃশ্যে তার দৃষ্টি আটকেই থাকে।
জীবনে কি আসলে মানুষের সুখ এই প্রেম,ভালোবাসা? নাকি কেবল বিষাদ নিয়ে আসে ক্ষণিকের এই ভালো লাগা? জানেনা নুসাইবা সে জানতেও চায় না। একটা লোককে ভরসা করার মতো সাহস মেয়েরা কিভাবে পায় সেটা আদৌ তার বুঝে আসবে কিনা কোনোদিন সে জানে না।
কাঁচের গ্লাসে সে আঙ্গুল বুলায়। ভাবনায় হারিয়ে যায় অদিতির জন্যে। মেয়েটার কি হয়েছে সে চিন্তায় অস্থির। আদৌ কি বলবে আসল সত্যিটা?
বেশ সময় পেরুনোর পর শোরুমের দিকে এগিয়ে যায় নুসাইবা গাড়ি থেকে নেমে।বৃষ্টি তখনো তুলকানাম চালাচ্ছে। শোরুমের একটা গেট খোলা। কিন্তু চারিদিকে এতসব কালো পোশাকের লোক দেখে সে তটস্থ। কি হচ্ছে ভিতরে?
নুসাইবাকে দেখে তারা জায়গা করে দেয়। তাদের গায়ের একটু বাতাসের স্পর্শ যেনো তার গায়ে না লাগে এমন ভাব। অথচ তারা কি চিনে নুসাইবা কে? নাকি বেঞ্জামিন নির্দেশনা দিয়ে রেখেছ কেউ একজন আসবে যে বেঞ্জামিনের নিজস্ব। তাই তো বেঞ্জামিন বলেছিল,
“ একটু পরে যে আসবে,তার দিকে দৃষ্টি দিলে ওখানেই চোখ তুলে নিবে।”
নুসাইবা ভেতরে প্রবেশ করলে কেমন একটা পরিচিত ম্যাসকিউলিন স্মেল নাকে লাগে। কিন্তু সে চিনে না। জানে না এমন কাউকে। না এমন সুবাসের অস্তিত্বের কেউ তার জীবনে আছে।
“অদিতি? অদিতি?”
“ইউ আর ফরটি মিনিটস লেইট।”
অচেনা এক লোকের কন্ঠস্বর। কেমন ভয়াবহ সেই কঠিন সুর। তবে বড্ড শ্রুতিমধুর। নুসাইবা ব্যাগ খাঁমচে নেয়। সে সামনে মাথা তুলে তাকাতেই রুহ কেমন যেনো ধড়ফড় করে উঠে। সোফায় বসে আছে এক আগুন্তক। যে ফিরেঙ্গি। শুধু কালো চুল। পড়নে কালো শার্ট। কালো প্যান্ট। আভিজাত্যের সীমান্ত পেরিয়ে যদি কোনো ডেফিনেশন থাকে তাহলে সেটা এই লোক। চেহারার মাধুর্য কঠোর,কিন্তু মারাত্মক চোখে লাগার মতো। ছোট চুলগুলো একপাশ করে সেট করা। চোখজোড়া যেনো অগ্নির ফোয়ারা। চোয়াল শক্ত।
দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিললে রুহ কেঁপে উঠে নুসাইবার। মনে হচ্ছে পায়ের নিচে জমিন নেই।
“সরি?”
নুসাইবা খুব চেষ্টা করে শক্তি সঞ্চয় করে বলে উঠে।
“দিস শোরুম এন্ড ইটস স্টাফ আর ইন মাই কন্ট্রোল নাও। আইএম দা নিউ ওনার।”
লোকটা বলে উঠে আবারো। এইবারের কন্ঠে আরো তেজ। যেনো তাকে ধমক দিচ্ছে। নুসাইবা চারিদিকে দৃষ্টি দেয়। লোকটার পাশে আরো তিনজন আড়াআড়ি ভাবে দাঁড়িয়ে। তাদের সাথে দৃষ্টি মিলল না। কেমন বডিগার্ড হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
“মাই ফ্রেন্ড, অদিতি…হোইয়ার ইজ শি?”
সে প্রশ্ন করতেই তার ফোন বেজে উঠে। দ্রুত ফোন রিসিভ করে নুসাইবা। অদিতি অনেকটা কান্নার সুরেই বলে উঠে,
“আমার বাবার শরীর ভালো নেই। তিনদিন আগে স্ট্রোক করে এখনো কোমায়। সুকান্তের মাকেও থাইল্যান্ড নিতে হচ্ছে চিকিৎসার জন্যে। বাবার চিকিৎসার জন্যে এত এত টাকা।এত লোনের টাকা কিভাবে ম্যানেজ করতাম আমি জানতাম না। তাই কিছু না বলেই তোর থেকে সাইন নিয়ে আমি এই শোরুম বিক্রি করতে চাচ্ছিলাম। তবে, আমাদের নতুন ওনার সেটা কিনেছেন ঠিক তবে আমাকে আর আমার সাথে যারা আছে তাদেরকে উনার আন্ডারে থাকার শর্ত দিয়েছেন। আমি কি করবো বল? আমি ডিলে সাইন করেছি। আর ডিল ক্যানসেল করলে ৫০ কোটি জরিমানা হবে। আমি ঠিক করেছি তো?”
নুসাইবার মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে। সে ভয়ে অস্থির। তটস্থ। তবে অদিতির কোনো দোষ খুঁজে পায়নি। সে চেয়েও তো পালাতে পারবে না। এত টাকার ব্যাপার। অদিতির উপর চাপ পড়বে। মেয়েটা মারাই যাবে স্ট্রেসে।
নুসাইবা ফোনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠে,
“ইটস ওকে। সমস্যা নেই,বুঝেছি। তুই কখন ফিরবি?”
“আমার ফিরতে একমাস লাগবে। বাবাকে এইখানে ভর্তি থাকার নির্দেশনা দিয়েছে। এরপর সুকান্তের মাকেও দেখতে যাবো। তোর স্যালারি এখন স্যার দিবে। উনি বেশ মোটা অংকের স্যালারি দিবে বলেছিলেন। নতুন মেয়েও নিবে এমনটা শুনলাম।”
“আচ্ছা। তুই ফিরে আয় সুস্থভাবে। আমি দেখছি। আমি আছি এইখানে।”
নুসাইবা আশ্বাস দেয়। অথচ সে নিজে কিভাবে সামলাবে নিজেকে বুঝতেই পারছে না।
তার কথা বলার সময়টা পুরোই বেঞ্জামিন মুগ্ধ হয়ে চেয়েছিল। অথচ তাকে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না। কেবল বাম দিকের কিছু অংশ আর জিঞ্জার রঙের চুলের নিচের দিকটা। অতটুকুতেই বেঞ্জামিন হন্য হয়ে উঠে। দৃষ্টি তার মেয়েটার জন্যে স্তব্ধ হয়ে রয়।
“ভাই,দেখছিস আমাদের বস কোথায়.. কেনো এসেছে? এইযে আমাদের ম্যাডাম। উনার জন্যেই।”
ফিসফিস করে বলে এলেক্স।
“বেশি কথা বলবি না,এলেক্স। বস রেগে আছে কিছু কারণে। অতিরিক্ত কথা শুনলে আমাদেকেই না শুলে চড়ান।”
ইথেনের ফিসফিস রাশিয়ান ভাষার কন্ঠে বিরক্ত হয় দোয়াদ। কুনোই দিয়ে গুতা দিয়ে আওড়ায়,
“চুপ থাক ভাই,আন্দাজে ঢিল মারলে আমাদের উপর উনি পাথর মারবেন। বস এমনিও ক্ষেপানো কয়েকদিন ধরে।”
তারা তাদের মতো চুপটি করে রয়।
নুসাইবা বেঞ্জামিনের সামনে দাঁড়ালে মেয়েটা বুঝতে পারে না কি বলবে। তাও মাথায় কাপড় টেনে ইংরেজিতে বলে উঠে,
“সরি স্যার। প্রথমে বুঝতে পারিনি। আমি নুসাইবা। নুসাইবা ইয়াসিন জামান।”
“আই নো। এন্ড মাইসেলফ বেঞ্জামিন। আরন বেঞ্জামিন।”
বুকে হাত গুটিয়ে বলে উঠে বেঞ্জামিন। পায়ে পা উঠানো ছিল পূর্ব থেকেই। মারাত্মক এম্পেরর টাইপ ভাব।সে কথাটা বলতেই বাকি তিনজন এবং সাথের বডিগার্ড সব বের হয়ে যায়।
নুসাইবার অন্তর ধরফর করে। মেয়েটা কি বলবে,কিভাবে কথা আগাবে ভেবে পায় না। মনে হচ্ছে তার দুনিয়া ঘুরছে।
বেঞ্জামিন উঠে দাঁড়ালে তার উচ্চতার সামনে নুসাইবাকে অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। লোকটার লম্বা উচ্চতা,বলিষ্ঠ শরীর আর চমৎকার বাচনভঙ্গিতে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে নুসাইবার। হঠাৎ সবাই চলে যাওয়ায় দুইজন শোরুমে একা ভেবে তার মাথা নড়ে উঠে। পেটে কিছু না থাকায় লো আয়রনের কারণে তার মাথা চক্কর দেয়। চারিদিকে বিভৎস লাল কালো রঙের উৎপত্তি হয়।
“ব্রিং দা ফাইলস অফ প্রিভিয়াস রেকর্ড,মিস নুসাইবা।”
বেঞ্জামিনের এমন কাঠখোট্টা ইংরেজি একটু সময় নিয়ে বুঝে সে। অথচ কিছু বলার আগেই তার গভীর কণ্ঠের খাদে আর লো আয়রনের কারণে তার মাথার খেয় হারিয়ে ফেলে। সে আচানক পড়তে নিলে একটা বলিষ্ঠ হাত তাকে আটকে নেয়। হাওয়ায় ভাসে সে।
বেঞ্জামিনের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। তবে মেয়েটা যে নার্ভাস হয়ে এমন জ্ঞান হারিয়েছে সেটা বুঝতে তার দেরী হয়নি। তাকে সোফায় শুইয়ে দেয়।
বেঞ্জামিন নুসাইবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে। আলতো করে তার গলায় আঙুল স্পর্শ করে ফিসফিস করে বলে,
“বেঞ্জামিনকে দেখেই সেন্স হারিয়েছ, জিঞ্জার কিটেন! তবে তখন কি করবে,যখন এই বেঞ্জামিনের ইরোটিক রোমান্সে তোমার দিন দুনিয়া মাতাল হয়ে যাবে! তখন অজ্ঞান হলেও কিন্তু রক্ষে নেই। উমহ মাই গুড গার্ল সাইবা,মিট ইওর পার্সোনাল ব্যাডবয় যে তোমার জন্যে উন্মাদ, তোমাতেই আসক্ত।”
চলবে…….
কপি করা নিষেধ। কেমন হচ্ছে গল্প অবশ্যই জানাবেন। আর উপন্যাস ১৮+ হবে তাই নিজ দায়িত্বে পড়বেন।